তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
২৩.
আমি বললাম, “দাদা এসব গহনা গড়িয়ে দিয়েছিল। কথা ছিল বিয়ের পরে ফেরত নিয়ে আপনার কাছে রেখে দিবেন। আপনি সে কাজ করেননি। মা বউ মানুষ, গহনা পরতে ভালোবাসে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। ছোট চাচা বিয়ে আপাতত ভেঙে গেছে। কিন্তু পরে আবার বিয়ে ঠিক হবে। নতুন বউকে কিছু না দিলে মানসম্মান থাকবে না। দাদার অবস্থা আগের মত স্বচ্ছল নেই। সোনার দামও খুব চড়া। কাজেই এখন এসব গহনা মাকে দেওয়ার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। আপনার কাছে রাখুন। আপনার বয়স হলে ফুফুর কাছে দেন। ছোট চাচার কাছেও দিতে পারেন। তবে মায়ের কাছে না।”
দাদি একটু তেঁ তেঁ উঠলেন। শক্ত মুখে বললেন, “তোর মায়ের কাছে রাখলে খুব সমস্যা হয়ে যাবে নাকি?”
“খুব সমস্যা হবে না। তবে এতে মায়ের আত্মসম্মান থাকবে না। আমি চাই না আমার মায়ের আত্মসম্মান নষ্ট হোক।”
“হ্যাঁ, সেই তো। এখন তোর অনেক জোর। পয়সা রোজগার করে গহনা গড়িয়ে দিতে পারিস। কাজেই এমন বড় কথা বলা অসম্ভব কিছু না।”
“আপনি যা মনে করবেন।”
দাদি আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকালেন। শান্ত গলায় বললেন, “বড় বউ তুমি কী এগুলো তোমার কাছে রাখবে?”
“না আম্মা। আমি এই গহনা আমার কাছে রাখতে পারব না। সাজ্জাদ ঠিক কথা বলেছে। ছোটর বিয়ে আজ ভেঙেছে কাল আবার হবে। অহেতুক এগুলো আমার কাছে রাখার কোন মানে হয় না।”
“তোমার কাছে রাখতে বলে তুলে রাখতে বলছি না। গায়ে পরলে, পরে যদি কখনো লাগে।”
“না আম্মা, গায়ে পরতে হবে না। আপনি এগুলো নিয়ে যান।”
মায়ের গলা ঠান্ডা এবং কোমল। দাদি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন না। মুখ কালো করে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। আমি মায়ের পাশে বসলাম। সহজ গলায় বললাম, “তুমি কী ওগুলো তোমার কাছে রাখতে চেয়েছিলে?”
মা কিছু বলল না৷ অল্প করে হাসার চেষ্টা করল। আমি মায়ের হাত চেপে ধরলাম।
“তোমার ওই গহনা নিতে হবে না। আমি তোমাকে আরও অনেক গহনা গড়িয়ে দেব। দাদি যা যা ফেরত নিয়েছে সব বানিয়ে দেব। লাগলে আরও বেশি দেব।”
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অসম্ভব কোমল গলায় বললেন, “আমার কোন গহনার দরকার নেই। যে মায়ের এমন একটা ছেলে থাকে, তার আলাদা করে গহনার দরকার পড়ে না।”
একটু লজ্জা পেয়ে গেলাম। মাথা নিচু করে চিকন গলায় বললাম, “তুমি যে কী বলো না মা। খেতে দাও। খিদে পেয়েছে।”
“ঠিক আছে। বাইরে থেকে এসেছিস। হাত-মুখ ধুয়ে নে। আমি ভাত বাড়ছি।”
বাথরুমে ঢুকে সবে চোখ মুখে পানি দিয়েছি। অমনি হড়হড় করে বমি করে দিলাম। মনে হচ্ছে পেটের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত বেরিয়ে আসবে। মিনিট দশেক একটানা বমি করার পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। শরীরের ভেতরে ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। কুলকুচি করব, হঠাৎই নজর পড়ল বেসিনে। র’ক্ত! টকটকে লাল, তাজা র’ক্ত। বমির সাথে র’ক্ত পড়বে কেন?
এটা নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করল না। হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় বসলাম। এখন আর খাব না। খানিকক্ষণ শুয়ে থাকতে হবে। ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে যাচ্ছে। মাকে ডেকে ভাত না খাওয়ার কথা জানিয়ে দিলাম। মা বলল, “ভাত বেড়ে এসেছি। দুই গাল খা। আমি খাইয়ে দেব?”
“না মা। খেতে ইচ্ছে করছে না। আমি একটু ঘুমাব।”
“এখন ঘুমাবি কেন? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
“না, রাত জেগে বই পড়ছিলাম। এজন্যই চোখ লেগে যাচ্ছে।”
“আচ্ছা। ঘুম পড়।”
মা শুকনো মুখে বেরিয়ে গেল। বমির সাথে র’ক্ত পড়েছে– ইচ্ছে করেই এ কথাটা এড়িয়ে গেলাম। মাকে বললে দুশ্চিন্তা করবে।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ফোনের রিংটোনে ঘুম ভাঙল। অচেনা নম্বর। কল রিসিভ করে ফোনটাকে কানের সাথে চেপে ধরলাম। মেয়েলি গলা। প্রথমে সালাম দিলো। সালামের উত্তর দিয়ে বললাম, “কে বলছেন?”
“আমি তানহা। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
“আমার সাথে কথা আছে! ঠিক আছে। বলেন, কী বলবেন।”
“অনেক কথা আছে। ফোনে বলা যাবে না।”
“তাহলে কীভাবে বলবেন? দেখা করব?”
“হ্যাঁ। আমার সাথে একটু দেখা করুন। খুব জরুরি। পারলে এখনই আসুন।”
“কী এমন কথা বলবেন যে এত তাড়াহুড়ো করছেন?”
“দেখা না হলে তো বলতে পারব না।”
“আচ্ছা বেশ। কোথায় দেখা করবেন?”
“আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে। উল্টো দিকে খোলা মাঠের মত খানিকটা জায়গা পড়ে আছে। পেছনের রাস্তা দিয়ে আসতে পারবেন।”
“ঠিক আছে আমি আসছি। আধঘন্টার মতো সময় লাগবে।”
“ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করব।”
কল কে’টে গেল। ঘুমানোর কারণে শরীরটা একটু ঝরঝরে লাগছে। তানহা কেন ডেকেছে অনুমান করতে পারলাম না। এমনকি ওকে পুরোপুরিভাবে বিশ্বাসও হলো না। বাদশাকে কল দিয়ে আমার সাথে যেতে বললাম। বাদশা বলল– সে আসছে। ওর কোন চাচার বাইক নিয়ে আসছে। সুবিধা হবে।
ভেবেছিলাম আমরা দু’জনই যাব। তিমু বাঁধ সাধলো। শেষ মুহূর্তে বলে বসল, “আমিও তোমাদের সাথে যাব।”
“ফালতু ঝামেলা করিস না তিমু। আমরা দু’জনে তানহার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। ঘুরতে যাচ্ছি না।”
“আমিও তো সে কথা বলছি। তোমরা দু’জনে তোমাদের গোপন প্রেমিকার সাথে প্রেমালাপ করতে যাচ্ছো না। তানহার সাথে দেখা করতে যাচ্ছো। হবু ছোট মামানি কী বলে সে কথা আমাকেও শুনতে হবে। উপস! হবু ছোট মামানি বলে ফেলেছি। এই বিয়ে তো আর হবে না। সো নো মামানি। অনলি তানহা। কী ঠিক বললাম তো?”
তিমুর গলার স্বর শুকনো। শুকনো মুখেও মেয়েটা খুব ভালো রসিকতা করতে পারে। তিমুর খটখটে গলা উপেক্ষা করতে পারলাম না। সাথে নিয়ে নিলাম।
বাদশা বাইক চালাচ্ছে। তারপর আমি বসেছি। তিমু একদম শেষ প্রান্তে। আমার গায়ে ওর শরীর স্পর্শ করছে না।
“তিমু, ঠিকভাবে ধরে বসবি কিন্তু। তানহার সাথে দেখা করার বদলে তোকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে পারব না।”
“চিন্তার কিছু নেই। আমি পড়ব না।”
সত্যিই সে পড়ল না। অক্ষত শরীরে বাইক থেকে নামল। বাদশা বলল, “তানহা কী এই জায়গার কথা বলেছে?”
“মনে তো হচ্ছে। এক মিনিট কল দিয়ে দেখছি।”
একবার রিং হতেই কল রিসিভ হলো। তানহা বলল, “হ্যাঁ, ওই পথ ধরে মাঠের ভেতরে দিয়ে হেঁটে বাগানের কাছে চলে আসুন। আমি দাঁড়িয়ে আছি।
তানহার পরনে লাল শাড়ি। মাথায় এক হাত ঘোমটা দেওয়া। তিমু বিস্মিত মুখে বলল, “ এভাবে সেজেছেন কেন? দেখতে এসেছে নাকি?”
তানহা বলল, “না, দেখতে আসেনি। যেন প্রথম দেখায় কেউ চিনতে না পারে তাই এভাবে সেজে এসেছি।”
“তা ভালো। সুন্দর লাগছে। নতুন বউ মনে হচ্ছে।”
আঁড়চোখে তিমুর দিকে তাকালাম। স্বাভাবিক গলায় বললাম, “আমাকে ডেকে ছিলেন কেন?”
“খুব জরুরি একটা কথা বলার ছিল।”
“কী কথা?”
“জায়েদার ব্যাপারে। কয়েকদিন ধরে ওর কোন খোঁজ নেই।”
“সে কথা আমি জানি। আপনার বাবাই ওকে কোথাও সরিয়ে ফেলেছে।”
“আমিও বুঝতে পারছি। জায়েদার বাবা মা পুলিশে জানিয়েছে। তবে পুলিশ এখনোও তাদের কিছু জানায়নি।”
“আমি একটা কথা কোনভাবেই বুঝতে পারছি না। সামান্য একজন চাকরিজীবী জামাই পাওয়ার জন্য কেউ এতকিছু করতে পারে কীভাবে?”
“আপনাকে কে বলল আব্বু শুধু আমাকে আপনার ছোট চাচার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাদের কি’ড’ন্যা’প করেছিল।”
“তাহলে কেন করেছে?”
তিমুর চোখ জ্বলজ্বল করছে। মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। তানহা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি তো জানেন জায়েদা আমার ডাইরি চু’রি করেছিল।”
“জানি।”
“জায়েদা ডাইরি রাখতে এসে আব্বুর হাত ধরা পড়ে যায়। আব্বু ওর হাত আমার ডাইরিটা নিয়ে পড়তে শুরু করে।”
“আমিও পড়েছি। বিশেষ কিছু পাইনি।”
“আপনি বুঝতে পারেননি, তাই বিশেষ কিছু পাননি। ওই ডাইরি আব্বুর সমস্ত ব্যবসা, অ’বৈ’ধ কাজ সবকিছুর হিসাব লেখা আছে। এমনকি বেশ কয়েকজন লোকের নম্বরও আছে।”
“বলতে চাইছেন– আপনার আব্বু ভেবেছে আমরা উনার ব্যাপারে সব তথ্য জেনে গিয়েছি। তাই আমাদের ওভাবে ধরে নিয়ে গেছিল?”
“আমার অনুমান তাই বলছে। শতভাগ নিশ্চিত না।”
“এখন কী বলতে ডেকেছেন?”
“আপনাদের তো অনেক বুদ্ধি। কতকিছু করেছেন। আমার একটা কাজ করে দেবেন?”
“কী কাজ?”
“আমার বয়ফ্রেন্ড, বেশ অনেকদিন হয়ে গেছে ওর কোন খোঁজ খবর নেই। কল দিলে মোবাইল বন্ধ বলে। কোনভাবেই কোন খবর জানতে পারছি না। দয়া করে ওর খোঁজ এনে দিবেন? কোথায় কেমন আছে– এতটুকু জানলেই হবে। আপনারা যা বলবেন আমি তাই করব। আমি নিজেই ওর খোঁজ করতাম। কিন্তু মা, নানি এরা আমাকে কোথাও বের হতে দেয় না।”
তানহা কথাগুলো বলতে বলতে হাতজোড় করে ফেলল। আমি তিমুর দিকে তাকালাম। তিমু বলল, “খোঁজ এনে দেব। কিন্তু আমরা তো তাকে চিনি না। আপনার কাছে তার কোন ছবি আছে?”
তানহা আঁচলের ভেতর থেকে একটা ছবি বের করে আমার হাতে দিলো। জড়ানো গলায় বলল, “আমি ওর বাড়ির ঠিকানা জানি। বলব? একটু দেখুন না। আমার ওর জন্য খুব চিন্তা হয়। আমি ঠিকমতো খেতে পারি না, ঘুমতে পারি না। নিঃশ্বাস নিতেও অনেক কষ্ট হয়।”
ছবি দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাম। এই ছেলে তানহার প্রেমিক? কীভাবে?
“কী হয়েছে? আপনি ওকে চেনেন?”
“হ্যাঁ! না মানে আপনার সাথে অন্য একটা ছেলেকে দেখেছিলাম। ছবিও দেখেছি। এই ছেলে আপনার প্রেমিক হলে সে কে?”
“ওর বন্ধু। বন্ধু না ভাই বলা যায়। আমাকে নিজের বোনের মত করে ভালোবাসে।”
এক মুহূর্তের জন্য আমার শরীর দুলে উঠল। ছবির এই ছেলেকে আমি চিনি। খুব ভালো করে চিনি। ওকে আমি দেখেছি। খুব ভালো করে দেখেছি। তবে মৃ’ত! বাদশার লা’শ ভেবে যে ছেলেকে দেখতে গিয়েছিলাম সেই ছেলের চেহারা আর এই ছবির চেহারা হুবহু এক। ছবির থেকে চোখ সরিয়ে তানহার দিকে তাকালাম। ইসস! কত আশা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ তবে সত্যিটা আমায় বলতে হবে। যে কথা জানি সে কথা লুকিয়ে কোন লাভ নেই।
“তানহা?”
তানহা চমকে আমার দিকে তাকালো। নরম স্বরে বলল, “জ্বি বলুন।”
“আমি যে কথা বলব সে কথা শুনে তুমি নিজেকে শান্ত রাখতে পারবে কি-না, সামলাতে পারবে কি-না জানি না। তবে কথাটা তোমার মানতে হবে৷ মানতেই হবে।”
সে ডান দিকে মাথা কাত করল৷ আমি বললাম, “এই ভদ্রলোকের কী কোন জমজ ভাই আছে?”
“না নেই। কিন্তু আপনি এ কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
“কারণ ছবির চেহারার একজন মানুষকে আমি দেখেছি।”
“কোথায় দেখেছেন? আমাকে নিয়ে যাবেন? আমি একটু ওর সাথে কথা বলব।”
“সম্ভব না। কারণ আমি লা’শ দেখেছি। জীবিত মানুষ না। বাদশা যখন নিখোঁজ ছিল। তখন পুলিশের কাছে একটা লা’শের সন্ধান আসে। পুলিশ ভেবেছিল বাদশার লা’শ। তাই আমাকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল। তখন দেখেছি।”
তানহা কয়েক সেকেন্ড আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই ঢলে পড়ে যাচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে ওকে ধরে ফেললাম। আর ঠিক সেই সময়ে চোখ পড়ল ছোট চাচা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দু’টো বিস্ফোরিত। যেন এই পরিস্থিতি তার ধারনার বাইরে এবং এক্ষুনি আমাকে খু’ন করে ফেলবে। ফিসফিসিয়ে বললাম, “ছোট চাচা কখন এসেছে?”
তিমু বলল, “মাত্রই এসেছে। এক মিনিট আগেও এখানে ছিল না।”
“ছোট চাচা কী ভুল বুঝল?”
“চোখ-মুখ দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।”
কী করব বুঝে উঠতে পারলাম না। তানহার জ্ঞান নেই। শরীরের ভার ছেড়ে দিচ্ছে। ওকে এইভাবে ধরে রাখতে পারছি না।
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৬
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৩
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৭
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৪