তুষারিণী —- ৮
সানজিদাআক্তারমুন্নী
ইথান নূশাকে নিয়ে ‘আশ্যা ক্যাসেলে’ আসার পর এর মাঝেই কেটে গেছে সাতটি দিন। আসার দিনই ইথান নিজের কথায় নূশাকে একটি রেস্টুরেন্ট বুঝিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে যায়। গত ছয়দিন ধরে তার কোনো খোঁজ নেই, লোকটা একেবারে নিখোঁজ। নূশাও একপ্রকার শান্তিতেই আছে। সে নিজেই এখন সেই রেস্টুরেন্টের শেফ এবং মালিক। চারজন কর্মচারী নিয়ে বেশ জোরকদমেই নিজের কাজ আর বিজনেসটা শুরু করে দিয়েছে সে। দেখা যাক সামনে কী হয়!ঘড়িতে এখন সকাল দশটা। ড্রেসিংরুম থেকে বোরকা, হিজাব আর নিকাব পরে তৈরি হয়ে বের হয় নূশা। হাতে হাতমোজা গলাতে গলাতে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে নেয় সে।
কিন্তু রুমে পা রাখতেই ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে তার। ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে ইথান! সদ্য গোসল সেরে বেরিয়েছে সে। নূশা অবাক হয় ইথান কখন এলো? আর এর মধ্যেই গোসলও সেরে নিল? এত দ্রুত কীভাবে কী হলো? তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয় সে। ইথানকে দেখেও না দেখার ভান করে দরজার দিকে পা বাড়ায়। ইথান হাত বাড়িয়ে নূশার পথ আটকে দাঁড়ায়। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে, “কোথায় যাচ্ছো?”
নূশা অত্যন্ত বিরক্ত চোখে তাকায় ইথানের দিকে। তবে গলার স্বর স্বাভাবিক রেখেই জবাব দেয়, “সেটা আপনার জানার কোনো প্রয়োজন আছে কি? আমি আপনার স্ত্রী নই, তাই আপনাকে জবাবদিহি করতেও আমি বাধ্য নই।”
কথাটি শোনা মাত্রই ইথানের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে ওঠে। এক হ্যাঁচকায় নূশার কাঁধ থেকে ব্যাগটা টেনে নিয়ে ঘরের এক কোণে ছুড়ে মারে সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “হোয়াট দ্য ফাক! আমার সাথে গলাবাজি করছো? কাপড় খোলো, আজ কোথাও যাওয়া হচ্ছে না তোমার। আমার এখন তোমাকে বেডে চাই। টানা ছয়দিন কিছু করিনি। তোমার পিরিয়ডও তো শেষ হয়ে গেছে, তাই না? সো, নো মোর এক্সকিউজ। লেটস গো।”
ইথানের এই রুদ্রমূর্তি দেখে নূশা আর আগের মতো ভয় পায় না। সে একেবারে শীতল দৃষ্টিতে ইথানের দিকে একবার তাকায়। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা ব্যাগটা তুলে আবারও নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। কোনো কথা না বলে নীরবে ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। ইথান এবার পেছন থেকে খপ করে নূশার হাত চেপে ধরে। এক টানে তাকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে কড়া গলায় বলে, “আমার মেজাজ এমনিতেই ভালো নেই। তাই জোরাজুরি করার আগেই চুপচাপ আমার কথা শোনো।”
নূশা সজোরে ধাক্কা দিয়ে ইথানকে সরিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “আপনার মেজাজ ভালো নেই তো আমি কী করব? এই কয়দিন যাদের সাথে ছিলেন, তাদের কাছেই যান। গিয়ে মেজাজ ভালো করে আসুন। আপনার সাথে চুক্তি অনুযায়ী আমার শরীর আপনি শুধু রাতেই পাবেন, দিনে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। নিজে কন্ট্রাক্ট করে এখন নিজেই মানছেন না? আমার কাজ আছে এখন, আপনার দেওয়া ব্যথা সহ্য করার মতো সময় আমার নেই। আপনার প্রয়োজন হলে অন্য কারও কাছে যান।”
ইথান এবার আঙুল তুলে নূশাকে শাসায়, “বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না নূশা! নয়তো বোম মেরে রেস্টুরেন্টসহ তোমার ওই স্টাফগুলোকে উড়িয়ে দেব আমি! দেব উড়িয়ে? বলো, দেব?”
ইথানের এমন ভয়ংকর হুমকিতে নূশা কিছুটা দমে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলে, “ইথান, প্লিজ! একটু বোঝার চেষ্টা করুন, আমাকে এখন যেতেই হবে। আমি কথা দিচ্ছি, তিনটের আগেই চলে আসব।”
কিন্তু ইথান কিছুতেই তাকে যেতে দিতে রাজি নয়। সে নিজের জেদে অনড় থেকে বলে, “তোমার সময়ের সাথে মেলানোর মতো সময় আমার হাতে নেই। আমি একটু পরেই আবার বেরিয়ে যাব। জলদি এসো।”
কথাগুলো বলেই ইথান নূশার হাত টেনে ধরে। তাকে নিজের খুব কাছাকাছি এনে মুখের নিকাবটা খুলতে উদ্যত হয়। কিন্তু আজ আর আপস করে না নূশা। সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয় ইথানের গালে! ‘ঠাস’ করে শব্দ হয় চারপাশ জুড়ে। নূশা ঝাঁজালো গলায় বলে ওঠে, “আপনার সমস্যা কী, আমি বুঝলাম না! আপনার কি মেয়ের অভাব পড়েছে নাকি যে আমাকে নিয়ে টানাটানি করছেন? যান না সেই মেয়েগুলোর কাছে! আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন। কেন এলেন আপনি?”
থাপ্পড় খেয়ে ইথানের রাগ যেন মগজে চড়ে বসে। নিমেষেই নূশাকে ঘুরিয়ে তার দুই হাত পেছন দিকে মুচড়ে ধরে সে। এক হ্যাঁচকা টানে নূশার পিঠটা নিজের শক্ত পাঁজরের সাথে চেপে ধরে। তারপর ধীরে ধীরে নূশার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে এনে ফিসফিসিয়ে হিসহিস করে ওঠে, “হাত তুলছো আমার গায়ে? তোমার দেহের প্রতিটা জায়গায় আমার ঠোঁট বসার কথা, কিন্তু এর বদলে এখন আমার বেল্টের দাগ পড়বে। কোনটা চাও তুমি?”
নূশা প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “মারুন! মেরে ফেলুন আমাকে! আপনার এই অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করার চেয়ে মরে যাওয়া আমার জন্য অনেক উত্তম।”
কিন্তু কথাগুলো বলার পরই নূশা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায়। তার নড়াচড়া একেবারে স্তব্ধ হয়ে আসে। অর্থাৎ আজও সে ইথানের কাছে নিজের পরাজয় মেনে নিল। কী আর করার আছে তার? এখন যদি সে ইথানের কথা না শোনে, লোকটা তার সদ্য দাঁড় করানো রেস্টুরেন্টটা ধ্বংস করে দেবে। এই ছয়টা মাস কোনো রকমে কেটে গেলেই তো হয়! নূশা ধীরে ধীরে ইথানের গ্রাস থেকে নিজের হাত জোড়া ছাড়িয়ে নেয়। হিজাবের পিনগুলো একটা একটা করে খুলে ফ্লোরে ফেলে দেয়। তারপর নিকাব আর হিজাবটা খুলে ইথানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শীতল গলায় বলে, “নিন।”
ইথান নূশার বাঁধা চুলগুলো খুলে দেয়। সেই খোলা চুলে নিজের মুখ ডুবিয়ে গভীর শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “সিলেটি সুইটহার্ট! হার তো মেনেই নিলে, তাহলে এতক্ষণ এত ড্রামা করার কী দরকার ছিল?”
নূশা বিরক্তি নিয়ে ইথানের কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, “সরুন। আমার কাঁধে এভাবে উষ্ণ শ্বাস ফেলবেন না।”
ইথান বাঁকা হেসে নূশাকে একপ্রকার পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় কোলে, তারপর পা বাড়ায় বিছানার দিকে। নূশা একবারের জন্যও তার দিকে তাকায় না, দৃষ্টি সরিয়ে রাখে অন্যদিকে। নূশাকে বিছানায় শুইয়ে দিতে দিতে ইথান মুচকি হেসে বলে, “আমার মতো একজন পুরুষ তোমার কাছে আসতে চাইছে, আর তুমি এসব করছো!”
নূশা এই কথার কোনো উত্তর দেয় না। ইথান ধীরে ধীরে নূশার ওপর ঝুঁকে আসে। একে একে সরিয়ে দেয় তার গায়ের সমস্ত আবরণ। হঠাৎ ইথানের চোখ আটকে যায় নূশার হাতের দিকে। ফর্সা বাঁ হাতখানা মেহেদির গাঢ় লাল রঙে রাঙানো। ইথান একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তারপর ধীরলয়ে নূশার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “ইটস মেহেদি, রাইট?”
নূশা ইথানের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করতে করতে একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে বলে, “হ্যাঁ। এবার হাত ছাড়ুন।”
ইথান তার অ্যামেথিস্ট চোখের বাঁকা চাহনি মেলে ধরে নূশার দিকে। সুন্দরের গায়ে জমে থাকা অনীহার আবরণ আর বিরক্তমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলে, “কেন? সবকিছুই যখন আমার দখলে, তখন হাত ছুঁলে ক্ষতি কী? আর আমি তো শুনেছি বিবাহিত মেয়েরা স্বামীর জন্য হাতে মেহেদি পরে। তুমি কার জন্য পরলে?”
ইথানের প্রশ্নের জবাবে নূশার ঠোঁটে ফুটে ওঠে একরাশ তিক্ততার হাসি। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “আমার তো হাসব্যান্ড থেকেও নেই! আমি নিজের জন্যই পরেছি।”
ইথান এবার নূশার গলার নিচে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে গাঢ় করে কয়েকটা চুমু খায়। তারপর ভারী গলায় বলে, “আমি এই যে দিনের পর দিন তোমার সাথে ইনটিমেট হচ্ছি, এর তো একটা কারণ আছে, তাই না? একটা বৈধ মাধ্যম আছে। আর সেই হিসাব অনুযায়ী আমিই তোমার হাসব্যান্ড। ছয় মাসের জন্য হলেও আমি তোমার স্বামী। তাই এরপর থেকে আর কখনও বলবে না যে তোমার হাসব্যান্ড নেই।”
নূশা চরম তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দেয়, “শুধু শারীরিক সম্পর্ক থাকলেই স্বামী-স্ত্রী হওয়া যায় না মিনিস্টার সাহেব! স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা ভালোবাসার হয়। আপনি আমার কেউ না। আমি হলাম আপনার হাতের একটা কাঠের পুতুল মাত্র, যাকে যখন মন চায় আপনি ভোগ করেন।”
ইথান নূশার এই কথার কোনো উত্তর দেয় না। আসলে তার কাছে এর কোনো উত্তর নেইও। সে ধীরে ধীরে মজে যায় নিজের একতরফা পাগলামিতে।
নূশাও আর টুঁ শব্দ করে না। তার দুই চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। এই যন্ত্রণাদায়ক কষ্টের শেষ যে ঠিক কবে, তা তার জানা নেই।
টানা চার ঘণ্টার দমবন্ধ করা এক প্রহর শেষে গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসে নূশা। ভেজা চুল আর ক্লান্ত শরীরটাকে কোনোমতে সামলে নিয়ে তড়িঘড়ি করে তৈরি হতে শুরু করে সে। মনের ভেতরে একটা অদৃশ্য ঘড়ি যেন টিকটিক করে চলেছে। রেস্টুরেন্ট থেকে এতক্ষণে হয়তো একশোরও বেশি কল এসে জমা হয়েছে মুঠোফোনের স্ক্রিনে। কিন্তু ইথানের খেয়ালিপনার কাছে বন্দি থাকায় একটা কলও ধরার উপায় ছিল না তার। শরীরটা আজ আর তার নিজের নেই, আক্ষরিক অর্থেই সেটাকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা তীব্র ব্যথাগুলো প্রতিটি পদক্ষেপে জানান দিচ্ছে গত কয়েক ঘণ্টার শারীরিক ও মানসিক ধকলের কথা।
হিজাব আর নিকাব পরার জন্য ড্রেসিং রুমে পা রাখতেই থমকে যায় নূশার পা জোড়া। বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় ছ্যাঁত করে ওঠে। সামনেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে ইথান! পরনে তার আপাদমস্তক কালো রঙের রাইডিং গিয়ার। গায়ে চাপা কালো লেদার জ্যাকেট, পরনে কালো রাইডিং প্যান্ট, হাতে মানানসই কালো গ্লাভস আর পায়ে ভারী কালো বুটজুতো। এক হাতে শক্ত করে ধরা একটা কালো ফুল-ফেস হেলমেট। ইথানকে হঠাৎ এমন এক অচেনা, বুনো রূপে দেখে নূশার কপালে সূক্ষ্ম বিরক্তির ভাঁজ পড়ে, তবে মুখে টুঁ শব্দটিও করে না সে। লোকটার উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পাশ কাটিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, নিপুণ হাতে নিজের হিজাবটা গুছিয়ে নিতে শুরু করে। ঘরের জমাট নীরবতা ভেঙে ইথান ধীর, মাপা পায়ে এগিয়ে আসে নূশার ঠিক পেছনে। আয়নার স্বচ্ছ প্রতিবিম্বে সরাসরি নূশার শান্ত অথচ ক্লান্ত চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সে। স্বভাবসুলভ কর্তৃত্বের সুরে বলে ওঠে, “মিস সিলেটি, চলো আজ একটা রাইডে যাই। আজ আমি পুরোপুরি ফ্রি আছি।”
কথাটা কানে যেতেই নূশার ভেতরে চাপা ক্ষোভের দাবানল যেন দপ করে জ্বলে ওঠে। এমনিতেই এতটা সময় ইথান তাকে নিজের কাছে জোরপূর্বক আটকে রেখেছে, আর এখন কাজের এই চরম মুহূর্তে আবার সময় নষ্ট করার নতুন ফন্দি এঁটেছে! রাগকে প্রশ্রয় না দিয়ে হিজাবের পিনটা আটকে নিয়ে ইথানের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় নূশা। বরফশীতল দৃষ্টিতে লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলে, “আমার একদমই সময় নেই, ইথান। আমাকে রেস্টুরেন্টে যেতেই হবে। আপনি বরং আপনার এই রাইডে অন্য কাউকে নিয়ে যান।”
কিন্তু ইথান যেন অন্য ধাতে গড়া। নূশার কথায় দমার বদলে সে উল্টো এক পা এগিয়ে আসে। চোখের পলকে এক হাতে নূশার ছিপছিপে কোমর জড়িয়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের বুকের একদম কাছে নিয়ে আসে তাকে। দুজনের মাঝে দূরত্বের লেশমাত্র থাকে না। ইথান সামান্য ঝুঁকে নূশার মুখের কাছে এসে নিচু, ঘোর লাগা স্বরে বলে, “আজ তুমি আমাকে কোনো বাধা দাওনি, অযথা কান্নাকাটিও করোনি। তোমার এইটুকু বাধ্যতার জন্য তোমাকে একটু ছাড় দেওয়াই যায়। চলো, তোমাকে নিয়ে আমি তোমার রেস্টুরেন্টেই যাব। ওকে?”
এই উন্মাদ, জেদি লোকটার সাথে জোরজবরদস্তি করে বা বাধা দিয়ে যে কোনো লাভ নেই, তা নূশা এতদিনে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে। অযথা শক্তি ক্ষয় না করে সে তাই বাধ্য মেয়ের মতো শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ক্লান্ত স্বরে বলে, “আচ্ছা এবার ছাড়ুন আমাকে, নিকাবটা পরে নিতে দিন।”
রেডি হয়ে ক্যাসেল থেকে বের হয় কিছুটা সময় পর দুজন। মেইন দরজার কাছে আসতেই ইথান ফিসফিস করে বলে, “পেছনের গেট দিয়ে বের হতে হবে। কেউ দেখলে প্রবলেম আছে।”
ইথানের এই সতর্কতার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে। সে একজন মিনিস্টার, তার ওপর অনেকেরই ক্ষোভ। সিকিউরিটি ছাড়া এভাবে বের হওয়াটা রীতিমতো প্রাণের ঝুঁকি। তাই নূশাকে নিয়ে ক্যাসেলের পেছনের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ইথান। আগে থেকেই সেখানে রেডি করা আছে কালো রঙের ‘প্যানিগেল ভি-ফোর’ বাইক। হাতে থাকা ফুল-ফেস হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে বাইকে উঠে বসে ইথান। তারপর ইশারায় নূশাকেও উঠতে বলে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইথানের পেছনে বসে তার কাঁধে হাত রাখে নূশা। ইথান ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, “বোরখা ঠিক করে নাও, সুইটহার্ট।”
নূশা বোরখা ঠিক করতে করতে নিচু স্বরে জবাব দেয়, “জি, করেছি।”
গিয়ারে চাপ দিয়ে বাইক স্টার্ট করে ইথান। নূশার মনে তখন হাজারো শঙ্কা। ইথান একজন মিনিস্টার, তার কি এভাবে চলা উচিত? হেলমেটের কারণে কেউ চিনতে না পারলেও ভয়টা থেকেই যায়। নূশার চিন্তা নিজের জন্য নয়, ইথানের জন্য। ইথানের ওপর কোনো অ্যাটাক হলে সেও তো বাঁচবে না! এর ওপর ইথান বেশ স্পিডে বাইক চালাচ্ছে। নূশা এক হাতে ইথানের কাঁধ খামচে ধরে অন্য হাতে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, “একটু ধীরে চালান! এত জোরে কেন চালাচ্ছেন?”
স্পিড কিছুটা কমিয়ে ইথান বলে, “সমস্যা কী তোমার? বেডেও বলো ধীরে, রোডেও বলো ধীরে! সবসময় শুধু এক কথা কেন আওড়াও?”
নূশা রাগী গলায় বলে ওঠে, “কী শুরু করেছেন? এত অসভ্য কেন আপনি?”
“হোয়াট দ্য ফাক! আমি কী করলাম? যা সত্যি, তা-ই তো বললাম।”
নূশা চুপ করে যায়। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে এখন স্বপ্নের মতো লাগছে। এই প্রথম ইথান তাকে নিয়ে বেরিয়েছে, এই প্রথম তার সাথে একটু হলেও ভালো ব্যবহার করছে! রাতের শীতল বাতাস গায়ে মেখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি ছুঁয়ে যায় তার অন্তর।এই সুযোগে নূশা একটা আবদার করে বসে, “ইথান, আমার একটা কথা রাখবেন?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে কিছুটা বিচলিত হয়ে ইথান বলে, “কী?”
নূশা সাহস জুগিয়ে বলে, “আজ রাতটা আমাকে একটু ঘুমাতে দেবেন প্লিজ? কাল রাতেও রেস্টুরেন্টের কাজের জন্য ঘুমাইনি। আপনি গেলে তো আর আমার ঘুম হবে না জানি, তাও আজ একটু ছাড় দেবেন?”
নূশার আকুতি শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকে ইথান। তারপর শান্ত গলায় বলে, “আচ্ছা, দিলাম। আমি মানুষ খারাপ হলেও, কারো এমন আকুতি শুনে ফিরিয়ে দিই না।”
ইথানের কথায় ভরসা পায় নূশা। ধীরে ধীরে ইথানকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে মাথা এলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “মাথাটা রাখি?”
ইথানও এই আবদার ফেলতে না পেরে ছোট করে বলে, “রাখো।”
চোখ বুঁজে ইথানের পিঠে মাথা রাখে নূশা। মনে মনে ভাবে, ভালোবাসা নিয়ে হয়তো এটাই তাদের প্রথম এবং শেষ আলিঙ্গন।কিছুক্ষণ পর নূশার রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামে বাইক। নূশা ধীরে ধীরে নেমে পড়ে। ইথানও বাইক থেকে নেমে রেস্টুরেন্টের দিকে তাকায়। সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে নামটা ‘মিস সিলেট’। নামটা দেখে বেশ অবাক হয় সে। এই নামেই তো সে নূশাকে ডাকত! ইথান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নূশার দিকে তাকায়।নূশা দু-কদম এগিয়ে এসে বলে, “এই নামটা আপনার দেওয়া, তাই আপনার দেওয়া নামেই রেস্টুরেন্টের নামকরণ করেছি। এখানে সব সিলেটি জিনিসই থাকবে। ভেতরে আসবেন কষ্ট করে?”
ইথান মাথা নেড়ে রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। চারপাশটা বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে নূশা আর তার টিম। ভেতরে কাস্টমারদের ভিড়ও আছে। ইথানের মাথায় এখনো হেলমেট থাকায় কেউ তাকে চিনতে পারে না।নূশার সাথে একজন অচেনা পুরুষকে দেখে একজন স্টাফ জিজ্ঞেস করে, “ম্যাম, ইনি কে?”
নূশা একবার ইথানের দিকে তাকিয়ে স্টাফের দিকে ফিরে বলে, “আমার হাসবেন্ড।”
স্টাফরা ইথানকে ‘হ্যালো’ বলে, ইথান শুধু মাথা নেড়ে সায় দেয়। একপর্যায়ে ইথানকে কিচেনে নিয়ে যায় নূশা। সেখানে রান্না হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সিলেটি খাবার সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস। আর অন্য পাশে তৈরি হচ্ছে সিলেটের বিখ্যাত লিকার চা। চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করে ইথান জিজ্ঞেস করে, “এই ডিশগুলো কেমন চলছে নূশা? মানুষ পছন্দ করছে?”
নূশা আলতো হেসে বলে, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই চলছে। বিশেষ করে সাতকরার তরকারিটা।”
“সেটা আবার কী? মানে, খেতে কেমন এটা?”
“আপনাকে আজ রাতে আমি এটা রান্না করে খাওয়াব। খাবেন?”
“রাতে তো এক্সট্রা কিছু খেলে তোমাকে টেস্ট করার মুড চলে যাবে।”
নূশা মনে করেছিল ইথান একটু হলে ভালো হয়ে গেছে কিন্তু নাহ শয়তান শয়তানি কখনো ছাড়ে না।
চলবে,,,
Share On:
TAGS: তুষারিণী, সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তুষারিণী পর্ব ৪
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৩
-
তুষারিণী পর্ব ৩
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৪
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ২
-
তুষারিণী পর্ব ৭
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান গল্পের লিংক
-
তুষারিণী পর্ব ৫
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ১
-
তুষারিণী পর্ব ৬