Golpo romantic golpo তাজমহল সিজন ২

তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩৮


তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড

পর্ব_৩৮

প্রিমাফারনাজচৌধুরী

“আমি চলে গেলে কার কী যায় আসবে?”

তাজদারের নির্বিকার প্রশ্নে শাইনা ওর ঠিক সামনে এসে বসলো। মুখের দিকে চেয়ে বলল, “আপনার কি এখন আমার সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে? আমার দিকে তাকান।”

তাজদার তাকালো। বিছানায় পা লম্বা করে ছড়িয়ে বসে আছে সে, কোলে ল্যাপটপ। একটু আগেই দু’জন ফজরের নামাজ শেষ করেছে। বাইরে সকাল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি। আজ বাবুনিকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার অন্যরকম একটা পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বৃষ্টির তোড়ে সবটাই বরবাদ। শাইনা উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে দেখে তাজদার ধীরস্বরে বলল, “ইচ্ছে হচ্ছে।”

শাইনা চটজলদি জবাব দিল, “ওকে, শুরুটা তবে আমিই করি।”

“করো।”

“আপনার দোষ দিয়েই শুরু করা যাক।”

তাজদার মাথা হেলিয়ে সম্মতি দিল, “যাক।”

শাইনা অভিযোগের ঝুলি খুলল, “যেমন ধরুন দেশ ছাড়ার আগে আপনি সবসময় এমন ভাল্লুক সেজে বসে থাকেন। দাড়ি-গোঁফ, চুলটুল কাটেন না। কাল আমার গাল ছিঁড়ে দিয়েছেন। এই ব্যথা আমাকে আগামী সাতদিন সহ্য করতে হবে।”

তাজদার বাঁকা হেসে বলল, “ননসেন্স! এগুলো কখনো দোষের তালিকায় পড়ে না।”

শাইনা আরও একটু এগিয়ে এলো,”অফকোর্স পড়ে।”

“পড়লে তো ভালোই। তুমি তো আমায় এমনি এমনি সারাক্ষণ মনে রাখবে না। গালের ব্যথা যদি আমার কথা মনে করিয়ে দেয়, তবে ব্যাপারটা পজিটিভলিই নিতে হচ্ছে। তাই নয় কি?”

শাইনা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বলল, “ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং! এবার তবে এই অপরাধের শাস্তি নিন।”

তাজদার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “দাও।”

“আগামী চব্বিশ ঘণ্টা আপনি আমার আশেপাশে ঘেঁষতে পারবেন না।”

“ওকে।”

তাজদারের ঝটপট সম্মতি শাইনাকে অবাক করে দিল। চোখ বড় বড় করে সে জিজ্ঞেস করল, “এত সহজে মেনে নিলেন? আপনাকে জ্বিন-ভূতে ধরেনি তো?”

“নাহ।”

শাইনা দোটানায় পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“ওকে ফাইন। এবার বলুন সকালের নাশতায় কী হবে? আম্মা কিছু মাংস দিয়েছিল। রুটি বানাব?”

তাজদার এবার একটু ঝামটে উঠল, “প্ল্যান তো আগে থেকেই করা। তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করার কী দরকার? সবসময় আমাকে এমন ঝালাই না করলে চলে না?”

শাইনা গাল ফুলিয়ে বিছানা থেকে নেমে যেতেই তাজদার বিড়বিড় করে বলল, “বেয়াদব!”

কথাটা কানে যাওয়ামাত্রই শাইনা তিরের মতো ছুটে এলো। বিছানায় তাজদারকে শুইয়ে ফেলে বালিশ দিয়ে চেপে ধরল। তাজদার সুযোগ বুঝে তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের ওপর টেনে নিল। শাইনার গালে আবারও দাড়িভর্তি চিবুকের খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“শাস্তি কিন্তু দেওয়া হয়েছে আশেপাশে ঘেঁষার জন্য। বুকের ওপর উঠে আসার জন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।”

শাইনা গালে হাত দিয়ে তার দিকে চেয়ে বলল,”নাম্বার ওয়ান বেয়াদবটা কে?”

“সে যে বেয়াদব হতে বাধ্য করে। খিদে লেগেছে। রান্নাঘরে যাওয়া যাক। এইসবে মন ভরলেও পেট ভরছে না।”

শাইনা তাকে সরিয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। তাজদার হকচকিয়ে বলল,

“কী হচ্ছে এসব? মমতাজ?”

“রান্নাঘরেও আপনার আদর সোহাগ ঝরে ঝরে পড়বে। তাই আগে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা হলো।”

তাজদার ঘরময় পায়চারি করতে করতে ঘুমন্ত মেয়ের দিকে তাকলো। মেয়েটাও ঘুমাচ্ছে। আশ্চর্য দিনদুপুরে সে এমন অত্যাচারিত হচ্ছে প্রতিবাদ করার মতো কেউ নেই?


দরজা খোলামাত্রই তাজদার হাঁফ ছেড়ে শাইনার দিকে তাকালো। শাইনা হাসিমুখে বলল,

“কিছু করার ছিল না বাবুমশাই। আপনাকে এখানে বেঁধে রাখার পর কাজটা আরামসে করেছি। সারাক্ষণ চুকচুক করলে তাদের এভাবে বেঁধে রাখা দরকার।”

এতবড়ো জঘন্য অপবাদ নিয়েও তাজদার চুপ করে রইলো। বিষয়টা ভীষণ আশ্চর্যের। শাইনাও আশ্চর্য হলো। কিন্তু প্রকাশ করলো না। তবে তাজদার সিদ্দিকীর চেহারাখানা দেখার মতো হয়েছে। না তিনি পারছেন প্রতিবাদ করতে। না পারছেন পাল্টা জবাব দিতে। কারণটাও খুব সোজা।

সে ট্রে টেবিলের উপর রাখলো। তাজদার রুটির সাইজ দেখে বলল,”রুটি তো ছোটো হয়ে গেছে।”

শাইনা রুটিটা তার সামনে তুলে ধরলো।

“তিনটি রুটি মিলে একটা রুটি। বড়ো হবে না?”

তাজদার সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা নাড়ল, “হুম, ভালো। বিয়ে যখন করেছি তখন বউয়ের কথাই শেষ কথা।”

শাইনা বলল,”আরেকটু আগে বুঝে গেলে ভালো হতো।”

সে চেয়ার টেনে খেতে বসল এবং ইশারায় শাইনাকেও পাশে বসতে বলল। কিন্তু শাইনার বসা হলো না। ওপাশ থেকে বাবুনি কেঁদে উঠেছে। শাইনা দ্রুত সেদিকে পা বাড়াল। বাবুকে কোলে নিয়ে এসে তাজদারের কাঁধের কাছে এসে উঁকি দিল। তাজদারও রুটির লোকমা মাংসে ডুবিয়ে পরম মমতায় তার মুখে তুলে দিতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পরেই খেয়াল হলো তার হালকা নীল শাটের কাঁধটায় ঝোল পড়েছে। শাইনাও তা খেয়াল করলো। সে দৌড়ে এল। চট করে তার মুখটা সেখানে ভালো মুছে দিয়ে বাকিটা তাজদারের গালে মুছে দিয়ে সরে গেল। তাজদার টিস্যু দিয়ে শার্টটা মুছতে মুছতে ওয়াশরুমের দিকে হেঁটে গেল। শার্ট থেকে দাগ সরিয়ে নিল। গাল থেকে নয়।


দুপুরে খিচুড়ি হয়েছে। ডিম ভাজা, মাংস ভুনা দিয়ে দুপুরের খাবারটা বেশ মজা করে খাওয়াদাওয়া হয়েছে। তাসনুভা এসেছে শোরুম থেকে ফেরার পথে। সে কিছুক্ষণ করবে। আনিস অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে যাবে।

সে এটাও বলেছে, অফিস থেকে আসার পথে সে সব বাজার সদাই করে দিয়ে যাবে। তাজদার যেন কোনো চিন্তায় না থাকে। তাজদার তবুও শাইনাকে নিয়ে বাজার করতে বের হলো তাজনাকে তাসনুভার কাছে রেখে। কাল সন্ধ্যায় তার ফ্লাইট। আজকের মধ্যে শাইনাকে সব গুছিয়ে দিতে হবে।

বাজারে তেমন ভীড় নেই আজ। শাইনা একটা শর্ট বোরকা, হিজাব আর মাস্ক পরেছে। পায়ে কেডস। তাজদারের পরনে কালো শার্ট। শাইনা তার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। তাজদার মাছের বাজারের ভেতর নিয়ে গেল তাকে।

শাইনা তার পিছু হেঁটে হেঁটে হরেক রকমের মাছ কিনলো। মাছ বিক্রেতারা মজা করছে তাদের সাথে। এই ঝড়বৃষ্টিতে বউ নিয়ে মাছ কিনতে আসে কে। এটা যতটা জরুরি ছিল তারচেয়ে বেশি দুজনের বাইরে একটু সময় কাটানোর অজুহাত বলা চলে।

শাক সবজি খুব বেশি কিনলো না। মশলাপাতি আর আটা, ময়দা আর যা যা লাগে সব কিনে নিল। বেবি কেয়ার প্রডাক্টস শেষ হয়ে গিয়েছে। সেইসবও কিনে নিল।

শাইনার ইচ্ছে করছিল রিকশায় চড়তে। কেন রিকশায় চড়ার ভূত মাথায় চেপেছে সে জানে না। তাজদার তার কথা শুনে রিকশা ডেকে নিল। রিকশার হুড তোলা ছিল। শাইনার ইচ্ছে করছিল একটু ভিজতে। কাছের মানুষ কাছাকাছি, পাশাপাশি থাকলে এমন এমন উদ্ভট ইচ্ছে জাগে বুঝি? কে জানে? তবে শাইনার আজ বড্ড ভালো লাগছে।

তাজদার সামনের দিকে গম্ভীর হয়ে চেয়ে জানতে চাইল,”জ্বর হলে তখন কি করবে?”

শাইনা তার দিকে তাকালো। ছোট্ট করে বলল,

“আপনাকে হয়তো মিস করবো। নাও করতে পারি। আবারও এমনও হতে পারে আপনাকে আমি বলবো ফ্লাইট মিস যাক। চলে আসুন।”

তাজদার আর জবাব দিল না। গাঁদাফুলের মালাটা নিয়ে তার হাতে জড়িয়ে দিতে লাগলো। বাজার করে ফেরার পথে কিনেছিল। তাজা ফুল তাই সুগন্ধি বেশি। শাইনার হঠাৎ করে কেমন একটা লাগছে। তাজদার সিদ্দিকী ফুলটা জড়িয়ে দিতে ব্যস্ত। যেন এইমুহূর্তে এই কাজটির চাইতে মূল্যবান কিছু আর হতেই পারে না।

শাইনা ডাকল,”শুনছেন?”

“হুম।”

“আমার হঠাৎ কান্না পাচ্ছে। মানে কেমন কেমন লাগছে।”

“কাঁদো।”

“কেন কাঁদবো?”

“পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য কোনটা জানো?”

শাইনা তার মুখের দিকে চেয়ে বলল”কোনটা?”

তাজদার মালাটা জড়িয়ে দিতে দিতে বলল,

“তোমার প্রিয় মানুষটা তোমার জন্য কাঁদছে। তোমাকে ভেবে কাঁদছে। তোমাকে হারানোর ভয়ে কাঁদছে। তোমাকে না পাওয়ার ভয়ে কাঁদছে। তাই আমি চাই তুমি কাঁদো। তোমার এই চোখের জল আমার প্রতি তোমার শ্রেষ্ঠ সমর্পণ।”

বলেই সে শাইনার দিকে ফিরলো। তার কাঁপা কাঁপা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“লোকে বলে চোখের জল অপচয় করতে নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে সেই অপচয়টুকু পৃথিবীর সব সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি দামী হিসেবে গণ্য হয়। তুমি এটুকু অপচয় করতেই পারো।”

শাইনা চোখ মুছতে মুছতে বলল,”আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?”

“করো”

“ভালোবাসা মানে কী?”

এত সহজ প্রশ্ন নিজের বরকে কেউ করে না অবশ্য। তবুও শাইনা করলো। শুনতে ইচ্ছে করলো। কেন শুনতে ইচ্ছে করলো সে নিজেও জানে না। তাজদার তার হাতটা নিজের দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘষতে ঘষতে নিজের মুখের কাছে এনে গম্ভীর হয়ে বলল,

“ভালোবাসা মানে ভালো রাখার দায়িত্ব নেওয়া। এর উপরে আর কোনো সত্য নেই।”


তারা যখন বাসায় ফিরলো তখন দেখলো তিতলি তৌসিফ আর শাওনও এসেছে। সবাই হাসিঠাট্টা করছে। গান ছেড়ে দিয়ে নাচছে। সেগুলো আবার তিতলি হাসতে হাসতে ভিডিও করছে।

শাইনা তাদের দেখে খুশি হলো। তারপর তাজদারের দিকে তাকালো। তাজদার কপাল কুঁচকে তাদের নাচ দেখে যাচ্ছে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। শাইনা গলা খাঁকারি দিতেই সবাই থেমে গেল। তৌসিফ লাজুক হেসে মাথা চুলকে বলল,

“ইয়ে মানে..

তাজদার ঘরে পা রাখতে রাখতে বলল,”দেড়মাস পর মানে মানে বের হয়ে যাবে। এখন করে নেন যত লাফালাফি। আনিস কখন আসবে?

তাসনুভা বলল,”অফিস থেকে বের হয়ে এদিকে চলে আসবে বলেছিল। জানিনা কেন লেট হচ্ছে। বোধহয় বাড়িতে গিয়েছে। ফোনও রিসিভ করছে না।”

“আবার ট্রাই করো।”

বলতে বলতে তাজদার ভেতরে চলে গেল। তাসনুভা কল দিতে লাগলো। আনিসুজ্জামান কল ধরছে না। তাসনুভার রাগ হচ্ছে। আরেকবার যদি কল রিসিভ না করে তাহলে সে আনিসুজ্জামানকে ব্লকলিস্টে রেখে দেবে।

তৌসিফের আর মুড নেই। সে সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়লো। মন খারাপ হয়ে গেছে। তিতলি তার পাশে এসে বসলো।

“ভাইয়ে ওই গানটা দাও।”

তৌসিফ কপাল কুঁচকে বলল,”কোনটা?”

তিতলি গেয়ে শোনালো।

“ধিকি ধিকি জ্বলে আগুন,
জলের ছিটায় নেভে না।
খোলা আছে মনের দুয়ার
বাইরে তুমি থেকো না…।”

তাসনুভা বিরক্ত হয়ে বলল,”তিতলি স্টপ। এইসব কোনো গান হলো?”

তিতলি পাল্টা প্রশ্ন করলো।

“আমার কি বিয়ে হয়েছে যে আমি তোমার মতো সারে সা সা সা সারে প্রেমের কাহিনী শুনবো?

“শাটআপ!”

“ওকে।”

তিতলি ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে তৌসিফকে ইশারা করলো গানটা দিতে। তৌসিফ গানটা দিতেই তিতলি শাওনকে বলল,”শাওন ভাই এইবার নাচেন।”

শাওন বলল,”ছিঃ ছিঃ বলো কি! আমি তো নাচতে জানিনা।”

তিতলি বেশ গুছিয়ে বলল,”আমি জানি আপনি নাচতে জানেন না। কিন্তু আপনি ব্যাঙের মতো লাফাতে জানেন। আপনি একটু ব্যাঙের মতো লাফাবেন প্লিজ? আমি ভীষণ খুশি হবো।”

শাওন মাথা নাড়লো,”না পারবো না বেয়াইন।”

তিতলি তাকে উৎসাহ দিয়ে বলল,”আপনি পারবেন। আপনাকে পারতেই হবে।”

শাওন মাথা নাড়লো পুনরায়।

“অসম্ভব।”

তিতলি অবাক হয়ে বলল,

“আমার এত মোটিভেশনেও কাজ হচ্ছে না?”

“আসলেই হচ্ছে না।”

“আমি কি করলে আপনি একটু ব্যাঙের মতো লাফাবেন?”

শাওন তৌসিফের দিকে তাকালো। তৌসিফও তার দিকে তাকালো। শাওন তারপর কান চুলকাতে চুলকাতে বলল,

“আসলে বেয়াইন হয়েছে কি। তোমার মুখে আমি ব্যাঙের মতো লাফাই কথাটা শুনে আমি ভীষণ লজ্জা পেয়েছি। তাই আমি জীবনেও আর নাচবো না।”

তিতলি বলল,”আপনারা পুরুষ মানুষেরা সত্যি কথা শুনে এত লজ্জা পান কেন?”

“বিষয়টা দুঃখজনক।”

তৌসিফ বলল,”তোর দার্শনিকগিরি থামাবি?”

তিতলি তার পাশে এসে বসলো।

“আসলে আমার মনটা খারাপ। বোঝো না কেন? ভাই হয়েছে কেন?”

তাসনুভা বিরক্ত হয়ে বাবুকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। তৌসিফ তিতলিকে বলল,

“তোর মন ভালো ছিল কখন?”

তিতলি জবাব দিল না। তৌসিফ বলল,”শাওন এর সমস্যাটা কী? হুদাই মাথা খারাপ করতে আসে। সারাক্ষণ প্যানপ্যান। ধরে একটা লাথি দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

তিতলি বলল,”সমস্যা নেই। তুমি সাপের মতো মোচড়ামুচড়ি আর শাওন ভাই ব্যাঙের মতো লাফালাফি করে নাচলে আমার মনটা একটু ভালো হতো, এই আর কি।”

তৌসিফ শাওনকে বলল,”শাওন জীবনের এই প্রথম একটা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছে করছে। এই ঝড়ের রাতে একে কোনো নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসি, চল। শালী আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে দিল।”

“তোমাকে আরও দেড়মাস আমাকে সহ্য করতে হবে। শাওন ভাই আপনারও কি আমাকে অসহ্য লাগে?”

শাওন মাথা নাড়লো।

“না লাগে না।”

“তাহলে চলুন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমরা বাড়ি চলে যাই। আপু আনিস ভাইয়ের সাথে ফিরবে।”

তারপর সে তৌসিফের দিকে চেয়ে বলল,”তুমি একটা বিয়ে করো। বউ ছাড়া তুমি আর ভালো হবে না।”

তৌসিফ চিন্তিত হয়ে বসে রইলো। সে একটা রিকশা কিনবে। রিকশা চালিয়ে বউ বাচ্চা পালবে। তবুও সে লন্ডনে যাবে না। ডিসিশন ফাইনাল।


মাছ কেটে ফ্রিজে রাখার জন্য বেশ তাড়াহুড়ো করছিল শাইনা। তাজদার মাছ কাটায় সাহায্য করছে তবুও সে তাড়াহুড়ো করছিল। আর তখুনি আঙুল কেটে গেল। মাছের রক্ত বলে চালিয়ে দিলেও তাজদার যখন টের পেল তার আঙুল কেটে গেছে সে ভীষণ রেগে রান্নাঘর থেকে বের করে দিল শাইনাকে।

“হাত কেটে ফেলবো আমার সাথে কাজ নিয়ে কাড়াকাড়ি করলে। নইলে কাল সকালে তোমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। তোমাকে একা এখানে রেখে যাব না আমি।”

“আমি এখান থেকে কোথাও যাব না।”

“আউট!”

গর্জে বললো তাজদার। শাইনা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।

তাজদার তড়িঘড়ি সিঙ্কে গিয়ে হাত ধুয়ে এল। তারপর কোনো কথা না বলে তার কবজি ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল। শাইনার কাটা আঙুল থেকে রক্ত এখনো গড়িয়ে পড়ছে।

বিছানার পাশে বসিয়ে সে ফার্স্ট এইড বক্স টেনে নিল। তুলো বের করে অ্যান্টিসেপটিক ঢালল। সতর্কবার্তা দিল।

“ব্যথা লাগবে।”

তুলোটা আঙুলে ছোঁয়াতেই শাইনা হালকা কেঁপে উঠল।

“বাপ্রে!”

তাজদার খুব যত্ন করে রক্ত মুছল, তারপর ওষুধ লাগিয়ে গজ জড়িয়ে দিল। শাইনা চোখ তুলে তাকাল। কাটা আঙুলে ব্যথা নিয়েও হেসে বলল,

” এটাই শেষবার। পরেরবার আঙুল কাটবো যখন আপনি দেশে থাকবেন।”

তাজদার কাজ থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে শাইনার চোখের দিকে তাকাল। কিছুটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করল, “মানে?”

শাইনা তার দৃষ্টির গভীরে ডুব দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“মানেটা খুব সহজ। প্রিয় মানুষের সামনে আমরা ইচ্ছে করেই একটু বেশি কাতর হতে ভালোবাসি, একটু ব্যথার বাহানা করি শুধু তাদের কাছ থেকে একটু মনোযোগ আর এক চিমটি বাড়তি যত্নের আশায়। এই যে আপনি এত মনোযোগ দিয়ে আমার সাধারণ একটা ক্ষত সারিয়ে দিচ্ছেন, এই বিশেষ মুহূর্তটুকুর জন্যই হয়তো আমি বারবার আঘাত পেতেও দ্বিধা করব না।”

“প্রতিবার আমি যাওয়ার আগে এ কেমন ষড়যন্ত্র?”

শাইনা হাসল। তাজদারের বুকের ওপর নিজের চিবুকটা ঠেকিয়ে মায়ার চোখে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের সেই নিস্তব্ধতাকে তারা নিজেই ভেঙে দিল স্বেচ্ছায় দেওয়া দুটো দ্রুত চুম্বনে। তাজদারের বুকের শার্টটা আলতো করে খামচে ধরে সে কিছুটা ছটফটিয়ে উঠে দুষ্টুমির ছলে জিজ্ঞেস করল,

“মিষ্টি?”

“হ্যাঁ, এত মিষ্টি যে এখন বুক জ্বালাপোড়া করছে।”

“আহারে আহারে!”

ড্রয়িং রুমে গান বাজছে।

“যত কাছে আসি তত,
বেড়ে যায় আশা যে।
আরো বেশি কাছে চাই,
আজ ভালোবাসা যে।”

তাজদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফার্স্ট এইড বক্সটা এক পাশে গুছিয়ে রাখল। তার হাত সচল থাকলেও মনটা কোথাও আটকে গেছে। ভালো লাগছে না কিছু। সে নিজের অস্থিরতা লুকাতে চেয়েও পারল না। বিরক্ত হয়ে বলল, “সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করছে আমার সাথে।”

শাইনার তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ধীরলয়ে দুহাত বাড়িয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নিজের তপ্ত কপাল আর মাথাটা তাজদারের শক্ত পিঠের ওপর চেপে দিয়ে চোখ বুজলো সে। তাজদারের হৃদস্পন্দন শুনতে শুনতে ফিসফিস করে আওড়ালো,

“আপনার মন খারাপ মিস্টার?”

তাজদার শক্ত কণ্ঠে বলল,

“না।”

“তাহলে?”

“তাহলে কিছু না।”

“আচ্ছা তাহলে একটু হাসুন।”

তাজদার সামনে ফিরল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল ঘুণাক্ষরে। রাগে গজগজ করে বলল,

“একটা সর্বস্বান্ত অসহায় মানুষের ক্ষতে হাসির প্রলেপ দিতে বলাটা স্রেফ তামাশা বোকাচণ্ডী মমতাজ বেগম।”

শাইনা হেসে উঠে তার বুকে গুঁজে যেতে যেতে বলল,”আহারে আমার অসহায় মানুষ।”

চলমান….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply