Golpo romantic golpo দিশেহারা

দিশেহারা পর্ব ৫৫


দিশেহারা (৫৫)

সানা_শেখ

“আমরা সকালেই চলে যাবো এখান থেকে। এই বাড়ি অভিশপ্ত। এই বাড়ি আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তোরা এখানে থাকলে—
না না, আমি তোদের এখানে আর রাখবো না, কোনোদিন আনবো না আর তোদের এই বাড়িতে।”

সোহা শ্রবণের চুলে হাত বুলিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,

“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি যা চাও তাই হবে, এখন নিজেকে সামলাও। এমন করছো কেন? আমাকে মানা করো অথচ নিজেই এখন নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছ। জানো তো উত্তেজিত হওয়া তোমার জন্য কতটা বিপদ জনক। প্লীজ, শান্ত হও। তোমার কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাব।”

শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোদের কিছু হলে আমি দিশেহারা হয়ে ম’রে যাব।”

“কিছু হবে না ইনশা-আল্লাহ।”

শ্রবণ মুখ নামিয়ে সোহার পেটে চুমু খায়, হাত বুলায়। কিছুক্ষণ গাল ঠেকিয়ে রাখে।
সোহা শ্রবণের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

“ঘুমাবে না? রাত এখনো অনেক বাকি, ভয় পেও না। শোও সোজা হয়ে।”

“আমাকে একা রেখে কোথাও যাবি না।”

“যাবো না।”

শ্রবণ বিছানায় শুয়ে পড়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে। সোহার দিকে তাকিয়ে শুতে বলে ওকেও। সোহা মেইন লাইট অফ করে শ্রবণের পাশে শুয়ে পড়ে। শ্রবণ সোহার বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে ওকে। ওর হার্ট এখনো অনেক জোরে জোরে বিট করছে। হাত-পা ভীষণ ঠান্ডা হয়ে গেছে এখন। স্বপ্নের দৃশ্য চোখে ভাসছে চোখ বন্ধ করলেই। এর আগে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠতো, তবে স্বপ্নে কি দেখেছে সেসব ভুলে যেত, কিন্তু আজকে এমন কিছু হয়নি। স্বপ্নের পুরো দৃশ্য স্পষ্ট মনে আছে, চোখের সামনে ভাসছে।
এমন বিভৎস স্বপ্ন কেন দেখল? কেউ ওর বউ-বাচ্চার কোনো ক্ষতি করলে তাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে এক ন্যানো সেকেন্ডও ভাববে না, সে যেই হোক না কেন।

সোহা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

“এমন কেঁপে কেঁপে উঠছো কেন? টেনশন বাদ দিয়ে ঘুমাও।”

শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলে,

“ঘুম আসছে না।”

“জেগে থাকলে উল্টাপাল্টা কিছু ভাববে না কখনো। জেগে থাকলে যা ভাবো ঘুমালে শ’য়’তান সেসব স্বপ্নে দেখায়।”

“আমি তো এমন কিছু কল্পনাও করিনি কখনো, তাহলে এমন স্বপ্ন কেন দেখলাম?”

“শ’য়’তান ভয় দেখানোর জন্য দেখিয়েছে, এসব সত্যি হবে না।”

“তুই যখন আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলি তখন তো সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। যদি আমার এই স্বপ্নও সত্যি হয়? না। এই বাড়িতে যতক্ষণ আছি তুই আমার কাছ থেকে এক চুলও নড়বি না। ওরা ডাইনী, রাক্ষসী। আমাকে শেষ করার জন্য ওরা তোদের দুজনকে খেয়ে ফেলবে। ওরা জেনে গেছে আমার দুর্বলতা কোথায়, জেনে গেছে কোথায় আঘাত করলে আমি নিজে থেকেই শেষ হয়ে যাবো চিরতরে। তুই একদম আমার কাছ থেকে দূরে যাবি না।”

শ্রবণের হাতের বন্ধন আগের চেয়ে শক্ত হয়েছে, পারলে বোধহয় সোহার বুকের ভেতর ঢুকে যেতো এখনই। উত্তেজিত হয়ে উঠেছে আবার। সোহা ওকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার জন্য বলে,

“যাবো না, কোত্থাও যাবো না তোমাকে ছেড়ে। সবসময় তোমার সঙ্গেই থাকব। তুমি উত্তেজিত না হয়ে শান্ত হও, আমি তোমার কাছেই আছি, সবসময় থাকব।”

শ্রবণ সোহার বুক থেকে মুখ সরিয়ে উপরের দিকে ওঠে, সোহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে। চার হাত-পা দিয়ে সাপের মতো করে পেঁচিয়ে ধরেছে। মাথায় চুমু খেয়ে বলে,

“তুই ঘুমা, আমার এখন আর ঘুম আসবে না।”

সোহা কিছু না বলে শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে নিশ্চুপ হয়ে রইল। এমনিতেই শ্রবণের ঘুম কম, ঠিক মতো ঘুমায় না। আজকে যাও একটু ঘুমিয়েছিল এই স্বপ্ন ওর সেই ঘুমটুকুও কেড়ে নিল।

বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, সোহা-ও ঘুমোতে পারছে না। শ্রবণ মুখ নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

“না ঘুমিয়ে এমন ছটফট করছিস কেন?”

হঠাৎ শ্রবণের গলার স্বর শুনে চমকে ওঠে সোহা। মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ঘুম আসছে না।”

“ঘুমা। ডাক্তার তোকে রাত জাগতে নিষেধ করেছেন না?”

“তোমাকেও তো নিষেধ করেছেন।”

“আমার কথা বাদ দিয়ে নিজের চিন্তা কর।”

“আমাদের ভালো থাকার কারণই তো তুমি। তুমি যদি ভালো না থাকো তাহলে আমরা ভালো থাকবো কীভাবে?”

শ্রবণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

“এত কথা কার কাছে শিখেছিস? তুই তো এত কথা বলতে পারতি না। বোকা মস্তিষ্কে এত বুদ্ধি কোত্থেকে এলো?”

সোহা শ্রবণের বুকে আবার মুখ গুঁজে বলে,

“আগে আমি শাহীন রেজা চৌধুরীর মেয়ে ছিলাম, কিন্তু এখন আমি শ্রবণ চৌধুরীর ওয়াইফ, তার সন্তানের মা হতে চলেছি, এখনো আগের মতো বোকা থাকা কি মানায় আমাকে?”

শ্রবণ সোহাকে আরো ভালোভাবে বুকে চেপে ধরে বলে,

“বোকাই থাক সারাজীবন।”

সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকায় আবার। শ্রবণ ওর কপালে ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। সোহা পুনরায় বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে শ্রবণকে।

নাস্তা সেরে রুমে আসে শ্রবণ আর সোহা। আজকে ডাইনিং রুমে গিয়েই নাস্তা করেছে দুজন। চলে যাবে তাই ভাই আর দাদার সঙ্গে নাস্তা করতে চেয়েছে শ্রবণ। রাতে আর জ্বর ওঠেনি সামাদ চৌধুরীর, এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন। আশা করা যায় আগামী দুদিনের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তনিমা চৌধুরী রুম থেকে বের হননি আজ। ওনার নাস্তা রুমে দিয়ে এসেছিল মেড। অনিমা চৌধুরীর নাস্তাও রুমে দিয়ে আসা হয়েছে। অ্যাকসিডেন্টের পর থেকে রুমেই খাওয়াদাওয়া করেন উনি।

শ্রবণ সোহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

“রেডি হ, বের হবো একটু পর।”

সোহা মাথা নেড়ে ওর আর শ্রবণের ঔষুধগুলো পার্সে তুলে রাখে। ফোন আর চার্জারও তুলে নেয়।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিছানায় বসে থাকা শ্রবণ ধমকের সুরে বলে,

“এই, ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন ওভাবে? কী হয়েছে?”

সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকায় তবে মুখে কিছু বলে না। শ্রবণ কিছুক্ষণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর স্বরে বলে,

“যা।”

সোহা প্রশ্ন বোধক চাহনিতে তাকিয়ে থাকলে শ্রবণ আবার বলে,

“যা।”

“যাব?”

“যা।”

সোহা শ্রবণের মুখের দিকে রইল। ও তো মুখে কিছু বলেনি, শ্রবণ বুঝলো কীভাবে ও কী করতে চাইছিল?

“দুই মিনিট সময়।”

সোহা মাথা নেড়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়। শ্রবণ বসা থেকে উঠে সোহার পেছন পেছন এগিয়ে বলে,

“আস্তে হাঁট, এক কথা কতবার বলতে হয়?”

সোহা হাঁটার গতি কমিয়ে বাবা-মায়ের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে প্রবেশের অনুমতি পায়।
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শাহীন রেজা চৌধুরী অবাক হয়ে সোহার দিকে তাকিয়ে আছেন। খাটের হেডবোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে থাকা অনিমা চৌধুরী সোজা হয়ে বসেন। ওনার চোখমুখেও অবাকের রেশ স্পষ্ট।
দরজার সামনে প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে সটান দাঁড়িয়ে আছে শ্রবণ। ওর চোখমুখ ভীষণ গম্ভীর।

“আম্মু, কেমন আছো?”

অনিমা চৌধুরী শ্রবণের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকান। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন,

“ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

বলতে বলতে মায়ের পাশে বসে সোহা। শ্রবণের চোখমুখ কঠিন হয়। সোহা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ডুকরে কেঁদে ওঠে। অনিমা চৌধুরী মেয়েকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরেন। মাথায় চুমু খেয়ে ধরা গলায় বলেন,

“সরি, মা। আমার জন্য, আমার ভুলের জন্য আজকে তোকে এতকিছু ভুগতে হয়। পারলে আমাকে মাফ করে দিস।”

সোহার কান্না বাড়ে। নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাকে।
শ্রবণ ধুপধাপ পা ফেলে ভেতরে প্রবেশ করে। সোহার হাত টেনে ধরে অনিমা চৌধুরীর কাছ থেকে আলাদা করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“তোকে কথা বলার পারমিশন দিয়েছি, কোনো নোংরা ন’ষ্টা মহিলাকে জড়িয়ে ধরার পারমিশন দেইনি। ওর ছোঁয়াও বিষাক্ত। চল এখান থেকে।”

অনিমা চৌধুরীর দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সোহাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
অনিমা চৌধুরী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন। শাহীন রেজা চৌধুরী কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে পুনরায় তৈরি হতে মনোযোগী হন।

আর তিনদিন পর শ্রবণের মাস্টার্সের পরীক্ষা শুরু। পড়াশোনার অনেক চাপ। সময় নষ্ট না করে পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে এখন।
এখন রাতের এগারোটা বাজে। বই বন্ধ করে হাই তুলতে তুলতে রুমের লাইট অফ করে বেডরুমের দিকে এগিয়ে আসে। এতক্ষণে সোহা নিশ্চই ঘুমিয়ে গেছে। সোহার ভয় এখন কমেছে অনেক, আগের মতো অত ভয় পায় না এখন।
রুমে ঢুকে শ্রবণ শকড। থমকে দাঁড়িয়ে গেছে, পলকহীন তাকিয়ে আছে সোহার দিকে। সোহা বাম হাত উঁচু করে শাড়ির আঁচল নাড়িয়ে হাসি মুখে বলে,

“কেমন লাগছে আমাকে?”

শ্রবণ ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বিরস বদনে বলে,

“একদম শাকচুন্নির মতো।”

সোহার মন খারাপ হয়ে যায়। ঘুরে দাঁড়ায় শ্রবণের দিকে মুখ করে। ওয়াশরুমে প্রবেশ করার আগে শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকায়। নরম মোলায়েম স্বরে বলে,

“বিউটিফুল।”

বলেই ওয়াশরুমের ভেতরে প্রবেশ করে।
মুহূর্তেই সোহার মন খারাপ উবে গেছে। আনন্দে ভরে উঠেছে মন। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে থাকে ঘুরে ফিরে। শ্রবণের বলা বিউটিফুল শব্দটা বারবার কানে বাজছে।
শ্রবণ ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর হার্টবিট বেড়ে গেছে অনেক। ডান হাতটা বুকের বাম পাশে চেপে ধরে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। সোহাকে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখে ওর হৃৎস্পন্দন থমকে গিয়েছিল। এমন সাজে আজকের আগে কোনোদিন দেখেনি শ্রবণ সোহাকে।

ঘুরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। সোহা ওর দিকে তাকায়। শ্রবণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে প্রায় ছুটে এসে সোহাকে আলিঙ্গন করে। এমন হওয়ায় হকচকিয়ে যায় সোহা। শ্রবণ মুখ এগিয়ে নেয় সোহার কানের কাছে। ফিসফিস করে বলে,

“পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, আমার তুই। তুই এত সুন্দর যা কোনো শব্দে, ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তুই কার চোখে কেমন আই ডোন্ট কেয়ার, তুই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, কারণ তুই আমার, একান্তই আমার।”

শ্রবণের গলার স্বর আর কথা শুনে সোহার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। হার্টবিট বেড়ে গেছে বহুগুণ। শ্রবণ আবার বলে,

“এভাবে সেজেছিস কেন? আমাকে পাগল বানানোর জন্য? এমনিতেই তো বাড়ির সবাই পাগল বলে, এবার কী তুই সত্যি সত্যিই পাগল বানাবি নাকি?”

চলবে………

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply