Golpo কষ্টের গল্প তুষারিণী

তুষারিণী পর্ব ১১


তুষারিণী — ১১

সানজিদাআক্তারমুন্নী

ভোরের আলো এখনো পুরোপুরি ফোটেনি, জানালার ভারী পর্দার ফাঁক গলে শুধু একটা আবছা নীলাভ আভা ঘরের ভেতর উঁকি দিচ্ছে। ঘরের বিছানার ঠিক মাঝখানে ইথান নূশাকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে আছে। নূশা তার বলিষ্ঠ বাহুডোরে প্রায় বন্দী, বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। গত রাতের কথাগুলো মনে পড়লে নূশার কেমন যেন একটা ক্লান্তি ভর করে রাতভর আবোলতাবোল অন্তত একশোটা কথা বকেছে ইথান, তারপর একসময় নূশাকে জাপটে ধরে বুকে নিয়ে তলিয়ে গেছে গভীর ঘুমে।
ঘুমের ঘোরেই ইথান অস্থির হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে। কখনো নূশার কপালে, কখনো গালে এলোমেলো চুমু খায়। কখনো এপাশ, তো কখনো ওপাশ নূশাকে তুলোর মতো নেড়েচেড়ে নিজের সুবিধামতো জড়িয়ে নিয়ে ঘুমাচ্ছে সে। নূশার কাছে অবশ্য এসব মোটেও নতুন কিছু নয়। ইথান তাকে কাছে পেলে এভাবেই আদরে-অত্যাচারে পিষে মারে। ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত হয়ে দু-একবার ইথানকে মৃদু বকা দেয় নূশা, কিন্তু ইথানের তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই, সে আবার তলিয়ে যায় ঘুমে। এভাবেই টানাপোড়েনে কেটে গেছে গোটা রাত।
ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসতেই ইথানের ভারী বাহুপাশ থেকে অত্যন্ত সন্তর্পণে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় নূশা। অজু করে ধীরপায়ে জায়নামাজে দাঁড়ায়। দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি আর ইথানের এলোমেলো অত্যাচারে সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে। নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াত করে সে ঘরের একপাশে থাকা সোফায় গিয়ে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দেয়।
নূশা সোফায় গা এলিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই ইথানের ঘুম ভেঙে যায়। মাথার ভেতর একটা ভোঁতা যন্ত্রণা, গত রাতের অ্যালকোহলের রেশ হয়তো এখনো কাটেনি। ধড়মড় করে উঠে বসে সে। চারদিকে ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, ফ্লোরের কার্পেটের ওপর তার পরনের শার্টটা অযত্নে পড়ে আছে। দৃশ্যটা দেখেই হন্তদন্ত হয়ে চারপাশটা আরও একবার পরখ করে নেয় ইথান। তার কোটটা কোথায়? গত রাতে পার্টিতে গিয়েছিল, কিন্তু এরপরের স্মৃতিগুলো কেমন ধোঁয়াটে লাগছে। মস্তিষ্ক থেকে মনে হচ্ছে কিছু দৃশ্য মুছে গেছে, সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। প্যান্টটা অবশ্য পরনেই আছে। পাশে তাকিয়ে দেখে বিছানা ফাঁকা, নূশা নেই। দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখে সে গুটিসুটি মেরে সোফায় শুয়ে আছে।
বিছানা ছেড়ে ধীরপায়ে উঠে নূশার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় ইথান। ইথান যে সজাগ হয়ে গেছে আর তার দিকেই এগিয়ে আসছে, সেটা পায়ের শব্দেই আঁচ করতে পেরেছে নূশা। চোখ শক্ত করে বুজে সে গভীর ঘুমের নিপুণ নাটক শুরু করে। ইথান ধীরে ধীরে নূশার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে। চারপাশটা কেমন ঘোর ঘোর লাগছে তার। নূশার দিকে তাকিয়ে থাকতে আজ কেমন মুগ্ধতা কাজ করছে ইথানের ভেতর। সকালের এই স্নিগ্ধ আলোয় নূশার মায়ামাখা প্রশান্ত চেহারাটা তাকে বড্ড আকর্ষণ করছে। অবচেতনভাবেই ইথান হাত বাড়িয়ে নূশার নরম গালে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে দেয়।
ইথানের উষ্ণ স্পর্শ পেতেই আর স্নায়ু স্থির রাখতে পারে না নূশা, ধড়ফড় করে লাফ দিয়ে উঠে বসে। এতক্ষণ ইথান যখন ধীরে ধীরে কাছে আসছিল, তখন অনেক কষ্টে নিঃশ্বাস আটকে চোখ দুটো বুজে রেখেছিল সে, কিন্তু ওই স্পর্শের পর আর পারল না। নূশাকে এমন ছিটকে উঠে বসতে দেখে ইথান মুহূর্তেই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে, বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে সে। নূশার ঠিক পাশেই সোফায় আয়েশ করে বসতে বসতে সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, “এত লাফালাফির কী আছে? তোমার সবকিছুতেই তো আমি টাচ করি!”
ইথানের এমন বেহায়া কথায় নূশা চরম বিরক্তি নিয়ে ওর দিকে একপলক তাকায়, তারপর দ্রুত অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। মনে মনে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে ইথানের মুখে সারাক্ষণ শুধু এই ধরনের অশ্লীল আর সস্তা কথাবার্তা! ইথান বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে, কিছুটা সংশয় নিয়ে নূশাকে জিজ্ঞেস করে, “রাতে আমাদের মধ্যে কি কোনো কিছু হয়েছিল?”
নূশা অন্যদিকে তাকিয়েই শীতল আর নির্লিপ্ত কণ্ঠে ছোট করে জবাব দেয়, “না।”

নূশা এই প্রশ্নে বুঝে গেছে রাতের কোনো ঘটনাই এখন ইথানের স্মৃতিতে আর নেই। তাই সে ইথানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “আপনাকে এজার আর একটি মেয়ে মিলে রুমে নিয়ে এসেছিল। আমি তখন কিচেনে ছিলাম। সেখান থেকে ফিরে দেখি এজার চলে গেছে।”
কথাটি শুনে ইথান কিছুটা বিচলিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়, “ঐ মেয়েটি কে? এজার তো চলে গিয়েছিল, কিন্তু সে কি যায়নি?”
নূশা এবার অবলীলায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলে, “আমি কী করে জানব সে কে? আপনার কোনো গার্লফ্রেন্ড হবে হয়তো। সে তখন যায়নি।”
“কী বলছ এসব? আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই!” এ বলে ইথান নিজের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার প্যান্ট ঠিক আছে, কিন্তু শার্ট খোলা কেন? তুমি খুলেছিলে?”
নূশা অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, “আমি খুলিনি, সেই মেয়েটিই খুলেছে। আপনারা তো ইনটিমেট হয়েছিলেন, আমি তখন ওই সোফায় বসে ছিলাম।”
এ কথা শুনে ইথান শব্দ করে হেসে ওঠে এবার। হাসতে হাসতেই সোফার হাতলে মাথা এলিয়ে দিয়ে ছোঁ মেরে নূশার কোমর পেঁচিয়ে ধরে। এক ঝটকায় তাকে নিজের বুকের ওপর আছড়ে ফেলে বলে, “মিথ্যা কেন বলছ, সুইটহার্ট? তোমার শরীর ছাড়া অন্য কারও শরীরের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। এবার সাফ সাফ সত্যিটা বলো, কাল রাতে ঠিক কী হয়েছিল?”
নূশা মুখ তুলে ইথানের চোখের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলতে শুরু করে, “কাল এজার আপনাকে একটা মেয়ের সাথে রুমে রেখে চলে গিয়েছিলেন। আমি বুঝতে পারিনি তিনি এমন কেন করলেন। আমি রুমে আসায় সেই মেয়েটিও চলে যায়। পরে আপনি নিজেই নিজের শার্ট খুলে আমার সাথে বেডে যেতে চান। আমি আপনাকে পানি দিয়ে মুখ মুছিয়ে, কোনোমতে বুঝিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই। ব্যাস, এতটুকুই হয়েছিল।”
সবটা শুনে ইথান তপ্ত শ্বাস ছেড়ে নূশার চুলে আলতো করে বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি সোফাতেই ঘুমিয়েছিলে?”
“না, আপনার বুকেই ছিলাম। সকালে উঠে নামাজ পড়ে এসে তারপর সোফায় শুয়েছি।”

কথাটি শুনে ইথান চোখ বুজে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর নূশার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “চলো, আমার ইচ্ছে করছে।”
নূশা রীতিমতো ভড়কে গিয়ে বলে, “কী ইচ্ছে করছে?”
“রাতে যা করিনি, তা করতে। এখন তো সবে পাঁচটা বাজে। তুমি আটটায় রেস্টুরেন্টে যাবে, আর আমিও নয়টায় বের হবো। হাতে অনেক সময়।”
নূশা দ্রুত ইথানের বুক থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলে, “না, এখন না। রাত ফুরিয়ে গেছে। কন্ট্রাক্টে কী লেখা ছিল, মনে নেই আপনার?”
ইথান শক্ত করে নূশার হাত টেনে ধরে। এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, “এত কথা বোলো না। গতকাল রাতেও কিছু করিনি। এত কথা আমার একদম পছন্দ না।”
নূশা ইথানের বাহুডোর থেকে ছুটে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলে, “ছাড়ুন বলছি! কলিজা খেয়ে নিন একেবারে। হাড্ডি পর্যন্ত যন্ত্রণা করে আমার। আপনার সময় শেষ।”
ইথান এলোমেলো বিছানায় নূশাকে ধপাস করে ছুঁড়ে ফেলে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “হোয়াট দ্য ফাক! যন্ত্রণা দেব তাহলে এখন। এসব যন্ত্রণা যখন নিতেই পারবে না, তখন বিয়েতে বসেছিলে কেন?”
এ কথা বলেই ইথান নূশার ওপর ঝুঁকে পড়ে। ওর দুই হাতের কব্জি নিজের এক হাতের মুঠোয় নিয়ে বিছানায় শক্ত করে চেপে ধরে। নূশার চোখে তখন পানি টলমল করছে। ইথান কাছে এলেই তাকে বড্ড কষ্ট দেয় ইথানের ছোঁয়ায় এক বিন্দুও ভালোবাসা নেই। নূশা ভেজা চোখে ইথানের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি আমার শরীর ভোগ করতে চাইছেন, করুন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার দেওয়া এই কষ্টগুলো একদিন ঠিকই আপনার কাছে ফিরে আসবে। আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না।”
“তোমার ক্ষমা দিয়ে আমি কার বাল ফালাব?”

এই বলে ইথান ধীরে ধীরে নূশার শরীর থেকে কাপড় সরিয়ে নিতে থাকে। নূশা একদম চুপ হয়ে যায়, আর কোনো প্রতিবাদ করে না। ইথান ক্রুর ভঙ্গিতে মুচকি হেসে নূশার গলায় ঠোঁট ছোঁয়ায়। গভীরভাবে শ্বাস টেনে ওর গায়ের ঘ্রাণ নিয়ে ফিসফিস করে ওঠে, “তুমি অন্যরকম, তুষারিণী।”
‘তুষারিণী’ শব্দটি শুনে নূশা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। যন্ত্রণার মাঝেই জিজ্ঞেস করে, “তুষারিণী আবার কী?”
“তুমি বুঝবে না, সুইটহার্ট। মুখ বন্ধ রাখো, আমাকে ডিস্টার্ব কোরো না।”
“আমার হাতটা ছাড়ুন, আমি আপনাকে বাধা দেব না।”
“না, ছাড়ব না। তুমি ডিস্টার্ব করবে।”
নূশার এবার প্রচণ্ড রাগ হয়। ও চিৎকার করে বলে, “মেরে ফেলুন আমায়! একেবারে মেরে দিন। হাতের হাড্ডিগুলো তো ভেঙেই ফেলবেন, একটু আস্তে ধরুন না!”
ইথান নূশার গলায় দাঁত বসিয়ে দিতে দিতে বলে, “উমম… চিৎকার কোরো না। কষ্ট আরও বেশি হবে, সুইটহার্ট।”
নূশা যন্ত্রণায় নানারকম প্রলাপ বকতে থাকে, কিন্তু ইথান তাকে ছাড়ে না। এভাবেই ইথানের পাশবিক উন্মাদনায় পার হয়ে যায় দীর্ঘ তিনটি ঘণ্টা।
দৃশ্যপট বদলায়। নূশা এখন ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে। তার সাথে ইথানও আছে। নূশা আয়নায় নিজের বেহাল শরীরের দিকে তাকিয়ে শিউরে ওঠে। ফর্সা ত্বকের ওপর অহরহ লালচে দাগ—এগুলো ওর কথা বলার শাস্তি। অতিরিক্ত কথা বলার অপরাধে ইথান লাভ বাইট দিয়ে তার সারা শরীর ভরিয়ে দিয়েছে। নূশা মনে মনে দাগগুলো গোনে, ৩৩৪ টা দাগ! ঘাড় আর গর্দানের অবস্থা তো দেখার মতো নয়।
ইথান নূশার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ায়। নূশা আয়নার প্রতিফলনেই ওর দিকে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে ওঠে, “পশু আপনি! একটা আস্ত পশু! পশুর মতো কামড়েছেন আমায়।”
ইথান নূশার দুই কাঁধে হাত রেখে কিছু একটা বলতে যায়, কিন্তু নূশা শোনার অপেক্ষায় থাকে না সে শাওয়ারের নিচে চলে যেতে নেয়। এতে ইথান পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে নূশার ঘাড় চেপে ধরে। এক ঝটকায় তাকে নিজের মুখের কাছে টেনে এনে কোনো কথা না বলেই ওর ঠোঁট দখল করে নেয়। নূশা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ইথানের উন্মুক্ত বুকে অনবরত কিল-ঘুষি মারতে থাকে, কিন্তু ইথানের বজ্রআঁটুনি খোলে না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর ইথান ওকে ছেড়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “আগেরগুলো ছিল তোমার অতিরিক্ত কান্না করা আর কথা বলার শাস্তি। আর এটা হলো এখন আমায় ‘পশু’ বলার শাস্তি।”
নূশা ইথানের ভায়োলেট রঙের চোখের দিকে চরম ঘেন্না নিয়ে তাকায়। ওর বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বলে, “আপনি এখন সরুন আমার সামনে থেকে। আপনার মতো মানুষ শুধু অন্যকে কষ্ট দিতেই জানে।”
ইথান নূশার উন্মুক্ত কোমরে নিজের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বিকারগ্রস্তের মতো হাসতে হাসতে বলে, “অবশ্যই! আমি কষ্ট দিতে পছন্দ করি। কেউ কষ্ট পেয়ে ছটফট করলে আমার আনন্দ হয়, আমি স্যাটিসফাইড হই, সুইটহার্ট।” এই বলে নূশার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আই অ্যাম আ সাইকোপ্যাথ, ডার্লিং। অন্যের কষ্টই আমার চোখের আনন্দ।”
কথাগুলো শুনে নূশার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে আসে। কী বলছে এই লোক? আসলেই ইথান একটা সাইকো, একটা অমানুষ! নূশা কোনোমতে নিজের কোমর থেকে ইথানের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলে, “আমার রেস্টুরেন্টে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমাকে ছাড়ুন।”
“ওকে, ছাড়লাম। তবে শোনো, বাথরোব পরে রুমে যাও। গিয়ে এখনই কাপড় পরবে না। আমি আসছি, এসে তোমার শরীরে মেডিসিন লাগিয়ে দেব, তারপর পরবে।”
এই বলে ইথান নূশাকে ছেড়ে দেয়। নূশা শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, “আমি নিজেই লাগিয়ে নিতে পারব। আপনাকে লাগাতে দিলে তো আবার শুরু করে দেবেন পশুর মতো খাবলানো।”
ইথান কঠোর গলায় ধমক দিয়ে ওঠে, “যা বলছি, তা করো! কথার এদিক-ওদিক হলে খবর আছে কিন্তু।”
এই হুমকি শুনে নূশা আর কোনো কথা বাড়ায় না। চুপচাপ গোসল সেরে বাথরোব জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। নূশা বেরিয়ে আসার বেশ কিছুক্ষণ পর ইথানও বের হয়। কিন্তু রুমে এসে সে নূশাকে দেখতে পায় না। নূশার ব্যাগটাও জায়গামতো নেই, তার মানে মেয়েটা রেস্টুরেন্টে চলে গেছে! এই মেয়েটা তার কথা শুনল না! ইথানের প্রচণ্ড রাগ হতে থাকে, রাগে তার সারা শরীর রিমঝিম করে ওঠে। নূশা কেন ওর কথা শুনল না?
মূলত ইথানের একটি মানসিক রোগ আছে। সে একজন স্যাডিস্ট। যেসব ব্যক্তি অন্য কোনো মানুষ বা প্রাণীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট দিয়ে, ভয় দেখিয়ে বা অপমান করে একধরনের পৈশাচিক আনন্দ বা তৃপ্তি লাভ করে, তাদেরকেই স্যাডিস্ট বলা হয়। আর ইথানের ঠিক এই সমস্যাটাই আছে।
।।

নূশা চলে এসেছে নিজের রেস্টুরেন্টে। ভিনদেশি এই অচেনা শহরে ছোট্ট রেস্টুরেন্টটি হয়ে উঠেছে একটুকরো জীবন্ত সিলেট। সকাল গড়িয়ে দুপুর, আর দুপুর গড়িয়ে রাত ভোজনরসিক কাস্টমারদের আনাগোনায় মুখর থাকে চারপাশ। বিশেষ করে তার হাতের জাদুকরী ছোঁয়ায় তৈরি সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস আর কড়া জ্বাল দেওয়া, ধোঁয়া ওঠা ঘন দুধ-চায়ের সুখ্যাতি এখন আর শুধু এই শহরের গণ্ডিতে আটকে নেই। এক-দু মাইল দূরের অন্য শহর থেকেও প্রবাসী সিলেটিরা ছুটে আসেন শুধু শেকড়ের এই চেনা স্বাদটুকু আস্বাদন করতে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, শুধু প্রবাসীরাই নয়, সিলেটিদের এই প্রিয় খাবারগুলো এখন মুগ্ধ করছে স্থানীয় ফরাসিদেরও। ঝাল-তাজা শুঁটকি ভর্তা, টমেটো দিয়ে টকের তরকারি কিংবা সাতকরার আচারের মিশেলে রাঁধা সুবাসিত পদগুলো যে ভিনদেশি মানুষেরাও এতটা আপন করে নেবে, তা নূশা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। এই অভাবনীয় সাফল্য তো পরম করুণাময় আল্লাহর এক অশেষ রহমত।
রেস্টুরেন্টের এক কোণায় দাঁড়িয়ে ব্যস্ততম এই পরিবেশের দিকে তাকিয়ে নূশার বুকে স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস জমা হয়। মাত্র এই কয়েকদিনের অভাবনীয় আয়ে সে তার কাঁধের ওপর চেপে থাকা সমস্ত ঋণ একেবারে কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে ফেলেছে। তবে এই দ্রুত সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হলো, রেস্টুরেন্টটি দাঁড় করাতে তাকে নিজের পকেট থেকে কানাকড়িও খরচ করতে হয়নি। আধুনিক অন্দরসজ্জায় ঘেরা, একেবারে নিখুঁতভাবে সাজানো-গোছানো এই রেস্টুরেন্টটি ইথান সম্পূর্ণ তার নামেই লিখে দিয়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও চাকরিটা চলে যাওয়ার নির্মম ভয়ে নূশা যখন প্রায় দিশেহারা, চারপাশের পৃথিবীটা যখন অন্ধকার মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো এই সুযোগটা তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
নূশা আনমনেই ভাবে, আল্লাহ যা করেন, নিশ্চয়ই তাতে বান্দার কোনো না কোনো মঙ্গল লুকিয়ে থাকে। এই যে ইথানের দেওয়া তীব্র চাপা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে, এটা যেমন ধ্রুব সত্য তেমনি তার পরিবার যে আজ সুখে আছে, নিশ্চিন্তে দিন পার করছে, সেটাও তো এক পরম প্রাপ্তি। নিজের জীবনের এই আকস্মিক শূন্যতা আর আত্মত্যাগকে একপাশে সরিয়ে রেখে পরিবারের হাসিমুখটাই এখন তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় রসদ। আর মাত্র তো ছয়টা মাস! এই চুক্তির ছয়টা মাস দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে পেরিয়ে গেলে হয়তো নিয়তি তার জন্যও এক সুন্দর, শান্তিময় জীবনের বন্ধ দরজাগুলো খুলে দেবে। আগামী দিনের আলোর আশায় বুক বেঁধেই নূশা প্রতিদিনের এই কোলাহল আর ব্যস্ততায় নিজেকে সঁপে দেয়।
।।
প্যারিসের এক কোলাহল মুক্ত নির্জন রাস্তায় আজ দুই দুর্ধর্ষ গ্যাং মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ‘লিজিয়ন’, আর ঠিক তাদের মুখোমুখি ‘গ্লিচ’ গ্রুপ।
লিজিয়নদের একেবারে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে আছে এক সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত ভয়াবহতার আরেক নাম, পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট এবং নৃশংসতম কাজগুলোর মূল হোতা, লিজিয়নদের ‘গডফাদার’। লিজিয়নের প্রতিটি সদস্যের মুখই আজ মুখোশে ঢাকা, তবে তাদের গডফাদারের মুখের সাদা-লাল মুখোশ। যেই মুখোশটা আলাদা করেই এক আদিম ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। তার পরনে একটি নিখুঁত টুইড থ্রি-পিস স্যুট, তার ওপর জড়ানো লম্বা ওভারকোট এবং মাথায় একটি ভিনটেজ ‘ফ্ল্যাট ক্যাপ’। তার ডান হাতে ধরা একটি গ্লক ১৮ (Glock 18)। এটি কোনো সাধারণ পিস্তল নয় সুইচ অন করলেই এই ফুল-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্রটি আস্ত একটি সাব-মেশিনগানের রূপ নেয়। মিনিটে প্রায় ১২০০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে সক্ষম এই দানবীয় অস্ত্রটি চোখের পলকেই পুরো ম্যাগাজিন খালি করে দিয়ে প্রতিপক্ষের বুক ঝাঁঝরা করে দিতে পারে।
উল্টোদিকে গ্লিচ গ্রুপের সদস্যদের হাতেও রয়েছে অত্যন্ত দুর্লভ এবং অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র। কিন্তু চারপাশের এই বারুদমাখা উত্তেজনা সত্ত্বেও, আজকের এই মুখোমুখি অবস্থান কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য নয়। গ্লিচ গ্রুপ মূলত এসেছে এই সম্ভাব্য ধ্বংসলীলা থামাতে। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে মাত্র তিন ঘণ্টা আগে। সাইপ্রাস থেকে আসা লিজিয়নদের একটি অস্ত্রের চালানকে ভুল করে ‘লিও’ গ্রুপের চালান ভেবে হাইজ্যাক করে বসে গ্লিচ। কিন্তু চালানের গায়ে ড্রাগনের সিলমোহর দেখেই তাদের শিরদাঁড়া বেয়ে আতঙ্কের শীতল স্রোত নেমে যায়। তারা বুঝতে পারে স্বয়ং যমের জিনিস হাতে দিয়ে দিয়েছে তারা। গর্ডফাদারের জিনিসে হাত দিয়ে দিয়েছে তারা। লিজিয়নের ওই ড্রাগন সিল দেখলে খোদ আন্তর্জাতিক বর্ডার গার্ডরাও যেখানে সম্মান জানিয়ে পথ ছেড়ে দেয়, সেখানে গ্লিচ তো নেহায়েত তেলাপোকা! গডফাদারের সাথে পাঙ্গা নেওয়া আর নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করা দুটোই যে এক কথা! গডফাদার এক আস্ত মনস্টার, যার অভিধানে ভয় বা পরোয়া বলে কোনো শব্দ নেই।
তাই ভুল বোঝার তিন ঘণ্টার মাথাতেই গ্লিচের প্রধান অ্যান্থনি স্বয়ং ছুটে এসেছে গডফাদারের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে। রাস্তার থমথমে নীরবতা ভেঙে এবার অ্যান্থনি ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে আসে। ওভারকোট আর সাদা-লাল মুখোশ পরিহিত ভয়ংকর গডফাদারের ঠিক সামনে এসে সে বিনা দ্বিধায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মাটিতে। মাথা নিচু করে, চরম অনুশোচনা আর ভয়ের সুরে সে বলে ওঠে,
“সরি স্যার…! আমার গ্যাং ভুল করে আপনার অস্ত্রের চালান তুলে নিয়ে এসেছিল। আমি আপনার সেই পুরো চালান তো ফিরিয়ে এনেছিই, সাথে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বেশ কিছু অত্যাধুনিক মেশিনগানও নিয়ে এসেছি আপনাকে উপহার দিতে। দয়া করে এই একবারের মতো আমাদের ক্ষমা করে দিন।”
গডফাদার কিছুক্ষণ একেবারে চুপ করে থাকে। চারপাশের থমথমে নীরবতা ভেঙে সে তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটা হালকা তুলে পেছনের দিকে ইশারা করে। পরমুহূর্তেই, চোখের পলক ফেলার আগেই, সে হাতের অস্ত্রটা তাক করে মাথা নিচু করে থাকা অ্যান্থনির ঠিক মাথার মাঝ বরাবর মগজ লক্ষ্য করে বুলেট ছুঁড়ে দেয়।
গডফাদারের ইশারা পাওয়া মাত্রই তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘লিজিয়ন’ গ্যাংয়ের সদস্যরা অতর্কিতে ফায়ার করতে শুরু করে ‘গ্লিচ’ গ্যাংয়ের ওপর। গ্লিচরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাত্র এক মিনিটের মধ্যে পুরো এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়, সবাই ওপারে পাড়ি জমায়।
অ্যান্থনির নিথর দেহটা ধপ করে লুটিয়ে পড়ে পিচঢালা রাস্তায়। গডফাদার ধীরপায়ে সেই মৃতদেহের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। নিজের মুখের মাস্কটা খুলে ফেলতেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি সাথে তার ভায়লোট রঙ্গের চোখে খেলে যায় পৈশাচিক আনন্দ। অ্যান্থনির শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া এক ফোঁটা তাজা রক্ত নিজের আঙুলের ডগায় তুলে নেয় সে। একদৃষ্টে সেই রক্তের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, “ক্ষমা? ওটা আবার কী? ওটা বলে কিছু হয় নাকি? আমি গডফাদার আমি আপস বলতে শুধু মৃত্যুকে চিনি… শুধু মৃত্যুকে।”
কথাগুলো বলেই সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করতে করতে লিজিয়নদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেয়, “যাও, উৎসব করো!”

গডফাদারের এ কথাটা হয়তো কোনো আদিম, পৈশাচিক মন্ত্র! নির্দেশ শোনামাত্রই লিজিয়নরা ক্ষুধার্ত নেকড়ের পালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিথর লাশগুলোর ওপর। শুরু হয় এক অমানুষিক সেলিব্রেশন।
গডফাদার নিজেও মেতে ওঠে এই বিভীষিকায়। এক হ্যাঁচকা টানে সে অ্যান্থনির পরনের শার্টটা ফালাফালা করে ছিঁড়ে ফেলে। হাতের ধারালো ছুরিটা বিনা দ্বিধায় গেঁথে দেয় তার কণ্ঠনালীতে, এরপর এক বুনো আক্রোশে একটানে চিরে নামিয়ে আনে একেবারে নাভি পর্যন্ত। চামড়া আর পেশি কাটার খচখচ শব্দের সাথেই ফিনকি দিয়ে ছিটকে আসে কালচে লাল রক্ত, ক্ষতের মুখ থেকে বুদবুদ করে বেরিয়ে আসে রক্তমাখা ফেনা।
গডফাদারের চোখেমুখে কোনো বিকার নেই, বরং এক উন্মাদ তৃপ্তি। সে সরাসরি তার দুই হাত ঢুকিয়ে দেয় অ্যান্থনির চেরা পেটের গহ্বরে। কাঁচা মাংস আর রক্তের পিচ্ছিল আস্তরণ ভেদ করে সে এক টানে উপড়ে আনে নাড়িভুঁড়ি, পাকস্থলী, কলিজা আর সদ্য স্পন্দন থামা হৃৎপিণ্ডটা।
খুবলে নেওয়া এই মাংসপিণ্ডগুলো সে ছুঁড়ে মারে পিচঢালা রাস্তায়। এটা কোনো খুন নয়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাকি গ্যাংগুলোর জন্য একটা ক্লিয়ার মেসেজ লিজিয়নদের পথে দাঁড়ালে ঠিক এই পরিণতিই বরণ করতে হবে।
তাণ্ডব শেষে এখন রাস্তাটা আর চেনার উপায় নেই। পিচের কালো রং পুরোপুরি ঢেকে গেছে জমাট বাঁধা রক্তে। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মানুষের উপড়ে নেওয়া মৃত চোখ, ছিঁড়ে ফেলা রগ, কালচে ফুসফুস আর থেঁতলানো কলিজার দলা। আস্ত একটা রাস্তাকে এক নিমেষে শহরের সবচেয়ে ভয়ংকর কসাইখানায় রূপান্তর করে দিয়েছে তারা। তারা লিজয়ন তাদের সাথে সব নিকৃষ্টতাই মানায়।

।।
নূশা নিজেদের ঘরের ব্যালকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর ইথান নিজের কাজে মগ্ন। নূশা এই একটু আগেই রেস্টুরেন্ট থেকে বাড়ি ফিরেছে। তাদের দুজনের মধ্যে কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না, চারপাশটা তাই বেশ শান্ত। নূশা খুব ভালো করেই জানে, নিজের দরকার না পড়লে ইথান গায়ে পড়ে তার সাথে কথা বলার পাত্র নয়। তাই সময় পেলেই নূশা এই ব্যালকনিতেই এসে নিজের মতো সময় কাটায়। নূশার স্থির দৃষ্টি সামনের শূন্যতায় নিবদ্ধ। ঠিক তখনই ইথান হাতে একটি কালো গোলাপ নিয়ে এসে দাঁড়ায় একদম নূশার গা ঘেঁষে। আলতো করে ছুঁয়ে দেয় নূশার থুতনি। এমন অপ্রত্যাশিত স্পর্শে নূশা হঠাৎ ভড়কে গিয়ে খানিকটা পিছিয়ে যায়। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই বলে ওঠে, “কী সমস্যা?”
ইথান কালো গোলাপটি নূশার দিকে বাড়িয়ে দেয়। শান্ত কণ্ঠে বলে, “নাও, এটা তোমার জন্য!”
নূশা ভ্রু কুঁচকে গোলাপটা হাতে নেয়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “হঠাৎ আমার জন্য কেন?”
ইথান খুব নরম চোখে নূশার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, “এমনিই দিলাম। মেয়েরা তো গোলাপ পছন্দ করে, তাই না?”
কথাটা শুনে নূশা মনে মনে ভাবে, ‘বাহ! আমার পছন্দের কথাও দেখি চিন্তা করেছে এই অমানুষটা!’
তবে মনের ভাব লুকিয়ে মুখে হালকা বিরক্তি ফুটিয়ে সে বলে, “এই গোলাপ দিয়ে আমি কী করব?”
ইথান ঠোঁটের কোণে হাসি টিকিয়ে রেখে বলে, “কেন, কী করবে তা-ও জানো না? তুমি কি এর আগে কখনো তোমার বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে ফুল পাওনি?”
‘বয়ফ্রেন্ড’ শব্দটা শুনে নূশার গলায় স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে ওঠে। কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরেই সে বলে , “আমার এসব বয়ফ্রেন্ড-টয়ফ্রেন্ড কেউ ছিল না। আমি দুশ্চরিত্রা নই যে বিয়ের আগে এসব সম্পর্কে জড়াব।”
নূশার এই সোজাসাপ্টা জবাব শুনে ইথান নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর স্বস্তি অনুভব করে। তবুও গলার স্বরে হালকা কৌতূহল বজায় রেখে ও জিজ্ঞেস করে, “কেন? তোমাকে কি কোনো ছেলে পছন্দ করত না?”

নূশা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খানিকটা উদাস গলায় বলে, “কে আর পছন্দ করবে? কেউ দেখলে তো করবে! আমার পুরো পড়াশোনাই তো মহিলা মাদ্রাসায়, তারপর মহিলা কলেজে।”
​কথাগুলো শুনে ইথানের কাছে সমীকরণটা একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। নূশার অতীত আয়নার মতোই স্বচ্ছ, আর ওর জীবনে পুরুষ বলতে প্রথম ইথান নিজেই। সবটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারলেও ইথান অন্য রকম এক তৃপ্তি নিয়েই আবারও জিজ্ঞেস করে, “তার মানে তোমার জীবনে কখনো কোনো প্রেমিক ছিল না?”
​নূশা সোজাসাপটা উত্তর দেয়, “না।”
​”বাহ! এটা তো আমার জন্য দারুণ খুশির খবর। তাহলে চলো, এই আনন্দে আজ আমরা একটু ইনটিমেট হই!”
​কথাটি শুনে নূশা আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ে। এই লোক বলছেটা কী! কথায় কথায় শুধু এই এক চিন্তা। নূশা চরম বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে ইথানের দিকে তাকায়, “এই এক কাজ ছাড়া কি আপনার আর কোনো কাজ নেই? এসব জোরাজুরি করে যে আপনি আদতে একজন কাপুরুষ, শুধু সেটারই পরিচয় দিচ্ছেন।”
​বিরক্তিকর কথাগুলো ছুড়ে দিয়েই নূশা পাশ কাটিয়ে রুমের দিকে পা বাড়াতে চায়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ইথান হাত বাড়িয়ে নূশার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। এক ঝটকায় ওকে নিজের শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশিয়ে নিয়ে হালকা হেসে বলে, “তাহলে সুপুরুষ হতে গেলে ঠিক কী করতে হবে, মিস সিলেটি?”
​নূশা ইথানের চোখের দিকে না তাকিয়ে দৃষ্টিটা অন্যদিকে সরিয়ে শক্ত গলায় বলে, “একজন সত্যিকারের শুদ্ধ পুরুষ কখনোই তার পার্টনার বা তার ওয়াইফকে অসম্মান করে না। তার অনুমতি ছাড়া তার সাথে জোরাজুরি তো করেই না, বরং সে সবসময় নিজের ওয়াইফকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে।”
​নূশার কথাগুলো শুনে ইথান একটুও না দমে বরং ওর কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে আসে। গলায় এক অদ্ভুত মাদকতা মিশিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আমি কি তাহলে সেগুলো তোমার ওপর ট্রাই করব?”
​নূশা একরোখা গলায় জবাব দেয়, “আপনি পারবেন না।”
​ইথানের এবার ঠোঁটে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি টেনে ধরে বলে “যদি পারি?”

কণ্ঠে তীব্র অভিমান আর প্রচ্ছন্ন বিতৃষ্ণা মিশিয়ে নূশা বলে ওঠে, “পারবেন না তো! যে মানুষটা অন্যকে কষ্ট দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পায়, সে কী করে আমাকে খুশি রাখবে?”
ইথানও সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে জেদি গলায় সে বলে, “অবশ্যই পারব। ভালো এবং খারাপ দুটো মুখোশই আমি খুব নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতে জানি, সুইটহার্ট।”
ইথানের নৈকট্য থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে যায় নূশা। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তিক্ত হাসি ফুটিয়ে বলে, “আপনার এসব অভিনয় করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তো আর আপনার স্ত্রী নই যে আমার সাথে এসব করবেন! আমাকে ছেড়ে যখন নিজের পছন্দমতো কাউকে বিয়ে করবেন, এই ভালো আচরণগুলো তার জন্যই জমিয়ে রাখুন।”
কথাগুলো ইথানের বুকে তীরের মতো বিঁধলেও সে নিশ্চুপ থাকে। বলতে গিয়েও শব্দগুলো গলায় আটকে যায় তার। সত্যিই তো, সে তো নূশাকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দেয় না। তাহলে কেন তার এই অহেতুক অধিকারবোধ? কেন এই কাছে টানার আকুলতা? পরক্ষণেই তার অবাধ্য মন যুক্তি দেখায় একটু কাছে টানলে ক্ষতিই বা কী?
নূশা আর কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায়। ইথানও এক অদৃশ্য সুতোর টানে সম্মোহিতের মতো তার পিছু নেয়। নূশা জানে এখন কী হবে। রোজকার মতো এক যান্ত্রিক অধিকার ফলানোর কাজ চলবে এখন। নিজের ওড়নাটা একপাশে সরিয়ে রেখে সে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ইথান হয়তো তার শরীরটা ভোগ করবে, তারপর তাকে সোফায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। এটাই তো তাদের রুটিন।
কিন্তু আজ সব হিসাব উল্টে যায়। ইথান ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে দ্রুত বিছানায় আসে। নূশার পাশে শুয়েই পেছন থেকে তাকে নিজের চওড়া বুকের মাঝে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। তার বাহুডোরের বাঁধন এতই শক্ত যে নূশা দমবন্ধ অনুভব করে চরম বিরক্তি নিয়ে নূশা বলে ওঠে, “এভাবে পশুর মতো জড়িয়ে ধরছেন কেন? হাড্ডি ভেঙে যাবে তো আমার!”
ইথান সামান্য জোর খাটিয়ে নূশাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। কনুইয়ে ভর দিয়ে একটু উঠে নূশার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে ও। আবছা অন্ধকারের মাঝেই নূশার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভারি গলায় প্রশ্ন করে, “আমার সবকিছুতেই কি তোমার এত বিরক্তি লাগে? এমন কেন করো তুমি? একটু সুন্দর করে, নরম সুরে কি একটা কথাও বলা যায় না?”
নূশা চোখ সরিয়ে নিয়ে কাঠখোট্টা গলায় জবাব দেয়, “না, যায় না। কারণ আপনি সেটা ডিজার্ভ করেন না।”
“কেন?”
নূশার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ যেন ফেটে পড়তে চায়। সে বলে, “আপনি আমাকে দিনের পর দিন যে পরিমাণ কষ্ট দিয়েছেন, তার পর কি আপনার সাথে হাসিমুখে কথা বলা সম্ভব? আপনি নিজেই বলুন! আমারও তো একটা বিবেক আছে, অনুভূতি আছে!”
নূশার এই ধারালো কথাগুলোর পর ইথান একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায়। আজ তার কোনো রাগ নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই। হঠাৎ করেই সে নিজের মাথাটা নূশার বুকের ওপর গুঁজে দেয়। দুই হাতে নূশাকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে একদম নিঃশব্দে পড়ে থাকে।
ইথানের এই অপ্রত্যাশিত, শান্ত আচরণে নূশা অসম্ভব বিস্মিত হয়। যে মানুষটা সবসময় অহংকার আর রাগে ফেটে পড়ে, সে আজ এমন শিশুর মতো তার বুকে মুখ লুকিয়ে আছে কেন? দ্বিধা আর কৌতূহল নিয়ে নূশা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, “আজ হঠাৎ এত ভালো আচরণ করছেন কেন আপনি? কী হয়েছে আপনার?”
কিন্তু ইথান কোনো জবাব দেয় না। নূশার বুকের উষ্ণতায় মুখ গুঁজে সে শুধু নিঃশব্দে পড়ে থাকে। এই মুহূর্তে বাইরের পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল, সমস্ত অহংকার ইথানের কাছে মিথ্যে। নূশার ধুকপুক করা হৃদস্পন্দনের শব্দে সে এক অবর্ণনীয় প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছে। প্রচণ্ড শান্তি লাগছে তার বড্ড বেশি শান্তি।

চলবে,,,,

রেসপন্স করিয়েন তাহলে তাড়াতাড়ি দিবনে 😐😶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply