দিশেহারা (৩৭)
সানা_শেখ
সোহা পেছন ফিরে তাকায় দু’জনের দিকে। জোর পূর্বক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলে,
“থাক, যাব না।”
ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয় সোহা। শ্রবণ দাদার আড়ালে মুচকি হাসে। মুখে বলেছে বলেই কি যেতে দিতো নাকি? ও তো শুধু এটাই দেখছিল সোহা ওই বাড়িতে যাওয়ার মতো দুঃসাহস দেখায় কি-না।
সোহা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখে।
শ্রবণ মুখে তো বললো যেতে তবে ওর চোখ দুটো স্পষ্ট করে নিষেধ করছিল না যাওয়ার জন্য। শ্রবণের সঙ্গ ছাড়া ওর এই ফ্ল্যাটের বাইরেও পা রাখা নিষেধ।
ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে দেখে শ্যাম্পুর বোতল, ফেসওয়াশ, বডিওয়াশ সহ যত যা ছিল সব ছুঁড়ে ফেলে লণ্ডভণ্ড করে রেখেছে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো ফ্লোরের দিকে।
ছুঁড়ে ফেলার ইচ্ছে ছিল ওকে কিন্তু ওকে তো ছুঁড়ে ফেলতে পারেনি তাই এগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে রাগ কমিয়েছে বোধহয়।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে সোহা। গোসল করতে পারলে আরও ভালো লাগতো কিন্তু এখন গোসল করতেও ইচ্ছে করছে না। এখন বিশ্রাম নিক, সন্ধ্যার পর নাহয় গোসল করবে একটু ভালো লাগলে।
শ্রবণ ফোন আর ওয়ালেট ওয়াশরুমেই রেখে চলে এসেছিল। ফোন আর ওয়ালেট ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখে। শ্রবণের দিকে চোখ পড়তেই দেখে শ্রবণ ওর পেটের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহা দ্রুত ওড়না টেনে পেটের সামনে নিয়ে আসে। শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকায়। সোহা দ্রুত দৃষ্টি লুকিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এসে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে আবার। এত খারাপ লাগছে এখন, বলে বোঝানোর মতো না। শ্রবণ রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
সামাদ চৌধুরী বিছানার কাছে এগিয়ে এসে বলেন,
“সোহা দাদু ভাই, যাবে না?”
সোহা চোখ মেলে তাকায়। দুর্বল স্বরে বলে,
“না, দাদা ভাই।”
“শ্রবণকে ভয় পাচ্ছো?”
“দুই একদিনের জন্য গিয়ে কি হবে? সারাজীবনের জন্য যদি নিয়ে যেতে পারো তাহলে নিয়ে চলো।”
আর কোনো কথা বাড়ান না সামাদ চৌধুরী। উনি চান না সোহা আর শ্রবণ সারাজীবনের জন্য আলাদা হয়ে যাক। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোটো একটা ঔষুধের প্যাকেট বের করে এগিয়ে দিয়ে বলেন,
“এটা রাখো, রাতে মনে করে শ্রবণকে একটা খেতে দিও।”
“কী ওগুলো?”
শ্রবণের প্রশ্নে দরজার দিকে তাকান সামাদ চৌধুরী। শ্রবণের হাতে ঠান্ডা পানির বোতল।
সোহা-ও তাকায় শ্রবণের দিকে, চোখে চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে নেয় সোহা।
সামাদ চৌধুরী শ্রবণের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেন,
“তোমার ঘুমের ঔষুধ, তোমার নাকি ঘুমের সমস্যা হচ্ছে আবার।”
“লাগবে না, নিয়ে যাও।”
“কেন লাগবে না? রাতে শোয়ার আগে মনে করে একটা খেয়ে নিও।”
ঔষুধের প্যাকেটটা সেন্টার টেবিলের ওপর রাখেন। শ্রবণের কাছে এগিয়ে এসে বলেন,
“সোহাকে আর কোনো ভয় ভীতি দেখিও না, বকাবকি কোরো না মেয়েটাকে। কত দম্পতি আছে যাদের বাচ্চা হয় না, একটা বাচ্চার জন্য হাহাকার করে। আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের দিয়েছেন না চাইতেই, তার কদর করো। ভালো বাবা হও, ভালো স্বামী হও। দোয়া রইলো তোমাদের তিন জনের জন্য, সবসময় ভালো থাকো তোমরা।”
শ্রবণ চুপচাপ শোনে সব কথা। সামাদ চৌধুরী শ্রবণের কাঁধে হাত রেখে বলেন,
“এমন কোনো ভুল কোরো না যার জন্য আফসোস করতে হবে সারাজীবন। আসছি, ভালো থেকো তোমরা।”
সামাদ চৌধুরী দরজার দিকে এগিয়ে যান। শ্রবণ এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দাদাকে বিদায় দিয়ে দরজা লক করে রুমে ফিরে আসে।
সোহা উল্টো ফিরে কাত হয়ে শুয়ে আছে।
শ্রবণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
হাতে থাকা পানির বোতলটা রেখে বিছানায় উঠে বসে হেডবোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকিয়ে থাকে পলকহীন।
কিছু একটা ভেবে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায় শ্রবণ। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে ফোন আর ওয়ালেট ট্রাউজারের পকেটে ভরে নেয়। গাড়ির চাবি নিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার আগে বিছানার দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই জংলির বাচ্চা, বিছানা থেকে নেমে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি ফিরে এসে যেন না দেখি তুই এভাবে শুয়ে আছিস।”
কথাগুলো বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যায় শ্রবণ। সোহা গাল মুছতে মুছতে শোয়া থেকে উঠে বসে। মাথা এখনও ঠিক হয়নি।
ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে নেমে কাভার্ড থেকে ড্রেস বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
বিশ পঁচিশ মিনিট পরেই রুমে ফিরে আসে শ্রবণ।
সোহা মাত্রই গোসল সেরে বেরিয়ে এসেছে। চুলে এখনো টাওয়েল পেঁচানো। চোখমুখ মলিন আর দুর্বল দেখাচ্ছে। শ্রবণের দিকে একবার তাকিয়ে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে আবার শোয়ার জন্য। ওর মতিগতি বুঝতে পেরে শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“খিদে পেয়েছে আমার, খাব।”
সোহা ঘুরে তাকায়। চুল থেকে টাওয়েল খুলে টুলের উপর রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ধীর পায়ে হেঁটে।
শ্রবণ হাতের প্যাকেটটা সেন্টার টেবিলের উপর রাখে। পকেট থেকে ফোন বের করে চার্জে লাগায়। ওয়ালেট আর গাড়ির চাবি ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে।
সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“সকালে খাসনি?”
সোহা মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। মৃদু স্বরে বলে,
“দেরি হয়ে যাচ্ছিল দেখে আর খাইনি। ভেবেছিলাম ফিরে এসে খাব।”
শ্রবণ চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকে। সোহা মিনমিন করে বলে,
“আর এমন হবে না।”
শ্রবণ চেয়ার টেনে বসে। সোহা বিরিয়ানির প্লেট শ্রবণের সামনে দেয়। ছোটো একটা বাটিতে মাংসের তরকারি ঢেলে সামনে রাখে। গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে নিজেও বসে খাওয়ার জন্য। গতরাতে ভালোভাবে খায়নি, সকালে শুধু দুইটা ডিম খেয়েই চলে গিয়েছিল ভার্সিটিতে, তারপর থেকে তো এখন পর্যন্ত না খাওয়াই রয়েছে।
শ্রবণ এখন বাইরে থেকে খাবার কিনে নিয়ে এসেছে যদিও দুপুরে মাজেদা আন্টি রান্না করে রেখে গেছেন।
শ্রবণ বাইরে যাওয়ার আগে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে দেখে গেছে কি কি রান্না করা হয়েছে তখনই সোহার জন্য রাখা নাস্তার প্লেট দেখেছে। ডিম দুইটা বাদে বাকি সব প্লেটেই রয়েছে। প্লেট দেখেই বুঝতে পেরেছিল সোহা সকালে নাস্তা করেনি, আর এই জন্যই আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। গতরাতে ভালোভাবে খায়নি সেটাও নজরে পড়েছিল রাতেই।
খেতে খেতে শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকায়, সোহা-ও তখনই মুখ তুলে তাকায়। শ্রবণকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গেই মুখ নামিয়ে নেয়।
শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই খাওয়া চালিয়ে যায়। মন মেজাজ খারাপ হয়ে থাকায় বেশ কিছুদিন ধরে সোহার দিকে সেভাবে তাকানো হয় না। তাকালে হয়তো সোহার চেহারার পরিবর্তন চোখে পড়তো আগেই।
মাংসের বাটিটা সোহার সামনে এগিয়ে দেয় নীরবে। সোহা শ্রবণের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বাটি থেকে দুই পিস মাংস তুলে নেয় নিজের প্লেটে। বিরিয়ানিতে মাংস আছেই, আর কত মাংস খাবে?
ধীরে ধীরে নিজের খাওয়া শেষ করে সোহা। ভীষণ খিদে পেয়েছিল। শ্রবণ নিজেও খাওয়া শেষ করে চেয়ারেই বসে আছে।
দুপুরে রান্না করা খাবারগুলো ফ্রিজে তুলে রেখে দেয়। টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে দেখে শ্রবণ ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিন খাওয়া শেষ করে সোহাকে একা ফেলে রুমে চলে যায়, সোহা ডাকলেও দাঁড়ায় না।
ডাইনিং টেবিলে গুছিয়ে রাখতে নিলে শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“এসব করতে হবে না, সকালে আন্টি এসে করে দেবে।”
সোহা না গুছিয়েই রেখে দেয়। শ্রবণ পকেট থেকে এক হাত বের করে ইশারায় কাছে ডাকে সোহাকে। ভয়ে ভয়ে কাছে এগিয়ে আসে সোহা। কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়ায় শ্রবণের সামনে। শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে সোহার দু’চোখ বেয়ে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
শ্রবণ পলকহীন তাকিয়ে থাকে সোহার মুখের দিকে। ওরো ভালো লাগছে না, মস্তিষ্কের ভেতর যন্ত্রণা হচ্ছে, বুকের ভেতর কেমন করছে।
শ্রবণ এক কদম আগায় সোহার দিকে। ডান হাত সোহার পেটের দিকে বাড়াতেই সোহা খপ করে শ্রবণের হাতটা চেপে ধরে দুই হাতে। কেঁদে ফেলে অনুরোধ করে বলে,
“প্লীজ আঘাত কোরো না পেটে।”
শ্রবণ গম্ভীর থমথমে গলায় বলে,
“কিছু করবো না, হাত ছাড়।”
“সত্যিই করবে না তো?”
“না, করবো না।”
সোহা শ্রবণের হাত ছেড়ে দেয়। শ্রবণ সোহার তলপেটের ওপর হাত রাখে আলতোভাবে। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শিহরণ খেলে যায়। বুকের ভেতর ভিন্ন অনুভূতি জাগে। সোহার মুখের দিকে তাকায়, সোহা-ও নিজের পেটের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। জড়ানো গলায় থেমে থেমে বলে,
“তুমি বাবুর কোনো ক্ষতি করবে না তো?”
“না।”
“সত্যি?”
“হুম।”
সোহা খুশি হয়েই কেঁদে ওঠে এবার। শ্রবণ ওকে টেনে এনে নিজের বুকে জায়গা দেয়। সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে আরও জোরে কেঁদে ওঠে ওকে জড়িয়ে ধরে। শ্রবণ সোহার ভেজা চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে আদর করে। সোহা নিজেকে শান্ত করতে পারে না, কাঁদতে কাঁদতে শরীর ছেড়ে দেয়। শ্রবণ ওকে এক হাতে আগলে ধরে রাখে।
সোহা বুকে মুখ গুঁজে রেখেই কাঁদতে কাঁদতে থেমে থেমে বলে,
“তুমি বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। আমি তোমার কথা মতোই চলেছি, সবগুলো পিল নিয়ম করেই খেয়েছিলাম।”
শ্রবণ চুপ করে থাকে।
সোহা মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ রসকষহীন গলায় বলে,
“এখন থেকে সময় মতো ঠিকঠাকভাবে খাওয়া-দাওয়া করবি। আবার অসুস্থ হলে তুলে নিয়ে বাইরে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসবো।”
“আচ্ছা।”
“দাদা ভাই যেতে বললো গেলি না কেন?”
“তু তুমি তো যেতে বলোনি।”
“তিনবার বলেছি।”
“আমাকে একবার বলেছ।”
“বলেছি তো।”
“ভালোভাবে তো বলোনি।”
“কীভাবে বলেছি?”
“যেভাবে তাকিয়ে বলেছো যদি যেতে নিতাম তাহলে রুম থেকে বের হওয়ার আগেই তো ঠ্যাং ভেঙে দিতে।”
“বোকা সোহার মাথায় তাহলে বুদ্ধি গজিয়েছে দেখা যাচ্ছে। আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে একটু উন্নতি হয়েছে তোর। যাই হোক তুই যদি আজ যেতি তাহলে তোর ঠ্যাং নয় ঘাড় ধরে ঘাড়টাই ভেঙে দিতাম।”
সোহা চুপ করে থাকে। তিন মাস পেরিয়ে গেছে শ্রবণের সঙ্গে রয়েছে। এই তিন মাসেই এই বদ ছেলেকে হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে ওর। মুখে এক কথা, চোখে আরেক কথা আর পেটের মধ্যে তো জিলাপীর প্যাচ।
“ঔষুধ এনেছি।”
সোহা শ্রবণকে ছেড়ে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। শ্রবণ ওর পেছন পেছন রুমে প্রবেশ করে।
সোহা প্যাকেট খুলে ঔষুধ বের করে। শ্রবণ বলে দেয় কোনটা কখন আর কতবার খেতে হবে।
সোহা নিজের ঔষুধ খেয়ে শ্রবণের ঘুমের ঔষধ খুলে ওর দিকে বাড়িয়ে দেয় পানি সহ।
বিনা বাক্যে ঔষুধটা খায় শ্রবণ। সোহা আরেকটু পানি পান করে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে। এখন একটু আরাম লাগছে আবার ঘুমও পাচ্ছে।
শ্রবণ লাইট অফ করার জন্য হাত বাড়ায় তখনই ওর ফোন শব্দ করে কেঁপে ওঠে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে হাসান কল করেছে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কল কে’টে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর আবার শব্দ করে কেঁপে ওঠে ফোনটা।
চার্জ থেকে খুলে ফোন হাতে ব্যালকনির দিকে আগায়। রিসিভ করে কানে ধরে কোনো কথা বলে না। হাসান ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো করে চলেছে।
“হ্যালো, শ্রবণ, শুনতে পাচ্ছিস? হ্যালো, হ্যালো, এই কথা বলছিস না কেন? শ্রবণ।”
শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“বল।”
“কী হয়েছিল? কথা বলছিলি না কেন?”
“বল কি বলবি।”
“কেমন আছিস?”
“মরিনি।”
“খেয়েছিস?”
“হ্যাঁ।”
“রেগে আছিস আমার উপর?”
“না।”
“দেখ ভাই, আমি যা করেছি তোর ভালোর জন্যই করেছি, রাগ করিস না।”
শ্রবণ চুপ করে থাকে। হাসান আবার বলে,
“সোহা মানে ভাবী এখন কেমন আছে?”
“ভালো।”
“খেয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“ঔষুধগুলো নিয়ে দিস।”
“দিয়েছি।”
“নিজের বউ-বাচ্চার প্রতি খেয়াল রাখিস, ভাই। ভাবীর কিছু হয়ে গেলে তার মতো কাউকে খুঁজে পাবি না এই জীবনে। ভাবীর মতো করে তোকে কেউ বুঝবে না, এমন তোকে কেউ মেনে নেবে না।”
“কী বলতে চাইছিস তুই? আমি কেমন?”
“রাগী, জেদি, মেজাজী। রাগ উঠলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিস না, যা-তা বলে ফেলিস আর করে ফেলিস। ভাবীর জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে থাকলে জীবনেও তোর এসব সহ্য করতো না।”
শ্রবণ চুপ করে থাকে। সোহাকে যে ও বিয়ে করেছে এটাই তো বেশি। ও কি অন্য কোনো মেয়েকে কোনোদিন বিয়ে করতো নাকি? হাসান আবার বলে,
“নিজের ভালো বুঝতে শিখ, ভাই। বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি করিস না। ও তোরই সন্তান, তোর র’ক্ত, তোর অংশ। নিজের ক্ষতি আর কত করবি? এখন তো নিজের ভালো কর।”
“তোর কোনো কাজ নেই এখন?”
“কেন?”
“না থাকলে গিয়ে ঘুমা আর আমাকেও ঘুমাতে দে।”
“এখনই ঘুমাবি? আটটাই তো বাজেনি।”
“বেজে যাবে, রাখলাম ভালো থাকিস।”
“এই শ্রবণ, শোন শোন…
শ্রবণ কল কে’টে দিয়েছে। ব্যালকনি থেকে রুমে এসে ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে ফোনটা আবার চার্জে লাগায়। লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে সোহার পাশে।
“এদিকে ফের।”
সোহা ফিরে শোয়। শ্রবণ সোহার বাহুর ওপর মাথা রেখে ঘাড়ে গুঁজে জড়িয়ে ধরে। ঘুমের ঔষুধ নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে, ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছে। সোহা আলতো হাতে শ্রবণের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করে।
দশ মিনিটও পার হয় না, দু’জনেই ঘুমিয়ে গেছে।
দু’জনকে দেখে কে বলতে পারবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দু’জনের উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে গেছে? দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছে সবচেয়ে সুখী কাপল ওরাই দু’জন। সোহার হাত এখনো শ্রবণের চুলের ভাঁজে রয়েছে। শ্রবণ শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে আছে সোহাকে। হাত নরম করলেই যেন সোহা ওর কাছ থেকে দূরে চলে যাবে।
দু’জনের ধীরে ধীরে ফেলা শ্বাস আর এসির মৃদু শব্দ ব্যতীত কোনো শব্দ নেই। নির্জনতায় চেয়ে গেছে পুরো ফ্ল্যাট।
শ্রবণ আর সোহা দু’জনেই ঘুম থেকে ওঠে দশটার পর। আজকে প্রথম দু’জন এক সঙ্গে এত লম্বা ঘুম ঘুমিয়েছে। শ্রবণ ঘুমিয়েছে ঔষুধের প্রভাবে আর গতদিনগুলোতে ঘুম না হওয়ার কারণে। সোহা ঘুমিয়েছে ক্লান্ত দুর্বল শরীর হওয়ার কারণে।
শ্রবণ ঝিম ধরে বসে আছে, সোহা বিছানা ছেড়ে নেমে রুমের লাইট অন করে রেখে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। শরীর এখন অনেক ভালো লাগছে, ঘুমটাও অনেক ভালো হয়েছে আজ। এক ঘুমে রাত পার হয়ে গেছে। এক টানা এত লম্বা ঘুম বুদ্ধি হওয়ার পর কোনোদিন ঘুমায়নি সোহা।
সোহা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। শ্রবণ বিছানা ছেড়ে নেমে হেলে দুলে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। এত ঘুম ঘুমিয়েও মাথা ভার ভার হয়ে আছে।
শ্রবণ ওয়াশরুমে প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পর ওর ফোন বুমবুম শব্দ তুলে কেঁপে ওঠে। সোহা এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ফোনের কাছে। সামাদ চৌধুরী কল করেছেন। ওয়াশরুমের দরজার কাছে এগিয়ে এসে বলে,
“শুনছো? দাদা ভাই কল করছে।”
শ্রবণ দাঁত ব্রাশ করছিল। থুথু ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে দরকার দিকে তাকিয়ে বলে,
“রিসিভ কর।”
সোহা ফোনের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে কে’টে যায়। ফোন থেকে চার্জারের ক্যাবল খুলতেই ফোন আবার বেজে ওঠে। রিসিভ করে কানে ধরে বলে,
“হ্যালো, দাদা ভাই?”
“সোহা?”
“হ্যাঁ।”
“কেমন আছো?”
“ভালো।”
“খেয়েছো সকালে?”
“খাব, একটু আগেই ঘুম থেকে উঠলাম। তুমি নাস্তা করেছ?”
“হ্যাঁ। শ্রবণ কোথায়?”
“ওয়াশরুমে।”
“শ্রবণ ওয়াশরুম থেকে বের হলে কল ব্যাক করতে বোলো।”
“আচ্ছা।”
“আচ্ছা রাখছি তাহলে।”
কল কে’টে দেন সামাদ চৌধুরী।
সোহা ফোন রেখে বিছানা গুছিয়ে নেয়। জানালার পর্দা সরিয়ে ব্যালকনির দরজা খুলে দেয়। বাইরের আলোয় আলোকিত হয় পুরো রুম। ব্যালকনিতে এসে দরজা লাগিয়ে দেয় আবার। বাইরে প্রখর রোদ, ঝিরঝির বাতাস বইছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা উড়ে যেতে দেখতে পায়। নীল আকাশে সাদা মেঘ দারুন দেখাচ্ছে।
শ্রবণের ডাক শুনে পেছন ফিরে তাকায়। ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে আসে।
“দাদা ভাই কী বলল?”
“তোমাকে কল ব্যাক করতে বলেছে।”
ট্রাউজার পরা শেষ করে ফোনের কাছে এগিয়ে আসে। ফোন হাতে নিয়ে দাদার ফোনে কল করে।
“দাদা ভাই, বলো।”
“একটা কথা বলতাম রাগ করবে না তো?”
“কী কথা?”
“অনিমা সোহার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে, রাত থেকে অনেক রিকুয়েস্ট করছে সোহার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্য।”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকায়। সোহা বিছানায় বসে আছে চুপচাপ মাথা নিচু করে।
“ডাইনিটা কোথায়?”
“ড্রয়িং রুমেই আছে।”
“দাও, পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারবে।”
“আচ্ছা দাঁড়াও দিচ্ছি।”
শ্রবণ সোহার সামনে এসে দাঁড়ায়। ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে,
“নে ধর, তোর ডাইনি মা কথা বলবে তোর সঙ্গে। দেখ কি কি কু বুদ্ধি দেয়।”
সোহা ফোনটা হাতে নেয়। মায়ের প্রতি রাগ, অভিমান অনেকটা কমে এসেছে এখন। গতকাল নিজে মা হবে জানার পর থেকে মায়ের কথা একটু বেশিই মনে পড়ছিল।
ফোন কানে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
“হ্যালো।”
“একটু অপেক্ষা করো, দিচ্ছি।”
সামাদ চৌধুরী ড্রয়িং রুমে এসে অনিমা চৌধুরীর দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলেন,
“অনিমা, ধরো কথা বলো সোহার সঙ্গে।”
ফোন হাতে নেন অনিমা চৌধুরী। কল কে’টে ভিডিও কল করেন। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মায়ের চেহারা দেখে সোহার টুইটুম্বুর চোখ জোড়া থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। দ্রুত চোখের পানি মুছে কাঁপা গলায় বলে,
“আম্মু, কেমন আছো?”
“ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?”
“ভালো।”
নাস্তা করেছিস?”
“করব। তুমি করেছ?”
“হ্যাঁ। তোর ফোন কোথায়? কল যায় না কেন?”
“আমার ফোন ব্যাগে রয়েছে আর ব্যাগ গাড়িতে। আগের সিম কার্ড ফেলে দিয়েছে।”
“শ্রবণ কোথায়?”
“রুম থেকে বেরিয়ে গেল।”
কথা বলতে বলতে দূরে চলে এসেছেন অনিমা চৌধুরী। আশেপাশে কেউ নেই এখন। গলার স্বর কিছুটা রুক্ষ করে বলেন,
“কী শুনছি? তুই নাকি প্রেগন্যান্ট?”
“হ্যাঁ।”
“কত দিন?”
“সাত সপ্তাহ চলে।”
“তুই কী পাগল? নিজের ভালো বুঝতে পারিস না?”
“কেন, কী হয়েছে?”
“শ্রবণের সন্তান কেন নিজের গর্ভে ধারণ করেছিস? নিশ্চই শ্রবণ জোর করে বাচ্চা নিতে বাধ্য করেছে তাইনা?”
“আম্মু, এসব কী বলছ?”
“কী বলছি বুঝতে পারছিস না?”
“এমন কিছু না, ও তো বাবু—
সোহাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলেন,
“এই বাচ্চা রাখার প্রয়োজন নেই, বাচ্চা নষ্ট করে ফেল। ওই পাগলের সংসার করতে হবে না তোর, পাগলের র’ক্ত থেকে পাগলেরই জন্ম হবে। ওখান থেকে চলে আয়, কোনো ভয় পাবি না, আমরা আছি তো। শ্রবণের চেয়ে হাজারগুণ ভালো ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। চলে আয় ওখান থেকে। পাগল ছাগলদের সঙ্গে ভালো থাকবি না তুই। ওর সঙ্গে সুখ শান্তি পাবি না কোনোদিন।”
সোহা উত্তেজিত হয়ে বলে,
“আম্মু, পাগল হয়েছ? কী বলছো এসব?”
অনিমা চৌধুরী কিছু বলার আগেই শ্রবণ বজ্র কন্ঠে বলে,
“এই কু/ত্তা/র বাচ্চা এক নাম্বারের ডাইনি, তোর কত বড়ো সাহস তুই আমার বাড়িতে বসে আমার বউকে কু বুদ্ধি দিচ্ছিস আমার সন্তানকে মে’রে ফেলার জন্য?
শু/য়/রের বাচ্চা, তুই দাঁড়া আমি আসছি তোর চামড়া ছিলে তোকে গরম তেলে ভাজার জন্য। তুই দশ মিনিট অপেক্ষা কর শুধু।”
অনিমা চৌধুরী কল কে’টে দেন। সোহা ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। রাগে শ্রবণের চেহারা লাল হয়ে গেছে।
সোহা তো বুঝতেই পারেনি শ্রবণ কখন এসে দাঁড়িয়েছে রুমে। ভয়ে একটা কথাও বলতে পারছে না। ওর মা যে এমন কিছু বলবে কল্পনাও করেনি। কত খুশি হয়েছিল এতগুলোদিন পর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারবে ভেবে। সব খুশি কোথায় মিলিয়ে গেল?
শ্রবণ রাগে ফেটে পড়ে বলে,
“ওই ডাইনি তোর সঙ্গে কথা বলতে চায় শুনেই বুঝতে পেরেছি কোনো মতলবে কথা বলতে চাইছে। গতরাতে দাদা ভাই নিশ্চই বাড়িতে এগিয়ে বলেছে তুই প্রেগন্যান্ট আর এটা শুনেই তোর ডাইনি মায়ের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তো তোকে কু বুদ্ধি দেওয়ার জন্য কথা বলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আমার সন্তানকে মা’রতে বলে? আজকে ওই ডাইনির একদিন কি আমার একদিন।”
চলবে……….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৪
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
দিশেহারা পর্ব ৩২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৯