Golpo romantic golpo তুমি এলে অবেলায়

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৭


তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব – ৭)

আতিয়া_আদিবা

সামাইরার ঘরটা ছোট, কিন্তু বেশ টিপটপ আর ছিমছাম। জানালার পাশে রাখা সেই পুরনো ঘুনে ধরা কাঠের টেবিল, যেখানে বসে সে রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিত। টেবিলের ওপর রাখা সস্তা একটি কলমদানি। কয়েকটা গল্পের বই আর ধুলো জমা একটা ছোট আয়না। সামাইরা হাত বাড়িয়ে টেবিলটা ছুঁয়ে দেখল। আঙুলের ডগায় এক চিলতে ধুলো লেগে এল।
ধূলোর দিকে তাকিয়ে সামাইরার মনে হল, এই ঘরটা তার অনুপস্থিতিতে কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে! সে বিছানায় গিয়ে বসল। সাধারণ তোশক আর সুতির চাদর, অথচ এই বিছানায় বসার পর যে প্রশান্তি সে অনুভব করল, তা গত কয়েকদিনে শেহজাদের ভিলাতে পায়নি।

​জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকাল সে। উঠোনের এক কোণে সেই পেয়ারা গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির জল পেয়ে পাতাগুলো সতেজ হয়ে উঠেছে। আরও ঘন সবুজ দেখাচ্ছে। সামাইরা যেন আরোও একবার নিজের অস্তিত্বের শেকড় খুঁজে পেল!

চোখজোড়া সামান্য বুজে আসতেই দরজায় মৃদু করাঘাত শোনা গেল।

ঠক। ঠক।

​ভেতরে এলেন সামাইরার বাবা, আমিনুল হক সাহেব। তার দু হাতে দুকাপ ধোঁয়া ওঠা চা। ওনার পরনে সেই পুরনো আইরন বিহীন ফতুয়া। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মেয়ের পাশে এসে তিনি আলতো করে বসলেন। হাসিমুখে বললেন,

​- মা রে, তোর জন্য নিজের হাতে চা বানালাম। দেখ তো চিনি বোধহয় একটু কম হয়েছে!

​সামাইরা কাপটা হাতে নিল। চায়ের উষ্ণতা পেতেই তার বিষন্নতা কেটে গেল। কাপে এক চুমুক দিয়ে মৃদু হাসল। বলল,

  • একদম ঠিক আছে বাবা। তোমার বানানো চায়ের স্বাদই আলাদা। আমার সামনে যদি একশ জনের বানানো চাও রাখা হয়, তোমার বানানো চা খুব সহজেই আলাদা করতে পারব।

​আমিনুল সাহেব জানালার ওপারে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার কপালে চিন্তার কয়েকটি ভাঁজ ফুটে উঠল। তিনি ধীর গলায় বললেন,

  • রিটায়ারমেন্টের ডেট তো চলে এল মা। সামনের মাসেই আমার শেষ কর্মদিবস। সরকারি অফিসের এই ফাইলপত্রের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাব এটা ভেবে শান্তি লাগছে। আবার রিটায়ারমেন্টের পরের দিনগুলো কীভাবে কাটবে তা ভেবে মনটা বড় অশান্ত বোধ করছে। তুইও নেই। বাড়ি বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

​সামাইরা বাবার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। আমিনুল সাহেবের হাতটা বেশ খসখসে। অভিজ্ঞ এই খসখসে হাতটি সারাজীবনের লড়াইয়ের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। সামাইরা স্বাভাবিক গলায় বলল,

  • বাবা, আমি ভাবছিলাম সামনের মাস থেকে পুনরায় ভার্সিটি শুরু করব। থার্ড ইয়ারের কয়েকটা সাবজেক্ট বাকি ছিল, ওগুলো ক্লিয়ার করতে হবে। পড়াশোনাটা মাঝপথে থামিয়ে রাখা ঠিক হবে না।

​আমিনুল সাহেব মেয়ের দিকে সপ্রতিভ দৃষ্টিতে তাকালেন। বললেন,

  • খুব ভালো সিদ্ধান্ত মা। শিক্ষাই তো মানুষের আসল অলঙ্কার। তবে… তোর স্বামী আর শাশুড়ি কি রাজি হবেন? বড় ঘরের ব্যাপার তো, ওনাদের মত নেওয়াটা জরুরি।

​সামাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। পুনরায় জানালার দিকে তাকাল। পর্দাটা হিমশীতল বাতাসের দোলায় পতপত করে উড়ছে।
সে ম্লান হেসে বলল,

  • শাশুড়ি মা খুব ভালো মানুষ বাবা। ওনার মতন অমায়িক আর উদার মনের মানুষকে শাশুড়ী হিসেবে পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। আমাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখেন। সারাক্ষণ আমার সুবিধা অসুবিধার দিকে ওনার নজর। ওনাকে বললে উনি নিশ্চয়ই খুশি মনে রাজি হবেন।

​আমিনুল সাহেব মেয়ের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, সামাইরা তার শাশুড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
অথচ পুরো কথার মাঝে একবারও স্বামীর নামটি উচ্চারণ করেনি। ওনার অভিজ্ঞ পিতৃ হৃদয়ে খটকার উদয় হল। উনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,

  • আর জামাই বাবা?

সামাইরা চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

আমিনুল সাহেব বললেন,

​- মা রে, শাশুড়ির এত প্রশংসা করলি, কিন্তু জামাইকে নিয়ে তো একটা শব্দও খরচ করলি না। সবকিছু ঠিক আছে তো?

​বাবার এই প্রশ্নে সামাইরা থমকে গেল। তার গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এল। সে হাসার চেষ্টা করল বটে তবে সেই হাসিটা ওষ্ঠাধর পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই মিলিয়ে গেল। শেহজাদের সেই শ্লেষমাখা কথা, রাইসার প্রতি তার অন্ধ প্রেম, আর সামাইরাকে প্রতি মুহূর্তে অপমান করার সেই দৃশ্যগুলো ঝড়ের বেগে তার মনশ্চক্ষুতে ভেসে উঠল।

​সামাইরার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গাল বেয়ে টুপ করে চায়ের কাপে পড়ল। সে মুখ নিচু করে সেই জলটুকু লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল।

​আমিনুল সাহেবের আর বুঝতে বাকি রইল না যে ওনার কলিজার টুকরো মেয়েটা ভালো নেই। তিনি কাপটা সরিয়ে রেখে সামাইরাকে পরম মমতায় বুকের মাঝে টেনে নিলেন। বাবার সেই চিরচেনা গায়ের ঘ্রাণ পেয়ে সামাইরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

​- মা, কাঁদিস না। আমি তো আছি। এখনো বেঁচে আছি।

আমিনুল সাহেবের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এল। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দৃঢ় গলায় বললেন,

​- শোন মা, আমি সারাজীবন ছোট চাকরি করেছি। কিন্তু মাথা নিচু করে বাঁচিনি কোনোদিন। তোকেও আমি মাথা নত করতে শেখাইনি। যদি কোনোদিন মনে হয় তোর আর সহ্য হচ্ছে না, এই সম্পর্কটা তোর আত্মসম্মানকে চুরমার করে দিচ্ছে তবে কখনো চেষ্টা করবি না জোর করে মানিয়ে নিতে। সমাজের ভয়ে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করবি না, খবরদার!

​সামাইরা বাবার বুকের গহীন থেকে মুখ তুলে তাকাল। তার ঝাপসা চোখে এক চিলতে আশার আলো। আমিনুল সাহেব মেয়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন,

​- এই বাড়িটা তোর, মা। এই নোনা ধরা দেয়াল আর বৃষ্টির জল জমা উঠোনটার মালিক তুই। নিজের বাড়িতে মাথা উঁচু করে থাকবি। আমার একার পেন্সনের টাকায় আমাদের বাবা-মেয়ের ডাল-ভাত চলে যাবে। কিন্তু তোর চোখের জল আমি সইতে পারব না রে, মা।

​বাবার এই আশ্বাসবাণী সামাইরার ভেতরের কংক্রিটের স্তুপকে এক নিমেষে সরিয়ে দিল।
​সে আশ্বস্ত হয়ে দীর্ঘক্ষণ বাবার বুকে মাথা রেখে বসে রইল। বাইরের পুনরায় ছিটে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পেয়ারা গাছের পাতায় টিপটিপ জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। সামাইরা বাবাকে আরোও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

★★★

শেহজাদ আজ তার বিশাল বেডরুমে একা। ঘরের সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম চালু থাকলেও কেন জানি তার হাড়ের ভেতর এক ধরণের কাঁপুনি হচ্ছে।

​বিকেলে সে একটা গাড়ি পাঠিয়েছিল ধানমন্ডিতে। ড্রাইভারের ফোনে আসা সেই অবাধ্য বার্তা এখনো তার কানে গলিত সীসার ন্যায় ঠেকছে।

  • স্যার, ম্যাডাম আজ আসবেন না।

শেহজাদ রহমানের জীবনে ‘না’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ আজ অতি সাধারণ একটি মেয়ে তাকে অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করল।

​শেহজাদ পায়চারি করছে। তার হাতে রাখা দামী লাইটারটা বারবার জ্বলছে আর নিভছে। সেই খট খট শব্দই ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভাঙ্গছে বারবার।

শেহজাদ একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে।
ধোঁয়ার কুন্ডলীগুলো ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা ল্যাম্পের আলোয় মিশে এক অপার্থিব মায়াজাল তৈরি করছে। জানালার পর্দাটা সামান্য সরানো, সেখান দিয়ে বাইরের কুয়াশাটুকুই দেখা যাচ্ছে।

​হঠাৎ বিছানায় রাখা ফোনটা সশব্দে কেঁপে উঠল। রাইসার কল করেছে। স্ক্রিনে ফুটে থাকা রাইসার সেই হাসিমাখা ছবিটা শেহজাদের কাছে বড্ড বিরক্তিকর লাগছে। সে ফোনটা হাতে নিল। কিন্তু কল রিসিভ করল না। রাইসার সেই অতি চেনা আহ্লাদ শোনার মতো মানসিক স্থিতি তার নেই।

দ্বিতীয় বার কল এলো। শেহজাদ শান্ত ভঙ্গিতে অপেক্ষা করল কল থেমে যাওয়ার।

তৃতীয় বার কল এলো। এবার সে ফোনটা সজোরে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। মুহুর্তেই খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেলো শেহজাদের লেটেস্ট মডেলের আইফোনটি।

​শেহজাদ আরোও কিছুক্ষণ পায়চারি করল। এরপর ঘুমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম যেন আজ তার দুশমন হয়ে দাঁড়িয়েছে! ঘরের প্রতিটি কোণ যেন তাকে বিদ্রূপ করছে।

শেহজাদের বারবার মনে হতে লাগল এই ঘরে কিছু একটা নেই। কিসের যেন অভাব!

​ঘড়ির কাটা তখন বারোটা পার করেছে। শেহজাদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঝটপট তার ক্যাজুয়াল টি শার্টের ওপর জ্যাকেটটা চাপিয়ে নিল। ড্রাইভারকে না ডেকে নিজেই মার্সিডিজের চাবি হাতে নিল।

ধানমন্ডির দিকে গাড়ি যখন সজোরে ছুটছে, শেহজাদ তখন স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে বিড়বিড় করে বলল,

  • “ইউ কান্ট ডু দিস টু মি সামাইরা, ইউ জাস্ট কান্ট!”

​ধানমন্ডির সেই সরু গলিটা এখন একদম নিঝুম। দু-একটা নেড়ি কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে।

পুরনো বাড়িটার সামনে শেহজাদের গাড়ি থামল। টিমটিমে আলোয় বাড়ির শেওলা ধরা দেয়ালগুলো কেমন বিভীষিকাময় দেখাচ্ছিল। শেহজাদ সজোরে কলিং বেল টিপল। একবার, দুবার।

​কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে খড়খড় শব্দ শোনা গেল। আমিনুল সাহেব দরজা খুললেন। ঘুমের ঘোরে চশমাটা নাকের ডগায় ঝুলে আছে। জামাইকে এত রাতে দরজায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন।

  • আরে শেহজাদ বাবা! তুমি এত রাতে? কোনো অঘটন ঘটেছে বাবা? আমিনুল সাহেবের গলায় ভয়ের কম্পন।

​শেহজাদ এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সালাম দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল,

  • সামাইরা কোথায়?

শেহজাদ উত্তরের অপেক্ষা করল না। অনুমতি ছাড়াই আমিনুল সাহেবের পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে গটগট করে সামাইরার শোবার ঘর খুঁজতে লাগল।

সামাইরার ঘরের ​দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল। শেহজাদ ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ঘরের কোণে একটা পুরনো টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সামাইরা অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। টেবিল ল্যাম্পের আলো ওর মুখে এক অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে। সামাইরা কম্বল মুড়ি দিয়ে একপাশ ফিরে শুয়ে আছে।

শেহজাদ ঘরের ভেতরে পা রাখতেই এক তীব্র ঘ্রাণ তাকে গ্রাস করল। বুনো রজনীগন্ধার ন্যায়! শেহজাদ বুঝল, এই গন্ধটার অভাব মেটাতেই আজ সে পুরো ঢাকা শহর চষে এখানে এসেছে।

​শেহজাদের গলার আওয়াজে সামাইরার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে চোখ পিটপিট করে উঠে বসল। শেহজাদকে নিজের শিয়রে যমের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বিস্ময়ে প্রায় বোবা হয়ে গেল।

​- আপনি? আপনি এখানে কেন?
সামাইরার কণ্ঠে রাজ্যের বিস্ময় ঝরে পড়ছে।

​শেহজাদ নিজের ভেতরের সেই হাহাকার লুকাতে এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে দম্ভের সাথে বলে উঠল,

  • কী পারফিউম ব্যবহার করো তুমি? এত বিশ্রী গন্ধ, দম আটকে আসছে আমার। এই সস্তা জিনিস আর কোনোদিন ব্যবহার করবে না।

​সামাইরা বিছানা ছেড়ে নেমে এলো। তার আলুথালু চুল আর লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো শেহজাদের দিকে স্থির। সে টিপ্পনী কেটে বলল,

  • বিশ্রী লাগলে এখানে কেন এসেছেন মিস্টার রহমান? আপনার ভিলাতে তো অনেক দামী পারফিউমের সংগ্রহ আছে। আমার এই নোনা ধরা ঘরে আপনার দম আটকালে দয়া করে এখনই বিদায় হোন। আমি শাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে পারমিশন নিয়েই আজ নিজের বাড়ি থাকছি।

​শেহজাদ একধাপ এগিয়ে এল। তাদের দুজনের ছায়া এবার ল্যাম্পের আলোয় দেয়ালে দৃশ্যপট আঁকছে।

  • মায়ের পারমিশন নিয়েছ, কিন্তু আমার পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করো নি। ভুলে যেও না কাগজে-কলমে তুমি আমার আমার স্ত্রী। আমার পারমিশন ছাড়া এই রাত দুপুরে ভিলা ছেড়ে থাকার সাহস হয় কী করে?

​সামাইরা আরোও বেঁকে বসল। জেদি কণ্ঠে বলল,

  • আপনার দম্ভটা একটু কমান। আমরা দুজনই জানি দুদিন আগে কিংবা পরে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে। তবে কেন বারবার আমার ওপর অধিকার খাটাতে আসছেন? আমি আজ যাব না। না, মানে না।

​শেহজাদ কিছুক্ষণ সামাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সামাইরার চোখের কোণে এক চিলতে বিদ্রোহ খেলা করছে। শেহজাদ রাগ করল না। মুচকি হাসল। হঠাৎ জ্যাকেটটা খুলে সে খাটের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। বলল,

​- ঠিক আছে। তুমি যাবে না যখন, আমিও যাচ্ছি না। ভোর হলে তোমাকে নিয়েই ফিরব আমি। তার আগে এক কদমও নড়ব না এখান থেকে।

​সামাইরা হতভম্ব হয়ে গেল। এই মানুষটা কি সত্যিই পাগল? সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে রাগী গলায় বলল,

  • এই আপনি কি মেন্টাল?

শেহজাদ নির্বিকারভাবে সামাইরার সেই ছোট কাঠের বিছানায় গিয়ে জাঁকিয়ে বসল।

​- শুয়ে পড়ো সামাইরা। রাত অনেক হয়েছে। ভোরেই আমরা বেরুব।

সামাইরার ​বিছানাটা ছোট। একজনের জন্য বেশ আরামদায়ক হলেও দুজনের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। সামাইরা নিচে শুতে চাইল। শেহজাদ ওর কবজি শক্ত করে ধরে বলল,

  • এই ঠান্ডার মাঝে নিচে শোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অহেতুক ড্রামা করো না। চুপচাপ শুয়ে পড়। এককথা বার বার বলতে ভালো লাগে না।

​অগত্যা সামাইরাকে সেই সংকীর্ণ বিছানায় শেহজাদের পাশে শুতে হলো। দুজন একদম গা ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়ে আছে।

ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো বাতাস জানালার পাল্লায় ক্ষণে ক্ষণে ধাক্কা দিচ্ছে। শেহজাদের চোখে ঘুম নেই। সে একসময় পাশ ফিরল। আবছা আলোয় সে দেখল, সামাইরা ঘুমের ঘোরে নিজেকে একদম গুটিয়ে নিয়ে শুয়ে আছে।
শেহজাদ ওর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।লক্ষ্য করল সামাইরার চোখের কোণে জলের ফোঁটা শুকিয়ে একটি সরু দাগের ন্যায় হয়ে আছে। ঘুমের মধ্যেও মেয়েটা ডুকরে কেঁদেছে!

​এই দৃশ্য দেখে শেহজাদের ভেতরকার দম্ভের পাহাড় মুহূর্তেই ধসে গেল। তার ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় হাহাকার করে উঠল।
​শেহজাদ আলতো করে সামাইরা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সামাইরার হাতের তালু বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। শেহজাদ নিজের শরীরের উত্তাপ দিয়ে সামাইরাকে আগলে রাখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করল। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষাকে মাটিচাপা দিতেও সময় নিল না। আবেগ নামক শব্দটি-কে শেহজাদ রহমান ভয় পায়। কেননা মানুষকে বশ করার ক্ষমতা এর আছে। আর আবেগের বশেই মানুষ জ্ঞানহীন আচরণ করে।

আপনার কি মনে হয় শেহজাদ আর সামাইরার শেষ পরিণতি কি হবে?

(চলবে…)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply