দিশেহারা (৪৯)
সানা_শেখ
বারোটার দিকে ফ্ল্যাটে ফেরে শ্রবণ। রুমে এসে দেখে সোহা ঘুমিয়ে আছে। হাতের চাবি আর ফোন ওয়ালেট রেখে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ওয়াশরুমের দিকে আগায় ফ্রেশ হওয়ার জন্য। বুকে নখের আঁচড় লাগতেই নিজের নখের দিকে তাকায়। কিছুটা বড়ো হয়ে গেছে নখগুলো। এখন আর নিজের নখ নিজে কা’টে না শ্রবণ, সোহা-ই কেটে দেয়। শার্ট খুলে রেখে ওয়াশরুম থেকে ফিরে আসে আবার। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে নেইল কা’টা’র খুঁজতে শুরু করে। খুঁজে না পেয়ে বিড়বিড় করে সোহাকে গালি দেয় কয়েকটা। কোথায় রেখেছে? আরও কতক্ষন খোঁজাখুঁজির পর পায়।
কা’টা’রটা নিয়ে সোফায় বসে। চার হাত-পায়ের নখ কে’টে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নখ একটু বড়ো হলেই শ্রবণের অস্বস্তি হয়। বড়ো নখ ওর একদম সহ্য হয় না। নখগুলো সামান্য বড়ো হয়েছিল তাতেই কে’টে ফেলল।
ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়েও থেমে যায়, ঘুরে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে। ব্ল্যাঙ্কেটের নিচ থেকে সোহার হাত বের করে ওর হাতের দিকে তাকায়। সোহার পাশে বসে যত্ন নিয়ে ওর হাতের নখগুলো কে’টে দেয়। ঘুমে বিভোর সোহা বুঝতেও পারে না কিছু। পায়ের কাছে বসে পা কোলের ওপর তুলে নিয়ে পায়ের নখগুলোও কে’টে দেয়।
পা-জোড়া ঢেকে দিয়ে নখ তুলে বাস্কেটে ফেলে। নেইল কা’টা’র জায়গা মতো রেখে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
সোহার ঘুম ভাঙে দুইটার পর পর। আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসে। চুলগুলো হাত খোঁপা করে ফোন হাতে নেয় সময় দেখার জন্য। দুইটার উপর বেজে গেছে দেখে চিন্তিত হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। শ্রবণ এখনো ফেরেনি? দরজা খুলতেই টিভির সাউন্ড কানে ভেসে আসে। রুম থেকে বেরিয়ে দেখে শ্রবণ সোফায় বসে টিভি দেখছে।
“কখন এসেছ?”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় সোহার মুখের দিকে। গম্ভীর গলায় বলে,
“অনেকক্ষণ।”
“খেয়েছ?”
“না।”
“ডাকোনি কেন আমাকে?”
“ফ্রেশ হয়ে আয়।”
সোহা আর কিছু না বলে রুমের দিকে আগায়।
মুখ ধোয়ার সময় হাতের দিকে নজর পড়ে। ও তো নখ কা’টেনি আজ। ওর নখ গেলো কোথায়? কে কা’টলো? শ্রবণ? বিস্ময়ে সোহার চোখজোড়া বড়ো বড়ো হয়। শ্রবণ ওর নখ কেটে দিয়েছে? যেই ছেলে এখন নিজের নখ কা’টে না সেই ছেলে ওর নখ কে’টে দিয়েছে? কিন্তু কখন কা’টলো? ঘুমিয়ে ছিল তখন? হতে পারে। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে পায়ের নখগুলোও কা’টা হয়েছে। সোহার কেন যেন খুব ভালো লাগছে এখন, আনন্দ অনুভব হচ্ছে, সুখ সুখ লাগছে।
ফ্রেশ হয়ে সোফার কাছে এগিয়ে আসে। শ্রবণ টিভি অফ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সোহা শ্রবণের সামনে দাঁড়িয়ে ওর হাত দুটো ধরে নখের দিকে তাকায়। দেখে শ্রবণ নিজের নখও কে’টেছে। শ্রবণের হাত দুটোতে চুমু খেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। শ্রবণ কিছু বুঝতে না পেরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাগল হয়ে গেলো নাকি ডাইনীর বাচ্চাটা?
“এই, কি হয়েছে তোর? মাথা খারাপ হয়েছে? নাটক করছিস? ছাড়।”
সোহা শ্রবণের বুক থেকে মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। সোহার চেহারা হাস্যোজ্বল, চোখমুখ চকচক করছে। অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। সোহা শ্রবণের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি অনেক ভালো।”
শ্রবণ কপাল ভ্রু কুঁচকায়। কয়েক সেকেন্ড বাদেই কপাল ভ্রু টানটান হয়। হয়তো আঁচ করতে পারলো সোহার এমন আচরণ আর কথা বলার কারণ। নিজেও আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে গম্ভীর গলায় বলে,
“খিদে পেয়েছে আমার।”
“চলো খেতে দিচ্ছি।”
খুশিতে সোহার চোখজোড়া পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে। শ্রবণের এতটুকু যত্নও ওকে অসীম সুখানুভূতি দিচ্ছে। শ্রবণকে ছেড়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে চোখের পানি মুছে নেয় ওড়না দিয়ে। শ্রবণ ওর পেছন পেছন এসে চেয়ার টেনে বসে। মুখ তুলে সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহা একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে খাবার বাড়ায় মনোযোগী হয়।
শ্রবণ কফি খেতে চাওয়ায় সোহা কফি বানানোর জন্য রান্নাঘরের দিকে আগায়। ওর পেছন পেছন শ্রবণ নিজেও রান্নাঘরে প্রবেশ করে। সোহার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ হয়ে।
“আরও কিছু লাগবে তোমার?”
শ্রবণ হ্যাঁ না কিছুই বলে না। ওকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে সোহা আর কিছু বলে না। কফি বানানো হলে শ্রবণের হাতে কফির মগ দেয়। কফি আর চিনির কৌটা সরিয়ে রেখে রান্নাঘর থেকে হয়, শ্রবণ আবার ওর পেছন পেছন রুমে ফিরে আসে।
সময় দেখে নিয়ে গোসল করার জন্য ওয়াশরুমে প্রবেশ করে সোহা। শ্রবণ বিছানায় বসে ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কফি খাওয়া শেষ করে নিজের ফোন খুঁজতে শুরু করে। রুমের কোথাও ফোন খুঁজে না পেয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। সোফা, টি টেবিলের ওপর কোথাও ওর ফোন নেই। ফোনের হাত পা গজালো নাকি? গেলো কোথায়? পুনরায় রুমে ফিরে এসে রুম তন্নতন্ন করে খোঁজে। মেজাজ গেছে বিগড়ে। ওয়াশরুমের দরজায় জোরে জোরে করাঘাত করে উঁচু গলায় বলে,
“এই সোহা, আমার ফোন কোথায়?”
ওয়াশরুমের দরজায় এত জোরে জোরে শব্দ হওয়ায় ভয় পেয়ে গেছে সোহা। শ্রবণের কথা শুনে বলে,
“আমি জানিনা তো, তোমার হাতেই তো দেখেছিলাম।”
“গোসল করতে কতক্ষণ লাগে? সারাদিন ধরে গোসল করবি নাকি? বের হ, ফোন খুঁজে দে আমার।”
“একটু আগেই তো আসলাম গোসল করতে।”
“দ্রুত বের হ ভেতর থেকে।”
বাজখাঁই গলায় বাক্যগুলো উচ্চারণ করে প্রস্থান করে। সোহা হতাশার শ্বাস ফেলে ড্রেস চেঞ্জ করতে শুরু করে। গোসল করতে এসেছে দশ মিনিটও হয়নি, একজন মেয়ের কি দশ মিনিট লাগে না গোসল করতে? ও ওয়াশরুমে ঢুকলেই শ্রবণের মাথায় আগুন ধরে। ও চোখের আড়াল হলেই শ্রবণের এটা লাগে, ওটা লাগে, এটা খুঁজে পায় না, সেটা খুঁজে পায় না। ডাকাডাকির উপরেই রাখে কাছ থেকে সরলে।
শুকনো পোশাক পরে চুলে টাওয়েল পেচাতে পেচাতে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে সোহা। শ্রবণ বিছানায় বসে আছে রাগে লাল হয়ে। নিজে ফোন রেখে এখন নিজেই খুঁজে পাচ্ছে না, আবার রেগে বোম হয়ে আছে।
ড্রেসিং টেবিলের উপর নজর বুলায়। শ্রবণ বসা থেকে উঠে সোহার কাছে এগিয়ে আসে। ওর চুল থেকে টাওয়েল খুলে নেয়। ভেজা চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে পড়ে। টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে।
“রুমে সব জায়গায় খুঁজেছি কোথাও নেই। আমি গোসল করে আসছি তুই ততক্ষণে খুঁজে বের কর।”
“আমার ফোন থেকে কল করলেই তো পেয়ে যেতে।”
শ্রবণ ওয়াশরুমে প্রবেশ করতে করতে বলে,
“তোর ফোনের পাসওয়ার্ড জানিনা আমি। ফোন খুঁজে বের করে চার্জে লাগিয়ে রাখ, বিকেলে বের হবো।”
সোহা আর কিছু বলে না। ব্যালকনি থেকে শুকনো টাওয়েল এনে নিজের চুলে পেচিয়ে নেয়। নিজের ফোন হাতে নিয়ে শ্রবণের ফোনে কল করে। রিংটোনের মৃদু সাউন্ড ভেসে আসছে রুমের বাইরে থেকে। রুম থেকে বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে আগায়। রান্নাঘরে এসে দেখে চুলার পাশে ফোন। বুঝতে পারে তখন ওর পেছন পেছন এসে এখানে রেখে চলে গেছে। এখানে রেখে গিয়ে বেডরুম আর ড্রয়িংরুম তছনছ করে ফেলেছে ফোন খুঁজতে খুঁজতে।
ফোন হাতে নিয়ে দেখে মিসড কলে ডাইনীর দুই নাম্বার বাচ্চা লেখা। ওর নাম্বার ডাইনীর দুই নাম্বার বাচ্চা দিয়ে সেভ করেছে। কৌতূহলী হয়ে ফোন আনলক করে। আর কারো নাম্বার কী এমন অদ্ভুত নামে সেভ করেছে?
ফোন আনলক করে অবাক হয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল। শ্রবণের ফোনের হোম স্ক্রিনে ওর পিকচার ওয়ালপেপার দেওয়া। এই পিকচার কবে আর কখন তুলল? পরনের ড্রেস দেখে বুঝতে পারছে বেশ অনেকগুলোদিন আগের পিকচার এটা। কারণ গত দুই মাসের মধ্যে এই ড্রেস পরেনি সোহা। পিকচারটা দুপুরে তোলা হয়েছে। সোহার এলোমেলো ভেজা চুলগুলোর ডগায় ফোঁটা ফোঁটা পানি জমে আছে। মুখের সামনের ছোটো ছোটো চুলগুলো পড়ে আছে, অন্যমনস্ক হয়ে কোনোদিকে তাকিয়ে ছিল বোধহয়। ওর অজান্তেই শ্রবণ পিকচারটা ক্যাপচার করেছে।
অনেকগুলোদিন হয়ে গেছে সোহা শ্রবণের ফোন আনলক করে না তাই হোম স্ক্রিনের ওয়ালপেপারও চোখে পড়েনি। গ্যালারিতে ঢুকে কয়েকটা পিকচার ছাড়া নিজের আর কোনো পিকচার পায় না। যেই কয়েকটা পিকচার আছে সবগুলো ওর অজান্তেই তুলেছে শ্রবণ।
কিছুক্ষণ ওয়ালপেপারে থাকা নিজের পিকচারটার দিকে তাকিয়ে থেকে বেডরুমের দিকে আগায়। শ্রবণ ওর পিকচার ওয়ালপেপারে দিয়ে রেখেছে এটা ওর কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে।
রুমে এসে শ্রবণের ফোনটা চার্জে লাগিয়ে বিছানায় বসে পড়ে।
আধা ঘন্টারও বেশি সময় পর ওয়াশরুম থেকে বের হয় শ্রবণ। ওর হাতের দিকে তাকিয়ে সোহার চোখ বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে গেছে আবার। শ্রবণ নিজের আর সোহার কাপড়চোপড় ধুয়ে নিয়ে এসেছে। ওর হাতে দুজনের ভেজা কাপড়চোপড়।
সোহা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“তুমি এসব ধুয়েছো কেন?”
শ্রবণ বলে না কিছু। কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয় শ্রবণ চৌধুরী।
সোহা কাছে এগিয়ে আসতেই শ্রবণ ভেজা কাপড়গুলো সোহার হাতে ধরিয়ে দেয়। টাওয়েল পরে ব্যালকনিতে যাবে না।
সোহা কাপড়গুলো নিয়ে ব্যালকনিতে চলে আসে। শীত জেঁকে বসেছে প্রকৃতিতে। আজ রোদ ওঠায় শীত কিছুটা হলেও কমেছে। গত কয়েকদিন টানা রোদ ওঠেনি। বাইরে রোদ ঝলমল করছে আজ। কাপড়চোপড় মেলে দিয়ে বেতের চেয়ারে বসে।
বেশ কিছুক্ষণ পর শ্রবণ নিজেও ব্যালকনিতে আসে। বসে সোহার পায়ের কাছে ফ্লোরে। সোহা বিচলিত হয়ে বলে,
“ঠাণ্ডার মধ্যে এখানে বসছো কেন? উঠে চেয়ারে বসো।”
শ্রবণ ওঠে না কোনো কথাও বলে না। সোহার পেটের উপর হাত রাখে। কোলের ওপর মাথা রেখে পেটের দিকে তাকিয়ে রইল পলকহীন।
সোহা শ্রবণের ভেজা চুলে হাত বুলায়। পরনের ওড়না দিয়ে আরও ভালোভাবে মুছে দেয়।
“তোমার চুল পেকে গেছে।”
শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকায়। কপাল ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আসলেই?”
“হ্যাঁ।”
“কতগুলো?”
“একটাই তো দেখছি।”
“তোল ওটাকে।”
সোহা পাকা চুলটা তুলে দেয়। শ্রবণ চুলটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন। সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি দেখা যাচ্ছে। এখন তো তোর নজর আরও বেশি বেশি অন্য ছেলেদের দিকে যাবে।”
সোহার চেহারায় আঁধার নেমে আসে।
“এসব কী বলছো তুমি?”
“ঠিকই বলেছি। এখন তো আমাকে আর ভালো লাগবে না তোর কাছে, কারণ আমি বুড়ো হয়ে গেছি।”
“আমাকে তোমার এমন মনে হয়?”
“কারো চেহারায় লেখা থাকে না তার চরিত্র কেমন, ভেতরটা কেমন। তোর মা-খালার চেহারা তো ভালোই দেখা যায়, কিন্তু ওদের ভেতরটা তো পুরো নোংরা, কালো, কুচ্ছিত।”
“আমি তো মা-খালার মতো না।”
“হতে কতক্ষন।”
“আমি তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানের মা হতে চলেছি।”
“তোর মা-ও তোর বাপের স্ত্রী, তোরা দুই ভাই-বোন হওয়ার পর তোর মা পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে হোটেলে গেছে। তোর নানি খারাপ, তোর মা খারাপ, তোর খালাও খারাপ, তুইও যে তাদের মতো হবি না, করবি না তার কি গ্যারান্টি আছে? আমাকে আর আমার সন্তানকে ফেলে যে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যাবি না তার কি গ্যারান্টি আছে?”
সোহা চুপ হয়ে গেছে, শ্রবণ আবার বলে,
“আমি কোনো সন্তান চাইনি একটা কারণেই, তুই যদি কোনোদিন আমাদেরকে ঠকাস, ছেড়ে চলে যাস তখন আমরা কি করব? আমার সন্তানের অবস্থা কেমন হবে? তুই নিজেকে দেখ, স্পর্শ, সিয়াম আর আমাকে দেখ। আমাদের কারো জীবনই স্বাভাবিক নেই তার কারণ একটাই। সিয়াম অনিমার সঙ্গে কথা বলে না। স্পর্শ তনিমাকে সহ্যই করতে পারে না, ওর চেহারাও দেখতে চায় না। আমার সন্তানকে জন্ম দিয়ে তুই যদি ওকে এমনই একটা জীবন দিস তাহলে জন্ম দেওয়ার তো প্রয়োজন নেই। জীবন্ত লা’শ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে জীবন না থাকাই ভালো নয় কী? আমার সন্তানের অবস্থা যদি আমাদের কারো মতো হয় তোকে আমি কি করবো নিজেও জানি না। আমি যা সহ্য করেছি এই জীবনে তার বিন্দু পরিমাণ সহ্য করতে দেবো না আমার সন্তানকে। ওর চুল পরিমাণ কষ্ট আমি মেনে নেবো না।”
একটু থেমে আবার বলে,
“নানি আর মা-খালার মতো হবি? ওদের মতো চরিত্র বানাবি? আমাকে আর আমার সন্তানকে ফেলে চলে যাবি? অন্য পুরুষের হাত ধরে হাঁটবি, ঘুরবি? কথা বলছিস না কেন? কথা বল? ছেড়ে যাবি আমাকে? তোর মায়ের কথা মতো আমাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য পুরুষকে বিয়ে করবি? আমার বুকের ভেতর কত যন্ত্রণা হয় তুই জানিস?”
সোহা কথা বলছে না, কেমন পাথরের মতো হয়ে বসে আছে। শ্রবণ সোহাকে জড়িয়ে ধরে সোহার বুকে মুখ গোঁজে।
সোহার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কথা বলার শক্তি টুকুও লোপ পেয়েছে এখন।
শ্রবণের উপর দৃষ্টি রেখে মনে মনে বলে,
“অদ্ভুত মানুষ তুমি শ্রবণ চৌধুরী, আমার বুকে যন্ত্রণা তৈরি করে দিয়ে সেই বুকেই মুখ গুঁজে নিজের যন্ত্রণা কমাচ্ছো।”
সোহার ফোঁপানোর আওয়াজ পেয়ে শ্রবণ মুখ তুলে তাকায়, সঙ্গে সঙ্গেই সোহার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে শ্রবণের চোখের ভেতর ঢুকে যায়। শ্রবণ চোখ বন্ধ করে আবার তাকায়। এক চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে সোহার চোখের পানি পড়ায়। সোহা চোখমুখ মুছে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলে,
“এসব কথা তুমি কেন বলো আমাকে? এসব কথা শুনলে অনেক যন্ত্রণা হয় আমার বুকে। সন্তান তো তোমার একার না, ও আমারও সন্তান। তোমাদের ছেড়ে কেন যাবো আমি? ওকে বাঁচিয়ে রাখতে এত আহাজারি কান্নাকাটি করলাম কী ছেড়ে যাওয়ার জন্য? দেখো আমার দিকে, আমি কারো মতো না, আমি আমার মতো। তুমি যা বলো সবই তো শুনি আমি, তুমি যেভাবে চাও সেভাবেই চলি। তোমাকে ছেড়ে আমাদের সন্তানকে ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি। প্রয়োজনে তুমি আমাকে এভাবেই সারাজীবন বন্দী করে রাখো তবুও প্লীজ এসব কথা আর কখনো বোলো না। এসব শুনলে নিজেকেই ঘৃণা লাগে নিজের কাছে। আয়নায় তাকাতে পারি না নিজের দিকে। তুমি তো এতদিনে বুঝে গেছো আমি কেমন। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার সবকিছু মেনে নিয়েই তোমাকে ভালোবাসি, সত্যিই ভালোবাসি। মৃত্যু ব্যতীত অন্য কোনো পরিস্থিতিতে তোমাকে আর আমাদের সন্তানকে ছেড়ে যাবো না আমি। গেলে তো আগেই যেতে পারতাম, সুযোগ কী ছিল না আমার কাছে? তোমার অগোচরে ভার্সিটি থেকে কি পালিয়ে যেতে পারতাম না? চাইলে কি এই ফ্ল্যাট থেকে পালাতে পারতাম না?
আব্বু-আম্মু যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলো তাকেই মেনে নিয়েছিলাম কিন্তু হুট করে তুমি আসলে ঝড়ের বেশে। নিয়তি হিসেবে তোমাকেই মেনে নিলাম, ভালোবাসলাম। তুমি আমাকে মা’রো, কা’টো, খু’ন করে ফেলো কিন্তু এমন কথা আর বোলো না। এসব শুনলে অনেক কষ্ট লাগে, যন্ত্রণা হয়, নিজেকেই ঘৃণা লাগে, শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে এই জীবন। মাঝে মাঝে ধৈর্যহারা হয়ে যাই, দিশেহারা হয়ে পড়ি, কেমন অনুভূতি হয় বলতে পারি না তোমাকে। তুমি ভালো করে দেখো, আমি ওদের মতো না।”
চলবে………….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৩৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৯
-
দিশেহারা পর্ব ৪৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ৯
-
দিশেহারা পর্ব ৪৭
-
দিশেহারা পর্ব ৪৮