দিশেহারা (২৭)
সানা_শেখ
খাওয়া শেষ করে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায় শ্রবণ। সোহা ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে রেখে এটো থালাবাসন নিয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করে। থালাবাসন ধুয়ে রেখে শ্রবণের জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে রুমে ফিরে আসে। শ্রবণ আবার তৈরি হচ্ছে বের হওয়ার জন্য। কফির মগ এগিয়ে ধরে বলে,
“তোমার কফি।”
শ্রবণ সোহার হাতের দিকে তাকিয়ে মুখের দিকে তাকায়। পুনরায় আয়নার দিকে তাকিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলে,
“রাখ টেবিলের ওপর।”
সোহা সেন্টার টেবিলের কাছে এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর কফির মগ রেখে বিছানায় বসে।
খাওয়ার পর এখন ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেই ঘুমিয়ে যাবে।
শ্রবণ পুরোপুরি তৈরি হয়ে এসে কফির মগ হাতে তুলে নেয়। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে ফোন পকেটে ভরে নেয়। সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে সোহা হাই তুলছে বসে বসে। ঘুমের কারণে চোখ দুটো ছোটো ছোটো হয়ে এসেছে।
শ্রবণকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাথা নত করে নেয় সোহা।
কফি খাওয়া শেষ করে মগটা টেবিলের ওপর রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শ্রবণ বেরিয়ে যেতেই সোহা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। এখন ঘুমাবে শান্তি মতো। শ্রবণের ভয়ে এতক্ষণ বসে ছিল।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে বিকেল চারটা বেজে গেছে।
হাসান শপিং মলে যাবে, বন্ধুদের জানাতেই সবাই যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। শ্রবণের ইচ্ছে না থাকলেও হাসানের জন্য রাজী হয়েছে।
ছয় বন্ধু বাইক নিয়ে সোজা শপিং মলে চলে আসে। বাইক পার্কিং করে রেখে ভেতরের দিকে পা বাড়ায় সবাই।
সাকিব হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কি কি কিনবি?”
“নূপুর।”
“নূপুর? কার জন্য?”
“কার জন্য আবার? ওই বাচালের জন্য। ক’দিন ধরে মাথা খাচ্ছে নূপুরের জন্য। মামাকে ছবি দিয়েছিল একটা নিতে, মামা নিয়েছে আরেকটা। সেটা ওর পছন্দ হয়নি। কদিন ধরে আমার সঙ্গে ঘ্যান ঘ্যান করছে নিয়ে দেওয়ার জন্য। গতকাল বলেছিলাম নিয়ে দেবো কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। আজকে না নিয়ে গেলে কানের পোকা তো মারবেই সঙ্গে টাকও বানিয়ে দিতে পারে। আপদটাকে বিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করতে পারলেই শান্তি।”
রাব্বি বলে,
“বিদায় করার কী দরকার? নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেই তো পারিস।”
রাব্বির কথা শুনে বাকি পাঁচজন রাব্বির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসান নাক মুখ কুঁচকে বলে,
“ওই বাচালকে কেন আমি নিজের ঘাড়ে চাপাতে যাব?”
“সুন্দর আর কিউট আছে কিন্তু।”
“তাহলে নিজের ঘাড়ে নিয়ে নে।”
“ভাই, আমার গার্লফ্রেন্ড আছে। না থাকলে নিশ্চই নিয়ে নিতাম।”
“গার্লফ্রেন্ড আছে, বউ তো নেই।”
সাকিবের কথা শুনে রাব্বি বলে,
“তোর তো গার্লফ্রেন্ড বা বউ কোনোটাই নেই, তুই নিয়ে নে।”
হাসান বলে,
“কোনো প্লে বয়ের হাতে বাচালকে দিচ্ছি না।”
শ্রবণ আর সাকিব বাদে বাকি তিনজন হেসে ওঠে হাসানের কথা শুনে।
সবাই এসে দাঁড়ায় একটা কসমেটিক্স শপে। হাসান পকেট থেকে ফোন বের করে নূপুরের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে সেম ডিজাইনের আছে কি-না।
ছেলেটি নূপুরের সামনে দাঁড়িয়ে হাসানের দেওয়া ছবিটার মতো সেম ডিজাইনের নূপুর খুঁজতে শুরু করে। শ্রবণ শপের ভেতরের সবকিছুর দিকে নজর বুলাচ্ছিল। মেয়েদের সাজসজ্জার সামগ্রী দিয়ে সাজানো পুরো শপ। লাইটের আলোয় ঝিকিমিকি করছে স্টোনের অর্নামেন্টসগুলো।
শ্রবণের নজর আটকায় কিছু চুড়ির দিকে। বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে চুড়িগুলোর দিকে।
শপের সেলস বয় হাসানের দেওয়া নূপুরের ছবির মতো সেম ডিজাইনের নূপুর খুঁজে বের করে নিয়ে আসে।
হাসান নূপুর জোড়া দেখে নিয়ে প্যাকেট করে দিতে বলে পেমেন্ট করে দেয়।
নূপুর জোড়া হাসানের কাছে দিতেই শ্রবণ চুড়ির দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“ওই চুড়িগুলো নিয়ে আসুন তো।”
শ্রবণের কথা শুনে সবাই ওর দিকে তাকায়। ছেলেটা শ্রবণের দেখানো চুড়িগুলো নিয়ে আসে।
শ্রবণ আরও কিছুক্ষণ চুড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে দুটো চুড়ি হাতে তুলে নেয়। ছেলেটাকে দেখিয়ে বলে,
“এগুলোর দাম কত?”
“চারশো।”
শ্রবণ চুড়ি দুটো পকেটে ভরে নেয়। ছেলেটা বলে,
“স্যার, প্যাকেট করে দেই।”
“প্রয়োজন নেই।”
পেমেন্ট করে দিয়ে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোর হয়েছে? নাকী আরও কিছু নিবি?”
“হয়েছে, চল।”
হাসান হাঁটতে হাঁটতে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায় একবার। শ্রবণের মুখে মাস্ক রয়েছে, চোখ দুটো গম্ভীর দেখাচ্ছে।
বাইরে এসে বাইকে উঠে বসে শ্রবণ বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোরা যা, আমি এখন আর কোথাও যাব না।”
“সন্ধ্যার পর?”
“না।”
শ্রবণ বেডরুমে এসে দেখে সোহা রুমে নেই। ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে দেখে দরজা খোলা।
পকেট থেকে চুড়ি জোড়া বের করে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখে। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে সোহার নাম ধরে ডাকে গলা ছেড়ে।
রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে সোহা। শ্রবণ ফ্ল্যাটে ফিরেছে বুঝতেই পারেনি।
“হ্যাঁ বলো।”
“কোথায় ছিলি?”
“রান্নাঘরে।”
শ্রবণ কিছু না বলে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
সোহার নজর পড়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা চুড়ির ওপর। এগিয়ে এসে চুড়ি দুটো হাতে তুলে নেয়। অনেক সুন্দর চুড়ি দুটো। কার এই চুড়ি জোড়া? ওর জন্য এনেছে নাকী অন্য কারো?
শ্রবণের রাগের মুখে পড়ার ভয়ে চুড়ি দুটো আগের জায়গায় রেখে সরে দাঁড়ায়।
শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা চুড়ি দুটোর দিকে তাকায়। সোহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“চুড়ি দুটো এখনও ওখানে কেন?”
“কী করব?”
“চুড়ি দিয়ে মানুষ কী করে?”
“চুড়ি আমার জন্য এনেছ?”
“নাহ। আমার আরও পনেরো-বিশটা বউ আছে, তাদের জন্য এনেছি।”
সোহা এগিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে চুড়ি দুটো হাতে তুলে নেয়। শ্রবণের দিকে একবার তাকিয়ে দুটো দুই হাতে পড়ে। চুড়ি হাতে আরও সুন্দর লাগছে হাত দুটো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের হাত দুটো দেখতে থাকে সোহা।
শ্রবণ সোহার হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে। যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে বেশিই সুন্দর লাগছে সোহার হাত দুটো। সোহা ঘুরে তাকাতেই শ্রবণ দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
সোহা হাত দুটোর দিকে আবার তাকিয়ে হেসে ওঠে। মনটা ভীষণ খুশি খুশি হয়ে গেছে। শ্রবণ যে কোনোদিন নিজ থেকে ওর জন্য কিছু নিয়ে আসবে এটা কল্পনায়ও ভাবেনি।
“সোহা…”
শ্রবণের ডাক শুনে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে আসে। শ্রবণ সোফায় বসে আছে। সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কফি নিয়ে আয়।”
“নিয়ে আসছি।”
কিছুদূর এগিয়ে আবার পেছন ফিরে বলে,
“শরবত খাবে?”
শ্রবণ বলে না কিছু।
“বানিয়েছিলাম যদি খাও তাহলে নিয়ে আসি।”
“নিয়ে আয়।”
সোহা রান্নাঘরে এসে জগ থেকে গ্লাসে শরবত ঢেলে শ্রবণের জন্য নিয়ে আসে।
শ্রবণ এক চুমুকে পুরো গ্লাস খালি করে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লেবুর শরবত খেয়ে ভেতর পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে।
সোহা খালি গ্লাস নিয়ে পুনরায় রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতে নিলে শ্রবণ বলে,
“কফি লাগবে না এখন।”
“আচ্ছা।”
সোহা রান্নাঘরে এসে নিজেও গ্লাসে শরবত ঢেলে খায়। শরবত বানিয়েছিল খাওয়ার আগেই শ্রবণ ডাক দিয়েছিল।
আটটার পর ডিনার করতে আসে দু’জন। সোহা আগে শ্রবণের জন্য খাবার বেড়ে দেয়। শ্রবণের দৃষ্টি সোহার হাতের দিকে স্থির। জুয়েলারী পরলে মেয়েদের এত সুন্দর লাগে? নাক ফুল খুলে ফেলেছিল বলে কেমন দেখাচ্ছিল। আজকে চুড়ি জোড়া হাতে দেওয়ায় হাত দুটোও সুন্দর লাগছে।
মুখ তুলে সোহার মুখের দিকে তাকায়। দৃষ্টি বিনিময় হয় দু’জনের। সোহা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। শ্রবণের চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না ও।
“খেতে বোস।”
সোহা চেয়ার টেনে বসে, চুপচাপ খাওয়া শুরু করে।
খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকবার শ্রবণকে জিজ্ঞেস করে ওর কিছু লাগবে কি-না।
রাত এগারোটা। সোহা ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়ে। শ্রবণ ফোনে কথা বলছে। কথা বলতে বলতেই রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়।
সোহার দিকে ফিরে শুয়ে ওকে কাছে টেনে আনতে আনতে বলে,
“বাইরে আসবো না এখন। আগামীকাল ভার্সিটিতে দেখা হবে।”
“এখন বউ আছে, বউ রেখে কী এখন আমাদের গলা ধরে বসে থাকবে নাকী এই রাতের বেলা?”
সোহা স্পষ্ট শুনতে পায় কথাগুলো। কে বললো এগুলো, তা সোহার অজানা। শ্রবণ একটা গালি দিয়ে কল কে টে দিয়েছে। ফোন রেখে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে সোহাকে। আগে ধরতো বালিশ জড়িয়ে আর এখন ধরে সোহাকে। সোহাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোনোর পর থেকে শ্রবণের সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটে না। এখন আর আগের মতো ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে ওঠে না।
ভার্সিটি থেকে ফিরে সোহাকে ফ্ল্যাটে রেখে ফ্রেশ হয়ে আবার বেরিয়ে আসে শ্রবণ।
ছয় বন্ধু বাইক নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছে।
প্রত্যেকের বাইকের স্প্রিড একশোর উপর। শো শো শব্দে ছুটে চলেছে পিচঢালা পথ ধরে।
রাস্তা ফাঁকা পেয়ে শ্রবণ বাইকের স্প্রিড আরও বাড়িয়ে দেয়। পেছন থেকে হাসান চিৎকার করে বলছে স্প্রিড কমানোর জন্য কিন্তু ওর চিৎকার হয়তো শ্রবণের কানে পৌঁছায়নি।
সামনের রাস্তা ব্লক করে দুটো লড়ি ছুটে চলেছে প্রতিযোগিতা করে। শ্রবণ বাইকের স্প্রিড কমায় কিন্তু—
পেছন থেকে ছুটে আসা আরেকটা বাইক ওর বাইকে ধাক্কা মা’রে। ব্যালেন্স রাখতে না পেরে বাইক থেকে ছিটকে পড়ে শ্রবণ। পিচঢালা রাস্তায় ছিটকে পড়ে সোজা লড়ির নিচে ঢুকে যায়।
হাসান পেছন থেকে অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার দৃশ্য টুকু দেখেছে। শ্রবণ শুধু ওর বন্ধু নয়, ওর ভাইয়ের মতোই। তাড়াহুড়ো করে বাইক কোনো রকমে থামিয়ে শ্রবণের নাম ধরে চিৎকার করে ডেকে দৌড়ে এগিয়ে আসে।
চলবে………….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৩৩
-
দিশেহারা পর্ব ১৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ২২
-
দিশেহারা পর্ব ১২