দিওতোমারমালাখানি – ৫
রুচি রেগে গেল। আদনানের গতির সাথে তাল মিলিয়ে বাধ্য হয়ে তিনতলা পর্যন্ত উঠে গেলেও আদনানের বাসায় ঢুকল না। সাততলা বাসায় প্রায় সময় সিঁড়ি দিয়ে লোকে ওঠে-নামে। রুচি আশেপাশে তাকিয়ে ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
–কী হলো এটা? এই অডাসিটি কীভাবে হলো তোমার? কী স্পর্ধা!
রুচির মাথা গরম হয়ে গেছে। রাগে কাঁপছে। কপালে হাত দিয়ে স্থির হতে চাইলো ও।
আদনান ঠোঁট টিপে মুখ কাচুমাচু করে তাকাল। অপরাধী গলায় মিনমিন করে বলল,
–আমার হাত কেটে গেছে! রক্ত পড়ছে! একটু কেয়ার করলে কী এমন সমস্যা হবে? প্লিজ!
ওর হাতের তালু থেকে রক্ত ঝরছে তখনো। রুচি শান্ত হলো। জানতে চাইল,
–বাসায় কে কে আছে?
–লোক আছে। বাসা খালি না। আমার কোনো খারাপ ইনটেনশন নেই!
আদনানের হাতে রক্তপাত বেশিই হচ্ছে। রক্ত পড়া থামানো দরকার। রুচি শান্ত হলো। বলল,
–আমার বাসায় চলো। ফার্স্ট এইড কিট রাখা আছে। ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি।
–এখানেই আছে।
আদনান ঘরের ভেতর টেবিলের উপর একটা ছোটো বক্স দেখিয়ে দিলো। রুচি সেদিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
–দরজাটা খোলা থাকুক।
আদনানের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দিতে দিতে রুচি জানতে চাইল,
–কাটলো কীভাবে?
–আমি আসলে এই বাসায় সাবলেট থাকি। ফ্ল্যাটশেয়ার করি যাদের সাথে তাদেরকে ভাইয়া-ভাবি ডাকি। নিজের রান্না নিজেকেই করতে হয়। ভেজিটেবল কাটছিলাম। অসাবধানে কেটে গেছে।
রুচি ভুঁরুতে ভাঁজ তুলে বলল,
–আদনান, আমার মনে হচ্ছে তুমি ইচ্ছে করে হাত কেটেছ। সবজি কাটবার সময় হাতের তালুতে এভাবে কাটার চান্স অনেক কম। সাধারণত আঙুলে কাটে। তালুতে কাটে না। আমাকে বলো, এটা তুমি কেন করলে?
তৌহিদ কল দিচ্ছে। রুচি মোবাইল বের করে নামটা দেখে সেটা আবার ব্যাগে ঢোকাল।
আদনানও রুচির ইনকামিং কলের নামটা দেখল। বলল,
–কেমন জ্বলছে দেখছেন না? আপনাকে যখন নিয়ে এলাম, বেচারার মুখটা যদি দেখতেন! আমার তো হাসি চাপতে গিয়ে পেট ফেটে যাচ্ছিল।
–কী জ্বলছে? কে জ্বলছে?
–আপনার এক্স। নাকি এক্স এখনো হয়নি? আপনি এখনো লোকটাকে সুযোগ দিচ্ছেন?
–তুমি তৌহিদকে চেনো?
–আপনার সাথেই দেখেছি অনেকদিন। আমার জানালা থেকে এন্ট্রান্স গেটটা স্পষ্ট দেখা যায়। গলিটাও অনেকটা দেখতে পারি। কে আসে, কে যায় সব দেখি আমি।
–এইজন্যই ইচ্ছে করে বারবার নিচে নামছিলে? কিন্তু তাতে তোমার কী লাভ হলো?
–আপনার লাভ হলো! আপনি সেদিন যেভাবে কাঁদছিলেন, ওই লোকটার কিছুটা শাস্তি তো পাওনাই হয়ে গেছে। ও এখন আপনাকে আর আমাকে জড়িয়ে নানান কিছু ভাববে আর কষ্ট পাবে। কী হারিয়েছে টের পাবে! আমার তো মনে হয়, আরও কয়েকদিন এটা কন্টিনিউ করা উচিত আমাদের। আমরা ফেক বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড হয়ে যাই?
রুচি উঠে দাঁড়াল। শীতল চোখে তাকিয়ে থাকল আদনানের দিকে। তারপর পা বাড়াল। দরজা দিয়ে বের হতে হতে বলল,
–হাতে পানি লাগিও না। শীতের দিনে ক্ষত সারতে দেরি হবে। তালু কাটা ব্যথা অনেক বেশি যন্ত্রণা দেয়। আর একটা কথা, আমার বয়স একুশ বাইশ নয়, আদনান। প্রেমিকের হৃদয়ে ঈর্ষা তৈরি করার বয়স আমি পেরিয়ে এসেছি। সেটার প্রয়োজনও মনে করছি না। নিজেকে অতখানি হেল্পলেস এখনো মনে হচ্ছে না। আর তুমিও ছেলেমানুষ না। মঈনের বয়সী মানে সাতাশ। ম্যাচিউরিটি গ্রো করার জন্য যথেষ্ট, যদিও বয়স দিয়েই ম্যাচুরিটি আসে না। তবুও সাতাশ অনেক।
–প্রেমে পড়লে সাতাশেও মানুষ সতেরোর আচরণ করে!
–মানে?
–মানেটা আপনি বুঝে গেছেন, রুচি! আমার চোখে স্পষ্ট লেখা আছে। না বুঝবার অভিনয় করতে চাইছেন?
আদনানের চোখে গাঢ় অভিব্যক্তি। কালচে চোখের তারায় আকুতি তীব্র হয়েছে। রুচি এড়িয়ে যেতে চাইল,
–আমি কিছুই চাইছি না।
–তাহলে বলুন, অগ্রনী ব্যাংকের ওই লোকটার সাথে আর দেখা করবেন না।
আবার অধিকারবোধ! রুচি ঝট করে ঘুরল। ওর প্রশ্নবোধক চাউনির উত্তরে আদনান বলল,
–আমি শুনেছি আপনাদের কনভার্সেশন।
রুচি নিচের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। ওর চলার গতি স্লথ হলো না।
তৌহিদ বিমর্ষ মুখে বাড়ি ফিরেছে। বাসায় ঢুকে তাহমিনার মোবাইলের কথোপকথন শুনতে পেলো। কোনো একজনকে রোশনি আর তৌহিদ কতটা মানানসই জুটি সেই সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। কথায় কথায় ‘বয়স কম’, ‘ছেলেমানুষ’ এইসব শব্দগুলো তৌহিদের কানে উত্তপ্ত সিসা ঢালল। ও মায়ের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারার অক্ষমতায় দুই পায়ের জুতো খুলে দুইদিকে ছুঁড়ে ফেলে নিজের ঘরে এসে দরজা দিলো।
কিছুক্ষণ পরে রুচির নম্বর থেকে কল এলো। এখনো সুরুচি লিখে সেভ করা। ফোন ধরেই তৌহিদ চিৎকার করল,
–এতক্ষণে আমার জন্য তোমার সময় হলো? এতক্ষণে মনে পড়ল, আমাকে রাস্তার উপর দাঁড় করিয়ে রেখে হারিয়ে গিয়েছ? এতক্ষণে মনে হলো, আমি অপেক্ষায় আছি? আমার সাথে…
রুচি ওকে কথা শেষ করতে দিলো না। নিচু গলায় বলল,
–গোসল করলাম, এইজন্য সময় লাগল। বলো?
তৌহিদের গলার স্বর আরও উঁচু হলো,
–বলো মানে কী? আমি কী বলব? বলবে তো তুমি? এসব কী হচ্ছে, রুচি? তুমি কারো সাথে রেস্টুরেন্টে চলে যাচ্ছ। কারোর কাটা হাতের পরিচর্যা করতে ছুটছ। আমি কে? হু দ্য হেল এম আই? আমার এক্সিসটেন্স আছে তোমার কাছে? নাকি আমি মৃত? আমাকে অলরেডি সাইড করে দিয়েছ?
রুচি দু:খে কাঁদবে নাকি আমোদিত হয়ে হেসে ফেলবে বুঝতে পারল না। তৌহিদ মায়ের পছন্দে অন্য কাউকে বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে সেটা কষ্ট দিলেও অভিযোগ করত না ও। কিন্তু রোশনির সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে, আবার সেটা লুকিয়ে, রুচিকে অপমান করেছে তৌহিদ। প্রমাণিত হয়েছে, স্বেচ্ছায় রুচিকে বাদ দিয়েছে ও। শান্ত গলায় বলল,
–তৌহিদ, যেটা হওয়ার সেটা হয়ে যাওয়াই উচিত! টেনে টেনে তেতো করবার প্রয়োজন নেই।
–কী হয়ে যাওয়া উচিত?
–ব্রেকআপ!
–আমাদের? ব্রেকআপটা তাহলে তুমিই ইনিশিয়েট করছ? স্বীকার করছ, প্রতারণা করেছ আমার সাথে? একইসাথে অন্য কারো সাথে সম্পর্কে গিয়েছ? আমাকে আর ভালো লাগছে না?
রোশনি যে রুচির পূর্বপরিচিত সেটা বলতে ইচ্ছে করল না ওর। কখনো কখনো চড় খেয়ে চুপ থাকতে হয়। কিন্তু তৌহিদের অভিযোগের বহর দেখে রুচি হেসেই ফেলল শব্দ করে,
–সত্যি বললে, আরও অনেক আগেই আমাদের মাঝখানে যা ছিল, সব শেষ হয়ে গিয়েছে। দিনের পর দিন তুমি আমাকে ছোটো করেছ। প্রমাণ করতে চেয়েছ, আমি তোমার সাথে কমপ্যাটিবল নই। না বয়সে, না সৌন্দর্যে, না কোয়ালিফিকেশনে! কোনোদিক থেকে আমি তোমার যোগ্য নই। বারবার বলেছ। আমাকে এত নগন্য দেখিয়েছ, আমি নিজেই নিজেকে অচ্ছুৎ ভাবতে শুরু করেছিলাম!
এসব কী বলছে রুচি! একদম বানোয়াট সব! মিথ্যে নালিশ! তৌহিদ বজ্রাহত হলো,
–অসম্ভব! তুমি আমাকে চেনো। আমি সবকিছু তোমাকে শেয়ার করি। প্রতিদিনের সাধারণ, এবসার্ড কথাবার্তাও আমি তোমাকে জানাই। কে কী বলল, আমি কাকে কী বলি, সব তুমি জানো। তোমাকে নিয়ে মীন চিন্তা করা আর পক্ষে সম্ভবই না। মায়ের বক্তব্যগুলো তোমাকে জানিয়েছি শুধু! সমাধান চেয়েছি। তোমাকে আমি ভালোবাসি, রুচি। আমি কীভাবে তোমাকে অসুন্দর দেখব? আমি কীভাবে বলব তুমি আমার যোগ্য না? কেন বলব আমি? আমার চোখে তুমি এখনো সেই প্রথম দিনের রুচি!
–তোমার দৃষ্টি পালটে গেছে। হয়তো তোমার মায়ের চোখে আমাকে দেখতে শুরু করেছ। কিংবা অন্য কেউ দৃষ্টিগ্রাহী হয়েছে! যাকগে, কোনোকিছু প্রমাণ অপ্রমাণের আগ্রহ আমার নেই। আমার মনে হয়, একে অন্যকে আসামী বানিয়ে কাঠগড়ায় না তুলে আমরা এখানেই শেষ করি। তোমাকে আমি ঘৃণাতে মনে রাখতে চাই না। আর এটাও চাই না যে, তুমিও আমাকে ঘৃণা করো। যখন ভিন্ন দুটো মানুষ আমাদের জীবনসঙ্গী হবে, তখন ঘৃণা কিংবা ভালোবাসা কোনো অনুভূতিতেই আমার মনে তোমার বা তোমার মনে আর অস্তিত্ব থাকা ঠিক হবে না। তোমার জন্য শুভকামনা থাকল।
–ভিন্ন মানুষ?
আঁতকে উঠল তৌহিদ,
–না, আমি মরে যাব। তোমাকে ছাড়া কিছুতেই পারব না!
ওই প্রান্ত থেকে আর উত্তর এলো না। রুচি ফোন কেটে দিয়েছে।
তৌহিদ হতভম্ব হয়ে থাকল কিছুক্ষণ। মাথা খালি হয়ে গেছে। ভোঁতা অনুভূতি হচ্ছে। রুচি যা যা বলেছে সব মাথার ভেতর আলোচনা করল।
রুচি বলেছে, ওর জীবনে আর তৌহিদের অস্তিত্ব থাকবে না। অন্য কেউ আসবে ওর জীবনে!
রুচি ভুল বুঝেছে তৌহিদকে। বড়ো রকমের ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। তৌহিদ টেরই পায়নি কবে এতখানি দূরে সরে গেছে রুচি।
কবে রুচিকে এতখানি কষ্ট দিয়েছে ও একদম কিছু বুঝতে পারেনি! রুচি ওর কতখানি, কাকে বোঝাবে ও? রোশনি? কিছু না ও! শুধুই চোখের চটক! মনের পা হড়কানো একটুখানি। হৃদয়ে একটু মিথ্যে আন্দোলন! চকমকি পাথর কি কখনো পরশ পাথরের বিকল্প হয়?
রুচি যে সবকিছু তৌহিদের। কবে থেকে তাও তো মনে পড়ে না। জীবনস্মৃতি যতটুকু মনে আসে, সবখানেই তো রুচি! বড্ড ভুল হয়ে গেছে! কী করবে এখন তৌহিদ? মাকে এনে দেখাবে তৌহিদের ধ্বংস?
নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করল ওর। তবে কি মা বুঝতে পারবে?
রুচি যে সশব্দে সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিলো সেটাও তো এখন স্পষ্ট!
পুরুষ মানুষের সহজে কাঁদে না। যন্ত্রণা সহনাতীত হলেই কাঁদে তারা। তৌহিদও আর সহ্য করতে পারল না। আবেগে আর নিয়ন্ত্রণ থাকল না। কেঁদে ফেলল। অসহ্য বেদনায় লীন হলো ও। অঝোরে কাঁদতে থাকল। পৃথিবীর অন্য কেউ সেই কান্নার স্বাক্ষী হলো না! না রুচি জানল, না ওর মা টের পেলো!
চলবে…
আফসানা আশা
Share On:
TAGS: আফসানা আশা, দিও তোমার মালাখানি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিও তোমার মালাখানি ৯(সমাপ্ত)
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৬
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৩
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ২
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৭
-
দিও তোমার মালাখানি গল্পের লিংক
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ১
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৪
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮ (খ)