Golpo romantic golpo তুমি এলে অবেলায়

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৮


তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব – ৮)

আতিয়া_আদিবা

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ধানমন্ডির সেই জীর্ণ গলি থেকে বের হয়ে এল শেহজাদের রাজকীয় মার্সিডিজ। চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে রাতের জমে থাকা বৃষ্টির জল আর ঝরা পাতা। শেহজাদ স্টিয়ারিং হুইলে তার লম্বা আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরেছে,
হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে বারবার।

শেহজাদ গত এক ঘণ্টা ধরে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। তার এই নীরবতা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। শেহজাদ চায় সামাইরা কথা বলুক। তার অনুমতি ব্যতীত বাবার বাড়ি থাকার বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চাক। কিংবা একটু কুঁকড়ে থাকুক।

কিন্তু সামাইরা তার স্বভাবসুলভ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। অল্প অল্প করে বৃষ্টিভেজা শহরটার জেগে ওঠা দেখছে।

গাড়ি যখন ‘দ্য স্কাইলাইন ভিলা’র বিশাল গেটের সামনে এসে থামল, শেহজাদ সজোরে ব্রেক কষল। টায়ারের শব্দ রাস্তার নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। সামাইরা যখন নামতে যাবে, ঠিক তখন শেহজাদ তার হাতটা খপ করে ধরল। তার স্পর্শে বিচরণ করছে বরফশীতল কাঠিন্য। শেহজাদ সামাইরার চোখের দিকে না তাকিয়েই দাঁতে দাঁত চিপে বলল,

-পরবর্তীতে কখনো যেন আমার পারমিশন ছাড়া এই ভিলার চৌকাঠ পার হওয়ার দুঃসাহস না দেখাও। এই ভিলার একটা স্ট্যাটাস আছে সেটা বজায় রাখতে শেখো।

সামাইরা তার হাতটা হ্যাঁচকা টানে ছাড়িয়ে নিল। সে শেহজাদের চোখে চোখ রেখে খুব ধীরে, অবজ্ঞার সাথে চোখের মণি উল্টে দিল। মুখে কিছু বলল না।

সামাইরার এই এক চিলতে অঙ্গভঙ্গি যেন সরাসরি প্রত্যাখ্যানের চেয়েও বেশি ধারালো বলে মনে হল শেহজাদের কাছে। সামাইরা গাড়ি থেকে নেমে গটগট করে ভিলার মূল গেটের ভেতর ঢুকে গেল।

শেহজাদ স্টিয়ারিং-এ সজোরে ঘুসি মারল। একবার নয়। বেশ কয়েকবার। তার নার্সিসিস্টিক মনটা হাহাকার করে উঠল। এই মেয়েটা তাকে গ্রাহ্যই করল না! কখনোই করে না!

শেহজাদ আর বাড়িতে ঢুকল না। গিয়ার বদলে গাড়ি ছোটাল ‘রহমান টাওয়ার’ এর দিকে।

শেহজাদ অফিসের কেবিনে ঢুকল। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে নাতিশীতোষ্ণ পানির ঝাপটা দিল। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো দেখল। সামাইরার শরীরের বুনো রজনীগন্ধার ঘ্রাণ এখনো তার নাকে লেগে আছে। সে বিরক্তিভরা মুখে জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। ইন্টারকমে তার ব্যক্তিগত সহকারী রফিককে ডাকল।

-রফিক, আইফোনের লেটেস্ট মডেলটা কিনে নিয়ে এসো। কুইক!

রফিক চলে যাওয়ার মিনিট দশেকের মাথায় কেবিনের দরজাটা কোনোপ্রকার অনুমতি ছাড়াই দড়াম করে খুলে ফেলল রাইসা। তার চোখেমুখে ঝড়ের পূর্বাভাস। সে ভ্রুঁ কুচকে শেহজাদের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল,

-হোয়্যার দ্য হেল হোয়্যার ইউ, শেহজাদ?

রাইসা চিৎকার করে উঠল।

-রাত থেকে তোমার ফোন বন্ধ! আমি কতবার ফোন করেছি, মেসেজ করেছি। তুমি কি জানো আমি কতটা প্যানিকড ছিলাম?

শেহজাদ চেয়ারে সামান্য হেলান দিয়ে বসল। তার চোখেমুখে এক ধরণের উদাসীনতা। সে শান্ত গলায় বলল,

-ফোনটা হাত ফসকে পড়ে ভেঙে গেছে। রফিককে বলেছি নতুন ফোন আনতে। তাছাড়া কাল রাতে একটা ব্যবসায়িক কাজে আটকা পড়েছিলাম। তুমি কি এখন একটু কাজ করতে দেবে আমাকে?

রাইসা ধীরপায়ে এগিয়ে এল। শেহজাদের টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল সে। রাইসা তীক্ষ্ণ নজরে শেহজাদকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
তার আচরণের এই নির্লিপ্ততা রাইসার মনে সন্দেহের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিল।

-ব্যবসার কাজে আটকা পড়েছিলে? আমি জানি, তুমি কাল রাতে বাড়ি ফেরোনি।

রাইসার কণ্ঠস্বর কাঁপছে রাগে।

শেহজাদ বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপটা সামনে টেনে নিল।

-ডোন্ট ইনভেস্টিগেট মি, রাইসা। আই হেইট দিস।

রাইসা এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে উচ্চস্বরে বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসল।

-আর ইউ ইগনোরিং মি, শেহজাদ? ওই বস্তির মেয়েটার প্রেমে পড়েছো তুমি? ইউ আর ফলিং ইন লাভ উইথ দ্যাট বি*চ, আরেন্ট ইউ?

শেহজাদ ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। সে থমথমে গলায় বলল,

-রাইসা, তোমার ভাষা ঠিক করো। হোয়াট রাবিশ আর ইউ টকিং!

-রাবিশ? আমি সত্যিটা বলছি! তুমি ওই বস্তির মেয়েটার জন্য আমাকে অবহেলা করছ। এক্সেপ্ট ইট শেহজাদ, শি ইজ জাস্ট এ বি*চ!

-স্টপ ইট রাইসা!

শেহজাদ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর কেবিনের কাঁচের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।

-ডোন্ট কল হার দ্যাট। শি ইজ মাই ওয়াইফ। শি ইজ দ্য পার্ট অফ রহমান ফ্যামিলি। ওকে অসম্মান করে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলে তোমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি।

রাইসা একথা শুনে উন্মাদ হয়ে গেল। সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো মেঝেতে এলোমেলো ভাবে ফেলে দিল।

-সম্মান? ওই মেয়ের জন্য সম্মান? আমি একশবার বলব শি ইজ এ বিচ! বিচ! বি*..

রাইসার মুখের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই শেহজাদের হাতটা বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে এল।

তীব্র চড়ের শব্দে পুরো কেবিনটা মুহুর্তেই শান্ত হয়ে গেল।

রাইসা গালে হাত দিয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে শেহজাদের দিকে তাকাল। তাদের তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক যেন এই এক চড়ে নড়বড়ে হয়ে গেল।

-আই নিউ ইট…
রাইসা ফিসফিস করে বলল। তার চোখের জল উপচে পড়তে লাগল।

-আই ফাকিং নিউ ইট। তুমি ওর প্রেমে পড়েছ। স্রেফ ওর জন্য তুমি আমার গায়ে হাত তুললে?

শেহজাদ নিজের হাতের দিকে সন্তপর্ণে তাকাল। তার হাতটাও কাঁপছে। সে সবসময় নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসে। কিন্তু আজ তার স্ত্রীর প্রতি হওয়া অবমাননা সে সইতে পারল না।

রাইসা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে তার ব্যাগটা হ্যাঁচকা টানে নিয়ে দরজার দিকে ছুটল। যাওয়ার আগে কান্নাভেজা গলায় বলে গেল,

-ইউ উইল রিগ্রেট দিস, শেহজাদ।

দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। শেহজাদ তার লেদার চেয়ারে বসে পড়ল। পুরো কেবিনে এখন ভয়াবহ নিস্তব্ধতা বিরাজমান। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল কুয়াশা কেটে গিয়ে মিষ্টি রোদ্দুরে ছেয়ে গেছে চারিপাশ।

শেহজাদ অফিস থেকে ফিরল সন্ধ্যার পরপর।
তার চোখেমুখে মেজাজের সেই চিরচেনা রুক্ষতা। রাইসার গালে চড় বসানোর বিস্বাদ স্মৃতিটা এখনো মাথায় ঘোরাঘুরি করছে। সে জ্যাকেটটা লিভিং রুমের সোফায় ছুঁড়ে ফেলল। এরপর দোতলায় উঠে গেল।

শয়নকক্ষের দরজা খুলতেই তার নাসারন্ধ্রে আছড়ে পড়ল সেই চেনা বুনো রজনীগন্ধার ঘ্রাণ। ঘরের আলো নেভানো। বিশাল স্মার্ট টিভির স্ক্রিন থেকে উপচে পড়া আলোয় সামাইরার মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে। সামাইরা বিছানায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ পর্দার দিকে। শেহজাদ ভেতরে ঢুকতেই পুনরায় কানে এলো সেই চিরচেনা সুর। ‘টাইটানিক’।

শেহজাদ দেখল পর্দায় ভেসে উঠেছে জ্যাক-রোজের
তীব্র ভালোবাসার সেই দৃশ্য। গাড়ির ভেতরে কাটানো জ্যাক আর রোজের একান্ত মুহূর্ত।

শেহজাদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সামাইরা এতটাই মগ্ন ছিল যে শেহজাদের উপস্থিতি টেরই পায়নি। সে সামান্য গলা খাঁকারি দিল।

সামাইরা চমকে উঠে তাকাল দরজার পানে। শেহজাদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে হঠাৎই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তড়িঘড়ি করে রিমোট খুঁজতে লাগল চারিপাশে। বিছানার চাদর, বালিশের নিচে, হন্যে হয়ে রিমোট হাতড়াচ্ছে সে, কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত রিমোটটি কোথাও নেই। কই রেখেছে সে?

শেহজাদ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সামাইরাকে এ অবস্থায় দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে নড়ল না। উপভোগ করতে লাগল সামাইরার এই অপ্রস্তুত অবস্থা।

সামাইরা যখন বুঝল রিমোট পাওয়ার কোনো আশা নেই, তখন সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে সরাসরি টিভির প্লাগটাই সজোরে টেনে খুলে ফেলল। মুহূর্তেই ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। কেবল জানালার ওপার থেকে আসা ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় দুজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে।

শেহজাদ ধীরপায়ে এগিয়ে এল। সামাইরা ভড়কে গেল। এক পা দু পা করে পেছতে লাগল। শেহজাদ সামাইরার খুব কাছে গিয়ে থামল। স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল,

-তুমি কি সবসময় এই একটা মুভিই দেখো? যতবার দেখি, তুমি এই টাইটানিক নিয়েই পড়ে থাকো। এর কারণটা কী?

সামাইরার বুক তখন ধকধক করছে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল,

-এই মুভির সবকিছু আমার ভালো লাগে। এই একটা মুভিতে সব ধরণের ইমোশন আছে। না পাওয়ার বেদনা আছে। আভিজাত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আছে। আর আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ছোটবেলা থেকেই আমি ভাবতাম, আমার জীবনেও যদি জ্যাকের মতো কেউ আসত! যে ভালোবেসে নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করবে না!

শেহজাদ হো হো করে হেসে উঠল। বিদ্রূপ মাখা সে হাসি।

-জ্যাক? সিরিয়াসলি? এমন সস্তা, ছন্নছাড়া জ্যাকের মতো ছেলেরা কেবল সিনেমাতেই জীবন দেয় সামাইরা। বাস্তবে তারা সুযোগ পেলেই সটকে পড়ে। কি আর বলব! আসলে তোমাদের মতো মিডল ক্লাস মেয়েদের যত্তসব আজাইরা ফ্যান্টাসি থাকে। সস্তা প্রেমের গল্প পড়ে বড় হওয়া মেয়েদের মস্তিস্ক এর বাইরে আর কিছু ভাবতে পারে না। জ্যাকের কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল না, স্ট্যাটাস ছিল না। সে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে মারা গিয়েছিল। দ্যাটস নট লাভ, দ্যাটস স্টুপিডিটি।

সামাইরা এবার ঘুরে দাঁড়াল। দৌড়ে গিয়ে ঘরের বাতি জ্বালালো।তার চোখে এখন আগুনের ফুলকি। সে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,

-আপনি জ্যাকের ত্যাগের মহিমা বুঝবেন না, কারণ আপনার কাছে সম্পর্ক মানেও একটা চুক্তি। বিজনেস ডিলের মতন। আপনি তো কেবল জানেন কীভাবে মানুষকে অপমান করতে হয়।

শেহজাদ তেড়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। সুফিয়া রহমান ঘরে ঢুকলেন। তিনি দুজনের থমথমে মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। ওনার অভিজ্ঞ চোখ ঠিকই ধরে ফেলল যে এখানে কোনো কোল্ড ওয়ার চলছে। বিষয়টিকে উপেক্ষা করে তিনি বললেন,

-ডিস্টার্ব করলাম নাকি তোদের?

সামাইরা ব্যস্ত হয়ে বললেন,

-না, মা। আসুন ভেতরে আসুন!

সুফিয়া রহমাম শেহজাদের মুখের দিকে তাকালেন। শেহজাদের হাতের শিরাগুলো ফুলে আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে রাগ চাপিয়ে রেখেছে।

সুফিয়া বললেন,

-বলছিলাম যে, তোরা এখনো হানিমুনে যাচ্ছিস না কেন? বিয়ের পর তো কতদিন হয়ে গেল।

শেহজাদ ঝটপট উত্তর দিল,

-মা, পোর্টের ঝামেলাটা খুব বেড়েছে। লইয়ারদের সাথে ডেইলি মিটিং করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় যাওয়াটা কঠিন।

সামাইরাও হানিমুন এড়ানোর জন্য দ্রুত বলে উঠল,

-মা, আর আমিও ভাবছিলাম সামনের মাস থেকে ভার্সিটি পুনরায় শুরু করব। গ্রাজুয়েশনটা শেষ করা খুব প্রয়োজন।

সুফিয়া রহমান দুজনের অজুহাতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন। ওনার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন,

-তোদের বাজে কথা রাখ তো! কাজ কোনোদিন শেষ হবে না শেহজাদ। আর সামাইরা মা, পড়াশোনা তো হবেই, কিন্তু আগে নিজেদের জীবনটা একটু গুছিয়ে নাও।

শেহজাদ তার মা-কে বোঝানোর চেষ্টা করল,

-কিন্তু মা…

-আমি কোনো কথা শুনব না। আগামী দুদিনের মাঝে তোরা হানিমুন ডেস্টিনেশন ফিক্সড করবি। আমি চাই তোরা এই গুমোট শহর ছেড়ে দূরে কোথাও গিয়ে ঘুরে আয়। এটা আমার অর্ডার, শেহজাদ।

সুফিয়া বেগম তার কথাকে চূড়ান্ত ঘোষণা করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সামাইরা শেহজাদের দিকে ফিরে সরাসরি বলল,

  • এই শুনুন, আমি কোনো হানিমুনে যেতে পারব না। আপনার সাথে এক ঘরে থাকাটাই আমার জন্য কষ্টের, সেখানে বাইরে গিয়ে রোমান্সের নাটক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

শেহজাদ এই প্রথমবার তার টি-শার্ট সামাইরার সামনে খুলে ফেলল। উন্মুক্ত হয়ে গেল তার জিম করা পেটা শরীর। সামাইরার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল এ দৃশ্য দেখে। শরীরে মৃদু বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল। ঢোক গিলল সামাইরা।

শেহজাদ সবটাই বুঝতে পারল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে সে আলমারি থেকে ক্যাজুয়াল পোশাক বের করল। এরপর সামাইরার দিকে তাকিয়ে সে পোশাক পরতে পরতে বলল,

-যাওয়ার শখ আমারও নেই সামাইরা। কিন্তু আমি আমার মায়ের কথা অমান্য করি না। আমার মা সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন। বাবার অবহেলা আর একাকীত্বে ওনার জীবনটা বিষিয়ে গিয়েছিল। আমি ওনাকে আর কষ্ট দিতে পারব না। ওনার শেষ বয়সের সকল ইচ্ছা আমি পূরণ করব।

সামাইরা খিলখিল করে হেসে উঠল। অবজ্ঞার সেই হাসি। সে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,

-কী চমৎকার হিপোক্রেসি! আপনার বাবা আপনার মায়ের সাথে যা করেছেন, আপনি আমার সাথে ঠিক অভিন্ন আচরণই করছেন। আপনিও তো আপনার প্রেমিকাকে নিয়ে মেতে আছেন, আমাকে প্রতি মুহূর্তে ছোট করছেন। তবে আমার কি মনে হয় জানেন মিস্টার রহমান? আপনি আপনার তথাকথিত প্রেমিকা রাইসাকেও ভালোবাসেন না।

শেহজাদ রুক্ষ গলায় ধমকের সুরে বলে উঠল,

-হাউ ডেয়ার ইউ, সামাইরা?

সামাইরা শীতল গলায় বলল,

-মিথ্যা কিছু তো বলি নি। আপনি আপনার প্রেমিকাকে ভালোবাসলে ওকেই বিয়ে করতেন। আপনার মা-কে যেভাবেই হোক রাজি করাতেন।
যাজ্ঞে, তবুও আপনার নিকট আমি কৃতজ্ঞ।বিয়ের রাতেই সবটা পরিষ্কার করে বলার জন্য।
এই বিয়ে আমার কাছে স্রেফ একটি মানবিক চুক্তি। আপনার মায়ের শান্তির জন্য আমি এই অভিনয় করছি। তবে এই তথাকথিত ‘হানিমুন’ আমি মেনে নিতে পারব না।আমি আপনার সাথে যাব না।

সামাইরা গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।শেহজাদ ক্ষণিককাল থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। সামাইরার কথাগুলো তীরের মতো তার বুকে বিঁধল। ‘হিপোক্রেসি’ শব্দটা তার মস্তিস্কে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে কি সত্যিই তার বাবার মতো হয়ে গেছে? যে বাবাকে সে সারাজীবন ঘৃণা করেছে, আজ সে-ই কি না তার স্ত্রীর চোখে ঠিক একই রকম প্রতিচ্ছবি?

শেহজাদের ইগো চরমভাবে আহত হলো। সে তার পকেট থেকে ফোন বের করল। ব্যক্তিগত সেক্রেটারিকে ফোন লাগাল।

-হ্যালো, কাল দুপুরের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম স্থানের দুটি ফার্স্ট ক্লাস টিকিট আর ভিসার ব্যবস্থা করো। কোনো অজুহাত শুনব না। উইথিন টোয়েন্টি ফোর আওয়ার্স আই ওয়ান্ট এভরিথিং অন মাই টেবিল।

ফোনটা রেখে শেহজাদ সোফায় গা এলিয়ে দিল। দামি লাইটার পকেট থেকে বের করে সিগারেট ধরালো। আয়েশ করে সিলিং এর দিকে ধোয়া ছেড়ে রহস্যময় হাসি হেসে ফিসফিস করে বলল,

-আই উইল মেইক ইউ ফল ইন লাভ উইথ মি, সামাইরা। আমি শেহজাদ রহমান। বিজনেস টাইকুন শেহজাদ রহমান। আমি যা চাই, তা ছিনিয়ে নিতে জানি। তুমি আমার প্রেমে পড়বে। আমাকে পাগলের মত ভালোবাসবে। এরপর…

শেহজাদ কথা শেষ করল না। অদ্ভুতভাবে হাসতে লাগল।

(চলবে…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply