Golpo romantic golpo তোমার সঙ্গে এক জনম

তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৩


তোমারসঙ্গেএক_জনম (১৩)

সানা_শেখ

লামহা বিছানায় না শুয়ে মেজাজ দেখিয়ে সোফায় গিয়ে বসে। বাড়িতে ছিল না ভালোই তো ছিল, কেন আসলো আবার? বিছানার দিকে তাকায় আবার, হিমেল আগের মতোই উপুর হয়ে শুয়ে আছে। লামহা রাগী চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। কত আরামে ঘুমিয়ে ছিল, ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে বদ লোকটা এসে।

“এই মেজাজ ওয়ালী, এখানে আসো।”

লামহা বিছানার দিকে তাকায় আবার। ক্ষিপ্ত স্বরে বলে,

“যাবো না।”

“ঘুরে ফিরে সেই আমার কাছেই আসতে হবে তাই মেজাজ না দেখিয়ে এখানে আসো।”

“যাবো না আপনার কাছে, সকালেই আমি চলে যাবো এই বাড়ি থেকে।”

“কোথায় যাবে?”

“জাহান্নামে।”

“স্বামীর সঙ্গে যেই আচরণ, যেতেই হবে।”

লামহার রাগ আরো বেড়ে যায়। আঙুল তুলে বলে,

“একদম কথা বলবেন না আমার সঙ্গে।”

“চার ফুটের শরীরে এত তেজ?”

লামহা ফুঁসে উঠে বলে,

“কিহ! আমি চার ফুট?”

“হ্যাঁ। দেখে তাই মনে হয়।”

“”আপনি আড়াই ফুট, অসভ্য লোক।”

“কে আড়াই ফুট আর কে চার ফুট সেটা তো জানিই আমি। আমি আড়াই ফুট বলেই তো তুমি আমার কাধেরও নিচে পড়ে থাকো,লিলিপুট।”

লামহা রেগে আর একটাও কথা বলে না। হিমেল আবার বলে,

“বিয়ে করলে অন্যদের জীবনে শান্তি নেমে আসে আর আমার জীবনের শান্তি গায়েব হয়ে গেছে। বিয়ের পর থেকে একটা দিন যদি শান্তিতে থাকতাম তাও হতো।”

“সকালে আমাকে নিয়ে বাড়িতে রেখে আসবেন।”

“ঠ্যাকা পড়েনি আমার।”

“একাই চলে যাব।”

“যেও।”

“খাটাস লোক কোথাকার।”

“কিছু বললে?”

“এই ঘুমান তো আপনি।”

“তোমার বিহেভিয়ার ঠিক করো। গুরুজনের সঙ্গে এক কেমন আচরণ?”

লামহা রাগে গজগজ করতে করতে মুখ ফিরিয়ে নেয় হিমেলের দিক থেকে।
হিমেল মাথা তুলে বলে,

“বিছানায় আসো।”

লামহা কিছু বলে না, ওর দিকে তাকায়ও না আর।

“বিছানায় আসলে আসো না আসলে আর একবার ডাকবো তারপর ঘুমিয়ে যাব।”

লামহা তবুও চুপ।

“এই যে বউ, শুনছো? বিছানায় আসো।”


হিমেলের ঘুম ভাঙে ফোনের রিংটোন শুনে। ঘুম ঘুম চোখে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে ওর বাবার কল। রিসিভ করে কানে ধরে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

“হ্যাঁ আব্বু, বলো।”

“ঘুম থেকে উঠিসনি?”

“না। কেন, কী হয়েছে?”

“লামহাকে নিয়ে নিচে আয় নাস্তা করার জন্য।”

“আসছি।”

ফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে আরো কতক্ষন চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। ঘুমে চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না।
আলসেমি ছেড়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দেয় কপালের উপর থেকে। সোফার দিকে তাকিয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। লাইট অন করে ডিম লাইট অফ করে দেয়। সোফার কাছে এগিয়ে এসে লামহার মুখের দিকে তাকায়। জেদ ধরে সোফাতেই ঘুমিয়েছে।
লামহাকে না জাগিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য।

ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে লামহা এখনো ঘুমিয়ে আছে। টাওয়েল দিয়ে হাতমুখ মুছতে মুছতে লামহার পাশে দাঁড়িয়ে ওর নাম ধরে ডাকে। দুবার ডাকতেই লামহা ঘুম ঘুম চোখের পাতা টেনে তুলে তাকায়।

“উঠে ফ্রেশ হয়ে আসো।”

লামহা চোখ বন্ধ করে নেয়।

“তোমার শ্বশুর খাওয়ার জন্য যেতে বলেছে।”

লামহা চুপ করে শুয়ে রইল। ওর এখন মোটেও উঠতে ইচ্ছে করছে না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘুমিয়েছেই ভোর রাতে।

“লামহা, ওঠো। আব্বু কল করেছিল, নিচে যেতে বলেছে।”

লামহা বিরক্ত ভঙ্গিতে শোয়া থেকে উঠে বসে। হিমেলের দিকে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। হিমেল লামহার যাওয়ার পথে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

“সহজ সরল মেয়ের এই নমুনা? শ্বশুর বলেছিলেন কি আর আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন কি? আমার সহজ, সরল, বোকা বউ কই? এটা তো ছোটো খাটো রিনা খান।”

লামহা ফ্রেশ হয়ে এসে হাতমুখ মুছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। হিমেলের দিকে তাকিয়ে দেখে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। মাথা থেকে আঁচল নামিয়ে চুল আঁচড়াতে শুরু করে। চুল আঁচড়ানোর ফাঁকে হিমেলের দিকে তাকায় আবার। দেখে হিমেল ওর দিকে তাকিয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে। এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়। বিড়বিড় করে কয়েকটা বকাও দেয়।
চুল খোঁপা করার সময় আবার চোখ পড়ে হিমেলের দিকে। হিমেল এখনো আগের মতোই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। অস্বস্তিতে ছটফটিয়ে ওঠে লামহা। হিমেলের দৃষ্টি দেখেই বুঝতে পারে কোন দিকে তাকিয়ে আছে। দ্রুত খোঁপা বেঁধে হাত নামিয়ে নিয়ে শরীর ঢেকে নেয়। খোঁপা করার জন্য হাত উপরে তুলেছিল তখন পেট আর কোমর বেরিয়ে গিয়েছিল। বজ্জাত লোকটা এতক্ষণ ধরে সেদিকেই তাকিয়ে আছে।

ঘুরে দাঁড়ায় হিমেলের দিকে, কটমট করে তাকিয়ে বলে,

“আপনার অসভ্য চোখজোড়া কানা করে দেবো কিন্তু।”

হিমেল কপাল ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হয়ে বলে,

“কেন, আমার চোখ কী করেছে? কখন অসভ্যতামি করল?”

“এভাবে তাকিয়ে ছিলেন কেন?”

“আশ্চর্য, কীভাবে তাকিয়েছি?”

বলতে বলতে ফোন হাত থেকে রেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। লামহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝুঁকে বলে,

“তুমি বের করলে আমি দেখবোই। দেখাটা আমার অধিকার, আর দেখানো তোমার অধিকার। দেখানোর অধিকার আছে বলে আবার যাকে তাকে দেখিয়ে দিও না, শুধু আমাকেই দেখিও।”

“আমি আপনাকে ভদ্র সভ্য ছেলে ভেবেছিলাম।”

“ছোটো মানুষ, ভুল করবেই সেটা নিয়ে মাথা ব্যথা তৈরি করার প্রয়োজন নেই। চলো খেয়ে আসি, খিদে পেয়েছে।”

লামহা আঙুল তুলেছিল কিছু বলার জন্য কিন্তু তার আগেই হিমেল ওর সামনে থেকে সরে দরজা খুলে দেয়।

“কী হলো? আসো।”

“আপনাকে আমি—

“হ্যাঁ, ভালোবাসো বুঝতে পেরেছি, আমিও ভালোবাসবো এখন খেতে চলো।”

লামহা কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে, কি বলবে বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে রইল হিমেলের মুখের দিকে। হিমেল এগিয়ে এসে লামহার হাত ধরে টেনে রুম থেকে বের করে। লামহা ঝাড়ি দিয়ে হিমেলের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বলে,

“আপনাকে বলেছি না ছোঁবেন না আমাকে?”

“মিষ্টি একটা মেয়ে, দেখতে পুতুলের মতো কিন্তু তোমার গলার স্বর এত কর্কশ আর ঝাঁঝালো কেন? ব্যবহারও ভালো না। দ্রুত নিজেকে পরিবর্তন করবে। মেয়ে মানুষ, কথা বলবে মিষ্টি মিষ্টি, ব্যবহার হবে নমনীয়, তাকাবে মায়াবী দৃষ্টিতে দেখে খু’ন হয়ে যাব। তা-না করে কি করো এসব? শ্বশুর আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, একটার কথা বলে আরেকটা দিয়ে দিয়েছেন।”

লামহা দাঁতে দাঁত চাপে। কটমট করে তাকায় হিমেলের মুখের দিকে। সিঁড়ির গোড়ায় চলে আসায় কিছু বলতে পারছে না। হিমেল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।

শিশির বড়ো ভাইকে দেখে বলে,

“আরেকটু পরেই আসতে তাহলে সকালের নাস্তাটা বেঁচে যেত, সংসারে উন্নতি হতো।”

হিমেল ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকায় তবে বলে না কিছু। শিশির আবার বলে,

“বলছিলাম কি ভাইয়া, আরেকটু পরেই খাও তোমরা। তাহলে সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার দুটোই একসাথে হয়ে যাবে।”

“এত বকবক করিস কেন তুই? মুখটা একটু বন্ধ করে রাখতে পারিস না? মুখটাকে একটু রেস্ট দে।”

“আগে ম’রি তারপর রেস্ট করবে।”

শিরিন সুলতানা ডাইনিং রুম থেকে বড়ো ছেলের গলার স্বর শুনে খাওয়ার জন্য ডাকেন দুজনকে।

“যাও, আজকে তোমার বাপ-ও খাওয়ায় লেট।”

হিমেল ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,

“আজকের পর থেকে আমার বাপকে ডাকবি না তুই।”

“ওখেএএএএএ। ভাবী যান যান খান।”

শিশিরের বলার ধরন দেখে মুচকি হাসে লামহা, সঙ্গে কনা আর জোবেদা মির্জাও।

জাবির মির্জার প্রায় খাওয়া শেষ। হিমেল আর লামহা খেতে বসে। বাড়ির বাকি সকলের খাওয়া শেষ শুধু জাকির খায়নি।
জাবির মির্জা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“খালি ফ্ল্যাটে তো গিয়ে থাকতে পারবি না, আসবাব পত্র কিনতে হবে। তোরা মার্কেটে যাবি? গেলে পছন্দ মতো সব কিনতে পারবি।”

“ফ্ল্যাটে না গেলে হয় না?”

“না, হয় না। সব দিক ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দ্রুত খাওয়া শেষ কর, মার্কেটে যাবি আমার সঙ্গে।”

“শিশিরকে নিয়ে যাও।”

“তুই যাবি না?”

“না।”

“লামহা।”

লামহা চোখ তুলে শ্বশুরের দিকে তাকায়।

“তুমি যাবে?”

লামহা দুদিকে মাথা নাড়ায়। জাবির মির্জা আর কিছু বলেন না। খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“এই হতচ্ছাড়া, যা রেডি হ।”

“কেন?”

“মার্কেটে যাবি আমার সঙ্গে।”

“কেন?”

“তোকে বেচতে যাব, যা রেডি হয়ে আয়।”

“হ্যাঁ, ভালো একটা ফ্যামিলি দেখে বেচেই দাও আমাকে। তোমাদের মতো মানুষদের সঙ্গে থাকতে চাই না।”

“ওখান থেকে উঠবি নাকি?”

“তোমাদের সমস্যা কি বলোতো আমাকে। যে যার উপরই রাগুক না কেন, সেই রাগ সবাই এসে আমার উপরেই ঝারে। এই নিরীহ বান্দার উপর এমন অবিচার কেন?”

জাবির মির্জা কনার দিকে তাকিয়ে বলেন,

“কনা, যা তুই রেডি হয়ে আয়।”

কনা সোফা ছেড়ে উঠে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় রেডি হওয়ার জন্য। পড়াশোনার খাতিরে কনা মামার বাড়িতে থাকে, এখান থেকে ওর কলেজ কাছে তাই এই বাড়িতেই রয়েছে।

শিশির দ্রুত সোফা ছেড়ে উঠে একপ্রকার দৌড়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
জাবির মির্জা আর জোবেদা মির্জা শিশিরের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলেন।

সবকিছু কেনা শেষ হতেই হিমেলের ফোনে কল করেন জাবির মির্জা। লামহার আর হিমেলের প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নিতে বলেন।
নাস্তা সেরে লামহা রুমে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে বসে ছিল। হিমেল কিছুক্ষণ আগেই রুমে এসেছে, এসেই চুপচাপ শুয়ে আছে। হিমেল রুমে আসার আগে জাকিরের চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছে অনেক। হিমেলের গলার স্বরও শুনেছে। মনে হচ্ছিল দুই ভাই তর্কাতর্কি করছে।

হিমেল শোয়া থেকে উঠে বসে লামহার দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নাও, আমরা একটুপর বের হবো।”

লামহা হিমেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে স্যুটকেস বের করে নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু গোছাতে শুরু করে।
হিমেল বিছানায় বসে লামহাকে দেখছে গভীর মনোযোগ সহকারে। লামহা হিমেলের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছে হিমেল ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
অস্বস্তি নিয়েই নিজের সবকিছু গুছিয়ে নেয় লামহা। হিমেল এখনো আগের মতোই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। লামহা হিমেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

“কোথায় তাকিয়ে আছি?”

“এই যে।”

“তুমি বললে বলে না তাকালাম।”

“এতক্ষণও তাকিয়ে ছিলেন।”

“তুমি দেখেছ?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তো তুমিও তাকিয়েছো আমার দিকে। তুমি তাকালে দোষ নেই আর আমি তাকালেই দোষ?”

“আপনার সঙ্গে কথা বলাই আমার দোষ হয়েছে, সব দোষ আমার।”

“শ্বশুর বলেছিলেন তাঁর মেয়ে সহজ, সরল, বোকা। আমার সহজ, সরল, বোকা বউ কই? সহজ সরলের এই নমুনা? তুমি যদি সহজ, সরল, বোকা হও তাহলে চালাক, চতুর, বজ্জাত কারা? শ্বশুরের সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে।”

“আমি যাবো না আপনার সঙ্গে কোথাও। আব্বুকে কল করে বলুন এসে যেন আমাকে নিয়ে যায়।”

“তুমি করো।”

লামহা হিমেলের কাছে এগিয়ে এসে বলে,

“ফোন দিন আপনার।”

হিমেল ফোন হাতে নিয়ে লামহার কাছে দেয়।

“লক খুলে দিন।”

“খোলো।”

“আমি লক জানি? খুলে দিন।”

“ঠ্যাকা পড়েনি।”

লামহা হিমেলের হাত ধরে জোর করে ফিঙ্গার দিয়ে ফোন আনলক করে। ফোন আনলক করতে হিমেলের সঙ্গে বেশ ধস্তাধস্তি করতে হয়েছে।
নাম্বার তুলতে দেখে থাবা দিয়ে লামহার হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয় হিমেল।

“ফোন দিন।”

হিমেল মুখে কিছু না বলে দুদিকে মাথা নাড়ায়।
লামহা দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

“যাও, দরজার বাইরে ভাইয়া তোমার অপেক্ষাতেই আছে।”

দরজা খুলতে গিয়েও থেমে যায় লামহা। হিমেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আপনারা বড়ো দুই ভাই-ই অসভ্য, আস্ত শ’য়’তা’ন, দেখলেই গা জ্বলে যায়।”

“ভুল বললে, আমার ভাইয়ার মতো ভালো মানুষ তুমি এই এলাকায় দ্বিতীয়জন খুঁজে পাবে না।”

“হ্যাঁ, সেজন্যই তো ছোটো ভাইয়ের বউকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গেছে।”

“ভাইয়া ভালোই আছে, ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে তুমি এতক্ষণে কোথায় থাকতে নিজেও জানতে না। তোমাকে জোর করে ধরে নিয়ে কখন হাওয়া হয়ে যেতাম কেউ টেরও পেতো না।”

“তাহলে তো আমার আপনার ভাইয়ার কাছেই চলে যাওয়া উচিত।”

“ভাসুর হয়, নজর দিও না।”

“আপনাদের দুই ভাইকে খু’ন করে জেলে যেতে ইচ্ছে করছে আমার।”

“জেলে যেতে হবে না, চলো ফ্ল্যাটে যাই।”

লামহা রাগে ফোস ফোস করতে শুরু করেছে। রাত থেকে পাগল করে দিচ্ছে ওকে।

ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আসরের আযান হয়ে গিয়েছিল। হিমেল আর লামহার সঙ্গে শিরিন সুলতানা-ও এসেছেন। উনি জাবির মির্জা, শিশির আর কনার সঙ্গে চলে যাবেন আবার।

ফ্ল্যাটে সবকিছু গোছগাছ হয়েই গেছে প্রায়। একা একা থাকতে হবে ভেবে লামহার এখনই কান্না পাচ্ছে। আর এই হিমেলকে তো ওর একদমই সহ্য হচ্ছে না।

শিশির দুজনের জন্য খাবার কিনে নিয়ে আসে। জাবির মির্জা ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“তোরা থাক তাহলে, আমরা এখন আসি। কোনো সমস্যা হলে জানাস। সময় পেলে আমরা আসবো এখানে। আগামীকাল সকাল থেকে বুয়া এসে রান্না বান্না সহ সব কাজ করে দিয়ে যাবে। আমরা আসছি।”

জাবির মির্জা আগে আগে বেরিয়ে যান, ওনার পেছন পেছন বাকি তিনজন বের হয়। হিমেল দরজা লাগিয়ে দেয় ভেতর থেকে।
লিফটে উঠে শিশির কনার পাশে দাঁড়ায়। কনা ওর পাশ থেকে সরে দাঁড়ায় মামির শরীর ঘেঁষে। শিশির কটমট করে তাকায় কনার মুখের দিকে। কনা শিশিরের দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। জাবির মির্জা শিরিন সুলতানার সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত, শিরিন সুলতানা-ও মন দিয়ে স্বামীর কথা শুনছেন।

লিফট থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে আগায় চারজন। শিশির পেছন থেকে কনার হাত শক্ত করে মুঠো করে ধরে। ব্যথায় ককিয়ে উঠতে গিয়েও মুখ বন্ধ করে নেয় কনা। শিশিরের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে চাপা স্বরে বলে,

“ভালো হচ্ছে না কিন্তু, হাত ছাড়ো আমার।”

“সন্ধ্যার আগে যেন কি বলেছিলি?”

“কই? কিছুই তো বলিনি।”

“কিছু বলিসনি?”

“না।”

“ফার্নিচার সেট করলো সেই খাম্বা ছেলেটাকে দেখে যেন কি বলেছিলি?”

“হ্যান্ডসাম।”

হাত ছেড়ে কনার ঘাড় চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

“হ্যান্ডসাম তাইনা? আজকে বাসায় চল, ফুপিকে কল করে আজকেই বলবো তার মেয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাইরের ছেলেদের দিকে নজর দেয়। কোন ছেলে হ্যান্ডসাম, লম্বা, খাম্বা সেসব দেখে শুধু।”

“মিথ্যে বলছো কেন? পড়াশোনা বাদ দিয়ে কবে এসব করেছি? কবেই বা কোন ছেলের দিকে তাকিয়েছি? শুধু আজকেই তো দেখলাম আর বললাম, তাছাড়া আর কবে বলেছি, দেখেছি? তুমিও তো কত সুন্দরী সুন্দরী মেয়েদের দিকে তাকাও, আমি মামা মামিকে কিছু বলেছি?”

“তুই কবে দেখেছিস আমাকে মেয়েদের দিকে তাকাতে?”

কনা মনে করার চেষ্টা করে শিশির কবে কোন মেয়ের দিকে তাকিয়েছে কিন্তু মনে করতে পারে না। আসলে শিশির তো কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকায়-ই না।

“ওর ঘাড় ধরেছিস কেন এভাবে?”

শিশির কনার ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে নেয়। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

“এটাকে উল্টো করে ঝুলাতে হবে।”

“কেন, কী করেছে?”

জাবির মির্জা বলেন,

“ওকে না, তোকে উল্টো করে ঝুলাতে হবে, বদমায়েশ কোথাকার।”

কনা দাঁত বের করে হাসে শিশিরের দিকে তাকিয়ে। মুখ ভেংচি কে’টে গাড়িতে উঠে বসে। শিশির কটমট করে তাকিয়ে রইল কনার দিকে। ইচ্ছে করছে ঠাস করে একটা লাগিয়ে দিয়ে দাঁত বত্রিশটা ফেলে দিতে।

চলবে………….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply