তুষারিণী– ১০
সানজিদাআক্তারমুন্নী
ফজরের নামাজ শেষে বিছানায় এসে গা এলিয়ে দিয়েছে নূশা। চারপাশের ভোরের স্নিগ্ধ নীরবতার মাঝেও তার মনে অদ্ভুত এক স্বস্তি আর তে হলো ইথান ঘরে নেই। ঘুম ভাঙার পর থেকেই তা আর কোথাও দেখা পায়নি। কোথায় গেছে, তা জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও নূশার নেই। বরং সে যেদিকেই যাক, নূশার এতেই পরম শান্তি। ইথান চোখের আড়ালে থাকা মানে অন্তত আগামী কয়েকটা দিন একটু নিজের মতো করে নিশ্চিন্তে শ্বাস নেওয়া যাবে। চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই, তাই অলস সময় কাটাতে হাতের কাছে থাকা ফোনটা টেনে নেয় সে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার ঢুঁ মারতেই নূশা খেয়াল করে, চারদিকে কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক আলোড়ন। স্ক্রিনজুড়ে শুধু একটা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের লিংক ঘুরপাক খাচ্ছে পরিচিত-অপরিচিত সবাই পাগলের মতো শেয়ার করছে সেটা। কৌতূহল সামলাতে না পেরে লিংকটায় ট্যাপ করে বসে নূশা। কিন্তু স্ক্রিনে ফুটে ওঠা দৃশ্যটা চোখের সামনে আসতেই তার ধমনীর রক্ত বরফ হতে শুরু করে, হাত-পা রীতিমতো অবশ হয়ে আসে। মানুষ কতটা পিশাচ হলে এমন নিকৃষ্ট হতে পারে?
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে লাইভ স্ট্রিমিং আর সেখানে স্বয়ং ‘গর্ডফাদার’। এই ফ্রান্সে পা রাখার পর থেকে এমন কোনো দিন নেই যেদিন নতুন কোনো অপরাধের গল্প নূশার কানে আসেনি। তবে সব অপরাধীর চেয়ে লিজয়ন আর গর্ডফাদারদের নামটাই যেন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের। এদের নীরব আর হিংস্র রাজত্বে গোটা দেশটাই একটা জ্বলন্ত চুল্লি হয়ে উঠেছে। ভিডিওতে গর্ডফাদারকে দেখা যাচ্ছে, তার পুরো শরীর এমন নিখুঁতভাবে কালো পোশাকে ঢাকা যে, ভেতরে থাকা মানুষটার এক ইঞ্চি চামড়াও দেখার উপায় নেই। তার সামনে মেঝেতে পড়ে আছে একটা ছেলে। আর তার ওপর চলছে মধ্যযুগীয় এক নির্মম নির্যাতন। জ্যান্ত অবস্থায় ছেলেটার শরীরের চামড়া একটু একটু করে ছিলে নেওয়া হচ্ছে। যন্ত্রণায় ছেলেটার গোঙানি স্ক্রিন ভেদ করে যেন নূশার কানে এসে বিঁধছে। তবে নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়। একটা বিশাল আকারের ইনজেকশনের সিরিঞ্জ হাতে তুলে নেয় গর্ডফাদার, আর কোনো তরল নয়, তার ভেতর কিলবিল করছে একগাদা জ্যান্ত পোকা। ছেলেটার কানের ভেতর সিরিঞ্জটা ঢুকিয়ে সেই পোকাগুলো মগজের ভেতর পুশ করে দেয় সে। এরপরই হাতে তুলে নেয় একটা শক্ত হকিস্টিক। সপাং সপাং শব্দে বেদম পেটাতে শুরু করে। আঘাতের পর আঘাতে ছেলেটার মাথা আর মুখ থেঁতলে একাকার না হওয়া পর্যন্ত থামে না সেই পৈশাচিক তাণ্ডব। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর, হাঁপাতে থাকা গর্ডফাদার সোজা স্ক্রিনের দিকে তাকায়। তারপর রক্তমাখা হাতে মিডিল ফিঙ্গার উঁচিয়ে ধরে যা এই দেশের ঘুমন্ত প্রশাসন আর আইনব্যবস্থার গালে এক চরম চপেটাঘাত। এরপরই স্ক্রিন কালো হয়ে যায়, লাইভ শেষ।
যে ছেলেটিকে এই মাত্র পশুর মতো পিটিয়ে মারা হলো, সে কোনো সাধারণ মানুষ নয়। সে আমেরিকার এক প্রভাবশালী পলিটিশিয়ানের বখে যাওয়া সন্তান। মেয়েদের জোর করে তুলে এনে নারকীয় টর্চার করা আর শেষে মেরে ফেলাই তার নেশা। শারীরিক শক্তির দিক দিয়ে অক্ষম হওয়ায় সে নিজে সরাসরি ধর্ষণের কাজটা করতে পারে না, বরং বিকৃত লালসা মেটাতে বিভিন্ন পাশবিক জিনিস ব্যবহার করে। আর নিজের এই শারীরিক অক্ষমতার তীব্র ক্ষোভ সে মেটায় নিরীহ মেয়েদের ওপর। আমেরিকায় প্রায় চল্লিশটা এমন নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে সে ভিআইপি ভিসায় ফ্রান্সে এসে গা ঢাকা দেয়। কিন্তু স্বভাব তো আর বদলায় না! ফ্রান্সে এসেও একই কাজ শুরু করলে শেষমেশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় সে। আর ঠিক তখনই শুরু হয় আসল খেলা।
এফবিআই ছেলেটিকে ফেরত চেয়ে বসে, তাদের দাবি তাকে অক্ষত অবস্থায় আমেরিকায় পৌঁছে দেওয়া হোক। ফ্রান্সের গোয়েন্দা সংস্থাও চায় বিনা ঝামেলায় ছেলেকে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে। কিন্তু সাধারণ পুলিশ প্রশাসন চায় তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তবে আইনের মারপ্যাঁচে পুলিশের হাতে শক্ত কোনো প্রমাণ না থাকায়, গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তাকে পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। রাখা হয় শহরের সবচেয়ে সুরক্ষিত এক ‘সেফ জোনে’। কিন্তু গর্ডফাদারের শকুনের চোখকে ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ? কড়া নিরাপত্তার জাল ছিঁড়ে যেকোনো উপায়ে সে ওই পিশাচটাকে তুলে নিয়ে আসে। আর সবার সামনে লাইভে এভাবেই তার বিচার কার্যকর করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি গর্ডফাদার, লাইভ শেষ করার সাথে সাথেই ছেলেটার করা সবকটি রেপের অকাট্য প্রমাণ দিয়ে তৈরি একটা ফাইলও সে ইন্টারনেটে রিলিজ করে দেয়।
ভিডিওটা শেষ হওয়ার পরও নূশা ঘোরের মধ্যে আছে। এসব বীভৎস দৃশ্য আর পেছনের রাজনীতি চিন্তা করে ঘর থেকে এক পা বাইরে ফেলার কথা ভাবতেই তার বুক কেঁপে ওঠে। ভয়ে গায়ের লোমগুলো সব খাড়া হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা একপাশে সরিয়ে রেখে সে দ্রুত একটা মোটা কম্বল টেনে নেয় গায়ের ওপর। শীতের জন্য নয়, বরং ভেতর থেকে উঠে আসা এক অজানা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে সে। কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে শুধু একটাই কথা বারবার মনে হতে থাকে তার ছিঃ! কতটা অসহ্য আর ভয়াবহ এই দুনিয়া। নূশা একসময় ভাবত, অপরাধ আর অবিচার বোধহয় শুধু বাংলাদেশেই ঘটে। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে, সভ্যতার মোড়কে মোড়ানো এই উন্নত দেশগুলোর ভেতরের রূপটা তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি অন্ধকার আর ভয়ংকর!
ইথান এমন সময় ঠাস করে ঘরে ঢোকে। নূশা ইথানকে দেখে চমকে যায়, এই বান্দা আজ এত সকালে চলে এলো কেন? ইথানকে দেখে নূশা তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে পড়ে। যদি না ওঠে, তাহলে এখনই এসে শুরু করে দেবে শয়তানি। ইথান কী যে করে আর কোথায় যায় এমন হঠাৎ হঠাৎ, একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
ইথান নূশাকে উঠতে দেখে এক নজর তার দিকে আড়চোখে তাকায়। তারপর কিছু না বলে চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে যায়। নূশা চুপচাপ বসে থাকে। ইথানের মতিগতি কখন কেমন বোঝা দায়! নূশা কিছুক্ষণ বসে থেকে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।
রাতের অন্ধকার এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, শুধু পুব আকাশে এক আবছা নীলাভ আর গোলাপি রঙের আভা ফুটে উঠেছে। শতাব্দীপ্রাচীন এক শ্বেতপাথরের অ্যাশার ক্যাসেলের সুউচ্চ কারুকার্যময় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ও। ভোরের হিমশীতল, স্নিগ্ধ হাওয়া গা কাঁপিয়ে তুলছে নূশার। বাতাসের সাথে ভেসে আসছে দূরের উপত্যকায় ফুটে থাকা বুনো ল্যাভেন্ডার আর ভেজা মাটির মাতাল করা সুবাস। নূশার মনে হচ্ছে, সে শ্বাস নিচ্ছে আস্ত একটা সতেজ কবিতার বুকের ভেতর থেকে।
ক্যাসেলের ঠিক নিচেই দিগন্তবিস্তৃত আঙুরবাগান। রাতের শিশির মেখে সবুজ পাতাগুলো এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। পুরো উপত্যকাটা এক সাদাটে, মিহি কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। পূর্ব দিগন্তের পাহাড়চূড়া ভেদ করে উঁকি দিতে শুরু করেছে ভোরের প্রথম সূর্য। গলিত সোনার মতো সেই রোদ এসে পড়ছে কুয়াশার বুকে আর চোখের পলকে সেই সাদা কুয়াশা সোনালি ধুলোয় পরিণত হলো। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো রোদের ছোঁয়ায় অজস্র হীরকখণ্ডের মতো জ্বলে উঠছে। দূরের বনভূমি থেকে ভেসে আসছে অচেনা পাখির মিষ্টি কলকাকলি।
ব্যালকনির ঠান্ডা, নকশাকাটা রেলিংয়ে দু’হাত রেখে নূশা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। চোখের সামনে প্রকৃতি এক নিপুণ শিল্পীর মতো আপন খেয়ালে রঙের পর রং চড়িয়ে সাজিয়ে তুলছে আজকের দিনটিকে। রূপে, লাবণ্যে আর স্নিগ্ধতায় ভরা এই অপরূপ ক্যানভাস নূশার মনের গহিনে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি এনে দেয়। তার মনে হলো, জীবনের সব ছুটে চলা আর ক্লান্তি যেন এই এক মুহূর্তের সৌন্দর্যের কাছে এসে চিরতরে থমকে গেছে।
নূশা যখন প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ, তখনি তার পাশে এসে দাঁড়ায় ইথান। গোসল করে এসেছে, ভেজা চুল বেয়ে বিন্দু বিন্দু পানি ঝরে পড়ছে। পরনে কালো টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। ইথান নূশাকে একদৃষ্টিতে বাইরের দিকে এত মৌন হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে, “কী দেখছো এত গভীর মনোযোগ দিয়ে, মিস সিলেটি?”
নূশা ইথানের কথার জবাবে কোনো উত্তর দেয় না, নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে আসে। ইথানের কর্কশ ব্যবহারগুলোর জন্য তার সাথে কথা বলতে নূশার ঘেন্না লাগে, বিশেষ করে কাল রাতে যা করল। ইথান নূশাকে চলে যেতে দেখে পেছন থেকে বলে ওঠে, “আমি কারো সাথে অতিরিক্ত কথা বলি না। যদিও বা কিছু বলি আর সে সেটার উত্তর না দেয়, তবে এর পরিণতি ভালো হয় না।”
কথায় কথায় ইথানের এমন হুমকি শুনে নূশা রীতিমতো টায়ার্ড। আর নিতে পারছে না এসব, না নেওয়া সম্ভবও নয়। মানুষ কী করে এসব সহ্য করতে পারে? সবসময় শুধু জোর খাটানো! নূশা যেতে গিয়েও থেমে যায়। পেছনে ঘুরে ইথানের চোখে চোখ রেখে বলে, “আপনার মতো হিংস্র প্রজাতির প্রাণীর সাথে কে কথা বলতে চাইবে? কী করবেন আর? কী করার আছে? পরিণতি তো পাপেট বানিয়ে রেখেছেন।”
ইথান নূশার কথাগুলো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শোনে। তারপর নূশার দিকে দু-কদম এগিয়ে হালকা হেসে বলে, “আমি তো তোমার সাথে ভালোই কথা বলতে চেয়েছিলাম, তুমিই তো আমার কথার উত্তর দিলে না।”
“আপনার সাথে কথা বলতে সত্যি অর্থে ঘেন্না লাগে!”
“হ্যাঁ, লাগবেই তো। মুখে তো আর আমার এজারের মতো মিষ্টি বাণী ঝরে না, ফ্লার্টিং স্কিলটাও ডাউন।”
“অদ্ভুত! আমাদের কথার মধ্যে এখানে এজার কোথা থেকে এলো? আর এজারের সাথে আমাকে কেন এভাবে জড়াচ্ছেন আপনি? আপনার ভাই তো, আমিও আমার ভাই মানি। এত টক্সিক চিন্তাভাবনা কেন আপনার?”
ইথান নূশার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলে, “টক্সিক? রিয়েলি টক্সিক?”
এ কথা বলে ইথান নূশার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে কাছে টেনে নেয়। নূশা খুবই বিরক্ত হয় ইথানের এরকম করায়। ইথান যখনই কথা বলবে তখনই টানাটানি করবে, অসহ্য লাগে এই বিষয়টি। ইথান নূশাকে কাছে টেনে নিয়ে তার গালে নাক ঘষতে ঘষতে বলে, “আমার সাথে থাকাকালীন যদি আমি জানতে পারি তোমার অন্য কারো সাথে ইটিশপিটিশ চলছে, তাহলে বুঝতেই তো পারছ কী করতে পারি। এতদিনে আমার সম্পর্কে ধারণা নিশ্চয়ই হয়েছে।”
ইথানকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে নূশা ছটফটিয়ে ওঠে, “সরুন আমার কাছ থেকে! আর কনট্রাক্টে তো লেখাই আছে যার যার পার্সোনাল লাইফ ডিভাইডেড, তাহলে আপনি কেন বাধা দেবেন? আপনি আমায় নিয়ে এত জেলাস কী জন্য? গতকাল রাতেও এমন করলেন!”
ইথান নূশার মুখে জেলাসি শুনে নূশার কোমরে দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে। নূশার চোখে চোখ রেখে বলে, “জেলাস? আর আমি? তোমাকে নিয়ে জেলাস হতে যাব কেন? আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম মাহরামটা কে, ব্যাস এতটুকু। আর কনট্রাক্টে আছে কেউ তোমায় টাচ করতে পারবে না, সেজন্য তোমাকে নিয়ে ওয়াচ করছিলাম। তুমি নিজেকে বড় কিছু ভাবতে যেও না। ছয় মাস শেষ হলে কার সাথে কী করবে, কার সাথে থাকবে, কার সাথে শুবে তাতে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
এ কথা বলেই ইথান নূশাকে ছেড়ে দিয়ে হনহন করে রুমে চলে যায়। নূশা কাতর হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন আর তার এসব নিয়ে দুঃখ হয় না, কেন জানি অভ্যস্ত মনে হয় নিজেকে। ইথানের বলা প্রতিটি কথাই হয় বিষধর।
নূশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমে পা রাখে। এসব কথা নিয়ে বসে থাকলে তো তার চলবে না, জীবনে করার মতো অনেক কিছু আছে, সেটা করতে হবে। ইথান রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছে জিম হলে যাওয়ার জন্য। নূশাও নিচে ব্রেকফাস্টের জন্য যায়।
সময় এখন রাত সাড়ে এগারোটা বাজতে চলল। নূশা অ্যাশার ক্যাসেলের কিচেনে নিজের জন্য রান্না করছে। আজ অ্যাশার ক্যাসেলের গার্ডেনে একটা পার্টি রাখা হয়েছে, যে জন্য সেখানেই ডিনারের যাবতীয় আয়োজন করা হচ্ছে। নূশা এসব পার্টিতে যায় না এবং সে যে ইথানের ওয়াইফ, সেটিও পাবলিক করা নয়। নূশা রেস্টুরেন্ট থেকে এসে একফাঁকে ক্যাসেলে ঢুকে পড়েছে, কেউ তাকে অতটা লক্ষ করেনি। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে, নামাজ পড়ে, কিছুক্ষণ পরিবারের সবার সাথে আলাপ শেষ করে এই এলো রান্নাঘরে নিজের জন্য কিছু বানাতে।
খাবার বানানোর মাঝে এজার একবার এসেছিল। এসে নূশাকে কিচেনে দেখে কিছু না বলে আবার হুট করে বেরিয়ে গেল। নূশা মনে করেছে হয়তো কাউকে খুঁজতে এসেছিল, তাই এমন করল। নূশা এসবে পাত্তা না দিয়ে রান্নায় মনোযোগ দেয়।
রান্নার মাঝখানে ডাইনিংয়ে যখন আসে, তখনই কেমন যেন লাগতে শুরু করে নূশার। নূশার চোখ যায় করিডরের দিকে, যেখানে এজার আর একটি মেয়ে ইথানকে নিয়ে নূশাদের ঘরের দিকে যাচ্ছে। ইথান টলমল করছে, ওকে একপ্রকার টেনে অনেক কষ্টে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। নূশা মনে করে, হয়তো ইথান অনেক ড্রিংক করেছে, তাই তারা তাকে রুমে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু নূশা দেখতে পায়, এজার একাই নিচে নেমে ক্যাসেল থেকে বেরিয়ে যায়, সেই মেয়েটি আসে না। এজার ইচ্ছে করে সেই মেয়েকে ইথানের সাথে রেখে গিয়েছে এই বিষয়টি উপলব্ধি হতেই নূশার কলিজা ছ্যাঁত করে ওঠে। একবার মনে হয় দৌড়ে রুমে গিয়ে দেখতে ইথান কী করছে, আবার মনে হয় ইথানই হয়তো এই মেয়েকে চেয়েছে। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে নূশা রুমের দিকে পা বাড়ায়। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে রীতিমতো।
নূশা রুমের সামনে দাঁড়াতেই দরজার কাচ দিয়ে দেখতে পায়, মেয়েটি ইথানের শার্ট খোলার জন্য একপ্রকার ছিঁড়েই নিচ্ছে। নিজের ড্রেসের চেইন খুলে নিয়ে অর্ধনগ্ন হয়ে গিয়েছে সে। মেয়েটির সাদা ফর্সা শরীর বাইরে থেকেই নূশা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মেয়েটি ইথানের দুই হাত নিয়ে জোর করে নিজের কোমরে চেপে ধরছে, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইথানকে কাছে টানার।
তবে নূশার জন্য সবচেয়ে শকিং বিষয় হলো, ইথান মেয়েটির থেকে ছিটকে সরে যাচ্ছে! ও মাতাল অবস্থায় মেয়েটির হাত নিজের কলার থেকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে বলে, “তুমি সরো, তুমি আমার ওয়াইফ নও! তুমি আমার ওয়াইফকে নিয়ে আসো। আমি আমার ওয়াইফ ছাড়া কারো ক্লোজ হই না। যাও এখান থেকে, আর আমার ওয়াইফ নূশাকে নিয়ে আসো আমার কাছে! তাকে আমার খুব প্রয়োজন, আমি সামলাতে পারছি না নিজেকে।”
মেয়েটি ইথানের কথা শুনে আবারো ইথানের কাছে এসে বলে, “আমাকেই নিজের ওয়াইফ মনে করুন। আমি আজ তার হয়ে কাজ করে দিই।”
ইথান এবার মেয়েটির গলা শক্ত হাতে চেপে ধরে হিসহিস করে বলে ওঠে, “আমার ওয়াইফকে নিয়ে আসো! আমার ওয়াইফ ছাড়া আমি অন্য কারও সাথে ইন্টিমেট হবো না।”
বাইরে দাঁড়িয়ে নূশা সবটা বুঝতে পারে। এজার ইচ্ছে করেই ইথানকে এই পতিতার সাথে একই ঘরে রেখে গেছে। নূশা দরজায় নক করতে যাবে, তখনই খেয়াল করে দরজাটা আগে থেকেই ভেজানো। তার মানে, এজার ইচ্ছে করেই দরজাটা খোলা রেখে গেছে যাতে নূশা এসে এই দৃশ্য দেখে এবং তাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়।
নূশা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। তাকে দেখেই মেয়েটি ঘাবড়ে যায়। সে দ্রুত ইথানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, নিজের অবিন্যস্ত ড্রেস ঠিক করতে করতে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় মেয়েটির হাবভাব দেখে মনে হয়, সে ধরে নিয়েছে নূশা হয়তো তাদের মাঝে ঘটে যাওয়া কোনো অন্তরঙ্গ দৃশ্য দেখে ফেলেছে। নূশা রক্তিম চোখে মেয়েটির যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর নিজের দৃষ্টি শীতল করে সে ধীরপায়ে ইথানের দিকে এগিয়ে আসে।
নূশাকে দেখেই ইথান নিজের শার্টটা এক টানে খুলে ফেলে ফ্লোরে ছুড়ে মারে। এতক্ষণ ধরে ওই মেয়েটি কত চেষ্টাই না করল, কিন্তু তার শার্ট খোলাতে পারেনি। আর এখন নূশাকে দেখেই সে নিজেই শার্ট খুলে ফেলল! এই লোক এখন বেহুঁশ অবস্থায় কী যে করবে, কে জানে! শার্টটা ছুড়ে ফেলেই ইথান এগিয়ে এসে নূশার কোমর জড়িয়ে ধরে। তাকে নিজের খুব কাছে টেনে নিয়ে নূশার ঠোঁটের কিনারায় গালে এলোপাতাড়ি চুমু খেতে শুরু করে। ইথানকে শান্ত করতে নূশা তার বুকে, কাঁধে আর পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সে নরম গলায় বলে, “ইথান, আপনি নেশাগ্রস্ত। হুঁশে আসুন!”
কিন্তু ইথান নূশার গলায় মুখ গুঁজে জোরে জোরে শ্বাস নেয়, বুক ভরে নূশার ঘ্রাণ নিতে নিতে বলে, “তুমি আমার ওয়াইফ। তোমার সাথে হুঁশে-বেহুঁশে যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারি আমি, তুমি আমাকে বাধা দিও না। ওরা আমার ড্রিংকের সাথে ড্রাগস মিশিয়ে দিয়েছিল। আমি সেটা দেখেও খেয়ে নিয়েছি, কিন্তু এখন আর নিজেকে সামলাতে পারছি না। আমার খুব গরম লাগছে। তোমাকে কাছে পেতে মন চাচ্ছে। আসো না, আমার আরও কাছে আসো আরও কাছে!”
ইথানের এমন ব্যাকুলতা দেখে নূশা বলে ওঠে, “আর কত কাছে আসব? আছি তো আপনার কাছেই।”
“না, হচ্ছে না! আরও কাছে এসো!” এই বলে ইথান নূশার কাপড় খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু নূশা দ্রুত তাকে আটকে দেয়। কোনো রকমে ইথানকে সামলে নিয়ে সে তাকে বিছানায় বসায়। এরপর তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি এনে জোর করে তাকে খাইয়ে দেয়। নিজের ওড়নার কোণটা পানির জগে ভিজিয়ে নিয়ে সে পরম যত্নে ইথানের চোখ-মুখ মুছে দেয়। এতে ইথানের নেশার ঘোর যেন কিছুটা কাটে।
নেশার ঘোর কিছুটা কমতেই ইথান বিছানার মাঝখানে গা এলিয়ে দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। নূশা ভাবে, ইথান হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। মনে মনে সে বিরক্তি নিয়ে ভাবে, ‘এই বড়লোক মানুষদের কত নাটক! এতক্ষণ ধরে কী সার্কাসটাই না দেখতে হলো!’
নূশা জগটা রাখার জন্য যেই না ঘাড় ঘোরায়, ঠিক তখনই ইথান নিজের মাথাটা দুহাতে চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে সশব্দে চিৎকার করে ওঠে, “আমি কাউকে ছাড়ব না!”
হঠাৎ এমন গগনবিদারী চিৎকার শুনে নূশা হন্তদন্ত হয়ে পড়ে। সে দ্রুত বিছানায় গিয়ে ইথানের মাথার কাছে বসে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে? কাকে ছাড়বেন না?”
ইথান নূশার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে, “আমাকে যে ঠকিয়েছে! আমাকে যে বিশ্রীভাবে ঠকিয়েছে, তাকে আমি কখনোই ছাড়ব না!”
নূশা কিছুই বুঝতে পারে না। কাকে ছাড়বে আর কাকে ধরবে? ইথান কী বলছে এসব? নেশা এখনো কাটেনি বলেই হয়তো আবোলতাবোল বকছে! নূশা যখন এসব ভাবছে, তখনই ইথান নিজের মাথাটা নূশার কোলে গুঁজে দেয়। নেশার ঘোরে সে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “ও আমাকে ঠকিয়েছে, নূশা। ও আমায় শেষ করে দিয়েছে।”
ইথানের এমন কথা আর আচরণে নূশা বড়ই হতবাক হয়ে যায়। হওয়ারই কথা! যে ইথান সবসময় রুক্ষ থাকে, মাঝেমধ্যেই পশুর মতো আচরণ করে, সেই ইথান এখন একটা ছোট বাচ্চার মতো তার কোলে মাথা গুঁজে আছে। নূশা ইথানের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একদম নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, “কে?”
ইথান সহজভাবে উত্তর দেয়, “ইসাবেলা!”
“ইসাবেলা কে?”
ইথান নূশার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “আমার প্রথম প্রেম। যে কিনা আমাকে বড্ড বাজেভাবে ঠকিয়েছে।”
ইথানের মুখে প্রথম প্রেমের কথা শুনে নূশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন অশান্ত হয়ে ওঠে। সে একটু উতলা হয়েই জিজ্ঞেস করে, “কেন ঠকালো? আর সে এখন কোথায়?”
ইথান এ কথা শুনে অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠে। তারপর বলে, “সে তো আর নেই! সে তো কবরে। “
“সে কি মারা গেছে?”
“হ্যাঁ, গেছে তো। কিন্তু সে এমনি মারা যায়নি, আমি তাকে মেরে ফেলেছি।”
এ কথা শুনে নূশার হুঁশ উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কী বলছে এই লোক? নেশার ঘোরে কী আজেবাজে বকছে কে জানে! নূশা আমতা আমতা করে বলে, “কী… কী বললেন?”
ইথান হাসতে হাসতে বলে, “আমাকে ঠকিয়েছিল, তাই আমি ওর হাত-পা কেটে দিয়ে ওকে জীবন্ত কবর দিয়ে মেরে ফেলেছি। খুব ভালো করেছি না?”
নূশার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায় এক শীতল স্রোত। এই ইথান এসব কী বলছে!
চলবে,,
এই গল্পটি একটি সুন্দর গল্প হবে প্রথম প্রথম খারাপ হচ্ছে কিন্তু বলে রাখি আপনারা একে পছন্দ করবেন যদি লিখি। আপনারা কি গল্প আর চান না? যদি না চান তাহলে আমি বন্ধ করে দিব। এত কম রেসপন্স
Share On:
TAGS: তুষারিণী, সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৭
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৫
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৪
-
তুষারিণী পর্ব ৪
-
তুষারিণী পর্ব ১
-
তুষারিণী পর্ব ৫
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৮
-
তুষারিণী গল্পের লিংক
-
তুষারিণী পর্ব ৮
-
তুষারিণী পর্ব ৬