তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
২১.
রাত কত গভীর জানি না। আঁধারের ঘনত্ব দেখে অনুমান করতে পারছি না। ফিনফিনে বাতাস বইছে। বরফ শীতল বাতাস। শরীরের কাঁপুনি ধরে যায়। হঠাৎই বাদশা আমার হাত ধরল। নরম গলায় বলল, “বাড়িতে কল দিয়ে দেখ। আমার মন বলছে তানহার বাবা তিমুকে তোদের বাড়িতে নিয়ে গেছে।”
“কিন্তু আমার তা মনে হচ্ছে না।”
“অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় চিন্তাশক্তি লোপ পায়। একবার কল করতে তো কোন সমস্যা নেই। তেমন হলে আন্টিকে কল দে।”
আমি কখনো বাদশার কথা ফেলি না। আজও ফেললাম না। ফোন বের করে মা’কে কল দিলাম। মা বলল, “কোথায় তুই? ঠিক আছিস তো?”
তার কণ্ঠ খুব বিচলিত শোনালো। আমি বললাম, “একটা কাজে আটকে গেছিলাম।”
“বাড়িতে আসবি কখন?”
“এইতো আসব। আচ্ছা মা, তিমু কোথায়?”
“তিমু? তিমু ঘরে ঘুমচ্ছে। তানহাদের বাড়িতে গিয়েছিল। খানিকক্ষণ আগে তানহার বাবা এগিয়ে দিয়ে গেছে।”
“আচ্ছা। আমি আসছি।”
বাদশা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। সহজ গলায় বলল, “বাড়িতে?”
“হ্যাঁ, বাড়িতে দিয়ে এসেছে। কিন্তু।”
“কিন্তু জানতে হলে তিমুর কাছে যেতে হবে।”
“তুই কী করবি?”
“বাড়িতে যাব। মায়ের কাছে। আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না৷ মুখ ঢেকে যাব। কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। মাকে জানিয়ে রাখব। সব সামলে নেবে।”
বাদশা রিকশা খুঁজতে শুরু করল। আমি বললাম, “আচ্ছা তোর সেই হুডি কোথায়? যেটা আমরা দু’জনে গিয়ে বানিয়ে ছিলাম।”
”ওই হুডি একজনকে দিয়ে দিয়েছিলাম। শীতের মধ্যে কাজ করছিল। দেখে মায়া লাগল।”
“কাকে?”
“জানি না। আমার পরিচিত কেউ না। বাসস্ট্যান্ডে বাদাম বিক্রি করছিল।”
রিকশা পাওয়া গেছে। বাদশা ভাড়া ঠিক না করেই রিকশায় উঠে পড়ল। আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে বলল, “মায়ের কাছ থেকে নিয়ে ভাড়া মিটিয়ে দেব। তুই বাড়িতে যা। সাবধানে যাবি, কেমন?”
আমি মাথা দোলালাম। নিজেকে অনেক হালকা লাগছে৷ কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। বহুদিনের ক্লান্তির শেষে মানুষের যেমন করে ঘুমতে ইচ্ছে করে ঠিক তেমন। সময় নষ্ট করলাম না। রিকশা নিয়ে বাড়ি চলে এলাম।
বাড়ির পরিবেশ শান্ত। যেন কোথাও কোন সমস্যা হয়নি। ফুফু দরজা খুলে দিলো। বিরক্ত মুখে বলল, “এতদিন কোথায় ছিলি?”
আমি তার কথার জবাব দিলাম না। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম, “তিমু কোথায়?”
“তিমুর খোঁজ করছিস কেন?”
“কিছু জিনিস কিনতে দিয়েছিল। তাই নিয়ে এসেছি।”
“কী জিনিস এনেছিস দেখি।”
কাগজের ব্যাগটা ফুফুর হাতে দিলাম। ছবি আঁকার খাতা, পেন্সিল আর রাবার। মোড়ের দোকান থেকে কিনে এসেছি। ফুফু জিনিসগুলো দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল।
“মেয়েটার ছবি আঁকায় যে কী পেয়েছে কে জানে। সারাক্ষণ ছবি ছবি করতে থাকে। যাইহোক, এগুলো আমার কাছে থাকুক। আমি ওকে দিয়ে দেব।”
ফুফু চলে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালো। পেছনে ঘুরে বলল, “মা তোর খোঁজ করছিল।”
মাথা দুলিয়ে নিজের ঘরে চলে এলাম। রইস উদ্দিনের দেওয়া মেমোরি কার্ডটা বালিশের নিচে রেখে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। হাতমুখ ধুয়ে বের হতেই দাদি এলেন। চোখ বড় করে উৎসুক গলায় বললেন, “চকলেট এনেছিস?”
“কোন চকলেট?”
“কোন চকলেট মানে? তোকে কিনে আনতে বলেছিলাম। টাকাও দিয়েছি। ভুলে গেছিস নাকি?”
“না, ভুলিনি। চকলেট নেই।”
“চকলেট নেই মানে?”
“যে দোকান থেকে কিনেছিলাম সে দোকানে নেই। আশেপাশে খুঁজে পাইনি। দোকানদার বলছে কাল পরশু আনিয়ে দেবে।”
“ওহ! তা ভালো।”
দাদি আর কিছু না বলে চলে গেলেন। খাবার টেবিলে ছোট চাচার সাথে দেখা। সে খুব আয়েশি ভঙ্গিতে খাচ্ছে। হাতে গোনা চার দিন পর তার বিয়ে। বিয়ের আগে সবার মনে হালকা ফুর্তি ভাব কাজ করে। আগ বাড়িয়ে তাকে কিছু বললাম না। ভাত খেয়ে ঘরে চলে এলাম।
ফোনে চার্জ আছে। রইস উদ্দিনের দেওয়া প্রমাণগুলো একটু ঘাঁটিয়ে দেখলাম। বেশিরভাগই তানহার বাবার কথাবার্তা। একে হুমকি দিচ্ছে, তাকে ধমকি দিচ্ছে। একটা ভিডিওতে আমার চোখ আটকে গেল–
খুব বয়স্ক একজন লোককে চেয়ারে সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। লোকটার অবস্থা করুণ, শরীরের মাংস শুঁকিয়ে হাড় বেরিয়ে গেছে। চারটে ছেলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তানহার বাবা একটা চেয়ারে বসা। ভিডিওর কথাবার্তা স্পষ্ট।
তানহার বাবা খুব শান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। সহজ গলায় বলছে, “শেষ বয়সে জমিজমা দিয়ে কী করবেন চাচা? ম’র’লে সেই সাড়ে তিন হাত। ছেলেপুলে নেই। এতকিছু কে খাবে? দলিলটা আমায় দিয়ে দেন। ভালো টাকা দেব।”
“টাকা লাগবে না। ওই জমি আমি বেচতে পারব না।”
“কেন চাচা? পাঁচ বিঘা জমি। এত জমি দিয়ে করবেন কী? দেখেন, আপনি আমার বাপের বয়সী। আপনাকে এইভাবে বেঁধে রাখতে আমার ভালো লাগছে না। কিন্তু কিছু করার নেই। আপনাকে অনেকবার বলেছি কিন্তু আপনি আমার কোন কথা শুনতে চান না। আমার কথা শোনানোর জন্য আপনাকে এমন করে বেঁধে রাখতে হচ্ছে। সেজন্য আমি আপনার পা ধরে মাফ চাচ্ছি।”
লোকটা কোন কথা বলল না। পাশের একটা ছেলে তার ঘাড় চেপে ধরল। সে ব্যাথায় ককিয়ে উঠল। ছেলেটা বলল, “ঝামেলা করিস না। আপোষে সই কর।”
তানহার বাবা ছেলেটার উপর চিৎকার করে উঠল। কর্কশ গলায় বলল, “সিনিয়র সিটিজেনের সাথে এমন আচরণ করা যায় না। অ’স’ভ্যের কাজ আমার পছন্দ না।”
ছেলেটা একটু পেছনে সরে গেল। তানহার বাবা বলল, “আপনার জমির দাম আপনি পাবেন। আপনি বললে যে দাম তার চেয়ে লাখ দুয়েক টাকা বেশি দেব। এই যে টাকা। এই ব্যাগে। এই তোরা ব্যাগ খুলে দেখা। দেখেছেন? বুড়ো হয়ে গেলে মানুষের বিবেচনা কমে। আপনার তেজ জেদ বুঝতে পারছি। কিন্তু আমরা তো আপনার জমি ডা’কা’তি করছি না। কিনে নিতে চাইছি। জমিটা খুব পছন্দ হয়ে গেছে। এই আর কী!”
ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত দলিলের কাগজে সই করল। শক্ত মুখে বলল, “আমার টাকা বুঝিয়ে দাও। বাড়িতে যাব।”
“যাবেন চাচা। নিজের আসল বাড়িতে যাবে। এই তোরা চাচাকে চাচার আসল বাড়িতে নিয়ে যা। মাছগুলো অনেকদিন না খেয়ে আছে।”
আমি পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেলাম। একটা মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কী করে? সামান্য সম্পত্তির জন্য কেউ এমন করতে পারে? এত বয়সের একজন মানুষকে মে’রে ফেলতে একটু বুক কাঁপল না? কীভাবে?
দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরলাম।বাদশার একটা কথা মনে পড়ছে– শুধু মেয়ে বিয়ের জন্য উনি আমাদের তুলে নেয়নি। এখানে আরও বড় কোন পরিকল্পনা আছে। কী পরিকল্পনা? আমাদের বাড়ি? হ্যাঁ! তাই তো! আমাদের বাড়ি হতেই পারে। আমি না থাকলে বাবার সম্পত্তির কোন অংশীদার থাকবে না। ছোট চাচার কাছ থেকে সবকিছু লিখে নেওয়া বা হাতের খেল। আমি না থাকলে বাবাকেও হাত করা সহজ।
খানিকক্ষণ ভাবলাম। পরক্ষণেই মাথা থেকে এই চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিলাম। মনের কথা ঘুরে গেছে। জায়গাজমির জন্য সে আমাকে তুলে নেয়নি। তাহলে বাদশাকে নিতো না। এমন কিছুর জন্য নিয়েছে যেটা আমরা কেউ বুঝতে পারছি না।
রাত বেড়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকছে। সরু একটু টুকরো আলো। ভালো লাগছে দেখতে। বেলকনি থেকে ফোঁপানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিমু? তড়িঘড়ি করে বেলকনিতে চলে গেলাম।
তিমু হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছে। আমি তার সামনে বসলাম। অসম্ভব কোমল গলায় বললাম, “কী হয়েছে তোর?”
সে আমায় দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল। হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও ধরল না। নিজেকে সামলে নিলো। জড়ানো গলায় বলল, “তুমি এখানে? সত্যিই কী তুমি? সাজ্জাদ ভাই, সত্যিই তুমি এসেছ?”
“হ্যাঁ আমি এসেছি। আমার কিছু হয়নি। শেষ মুহূর্তে রইস উদ্দিন সাহায্য করেছে।”
“আল্লাহর অশেষ রহমত। ওই জা’নো’য়া’রটা বলেছিল– তোমাকে মে’রে ফেলেছে। মাগুর মাছ ভরা পুকুরে ফেলে দিয়েছে।”
“দিতে পারেনি। কিন্তু তোর কী হয়েছিল?”
“আমি তোমার জন্য দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর যখন দেখলাম তুমি আসছ না, তখন বাড়িতে বললাম নতুন মামানির বাড়িতে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম থানায় গিয়ে পুলিশের সাথে ওখানে যাব। কিন্তু তার আগেই ধ’রা পড়ে যাই।”
“এসব জানি। তানহার বাবা বলেছে। কিন্তু তোকে বাড়িতে দিয়ে গেল?”
তিমু অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠল। দু’হাতে মুখ চেপে কাঁদতে লাগল।
“কী হয়েছে তিমু? তোকে মে’রে ফেলবে এমন হুমকি দিয়েছে?”
তিমু মাথা দুলিয়ে না বলল।
“তাহলে?”
“ওই জা’নো’য়া’র আমার ভিডিও বানিয়ে রেখেছে। এলার্জির নামে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে! আমি এসবের কিছুই জানতাম না। পরে বলেছে। বলেছে– আমি যদি মুখ খুলি তাহলে সবকিছু ভাইরাল করে দেবে। আমাকে মে’রে ফেলা তার বা হাতের খেল, তবে এই মুহূর্তে কোন ঝামেলা চায় না।”
“চিন্তা করিস না তিমু। ওর সময় শেষ। কাল সকালেই থা’নায় যাব। আমার হাতে প্রমাণ আছে। কোনমতে বাঁচতে পারবে না।”
তিমু কিছু বলল না। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর দৃষ্টি অনুসরণ আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশের পশ্চিম কোণে দু’টো তারা। অসম্ভব কোমল এবং উজ্জ্বল। ভীষণ সুন্দর। মন ভালো করে দেওয়ার মতো সুন্দর। তবে তিমুর মন ভালো হলো না। সে বিষন্ন চোখে তাকিয়ে রইল।
রাতটা দারুণ উত্তেজনার মধ্যে কাটল। ঘুমতে পারলাম না। রইস উদ্দিনের দেওয়া জিনিসপত্র বারবার করে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি ভিডিও ভয়ংকর রকমের কুৎসিত। দেখলে শরীরে কাঁপুনি ধরে যায়। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। নাহ! এই লোকের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। একটুও না।
সূর্যের আলো ফুটতেই তিমুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ফুফুকে বললাম, “তিমু কিছুর কেনাকাটা আছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনবে।”
ফুফু অমত করল না। প্রথমে বাদশার কাছে গেলাম। বাদশার মামা আমায় জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ কাঁদলেন। ভেজা গলায় বললেন, “আল্লাহ তোমার ভালো করুক বাবা। তুমি না থাকলে ছেলেটাকে আর খুঁজে পাওয়া যেত না। আপা কাল রাতে কল দিয়ে বলল– বাদশা এসেছে। শুনে আর দেরি করিনি। আল্লাহ তোমার ভালো করুক বাবা।”
খুব বেশি দেরি করলাম না। বাদশাকে নিয়ে থানার যাত্রা শুরু করলাম। মামাও আমাদের সাথে এসেছেন। পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছি। দারোগা সাহেব বাদশাকে দেখে একটু অবাক হলেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন, “তুমি নিখোঁজ ছিলে না? ফিরলে কীভাবে?”
বাদশা খুব গুছিয়ে পুরো ঘটনা বলল। আমিও কিছু বললাম। রইস উদ্দিনের দেওয়া প্রমাণাদি দেখালাম। সবকিছু দেখে দারোগা সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। পুলিশের চাকরি, এসব দেখে অভ্যস্ত। তবুও যেন তিনি এই ব্যাপারটা মানতে পারলেন না। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়লেন। আমাদেরকেও সাথে নিয়ে গেলেন।
ঘড়িতে দশটা সাতাশ। তানহার বাবা খেতে বসেছে। প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, পাবদা মাছের ঝাল। সবে এক গ্রাস মুখে তুলেছে। আমাদের দেখে তড়িঘড়ি করে পানির গ্লাস হাতে তুলে নিলো। এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের সব পানি খেয়ে বলল, “আপনারা?”
দারোগা সাহেব বললেন, “এই ছেলে দু’টোকে চিনতে পারছেন তো?”
“পারছি। সাজ্জাদের ছোট চাচার সাথে আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
“উঁহু! বলেন– এই সেই সাজ্জাদ, যাকে আপনি মে’রে ফেলতে চেয়েছিলেন। মাগুরমাছ ভরা পুকুরে হাত পা বেঁ’ধে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”
“সব মিথ্যে কথা। আমি এমন কিছু করিনি।”
“অ’প’রা’ধী কখনো নিজের দোষ স্বীকার করে না। অতীতে করেনি, বর্তমানে করে না, ভবিষ্যতেও করবে না।”
“আপনাদের ভুল হচ্ছে। আমি এসব কিছু করিনি।”
“আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ আছে। সস্তা নাটক দেখিয়ে কোন লাভ নেই।”
দারোগা সাহেব সময় নষ্ট করলেন না। তানহার বাবাকে গ্রে’ফ’তা’র করে থা’নায় নিয়ে গেলেন।
বাদশা বলল, “এবার সত্যি কথা বলুন। আমাদের সাথে এমন করলেন কেন?”
তাহনার বাবা কথার জবাব দিলো না। ফোন হাতে কাউকে কল দিতে ব্যস্ত হয়ে রইল। আমি বাদশার দিকে একটু সরে দাঁড়ালাম। ফিসফিসিয়ে বললাম, “পুলিশ গ্রে’ফ’তা’র পরার পর কাউকে কল দেওয়া যায়?”
বাদশা বলল, “বোধহয় উকিলকে কল দিয়েছে। বা পরিচিত কাউকে। এ ব্যাপারে আমার জানা নেই।”
খানিক পরেই উকিলের কোর্ট পরা দু’জন লোক থানার ভেতরে ঢুকল। তারা দারোগা সাহেবের সাথে কী কথা বলল শুনতে পেলাম না। ভদ্রলোকেরা খুব নিচু গলায় কথা বলে। দারোগা সাহেব মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনলেন। ভেবেছিলাম তানহার বাবা ছাড়া পেয়ে যাবে। তবে তেমন কিছু হলো না। দারোগা সাহেব শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “প্রমাণ হাতে পেয়ে গ্রে’ফ’তা’র করেছি। অভিযোগটি কগনাইজেবল ও গুরুতর অ’প’রা’ধ হলে যেমন : খু’ন, ধ’র্ষ’ণ, অ’স্ত্রসহ হা’ম’লা ইত্যাদি। এবং পুলিশের কাছে তাৎক্ষণিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকে। ক্ষেত্রে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করতে পারে (CrPC ধারা ৫৪)। কাজেই আপনাদের সুপারিশ গ্রহণ করতে পারছি না।”
তিমু বলল, “এই দেশে অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ানোর মত উকিল আছে বলেই এদের এত সাহস। কাগজের নোটের কাছে নীতি বিক্রি করে নিজেদের সমাজের উচ্চ শ্রেণির মনে করে। অথচ বাস্তবে নর্দমার কীটের চেয়েও জঘন্য!”
উকিল দু’জন তিমু দিকে এক পলক তাকালো। দারোগা সাহেব বললেন, “আপনারা এখন আসতে পারেন। আমার কিছু কাজ আছে। সময় দিতে পারব না।”
শেষ পর্যন্ত তানহার বাবাকে ছাড়া হলো না। বাড়িতে হুলুস্থুল লেগে গেছে। দাদি খানিকক্ষণ বাদে বাদে ফিট হয়ে পড়ছেন। ছোট চাচা মুখ গম্ভীর করে বসে আছে। কথাবার্তা বলছে না। ফুফু সুর করে কাঁদছে। তিমু তার কান্নায় ভীষণ বিরক্ত। সে বিরক্ত মুখে বলল, “আহ মা! কাঁদছ কেন?”
ফুফু বলল, “কাঁদব না তো কী করব? এমন একটা লোকের সাথে আত্মীয়তা হচ্ছিল ভাবতেই আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।”
“গলা শুকিয়ে যাবে কেন? সাজ্জাদ ভাই যখন বলেছিল তখন তো তোমরা সবাই তাকে মৌমাছির মতো ঘিরে ধরেছিলে।”
“বাজে কথা বলিস না তিমু। সাজ্জাদ কী তানহার বাবার কথা কিছু বলেছিল নাকি? তানহার কথা বলেছিল। তা-ও ছাড়াছাড়া ভাব নিয়ে।”
তিমু কিছু বলল না। ঘরে চলে গেল। আমিও নিজের ঘরে চলে এলাম। ঘুমাতে ইচ্ছে করছে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখে ঘুম চলে এলো। ঘুম ভাঙল ফোনের রিংটোনে। জুয়েলার্স থেকে কল দিয়েছে।
“সাজ্জাদের সাথে কথা বলছি?”
“জ্বি। আমি সাজ্জাদ।”
“অর্ডারের কাজ শেষ। এসে নিয়ে যেতে পারেন।”
“এত দ্রুত শেষ হলো?”
“আপনিই তো বলেছিলেন ইমার্জেন্সি লাগবে৷ আমরা কাস্টোমারের দিকটা খুব দেখি।”
“কখন আসব?”
“সন্ধ্যার দিকে আসুন। এখনও আসতে পারেন।”
“ধন্যবাদ।”
কল কেটে গেল। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নামলাম। কাঁধে তোয়ালে ঝুলিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম৷ ট্যাপের পানি ঠান্ডা। মুখে ছড়ালে শরীর জুড়িয়ে যায়। মুখ হাত ধুয়ে কাপড় পরে নিলাম। চুড়ির টাকা পাওয়া আছে। আজ মিটিয়ে দেব।
গহনা নিয়ে নিজের কাছে রেখেছিলাম৷ রাতে খাওয়া সময় মায়ের হাতে পরিয়ে দিলাম। বাড়ির সবাই ভীষণ অবাক। মা কোন কথা বলতে পারছে না। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
ফুফু বলল, “সাজ্জাদ তুই এত কাজের হয়েছিস। আল্লাহ! আমার যদি এমন একটা ছেলে থাকত। আমার মেয়ের দু’টোর জন্য যদি এমন জামাই পেতাম। আল্লাহ!”
ফুফুর কথায় কেউ তেমন গুরুত্ব দিলো না। সবাই ভীষণ অবাক হয়ে গেছে৷ সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ছোট চাচা। চোখ মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। সে আমার এই কাজ মেনে নিতে পারছে না। একটুও পারছে না।
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২০
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১০