দিশেহারা (৪৪)
সানা_শেখ
সোহা মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। অনিমা চৌধুরী চোখ বন্ধ করে আছেন। ঘুমিয়ে আছেন নাকি জেগে আছেন বোঝা যাচ্ছে না।
সোহা মৃদু স্বরে ডাকে,
“আম্মু।”
তনিমা চৌধুরী চোখ মেলে তাকান। মেয়েকে দেখে পলকহীন তাকিয়ে রইলেন। সোহা মায়ের ডান হাতটা ধরে বলে,
“কেমন আছো, আম্মু?”
“ভালো, তুই কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“কার সঙ্গে আসলি? শ্রবণ আসতে দিল?”
“ও নিজেই নিয়ে এসেছে নিজে থেকেই।”
“শ্রবণ আমাকে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল।”
অনিমা চৌধুরী ভেবেছেন এই কথা শুনে সোহা অবাক হবে কিন্তু ওর মধ্যে তেমন কিছু দেখা গেলো না। ওকে স্বাভাবিক দেখে অনিমা চৌধুরীই বরং অবাক হয়েছেন। সোহা স্বাভাবিক গলায় বলে,
“জানি, বলেছে গতকালই।”
“তুই কিছু বলিসনি ওকে? যদি আমি ম’রে যেতাম?”
“কি বলব? ওকে কিছু বলার মতো সাহস আছে আমার?”
“ওর সঙ্গে সারাজীবন কীভাবে থাকবি?”
“থাকতে হবে, আমরা ছাড়া কে আছে ওর? পরিবর্তন হচ্ছে, আস্তে আস্তে হয়তো একদিন পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যাবে।”
“যদি না হয়?”
“তবুও ওর সঙ্গেই থাকব।”
“ওর সঙ্গে থাকতে থাকতে তুইও পাগল হয়ে গেলি নাকি?”
সোহা চুপ করে থাকে। ও শ্রবণকে একা ছাড়তে চায় না। মাঝেমধ্যে শ্রবণের উপর অনেক রাগ হয় ওরো। কখনো কখনো তো ইচ্ছে করে শ্রবণের মাথায় একটা বারি দিয়ে অজ্ঞান করে দিতে। কিন্তু যখনই শ্রবণের অতীত স্মরণ হয় তখন সব ভুলে যায়, সব রাগ গায়েব হয়ে যায়। শ্রবণ তো কত কিছু সহ্য করে বড়ো হয়েছে, সেই হিসেবে তো ও কোনো কষ্টই পাচ্ছে না। শ্রবণ এখন আর আগের মতো অত খারাপ আচরণ করে না ওর সঙ্গে, ওর বিশ্বাস শ্রবণ একদিন পুরোপুরি পরিবর্তন হবে। ধৈর্য ধরে থাকবে ও, শ্রবণের হাত ছাড়বে না। দুনিয়ার সবাই শ্রবণের সঙ্গ ছেড়ে দিলেও সোহা ছাড়বে না।
নার্সের কথা শুনে সোহা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ভালো থেকো, আসছি আমি। দোয়া করি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠো।”
“যাস না, সোহা।”
“নার্স আর থাকতে দেবে না এখন। আসছি।”
সোহা দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। অনিমা চৌধুরী পেছন থেকে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের যাওয়ার পথে। এই মেয়ে নিজের ভালো কেন বুঝতে চায় না? রাগের মাথায় ওনাকে মা’র’তে নিয়েছিল, একটুর জন্য জানে বেঁচে গেছেন। আগামীকাল তো রাগের মাথায় ওকেও মে’রে ফেলতে পারে।
সোহা বাইরে বেরিয়ে আসতেই শ্রবণ ওর এক হাত মুঠো করে ধরে। মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“জ্ঞান দেয়নি?”
“কী… কীসের জ্ঞান দেবে?”
“আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।”
দুদিকে মাথা নাড়ায় সোহা। শ্রবণ সোহার হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে বলে,
“তোর ডাইনি মা এমন কিছু বলেনি এটা তুই আমাকে বিশ্বাস করতে বলছিস?”
সোহা মিনমিন করে বলে,
“সত্যিই বলেনি।”
“আর একবার মিথ্যে বলবি তো কানশা বরাবর লাগিয়ে দেবো একটা তারপর ওই কান দিয়ে বাকি জীবনে ডাইনির কোনো কথা শুনতে পাবি না আর।”
সোহা চুপ করে থাকে। ও মিথ্যে বললে শ্রবণ কীভাবে যেন বুঝতে পেরে যায়। কখনো কখনো কিছু না বললেও ওর মনের কথা বুঝতে পেরে যায়।
তিনজনের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শ্রবণ তিনজনের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“এই বড়ো ডাইনি সাবধান আর ডাইনি বুড়ি তুই শুধু চৌধুরী বাড়িতে যাস।”
শাহীন রেজা চৌধুরী দ্রুত পায়ে দুজনের দিকে এগিয়ে বলেন,
“তোমরা চলে যাবে এখনই?”
“আপনার কী মনে হচ্ছে? এখানে থাকার জন্য এসেছি আমরা?”
“সোহার সঙ্গে একটু কথা বলতে দেবে?”
“কু বুদ্ধি দেওয়ার জন্য?”
“না না, বাড়ি থেকে আসার পর তো আর ওর সঙ্গে কথা বলতে পারিনি আমি। তুমি রেগে যাবে ভেবে ডিস্টার্ব করি না তোমাদের। আজ যখন এসেছো তখন একটু কথা বলতাম।”
“নিচে চলুন।”
শ্রবণ আবার হাঁটা শুরু করে সোহাকে নিয়ে। ওদের দুজনের পেছন পেছন শাহীন রেজা চৌধুরীও হাঁটেন। এতগুলোদিন ধরে সোহার সঙ্গে কথা বলতে না পারলেও বাবার কাছ থেকে রোজ সোহার খোঁজ খবর নেন, শ্রবণের খোঁজ খবরও নেন। শ্রবণ যেহেতু নিষেধ করে দিয়েছে তাই সামাদ চৌধুরী সোহার নাম্বার কাউকে দেননি বা কেউ সোহার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও বলিয়ে দেন না।
নিচে নেমে এসে এক পাশে দাঁড়ায় তিনজন। শ্রবণ সোহার হাত ছেড়ে দিয়ে বলে,
“পাঁচ মিনিট সময়।”
সোহা মাথা নেড়ে শ্রবণের পাশ থেকে বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। শাহীন রেজা চৌধুরী দ্রুত মেয়েকে বুকে টেনে নেন। কত আদরের মেয়ে ওনার, কোনোদিন ফুলের টোকা লাগতে দেননি, কাছ ছাড়া করেননি সেই মেয়েকে কতদিন পর সামনে থেকে দেখলেন, ছুঁলেন।
এই দুনিয়া বরাবর শুধু ভালো মানুষদেরই কষ্ট দেয়। ভালো থাকে সব বেঈমান স্বার্থপর মানুষগুলো।
সোহা কাঁদতে কাঁদতে ‘আব্বু আব্বু’ বলে ডাকছে শুধু, আর কোনো কথা বলতে পারছে না।
শাহীন রেজা চৌধুরীও কোনো কথা বলতে পারছেন না। ওনার গলা ভারী হয়ে গেছে, চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর, গড়িয়েও পড়েছে কয়েক ফোঁটা।
পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেছে, শাহীন রেজা চৌধুরী মেয়ের সঙ্গে একটা কথাও বলতে পারেননি। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুধু অন্তর ঠান্ডা করছেন। আবার কবে মেয়েকে দেখতে পাবেন ছুঁতে পাবেন জানা নেই।
শ্রবণ কর্কশ গলায় বলে,
“সোহা, এদিকে আয়।”
সোহা বাবাকে ছেড়ে দেয়। মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আসছি, আব্বু। ভালো থেকো, আম্মুর খেয়াল রেখো। আমাদের জন্য দোয়া কোরো।”
শাহীন রেজা চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত রেখে জড়ানো গলায় বলেন,
“দোয়া করি, ভালো থাক তোরা। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুন্দর সুখের সংসার হোক তোর, কোনো দুঃখ কষ্ট তোদের স্পর্শ না করুক। যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস, আমার দোয়া সবসময় তোদের সঙ্গে আছে।”
শ্রবণ সোহার হাত ধরে বলে,
“চল।”
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বাবার মুখের দিকে তাকায় আবার।
“ভালো থেকো, আব্বু।”
“তোরাও ভালো থাকিস সারাজীবন।”
শ্রবণ সোহাকে নিয়ে নিজের গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। দরজা খুলে সোহাকে বসিয়ে দিয়ে নিজে বসে ড্রাইভিং সিটে। সোহার কান্না বেড়ে গেছে আগের চেয়েও। জানালা দিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। শাহীন রেজা চৌধুরীও তাকিয়ে আছেন গাড়ির দিকে।
“সোহা।”
সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। দ্রুত চোখ মুখ মুছে নেয় কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে গাল ভিজে গেছে।
“কান্না বন্ধ কর, কী বলেছিলাম তোকে?”
সোহা কান্না বন্ধ করতে চেয়েও পারে না। ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে হুহু করে কাঁদতে থাকে। কিছুতেই কান্না বন্ধ হচ্ছে না। এত কষ্ট হচ্ছে বুকের ভেতর যা দমিয়ে রাখতে পারছে না সোহা। শ্রবণ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। ঘুরে এসে সোহার পাশের দরজা খুলে দেয়। ঝুঁকে মাথা ঢুকিয়ে দেয় ভেতরে।
“এই তাকা আমার দিকে।”
সোহা মুখ তুলে তাকায়।
“কাঁদতে নিষেধ করেছি না? কাঁদছিস কেন? কান্না বন্ধ কর।”
“আব্বুর কাছে যাব।”
“মা’র’বো এক চড়।”
“একটু।”
“একটুও না। ওরা সবাই বিষাক্ত।”
“আব্বু তো আম্মু বা বড়ো আব্বুর মতো না।”
“কে কার মতো আর কার মতো না আমি খুব ভালো করেই জানি। খিদে পেয়েছে আমার, বেশি কথা বলতে পারবো না।”
সিট বেল্ট লাগিয়ে দেয় শ্রবণ নিজেই। টিস্যু পেপার দিয়ে চোখমুখ মুছিয়ে দেয়। গালে হাত রেখে চাপা রাগী স্বরে বলে,
“আর একবারও যেন কান্নার আওয়াজ আমার কানে না পৌঁছায়। কাদের জন্য কাঁদছিস তুই? ওই স্বার্থপর মানুষদের জন্য? যারা নিজেদের ছাড়া কাউকে চিনে না তাদের জন্য?”
৩.৫k রিয়েক্ট পূরণ করবেন তাহলে নেক্সট পার্ট দ্রুত পাবেন।
চলবে…………….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৭
-
দিশেহারা পর্ব ২৭
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ২৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ৪