Golpo romantic golpo তোমার সঙ্গে এক জনম

তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১২


তোমারসঙ্গেএক_জনম (১২)

সানা_শেখ

হিমেলের ফোনে রিংটোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে ওর বাবা কল করেছেন। বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে সরে কল রিসিভ করে।

“হিমেল।”

“বলো।”

“বাড়িতে আয়।”

বাবার কথা শুনে বিরক্ত হয় হিমেল। মাত্র কদিন আগে বাড়ি থেকে আসলো, এখন আবার বাড়ি যেতে বলছে।

“কোথাও যেতে পারবো না এখন। বাড়ি থেকে আসলামই তো মাত্র কদিন আগে।”

“জাকির ঝামেলা করছে বাড়িতে, পাগলামি শুরু করেছে।”

“কেন? ভাইয়ার আবার কী হলো?”

“লামহাকে বিয়ে করার জন্য পাগলামি করছে।”

“কিহ!”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“বলছে লামহাকে বিয়ে করবে, তোর সঙ্গে যেন ওর ডিভোর্স করিয়ে দেই।”

হিমেল বাক্যহারা। কী শুনছে এসব?

“হিমেল।”

“হ্যাঁ, বলো।”

“বাড়িতে আয় দ্রুত।”

“এখন কীভাবে যাব? আগামীকাল ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে।”

“বউয়ের চেয়ে তোর ক্লাস বেশি ইম্পর্টেন্ট?”

“আমি গেলেই ঝামেলা মিটে যাবে?”

“লামহাকে নিয়ে তুই আলাদা ফ্ল্যাটে থাকবি।”

“পাগল হয়েছ? আমরা দুজনেই স্টুডেন্ট।”

“তো কী হয়েছে? খরচ আমরা দেব।”

“খরচ দিলেই কি, আ—

“আমি অত কিছু শুনতে চাই না, তুই আসবি কি-না বল?”

“আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো তোমরা তাইনা?”

“তুই থাক তোর ক্যারিয়ার নিয়ে, বাড়িতে এসে লামহাকে তালাক দিয়ে চলে যা।”

রাগী গলায় কথাগুলো বলেই কল কে’টে দেন জাবির মির্জা।
হিমেল নিজেও রেগে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল। সবাই পেয়েছেটা কী ওর সঙ্গে? সেই বিয়ের দিন থেকে একটার পর একটা প্যারা এসে চেপে বসছে ঘাড়ে। একটু শান্তি নেই জীবনে।


রাত দশটার পর বাড়ির কলিং বেল বেজে ওঠে। শিশির সোফা ছেড়ে উঠে দরজার কাছে এগিয়ে আসে। দরজা খুলে দেখে হিমেল দাঁড়িয়ে আছে।

“সর সামনে থেকে।”

“তোমার বউ নিয়ে আমি টানাটানি করছি না, যে করছে গিয়ে তার সঙ্গে তেজ দেখাও।”

বলতে বলতে সামনে থেকে সরে যায় শিশির। জাকিরের কথা শুনে ওর মেজাজ ভীষণ গরম হয়ে আছে।
হিমেল ছোটো ভাইয়ের উপর অগ্নি দৃষ্টি ফেলে ভেতরের দিকে পা বাড়ায়। কনা আর লামহা বাদে বাকি সবাই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত। জাকিরকে অনেক রাগী দেখাচ্ছে। বড়ো ভাইকে এমন রূপে আগে কোনোদিন দেখেনি হিমেল।

হিমেল কাছে এগিয়ে আসতেই জাকারিয়া মির্জা বলেন,

“তুই তোর বউকে নিয়ে আলাদা থাক।”

জাকির ছ্যাত করে উঠে বলে,

“কেন? ও ছেড়ে দিক লামহাকে।”

হিমেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তুই লামহাকে তালাক দে।”

হিমেল গম্ভীর গলায় বলে,

“আমি আমার বউকে কেন তালাক দেব? বিয়ে করেছি তালাক দেওয়ার জন্য নাকি?”

“তুই-ই তো বলেছিলি তুই এই বিয়ে মানিস না।”

“তখন মানিনি কিন্তু এখন মানি। আমি আমার বউকে তালাক দেবো না।”

“না, তালাক দিবি তুই।”

“মামা বাড়ির আবদার? যা বলবে তাই হবে?”

জাকারিয়া মির্জা বলেন,

“এত তর্কাতর্কির কোনো প্রয়োজন নেই, যা হওয়ার হয়ে গেছে। হিমেল, তুই আগামীকালই লামহাকে নিয়ে ফ্ল্যাটে উঠবি, সবকিছু স্বাভাবিক হলে তারপর বাড়ি ফিরবি বউ-বাচ্চা নিয়ে।”

জাকির তেতে ওঠে। হিমেল বলে,

“দেখো ভাইয়া, আমি তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছি না। ভালো হয় এসব এখানেই থামিয়ে দাও। লামহা আমার ওয়াইফ, এটা ভুলে যেও না। আমি আমার ওয়াইফকে কোনোদিন ছাড়বো না। আগে কী বলেছি আর করেছি সেসব ভুলে যাও।”

জাবির মির্জা বলেন,

“তোর আংকেলের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার, ও ধানমন্ডির ফ্ল্যাট দিতে রাজি। তুই আগামীকাল লামহাকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে উঠবি।”

“ভাইয়া, দুনিয়ায় অনেক মেয়ে আছে, তুমি তাদের মধ্যে থেকে কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করে নাও, লামহাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। আজকে যা করছো একদিন এর জন্য অনুশোচনা করবে মিলিয়ে নিও।”

“অনুশোচনা করি আর না করি সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই লামহাকে ছাড়, ও আমার হবু বউ ছিল।”

“তোমার হবু বউ ছিল কিন্তু ও বর্তমানে আমার বউ। সেদিন তো বিয়ে করলে না আজকে এত পাগলামি করছো কেন?”

“তুই বিয়ে করলি কেন?”

“আমি কেন করেছি সেটা বাড়ির সবাই জানে, তুমিও জানো তাই এমন প্রশ্ন করবে না। লামহা এখন তোমার ছোটো ভাইয়ের বউ, ওকে সেই নজরেই দেখবে। নিজের ছোটো বোনও ভাবতে পারো যেমনটা কনাকে ভাবো। আসছি আমি, প্রচুর টায়ার্ড হয়ে আছি। রাত অনেক হয়েছে, সবাই যার যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”

হিমেল সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। জাকির পেছন থেকে চেঁচায়, হিমেল আমলে নেয় না।
জাকির রেগে বাবার দিকে তাকায়। জাকারিয়া মির্জা ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যান, ছেলের কান্ডে মেজাজ বেজায় চটে আছে।

সবাই যার যার রুমের দিকে এগিয়ে যায়। জাকির আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। ওর মস্তিষ্কে লামহা ছাড়া অন্য কোনো ভাবনা আসছেই না। ঘুরে ফিরে শুধু লামহা আর লামহা।
নাজমা মির্জা ছেলের পাশে এসে দাঁড়ান। ছেলেকে বোঝানোর মতো করে বলেন,

“দেখ জাকির, লামহার মধ্যে এমন কিছু নেই যার জন্য ওকেই বিয়ে করতে হবে।”

জাকির মায়ের দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বাইরের দিকে হাঁটা ধরে।

“এই রাতের বেলা কোথায় যাচ্ছিস? জাকির, দাঁড়া।”

নাজমা মির্জা ছেলের পেছন পেছন ছুটে এসেও ছেলেকে ধরতে পারেন না, জাকির বেরিয়ে গেছে।

হিমেল নিজের রুমের সামনে এসে দেখে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় কড়া নেড়ে বলে,

“লামহা।”

“ভাবী ঘুমিয়েছে।”

“দরজা খোল।”

কনা শোয়া থেকে উঠে দরজা খুলে দেয়।

“নিজের রুমে যা।”

কনা রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। হিমেল রুমের ভেতর ঢুকে করে দরজা লাগিয়ে দেয়। ঘুরে দাঁড়াতেই নজরে আসে লামহাকে। গভীর ঘুমে বিভোর হয়ে আছে। এত ঝামেলার মধ্যে ঘুমাচ্ছে কীভাবে?
কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। দুই হাত একসাথে করে গালের নিচে গুঁজে রেখেছে। ফ্যানের বাতাসে ছোটো ছোটো চুলগুলো উড়ছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে শরীর কোনো রকমে ঢাকা। ভীষণ আদুরে লাগছে দেখতে।
হিমেল অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত লামহার দিকে। ঘুমালে কাউকে এত আদুরে লাগে?

কাধের ব্যাগ সোফার উপর রেখে ফ্রেশ হয়ে আসে। হিমেল সত্যিই অনেক ক্লান্ত, আবার বাড়ির এই ঝামেলা।

ডিম লাইট অন করে মেইন লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে লামহার পাশে। অতিরিক্ত গরমে মাথা ব্যথাও করছে।
লামহা আর হিমেলের মাঝখানে বেশ অনেকটাই দূরত্ব। বড়ো ভাইয়ের কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। লামহাকে কিছুতেই আর জাকিরের সঙ্গে এক বাড়িতে রাখা যাবে না। জাকিরের চট্টগ্রাম ফিরতে আরও বিশ দিনের মতো দেরি আছে।

এই ছোট্টো মেয়ে ওর সঙ্গে আলাদা সংসার করবে কীভাবে? ওরো পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটবে। লামহাকে কলেজে ভর্তি করাতে হবে। কি একটা ঝামেলা।

ঘুম হালকা হয়ে আসতেই বাম কাত হতে ডান কাত হয় লামহা। কনা মনে করে হিমেলকে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে এসে। নাকে পারফিউমের ঘ্রাণ এসে বারি খায়। যাকে জড়িয়ে ধরেছে সেই মানুষটাকে লম্বা চওড়া লাগে, কনা তো এত লম্বা চওড়া না, আর না এমন কড়া পারফিউম ব্যবহার করে। কে এটা? মস্তিষ্ক সজাগ হয় লামহার। চোখ মেলে তাকাতে তাকাতেই হিমেলের গালে হাত ছোঁয়ায়। ঘন খোঁচা খোঁচা দাড়ির ছোঁয়া পেতেই চিৎকার করে শোয়া থেকে উঠে ছিটকে দূরে সরে যায়। ওর চিৎকার শুনে হিমেলের ঘুম পালিয়েছে। নিজেও আতঙ্কিত হয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে দ্রুত।
লামহা দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। আঙুল তুলে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,

“এ এই, কে আ আপনি? এই রুমে কী কীভাবে আসলেন?”

“এই মাঝরাতে এভাবে চেঁচাচ্ছো কেন? বাড়ির সবাই শুনলে কী ভাববে?”

“আব্বু, আব্বুউউউ…..।”

হিমেল তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নেমে লামহার মুখ চেপে ধরে। লামহা ওর হাত থেকে ছোটার জন্য উম উম করতে করতে ধস্তাধস্তি শুরু করে।

“আব্বুকে ডাকছো কেন? চুপ করে শান্ত হও, আমি হিমেল, তোমার হাজব্যান্ড।”

হিমেলের নাম শুনে শান্ত হয় লামহা।

“চেঁচাবে না কিন্তু আর।”

মাথা নাড়ে লামহা। হিমেল লামহার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়।

“আ আপনি এখানে কেন?”

“এখানে না থাকলে কোথায় থাকব?”

“না মানে কখন এসেছেন?”

“দশটার পর পরই।”

“কনা আপু কোথায়?”

“নিজের রুমে চলে গেছে।”

হিমেল সুইচ বোর্ডের কাছে এগিয়ে এসে মেইন লাইট অন করে। লামহার দিকে তাকিয়ে দেখে লামহার শাড়ির আঁচল নিচে পড়ে আছে। ডিম লাইটের আলোয় এতক্ষণ সেভাবে খেয়াল করেনি তার মধ্যে লামহার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ।
ফর্সা পেট কোমর উন্মুক্ত, লাল টকটকে ব্লাউজে মারাত্মক লাগছে।
লামহা হিমেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকায়। নিজের অবস্থা দেখে আবার চিৎকার করে ওঠে। হিমেল দৌড়ে এসে আবার মুখ চেপে ধরে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“বারবার এভাবে চিৎকার করছো কেন? সবাই শুনলে কী ভাববে? সকালে সকলের সামনে যাবো কীভাবে? চিৎকার না করে একদম চুপ করে থাকো।”

লামহা আগে নিজের শাড়ির আঁচল তুলে শরীর ঢেকে নেয় তারপর জোর করে হিমেলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
আঙুল তুলে শাসিয়ে বলে,

“একদম ছোঁবেন না আমাকে, দূরে থাকুন আমার কাছ থেকে।”

“ছুঁলে কী করবে?”

“একদম চোখ দুটো কানা করে দেব। আপনার নজর এত অসভ্য কেন?”

“খুলে টুলে দাঁড়িয়ে থাকবে আর আমি দেখলেই দোষ?”

হিমেলের কথা শুনে বাকরুদ্ধ লামহা। ও নাকি খুলে টুলে দাঁড়িয়ে আছে, রাগে গজগজ করতে করতে আবারো আঙুল তুলে বলে,

“একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।”

“উল্টাপাল্টা কথা বলার মুডেও নেই আমি। একটু ঘুমিয়েছিলাম, চেঁচিয়ে ঘুমের রফাঁদফা করে দিলে। এমনিতেই মাথা ব্যথা করছে, এখন আরও বেড়ে গেল।”

বলতে বলতে মেইন লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে আবার। লামহা একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর এখনো কেমন শব্দ হচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে হিমেলের ওই গভীর চাহনি ওর রূহ পর্যন্ত পড়ে ফেলেছে।

“ঘুমাবে নাকি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে সারারাত?”

“ঘুমাবো না আপনার মতো অসভ্য বদ লোকের সঙ্গে।”

“ওকে, না ঘুমালে, থাকো সারারাত দাঁড়িয়ে। আর চেঁচাবে না, আমি ঘুমাব।”

হিমেল উপুর হয়ে শোয়। বিছানার দিকে তাকিয়ে লামহার কান্না পাচ্ছে। ওই দৃষ্টি স্মরণ হতেই গা শিউরে ওঠে আবার।

চলবে…………..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply