Golpo romantic golpo তুমি এলে অবেলায়

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১


বাসর রাতে স্বামীকে তার প্রেমিকার সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে দেখছে, নববধূ। যে রাতে স্বামীর তাকে গভীর আদরে ভরিয়ে দেবার কথা ছিল, পৃথিবীর সমস্ত সুখ তার সামনে জড়ো করবার কথা ছিল সে রাত এমন ব্যতিক্রম হল কেন?

এ রাতের অপেক্ষায় যে নববধুর কেটে গেছে আঠারোটি বসন্ত।
অথচ এই রাত-ই যে তাকে এভাবে কাঁদাবে কে জানত?

ক্ষণিককাল আগের কথা।

শেহরাজ বাসর ঘরে প্রবেশ করতেই রজনীগন্ধার কড়া ঘ্রাণ কেমন যেন মিলিয়ে গেল। টুকটুকে লাল বেনারসি পরে খাটের এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা সামাইরা নিজেকে আরোও গুটিয়ে নিল। ঘোমটা টেনে মুখ লুকানোর প্রচেষ্টা। পাছে ছলছলে চোখদুটো স্বামীর নজরে পড়ে!

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অতি সন্তপর্ণে নিজের প্লাটিনাম ঘড়ির স্ট্র্যাপ খুলতে লাগল শেহজাদ। তার শ্রবণশক্তি প্রখর। বাসর ঘরের দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা কাজিনদের হাসাহাসি সে শুনতে পাচ্ছে।
ছাদে এখনো পুরোদমে গানবাজনার চলছে।

ঘড়িটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল শেহজাদ। এরপর সামাইরার দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল,

  • সামাইরা, আই গেস উই শুড বি ভেরি প্রফেশনাল হেয়ার। আমি তোমাকে কোনো ইমোশনাল ড্রামার মাঝে রাখতে চাই না। সো, লেটস বি ক্লিয়ার, আমার লাইফে অলরেডি একজন স্পেশাল মানুষ আছে। গত পাঁচ বছর ধরে আমি তাকে ভালোবেসে এসেছি, আজও তাকে ভালোবাসি, ভবিষ্যতেও তাকেই ভালোবাসব। তার সাথেই রিলেশন কন্টিনিউ করব।

সামাইরার গলা বার বার সংকুচিত হয়ে আসছে। নিশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। এ পর্যায়ে কষ্ট করে ধরে রাখা চোখের পানি উপচে পড়ল। গোলাপি রাঙ্গা গালজোড়া ভিজে গেল অশ্রুধারায়।

মধ্যবিত্ত ঘরের অতি সাধারণ মেয়ে সামাইরা। তার ভাগ্যে শেহজাদের মতো এমন তুখোড় হ্যান্ডসাম আর ‘এলিট’ লেভেলের বিজনেস টাইকুন জুটবে তা দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি সে। যেদিন তাদের বিয়ের কথা পাকাপোক্ত হল, সেদিন পুরো বিষয়টি সামাইরার কাছে রূপকথার কোনো গল্পের ন্যায় লেগেছিল। কিন্তু মধ্যবিত্তদের জীবন আর রূপকথার গল্প যে বিপরীতমুখী!
হাতের কাঁপনটা স্তিমিত করতে সামাইরা বেনারসির আঁচলটা খামচে ধরল।

শেহজাদ তখন জানালার দিকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাঞ্জাবির পকেটে হাত গুঁজে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখছে। তার অঙ্গভঙ্গি আবেগহীন। ভাবখানা এমন যেন কিছুই হয় নি!

​সামাইরার গলা ইতোমধ্যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক বুক হাহাকার অতি কষ্টে লুকিয়ে সে অস্ফুট স্বরে বলল,

  • তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?

​শেহজাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে তাতে কোনো মায়া ছিল না। বরং হতাশা মিশে ছিল।
সে নির্লিপ্ত স্বরে আবারও বলল,

  • বিশ্বাস করো, তোমাকে বিয়ে করার কোনো পার্সোনাল ইন্টারেস্ট আমার ছিল না। তুমি তো জানো, মা শয্যাশায়ী। ওনার হার্ট কন্ডিশন যেকোনো সময় কোল্যাপ্স করতে পারে। আমি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি আমার মা-কে।
    তোমাকে আমাদের ধানমন্ডির বাড়ির ওই ভাড়াটিয়ার বাসায় টিউশনি করাতে যেদিন দেখেছিল, ওদিনই উনার মনে ধরেছিল। শখ জেগেছিল তোমাকে পুত্রবধূর রূপে এ বাড়িতে নিয়ে আসার।

এবার শেহজাদ সামান্য হাসল। সে হাসিতে তাচ্ছিল্য মিশে ছিল। দামী সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট ঠোঁটের ডগায় রেখে লাইটার খুঁজতে খুঁজতে বলল,

  • আমার মায়ের কাছে তুমি ‘পিওর বেঙ্গল বিউটি’। উনার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল আর জেদের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে।

শেহজাদ লাইটার খুঁজে পেল। সিগারেট ধরিয়ে গভীর সুখটান দিল সে। জানালার বাইরে ধোঁয়া ছাড়ল। ডিসেম্বর মাস চলছে। বাহিরের ঘুন কুয়াশার সাথে সিগারেটের ধোয়া মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। কুয়াশাচ্ছন্ন ল্যাম্পপোস্টের দিকে পুনরায় তাকিয়ে সে বলল,

  • বাট দ্যাটস ইট, আমার ডিউটি কবুল বলা পর্যন্তই ছিল।

শেহজাদের এই কথাটি ​সামাইরার আত্নসম্মানে বেশ জোড়েসরেই আঘাত হানল। ঘোমটা ফেলে শেহজাদের দিকে সরাসরি তাকাল সে। না, শেহজাদের চাউনিতে কোনো অপরাধবোধ নেই। বরং এক অদ্ভুত আভিজাত্যের দম্ভ খেলা করছে। সামাইরা কণ্ঠস্বর যতটুকু সম্ভব কঠিন করে বলল,

  • আপনার ডিউটি শুধুমাত্র কবুল বলা পর্যন্তই ছিল? আর কোনো ডিউটি নেই আপনার?

শেহজাদ এবার সামাইরার চোখে চোখ রেখে বলল,

  • মেইন্টেনেন্স নিয়ে ভাবছো? কাম অন, সামাইরা! তুমি এলিট লেভেলের লাইফস্টাইল পাবে। ব্যাংক ব্যালেন্স, শপিং, ব্রান্ডেড ব্যাগ কোনো কিছুর অভাব তোমার হবে না। তোমার স্ট্যাটাস হবে ‘মিসেস শেহজাদ রহমান’। সোসাইটির মেয়েদের চোখে তুমি হবে ভাগ্যবতী।

সামাইরা চোখে জল নিয়েও ফিঁক করে হেসে ফেলল,

  • ভাগ্যবতী! ভাগ্যবতীর সংজ্ঞা জানেন আপনি?

শেহজাদ এবার সোফায় গিয়ে বসল। কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলল,

​- লুক সামাইরা, জাস্ট স্টপ দিস মিডল ক্লাস ড্রামা। তুমি এই বাড়িতে রাণীর মতন থাকবে। এভরিথিং উইল বি প্রোভাইডেড। শুধু আমার কাছ থেকে লাভ আর ফিজিকাল ইন্টিমেসি আশা করো না।

​সামাইরা নিজেকে দোকানে কিনতে পাওয়া খুব সস্তা কোনো শোপিস মনে হতে লাগল, যাকে কেবল মায়ের ঘর সাজানোর জন্য আনা হয়েছে।

​শেহজাদ সোফায় পা তুলে দিয়ে ল্যাপটপটা কোলের ওপর টেনে নিল। ডিসপ্লে-র নীল আলোয় তার মুখটা অদ্ভুত রকমের সুন্দর দেখাচ্ছে। সে কিবোর্ডে টাইপ করতে করতে যোগ করল,

  • তুমি ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়। সারাদিন অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর। এত ভারী লেহেঙ্গা, লাখ টাকার মেক’আপ। আমি একটু পর শুয়ে পড়ব।
    আর শোনো, মা যেন আমাদের সম্পর্ক নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করেন সেদিকে খেয়াল রেখো। ইউ আর আ স্মার্ট গার্ল, সামাইরা। আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দিস ডিল।

সামাইরা আর কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। অপমানে, বিস্ময়ে সে যেন পাথর হয়ে গেছে। ঠিক তখনই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে শেহজাদের আইফোনটা তীব্র আলোয় জ্বলে উঠল। সাইলেন্ট মোডে থাকলেও দামী কাঠের টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা পুরো ঘর কাঁপিয়ে ভাইব্রেট করে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল শেহজাদের প্রাণপ্রিয় মুখ। যার জন্য নব বিবাহিত স্ত্রীর অধিকারটুকু সে কেড়ে নিয়েছে। রাইসা।

শেহজাদের প্রেমিকা তাকে ভিডিও কল করেছে। সে ল্যাপটপ ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠে ফোনটা হাতে নিল। সামাইরার দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে সে দ্রুত বারান্দার স্লাইডিং ডোর খুলে বাইরে চলে গেল। কিন্তু কাঁচের দরজার ওপাশ থেকেও রাইসার চড়া গলা আর আদুরে আবদার সামাইরার কানে আসছিল।

​- বেবি! কানেক্ট হতে এত লেট হল কেন? কী করছিলে?
রাইসার গলাটা ভিডিও কলেও বেশ তীক্ষ্ণ শোনাল।

​শেহজাদ গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল,

  • ল্যাপটপে একটা মেইল চেক করছিলাম, বেবি। তুমি এখনো ঘুমাওনি?

​- কী করে ঘুমাব? আমার কি আর ঘুম আসে? তুমি তো এখন দিব্যি নতুন বউয়ের সাথে বাসর এনজয় করছ!

রাইসার গলায় কৃত্রিম অভিমান।
​শেহজাদ ফিক করে হেসে ফেলল।

  • পাগলী! তোমাকে ভোলা কি সম্ভব? আমি ওকে সব ক্লিয়ার করেই বলেছি। শুধু মা যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন একটু কষ্ট করো। সব পুষিয়ে দিব।

​- আই ডন্ট ট্রাস্ট ইউ শেহজাদ!
রাইসা ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল। বলল,

  • পুরুষ মানুষদের বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে বাসর রাতে! তুমি আমাকে সারারাত ভিডিও কলে রাখবে। আমি দেখতে চাই তুমি কী করছ। তুমি যদি ওকে টাচ করো, আই উইল ডাই!

​সামাইরা বিছানায় বসে সব কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। রাইসার এই আহ্লাদ আর বোকাবোকা হুমকি কি সহজেই না মেনে নিচ্ছে শেহজাদ!
একজন গম্ভীর, এলিট বিজনেসম্যানও কিভাবে মেয়েটার এমন অযৌক্তিক আবদারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে!

​- আচ্ছা বাবা, আচ্ছা! শান্ত হও। কল কাটব না, প্রমিজ। ফোনটা আমি টেবিলের ওপর রেখে দিচ্ছি, চার্জেও বসিয়ে দিচ্ছি। তুমি সারারাত আমাকে দেখতে পাবে। হ্যাপি?

শেহজাদের কণ্ঠে রাইসার জন্য অপরিসীম ধৈর্য আর ভালোবাসা ঝরে পড়ছিল। ​সে ঘরে ঢুকে ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এমনভাবে সেট করল যাতে পুরো ঘর, বিশেষ করে বিছানাটা দেখা যায়। সামাইরাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ফোনের স্ক্রিনে রাইসার মুখটা তখনো জ্বলজ্বল করছিল। যেন এক অদৃশ্য প্রহরী এই ঘরে ঢুকে পড়েছে।

​সামাইরা সেই জ্বলন্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ার আগেই দ্রুত মুছে ফেলল। এই বিয়ে তার ন্যূনতম নারীসুলভ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। তাকে বন্দী করে ফেলেছে সোনার খাচায়। তিনবেলা পেট পুরে খেতে পাবে। দামী জামা কাপড় পাবে। পাবে না শুধু স্ত্রীর অধিকার!

চলবে..?

তুমিএলেঅবেলায় 🍂

~ পর্ব ১ ~

লেখনীতে, #আতিয়া_আদিবা

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply