দিশেহারা (৪৫)
সানা_শেখ
শ্রবণ সোহাকে নিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। মাজেদা আন্টি সোফায় বসে চা খাচ্ছিলেন। ওদের দুজনকে ফিরে আসতে দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,
“হুট করে কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?”
“হসপিটালে।”
“হসপিটালে কেন? সোহার কিছু হয়েছে?”
“না, আন্টি। সোহার মায়ের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, তাকেই দেখতে গিয়েছিলাম।”
“ওহ, কীভাবে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?”
“রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে।”
“এখন কেমন আছেন?”
“কৈ মাছের জান তো তাই ভালোই আছে।”
মাজেদা আন্টি সোহার মুখের দিকে তাকান। চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা অনেক কেঁদেছে। সোহার জন্য ওনার ভীষণ মায়া হয়।
সোহা রুমের দিকে এগিয়ে যায় শ্রবণকে রেখেই। শ্রবণ সোহার পেছন পেছন রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
মাজেদা আন্টি ওদের দুজনের যাওয়ার পথে তাকিয়ে সোফায় বসেন আবার।
সোহা হিজাব খুলে হাতমুখ শোয়ার জন্য ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। শ্রবণ ড্রেস চেঞ্জ করে সোহার বের হওয়ার অপেক্ষা করে।
সোহা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই শ্রবণ ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে দেখে সোহা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে সোহার জন্য প্লেটে নাস্তা সাজিয়ে নিয়ে রুমে ফিরে আসে। বিছানার উপর প্লেট রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
“নাস্তা কর।”
সোহা দ্রুত চোখমুখ মুছে দরজার দিকে পা বাড়ায়। শ্রবণ আগের মতোই গাম্ভীর্য ভাব বজায় রেখে বলে,
“নাস্তা এখানে।”
সোহা বুঝতে না পেরে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। কান্না করার কারণে সোহার চেহারার বেহাল দশা। শ্রবণের মেজাজ গরম হয়। ধমক দিয়ে বলে,
“এখনো কীসের এত কান্না? নাস্তা করতে বলেছি, নাস্তা কর।”
বিছানার উপর নাস্তার প্লেট দেখে বিছানায় বসে নাস্তার প্লেট হাতে তুলে নেয় সোহা। ঢোঁক গিলে কান্না জড়ানো গলায় বলে,
“তুমি খাবে না?”
“তুই আগে খা, আমি পরে খাব।”
সোহা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পানি পান করে। ডিম গিলার সঙ্গে সঙ্গে কান্নাও গিলে খেতে থাকে। খাবার গলা দিয়ে নামতে চাইছে না। চোখের পানি মুছতে মুছতে খাওয়া চালিয়ে যায়।
শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নেয় আবার।
হাসানের ঘুম ভাঙে বারোটার পর। ঘুমিয়েছিল ফজরের পর তাই এত দেরি ঘুম থেকে উঠতে।
বিছানা ছেড়ে নেমে হেলেদুলে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে এসে ট্রাউজার টিশার্ট পরে রুম থেকে বের হয়।
নিচে নেমে আসতেই মামা-মামি, নানি আর রিতার সঙ্গে দেখা হয়। সবাইকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তিতে পড়ে।
মামির দিকে তাকিয়ে বলে,
“মামি, খিদে পেয়েছে।”
“চলো খেতে দিচ্ছি।”
হাসানের নানি বলেন,
“হাসান, কি শুনলাম?”
হাসান ডাইনিং রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিল, নানির কথা শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলে,
“কী শুনলে?”
রেজোয়ান আহমেদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“মা, ওকে খেয়ে আসতে দাও আগে। হাসান, যা খেয়ে আয়।”
রিতার দিকে আবার চোখ পড়তেই রিতা কপাল ভ্রু নাচায়। হাসান চোয়াল শক্ত করে রাগ দেখিয়ে মুখ ফিরিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে আগায় আবার। রিতা পেছন থেকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসে। ওর যে কি আনন্দ হচ্ছে সকাল থেকে তা কোনো শব্দে প্রকাশ করতে পারবে না।
রিমা বেগম হাসানের জন্য ভাত বেড়েছেন, দুপুর তো হয়েই গেছে এখন আর কি নাস্তা খাবে? একটু আগেই রান্না শেষ হয়েছে তাই গরম গরম ভাত-ই খেতে দিলেন।
হাসান হাত ধুতে ধুতে মামির দিকে তাকিয়ে বলে,
“এভাবে কী দেখছ?”
“কিছু না, তুমি খাও।”
“তুমিও খাও।”
“পরে খাব, তুমি খাও এখন।”
হাসান খাওয়া শুরু করে। রিমা বেগম তাকিয়ে আছেন ওর দিকেই। হাসান খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মামির দিকে তাকাচ্ছে তবে মুখে কিছু বলছে না।
ও খেতে বসলে বা রিমা বেগমের কাছে থাকলে বেশির ভাগ সময় রিমা বেগম ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাকিয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে প্রতিবার একই উত্তর দেন, “কিছু না”
খাওয়া শেষ করে ড্রয়িং রুমে ফিরে আসে হাসান। রিমা বেগম টেবিল গুছিয়ে রেখে নিজেও ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হন।
রেজোয়ান আহমেদ নিজের পাশে জায়গা দেখিয়ে দেন হাসানকে বসার জন্য। হাসান চুপচাপ মামার পাশে বসে।
হাসানের নানি হোসনে আরা বেগম বলেন,
“নাতি, তুমি নাকি বিয়া করবা?”
হাসান নানির দিকে তাকায়। চোখমুখ গম্ভীর করে বলে,
“করলে সমস্যা?”
“এতকাল তো বললে জীবনে বিয়াই করবে না, আর আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনি তোমার বিয়া।”
হাসান চুপ করে রইল, খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে নানি ওকে ইচ্ছে করে খোঁচাচ্ছে। ওর পেছনে লাগা ছাড়া এই বুড়ির কোনো কাজ নেই।
রেজোয়ান আহমেদ হাসানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল।”
“বলো।”
“এই বিয়েতে তো আমরা সবাই রাজি, কারো অমত নেই। এখন তুই আমাদের সঙ্গে আছিস তাই বলে তো আমরা তোর বাবার অনুমতি ছাড়া তোর জীবনের এত বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তুই হাফিজের ছেলে, হাফিজের-ও তো একটা মতামতের ব্যাপার আছে।”
মামার কথা শুনে ছ্যাত করে ওঠে হাসান। গলার স্বর পরিবর্তন হয়। কিছুটা রুক্ষ স্বরে বলে,
“কীসের অনুমতি? কার অনুমতি? তার কোনো মতামতের প্রয়োজন নেই। আমার জীবন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তার সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই আমার।”
“এত রাগ করলে চলে? তুই হাফিজের ছেলে, তার ছেলের বিয়েতে সে মতামত দেবে না? হাফিজ এই বিয়েতে রাজি কি-না সেটাও তো জানতে হবে।”
“কোনো কিছু জানতে হবে না। সে বিয়ে করেছে আমাকে বলেছে? আমার মতামত নিয়েছিল?”
“হাসান, হাফিজ তোর বাবা হয়।”
“সো হোয়াট? এই বিয়েতে রিতা রাজি, তোমরা রাজি, আমি রাজি তাহলে ডাকো কাজি বিয়ে করে ফেলি।”
“হাফিজের সঙ্গে একটাবার কথা বল।”
“জীবনেও না।”
বলতে বলতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় হাসান। ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
পেছন থেকে চারজোড়া চোখ ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে।
রেজোয়ান আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এই ছেলে বাবার নাম শুনলেই কেমন ছ্যাত করে ওঠে। বাবার সম্পর্কে কিছু শুনতেই চায় না।
হাসানের জন্ম ইংল্যান্ডে। জন্ম সূত্রে ইংল্যান্ডের নাগরিক। বাবা মায়ের সঙ্গে সুখেই দিন কা’টছিল ওর। প্রায় তেরো বছর আগে একটা অ্যাকসিডেন্টে হাসানের মা মা’রা যান। মাকে হারিয়ে বাবার উপর নির্ভর হয়ে পড়ে হাসান। বাবাকে ছাড়া ওর চলেই না। খেতে, ঘুমোতে, স্কুলে যেতে সব জায়গায় বাবাকেই চাই। এমনিতেও মায়ের চেয়ে বেশি বাবা ভক্ত ছিল ছোটো বেলা থেকেই।
বাড়ি, অফিস আর হাসানকে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতেন হাসানের বাবা হাফিজ আহমদ।
অতঃপর স্ত্রীর মৃত্যুর ছয় মাস পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে মানতে পারেনি হাসান। ওর মায়ের জায়গায় অন্য কেউ এটা মেনেই নিতে পারছিল না। দ্বিতীয় বউ পাওয়ার পর ছেলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে হাফিজ আহমদের। হাসানও অভিমানে বাবার সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করে।
পড়াশোনা, খেলাধুলা, খাওয়াদাওয়া সবকিছুতেই অনিহা তৈরি হয়। সারাক্ষণ নিজের রুমে পড়ে থাকতো মন ম’রা হয়ে। আস্তে আস্তে শারীরিকভাবে অসুস্থ হতে শুরু করে। হাফিজ আহমদ চাইলেও তখন আর ছেলের সঙ্গে আগের মতো মিশতে পারছিলেন না, মূলত হাসান নিজেই মিশছিল না বাবার সঙ্গে। হাফিজ আহমদ হাসানের সঙ্গে কথা বলতে আসলেও হাসান বাবাকে ইগনোর করতো।
বাংলাদেশ থেকে হাসানের অবস্থার কথা জানতে পেরে ওর দাদা বাড়ি আর নানার বাড়ি, দুই বাড়ির মানুষই ওকে বাংলাদেশে পাঠাতে বলে।
বারো বছর আগে হাসানকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন হাফিজ আহমদ। ওনার দ্বিতীয় স্ত্রী বাংলাদেশে আসেনি ওনাদের সঙ্গে। হাফিজ আহমদ এক সপ্তাহের মতন থেকে হাসানকে রেখে আবার ফিরে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সেই যে ফিরে গেছেন তারপর আর ফেরেননি বাংলাদেশে। হাসান দাদার বাড়িতে না থেকে নানার বাড়িতেই আছে। দাদার বাড়ির মানুষের ব্যবহার ওর পছন্দ নয় তাই কখনো যায়ও না সেখানে।
হাসানের হাই স্কুল শেষ হওয়ার পর হাফিজ আহমদ ছেলেকে ইংল্যান্ডে ফিরতে বলেছিলেন অনাকবার হাসান রাজি হয়নি। হাসান বেশ কয়েকবার বাবাকে বলেছিল বাংলাদেশে আসার জন্য কিন্তু হাফিজ আহমদ সময় বের করে আর আসতে পারেননি। ইন্টার মিডিয়েট শেষ করার পরেও অনেকবার বলেছিলেন তার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য হাসান যায়নি। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর আস্তে আস্তে বাবার সঙ্গে কথা বলা একদম বন্ধ করে দেয় হাসান। গত তিন বছরে বাবার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি আর। ওর প্রত্যেক মাসের খরচ পাঠিয়ে দেন হাফিজ আহমদ। আগে রেজোয়ান আহমেদের কাছে দিতেন, গত কয়েক বছর ধরে ছেলের অ্যাকাউন্টেই পাঠিয়ে দেন মাসের শুরুতেই।
হাফিজ আহমদের কাছ থেকে টাকা নিতে চাইতেন না রেজোয়ান আহমেদ, হাফিজ আহমদ জোর করেই পাঠিয়ে দিতেন তবুও।
রেজোয়ান আহমেদ হাফিজ আহমদের ফোনে কল করেন। বেশ কয়েকবার রিং হয়ে কে’টে যায়। রিসিভ করে ওপাশ থেকে হাফিজ আহমদ সালাম দিয়ে বলেন,
“কেমন আছেন, ভাই?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুমি কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“তোমাকে একটা কথা বলার জন্য কল করেছি।”
“হ্যাঁ বলুন।”
রেজোয়ান আহমেদ ইতস্তত করে বলেন,
“হাসান বিয়ে করতে চাইছে।”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো খবর তো এটা।”
“হাসান রিতাকে বিয়ে করতে চাইছে। এখন তোমার মতামত কী?”
হাফিজ আহমদ কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থাকার পর বলেন,
“হাসান যদি রিতাকে বিয়ে করতে চায় তবে আমার কোনো আপত্তি নেই। ওর জীবন তাই সিদ্ধান্তও ওর। ও যাকে নিয়ে সংসার করতে চায় করবে, যদি রিতাকে বিয়ে করতে চায় তবে করিয়ে দিন।”
“তুমি মত দিচ্ছ এই বিয়েতে?”
“হ্যাঁ।”
“ছেলের বিয়েতে তুমি আসবে না?”
“সময় হবে না। হাসান কোথায়?”
“রুমে চলে গেছে। তুমি একটাবার আসো, সামনে থেকে দেখলে আর রেগে থাকতে পারবে না। তুমি আসো না বলেই হয়তো আরও বেশি রেগে আছে।”
হাফিজ আহমদ চুপ করে রইলেন। যা বোঝার বুঝে যান রেজোয়ান আহমেদ।
হাসান তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসেছে। রেজোয়ান আহমেদ হাসানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“হাসান, হাফিজের সঙ্গে একটাবার কথা বল।”
হাসান কিছুটা রাগী গলায় বলে,
“কোনো হাফিজকে চিনি না আমি।”
“এখনো এত রেগে থাকবি? তোকে তো যেতেই বলেছে কতবার, তুইই তো যাসনি।”
“কোথায় যাব? কার কাছে যাব? আমার জন্য তার কাছে সময় আছে? সে তো দ্বিতীয় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত, আমার জন্য তার কাছে সময় কোথায়? সময় বের করে আমাকে বাংলাদেশে রেখে যেতে পেরেছে তাহলে সময় বের করে নিয়ে যেতে পারলো না কেন? আমি একা এসেছিলাম? তাহলে একা কেন যাব? বারো বছর হয়ে গেছে বাংলাদেশে আছি, বারো বছরে কি তার একটুও সময় হয়নি আমাকে দেখতে আসার? এসব আগলা দরদ দেখাতে নিষেধ করো, বিরক্ত লাগে।”
জোরে জোরে কথাগুলো বলেই আবারো ধুপধাপ পা ফেলে বাইরের দিকে এগিয়ে যায়। ওর গলার স্বর ভারী হয়ে উঠেছিল।
হাফিজ আহমদ ছেলের সব কথাই শুনেছেন। ফোনের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মাথা নিচু করে বসে আছেন।
চলবে………..
নেক্সট পার্ট থেকে শ্রবণ আর সোহাকে নিয়েই বেশি বেশি লেখা হবে।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
দিশেহারা পর্ব ১৩
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৭
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩৭