দিওতোমারমালাখানি – ৯ (শেষ পর্ব)
রাত বেশি হলে রুচি ছাদে গেল। সারাদেশে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। বেশ শীত পড়েছে। ঘন কুয়াশা ভারী হয়ে নেমে এসেছে ছাদের উপর। কুয়াশার চাদর পরা শহরটাকে খুব শান্ত দেখাচ্ছে। মিনিট খানেক বাদে আদনান এসে চুপচাপ পাশে দাঁড়াল। রুচি তাকাল না ওর দিকে। ওর দৃষ্টি সামনের দশ তলা ভবন কাটিয়ে আকাশের দিকে।
আদনান বলল,
–আপনার শীত করছে না?
আদনানের আপাদমস্তক হুডিতে ঢাকা। হাতদুটো পকেটে। অন্যদিকে রুচির গায়ে শুধু একটা শাল৷ রুচি ফিরল আদনানের দিকে। বলল,
–শীত লাগলে কী করবে? জ্যাকেট খুলে আমাকে পরিয়ে দেবে? সিনেমার নায়কদের মতো?
আদনান ঠোঁট উল্টাল,
–আপনি মজা করছেন আমাকে নিয়ে?
–মনে হয় করছি!
আদনানও উল্টোদিকে তাকিয়ে থাকল। মেঝেতে পা ঠুকতে শুরু করল। নার্ভাসনেস কমল তাতে কিছুটা। বলল,
–আপনি জানতে চাইবেন না, আমি ফোন করতে চেয়ে করিনি কেন?
–হুম। কেন করোনি বলো তো?
–আমি চেয়েছিলাম, আপনি কৌতুহলী হন। কেন ফোন দিচ্ছি না সেটা ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠবেন৷ আমার ফোনের জন্য, আমার প্রতি যেন আপনার আগ্রহ জাগবে…
–জেগেছে?
–উত্তর তো আপনি দেবেন!
–তোমার কী মনে হচ্ছে?
–ধাঁধা দিচ্ছেন?
–মনে করো তাই। বুদ্ধিমত্তা যাচাই করছি!
আদনান এক বিঘত সাইজের হাসি দিলো,
–তার মানে এখন পরীক্ষা চলছে আমার?
–পরীক্ষা? কীসের?
রুচি বিস্মিত হলো।
–আমি ভেবেছিলাম, এলিজিবলই হব না। এপ্লিকেশন সাবমিট করার সাথে সাথে রিজেক্টেড! এখন তো দেখছি, আমার বুদ্ধি যাচাই হচ্ছে। চান্স আছে কিছুটা। পাশ করে যাব? কী মনে হয়?
রুচি কথার পিঠে কথা বলল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। কুয়াশা আরো ঘন হচ্ছে। শিশিরে মাথা ভিজে যাচ্ছে। আদনানের কাঁপুনি ধরে গেছে। নীরবতা ভেঙে বলল,
–জোকস এপার্ট, টেনশনে আমার জ্বর চলে এসেছিল। ধুম জ্বর মাথায় নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছি আমি। এখনো জ্বর আছে। আসলে আমি জানি, আপনি আমাকে না করে দেবেন। মুখে বড়াই করলেও ওই না শুনবার সাহস করতে পারিনি, তাই ফোন করিনি। এখানে এসে অপেক্ষা করছি। আপনি আসবেন, জানতাম।
বলতে বলতে ওর চোখ গড়িয়ে জলের ফোঁটা নেমে এলো। রুচিকে দেখতে না দিয়ে নিভৃতেই অশ্রুজলটুকু মুছে নিলো। বলল,
–আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট হয়েছে। আগে কখনো আপনাকে পাবার আশা করিনি। অন্য একজনের সাথে আপনাকে দেখে আমার ঈর্ষা জাগত কিন্তু কষ্ট পেতাম না। যখন থেকে আপনাকে চাইতে শুরু করেছি, পাব বলে আশায় বুক বেঁধেছি, তখন থেকেই প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছি! আপনি যে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন সেটা জানি আমি। তবুও ভয় পাচ্ছি!
–কষ্ট হচ্ছে?
–হুম!
–কিন্তু তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আমরা কমিটেড না, ইভেন আমি কখনো তোমাকে পজিটিভ রেসপন্স দিইনি। আমাকে দেখো, তৌহিদের সাথে আমার সম্পর্ক গুণতে গেলে দুই হাতের আঙুলে কম পড়ে যাবে! কতগুলো বছর! সবাই জাজ করছে আমাকে। কেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছি? কেন কাঁদছি? কেউ কেউ স্ট্রং হতে বলছে। কিন্তু একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাটা কতখানি অসহ্যকর সেটা আমি টের পাচ্ছি। সবাই বলে, আমি নাকি তৌহিদের চাইতে বেটার ডিজার্ভ করি। কিন্তু বেটার তো আমি চাইনি। আই ওয়ান্টেড হিম অনলি!
–এখনো চান?
–না সম্ভবত। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তৌহিদের প্রতি কোনো অনুভূতি আসছে না। ভালোবাসতাম যাকে সেই মানুষ তৌহিদের প্রতি আমার কোনো ফিলিংস নেই। কিন্তু ওই সম্পর্কটা, ওটাকে ঘিরে এত মায়া! মেয়েরা সম্পর্কের ওই মায়াটুকু কোনোদিন ছেড়ে আসতে পারে না।
রুচি কাঁদল খানিকক্ষণ। হুট করে বলল,
–আই ওয়াজ রিয়েলি ওয়েটিং ফর ইয়োর কল!
–হুম?
আদনান সচকিত হলো।
–হ্যাঁ। এত বছরের একটা সম্পর্কে থেকেও তোমার আমাকে এপ্রোচ করাটা, আই ডোন্ট নো, আমার মনে হচ্ছিল, আই ওয়াজ ফলিং ফর ইউ।
রুচি থামল একটু। বুকভরে শ্বাস নিয়ে বলল,
–সেইম ইনসিডেন্ট তৌহিদের সাথেও ঘটেছে। অন্য একজনকে ভালো লেগে গিয়েছিল ওর। আসলে কি জানো, মানবিক এই অনুভূতিগুলো তো আমাদের হাতে নেই। কখন প্রেমে পড়ব, কখন প্রেম আসবে না, কাকে ভালোবাসব, কার প্রতি অনুভূতি তৈরি হওয়া উচিত না, এগুলো কোনোকিছুই টার্মস এন্ড কন্ডিশন মেনে চলে না। এদের ফাংশন কম্পিউটারে প্রগ্রাম করা নেই। তাহলে, তৌহিদ আর আমার মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য আছে। বেশ বড়ো পার্থক্য। কিন্তু সেটা অনেকসময় আমরা অনুধাবন করতে পারি না। বুঝতে পারি না। ও এই অনুভূতিকে বাড়তে দিয়েছে, নারচারিং করেছে, যত্ন করেছে। একই সময়ে আমাকে ইনফেরিওর ফিল করিয়েছে। আর আমি সেসবের কিছুই করিনি। তোমার প্রতি আমার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, সেটা রিয়েলাইজ করবার পরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কেন আমি তোমাকে পছন্দ করছি? আমার মন আমাকে অনেকগুলো উত্তর দিলো। প্রথমত, যখন তুমি আমাকে প্রপোজ করেছ, তখন আমি অনেক ভলনারেবল সিচুয়েশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমার ব্রেকআপ হচ্ছে, আমি অনেক দু:খ পাচ্ছি। অনেকের ধারণামতে, সুইসাইড করে ফেলার মতো কষ্ট পাচ্ছি। তুমি হলে সেই অথৈ সমুদ্রে ভেসে আসা খড়কুটো। আমার অবচেতন তোমাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। তোমার প্রতি দুর্বল হওয়ার আরেকটা কারণ, কোথাও না কোথাও আমার মন রিভেঞ্জ নিতে চাইছে। তৌহিদকে দেখিয়ে দিতে চাইছে, ও যে রুচিকে অবহেলা করেছে সেই রুচি রূপে-গুণে সেরা। সর্বেসর্বা। এটাও হিউমেন ইন্সটিংকট। নিজেকে সেরা হিসেবে একনলেজমেন্ট পাওয়ার চেষ্টা করেই মানুষ। আমিও ব্যাতিক্রম নই। আমার চাইতে কমবয়সী ছেলেদের কাছেও আমি এট্রাক্টিভ এটা প্রমাণ করতে মন আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। সাব-কনশাস মাইন্ড আমার ব্রেইন নিয়ে খেলছিল। দেন, ওই খেলাটা আমি থামিয়ে দিলাল। প্রস এন্ড কন্স নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলাম। হোয়াই ইউ এন্ড হোয়াই নট?
আদনানের দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। রুচির ব্যাখা-বিশ্লেষণের আখ্যান ওকে বিচলিত করছে। ও বলতে চাইল,
–যাস্ট লাভ মি, নাথিং এলস…
–লিসেন, লিসেন! কেন তোমার প্রতি অনুভূতিটাকে কন্টিনিউ করব সেটার অনেকগুলো কারণ আছে। ইউ আর গুডলুকিং, রেসপন্সিবল, ওয়ার্ম হার্টেড, কেয়ারিং, উইটি। কিন্তু মেজর প্রব্লেমটা যেটা সেটা তুমিও জানো। আমাদের বয়সের ডিফারেন্স। এটা এখনো সামাজিক ট্যাবু। অনেক অনেক সফল উদাহরণ আছে, এরকম অনেক কাপল হ্যাপি লাইফ লিড করছে, হাদীসের উদাহরণ দিয়ে জায়েজ করে নেওয়া যায় – কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, আই উইল নট ফিট ইনটু দিস! একটা সম্পর্ক আমার শেষ হলো এই বয়স নিয়ে কথা শুনতে, শুনতে। আবার তোমার সাথে একই জিনিস রিপিট হবে। তোমার বাবা-মা আছেন, ফ্যামিলি আছে, তাদের এক্সপেকটেশন আছে।
–রুচি, পৃথিবীর কোনো বাবা-মাই সন্তানের রিলেশনশিপ সহজে একসেপ্ট করে না। ঝামেলা তারা করেই। আমি তাদেরকে বোঝাব, আপ্রাণ চেষ্টা করব…
–যদি তারা না বোঝেন, না মানেন?
–ফাইট করব। তারা মানবে না বলে তারা বেটার একটা অপশন দিলো আমাকে আর আমি সেটা হাসি-খুশি মেনে নিলাম, এমন তো হবে না! একটু আগে আপনি বললেন, বেটার না, আপনি ওই মানুষটাকে চেয়েছিলেন। আমিও শুধু আপনাকে চাই! মাকে, বাবাকে ম্যানেজ করে ফেলব।
রুচি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তৌহিদের মুখে শুধু অজুহাত শুনেছে গত কয়েকটা মাস। মা মানছে না, মা মানবে না, মা এই বলছে, মা সেই বলছে। কখনো বলেনি, মাকে ম্যানেজ করে ফেলব! এই ছেলেটা এত প্রাণশক্তি কোথায় পাচ্ছে?
ঠান্ডা বাড়ছে। রুচির কান-নাক বরফ হয়ে গেছে। ও কথা শেষ করতে চাইল। বলল,
–আদনান, আমি না আর এনার্জি পাচ্ছি না ফাইট করবার! প্লিজ। আমি কতটা বিধ্বস্ত ছিলাম, সেটার সাক্ষী একমাত্র তুমি। তাই তুমি বুঝবে, দ্বিতীয়বার একই জার্নি আমার প্রাণে সইবে না। আমি তোমাকে খুব ভালো একটা মেমোরি হিসেবে মনে করব, যে আমার তীব্র ব্যথায় একটু উপশম দিয়েছিল!
আদনান অনুনয় করল,
–রুচি, প্লিজ! আমি কখনো আপনাকে কষ্ট পেতে দেবো না। যত পথ পাড়ি দিতে হয় আমি একা যাব, একা সব বোঝা বইব, যুদ্ধটা একা করব – আপনার গায়ে আঁচ লাগতে দেবো না!
–আমি এখন প্রস্তুতও নই। আমি এখনই প্রেম-বিয়েতে যাব না। সময় নেবো। মাকে নিয়ে কিছুদিন ধুরে বেড়াব বলে ঠিক করেছি। মাঝেসাঝে ছুটি নিয়ে একটু ঘুরে দেখব দেশটার আনাচ-কানাচ। একটু স্থির হব।
আদনান মরিয়া হলো,
–আমি অপেক্ষা করব! যতদিন লাগে ততদিন…
–সবাই অপেক্ষা করতে চাইছে কেন?
দুই হাত নাড়ল রুচি,
–না না। কোনো অপেক্ষা না। আমি কারো কাছে সংকল্প করতে চাই না, কারো কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে চাই না। আমি অবশ্যই জীবনে সেটেল হব, সংসার করব, জীবনে আগে বাড়ব – কিন্তু সেটা তোমার সাথে নয়। আমার সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে, তাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম তোমার প্রতি। এই দুর্বলতা জীবনসঙ্গী পছন্দ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে না। ওই দুর্বল আবেগকে আমি প্রশ্রয় দিইনি, ওটা একটা ক্ষণস্থায়ী স্মৃতি এখন। এখনই কাউকে আমার জীবনের সাথে জড়াব না। জীবনসঙ্গী পছন্দ করার সময় এটা নয়। এখনই বড়ো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা নেই আমার, আর এটা জরুরিও নয়!
–সত্যিই ফিরিয়ে দিলেন?
রুচি মাথা নাড়ল।
–আমিও জানতাম তোমাকে এখানেই পাব। এই কথাগুলো বলতেই এসেছিলাম। তোমার জন্য আমার আন্তরিক শুভকামনা থাকল, জীবনে অনেক সুখী হও! আর একটা উপদেশ দেবো। লাইফ হ্যাক বলতে পারো। কেউ যদি তোমাকে যত্ন করে, তার প্রতি দায়িত্বশীল থেকো।
রুচি ছাদ থেকে নামতে শুরু করলে আদনান পেছনে পেছনে এলো,
–চলে যাচ্ছেন? সত্যি সত্যি? আপনি তো কাওয়ার্ড। নিজের মনের কথা শুনলেন না। আপনার মন আমাকে এপ্রুভ করেছে। আপনি ভয় পাচ্ছেন। মানুষ কী বলবে, ফ্যামিলি কী বলবে এসব ভয় পাচ্ছেন…
রুচি থামল না। হয়তো কথাগুলো আদনান সঠিক বলছে। কিন্তু রুচির সময়টা সঠিক নয়।
দিন পেরুলো, মাস পেরুলো। বছরও ঘুরে গেল। আরেক জানুয়ারি। রুচি পার্লারে এসেছে৷ ব্রাইডাল ফেসিয়াল করিয়েছে। ত্বক পরিষ্কার ও উজ্জ্বল হবে। কিন্তু আয়নার সামনে ওকে অসন্তুষ্ট দেখাল,
–কালো দেখাচ্ছে কেন এত?
বিউটিশিয়ান বলল,
–পোরস খুলে গেছে, আপু। ব্লাড সার্কুলেশন বেড়েছে। এইজন্য ত্বক লালচে হয়ে কালো দেখাচ্ছে। দুইদিন পরেই দেখবেন স্কিন গ্লো করছে। বিয়ে কবে?
–পরশুদিন।
–মেকআপ খুব সুন্দর বসবে, আপু। একদম চিন্তা করবেন না। এর আগেও আমিই আপনার স্কিনকেয়ার করেছি। এই ফেসিয়ালটা আপনাকে স্যুট করবে।
রুচির ফোন বাজল। রিসিভ করে ও বলল,
–পার্লারে আছি।
ওই প্রান্ত থেকে বলল,
–মন খারাপ মনে হচ্ছে!
–না দেখেই বুঝে ফেললে?
–গলার স্বরে বুঝেছি। এতদিনে এইটুকু তো বুঝিই, তাই না?
–পরশু অনুষ্ঠান। এদিকে ফেসিয়াল করার পরে ভূতের মতো দেখাচ্ছে আমাকে! অনুষ্ঠানে কেমন যে লাগবে আমাকে?
–কোন ভূত? শাকচুন্নী নাকি শ্যাঁওড়া গাছের পেত্নী? আমি কখনো ভূত দেখিনি, দেখতে ইচ্ছে করছে! আসব?
–তাই? হুম?
ওই প্রান্ত থেকে হাসির শব্দ শোনা গেল,
–খুব ছেলেমানুষী হয়ে যাবে, তাই না? আচ্ছা, থাকুক। পরশু তো দেখা হচ্ছেই। তুমি তো চিরদিনের জন্যই আমার কাছে আসছ। ওইটুকু ধৈর্য ধরা যায়।
রুচিও হাসলো,
–করব ছেলেমানুষী! লোকে কী ভাববে, ছেলেমানুষী হয়ে যাবে কিনা এসব সাতপাঁচ ভেবেভেবে করা হয়নি অনেককিছু। ইদানিং সেই সবকিছু করতে ইচ্ছে করে। ছেলেমানুষীও…
–শিওর? কথা ফিরিয়ে নেবে না তো? আসছি কিন্তু।
রুচি পার্লার থেকে বের হয়েই অদূরে মাহমুদকে দেখতে পেলো। কাছাকাছি এসে বলল,
–শুধু তো ভূত না, নার্ভাসও দেখাচ্ছে। কী হয়েছে?
রুচি মাথা নাড়ল। বলল,
–চলো হাঁটি। বাসা তো কাছেই…
–এটা কি আরেকটা ছেলেমানুষী ইচ্ছাপূরণ?
–হুম!
মাহমুদ পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল,
–কী হয়েছে?
–ভাবছি। অনেককিছু ভাবছি কয়েকদিন ধরে। যত সময় এগিয়ে আসছে তত বেশি টেনশন লাগছে।
–কী এত ভাবছ? টেনশনে কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে রেখেছ!
–ভাবছি অনেক কিছুই। এই যেমন, আমি কি সত্যিই কোনোদিন তোমাকে ভালোবাসতে পারব? সুখী হতে পারব? নাকি ভান করছি সব? শুধু ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা আমাদের এই ভালো বন্ধুত্ব কি যথেষ্ট হবে? এসব চিন্তায় আমার খুব অস্থির লাগছে। যত সময় এগিয়ে আসছে, ততই ভয় করছে।
মাহমুদ হাসলো। শান্ত শব্দে বলল,
–আমি ব্যাংকার। দেনা-পাওনার হিসাব খুব ভালো বুঝি। কোন দেনা সুদসহ ফেরত আসবে, আর কীভাবে ফেরত পেতে হবে আমি খুব ভালো করে জানি। আমার সময়মতো আমি আমার পাওনা বুঝে নেবো। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
রুচি আশ্বাস পাওয়ার আশায় বলল,
–সত্যিই আদায় করে নিতে পারবে? আমি ভালোবাসা চাই, ভালোবাসতেও চাই…
–না পারলে কি বকবে? আমি কিন্তু বয়সে বড়ো হই অনেক! আমাকে বকা যাবে না! বয়স্ক মানুষকে সম্মান দিতে হবে।
রুচি মুখ বাঁকাল,
–আচ্ছা, বয়সে ছোটো বলে বকা খাওয়ার ভাগীদার শুধু আমি? এটা কেমন কথা হলো?
–সত্যি কি রেগে গেলে নাকি? এইটুকু কথাতে?
–কথা যতটুকুই হোক। রাগিয়েছ যখন, রাগ ভাঙাও?
মাহমুদকে অসহায় দেখাল। হাত কচলে বলল,
–কী করলে রাগ ভাঙবে?
রুচি হেসে ফেলল,
–অকারণ রাগ করে দেখলাম কেমন লাগে। ভালোই লাগে কিন্তু। বেশ, আইসক্রিম খাওয়াও।
–এই শীতে আইসক্রিম? এটা কি তোমার আরেকটা ছেলেমানুষী প্রজেক্ট?
–হলোই বা! আমার তো অনেক ভালো লাগছে এসব ন্যাকামো করতে!
মাহমুদেরও খুব ভালো লাগছে এই উচ্ছ্বাসভরা রুচিকে দেখতে। কিন্তু সেই কথা ও বলল না। কিছু ভালো লাগা প্রকাশ করতে নেই। বুকের মধ্যে পুষে রাখতে হয় কিছু অনুভূতিকে। কিছু কথা বলবার জন্য অপেক্ষা করতে হয় সুন্দরতম সময়ের। কিন্তু অপেক্ষা যে দুরূহ হয়ে আসছে সেই কথা কি রুচি জানে?
মাহমুদ সন্তর্পণে একটা হাত বাড়িয়ে দিলো রুচির দিকে। রুচি কি ওর হাতটা ধরবে একটু? সামনের দুটো দিনের সমুদ্র সমান অপেক্ষা পেরিয়ে যেতে তবে কিছুটা কম কষ্ট হতো…
শেষ
আফসানা আশা
(প্লট অনুযায়ী গল্পটা এখানেই শেষ। তবে পাঠকের আগ্রহে আমার মনে হচ্ছে, এই গল্পটির আরেকটা সিজন লেখা উচিত। রুচির পরবর্তী জীবনের পাওয়া আর না পাওয়ার হিসাবটা লিখে ফেলতে ইচ্ছে করছে। হয়তো আগামী সপ্তাহ, আগামী মাস বা কোনো এক বছরে পরবর্তী আখ্যান লিখে ফেলব। অথবা কোনোদিনই না! যাদের কৌতুহল বেশি থাকবে তারা সাথে থাকুন, প্রতিদিন আমাকে প্রেসার দেবেন। আমাকে না গুঁতালে আমি কাজ করি না! আর যাদের ধৈর্য আমার মতো কম তাদের জন্য দিও তোমার মালাখানির এখানেই সমাপ্তি।)
Share On:
TAGS: আফসানা আশা, দিও তোমার মালাখানি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮ (খ)
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৬
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৫
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৩
-
দিও তোমার মালাখানি গল্পের লিংক
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ২
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৭
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ১
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৪