Golpo romantic golpo তাজমহল সিজন ২

তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩৭


তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড

পর্ব_৩৭

প্রিমাফারনাজচৌধুরী

আকাশের বুক চিরে আজ বিশাল রূপালি থালার মতো চাঁদ উঠেছে। চারিদিকে চাদরের মতো বিছিয়ে আছে মায়াবী জোছনা।

রাশি রাশি আলোর ছটায় চারপাশ এমনভাবে ঝলমল করছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই এখন গভীর রাত। এমন মোহময় একটা রাত কি চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থেকে কাটানো যায়?

তাসনুভা বাইক থেকে নেমে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল। আনিস বাইকটা রাস্তার ধারে স্ট্যান্ড করিয়ে তার পিছু নিল।

কিন্তু আনিসের মনোযোগ তখনো ফোনের স্ক্রিনে। তাজদার মেসেজ দিচ্ছে আর সে তার রিপ্লাই দিতে ব্যস্ত। তাসনুভা একবার ঘাড় ফিরিয়ে তার এই নির্লিপ্ততা দেখে চরম বিরক্ত হলো।

সে আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে আনিসের হাত থেকে ছোঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিল, তারপর আগের চেয়েও দ্রুতলয়ে হাঁটতে শুরু করল। আনিস অবাক হলেও কোনো প্রতিবাদ করল না। নিঃশব্দে তার ছায়া অনুসরণ করতে লাগল।

আনিস নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রশ্ন করল।

“আমরা আর কতদূর পর্যন্ত হাঁটব?”

তাসনুভা না থামিয়েই জবাব দিল, “যতক্ষণ না আমার মন চায়।”

আনিস আবারও চুপ হয়ে গেল। তার এই নীরবতা তাসনুভাকে আরও খ্যাপিয়ে তুলল। সে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত কম কথা বলেন কেন?”

“কই আমি তো বেশ কথা বলি। সবাই তো তাই বলে।”

তাসনুভা তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে শুধু আমার বেলাতেই কি আপনার শব্দভাণ্ডার ফুরিয়ে যায়?”

আনিস কিছুটা থতমত খেল। ইতস্তত করে বলল,

“হয়তো তাই।”

“আবার স্বীকারও করছেন?”

“অস্বীকার করার মতো কিছু তো খুঁজে পাচ্ছি না।”

তাসনুভা আবারও হাঁটা শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতেই জিজ্ঞেস করল, “আপনি মেয়েদের দিকে খুব কম তাকান?”

আনিসের সোজাসাপ্টা উত্তর,”না বরং বেশিই তাকাই।”

“এটাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করছেন?”

আনিস এবার একটু হেসে সংশোধন করল, “না, আসলে তেমন একটা তাকাই না।”

“থাক, আর ভালো সাজতে হবে না। মিররে আপনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন আমি দেখেছি।”

আনিস এবার থামল। সরাসরি তাসনুভার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার দিকে তো আমি তাকাবোই।”

তাসনুভার কণ্ঠে এক চিলতে কৌতূহল।

“কেন তাকাবেন?”

আনিস কোনো কথা বলল না, তবে তার মৌন চাহনিতেই হাজারো না বলা উত্তর লুকিয়ে ছিল। তাসনুভা কাঙ্ক্ষিত জবাবটা পেয়ে অদ্ভুত ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে আবারও সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

তার সেই মৌন সম্মতির পর তারা আবারও হাঁটতে লাগলো।

রাস্তার দুই পাশের গাছপালাগুলো চাঁদের আলোয় রূপালি অবয়ব ধারণ করেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা বাতাসের শনশন শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। তাসনুভা ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে নিজের মুঠোয় পুরে নিল। কিছুক্ষণ আগের বিরক্তিটা এখন আর নেই। সে আড়চোখে একবার আনিসকে দেখল।

“আপনি পেছনে হাঁটছেন কেন?”

আনিস বলল,”তুমি আগে হাঁটতে চাইছো তাই।”

তাসনুভা তার হাত ধরে পাশে টেনে এনে বলল,

“আপনি জানেন মাঝে মাঝে কোনো কথা না বলেও শুধু পাশাপাশি হাঁটাতেই পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর গল্পগুলো বলা হয়ে যায়।”

আনিস মাথা দুলিয়ে বলল,”আজ জানলাম।”

“আপনাকে একটা কবিতা শোনাই?”

আনিস বলল,”হুম।”

“হাসবেন না কিন্তু।”

সে আগে থেকে সাবধান করে দিল। আনিস মাথা নেড়ে বলল,”এত মহৎ আমি নই।”

তাসনুভা বুকে হাত ভাঁজ করে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“না থাক বলবো না।”

আনিস জোর দিয়ে বলল,”বলো।”

“না না, আমি পারিনা।”

তাসনুভা এবার আগে আগে হাঁটতে লাগলো। ফোনে মনোযোগ দিয়ে বলল,

“হোয়াটসঅ্যাপ চেক করুন।”

আনিস হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। তাসনুভা একটা পংক্তি পাঠিয়েছে।

“শব্দরা আজ ছুটি নিয়েছে,
মৌনতা পেয়েছে ঠাঁই,
তোমার পাশে এই হেঁটে চলাতেই,
জীবনের সবটুকু সুখ পাই।”

“এটা জোরে জোরে পড়ে শোনান আনিসুজ্জামান।”

আনিস মাথা তুলে বলল,”কোথায় পাও এসব? এইসব তো বাচ্চাদের মতো কথাবার্তা।”

তাসনুভা পিছু হাঁটতে হাঁটতে হেসে বলল,”বলুন। কবিদের মতো করে বলুন।”

আনিস বলল,”আমি আবৃত্তি পারিনা। তোমার ভালো লাগবে না।”

তাসনুভা আরও একটি পংক্তি পাঠালো,

“হাজার বছর চলব সাথে, ফুরোবে না এই পথ,
হৃদয় গভীরে জমা থাকুক দুজনের সকল শপথ।
গন্তব্যহীন এই মিছিলে,
আমি শুধু তোমারই হই,
পৃথিবী হারাক নিজের পথে,
আমি তোমাতেই রই।”

আনিস পড়তে পড়তে হাঁটতে লাগলো। মাথা তুলে বলল,”এটা ঠিকঠাক।”

তাসনুভা হাসিমুখে বলল,”আরও একটা দিয়েছি।”

আনিস হাঁটতে হাঁটতে সেটা উচ্চারণ করে পড়তে লাগলো,

“পৃথিবী যদি থমকে দাঁড়ায় ভিড়ের কোলাহলে,
আমরা না হয় হারিয়ে যাব নীরবতারই ছলে।”

সে তাসনুভার দিকে তাকালো। ভ্রু তুলে বলল,”এটা ভালো ছিল।”

“আমার মতো?”

আনিস হেসে ফেললো। তাসনুভাও। ধীরেধীরে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“আমার মতো দিকভ্রান্ত নাবিকের কম্পাস হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ মিস্টার আনিসুজ্জামান।”

আনিস মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তারপর কপাল কুঁচকে বলল,

“কিন্তু পথ হারানো নাবিককে পথ দেখানোতে কোনো বাহাদুরি নেই, বাহাদুরি তো তখন যখন নাবিকটি নাবিকের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখে। আমার ওপর এই বিশ্বাসটুকু রাখার জন্য তোমাকেও ধন্যবাদ।”

তাসনুভা আচমকা ছুটে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,”এবার বাইক অব্দি আমাকে কোলে করে নিয়ে যান। আমার পায়ে ব্যাথা করছে।”

আনিস হকচকিয়ে গিয়ে বলল,”তোমার এই পায়ে ব্যথার অজুহাতটা কিন্তু বড্ড সেকেলে জুনুনআরা। সরাসরি বললেই পারতে কোল ওঠার ইচ্ছে হচ্ছে।”

তাসনুভা বলল,”জি, আনিসুজ্জামান সাহেব। আমার আপনার কোলে ওঠার ইচ্ছে হচ্ছে।”

আনিস তাকে শেষমেশ কোলে তুলেই নিল। তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“বাইক অব্দি তো নিয়ে যাব কিন্তু পথে যদি ট্রাফিক পুলিশ ধরে জিজ্ঞেস করে এই বড়সড় বাচ্চাটাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন? তখন কিন্তু আমি নির্ঘাত বলব উনি হাঁটতে ভুলে গেছেন, ওনার জন্য একটা ফিডার আর দোলনার ব্যবস্থা করুন।”

“আপনি তো বড় অদ্ভুত মানুষ। দিকভ্রান্ত নাবিককে পথ দেখানোর সময় খুব বড় বড় কথা, আর কোলে তুলে একটুখানি পথ চলতেই পুলিশের ভয়?”

আনিস একটু থমকে দাঁড়াল। তাসনুভার চোখের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল যেটা তাসনুভাকে প্রতিবারই একটু থমকে দেয়। সে তাসনুভার ওজনটা আরেকটু ভালো করে সামলে নিয়ে জবাব দিল,

“সমস্যাটা সেখানে নয়। সমস্যাটা আমার হৃদপিণ্ডের। ওখানে যে ড্রাম বাজানোর মতো শব্দ করছে কোনো ট্রাফিক পুলিশ যদি সেই শব্দ শুনে ফেলে তাহলে নির্ঘাত আমাকে পাবলিক ডিসটারবেন্সের দায়ে অ্যারেস্ট করবে। দেখে নিও।”

“আপনার হৃদপিণ্ডের কি সমস্যা?”

“আমি কোনোদিন কোনো মেয়ে কোলে নিয়েছি?”

আনিসের এই কথাটা শুনে তাসনুভা খিলখিল করে হেসে উঠল। আনিসের গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো এই মানুষটা এমন কেন?

সে হাসতে হাসতে আরও একটু নিবিড় হয়ে আনিসের গলা জড়িয়ে ধরল। তারপর আচমকা তার লাল হয়ে যাওয়া শক্ত গালটাতে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ব্যাস, কোল থেকে এবার নামিয়ে দিন মিস্টার আনিসুজ্জামান। আমার আজকের মিশন কমপ্লিট!”

আনিস একটু থমকে দাঁড়াল। পায়ের নিচের রাস্তাটা স্থবির হয়ে গেল। সে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে পালটা প্রশ্ন করল,

“এতবড়ো চক্রান্ত?”

তাসনুভা মাটিতে পা রেখেই আনিসের দিকে তাকিয়ে বলল, “চক্রান্ত নয় মিস্টার কম্পাস। একে বলে লাভ স্ট্র্যাটেজি। আপনাকে একটু অপ্রতিভ হতে দেখাটাও তো আমার এই জঘন্য জীবনের অনন্য একটা পাওনা।”

বলেই সে আগে আগে হেঁটে বাইকের কাছে চলে যেতে লাগলো। আনিস কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর তার পেছন পেছন হেঁটে যেতে লাগলো।

বাইকের স্ট্যান্ড তোলার শব্দটা নিঝুম রাতে বেশ জোরেই শোনা গেল। আনিস বাইকে উঠে স্টার্ট দিতেই তাসনুভা পেছনে এসে বসল। তবে এবার আর দূরত্ব বজায় রেখে বসলো না। আনিসের পিঠে নিজের চিবুক ঠেকিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার কোমর। বাইক চলতে শুরু করলে বাতাসের ঝাপটা এসে তাসনুভার অবাধ্য চুলগুলোকে আনিসের মুখে উড়িয়ে দিতে লাগলো।

সে কাঁধে মুখ গুঁজে অস্ফুট স্বরে বলল,

“আপনার পারফিউমটা ভালো।”

আনিস বলল,”আমার এবার মনে হচ্ছে নির্ঘাত তোমার গায়ে কিছু একটা ভর করেছে।”

তাসনুভা শার্ট খামচে ধরে তার পিঠ কামড় বসানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,

” ok, let me prove it.”

চলমান……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply