Golpo romantic golpo দিও তোমার মালাখানি

দিও তোমার মালাখানি পর্ব ২


দিও তোমার মালাখানি – ২

রুচি ছাদে ওঠার প্রায় সাথে সাথে রুলিও চলে এলো। আকাশ পরিষ্কার। অল্প অল্প কুয়াশা স্বচ্ছ মেঘের মতো করে চাঁদটাকে ঘিরে ধরেছে। পৌষের আরামদায়ক শীতলতা। রুলি একটা চাদর ছুড়ে দিলো রুচির দিকে। বলল,
–তোর শীত লাগে না? দেখলাম খালি একটা পাতলা জামা পরে বের হয়ে এলি। ভাত রেখে ছুটতে হলো আমাকে!
রুচি মৃদু হাসলো,
–ভান করিস না।
–কীসের ভান?
রুচি উত্তর দিলো না। অন্য প্রসঙ্গে কথা পাড়ল,
–শান্তা খালা তোর বিয়ের জন্য কথা তুলেছে, তুই জানিস?
রুলি মাথা নাড়ল। ও জানে।
কৌতুহলী হলো রুচি,
–তুই কী করবি?
রুলি কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল। ইতস্তত করল খানিকটা। রুচির থমথমে মুখটা দেখে খুব মায়া হচ্ছে ওর। জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। ছোটোবেলার বাচ্চা রুলি হলে সেটাই করত। বড়ো হওয়াটা একটা জ্বালাতনের বিষয়। আর বিশেষ আদর-ভালোবাসা দেখিয়ে রুচির ঘা খুঁচিয়ে দিতেও ইচ্ছে করছে না। এখন আহ্লাদ করলে রুচি বুঝে যাবে যে ওর আর তৌহিদের ব্যাপারটা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।
কিন্তু চুপ করে থাকলে রুচি হয়তো অন্য কিছু ভেবে বসবে। সব ভাবনা-চিন্তা করে রুলি মুখ খুলল,
–শান্তা খালা যখন প্রপোজাল এনেছিল, তখন ওই শালা তৌহিদ্দ্যার ব্যাপারটা তো জানতাম না। ভেবেছিলাম তোর বিয়ে তো ফিক্সডই। এখন আমার বিয়েটাই স্বাভাবিক!
রুলির মুখচোখ শক্ত হয়ে গেছে। চোখে জগদ্দল ঘৃণা ঠিকরে বের হতে চাইছে। সেদিকে তাকিয়ে রুচি হাসবার চেষ্টা করল,
–থাক। গালাগাল করিস না। হয়তো ও আসলেই বেটার ডিজার্ভ করে! কয়েক বছর টানা পরিশ্রম করেছে। কত অপমান, গালাগাল, গঞ্জনা শুনেও ফোকাসড ছিল। আমি তো দেখেছি সব!
রুলি কাঁধ নাচাল,
–করতে পারে। আমারও না সেটাই মনে হয়। সে অনেক ভালো কাউকে ডিজার্ভ করে। সেই মেয়ে সবদিক থেকে তোর চাইতে বেটার হবে। মে বি মহারানি কোনো। একচুয়ালি ওই ভুইত্তাটা কোনো মহারানিকেই ডিজার্ভ করে। হার ম্যাজেস্টি দ্য কুইন ক্যামিলা! ওইরকম বেজিমার্কা মহিলাই ও ডিজার্ভ করে। আমার আপুকে কীভাবে ও পাবে? তুই পৃথিবীর সবচেয়ে সুইট মেয়েটা!
অনেকক্ষণ ধরেই বোনকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে প্রকট হচ্ছিল। শক্ত করে চেপে ধরল ও রুচিকে।
রুচি হেসে ফেলল,
–সর! জড়াজড়ি ভালো লাগে না!
রুলি ছেড়ে দিলো না সহসা। রুচি অন্য কথা পাড়ল,
–সেসব না। আমি প্রাসঙ্গিক না এখানে। তুই এত সহজে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলি? নাহিয়ানের সাথে…
রুচিকে বক্তব্য শেষ করতে দিলো না রুলি। কথার মাঝখানেই বলল,
–আমি ওর জন্য অপেক্ষা করব না, আপু।
রুচি তৌহিদের জন্য অপেক্ষা করে ভুল করেছে, সেটা বলতে চাইল না রুলি। কিন্তু রুচি বুঝে গেল। ও মাথা নাড়ল,
–সেটা না শুধু। তোর অনার্সটা শেষ হয়নি এখনো। বয়সও তেইশ মোটে। এখনই বিয়ে করাটা আমার পছন্দ হচ্ছে না।
–আমিও এখনই বিয়ে করতে চাই না। শশুরবাড়ি গিয়ে পড়াশুনা কন্টিনিউ করাটা হলো সোনার পাথর বাটি। সবাই শুনেছে শুধু, কেউ দেখেনি কোনোদিন ওই বস্তু। তবে, শান্তা খালা যার কথা বলছে ওই ছেলেটা নাকি খুবই ভালো। আম্মু বলছে, কথাবার্তা বললেই তো বিয়ে হয়ে যায় না। লাখ কথা হতে সময় তো লাগেই। তবে, এখন পরিস্থিতি খানিকটা বদলে গেছে। তোর বিয়ের আগে তো আমি বিয়ে করব না।
রুচি, রুলির আলিঙ্গনের বাঁধন ছাড়িয়ে নিলো। অদূরে তাকিয়ে রইল। দূর দিগন্তে আকাশের দেখা পাওয়া মেলা ভার। সুউচ্চ ভবনগুলো কঠিনমুখো প্রহরীর মতো সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের মতো শক্ত কঙ্ক্রিটের গলায় বলল,
–বাসায় যা, রুলি। আমি কিছুক্ষণ একা থাকি। আর আম্মুকে বলিস ভয় না পেতে! আমি কিশোরী না। আমাকে পাহারা দিতে হবে না!
রুলি তবুও মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে থাকল। রুচির হাত ধরে বলল,
–আমি ওসব ভাবিনি, আপু।
রুলি নেমে গেলে রুচি মোবাইলের ফটো গ্যালারি খুলল। অনেক ছবি আছে তৌহিদের সাথে ওর। কিছু ছবি রুচির একার হলেও, তুলে দিয়েছে তৌহিদ। প্রতিটি ফটোর সাথেই কিছু না কিছু স্মৃতি আছে। বাছাই করতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে গ্যালারির সব ছবিই ডিলিট করে দিলো ও। ফেসবুকে ঢুকে তৌহিদকে ব্লক করতে গিয়ে মনে হলো ছেলেমানুষী হয়ে যাবে। তাই একাউন্টই ডিএক্টিভেট করে দিলো। ছাদে আসার সময় একটা শপিং ব্যাগ সাথে করে এনেছিল। ব্যাগটা থেকে তৌহিদের দেওয়া চিঠি, ছবি, অনেকগুলো কার্ড বের করল। সেই প্রথম চিঠিটা! তৌহিদের হাতের লেখা সুন্দর। বাংলাটাও খুব সুন্দর আসে ওর। এসএমএসের যুগে ও ছোটো ছোটো চিঠি লিখত রুচিকে। সম্বোধন করত ‘প্রিয় সুরুচি’ লিখে!
প্রথম চিঠিটা খুব মজার ছিল। প্রথমে তো রুচি ভেবেছিল, খুব সিরিয়াস ধরনের পড়াশোনার কথাবার্তা।
প্রিয় সুরুচি,
Sincerely Yours এর আদি অর্থ জানো?
আগে বলি শব্দদুটো কিন্তু ল্যাটিন অরিজিন। ল্যাটিনে sine cera অর্থ without wax – বাংলা করলে মোমবিহীন – অর্থ এতে মোম নেই বা খাদ নেই। মোম আর খাদ কি সমার্থক? একদমই না। এটাও ভীষণ মজার তথ্য।
আমরা মনে করি যে, আগেকার দিনের লোকেরা খুব সৎ ছিল। আদোতে সেটা সত্য নয়। তারাও কেউ কেউ ঠগ ছিল, জোচ্চোর ছিল।
ভাস্কররা পাথর ঠুকে যেসব ভাষ্কর্য বানাতেন, অনেক সময় সেসবে ত্রুটি দেখা যেত। ছোটো কোনো ফাটল বা গর্ত, কখনো অসাবধানে কোনো অংশ ভেঙে যেত। সেসব ত্রুটি ধাপাচাপা দিয়ে লুকিয়ে রাখার জন্য তারা প্রথমে মোম গলিয়ে ছিদ্রটি ভরাট করতেন, তারপর সেই মোমের উপর আবার পাথরের গুঁড়ো বা ধুলো দিয়ে চেপে দিতেন। এতে করে ওই ত্রুটি আর ধরা যেত না। নিরেট পাথরের মূর্তিই মনে হতো ওগুলোকে। কেউ বুঝতেই পারত না। এই জন্য ওই সময়ে ওই কাজকে ধোঁকাবাজি হিসেবে ধরা হতো। কোথাও কোথাও অপরাধও।
তখন এই সিন্সিয়ার শব্দবন্ধের প্রয়োগ শুরু হয়। যে ভাষ্কর্যগুলোতে মোমের কারসাজি করা হয়নি সেগুলোকে খাঁটি আর শতভাগ ত্রুটিহীন ধরা হতো। অর্থাৎ sincere!
তারপর একসময় অনুভূতির প্রকাশেও এই শব্দদুটির ব্যবহার শুরু হলো। ত্রুটিহীন, একান্ত এবং সৎ সমর্পণকে উপমা দেওয়া হলো ‘sincerely yours!’ বাংলায় তরজমা করলে এমন হয় – আমি একান্তই তোমার, শতভাগ তোমার কিংবা আমার সমর্পণে কোনো খাঁদ নেই!
তৌহিদ
sincerely yours
ওটা যে প্রপোজাল ছিল সেটা বুঝতে অনেকটা সময় লেগে গিয়েছিল রুচির। বুঝতে পেরে সে কী বুক কাঁপা-কাঁপি, গলা শুকিয়ে যাওয়া! সেই মুহূর্তটা আর নার্ভাসনেসটুকু যত্নে তুলে রেখে দিয়েছিল ও। চিঠিটাকেও। ভাঁজে ভাঁজে জীর্ণ হয়েছে কাগজটা আর বহুল ব্যবহারে তৌহিদের সেই একান্ত সিন্সিয়ারিটিও মলিন হয়েছে। ব্যাগে একটা লাইটারও এনেছে ও। লাইটারের আগুনের উপর ধরল কাগজটাকে। কয়েক সেকেন্ড সময় নিলো ওটা পুড়ে ছাই হতে। সবগুলোই পুড়ল একে একে।
যে যাওয়ার সে যায়ই। কোনো শর্তেই তাকে ধরে রাখা যায় না। ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা করতে আত্মসম্মানে লাগে। মর্যাদাবোধ ধুলায় লুটিয়ে দিয়েও তাকে ধরে রাখা যায় না। তাই, অহেতুক এই চেষ্টাটুকু করার আগ্রহ নেই রুচির। যে যাবার সে যাবেই – আগেভাগেই তাকে ছেড়ে দেওয়ার এই প্র‍য়াস রুচিকে ভেতর থেকে ভেঙেচুরে দিতে থাকল।
কান্না পেলো খুব। আগুনের শিখা সামনে নিয়ে নি:শব্দে কেঁপে কেঁপে কাঁদল ও। ব্যথার বোধ খানিকটা হালকা হলো। বুকের ক্ষরণ কমলো কিছুটা। বুকভরে নি:শ্বাস নিলো ও।
আদনান অনেকক্ষণ থেকেই খেয়াল করছিল রুচিকে। ওকে ছাদের কিনারায় দাঁড়াতে দেখে চমকে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে জোরে চেঁচাল।
–এই, এই, এই?
বিকট চিৎকার শুনে পেছনে ফিরল রুচি। আদনানকে ক্ষীপ্র বেগে ছুটে আসতে দেখল তটস্থ হয়ে বলল,
–কী হয়েছে? কী সমস্যা?
–লাফ দেবেন না, প্লিজ! সুই/সা-ড করার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই, সমস্যার সমাধানও নেই! আপনার মা আছে, ভাই-বোন আছে। তাদের কথা ভাবেন, প্লিজ!
রুচি অত্যন্ত বিরক্ত হলো,
–আজব! আমি লাফ দিতে চাইছি এটা আপনাকে কে বলল?
আদনানও ভীষণ অবাক হলো। সোজা হয়ে রুচির চোখে চোখ রাখল। সন্দিহান গলায় বলল,
–আপনি সুই-সাই’ড এটেম্পট করেননি?
–না! কীসে এমন মনে হলো আপনার?
–আপনি কাঁদলেন। ছবি, চিঠি পোড়ালেন। আরও খানিকক্ষণ কাঁদলেন। তারপর না উঠে এলেন ছাদের কিনারায়! এরপরের সিকোয়েন্স তো অবভিয়াস, এবারে আপনি ঝাঁপ দেবেন…
–আপনি এতক্ষণ ধরে আমাকে নজরে রেখেছেন? কই আমি তো দেখলাম না আপনাকে।
–আমি আপনার আগে থেকেই ছাদে ছিলাম। যদিও আপনার প্রাইভেসি নষ্ট করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমি নেমে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইনার মি বলছিল, আপনি একটা বিপদ ঘটানোর তালে আছেন।
–রুলিও সেটাই ভেবে আমাকে পাহারা দিতে এসেছিল। আপনাকে আলাদা করে দোষ দেবো না…
রুচির কণ্ঠে কৌতুহল টের পেয়ে ছেলেটা বলল,
–আমি আদনান। তিন তলায় থাকি। আপনাদের বরাবর উপরে। আপনি চেনেন না আমাকে, আমি কিন্তু আপনাকে দেখি। আপনি লালের মধ্যে কালো লিপস্টিক লাগান। হিন্দি সিরিয়ালের ইভিল ভ্যাম্পদের মতো লাগে।
রুচির খুব মজা লাগল। হেসে ফেলল ও,
–মেরুন বলে ওটাকে।
–হোয়াটেভার! কটকটে রং। চোখে লাগে। আর পরবেন না।
আদনানের বলার ভঙ্গিতে অধিকারবোধ। রুচি ঠিক সুরটা বুঝে উঠতে পারল না। ব্রেকআপ বা ডিভোর্সের পরে মেয়েদের আশেপাশে এরকম অধিকারপ্রবণ শুভাকাঙ্ক্ষীরা গুণগুণিয়ে ওঠে। রুচি পাশ কাটিয়ে চলে আসবে বলে বিদায় নিলো,
–আমার বাসায়ও মনে হয় সবাই আপনার মতো ভুল চিন্তায় পড়ে গিয়েছে। আপনি থাকেন, আমি আসি।
–আপনি না, তুমি। আমি অনেক ছোটো হব আপনার থেকে। আপনার ভাই মঈন আমার ব্যাচমেট।
–ওহ! ভালো থাকো, আদনান। তবে তুমি যেভাবে হেড়ে গলায় চিৎকার করেছিলে, অমন কোরো না আর। ভয় পেয়েও কেউ ঝাঁপ দিয়ে বসতে পারে! ঠিক আছে? শুভরাত্রি।

চলবে…
আফসানা আশা

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply