তুষারিণী ——— ২
সানজিদাআক্তারমুন্নী
সকাল সাতটা বাজে, বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা। বিছানায় নূশা শুয়ে আছে ইথানের পাশে। চোখে ঘুম আসছে, কিন্তু চিন্তায় ঘুমাতে পারছে না। কাল সারা রাত ইথান যখন পেরেছে, যেভাবে পেরেছে, যা ইচ্ছে নূশার সাথে করেছে। ফজরের আযানের রিংটোনে নূশার ফোন বাজার পর ইথান নূশাকে ছেড়েছিল। নূশা সেবারও অনেক কষ্ট করে ফ্রেশ হয়ে বসে বসে ফজরের নামাজটা পড়েছিল দাঁড়িয়ে যে নামাজ পড়বে, সেই শক্তিও ছিল না তার।
বড্ড ক্ষিধেও পেয়েছে নূশার, কিন্তু কী খাবে? নিচে গিয়ে খাবে, সে অবস্থা নেই তার। এক গ্লাস পানি খেয়েছে শুধু। ইথান উঠে ফ্রেশ হয়ে বেডশিট চেঞ্জ করে শুয়ে পড়ে একপাশে। নূশা নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে ছিল বেশ কিছুক্ষণ, তারপর উঠে এই শুয়েছে। এক বেডে একই ব্লাঙ্কেটের নিচে তাকে এই মানুষরূপী পশুটার সাথে থাকতে হচ্ছে।
নূশা শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছে শুধু। সকাল থেকে ঘুম আসছে না। এদিকে ইথান তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েছে প্রায়। সে খুব কমই ঘুমায়। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তার। হাড়মড়ো খেয়ে পাশ ফিরে দেখে, তার পাশে নূশা শুয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। নূশাকে দেখেই ইথান নূশার কাছে চলে যায় ঘেঁষে ঘেঁষে আর তার ওপর ঝুঁকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।নূশা ইথানকে আবারো নিজের কাছে দেখে ঘৃণা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “একটু মায়া হয় না আপনার আমার প্রতি? আমি তো মানুষ, কত সহ্য করব আপনার এই শারীরিক নির্যাতন?”
ইথান নূশার কথায় কোনো রিপ্লাই দেয় না। চুপচাপ নূশার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিয়ে নূশার দুই হাত বেডের সাথে চেপে ধরে। নূশার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে পানি। রাত থেকে কান্না করতে করতে গলা ভেঙে গেছে তার। এখন আবার ইথান তাকে মরণের মুখ দেখাবে। নূশা ছটফট করতে শুরু করে। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ইথানের দুই কাঁধে ধাক্কা দিয়ে তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে বলে, “আমার কাছ থেকে সরুন বলছি, জানোয়ার একটা! আমার শরীর এটা, সরকারি নয়। যখন ইচ্ছে তখন খুবলাবেন? সরুন!”
ইথান নূশার কথা শুনে ঠান্ডা হেসে নূশার থেকে ব্লাঙ্কেট সরিয়ে নিতে নিতে বলে, “সহ্য হচ্ছে না যখন ডিভোর্স দিয়ে দাও, চলে যাও। আর নয়তো সহ্য করো, আমি এমনি উন্মাদ।”
নূশা ইথানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “আহ! আমার কাছ থেকে সরুন, আমার ব্যথা করছে। সারা শরীরে শিং মাছের কাঁটা ফোটালেও এত কষ্ট হয় না হয়তো। সারা রাত তো যা ইচ্ছে করলেন, ছাড়ুন এখন।”
ইথান নূশার কথায় পাত্তা দেয় না। চুপচাপ নূশার দুই গালে হাত রেখে তার গলায় চুমু খেতে থাকে। নূশা বেড কাভারটা খাবলে ধরে দুই হাতে আর চিৎকার করে ওঠে, “আমাকে ছাড়ুন ইথান! আমাকে ছাড়ুন!”
ইথান নূশার কথা শোনে না। সে নূশাকে এবার আদিম পরশে নিজের সাথে মিশাতে শুরু করে। নূশা বাচ্চাদের মতো কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে, “আ আপনার ভালো কোনো দিন হবে না। এসবই করার ছিল যখন বিয়ে করলেন কেন? কল গার্ল দিয়ে করিয়ে নিতেন!”
ইথান নূশার কানে কানে এসে বলে, “কল গার্লদের তোমার মতো সুন্দর বডি তো নেই। আর তোমার মতো পবিত্র তো তারা নয়। তুমি আমার একার, কেউ তোমাকে ছোঁয়নি, আমিই প্রথম এবং শেষ। কিন্তু তারা তো সরকারি। তারা যদি তোমার মতো হতো, তাহলে তাদের দিয়েই করতাম। কিন্তু এটাই লাস্ট আজকের মতো। আই নো একটু বেশিই হয়ে গেছে প্রথমবার, তার ওপর বাঙালি, নিতে পারছ না, এসবে অভ্যস্ত নও।”
এটা বলে নূশার ঠোঁটে আবার নিজের ঠোঁট বসিয়ে দেয়। নূশা শুধু তার ভায়োলেট রঙের চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলতে থাকে।
অনেকক্ষণ পর…
ইথান গোসল সেরে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে সুট-কোট পরা নিয়ে ব্যস্ত। নূশা গোসল করে রুমে রাখা সোফার এক কোণে দেশ থেকে নিয়ে আসা একটা পাতলা নকশিকাঁথা গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। সারা শরীর কাঁপছে, হয়তো জ্বর আসবে। চোখ-নাক বেয়ে পানি পড়ছে তিন-তিনবার এই ঠান্ডায় গোসল করায়। নূশা আপন মনে বসে আছে। ক্ষিধায় পেট ছিঁড়ে যাচ্ছে। এতটা টর্চার শরীর নিল, ক্ষিধে তো স্বাভাবিক লাগবেই।
ইথান ওয়াচ হাতে লাগাতে লাগাতে নূশার দিকে এগিয়ে আসে আর বলে, “কী হলো? নিচে যাও, ব্রেকফাস্ট করো গিয়ে। এভাবে বসে আছো কেন?”
নূশা চোখে পানি নিয়ে ইথানের দিকে তাকায় আর বলে, “আমার হাঁটার শক্তিটাও কেড়ে নিয়েছেন, এখন বলছেন নিচে যেতে? তিন-তিনবার এই ঠান্ডার মধ্যে শাওয়ার নিয়েছি।”
“তো কী হয়েছে? ম্যারেড লাইফে এগুলো স্বাভাবিক। আমিও তো নিয়েছি।”
“এগুলো স্বাভাবিক না! এগুলো নির্যাতন, নির্যাতন!”
ইথান নূশার কথায় এবার হিম সুরে বলে, “অভিয়াসলি। শোনো, তোমার আমার সংসার আর পাঁচটা সংসারের মতোই হবে। কিন্তু তুমি কখনো আমার কাছ থেকে সম্মান, ভালোবাসা পাবে না। আমি আগেই বলে রাখলাম, তুমি আর তোমার শরীর হবে আমার প্রয়োজন। কথা ক্লিয়ার? এখন এই প্রসঙ্গ আর টেনো না প্লিজ।”
নূশা ইথানের দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু। কী বলবে এই মুহূর্তে বুঝে উঠতে গিয়েও বুঝতে পারে না। মানুষ এমনও হয়? বিয়ে করল, ভোগ করছে, অথচ ভালোবাসবে না, সম্মান দিবে না এ কেমন কথা? নূশা কিছু বলবে তখনি দরজায় নক করেন ইথানের মা মাইরা। ইথান গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়।
মাইরা ঘরে প্রবেশ করতে করতে বলেন, “কী রে, তোরা এখনো ডাইনিংয়ে গেলি না যে?”
এটা বলে নূশার দিকে তাকান। নূশাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে তিনি তার দিকে এগিয়ে যান আর বলেন, “কী হয়েছে নূশা? শরীর খারাপ করছে মা? এভাবে বসে আছো যে?”
নূশা চোখ নামিয়ে নেয়। ইথান তাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, “কী হবে মম? ওর সাথে কি আমার কিছু করার রাইট নেই? ও এসব নিয়ে কান্নাকাটি করছে। এ জন্যই আমি নিজেদের কালচারের মতো কাউকে চেয়েছি, কিন্তু তোমরা তো বুঝলে না।”
নূশা লজ্জায় চোখ বুজে নেয়। এই মানুষটা কত শয়তান যে নিজের এসব কথা নিজের মাকে বলছে! মাইরা সবটা বুঝতে পারেন। তিনি নূশার মাথায় হাত রেখে বলেন, “তুই বুঝবি না? ও এসবে অভ্যস্ত নয়, এসবের মুখোমুখি কোনো দিন হয়নি। কী হাল করেছিস ওর! ইথান, এসব কিন্তু ঠিক না বাবা।”
ইথান কোনো কথার তোয়াক্কা না করে বলে, “মম, আমি কখনো কিছু স্যাক্রিফাইস করিনি আর করবও না। তুমি তোমার সিলেটি বউমাকে এটা বলে দাও যেন আমাকে সামলে নেওয়ার ক্ষমতা আয়ত্ত করে নেয়।”
মাইরা ইথানের কথায় আর কিছু বলেন না। তিনি নূশাকে বলেন, “মা ওঠো তো। আমি জানি একটু যন্ত্রণা হবে, কী করবে বলো তো? উঠে যাও মা।”
এটা বলে তিনি নূশাকে দাঁড় করিয়ে নেন। তবে থেমে গিয়ে ইথানের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওর এই অবস্থা তোর জন্য। তুই ওরে কোলে নিয়ে নিচে ডাইনিংয়ে যা।”
ইথান মায়ের কথায় আকাশ থেকে পড়েছে এমন ভাব ধরে বলে, “মম, এসব ন্যাকামিতে আমি নেই। তুমি বউমা করে এনেছ, তুমি কোলে তুলে নিয়ে যাও।”
নূশা এগুলো শুনে ধীর কণ্ঠে বলে, “না আন্টি থাক, আমি যেতে পারব।”
‘আন্টি’ শুনে মাইরা তার দিকে তাকিয়ে বলেন, “আন্টি কী আবার? মম বা আম্মা ডাকো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, আম্মু।”
মাইরা ইথানকে আবারো বলেন। ইথান না পারতে, ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও এসে নূশাকে কোলে তুলে নেয়। মাইরা চুপচাপ বেরিয়ে যান। ইথান নূশাকে কোলে নিয়ে নূশার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি তো মহা যন্ত্রণা হয়ে যাচ্ছো মিস সিলেট! কথায় কথায় কোলে উঠে যাও। এই অ্যাশারের কোল এত সস্তা না।”
নূশা ইথানের দিকে তাকায় না। অন্যদিকে তাকিয়ে বিরক্তি ও ঘৃণা প্রকাশ করে বলে, “আপনার কোলে ওঠার শখও নেই আমার। নামিয়ে দিন না পারলে।”
ইথান নূশার থেকে নজর সরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, “মুখে মুখে তর্ক করবে না নেক্সট টাইম। এটা আমি অপছন্দ করি ।”
নূশা ইথানের কথায় চুপ হয়ে যায়, কিছু বলতে গিয়েও বলে না। ইথান নূশাকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। পুরো অ্যাশার ক্যাসেলের শতখানেক মেড, অ্যাশার ফ্যামিলির গার্ড ও অ্যাশার ফ্যামিলি দেখছেন। নূশার লজ্জায় বিষ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। ছিঃ ছিঃ, কী কাণ্ড হলো!
নূশাকে ইথান ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড় করায়। তখনি ইথানের ছোট চাচার ছেলে এজার, যে কিনা তাদের বিয়েতে ছিল না, সে নূশা আর ইথানকে দেখে এগিয়ে এসে হেসে বলে ওঠে, “কী অবস্থা ইথান ব্রো? বিয়ে করলে, একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না? বাইরে ছিলাম বলে এতটা পর করে দিলে?”
ইথান এজারের দিকে তাকায় আর কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, “তোকে বলে কী করতাম? তুই এসে আমার বদলে বিয়ে করতি নাকি?”
এজার নূশার দিকে তাকায়। ইথানের কথায় নূশা ওর চোখের অস্বস্তিকর চাহনি দেখে ইথানের পিছনে কিছুটা সরে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে নেয়। ইথানের কথার উত্তরে এজার বলে, “যদি আসতাম আর অনুমতি পেতাম, অবশ্যই করতাম।”
এতটুকু বলে কথা ঘোরাতে নূশার দিকে এগিয়ে যায় আর তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “বাই দ্য ওয়ে, আমি এজার। থিও এজার। আপনার হাজব্যান্ডের চাচাতো ভাই।”
এটা বলে সে নূশার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় হ্যান্ডশেক-এর জন্য। নূশা এটা দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে মুচকি হেসে দু-কদম পিছনে সরে যায়। এ দেখে ইথান এজারের সাথে নিজেই হাত মিলিয়ে নিয়ে বলে, “আমি ছাড়া ওকে কেউ ছুঁতে পারবে না, এটা ওর চাওয়া। তাই হ্যান্ডশেক করার দরকার নাই, আমি করে নিলাম তোর হয়ে।”
এজারের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ছুড়ে দিয়েই ধপ করে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে ইথান। তার ঠিক পাশেই আড়ষ্ট হয়ে বসে নূশা। সদ্য বিবাহিত বধূ সে, অথচ তার বসার ভঙ্গিতে নেই কোনো উচ্ছ্বাস, বরং আছে এক অজানা সংকোচ। সামনের খাবারগুলোর দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইথান হঠাৎ তার বাবা, মিস্টার আইভারের দিকে ফেরে কণ্ঠে কোনো ভণিতা না রেখেই সে বলে, “ড্যাড, আমি আজই ক্যাসেল ছাড়ছি। আগামী চার-পাঁচ মাসের জন্য আমাকে বাইরে থাকতে হবে।”
আকস্মিক এই ঘোষণায় ডাইনিং টেবিলে বজ্রপাত হয় বলতে গেলে। কাঁটা-চামচের শব্দ থেমে যায় মুহূর্তেই। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে ইথানের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মিস্টার আইভার বলে ওঠেন, “কী বলছ তুমি? গতকালই তোমার বিয়ে হলো, আর আজ তুমি বলছ চলে যাবে?”
বাবার কথার রেশ কাটতে না কাটতেই ইথানের দাদী, মিসেস এমা, কিছুটা বিরক্তি ও কিছুটা আদেশের সুরে বলেন, “তাতে কী হয়েছে? যা না! তোর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যেখানে ইচ্ছে, সেখানে যা!”
দাদীর কথায় ইথানের চোখে-মুখে বিরক্তি আর তিক্ততা ফুটে ওঠে। সে কড়া গলায় উত্তর দেয়, “গ্রেনি, আমি কোনো সাধারণ চাকরি করি না। আমি ডিফেন্স সেক্রেটারি। দেশের নিরাপত্তার বিশাল একটা অংশ আমার কাঁধে। এখন যদি আমি স্ত্রীকে আঁচলে বেঁধে ঘুরে বেড়াই, তবে দেশের নিরাপত্তা শিকেয় উঠবে। নূশা এখানেই থাকুক। আমি তো আর সারাজীবনের জন্য যাচ্ছি না, কাজ শেষেই ফিরে আসব।”
একটু থেমে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইথান আবার বলে, “সব কিছুতেই তো জোর খাটিয়েছ তোমরা, অন্তত এখন আর করো না।”
কথাটা শেষ করেই ইথান সশব্দে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর গটগট করে ডাইনিং রুম ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। তার চলে যাওয়ার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে, সে কতটা ক্ষুব্ধ।
পেছনে নূশা পাথরের মতো বসে থাকে। সবার সামনে এই অনাদরে নিজেকে তার বড্ড অপমানিত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে মনে হয় এই বাড়িতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাইরা আর ইথানের ছোট বোন এভা দ্রুত নূশার কাছে এগিয়ে আসে। নূশার কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় এভা বলে, “মন খারাপ কোরো না নূশা, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নূশা কোনো কথা বলে না, উত্তরে শুধু যন্ত্রের মতো মাথা নেড়ে চুপচাপ ব্রেকফাস্ট করতে শুরু করে। খেতে তার একদমই ইচ্ছে করছে না, অথচ পেটে রাক্ষুসে ক্ষিধে। প্রতিটি নলা খাবারের সাথে সে এক দলা করে অপমান গিলে নিচ্ছে। ক্ষিধে মিটছে ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর জমছে এক পাহাড়সম অভিমান।
ইথান রুমে ঢুকে কোনো রকম কালক্ষেপণ করে না। সুটকেসটা খুলে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে নিতে শুরু করে। তবে সেখানে পোশাক-আশাকের চেয়ে স্থান পাচ্ছে জরুরি নথিপত্র আর কিছু গোপন ডকুমেন্টস। হাতের কাজের ফাঁকেই কানে ফোনটা ধরে সে নিচু কিন্তু কঠোর স্বরে কাউকে বলছে,
“আমার বিয়ের আসল উদ্দেশ্যই তো ছিল এটা। নয়তো এমন ‘থার্ডক্লাস’ মেয়েদের কেউ বিয়ে করে? শোনো, আমি আসছি। এসেই মিশন কমপ্লিট করব। শুধু খেয়াল রেখো, ইন্টারপোল যেন কোনোভাবেই আমার টিকিটি ছুঁতে না পারে।”
কথা শেষ হওয়ামাত্রই খট করে ফোনটা কেটে দেয় সে।
ঠিক তখনই খাওয়া শেষ করে ধীর পায়ে রুমে ঢোকে নূশা। ওর হাঁটার গতিতে এক ধরণের জড়তা, চোখেমুখে বিষণ্নতা। ইথানের ব্যস্ততার সামনে গিয়ে সে নিঃশব্দে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, “আপনি… আপনি কি আমার জন্যই চলে যাচ্ছেন? প্লিজ, এরকম করবেন না। আমি আপনার কাছে স্ত্রী হিসেবে কোনো অধিকার চাই না, কিন্তু এভাবে হুট করে চলে যাবেন না। সবাই ভাবছে আমার কোনো দোষেই আপনি চলে যাচ্ছেন।”
ইথান নথিপত্র গোছানো থামিয়ে নূশার দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক বিদ্রূপাত্মক বাকা হাসি। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “সেটাই তো, তোমার জন্যই তো চলে যাচ্ছি। আমার ইচ্ছে হচ্ছে তাই যাচ্ছি। আমাকে আটকানোর তুমি কে? ভুলেও সাহস দেখানোর চেষ্টা করো না, পরিণাম কিন্তু খুব খারাপ হবে।”
ইথানের ধমকে নূশা মুহূর্তের জন্য কুঁকড়ে যায়, মাথা নিচু করে ফেলে অপমানে। কিন্তু পরক্ষণেই এক বুক হাহাকার নিয়ে সে ইথানের চোখের দিকে তাকায়। সেই চোখের চাহনিতে আছে চূড়ান্ত আকুতি সে অনেকটা আর্তনাদের মতো করে বলে, “আমার ভালোবাসা চাই না, আপনার কাছ থেকে সম্মানও চাই না। আপনি যা ইচ্ছে আমার সাথে করুন। আমার শরীর চাই আপনার? নিন, কোনো সমস্যা নেই। যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার করুন, তবুও… তবুও প্লিজ এভাবে আমাকে ফেলে যাবেন না। আমি বর্তমানে খুব অসহায় অবস্থায় আছি, আমাকে আর অসহায় বানাবেন না প্লিজ!”
নূশার এমন আত্মমর্যাদাহীন সমর্পণের কথা শুনে ইথান কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়। সে নূশার আপাদমস্তক একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর এক নিঠুর, তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, “তোমার শরীরের জন্য আমি এখানে তোমার সাথে পড়ে থাকব এটা ভাবলে কী করে? তুড়ি মারলেই এমন শরীর একশোটা আসবে আমার কাছে। তুমি তোমার মতো থাকো। আমি গেলাম।”
এটুকু বলে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় তারপর পিছনে চেয়ে বলে, ” সাবধানে থেকো যদি দেখি অন্য পুরুষদের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছো তাহলে জেন্ডার চেঞ্জ করিয়ে দিব!”
কথাটা ছুঁড়ে দিয়েই হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় ইথান, নূশাকে একটি শব্দ উচ্চারণের সুযোগটুকুও দেয় না। নূশা যেন পাথর হয়ে যায়, স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে নিজের জায়গায়। মস্তিষ্ক কাজ করছে না তার এখন কী করবে সে? ইথানের চলে যাওয়ার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে, এই প্রস্থান সাধারণ নয়। তবে কি তার ভবিষ্যৎ এখানেই অন্ধকার? সংসারের প্রথম দিনটি পার হতে না হতেই কি সব শেষ হয়ে গেল? এ কেমন নির্মম পরিহাস ভাগ্যের!
এক অজানা আশঙ্কায় নূশা ছুটে যায় বেলকনিতে। নিচে তখন সাজসাজ রব। ইথান তা কালো এসইউভি-তে উঠে বসে। মুহূর্তের মধ্যেই তাকে কর্ডন করে রাখা পনেরোটি রেঞ্জ রোভারের বিশাল বহর ক্যাসেলের সদর গেট পেরিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায়। নূশা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই ধুলো ওড়া পথের দিকে। তার স্থির দুচোখে একটাই প্রশ্ন কী আছে তার কপালে?
চলবে,,,
Share On:
TAGS: তুষারিণী, সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE