তুষারিণী —- ৭
সানজিদাআক্তারমুন্নী
রাত সাতটা। জঙ্গলটা ডুবে আছে কবরের মতো স্তব্ধ তমসায়। আর জঙ্গলের ভেতরে নূশা ছুটছে। ও স্রেফ ছুটছে। কোনো গন্তব্য নেই, কোনো দিক নেই যা আছে তা শুধু বেঁচে থাকার এক চিলতি আকাঙ্ক্ষা। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা হাতুড়ির মতো পিটছে ওর বারংবার। নূশার মনে হচ্ছে প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে ওর ফুসফুসটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। সে ভেবেছিল, ইথানের থেকে পালিয়ে আসাটা মুক্তির পথ। ভেবেছিল, ইথানের সাম্রাজ্যে সে তো নগণ্য এক পুতুল, তাকে খোঁজার প্রয়োজন মনে করবে না ওই পাষাণ মিনিস্টার ইথান। কী ভয়ানক ভুল সে করেছে এ ভেবে! তার এই বোকামিই এখন তার মৃত্যু পরোয়ানা। ইথানের সীমানা থেকে পালানো আর নিজের পায়ে কুড়াল মারা দুটো একই কথা। গুমগুম শব্দে আকাশ কেঁপে উঠছে! কেন কাপছে? কাঁপার কারণটা কী? আসলে জঙ্গলের ওপরে নূশার মাথার ঠিক ওপরে চক্কর দিচ্ছে আট থেকে দশটা কালো হেলিকপ্টার। কেউ দেখলে মনে করবে একঝাঁক শিকারি চিল তাদের শিকারকে নজরে রাখছে। হেলিকপ্টারগুলোর সার্চলাইটের তীব্র বিমগুলো জঙ্গলের অন্ধকার চিরে ফেলছে, মাটি তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তাদের পলাতক আসামি নূশাকে।
নিচে, জঙ্গলের প্রতিটা কোণ ছেয়ে গেছে কালো ট্যাকটিক্যাল গিয়ার পরা গার্ড দিয়ে। তাদের হাতে ভারী অটোমেটিক রাইফেল, চোখে নাইট ভিশন গগলস। তারা নূশা কে বের করার জন্য টহল দিচ্ছে। এর মাঝে আবার মেগাফোনে ভেসে আসছে তাদের হাড়হিম করা ঘোষণা,
“মিসেস ইথান কোচুরি শেষ করুন। দয়া করে বেরিয়ে আসুন। আমাদের বস অপেক্ষা করা পছন্দ করেন না।”
নূশা ভয়ে জমে যাচ্ছে এগুলো শুনে। এই ঘোষণা কোনো অনুরোধ নয়, এ এক প্রচ্ছন্ন হুমকি তার কাছে। নূশা আজ ভারী অসহায় আজ ও দিকভ্রান্ত, দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অন্ধকার লতাপাতা তার পায়ে জড়িয়ে ধরছে, নূশার মনে হচ্ছে জঙ্গলটাও বোধহয় ইথানের হয়ে কাজ করছে। হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এগোতেই ধপাস করে বড় একটা গাছের গুঁড়িতে সজোরে ধাক্কা খেয়ে নূশা ছিটকে পড়ে মাটিতে। মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র যন্ত্রণা বিদ্যুৎচমকের মতো খেলে যায় ওর পায়ে। ধারালো কোনো কাঠ বা কাঁটা গেঁথে গেছে গোড়ালির গভীরে। টাটকা গরম রক্ত চুইয়ে পড়ছে হয়তো ভেজা মাটিতে। নূশা ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু শরীর অবশ হয়ে আসছে। আর শক্তি নেই। সে জানে, পালানোর আর কোনো রাস্তা নেই। মাটির সাথে মুখ গুজে নূশা হু হু করে কেঁদে ওঠে। কান্নার দমকে শরীরটা কাঁপছে তার।
নূশার মস্তিষ্কে এখন একটাই চিন্তা হাতুড়িপেটা করছে তা হলো সে কোনো সাধারণ পুরুষের হাতে পড়েনি। সে পড়ে গিয়েছে এক নির্দয়, পৈশাচিক ‘মনস্টার’-এর পাল্লায়, যার হাত থেকে মৃত্যুও হয়তো তাকে বাঁচাতে পারবে না। আকস্মিক এক তীব্র আলোয় চারপাশটা সাদা হয়ে যায় এ দেখে নূশার চোখের মণি সংকুচিত হয়ে আসে। এই আলোর ঝিলিকের ঠিক মাঝখান থেকে ভেসে আসছে ইথানের হাড়হিম করা শীতল কণ্ঠস্বর, “I wanna be your slave, I wanna be your master…”
এতটুকু গাইতে গাইতে ইথান পা ফেলে নূশার দিকে এগিয়ে আসে শিকারি চিতার মতো। নূশার ঠিক সামনে এসে সে যখন হাঁটু গেড়ে বসে, তখনো আলোর ঘোর নূশার চোখ থেকে কাটেনি। না কাটলে তার বুকের ভেতরটা বরফের মতো। জমে যাচ্ছে। ইথানের দিকে মুখ তুলে তাকায় নূশা অসহায় হরিণীর মতো নিরাস চোখ তাকায় তাকাতেই নূশা দেখে ইথানের ঠোঁটে ফুটে উঠছে এক পৈশাচিক, বাঁকা হাসি। নূশার চোখের অসহায় দৃষ্টি দেখে ইথান তিরস্কার করে গেয়ে ওঠে,”
“I wanna be your slave, I wanna be your master
I wanna make your heartbeat run like rollercoasters
I wanna be a good boy, I wanna be a gangster
‘Cause you could be the beauty and I could be the monster।”
গানের প্রতিটি শব্দ চাবুকের মতো নূশার শরীরে আছড়ে পড়ছে। ইথান নূশার ঠিক কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে, তার তপ্ত নিঃশ্বাস নূশার চামড়ায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে ও গানের শেষ অংশটুকু আওড়ায়,
“I love you since this morning, not just for aesthetic
I wanna touch your body, so fucking electric
I know you’re scared of me, you say that I’m too eccentric।”
এই গান আর ইথানের চোখের ওই আদিম হিংস্র চাহনি নূশা বুঝে যায়, আজ তার নিস্তার নেই। বাঘের ডেরায় একবার ধরা পড়ার পর মুক্তির কোনো পথ খোলা নেই। ইথান মানুষ নয়, একটা আস্ত সাইকো যদি সাইকো না হতো তাহলে এমন অবস্থা করত না। নূশা দুহাতে মাটি আঁকড়ে ধরে শরীরের সবটুকু জোর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তার শরীর বিদ্রোহ করছে তার সাথে আজ তার শরীরটাও তার বিরুদ্ধে। নূশার এই ব্যর্থ চেষ্টা দেখে ইথান তিরস্কারের সুরে বলে ওঠে, “সুইটহার্ট, ওঠার চেষ্টা করছ কেন? শুয়েই থাকো না। পালিয়ে যখন এখানে এসেছই, তোমাকে বরং এখানেই জ্যান্ত কবর দিয়ে যাই?”
ইথানের প্রতিটি কথা তীরের মতো নূশার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। আর পারছে না সে নিতে। সবটুকু মানসিক শক্তি হারিয়ে এবার নূশা ডুকরে কেঁদে ওঠে মিনতি করে বলে, “ইথান, প্লিজ! আমাকে ছেড়ে দিন। আপনার এই টর্চার আমি আর নিতে পারছি না।”
ইথান এবার সপাটে উঠে দাঁড়ায়। এক ঝটকায় নূশাকে মাটি থেকে টেনে দাঁড় করায় ইথানের হাতের আঙুলগুলো নূশার হাতে লোহার মতো বিঁধছে ইথান নূশার হাত শক্ত করে ধরে হিসহিসিয়ে বলে, “ছয় মাস! আগামী ছয় মাস তুমি শুধুই আমার সম্পত্তি, আর সেই দলিলে তুমি নিজেই সই করেছ। এখন চুপচাপ ক্যাসেলে চলো, পালানোর শখ আমি কড়ায়-গণ্ডায় মেটাচ্ছি।”
কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে নূশাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা হেলিকপ্টারের দিকে। এমনিতেই দৌড়াদৌড়িতে পা দুটো খাদরা খাদরা হয়ে গেছে কাটা বিঁধে। তারমধ্যে এখন পাথুরে জমিতে ঘঁষটে গিয়ে নূশার পায়ের চামড়া ছিলে রক্ত বেরোচ্ছে। হেলিকপ্টারের ব্লেডের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। নূশা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেলেও ইথানের মাঝে কোনো দয়া নেই। কপ্টারের সামনে এসে ইথান নূশাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় এবং একপ্রকার অবজ্ঞাভরে ভেতরে ছুঁড়ে মারে নূশাকে। নূশা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠতেই ইথান আঙুল উঁচিয়ে ধমক দেয়, “একটা আওয়াজও করবে না! একদম চুপচাপ বসে থাকো।”
নূশা দাঁতে দাঁত চেপে কান্না গিলে নেয়। একমাত্র আল্লাহ জানেন তার কপালে কী লেখা আছে। সে ভেবেছিল আজ বুঝি মুক্তি মিলবে, কিন্তু আজ সে মরণের দিকে আরও এক কদম এগিয়ে যায়। ইথানের ভায়োলেট রঙের ওই মারাত্মক চোখের দিকে তাকাতেই নূশা বুঝে গেছে, আজ তার জন্য চরম দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে। ভয়ে নূশা দ্রুত হাঁপাতে শুরু করে, তার বুকের ধুকপুকানি কপ্টারের ইঞ্জিনের শব্দের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।
ইথান ক্যাসলে নিয়ে এসেছে নূশা কে। নিয়ে এসে বেডরুমে নূশাকে বেডের হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে আধশোয়া করে বসিয়ে রাখা হয়েছে। নূশার গাল বেয়ে অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নূশা চিৎকার করছে,
“ইথান! প্লিজ, ওদের বলুন না আমাকে ছেড়ে দিতে! ইথাননন… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! আর বের করতে হবে না… প্লিজ!”
ইথান বেডের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তার ঠোঁটে ঝুলে আছে পরিচিত পৈশাচিক বাঁকা হাসি। সে কোনো কথা বলছে না বলে দুচোখ ভরে নূশার যন্ত্রণা উপভোগ করছে। দৃশ্যটা মর্মান্তিক নূশার পায়ের নরম তালু ক্ষতবিক্ষত, সেখানে গেঁথে আছে অসংখ্য ছোট ছোট কাঁটা। ইথানের নির্দেশে চারজন ফিমেল ডাক্তার ঘিরে আছে তাকে। কোনো প্রকার অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকা অবস্থায় দুজন ডাক্তার নূশার পা শক্ত করে চেপে ধরে আছে, আর বাকি দুজন চিমটা দিয়ে খুঁচিয়ে বের করছে এক একটি কাঁটা। ইথান একেই বলে শাস্তি। পালিয়ে যাওয়ার কিংবা তার অবাধ্য হওয়ার চরম মূল্য। প্রতিটি কাঁটা বের করার সময় নূশার মনে হচ্ছে, তার শরীর থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছে। জীবন্ত চামড়া শরীর থেকে টেনে ছিঁড়ে নিলে যেমন জ্বালা হয়, ঠিক তেমনই এক তীব্র দহন হচ্ছে তার পায়ে। সহ্যসীমা অতিক্রম করতেই নূশা হু হু করে কেঁদে ইথানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ইথাননন! আমি আর নিতে পারছি না… আমাকে এভাবে তিলে তিলে কষ্ট না দিয়ে একেবারে মেরে ফেলুন! ইথান, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে… ইথান!”
নূশার আর্তনাদ শুনে ইথানের হাসির রেখা আরও চওড়া হয়ে যায় সে ধীর পায়ে নূশার দিকে ঝুঁকে এসে খুব শান্ত গলায় বলে, “দোষ যখন করেছো, শাস্তি তো পেতেই হবে সুইটহার্ট। আর মৃত্যু? ওটা নিশ্চিত করার মালিক আল্লাহ, আমি ওসবের মধ্যে নেই।”
কথাটা শেষ করেই ইথান আচমকা নূশার ঠোঁট দখল করে নেয়। ঘরে উপস্থিত সবার সামনেই শুরু হয় তার আগ্রাসী চুম্বন। মুহূর্তের মধ্যে নূশার গগনবিদারী চিৎকার চাপা পড়ে যায় ইথানের ঠোঁটের নিচে। অদ্ভুত এক দ্বিমুখী নির্যাতনে জমে যায় নূশার শরীর। সে আসলে কোন যন্ত্রণায় কাঁদবে? পায়ের তালু চিরে কাঁটা বের করার যন্ত্রণায়? নাকি ইথানের এই দমবন্ধ করা চুম্বনের জবরদস্তিতে? একদিকে শরীর ছিঁড়ে যাওয়া ব্যথা, অন্যদিকে শ্বাসরোধ করা এক ভয়ানক অধিকারবোধ নূশা ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকে এক অন্ধকারে।
ডাক্তাররা নূশার দুপায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে, ব্যান্ডেজ বেঁধে বিদায় নিয়েছে। ঘর এখন নিস্তব্ধ, শুধু নূশার যন্ত্রণার রেশ রয়ে গেছে ঘরে। ডাক্তাররা চলে যাওয়ার পরপরই ইথান নূশাকে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে রেখে গেছে।
কিন্তু ফ্রেশ হবে কী করে নূশা? মেঝেতে পা ফেলার তো উপায় নেই। ক্ষতবিক্ষত পায়ের পাতা আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সারা শরীর যন্ত্রণায় আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ওয়াশরুমের দেয়ালে ভর দিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছে সে। প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে, অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে কোনোমতে নিজেকে পরিষ্কার করে নেয় নূশা। এর মধ্যেই আবার নতুন করে পা থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়তে শুরু করে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরে একটা বাথরোব জড়িয়ে ওয়াশরুমের ভেতরের ছোট কাউচটায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকে নূশা উঠে দাঁড়ানোর আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। অনেকক্ষণ পর ইথান ফিরে আসে। কোনো কথা না বলে নূশাকে পাঁজাকোলা করে বেডে নিয়ে আসে। বিছানায় নামিয়ে দিতেই নূশা তড়িঘড়ি করে কোমর পর্যন্ত ব্লাংকেট টেনে দেয় তীব্র আতঙ্কে যদি ইথান দেখে পা থেকে আবার রক্ত বের হয়েছে, তবে ওকে আবারও ওই ভয়ংকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে? আবারও জ্ঞান থাকা অবস্থায় ব্যান্ডেজ করার নরকযন্ত্রণা সইতে হবে?কিন্তু ইথানের তীক্ষ্ণ নজর এড়ানোর সাধ্য কি নূশার আছে? সে অনেক আগেই নূশার পায়ের ব্যান্ডেজে রক্তের দাগ লক্ষ্য করেছে। মেইড অনেক আগেই খাবার দিয়ে গেছে। ইথান খাবারের ট্রে-টা নূশার একেবারে কাছে রেখে শান্ত শীতল গলায় বলে, “নাও, খেয়ে নাও। আমি ব্যান্ডেজটা খুলে পা-টা আবারও ক্লিন করে দিচ্ছি।”
কথাটা শোনামাত্র নূশা আঁতকে ওঠে। করুণ চোখে ইথানের দিকে তাকিয়ে বলে, “না না… থাক! আমি নিজে করে নেব। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি আমাকে একটু রেহাই দিন, প্লিজ!”
ইথান কি আদৌ নূশার আকুতি শোনার পাত্র? সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নূশার পায়ের কাছে বসে। ব্লাংকেটটা একটানে সরিয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ খোলার প্রস্তুতি নিতে নিতে ইথান হুকুমের সুরে বলে,
“চুপচাপ খেয়ে নাও। আমি তোমার কথা মতো চলার মানুষ নই, সেটা ভালো করেই জানো। আমি যা বলি, তা-ই করতে হবে তোমায়। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো। আর যদি না খাও, তবে আগামী তিনদিন কোনো খাবার পাবে না।”
এমন হুমকি শুনে নূশার হাত কেঁপে ওঠে। সুপের বাটিটা কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে নেয় সে। শরীরটা দুর্বলতার চরম সীমায় পৌঁছেছে। না খেয়ে উপায় নেই, আর ইথান যখন বলেছে, তখন সে সত্যিই তিনদিন অভুক্ত রাখবে এ ব্যাপারে নূশার কোনো সন্দেহ নেই। একটু আগেই তো সে প্রমাণ পেয়েছে ইথানের মায়াদয়াহীন রূপের। ইথান নূশার পা থেকে রক্তমাখা ব্যান্ডেজটা সাবধানে খুলে নেয়। রক্ত মুছে আবারও মেডিসিন লাগিয়ে নতুন করে ব্যান্ডেজ করে দেয়। অদ্ভুতভাবে, এবার ইথানের স্পর্শে আগের মতো যন্ত্রণা লাগে না, হয়তো নূশার শরীর ব্যথায় অসাড় হয়ে গেছে। নূশার দুচোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে সুপের বাটিতে। সে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করছে না, শুধু যন্ত্রের মতো খেয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করে তো কোনো লাভ নেই, এখানে তার ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই।
নূশার খাওয়া শেষ হলে ইথান ট্রে-টা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেতেই নূশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। বালিশে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। কী হলো এসব? তার সাথেই বা কেন এমন হচ্ছে? সে তো নিতান্তই সাধারণ এক মেয়ে, এমন বড় বিপদ সে কীভাবে কাটিয়ে উঠবে? নূশার মন চাইছে এখনই এক দৌড়ে নিজের দেশে, নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু তা যে সম্ভব নয়। কতটা যন্ত্রণা, কতটা অপমান তাকে সহ্য করতে হচ্ছে, আর ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে তা ভেবেই তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
কান্না করতে করতেই একসময় নূশার দুর্বল শরীরটা বিছানায় এলিয়ে পড়ে। শরীর আর মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের ধকল সইতে না পেরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে।
ইথান ডিনার সেরে রুমে ফেরে, তার চোখেমুখে জটিল হিসাবনিকাশের ছাপ চারদিকে ক্রাইম আর ক্রাইম নিরাপত্তা নিয়ে বেশ চাপে আছে সে। রুমে ঢুকে সামনে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে বিছানায় লতিয়ে থাকা নূশার নিথর দেহটার ওপর।বিছানার দিকে চোখ পড়তেই ইথানের ক্লান্ত চোখের মণি স্থির হয়ে যায়। সাদা চাদরের ওপর নূশা শুয়ে আছে অসতর্ক, এলোমেলো হয়ে। নূশার ঘুমের মধ্যেই এক ধরণের অসহায় আত্মসমর্পণ আছে, যা দেখামাত্রই ইথানের ধমনীতে রক্তের গতি বেড়ে যাচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষেই উবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে এক আদিম, হিংস্র আকাঙ্ক্ষা। ইথানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ইচ্ছে করে, এই মুহূর্তেই নূশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার নরম শরীরটাকে দুমড়েমুচড়ে ফেলে নিজের পৌরুষের স্বাক্ষর রেখে দিতে। ইচ্ছে করে, মেয়েটার তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ দুটোতে ভয় আর বিস্ময় জাগিয়ে তুলে সারারাত ধরে নিজের তৃষ্ণা মেটাতে। কিন্তু আজ ইথান নিজের ভেতরের এই দানবটাকে শেকল পরায়। অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে সে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই কাজ করে আজ। কোনো ঝড় তোলে না, কোনো তান্ডব চালায় না। খুব ধীর পায়ে, শিকারি বিড়ালের মতো নিঃশব্দে ইথান বিছানায় উঠে আসে। ঘুমন্ত নূশা টের পায় না কিছুই। উঠে এসেই ইথান আলতো করে নিজের ভারী শরীরটা এলিয়ে দেয় নূশার পাশ ঘেঁষে। তারপর খুব সন্তর্পণে, মনে হচ্ছে কোনো দামী কাঁচের পুতুল স্পর্শ করছে, সেভাবে নূশার বুকের ভাঁজে নিজের মুখটা গুঁজে দেয়। দুহাতে নূশাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, নূশা যাতে কোনোভাবেই ফসকে যেতে না পারে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এ এক গভীর ভালোবাসার নিশ্চুপ দৃশ্য। মনে হবে, প্রেমিকের আদরে প্রেমিকা ঘুমাচ্ছে। তবে বাস্তবে এই স্পর্শে প্রেমের উষ্ণতা নেই, আছে শুধু ইথানের নিজের স্বস্তি খোঁজার স্বার্থপরতা। নূশার এই নমনীয় শরীরটা যখন ইথানের কঠিন পেশীবহুল দেহের নিচে চাপা পড়ে থাকে, তখনই ইথানের মস্তিষ্কের অস্থির নিউরনগুলো শান্ত হয়।
নূশার চুল আর শরীর থেকে ভেসে আসা এই পরিচিত গন্ধ একটু মিষ্টি, একটু বুনো থেকেই ইথান বুক ভরে শ্বাস নেয়। এই গন্ধটা তার কাছে ক্লোরোফর্মের মতো কাজ করে। এক নিমিষেই সব ক্লান্তি ধুয়েমুছে ইথানকে ঠেলে দেয় গভীর ঘুমের দেশে। ইথান বোঝে, এই মেয়েটা তার কাছে এখন আর মানুষ নয়, বরং জীবন্ত এক ঘুমের ওষুধ।
এই সামান্য কয়েক ঘণ্টার নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্যই তো ইথান এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে। তছনছ করে নূশাকে খুঁজে এনেছে নিজের খাঁচায়। এই অধিকারটুকু, এই শরীরটুকু আর এই গন্ধটুকু ছাড়া নূশার প্রতি ইথানের আর কোনো মোহ নেই, কোনো দায়বদ্ধতা নেই। নূশা কি ভাবছে, তার কি কষ্ট হচ্ছে, কিংবা সে আদৌ ইথানকে চায় কি না এসব ভাবলৌকিক চিন্তা ইথানের নেই। তার শুধু প্রয়োজন নিজের প্রশান্তি। নূশা জাহান্নামে যাক, তাতে ইথানের কিছু আসে যায় না শুধু যতক্ষণ সে ইথানের বাহুডোরে বন্দী আছে, ততক্ষণ তার পৃথিবী শান্ত।এই আলিঙ্গনে কোনো প্রেম নেই, নেই কোনো হৃদয়ের টান। এটা ঠিক তেমনই যেমন কোনো তৃষ্ণার্ত মানুষ এক আঁজলা জল পেলে স্বস্তি পায়। ইথানের কাছে নূশা কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং তার বিলাসবহুল জীবনের এক চরম প্রয়োজনীয় ‘বিলাসব্যসন’। নূশার নরম দেহের ছোঁয়া আর তার অস্তিত্বের সুবাস না পেলে ইথানের মস্তিষ্ক শান্ত হয় না, হাজারো দামি বালিশ আর গদি তাকে ঘুম পাড়াতে পারে না।এই বদ্ধ ঘরে নূশাকে নিজের শরীরের নিচে পিষ্ট করে রাখার এক পাশবিক প্রশান্তিতে ইথান তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
চলবে,,,,
কেমন হলো জানাবেন।
Share On:
TAGS: তুষারিণী, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৯
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৬
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৫
-
তুষারিণী পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১২