দিশেহারা (৫০)
সানা_শেখ
শ্রবণ কোনো কথা বলে না, বলতে পারছে না। মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেছে। সোহাকে ছেড়ে বসা থেকে উঠে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। সোহার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে রুমে ফিরে আসে। বিছানায় বসে মুখ চেপে গুমরে কাঁদে। শ্রবণের এমন কথা ওকে অনেক যন্ত্রণা দেয়। যখন মা-খালাকে তুলনা করে ওকে কথা শোনায় তখন যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে আসে, বুক ফেটে যেতে চায়। শ্রবণের সবকিছু মেনে নিতে পারলেও এই একটা কাজ মেনে নিতে পারে না। ভয়ে শ্রবণের মুখের উপর কোনো কথা বলারও সাহস পায় না, আজকে যেন কীভাবে বলে দিলো এতগুলো কথা।
আধা ঘণ্টার অধিক সময় পর সোহা নিজেকে স্বাভাবিক করে। শ্রবণ এখনো ব্যালকনিতেই রয়েছে। বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে হাতমুখ ধোয়ার জন্য। আয়নার দিকে তাকায়, কান্নাকাটি করে চোখমুখের বেহাল দশা করে ফেলেছে। মাথা ভার ভার লাগছে।
হাতমুখ মুছে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। শ্রবণ আগের মতোই উল্টো ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। সোহার ভয় লাগছে এখন। শ্রবণ নিশ্চই ওর উপর অনেক রেগে আছে। তখন তো ঝোঁকের মাথায় কত কিছু বলে ফেলল। এখন কী হবে ওর? শ্রবণ কী করবে ওর সঙ্গে? সোহার গলা শুকিয়ে আসে, ভয়ে ভয়ে কম্পিত স্বরে বলে,
“খে… খেতে চলো।”
শ্রবণ নিশ্চুপ থাকে।
“খাবার খাবে চলো।”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণের দৃষ্টি আজ অন্য রকম লাগছে। পুনরায় সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে থমথমে গম্ভীর গলায় বলে,
“খাব না, তুই খেয়ে নে।”
“চলো।”
“যা এখান থেকে।”
“সরি।”
শ্রবণ বলে না কিছু। সোহা ভয়ে ভয়ে শ্রবণের পাশে এসে দাঁড়ায়। ডান হাতটা ধরে বলে,
“ভুল হয়ে গেছে আমার, মাফ করে দাও। আর কোনোদিনও বলবো না কিছু। তুমি যা খুশি বলো, করো আমি কিছুই বলবো না আর।”
“যেতে বলেছি এখান থেকে।”
সোহা ডুকরে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“ভুল হয়ে গেছে, আর কোনোদিন এমন ভুল হবে না। তোমার মুখের উপর আর কোনোদিন কথা বলবো না।”
শ্রবণ সোহাকে নিজের সামনে টেনে এনে জড়িয়ে ধরে। ভেজা চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে।
বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়, সোহার কান্না বন্ধ হয়ে গেছে আবার। বুকে মুখ গুঁজে রেখেই নাক টেনে বলে,
“খাবে চলো।”
“খেতে ইচ্ছে করছে না, তুই খা গিয়ে। আমি বের হবো এখন।”
সোহা বুক থেকে মুখ তুলে তাকায়, শ্রবণ-ও সোহার মুখের দিকে তাকায়। একে অপরের মুখের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
শ্রবণ রেডি হয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার আগে সোহার দিকে তাকিয়ে আরও একবার বলে,
“খেয়ে নে দ্রুত, আমার ফিরতে একটু রাত হবে। ভয় পাবি না, রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি দ্রুত।”
সোহা মাথা নাড়ে, শ্রবণ দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। সোহা বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। শ্রবণ না খেয়ে বেরিয়ে গেল, ওর গলা দিয়ে এখন খাবার নামবে?
সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। পশ্চিম আকাশ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। হাইওয়ে রোডে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে শ্রবণের বাইক। হাইওয়ে রোড হলেও এখন যানবাহন চলাচল তুলনামূলক কম তাই বাইকের গতি আরও বেশি। ওর পেছনে ছুটে আসা সিলভার কালার গাড়িটা ওর বাইকে ধাক্কা মা’রে সজোরে। পেছন গাড়ি দেখে শ্রবণ রাস্তার সাইডে নিয়েছিল বাইক কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। গাড়ি সাইডে এসেই ওকে ধাক্কা দিয়ে ছুটে চলে গেছে মুহূর্তেই।
শ্রবণের বাইকে ধাক্কাটা যে ইচ্ছাকৃতভাবেই দিয়েছে সেটা তো স্পষ্টই। বাইক সহ অনেকটা দুরত্বে উড়ে এসে ছিটকে পড়েছে শ্রবণ। গলা কা’টা মুরগীর মতো ছটফট করতে করতে উঠে বসার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। পড়ে থেকেই হেলমেট খোলার চেষ্টা করে এমন সময় ওর সামনে এসে দাঁড়ায় কয়েকটা বাইক। বাইকগুলো থেকে নেমে দাঁড়ায় কয়েকজন ছেলে। সকলের হাতে হকি স্টিক। হেলমেট পরিহিত থাকলেও ছেলেগুলোকে চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয় না শ্রবণের। ছেলেগুলোর মধ্যে কয়েকজন ওদের ভার্সিটির জুনিয়র। এদের মধ্যে থেকে দুজন ছেলে সোহাকে র্যাগিং করেছিল একদিন, আরেকদিন টিজ করে কথা বলেছিল বিনিময়ে শ্রবণ শাস্তিও দিয়েছিল।
এরা কি করতে চলেছে তা বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনি শ্রবণের। ব্যথাতুর কন্ঠে বলে,
“কু/ত্তার মতো দল বেঁধে এসেছিস? একা আসার মতো হিম্মত নেই?”
“যার মতোই আসি, আজকে তো তোর খবর আছে।”
শ্রবণকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আগ্রাসী হয়ে হামলা করে ওর উপর। শ্রবণ তো বাইক থেকে ছিটকে পড়েই আধম’রা হয়ে ছিল, এখন এদের হকি স্টিকের বারি খেয়ে জান যায় যায়। চাইলেও উঠতে পারছে না আর। দুই একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না।
ঠাস ঠাস বারির শব্দ আর শ্রবণের গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে সাই সাই করে ছুটে চলে যাচ্ছে ইঞ্জিন চালিত যানবাহনগুলো।
ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছে সোহার। শীতের মধ্যেও শরীর ঘেমে নেয়ে জবজবে প্রায়। ওড়না দিয়ে মুখ গলা মুছতে মুছতে আতঙ্কিত হয়ে রুমের চারদিকে নজর বুলায়। বুঝতে পারে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি।
বুকের ভেতর অনেক জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে। অস্থির হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে শ্রবণের জন্য। এত বাজে একটা স্বপ্ন কেন দেখল? শ্রবণ এখন কোথায়? ওর এমন লাগছে কেন?
তাড়াহুড়ো করে নিজের ফোন হাতে নিয়ে শ্রবণের ফোনে কল করে। প্রথমবার রিং বেজে কে’টে যায় রিসিভ হয় না। ভয়ে ভয়ে দ্বিতীয়বার কল করে। এবার সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হয়।
“হ্যা… হ্যালো।”
“হ্যালো।”
সোহা ফোন কান থেকে সরিয়ে মুখের সামনে ধরে। শ্রবণেরই তো নাম্বার, কল কে রিসিভ করেছে? শ্রবণের বন্ধুদের মধ্যে থেকে কেউ? হতে পারে। পুনরায় ফোন কানে ধরে বলে,
“হ্যালো, কে?”
“আমি রুস্তম, এই ফোনের মালিক আপনার কে হোন?”
“আমার হাজব্যান্ড, আপনি কে আর ওর ফোন আপনার কাছে কেন? ও কোথায়?”
“আপনার হাজব্যান্ড অজ্ঞান হয়ে হাইওয়ে রোডে পড়ে আছে। কারা যেন মা’রধর করেছে। অবস্থা আশঙ্কা জনক।”
শ্রবণের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতেই সোহার হাত থেকে ফোন পড়ে যায়। লোকটার কথাগুলো কানে বাজছে বারবার। সোহা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। উদভ্রান্তের ন্যায় ফোন হাতে নিয়ে কান্না করতে করতে কিছু বলে তবে ওপর পাশের ব্যক্তি সেসব বুঝতে পারেন না।
সোহা কল কে’টে দিয়ে সামাদ চৌধুরীর ফোনে কল করে। রিসিভ হতেই হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“দাদা ভাই, ওকে যেন কারা মে’রে’ছে, অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে।”
“কাকে মে’রে’ছে? কী বলছো এসব?”
“তোমার নাতিকে মে’রেছে। ওকে বাঁচাও। ওর ফোনে কল করো তাহলে বুঝতে পারবে।”
“হ্যাঁ করছি তুমি শান্ত থাকো, প্যানিক করো না।”
সামাদ চৌধুরী কল কেটে দেন। সোহা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে বিছানায়।
চলবে…………
পর্ব ছোটো হয়েছে বলে মনে খারাপ করবেন না। আমি ক্লান্ত থাকায় লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম 🙂 নেক্সট পর্ব বড়ো করে দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশা-আল্লাহ।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ২২
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ৫১
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা পর্ব ১১
-
দিশেহারা পর্ব ৫২
-
দিশেহারা পর্ব ৯