Golpo romantic golpo তোমার হাসিতে

তোমার হাসিতে পর্ব ২০


তোমার_হাসিতে

ফারহানাকবীরমানাল

২০.
ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। মাটির নিচে ঝিঁঝিঁ থাকে নাকি? আঁড়চোখে বাদশার দিকে তাকালাম। চোখ-মুখ শান্ত। চেংদোলা হয়ে যেতে তার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। যেন নিয়তিকে মেনে নিয়েছে। একটা ছেলে বলল, “পুকুরের কাছাকাছি এলে চোখ বাঁধার নিয়ম আছে। কাপড় বের কর।”

অন্য একটা ছেলে বলল, “পুকুরে নিয়ে ফেলে দেব। মাছে খেয়ে ফেলবে। এত তাল-বাহানা করার দরকার নেই। সময় নষ্ট হবে।”

“সময় নিয়ে এত ভাবছিস কেন? কাজ করে ফিরে যাব।”

ছেলেটা কিছু বলল না। চোখ-মুখ বিকৃত করে ফেলল। পুকুরের পাড়ে চলে এসেছি। বিশাল পুকুর। পুকুরে মাছ আছে বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো মাছগুলো গুপ্ত। পানির নিচে ওত পেতে বসে আছে। আমাদের শরীর পাওয়ার সাথে সাথে খুবলে খুবলে খাবে। চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিলাম। একজন আমার ডান পা ছেড়ে দিলো। খুব অস্বস্তি নিয়ে বলল, “ভাই, পেট কামড়ায় কেন? তুই একটু ধর তো।”

পাশের ছেলে দুই পা ধরল। খানিকটা বিরক্ত নিয়ে বলল, “এখানে শুইয়ে দে। লা’থি দিয়ে ফেলে দেব। আর টানতে পারছি না। শালা ভীষণ ভারী। গায়ে তেল আছে।”

আমাদের দু’জনকে মাটিতে শুইয়ে রাখল। একজন গায়ে পা ছুঁইয়ে বলল, “বহুদিন ফুটবল খেলা হয়নি। আজ খুব আয়েশ করে খেলব।”

দাঁতে দাঁত চিপে চুপ করে রইলাম। বাদশা রাগে পু’ড়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। হাত পা খোলা থাকলে কিছু একটা হতো। কিন্তু তেমন কোন উপায় নেই। চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে ডাকলাম। বিপদের শেষ মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্য আসে। আমাদের জন্য কী আসবে?

চোখ খুলল রইস উদ্দিনের গলায়। হঠাৎই সে এখানে চলে এসেছে। রইস উদ্দিন বলল, “কী সমস্যা? স্যার এমন করে মোচড়ান কেন?”

ছেলেটা আমার গা থেকে পা সরালো। নিজের পেট চেপে ধরে করুণ গলায় বলল, “পেট কামড় দেয় চাচা। ভীষণ কামড়ায়। মিনিট দুয়েক দেরি করলে কাপড়চোপড় নষ্ট হয়ে যাবে।”

“পোলা দুইটাকে পুকুরে ফেলবেন না?”

ছেলেটা কথা বলল না। মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল। বাকিদের অবস্থাও তাই। সবার চোখ-মুখে অস্বস্তি। রইস উদ্দিন বলল, “আপনারা বললে আমি ওদের ফেলে দিতে পারি। স্যার চলে গেছে।”

ছেলেগুলো যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। কৃতজ্ঞ গলায় বলল, “ধন্যবাদ চাচা।”

“দৌড় দাও। এত মানুষের সামনে কাপড়ে-চোপড়ে ভীষণ লজ্জার!”

সবাই দৌড় দিলো। রইস উদ্দিন বলল, “আপনার প্যান্টের থেকে কী যেন পড়ল!”

ছেলেটা থমকে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকাল। হতভম্ব মুখে বলল, “কই কী? দূর কচু!”

বলেই আবার দৌড় দিলো। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ঘটলো যে হাসার সুযোগ পেলাম না। রইস উদ্দিন খুব দ্রুত হাতে আমাদের হাত পায়ের দড়ি কে’টে দিলো। ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার সাথে আসেন সাহেব। পথ দেখিয়ে দিচ্ছি। সোজা পথে হাঁটতে শেষ মাথায় চার রাস্তার মোড়।”

অবাকই হলাম। এই রইস উদ্দিন আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। সে কি-না আমাদের পালাতে সাহায্য করছে নাকি এটাও একটা ফাঁদ। মনের কথা মনে রাখলাম না। বলে দিলাম। বেশ সহজ গলায় বললাম, “আমাদের সাহায্য করছেন কেন?”

“এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ওরা চলে আসতে পারে। যেতে যেতে বলব সাহেব। আসুন। দেরি করবেন না।”

সে দড়িগুলো পানিতে ফেলে দিলো। দড়ি পানিতে ফেলার সাথে সাথেই মাছ লাফিয়ে উঠল। রইস উদ্দিন কোমরের নিচ থেকে এক বোতল লাল তরল বের করল। বোতলের তরল পানিতে ফেলে দিয়ে বলল, “র’ক্তের গন্ধ থাকে। চলে আসুন। এমনিতে ওরা ভীষণ ফাঁকিবাজ, খুব বেশি যাচাই করবে না।”

“একসাথে সবার পেট কামড়াতে আরম্ভ হলো কীভাবে?”

“শরবতের সাথে জোলাপ মিশিয়ে দিয়েছে। কড়া ডোজের। অরিজিনাল মাল। এতক্ষণ সহ্য করল কীভাবে সেটাই চিন্তা বিষয়। শরীর বেশ ভালো।”

“আপনি আমাদের এত উপকার করলেন কেন?”

“আমি এই ফাঁদ থেকে মুক্তি চাই। যার জন্য কাজে ঢুকেছিলাম সে আর বেঁচে নেই। আমার কাজ করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।”

“কার জন্য কাজে ঢুকেছিলেন?”

“আমার ছেলে। আপনার বয়সী হবে। চোখ দু’টো একদম আপনার মতো। ওমন ভাসা ভাসা। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।”

বাদশা বলল, “আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না।”

“প্রতিটা গরিব মানুষের একটা করে করুণ কাহিনি থাকে সাহেব। আমারও আছে। শুনবেন?

আমি বললাম, “হাঁটছি যখন বলেন। শুনতে থাকি।

“বিয়ের প্রায় চব্বিশ বছর পর আল্লাহ একটা ছেলে দিয়েছিল। ছোট মেয়ে বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের সময়ে তার বয়স ছিল দশ বছর। ছেলের জন্মের সময়ে ওর মা মা’রা যায়। মা হারা ছেলেকে বুকে আগলে দিন পার করতে লাগলাম। এমনই শীতের রাত ছিল। ছেলেটার র’ক্তবমি শুরু হলো। সেই রাতে সদর হাসপাতালে ছুটলাম। একগাদা টেস্ট ফেস্ট করানোর পর জানলাম ছেলের আমার ব্লা’ডক্যান্সার। সুস্থ হওয়ার চান্স নেই। কিডনিতেও বিশাল সমস্যা। বাঁচাতে হলে সপ্তাহে দুইবার র’ক্ত পরিষ্কার করতে হবে। প্রতিবারে তিন-চার হাজার খরচ। আমার মাথায় আসমান ভেঙে পড়ল। এত টাকা কোথায় পাব? জমানো টাকা যা ছিল টেস্ট করতে শেষ। জমিজমা বিক্রি করতে শুরু করলাম। একদিন হাসপাতালে বড় স্যারের সাথে দেখা। উনি বললেন– তার হয়ে কাজ করলে আমার ছেলের চিকিৎসার টাকা দেবে। মেঘ না চাইতে পানি। রাজি হয়ে গেলাম।”

“এখানে আপনার কী কাজ?”

“স্যারের এইখানে মাঝেমধ্যে কিছু লোক আসে। আমি তাদের জন্য রান্না করি। রান্নার স্বাদ ভালো হতে হয়।”

“শুধু রান্না করার জন্য আপনি এত টাকা পান?”

“নাহ! মুখ বন্ধ রাখার জন্য। কারণ আমি যাদের জন্য রান্না করি তাদের মধ্যে বেশিরভাগ লোকই আর জীবিত থাকে না। মাগুর মাছের পেটে যায়।”

“আমাদের জন্য এতকিছু করছেন ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা নেই।”

“ধন্যবাদ দিতে হবে না সাহেব। আমি ভালো মানুষ না। ভালো মানুষ খারাপ কাজ করতে পারে না। আমি পারি। কাজেই আমি ভালো না। আপনাদের বাঁচিয়েছি তার পেছনে আমার একটা উদ্দেশ্য আছে।”

“কী উদ্দেশ্য?”

“আপনার চোখ! ওই চোখজোড়া আমার ছেলের মতো দেখতে। হুবহু এক রকম। প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিনই চমকে উঠেছিলাম।”

“শুধু চোখের জন্য?”

“নাহ! শুধু চোখের জন্য না।”

“তাহলে কেন করেছেন? দেখুন ভনিতা করবেন না।”

বাদশা খুব বিরক্ত মুখে কথাগুলো বলল। রইস উদ্দিন যেন একটু হাসল। হাসির শব্দ শোনা গেল স্পষ্ট। অন্যরকম গলায় বলল, “আমি চাই ওই লোকের শা’স্তি হোক।”

“এতদিন বাদে আজ হঠাৎ শা’স্তি চাইছেন?”

“আমার ছেলে নেই। পিছুটান নেই। শুনেছি বড় স্যার ডাক্তারের সাথে গোপন আলাপ করে ছেলেটার খু’ন করেছে। কারণ সে আর এখন এত টাকা ঢালতে পারছে না।”

“কিন্তু আমরা এর বিচার করব কীভাবে?”

“আইনের সাহায্য নিয়ে।”

“পুলিশ আমাদের কথা বিশ্বাস করবে কেন?”

রইস উদ্দিন দু’টো ফোন করে বের করে আমার হাতে দিলো। একটা মেমোরি কার্ডও দিলো। তরল গলায় বলল, “সাহেবদের ফোন। ফোনগুলো আমার কাছে জমা থাকে৷ ছেলেগুলোকে বড় স্যার বিশ্বাস করতে পারেন না।”

“মেমোরি কার্ড?”

“এইখানে কিছু জিনিস রেকর্ড করা। পুলিশি কাজে লাগবে। আপনার ফোনেই করতাম। লক খুলতে পারিনি। আপনার বন্ধুর ফোনে অবশ্য কিছু কিছু আছে। আঙুলের ছাপ নিয়ে লক খুলেছিলাম। কিছু দেখিনি। শুধু ভিডিও করেছি।”

কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। পথের শেষ মাথায় চলে এসেছি। যাওয়ার আগে রইস উদ্দিনকে একবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। হঠাৎই এই অদ্ভুত ইচ্ছার কারণ ধরতে পারছি না। কারণ খুঁজতেও চাইছি না। পৃথিবীর সব জিনিসের কারণ খুঁজতে নেই। কিছু জিনিস কারণ ছাড়া সুন্দর।

রইস উদ্দিনকে জড়িয়ে ধরায় সে ভীষণ অবাক হলো। ভেজা গলায় বলল, “ভালো থাকবেন সাহেব। বেঁচে থাকলে আরও একদিন রান্না করে খাওয়াব।”

“আপনিও নিজের যত্ন নিবেন। আমরা বেঁচে আছি জানার পর তানহার বাবা আপনার উপর চড়াও হবে।”

“হলে হবে। আল্লাহর কাছে গেলে হয়তো ছেলের সাথে দেখা হবে। আবার না-ও হতে পারে। আমার ছেলেটা পাপ কাজ করেনি। নামাজ রোজা করত। আমি পাপী মানুষ। ওর সাথে দেখা না-ও হতে পারে।”

“না, না। আপনার কিছু হবে না। আমাদের আবার দেখা হবে।”

শেষ কথাগুলো বলতে গলা জড়িয়ে এলো। মনে পড়ল প্রথম যেদিন রইস উদ্দিনকে দেখেছিলাম। লোকটা আজও আমায় আপনি করে ডাকছে। সাহেব বলে সম্মোধন করছে। সব বাবারা কী সন্তানদের এমন করে ভালোবাসে? নিজেকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়? তার ছেলেকে দেখতে কেমন ছিল? নিজের চোখ দু’টো আয়নায় দেখতে ইচ্ছে করছে। রইস উদ্দিন তো বলল আমার চোখ দু’টো হুবহু ওর ছেলের মতো দেখতে।

চার রাস্তার মোড়ে চলে এসেছি। রইস উদ্দিন ফোনের সাথে কিছু টাকাও দিয়ে গেছে। আর দেরি করলাম না। রিকশা ঠিক করে তানহার বাড়ি রওনা দিলাম। তিমু ওখানে আছে। ওকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। সুস্থ আছে কি-না দেখতে হবে। বাদশাকে বললাম, “তুই কী তোর বাড়িতে যাবি?”

বাদশা বলল, “না, আপাতত তোর সাথে যাব। কখন কী হয় বলা যায় না।”

“বাড়িতে কল দিয়ে বলে দিবি?”

“বাড়িতে কল দিলে ঝামেলা বাড়বে। আমার মনে হয় আমাদের এখন থানায় যাওয়া উচিত। পুলিশকে সব বলে তিমুকে উদ্ধার করলে ভালো হতো।”

“সময় নেই। পুলিশ আমাদের দুই চারটে কথা শুনবে না। তাছাড়া তানহাদের বাড়িতে লোকজন থাকবে। আমি ছোট চাচা, দাদি, ফুফু সবাইকে ডেকে নেব। ইমার্জেন্সি হলে ট্রিপল নাইন তো আছেই।”

বাদশা আর কিছু বলল না। রিকশা তানহাদের বাড়ির সামনে থামল। হুড়মুড়িয়ে রিকশা থেকে নামলাম। দুশো টাকার একটা নোট রিকশাওয়ালার হাতে ধরিয়ে বাপড়ির মধ্যে ছুটে গেলাম। তানহার মা বলল, “একি তুমি! এমন করে হাঁপাচ্ছ কেন?”

“তিমু কোথায়? আপনাদের বাড়িতে আসেনি?”

“এসেছিল তো। খাওয়াদাওয়া করল। আমি গরুর গোশত রান্না করেছিলাম।”

“এখন কোথায়?”

“গরুর গোশত খাওয়ার পর এলার্জি শুরু হয়েছিল। তারপর এলার্জির ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিল।”

“এখন কোথায় সে কথা বলুন।”

“ওমন ঘুম আমি জীবনেও দেখিনি বাবা।”

“কথা বুঝতে পারছেন না? তিমু কোথায় সেটা আগে বলুন।”

ভদ্রমহিলা আমার উঁচু গলা শুনে একটু ঘাবড়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তিমু তানহার আব্বার সাথে গেছে।”

“কোথায়?”

“বলল তো ডাক্তার দেখিয়ে তোমাদের বাড়ি দিয়ে আসবে। কেন কোন সমস্যা?”

তার কথার জবাব দিলাম না। তক্ষুনি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। বাদশা বলল, “কোথায় যাবি?”

“ওই স্কুলে যেতে হবে। আমার মন বলছে লোকটা তিমুকে মে’রে ফেলবে।”

“কেন ফেলবে? তিমুকে মা’র’লে তো সে ঝামেলায় পড়ে যাবে।”

“তিমু আমার কথা জানে। ওই লোকটা ওকে বাঁচতে দেবে না।”

“একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরছে। সাধারণ একটা জমিজমার দলিলের সুবিধার জন্য কেউ এত কিছু করে?”

প্রশ্নটা মাথার মগজে ঠক করে লাগল। তবে গুরুত্ব দিলাম না। এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই। তিমুর খোঁজ করতে হবে৷ মেয়েটা জীবিত থাকতেই আমাকে ওর কাছে পৌঁছাতে হবে।

চলবে

আমার লেখা ইবুকসমূহ পড়ুন বইটই অ্যাপে। লিংক কমেন্ট বক্সে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply