তোমারসঙ্গেএক_জনম (১৬)
সানা_শেখ
“স… সরুন আমার উ… উপর থেকে।”
“ভয় পাচ্ছ?”
“সরুন।”
“তাকাও।”
“না।”
হিমেল লামহার মুখের উপর ফুঁ দেয়। লামহা চোখমুখ খিঁচে নেয় আরো।
কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর হিমেলের উপস্থিতি অনুভব না করে চোখ মেলে তাকায় লামহা। দেখে হিমেল ওর উপর থেকে সরে গেছে। ফোস করে শ্বাস ছাড়ে, তাড়াহুড়ো করে উঠে বসে আঁচল ঠিক করে নেয়।
হিমেল ব্যালকনি থেকে টাওয়েল হাতে রুমে প্রবেশ করে। লামহার দিকে তাকিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়।
লামহা বুকে হাত দিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। কী বজ্জাত লোক, আরেকটু হলেই দম আটকে ম’রতে বসেছিল।
বিশ/পঁচিশ মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে হিমেল। দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে ওর দিকে তাকায় লামহা। চুলগুলো ভালোভাবে মোছেনি, কপালে লেপ্টে আছে, চোখদুটো প্রায় ঢেকে ফেলেছে। টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে। শরীরও ভালোভাবে মোছেনি, ফোঁটায় ফোঁটায় পানি জমে আছে সারা শরীরে। সাদা টাওয়েল কোমরে প্যাচানো।
হিমেলের বেশভূষা দেখে লজ্জা পেয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয় লামহা। নির্লজ্জ পুরুষ। হিমেলের গলায় গান শুনে আবার ওর দিকে তাকায় লামহা। হিমেল নাচছে আর গান গাইছে। ওর গান শুনে লামহার গম্ভীর চেহারায় হাসি ফুটে ওঠে।
“ফাগুন মাসে কাঁচা বাঁশে–
গুনগুনিয়ে ভ্রমর আসে–
হায় ফাগুন মাসে কাঁচা বাঁশে
গুনগুনিয়ে ভ্রমর আসে
প্রেমের লাগি বুকটা করে আ আ উ-~-
দুষ্টু কোকিল ডাকে রে
কু কু কু কু কু কু
মনে বাঁশি বাজে রে
কু কু কু কু কু কু
দুষ্টু কোকিল ডাকে রে
কু কু কু কু কু কু
মনে বাঁশি বাজে—
হিমেলের গাল আর মাজা দুলানি দেখে দম ফাটা হাসিতে ফেটে পড়ছে লামহা। হাসতে হাসতে বিছানা থেকে ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে যায়। নিচে পড়েও ওর হাসি থামছে না। হিমেল ছুটে আসে লামহার কাছে। ধরে তোলার চেষ্টা করে বলে,
“হায় হায়, আমার ছোট্টো বউটার মাজা আর হাড়গোড় গেলরে। ও বউ, ঠিক আছো?”
লামহা উঠে বসে সমান তালে হেসেই চলেছে। হাসতে হাসতে ফর্সা চেহারা লাল হয়ে গেছে, চোখজোড়ায় পানি চিকচিক করছে।
কোনো রকমে হাসি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে বলে,
“আপনি তো দারুণ নাচতে পারেন।”
বলতে বলতে আবার দম ফাটা হাসিতে ফেটে পড়ে।
“আরে হাসি থামাও, দম আটকে ম’রবে নাকি? এই লামহা, এই থামো।”
লামহা কোনো রকমে হাসি থামায় আবার। শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। হিমেল উঠে দাঁড়িয়ে ওকে বিছানায় বসায়। লামহা হিমেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ফিক করে হেসে ওঠে।
হিমেল মুগ্ধ হয়ে দেখে লামহার হাসি। আজকের আগে লামহাকে হাসতে দেখেনি হিমেল। লামহার আঁচল পড়ে গেছে মাথা থেকে। ছোটো ছোটো চুলগুলো উড়ো উড়ো।
“হাসলে তোমাকে আরো সুন্দর লাগে, পুতুল।”
হিমেলের গলার স্বর আর কথা শুনে লামহার হাসি থেমে যায়। হিমেল কেমন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে।
রাত আটটা নাগাদ জাকির নিজের ব্যাগ প্যাক করে নিয়ে নিচে নেমে আসে। ওকে ব্যাগ নিয়ে আসতে দেখে জোবেদা মির্জা বলেন,
“জাকির, ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাস?”
জোবেদা মির্জার কথা শুনে সোফায় বসে থাকা বাকিরাও তাকায় জাকিরের দিকে। নাজমা মির্জা সোফা ছেড়ে উঠে ছেলের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,
“কোথায় যাস?”
জাকির রাগী গলায় বলে,
“জাহান্নামে।”
নাজমা মির্জার মুখটা কালো হয়ে ছোটো হয়ে যায়। তার শান্ত-শিষ্ট, নম্র-ভদ্র ছেলেটা কেমন খিটখিটে মেজাজের আর অভদ্র হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে বেয়াদবি করে।
মাকে উপেক্ষা করে বাইরের দিকে পা বাড়ায় জাকির। জাকারিয়া মির্জা বলেন,
“জাকির? কোথায় যাচ্ছিস? আগামীকাল মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ভুলে গেছিস?”
“কোনো মেয়ে দেখতে যাবো না আমি, যাকে চেয়েছিলাম তাকে তো দাওনি কেউ।”
“বারবার এক কথা কেন বলিস? ভাগ্যে না থাকলে চাইলেই আসবে নাকি? লামহার চেয়ে কয়েকগুণ ভালো মেয়ে তোর বউ করে নিয়ে আসব।”
“ওর চেয়ে ভালো মেয়ে চাইনা আমার। এই জীবনে বিয়ে করার শখ মিটে গেছে। আজকের পর এই বাড়িতে আর ফিরবো না আমি, ধরে নাও ম’রে গেছি আমি।”
কথাগুলো বলেই গটগট পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় জাকির। ওর পেছন পেছন ডাকতে ডাকতে বাড়ির সবাই আগায়। কারো ডাক যেন জাকিরের কানে পৌঁছাচ্ছে না। জাবির মির্জা প্রায় দৌড়ে গিয়ে জাকিরের হাত ধরেন। জাকির চাচ্চুর হাতের দিকে তাকিয়ে মুখের দিকে তাকায়। ঠান্ডা গলায় বলে,
“চাচ্চু, প্লীজ আটকিও না আমায়। দম বন্ধ হয়ে আসছে এই বাড়িতে। যেতে দাও আমাকে এখান থেকে। হাত ছাড়ো আমার।”
“যা হয়ে গেছে তা মেনে নে।”
“মেনে নিতে পারছি না আমি, ছাড়ো আমাকে।”
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“চট্টগ্রাম।”
“মেয়েটাকে দেখে যা, দেখে হয়তো তোর পছন্দ হবে।”
“আর কোনো মেয়ে দেখতে চাই না আমি। প্লীজ হাত ছাড়ো।”
বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেছে। লামহার অ্যাডমিশন হয়ে গেছে কলেজে। আজকে লামহা আর হিমেল গ্রামে যাচ্ছে। হিমেল ড্রাইভিং করছে, পাশেই অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে লামহা।
“লামহা।”
লামহার ভাবনায় ছেদ পড়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে হিমেলের দিকে তাকায়। হিমেল ড্রাইভিং করতে করতে বলে,
“মাফ করবে না আমাকে? ভুল তো মানুষই করে, আমিও করেছি। সেদিন সত্যিই আমার মাথা ঠিক ছিল না নানান জনের নানান কথা শুনে, রাগের মাথায় কি কি বলে ফেলেছি নিজেও বুঝতে পারিনি তখন। আমার জায়গায় তুমি থাকলে কি এমন কিছু করতে না? অন্য কেউ করতো না? হয়তো আমি একটু বেশিই রিয়েক্ট করে ফেলেছিলাম।”
লামহা হিমেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কথা না বলে। হিমেল ওর দিকে তাকাতেই লামহা অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। হিমেল আর কিছু বলে না, মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভিং করতে থাকে।
কিছুটা সময় অতিবাহিত হতেই লামহা আবার তাকায় হিমেলের দিকে। হিমেলের সিল্কি চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। দৃষ্টি সামনের দিকে, দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করছে। পরনে সাদা কালো মিশ্রণের চেক শার্ট, শার্টের ভেতরে সাদা টিশার্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, বাম হাতে ব্র্যান্ডের ঘড়ি।
হিমেল আবার তাকায় লামহার দিকে। লামহা আবার অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, হিমেল মুচকি হাসি উপহার দিয়ে আবার সামনের দিকে দৃষ্টি রাখে।
চলবে……..
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৫৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৪৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৭
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ৪১