৩.
সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তেই ‘দ্য স্কাইলাইন ভিলা’ এক মায়াবী আলোকসজ্জায় রূপ নিল। গুলশান লেকের শান্ত জলরাশিতে প্রতিফলিত হতে লাগল ডুপ্লেক্স বাড়িটির ছাদের নিওন আলো।
শেহজাদের হাই-প্রোফাইল বিজনেস সার্কেলের জন্য আয়োজন করা হয়েছে এক রাজকীয় ডিনার পার্টি। বাড়ির ছাদের এপ্রান্ত হতে শুরু করে পুলসাইড অব্দি দামী সব সজ্জায় সজ্জিত।
সামাইরা তখনও অলস ভঙ্গিতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে। যে পোশাক পরে তার পার্টিতে যাবার কথা, সে পোশাক আর অলংকার এখনো তার ঘর অব্দি পৌঁছায় নি।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সামাইরা ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। এমন সময় দরজায় কেউ কড়া নাড়ল।
ঠক ঠক।
সামাইরা সামান্য নড়েচড়ে বসল। নরম সুরে বলল,
- কাম ইন, প্লিজ।
বেডরুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ডিজাইনার জুহাইর আরিয়ান। সাথে আছেন তার দুজন সহকারী। তাকে দেখা মাত্র সামাইরা স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখদুটো যেন কোটর ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
এই সেই জুহাইর আরিয়ান! যার ডিজাইন করা লেহেঙ্গা পরে দেশের শীর্ষ নায়িকারা র্যাম্পে হাঁটেন। যার তৈরি ডিজাইনার ড্রেস জীবনে একবার পরিধান করা প্রায় সকল মেয়েদের স্বপ্ন। সামাইরা নিজেও বহুরাত ফেসবুকে তাদের নতুন কালেকশন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। আজ সেই মানুষটিই তার সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত ভঙ্গিতে বললেন,
- গুড ইভিনিং, মিসেস শেহজাদ রহমান।
সামাইরা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। গলার স্বর নিমজ্জিত করে বলল,
- গুড ইভিনিং!
- ভালো আছেন, মিসেস রহমান?
- জ্বি। আপনি?
- আই এম গ্রেট! তবে আরো খুশি হব যদি আমার ডিজাইন করা লেহেঙ্গাটি আপনার পছন্দ হয়।
জুহাইর আরিয়ান ইশারা করতেই তার দুজন সহকারী একটি বিশাল মখমলের ভারী বক্স ধরাধরি করে বিছানায় রাখলেন। তিনি বললেন,
- আই হোপ আপনার ফিটিংসে কোনো সমস্যা হবে না। শেহজাদ ভাই আমাকে স্পেশালি বলেছিলেন আপনার জন্য একদম ইউনিক কিছু করতে।
জুহাইরের সহকারীরা মখমলের বক্স থেকে বের করল চোখধাঁধানো লেহেঙ্গা। সূক্ষ্ম কারচুপি আর আসল জারদোসির কাজ করা সেই পোশাকের দিকে তাকিয়ে সামাইরা বিমূঢ় হয়ে রইল।
জুহাইর আবার বললেন,
- এটা আমাদের সিগনেচার কালেকশন। পিওর হ্যান্ডক্রাফটেড। তবে আপনি পরলে এর গ্ল্যামার দ্বিগুণ হয়ে যাবে, মিসেস রহমান।
সামাইরা ফ্যাকাসে মুখেই মৃদু হাসার চেষ্টা করল। এত আয়োজন করে দেশসেরা কারিগরদের ভাড়া করা হয়েছে শুধুমাত্র শেহজাদ রহমানের সম্মান রক্ষার্থে। কথাটি মনে পড়তেই সামাইরার মৃদু হাসিতে তাচ্ছিল্য ফিরে এলো।
লেহেঙ্গাটি সামাইরাকে পরানো হল। জুহাইরের চোখজোড়া চকচক করে উঠল। সে অস্ফুটস্বরে বলল,
- সুপারক্যালিফ্রাজিলিস্টিক এক্সপিয়ালিডোসিয়াস!
সামাইরা তাকে অতি বিনীতভাবে ধন্যবাদ জানাল। তবে সামাইরার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি চমক।
জুহাইর আরিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই মেকআপ বক্স হাতে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন প্রখ্যাত মেকআপ আর্টিস্ট নাজিয়া জামান।
সামাইরা এতদিন ইন্সটাগ্রামে নাজিয়ার জাদুকরী মেকআপের ভিডিও দেখেছে। আজ নাজিয়া নিজে এসেছেন তাকে সাজিয়ে দিতে!
নাজিয়া ব্রাশ নিয়ে সামাইরার ত্বকে আলতো ছোঁয়া দিয়ে বললেন,
- আপনার স্কিনটা মাশা-আল্লাহ একদম ফ্ললেস। আপনার এই ড্রেসের সাথে ‘ডিউই গ্ল্যাম’ লুকটা একেবারে মানানই। তবে আপনার কত প্রেফারেন্স থাকলে বলুন, মিসেস সামাইরা।
সামাইরা শীতল গলায় বলল,
- আমার কোনো প্রেফারেন্স নেই। আপনি আপনার মত করে সাজিয়ে দিন।
নাজিয়া তার সহকারীর দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন,
- সারা, প্যালেটটা দাও তো! আর শোনো, একদম ন্যুড শেডের লিপস্টিক বের কর বক্স থেকে।
সামাইরা চোখ বন্ধ করে গভীর ভাবনায় মগ্ন হল।এতদিন সে এসব শুধুমাত্র মুভিতেই দেখেছে। সিনেমার নায়িকাদের সাজানোর জন্য একদল মানুষ সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকে। আজ শেহজাদ রহমানের অঢেল টাকার জোরে সেও একই কাতারে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এই জৌলুস যে তার মনের ক্ষতগুলো ঢাকতে পারছে না, বরং বাড়িয়ে দিচ্ছে দ্বিগুণ করে।
সাজ শেষ হওয়ার পর নাজিয়া প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন,
- পারফেক্ট! ইউ আর লুকিং লাইক এ রয়্যাল কুইন, সামাইরা।
মেকআপ আর্টিস্ট যখন কাজ শেষ করে বেরিয়ে গেলেন, সামাইরা আরোও একবার আয়নায় নিজের পূর্ণাবয়ব দেখল। দামী হীরের সেট আর ডিজাইনার লেহেঙ্গার ভারে তার শরীরটা নুইয়ে পড়তে চাইছে। হালকা মেকআপ আর দামী পারফিউমের ঘ্রাণে সে তার পুরোনো সত্তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেকে বড্ড অচেনা লাগছে।
সহসা, শেহজাদের সকালের সেই অবজ্ঞাসূচক কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো তার কানে বাজতে লাগল,
“সস্তা মধ্যবিত্ত আচরণ করবে না।”
সামাইরা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে রুমের দরজা খুলল। করিডোর পার হয়ে সিঁড়ির মাথায় গিয়ে দাঁড়াল সে। গোটা ছাদে জুড়ে তখন আলোর রোশনাই আর উচ্চবিত্তের কোলাহল। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে শুরু করল, যেন এক সাজানো পিঞ্জরের রাজহাঁস অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে।
পুলের চারিপাশে আভিজাত্যের মেলা বসেছে। চারিদিকে শুধু দামী পারফিউমের ঘ্রাণ, নামী ব্রান্ডের স্যুট আর সিল্কের শাড়ির খসখসানি।
ওয়েটাররা দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছে না। ট্রে-তে করে দামী অ্যালকোহল আর ককটেল নিয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে।
শেহজাদ এক কোণে দাঁড়িয়ে তার বিজনেস পার্টনারদের সাথে হাসিমুখে কথা বলছে। পরনে কুচকুচে কালো রঙের ভেলভেট টাক্সিডো, চুলে নিখুঁত সেটিং। সামাইরা লক্ষ্য করল তার সামনের কয়েকটি চুলে বাদামী রঙের হাইলাইট করা হয়েছে। তাকে দেখতে লাগছে হলিউডের নায়কদের মত। অথচ বোঝার উপায় নেই, এই লোকটার ভেতরে এক পাহাড় সমান রুক্ষতা বাস করে।
সামাইরাকে দেখামাত্র পুরো ছাদের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এল। শেহজাদের চোখও সামাইরার ওপর স্থির হলো। এক মুহূর্তের জন্য তার পাথুরে হৃদয়ও সামাইরার সৌন্দর্যের উত্তাপে গলে গেল। তবে তা একমুহূর্তের জন্যই। পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেল সামাইরার দিকে।
সবার সামনে সামাইরার কোমরে হাত রেখে খুব নরম গলায় বলল,
- লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান, মিট মাই ওয়াইফ, সামাইরা রহমান। শী’জ বিউটিফুল, ইজন্ট শী?
উপস্থিত অতিথিরা হুল্লোড়ে মেতে উঠল। সামাইরার রূপের প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ। সামাইরাও হাসছে। তবে কৃত্রিম সে হাসি। শেহজাদের স্পর্শও তার চামড়ায় আগুনের ফুলকির ন্যায় ঠেকছে।
পার্টি যত এগোচ্ছিল, পরিবেশও ঠিক ততটাই উগ্র হচ্ছিল। অতিরিক্ত ড্রিংকসের প্রভাবে অনেকেরই আচরণে ততক্ষণে শিথিলতা এসেছে। শেহজাদ তখন অন্য এক ক্লায়েন্টের সাথে জরুরি আলাপনে ব্যস্ত। সামাইরাও একা এক কোণে দাঁড়িয়ে ফলের জুসে চুমুক দিচ্ছিল। ঠিক তখনই শেহজাদের এক ইনভেস্টর, মিস্টার খন্দকার, হাতে গ্লাস নিয়ে সামাইরার সামনে এসে দাঁড়ালেন। লোকটার চোখেমুখে কামুক দৃষ্টি। তিনি সামাইরার পানে হাত এগিয়ে দিয়ে বললেন,
- নাইস টু মিট ইউ, মিসেস রহমান।
সামাইরা মিস্টার খন্দকারের এগিয়ে দেওয়া হাতটি উপেক্ষা করে বলল,
- নাইস টু মিট ইউ টু!
মিস্টার খন্দকার সামান্য হেসে বললেন,
- ভাবি বোধহয় কথা কম বলেন। এত কম কথা বললে কিন্তু চলবে না ভাবি। অনেকেই মনে মনে ক্ষুদ্ধ হবেন। চলুন, এক রাউন্ড ডান্স হয়ে যাক!
সামাইরা হাসিমুখে বলল,
- দুঃখিত আমি নাচতে পারিনা।
খন্দকার সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন,
- আমি শিখিয়ে দিব ভাবি। চিন্তা কিসের? শুধু মিউজিকের তালে তালে শরীর দুলাবেন। ওই দেখুন আপনার ভাবী আমার এক কলিগের সাথে কিভাবে শরীর দুলিয়ে নাচছে।
সামাইরা দেখল মিস্টার খন্দকারের স্ত্রী একজন আগন্তকের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় নাচছে। লোকটি মহিলাটির গায়ের বিভিন্ন স্থানে বাজে ভাবে স্পর্শ করছে। সামাইরার গা গুলিয়ে বমি এলো।
তবুও কণ্ঠস্বরে ভদ্রতা বজায় রেখে বলল,
- আমি নাচব না। এক্সকিউজ মি!
কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা। সে এবার জোর করে সামাইরার হাতে একটা ককটেল গ্লাস ধরিয়ে দিতে চাইল।
- আরে ভাবি, একটু ট্রাই করেই দেখুন। এসব হাই-সোসাইটি পার্টিতে একটু আধটু ড্রিংক না করলে, কোমর না দুলালে কি আর আভিজাত্য বেঁচে থাকবে? একবার গ্লাসে চুমুক দিয়েই দেখুন, নাচের অফারটা ফেরাতে পারবেন না।
মিস্টার খন্দকার সামাইরার হাত ধরার চেষ্টা করতেই সে ভয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখেমুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। ঠিক সেই মুহূর্তে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত সামাইরার কোমর জড়িয়ে ধরল এবং অন্য হাত দিয়ে মিস্টার খন্দকারের বাড়ানো গ্লাসটা সরিয়ে দিল।
শেহজাদের কণ্ঠস্বর শোনা গেল এক টুকরো হিমালয়ের ন্যায়,
- মিস্টার খন্দকার, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন সামাইরা আমার স্ত্রী। তার ডান্স পার্টনার হিসেবে আমি একাই যথেষ্ট এবং সবসময় আমিই যথেষ্ট থাকব। আশা করি আমার কথার মূলভাব আপনি বুঝতে পেরেছেন। নাও ফোকাস অন ইওর ড্রিংক।
মিস্টার খন্দকার থতমত খেয়ে পিছিয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন,
- মিস্টার রহমান, আসলে আমি…
শেহজাদ তার কথা শেষ হবার আগেই থামিয়ে দিল। এরপর সামাইরাকে ডান্স ফ্লোরের মাঝখানে নিয়ে গেল। সাথে সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক পরিবর্তন হয়ে গেল। একটি ধীরগতির সফট রোমান্টিক মিউজিক বাজতে শুরু করল।
শেহজাদ সামাইরার হাত নিজের কাঁধে রাখল এবং অন্য হাতে তাকে নিজের দেহের সাথে মিশিয়ে নিল।
সামাইরা কৃতজ্ঞতার স্বরে বলল,
- ধন্যবাদ, আমাকে ওই পরিস্থিতি থেকে বাঁচানোর জন্য।
শেহজাদ সামাইরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার উত্তপ্ত নিশ্বাস সামাইরার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। সে তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বলল,
- ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। ওটা স্রেফ সৌজন্য ছিল, ভালোবাসা নয়।
সামাইরা আহত চোখে তার দিকে তাকাল। রাগণ্বিত স্বরে বলে বসল,
- আপনি কি জানেন, চুলে রঙ করাতে আপনাকে বানরের মত লাগছে?
একথা বলে সামাইরা নিজেকে শেহজাদের বাহু থেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল। শেহজাদ আরও শক্ত করে তাকে জাপটে ধরল। দাঁত কিড়মিড়িয়ে ধমকের সুরে বলল,
- ছাড়ার চেষ্টা করো না। সবাই দেখছে, সামাইরা। ভুলে গেছ সকালে কি বলেছিলাম? হ্যাপি কাপলের নাটকটা নিখুঁত হতে হবে। ভুলে যেও না তোমার ইমেজের সাথে আমার স্ট্যাটাস জড়িয়ে আছে। ডান্স উইথ মি।
উপস্থিত সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে তালি দিচ্ছে। সবাই ভাবছে কত সুখী দম্পতি! তারা একে অপরেরর সাথে মিশে গিয়ে নাচছে অথচ দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পর্বত সমান দূরত্ব।
( আপনাদের রেসপন্সের ভিত্তিতে পরবর্তী পর্ব আগামীকাল দুপুর ৩:৩০ এ আসবে। বেশি বেশি কমেন্ট করবেন।)
চলবে…
উপন্যাসঃ #তুমিএলেঅবেলায় 🍂
পর্ব_৩
লেখনীতে, #আতিয়া_আদিবা
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৬
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৪
-
তুমি এলে অবেলায় গল্পের লিংক