তোমারসঙ্গেএক_জনম (০৮)
সানা_শেখ
হিমেল রুম থেকে বেরিয়ে শিশিরের রুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
কনা একটা বড়ো বাটিতে করে বরফ নিয়ে রুমে প্রবেশ করে। বাটিটা বিছানার উপর রেখে ওয়াশরুমে এসে লামহা রুমে নিয়ে আসে। বিছানায় বসিয়ে হাত দুটো বরফের পানির মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। এবার একটু বেশিই আরাম লাগছে।
লামহার মুখের দিকে তাকিয়ে কনার চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে এসেছে। ইশ, মেয়েটা কীভাবে কেঁদেছে, চোখমুখ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর হিমেল ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে খাওয়ার জন্য। শিরিন সুলতানা সোফার উপর বসে আছেন গম্ভীর হয়ে। হিমেল মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে। শিরিন সুলতানা ছেলের পেছন পেছন প্রবেশ করেন।
ছেলের সামনে নাস্তা সাজিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলেন,
“ওই মেয়ে খাওয়ার জন্য আসলো না?”
হিমেল খিটখিটে মেজাজ নিয়ে বলে,
“না আসলো, না খেয়ে ম’রে যাক।”
শিরিন সুলতানা একটা প্লেটে লামহার জন্য নাস্তা সাজিয়ে নিয়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে যান। হিমেল মায়ের যাওয়ার পথে একবার তাকিয়ে আবার খেতে শুরু করে।
শিরিন সুলতানা হিমেলের রুমে সামনে এসে দেখেন লামহা একটা বাটিতে দুই হাত ভিজিয়ে বসে আছে। এখনো ফোঁপাচ্ছে, চোখমুখের বেহাল দশা। কনা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, লামহাকে কান্না বন্ধ করতে বলছে বারবার।
গলা খাকারি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। দুইজনেই ওনার দিকে তাকায়। প্লেট হাতে বিছানার কাছে এগিয়ে আসেন। কনার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“পানির জগটা ভরে নিয়ে আয়।”
কনা মাথা নেড়ে পানির জগ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শিরিন সুলতানা লামহার হাত দুটো পানি থেকে তুলে ধরেন। হাত দুটো দেখে ভীষণ মায়া হয় ওনার। উনি বুঝতে পারেননি এমন কিছু হবে, নানান টেনশানে খেয়ালই ছিল না। পুনরায় হাত দুটো পানিতে রেখে বলেন,
“মরিচ কা’টলে হাত জ্বালা করে আগে বললে না কেন?”
লামহা চুপ করে থাকে।
“কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হয় এতটুকু জানো না?”
লামহা কান্না করতে করতে বলে,
“আমি জানতাম না মরিচ কা’টলে হাত জ্বলবে।”
“আগে কোনদিন মরিচ কা’টোনি?”
দুদিকে মাথা নাড়ায় লামহা।
কনা পানি নিয়ে রুমে ফিরে এসেছে।
শিরিন সুলতানা এক গ্লাস পানি ভরে লামহাকে একটু পানি খাওয়ান। রুটি ছিঁড়ে নিজের হাতে তুলে ধরেন লামহার মুখের সামনে। লামহা শাশুড়ি মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে মুখের দিকে তাকায়। শিরিন সুলতানা গম্ভীর গলায় বলেন,
“হা করো।”
লামহা হা করে। শিরিন সুলতানা নিজ হাতে লামহাকে খাইয়ে দিতে থাকেন। খেতে খেতে হুহু করে কেঁদে ওঠে লামহা। শিরিন সুলতানা নিজ হাতে লামহার চোখমুখ মুছিয়ে দেন।
লামহাকে জোর করে দুটো রুটি খাওয়ান শিরিন সুলতানা। কিছু না বলে প্লেট হাতে রুম থেকে বেরিয়ে যান। লামহা দরজার দিকে তাকিয়ে হেঁচকি তুলে কাঁদছে।
কিছুক্ষণ পরেই শিরিন সুলতানা ফিরে আসেন রুমে। হাতে নারিকেল তেলের বোতল আর একটা চার্জার ফ্যান।
লামহার পাশে বসে ওর হাত দুটো পানি থেকে তোলেন। নিজের ওড়না দিয়ে হাত দুটো মুছে চুপচুপে করে তেল মেখে দেন। লামহা হাত দুটো আবার পানিতে ডুবানোর জন্য টানতে টানতে নাক টেনে বলে,
“আহ্, জ্বলছে।”
“এভাবে হাত পানিতে ডুবিয়ে বসে থাকলে সহজে জ্বালা কমবে না। তেল দিয়েছি কষ্ট করে একটু সহ্য করে নাও কিছুক্ষণের মধ্যে কমে যাবে।”
লামহা হাতে ফুঁ দিতে শুরু করে। শিরিন সুলতানা ছোটো চার্জার ফ্যানটা অন করে লামহার হাতের দিকে ধরে রাখেন। মাথার উপর সিলিং ফ্যান ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছেই।
চার্জার ফ্যানের বাতাস হাতের উপর পড়ায় এবার কিছুটা আরাম লাগছে।
লামহা শাশুড়ি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আর নাক টানছে। ভদ্র মহিলাকে যতটা খারাপ ভেবেছে ততটা খারাপ না, ভালোই আছে। শিরিন সুলতানা লামহার মুখের দিকে তাকাতেই লামহা মাথা নিচু করে নেয়।
দুইটার পর পর রেডি হয়ে নেয় হিমেল। লামহা ঘুমিয়ে আছে এখন। খ্যাপাটে দৃষ্টিতে বিছানায় শুয়ে থাকা লামহার দিকে একবার তাকিয়ে ব্যাগ কাধে নিয়ে রুম থেকে বের হয়। লামহার কথাগুলো শোনার পর থেকে ভীষণ রেগে আছে ওর উপর। সন্ধ্যায় হলে ফেরার কথা থাকলেও এখনই ফিরে যাবে। আর এক মুহুর্তও বাড়িতে থাকবে না।
নিচে নেমে আসতেই শিশিরের সঙ্গে দেখা হয়। শিশির কপাল ভ্রু কুঁচকে বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই দুপুর বেলা কোথায় পালাচ্ছ আবার?”
“সর সামনে থেকে।”
“এভাবে ঝাড়ি দিচ্ছ কেন? তোমার বাপের কামাই খাই?”
“কার বাপের কামাই খাস?”
শিশির সিনা টানটান করে বলে,
“আমার বাপের।”
হিমেল বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে বিড়বিড় করে।
“কোথায় যাচ্ছ?”
“জাহান্নামে।”
“জাহান্নামেই যেতে হবে, সেই ব্যবহার আর মুখের ভাষা। ছোটো ভাই, স্নেহ করে কথা বলবে, তা-না খ্যাক খ্যাক করছো শুধু শুধু।”
“তোর চেহারা দেখলেই রাগ উঠছে, তুই সর আমার সামনে থেকে।”
“ভালো মানুষের ভালো কথা আর কাজ দেখলে শ’য়’তা’নের রাগ উঠবেই।”
হিমেল দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“কী বললি তুই?”
বলেই শিশিরকে ধরার জন্য হাত বাড়ায়। শিশির সিঁড়ির দিকে দৌড় দিয়ে চিৎকার করে বলে,
“আম্মুউউউ, বাঁচাওওওও।”
“এই শ’য়’তা’নের কারখানা, দাঁড়া বলছি। আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন।”
“আম্মু গোওওও, বাঁচাও তোমার নিরীহ ছেলেকে।”
শিরিন সুলতানা নিজের রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আসেন। শিশির মায়ের পেছনে দাঁড়ায় মাকে ঢাল বানিয়ে। খ্যাপাটে ভঙ্গিতে এগিয়ে আসা হিমেলকে দেখিয়ে বলে,
“দেখো তোমার বড়ো ছেলে কীভাবে আসছে আমাকে মা’রা’র জন্য।”
হিমেল শিশিরকে ধরার চেষ্টা করে। শিরিন সুলতানা ছোটো ছেলেকে হিমেলের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতে বলেন,
“কী হয়েছে? ওর সঙ্গে এমন করছিস কেন?”
হিমেল কিছু বলার আগেই শিশির বলে,
“তোমার পেয়ারের ছেলে আবার বাড়ি থেকে পালাচ্ছে।”
হিমেল কটমট করে শিশির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শিশির মায়ের পেছন থেকে হিমেলের দিকে তাকিয়ে আছে।
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“কোথায় আর যাব? হলে যাচ্ছি।”
“এখনই কেন? বিকেলে না যাবি বলেছিলি।”
“দরকার আছে, এখনই যেতে হবে।”
“খেয়ে যাবি না?”
“না।”
“বউ রেখে যেতে কষ্ট হবে না?”
“ওর মুখ বন্ধ রাখতে বলো নয়তো মে’রে ওর মুখ ভেঙে দেব, বেয়াদ্দব কোথাকার।”
“খেক শেয়াল কোথাকার।”
“শিশির।”
“ভ্যাএএএএএ।”
“আম্মু, ওকে কিছু বলবে নাকি আমি কিছু করব?”
শিরিন সুলতানা ছোটো ছেলেকে মৃদু ধমক দিয়ে বলেন,
“শিশির, হিমেল তোর বড়ো ভাই হয়। ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস কেন?”
“তোমার বড়ো ছেলে সবসময় আমার সঙ্গে খ্যাক খ্যাক করে কেন?”
হিমেল আবার হাত বাড়ায় শিশিরকে ধরার জন্য। শিশির মাকে ছেড়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে হিমেলকে মুখ ভেঙ্গায়। হিমেল দাঁতে দাঁত পিষে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
“খেয়ে তারপর যাবি, নিচে চল।”
“খাব না এখন, পেট ভরাই আছে।”
“লামহা কোথায়?”
“ঘুমিয়েছে, আমি গেলাম।”
“আচ্ছা, সাবধানে যাস।”
“হুম।”
“পৌঁছে কল করিস।”
“আচ্ছা।”
হিমেল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। শিরিন সুলতানা ছেলের পেছন পেছন নেমে আসেন।
নিচে নেমে আসতেই দাদির সঙ্গে দেখা হয় হিমেলের। নিচে ফেলে রাখা ব্যাগটা কাধে তুলে নিয়ে দাদিকে বলে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
লামহার ঘুম ভাঙে বিকেল চারটার পর তাও কনার ডাক শুনে। শোয়া থেকে উঠে বসে শাড়ীর আঁচল ঠিক করে নেয়।
“গোসল সেরে নিচে আসো খাওয়ার জন্য।”
লামহা মাথা নেড়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। লম্বা ঘুমের পর এখন একটু ভালো লাগছে। গোসল করলেই ফুরফুরে লাগবে।
গোসল সেরে বের হয় লামহা। ব্যালকনিতে আসে ভেজা কাপড় মেলে দেওয়ার জন্য। হিমেলের ভেজা ট্রাউজার আর টিশার্ট মেলে দেওয়া রয়েছে দড়িতে। নিজের ভেজা কাপড় মেলে দিয়ে রুমে ফিরে আসে।
ভেজা চুলগুলো আঁচড়ে হাত খোঁপা করে নেয়। মুখে একটু ক্রিম মেখে লম্বা ঘোমটা টেনে ফ্যান বন্ধ করে রুম থেকে বের হয়।
কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে নামাতেই দেখে জাকির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে। দুজনেই দাঁড়িয়ে যায় নিজ নিজ জায়গায়। লামহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, জাকির তাকিয়ে আছে লামহার দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নিজেই পিছিয়ে যায় জাকির। ওকে সিঁড়ি থেকে নেমে দূরে সরে দাঁড়াতে দেখে লামহা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে চলে যায়।
জাকির ওর যাওয়ার পথে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে। লামহাকে দেখলেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। মন মানতেই চায় না লামহা ওর ছোটো ভাইয়ের বউ, সারাজীবন ছোটো ভাইয়ের বউ হিসেবে চোখের সামনে দেখতে হবে। অন্য কারো বউ হলে এত এমন লাগতো না, দেখতোও না, মনেও পড়তো না। এখন মনকে কীভাবে বোঝাবে? এই মন যে কিছুই বুঝতে চায় না আজকাল।
চলবে………….
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪৩
-
দিশেহারা পর্ব ৪৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ৩২