তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড
পর্ব_২৭
প্রিমাফারনাজচৌধুরী
আনিস পাথরের মতো বিছানায় বসে রইল। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে এখনো। কপালে বিন্দু বিন্দু নোনা ঘাম। রাতে শাওন আর তৌসিফের সাথে একটা মুভি দেখে শুয়েছিল। আর তারপর এইসব। সাদা কাপড়! তাসনুভা!
কপাল মুছলো সে। গরম লাগছে হঠাৎ। অথচ এখানকার আবহাওয়া আজকে যথেষ্ট ঠান্ডা।
অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতেই সে দেখল ঘরের ভেতর তৌসিফ আর শাওন পাশাপাশি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ক্লান্তিতে দুজন একে অপরের গায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে জড়িয়ে আছে।
শরীরটা পাথরের মতো ভারী লাগছে। সে ধীরপায়ে উঠে গিয়ে জানালা মেলে ধরল। রাতের হিমেল হাওয়া হু হু করে ঘরে ঢুকে পড়ল। বাইরে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার মনে হচ্ছে। চাঁদটি যেন ঢাকা পড়েছে। বৃষ্টি আসবে কি? ঘরের আবছা অন্ধকারে সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশ নিস্তব্ধ, কিন্তু তার কানে তখনও আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের সেই কালান্তক গর্জন। স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখাটা এতটাই ঝাপসা যে, সে এখনো বুঝতে পারছে না সে কি সত্যিই জেগে উঠেছে, নাকি দুঃস্বপ্নে ডুব দিচ্ছে?
কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হতেই বিছানার কাছে গিয়ে ফোনটা হাতে নিল সে।
হাতের তালু ঘেমে একাকার। কাঁপাকাঁপা আঙুলে ফোনের লক খুলতেই নীলচে আলোটা চোখে এসে বিঁধল। সময় দেখল, রাত তিনটে বেজে পনেরো মিনিট। ফোনের নেটওয়ার্ক বারগুলো লুকোচুরি খেলছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা আবার বিছানায় রেখে দিল।
খুব পরিচিত কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পাশে শুয়ে থাকা তৌসিফ আর শাওনের নিশ্চিন্ত ঘুম ভাঙানোর সাহস তার হলো না। তাজদারকে একবার ফোন করবে কিনা ভাবতে ভাবতে সে আবারও বিছানায় শুয়ে পড়লো।
তিতলির হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছে। তার একটা পা তাসনুভার গায়ের উপর। সে টের পেতেই আলতোভাবে পা নামিয়ে নিয়ে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। অনুশোচনাও হলো। সে রোজ এভাবে আপুর গায়ে পা তুলে ঘুমায়। আপুর বিয়ে হয়ে গেলে সে খুব খুশি হবে এমনটা সবাই জানে। কিন্তু সত্যি কথা হলো তার খুব মন খারাপ হবে। সে ঘরে একা থাকতেই পারবে না। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে
সে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ডাকলো,
“আপু?”
সাড়া নেই। তিতলি আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,”তোমার গায়ে কি জ্বর? খুব গরম দেখছি।”
তাসনুভা এবার সাড়া দিল,
“না, ঘুমাও। কথা বলো না।”
“তোমার সত্যিই জ্বর। নইলে তুমি ঘুমাচ্ছ না কেন?”
“বেশি প্রশ্ন করো তুমি। চুপচাপ ঘুমাও।”
তিতলি আবারও ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়লো। তাসনুভা আলতোভাবে শুধু চোখদুটো বন্ধ করে রাখলো। কালকে সে ঢাকায় চলে যাবে।
মেজো ভাইয়া রাজি হবে কিনা সে জানেনা এখনো। কিন্তু রাজি করাতে হবে। এই হাই টাইমে তার সময় নষ্ট করা উচিত হচ্ছে না। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ এল।
টুং করে শব্দ হতেই তাসনুভা হাতড়ে ফোনটা খুঁজে নিল। তিতলি ইচ্ছে মতো রিলস দেখার বিশ পার্সেন্ট চার্য রেখেছে।
সে চ বর্গীয় শব্দ করে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে দেখলো একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ। প্রোফাইলে সাদা শার্ট পরা একটা ছেলে। প্রোফাইলে পিকচারে ক্লিক না করেও দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা দেখে তাসনুভা চিনে ফেললো এটা কার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার।
সে ইনবক্সে ঢুকেই দেখলো সেখানে একটা ছবি এসেছে। আবছা অন্ধকারে সমুদ্রের পাড়ে উদাস হয়ে বসে থাকা তার একটা ছবি। চুলে চোখমুখ ঢেকে যাচ্ছে।
“তোমার একটা ছবি নিয়েছিলাম। দারুণ এসেছে। হঠাৎ গ্যালারিতে দেখলাম। তোমাকে পাঠিয়ে আমি ডিলিট করে দিলাম।”
তাসনুভা রিপ্লাই করলো ছোট্ট করে,
“শুধু একটা তুলেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“ওহহ, থ্যাংকস।”
আনিস ফোনের পাওয়ার অফ করে রেখে দিল ফোনটা। ছবিটা তুলে লাভই হয়েছে। নইলে বাকি সময়টুকুতে তার চোখে ঘুম নামতো না। মাঝেমধ্যে কিছু ভুল ভালোর জন্যই ঘটে। সে এবার আরাম করে শুয়ে পড়লো।
পরক্ষণেই হুট করে মনে পড়লো তাজদারকে দেয়া মেসেজটা ডিলিট করতে ভুলে গিয়েছে। সে দ্রুত ফোন অন করে মেসেজটা ডিলিট করতে গেল। তার আগেই তাজদার মেসেজ সিন করে ফেলেছে।
“কীসের আওয়াজ পেয়েছিস তিতলিদের রুম থেকে?”
আনিস দ্রুত টাইপ করলো,”মনে হলো কেউ চিৎকার দিল। মনের ভুল হয়তো।”
“তোর মাথা গেছে।”
“সেটাই মনে হচ্ছে।”
“বিয়ের আগেই মাথা নষ্ট? তাহলে বিয়ের পর তোকে পাগলাগারদে যেতে হবে।”
“বিয়ে না করতে বলছিস?”
তাজদার হালকা হেসে বলল,
“তুই আপাতত ঘুমা।”
“আচ্ছা সকালে এই কথাটা কাউকে বলিস না। সবাই শুনলে আবার হাসাহাসি করবে।”
তাজদার শব্দ করে হেসে উঠলো। শাইনার ঘুম ছুটে গিয়েছে তার হাসির শব্দে। সে ঘুমজড়ানো চোখে তাকালো ফিরে।
বাবু তাদের পাশে থাকা বেবি কটে ঘুমিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই তাকে সেখানে রেখেছে তাজদার। কারণ ঘুমের মধ্যে শাইনা বেশি হাত পা ছুঁড়ে। বেবির জন্য খুব রিস্কি। বেবি কট বাবুর জন্য বেশি সেইফ। ঘুম ভাঙলে আবারও বুকের উপর নিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়।
শাইনা তাজদারের বাহুর উপর উঠে এসে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো কার সাথে কথা বলতে বলতে হাসছে।
তাজদার তখুনি ফোন বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো। শাইনা ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল,”কার সাথে কথা বলছিলেন?”
“আনিসের সাথে।”
“ভাইয়ার সাথে এতরাতে?”
“সন্দেহ করছো তুমি আমাকে?”
শাইনা দুপাশে মাথা নাড়লো।
“না কিন্তু ভাইয়া এতরাতে কি বলছিল?”
“বউ ছাড়া ঘুম আসছে না।”
শাইনা সাথে সাথে লজ্জা পেয়ে গেল। গায়ে কম্বল টেনে নিয়ে পাশ ফিরে গিয়ে বলল,”এটা কোনো কথা!”
তাজদার কম্বলের মধ্যে পা ঢুকিয়ে শাইনার পা চেপে ধরলো নিজের পা দিয়ে। হাত দিয়ে শাইনার উদরও। শাইনা কেঁপে উঠলো।
“কি শক্ত হাত পা!”
তাজদারের দিকে হালকা ফিরতেই তাজদার তার গালে নাক ঘষতে ঘষতে বলল,
“সত্যি! বউ ছাড়া ঘুমানো কষ্টের।”
বলেই চুল সরিয়ে গালে টুপ করে একটা চুমু খেল।
শাইনা খোঁচা মেরে বলল,”বউ তো পাশেই আছে। আপনি ঘুমালেন কখন? সারাক্ষণই দেখছি এপাশ ওপাশ।”
“বউ পাশে রেখে ঘুমানো অপরাধ।”
“নিরপরাধরা কি করে?”
“বউকে জ্বালায়। এই যেমন আমি তোমাকে জ্বালাচ্ছি।”
বলতে না বলতেই শাইনার কোমরে একটা চিমটি বসিয়ে দিয়ে সে সোজা হয়ে শুয়ে পড়লো চোখের উপর হাত দিয়ে।
“নো ডিস্টার্ব। আমি এখন ঘুমাবো। তুমিও ঘুমাও।”
শাইনা চিমটির ব্যাথা সইতে না পেরে তার বুকের উপর উঠে বালিশ দিয়ে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লো। তারপরও তাজদারের বিন্দুমাত্র নড়াচড়া আর প্রতিরোধ না দেখে মুখের উপর বালিশ দিয়ে চেপে ধরলো। তাজদার নিঃশ্বাস ফেলতে না পেরে কিছুক্ষণ পর তাকে পাশে ফেলে দিয়ে দাঁত চিবিয়ে বলল,
“ষ্টুপিড!”
তারপর শক্ত করে চেপে ধরলো। তবে বালিশ দিয়ে নয়।
রিসোর্টের চারপাশে তখন ভোরের নরম আলো ছটা। সমুদ্রের নোনা বাতাসের সাথে ভোরের স্নিগ্ধতা মিশে আছে।সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তাসনুভা আর ঘরে মন টেকাতে পারল না।
তিতলি তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে বালুকাময় সৈকতের দিকে হাঁটা দিল। জোয়ারের পানি তখনো কিছুটা উত্তাল, পায়ের তলায় বালু সরে গিয়ে অদ্ভুত একটা শিরশিরানি অনুভূত হচ্ছে।
সে সমুদ্রের বিশালতার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সব ক্লান্তি এই বিশাল নীল জলরাশি শুষে নিচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি এলে নিজেকে কত ছোটো মনে হয়।
কিছুক্ষণ পর, বালুর ওপর দিয়ে কারো হেঁটে আসার শব্দ পাওয়া গেল। তাসনুভা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আনিস ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। ভোরের আলোয় তাকে অনেকটা শান্ত মনে হচ্ছে।
আনিস বালুর ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু একটা খুঁজে যাচ্ছে। তাসনুভা আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গেল। সমুদ্রের ঢেউগুলো তার পায়ের পাতায় এসে আছড়ে পড়ছে।
আনিস দেখলো তাসনুভা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পরনে হালকা নীল-সাদা কূর্তা। ভোরের মৃদু আলোয় ড্রেসটা তাকে বেশ মানিয়েছে। তার কপাল কুঁচকে গেল। ও কোথায় যাচ্ছে ওইদিকে?
তাসনুভা কিছুটা দূরে গিয়ে আড়চোখে একবার পেছন ফিরে দেখল আনিসকে। আনিস কুঁজো হয়ে একমনে বালু সরিয়ে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে এখনো। তাসনুভা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার এই অস্থিরতা দেখল। তারপর ধীরপায়ে বালু মাড়িয়ে আনিসের দিকে মুখ করে দাঁড়াল।
আনিস তখনও নিচের দিকেই তাকিয়ে। একবার বালু সরাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার ডানে-বামে দেখছে। তাসনুভা ভ্রু কুঁচকে ডাকল, “আনিস ভাই!”
আনিস যেন ঘোর থেকে ফিরল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাসনুভার দিকে তাকাল সে। কপালে চিন্তার রেখা। তাসনুভা কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
“আপনি ওখানে কী খুঁজছেন?”
আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের তালু ঝেড়ে বলল, “আমার ঘড়িটা। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। ওটা হাতেই ছিল। কাল এখানে অনেক দৌড়াদৌড়ি করলাম। তাই বালুর ওপর কোথাও পড়েছে কি না সেটাই দেখছি।”
“ওহহ,” তাসনুভা একটু অন্যমনস্ক ভাবে জবাব দিল।
আনিস আবারও নিচের দিকে নজর দিল। তাসনুভা দেখল আনিস ভাই শুধু ঘড়ি খুঁজছে না। তার মধ্যে একটা ছটফটানি কাজ করছে। সে কথা না বাড়িয়ে আবার উল্টো দিকে ঘুরে সমুদ্রের আরও কাছাকাছি এগিয়ে যেতে লাগল। পায়ের নিচে নরম ভেজা বালু দেবে যাচ্ছে।
আনিস ঘড়ি খোঁজা থামিয়ে কিছুক্ষণ সেই একা হেঁটে যাওয়া তাসনুভার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সমুদ্রের নীল আর তাসনুভার নীল-সাদা ড্রেসটা মনে হলো এক বিন্দুতে মিশে যাচ্ছে।
সে ঘড়ি খোঁজা বাদ দিয়ে একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতের সেই বীভৎস স্বপ্নের স্মৃতিটা মাথার ভেতর ঝিলিক দিয়ে উঠল। ঠিক এভাবেই কি সে তাসনুভাকে দেখেনি? পার্থক্য শুধু এটুকুই, স্বপ্নে সে ছিল নিথর, আর এখন নীল-সাদা ড্রেসের ওড়নাটা বাতাসে পতপত করে উড়ছে।
আনিস পা বাড়াল তাসনুভার দিকে। বালিতে পা দেবে যাচ্ছে। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সে পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বলল,
“নুভা চলো।”
তাসনুভা চট করে তার দিকে তাকালো।
“ব্রেকফাস্ট করোনি তাই। চলো। সবার সাথে পরে আসবে।”
তাসনুভা তার দিকে কপাল কুঁচকে চেয়ে রইলো। আনিস তার চাহনি দেখে বিব্রত হয়ে হাঁটা ধরলো।
” চলে এসো, দেরী করো না।”
সে চলে যাচ্ছিল কথাটা বলে। তাসনুভা তখুনি ডাকলো।
“আনিস ভাই শুনুন। একটা কথা।”
আনিস তার দিকে ফিরলো।
“কী?”
তাসনুভা বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়ালো।
বলল,”আপনার বিয়ের শপিংটা আমার শোরুম থেকে করলে টোয়েন্টি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট পাবেন। আপনার বউকেও নিয়ে আসতে পারেন।”
আনিস মাথা দুলিয়ে বলল,”আচ্ছা দেখি।”
তারপর সে চলে যেতে লাগলো। কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ থামলো। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে তাসনুভাকে পানি থেকে হেঁচকা টানে তুলে নিয়ে এল বালুর মধ্যে।
“আনিস ভাই আপনি কি পাগল? এভাবে কেউ টানে? আমার হাতটা গেল।”
আনিস গর্জে উঠে বলল,”তোমাকে যেতে বললাম না আমার সাথে? তুমি এত ঘাড়ত্যাড়া কেন? আমি তোমার ভাইয়ের সমবয়সী তাই আমার কথা শোনা জরুরি। আশ্চর্য এমন মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি।”
“আপনি এভাবে টেনে আনবেন তাই বলে?”
“আরেহ আমি কাল রাতে তোমাকে নিয়ে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।”
তাসনুভা কানের পেছনে চুল গুঁজতে গুঁজতে বলল,”যারা স্বপ্ন দেখতে পারেনা তারা দুঃস্বপ্নই দেখবে। আপনার হাতটা খুব শক্ত। ময়েশ্চারাইজার লাগাবেন।”
বলেই সে আগেভাগে হেঁটে চলে যেতে লাগলো।
চলমান…
তাজমহল #পর্ব_২৭ (২)
তাজদারকথন
লন্ডনের টেমস নদীর ধারের কনকনে ঠান্ডা হাওয়াটা সেদিন একটু বেশিই ধারালো ছিল। ডিসেম্বরের শেষ, চারিদিকে ক্রিসমাসের আলোকসজ্জা।
রিজেন্ট স্ট্রিটের মাথার ওপর ঝুলে থাকা বিশালাকার অ্যাঞ্জেল আলোগুলো ডানা মেলে উড়ছে। মানুষজন ভারী কোট আর মাফলারে মুখ ঢেকে দ্রুত পায়ে গন্তব্যে ফিরছে।
আমি সাউথ ব্যাংকের একটি কফিশপে জানালার পাশে বসেছিলাম। বাইরে লন্ডনের বিখ্যাত সেই ড্রিলিং অর্থাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ভিজে পিচে প্রতিফলিত হয়ে মায়াবী বিভ্রম তৈরি করেছে। কি চমৎকার!
লন্ডনের এই রুক্ষ সৌন্দর্য, ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্য আর আধুনিক কাঁচের দালানের সহাবস্থান আমাকে বরাবরই টানে। এখানকার মেয়েরা নিখুঁত মেকআপ আর ব্র্যান্ডের পোশাকে স্টাইলিশ কফি মগ হাতে হাঁটে। তাদেরকে দেখে অভ্যস্ত আমি। এই শহরে সৌন্দর্য একঘেয়েভাবে নিখুঁত।
হঠাৎ পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। বাংলাদেশ থেকে ছোটো ভাই কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে।
ক্যাপশনে লেখা, “গায়ে হলুদের ছবি।”
কার গায়ে হলুদ সেটা আমি জানতাম।
বেশ উদাসমনে ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ থামলাম। স্ক্রিনে ফুটে উঠল হলুদ রঙের শাড়ি পরা একটা মেয়ে, খোঁপায় সাদা ফুল, কানে ঝুমকো, আর হাতে একগুচ্ছ কাঁচা গাঁদা ফুলের মালা। রোদের মতো ঝলমলিয়ে সে হাসছে। এমন প্রাণখোলা আমি নিজে কখনো হাসিনি।
আম্মুকে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম,
“তিতলির পাশে মেয়েটি কে?”
আম্মু বলল,”ওই বাড়ির মেয়ে। আশরাফের বোন।”
ওই বাড়ি মানে আমাদের পাশের বাড়ি। ছোটবেলায় যে পরিবারের সাথে আমাদের ছিল আদা-কাঁচকলা সম্পর্ক। আমার খিটখিটে মেজাজ আর অহংকারী, উদ্ধত আচরণের জন্য তারা আমাকে প্রকাশ্য তীব্র ঘৃণা করে বললেও কম হয়ে যায়। বরং অনেক বেশিই। সেই বেশির মাত্রা সম্পর্কে কেউ ধারণাও করতে পারবে না।
লন্ডনের হাই স্ট্রিটগুলোতে আমি কত শত মডার্ন ক্লিওপেট্রা দেখি, কত স্টাইলিশ মানুষের ভিড়ে পথ চলি। কিন্তু এই হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটির মধ্যে আমি সেদিন এমন কিছু একটা দেখলাম যা আগে কোনোদিন দেখিনি। পরিণত বয়সের এই বিষণ্ণ সৌন্দর্য আমাকে থমকে যেতে কেন বাধ্য করেছিল আমি নিজেকে হাজারবার প্রশ্ন করেও উত্তর পাইনি। সেদিন ওই সাধারণ হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটির একঝলকে টেমসের ধারের সব নিয়ন আলো ম্লান হয়ে যায়নি কি?
সেই রাতে আমার আর ঘুম হলো না।
বালিশে মাথা দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাইরে লন্ডনের আকাশটা মেঘলা, তারার দেখা নেই। কিন্তু আমার মনের ভেতর ভেসে বেড়ালো সেই ছোটোবেলার সব স্মৃতি। যে মেয়েটাকে ঘৃণা করতে করতে বড় হয়েছি, আজ কেন যেন মনে হলো আমার এই থমকে যাওয়াটা দরকার ছিল। আমি তো মাটির সাথে মিশতে চাই। পারিনি। চেষ্টা করিনি। সুযোগ আসেনি। এবার কি তবে এসেছে?
আমি কয়েকদিন কাজের ব্যস্ততায় ডুবে রইলাম। সব ভুলে যেতে চাইলাম।
__
কয়েকদিন পর সেন্ট্রাল লন্ডনের একটা ক্যাফেতে দেখা হলো আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু শামীমের সাথে। শামীম আমার খুব কাছের বন্ধু।
কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আমি আমি তাকে একটি গল্প শোনালাম। সে সবটা শুনে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। গল্পকথকই নায়ক, জানার পর সে আমাকে বলল,”মুখোমুখি দাঁড়াও। সোজাসাপটা বলে দাও।”
“আমি এটা কখনোই পারবো না। আমি তাদের ছায়া দেখলেও বিরক্ত হতাম। এমন ঘৃণা কেউ আমাকে করলে আমি তার মুখও হয়তো দেখতাম না।”
শামীম বলল,”তাহলে তুমি নিজেকে সময় দাও। নিজেকে যদি কখনো ক্ষমা করতে পারো তাহলে তার সামনে যাওয়ার সাহস করো।”
তার কথাগুলো আমার বুকের ভেতরটা নাড়িয়ে দিল। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আমি টেমসের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। আকাশে হালকা রোদের আভা। আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। কন্টাক্ট লিস্টে আম্মুর নামটা বের করে গভীর এক শ্বাস নিলাম।
যে আদা-কাঁচকলা সম্পর্কের কথা ভেবে আমি এতদিন দূরে সরে ছিলাম সেদিন কেন জানি মনে হচ্ছে সেই তিক্ততাই ছিল আমাদের অদৃশ্য একটা বাঁধন।
লন্ডনের হাই স্ট্রিটের সব সৌন্দর্যকে তুচ্ছ করে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি হার মানব। এই হার আমার পরাজয় নয়, বরং নিজের সত্তার কাছে ফিরে আসার পরম জয়। আমি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।
যখন দেশে ফেরার টিকেট কনফার্ম করলাম, তখন লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে কুয়াশা আর তুষারপাতের আশঙ্কা। কিন্তু আমার ভেতরে তখন বসন্তের হাওয়া। মনটা পড়ে আছে প্রিয় শহর চট্টগ্রামের সেই গ্রামটায় যেখানে একসময় ঘৃণা আর অহংকারের দেয়াল তুলে আমি নিজেকে বন্দি করে রেখেছিলাম।
আম্মুকে ফোনেই সবটা বলে দিলাম। বাড়ির সবাই জেনে বরফ হয়ে গেল। আমি বরাবরই সিদ্ধান্ত জানাতাম ‘না’ শোনার তোয়াক্কা না করেই। সেদিনও। যেহেতু ভালো একটা ইনকাম আছে সেহেতু বাড়ির সবাই আমার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে আমি এটুকুই বিশ্বাস রাখতাম।
কিন্তু আম্মু কিছুক্ষণ পরেই বলল,”তোমার আসাটা উচিত হচ্ছে না।”
আব্বুও একই কথা বললো। এমনকি বাড়ির সবাই। আত্মীয় স্বজনরাও।
শামীমের কথাগুলোও কানে বাজতে লাগল,”মুখোমুখি দাঁড়াও।”
বিমানে বসে আমি সেই হলুদ শাড়ির ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আগের জেদি আর উদ্ধত সেই ছেলেটা কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেছে এটা কি তারা মানতে পারছে না বলেই এত প্রতিক্রিয়া?
পাশের বাড়ির সাথে আমাদের যে ঝগড়া, যে হিংসা, রেষারেষি আর মুখ দেখাদেখি বন্ধের ইতিহাস তা এক নিমিষেই মুছে ফেলার কোনো জাদুমন্ত্র আমার জানা নেই।
কিন্তু আমি জানি, ওই বিষণ্ণ চোখের গভীরে এমন কিছু একটা আছে যা আমি পড়তে পারবো। আমি পারবোই।
ঢাকা বিমানবন্দরে যখন নামলাম, তখন ভোরের আলো ফুটছে। কুয়াশাচ্ছন্ন ঢাকা শহরটাকে সেদিন বড্ড আপন মনে হলো। গাড়িতে বসে আমি শুধু ভাবছিলাম, যে দরজায় একসময় আমি অবজ্ঞার থুতু ছিটিয়েছি আজ সেই দরজায় কড়া নাড়ার সাহস কি আমার হবে?
গুলশানের ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলাম। বাবা আর মায়ের যত কাছের মানুষ সবাই তখন বাড়িতে উপস্থিত। আমি আবহাওয়া টের পেয়েছিলাম বাড়িতে পা রাখার পরপর। সবাই আকাশ থেকে পড়েছে আমার কথা শুনে।
যোগ্যতা অযোগ্যতার মাপকাঠিতে সারাদিন মাপজোক হলো। আমি চুপচাপ সবার কথা শুনলাম। বিকেলে পাকা কথা জানিয়ে দিলাম, বিয়ে যদি করতে হয় ওই মেয়েকেই করবো।
সবার নিষেধাজ্ঞা শুনে আমার জেদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমি রাগে ক্ষোভে তখন অন্ধ।
তারপর ফিরলাম সেই গ্রামে।
গাড়ি থেকে নামামাত্রই পেলাম তার। খালি পায়ে, ফেরিওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে চলছিল চুল নিয়ে দর কষাকষি। কত সাধারণ একটি দৃশ্য তাই না? অথচ আমার চোখে দেখা সবচেয়ে বিরল দৃশ্য ছিল সেটি।
তারপর সে আমাকে দেখেও অবজ্ঞা করে চলে গেল। সুটেড-বুটেড কর্পোরেট পোশাকের মানুষটি তার কাছে তখন শুধু একজন ঘৃণিত মানুষ।
__
বাড়িতে যুদ্ধ চলছেই। তখন আমি যুদ্ধ করছি তার সাথে একটু দেখা করার, কথা বলার। কিন্তু সে এড়িয়ে যেতে লাগলো। অনেক কষ্টে ফোন নাম্বার যোগাড় করলাম। কল দিলাম। কথা বললো না। মেসেজ দিলাম। সিন করলো না।
সে তার পরিবারের কথাও তখন এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনে একজন বুড়ো লোককে বিয়ে করবে তবুও ওই বাড়ির সেই ছেলেকে নয়।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ওকে আমার কাছাকাছি আনার ব্যবস্থা করতে হবে। মুখোমুখি হতে বাধ্য করতে হবে। তার পরিবারের সাথে কথা বলে তাই তাই করলাম।
আর সেই ফাঁকে আমি বুঝতেই পারলাম না আমি আবারও সেই পুরোনো পথে হাঁটছি।
জেদের বশেই আমি তাকে জয় করলাম। আমাদের দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের শত্রুতা আর আদা-কাঁচকলা সম্পর্কের সেই তপ্ত মরুভূমিতে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি নামল। সে আমার ঘরে এল। ঠিক শরতের মেঘ সরিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছিল আমার অন্ধকার ঘরে। আমার সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে।
আমি বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, যে মেয়েটিকে একসময় ঘৃণা করার জন্য আমি হাজারো যুক্তি খুঁজতাম সে আজ আমার চাদরের ভাঁজে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু সে বিছানায় শুয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মাঝখানে তখন অদৃশ্য একটা দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
লতানো গাছের মতো সে আমার ঘরে ঠাঁই নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই লতা আমায় জড়িয়ে ধরেনি।
আমি জয় করেছি তার শরীরকে, তার উপস্থিতিকে। কিন্তু তার সেই প্রাণখোলা হাসি? সেটা সেই হোয়াটসঅ্যাপের ছবিতেই আটকা পড়ে রইলো।
আমি জেদের বশে তাকে জয় করেছিলাম, অনেকটা শিকল দিয়ে পাখি বাঁধার মতো। আর সেই জেদ মেটাতে গিয়ে আমি আবারও সেই পুরোনো ‘অহংকারী আমি’র পথেই হেঁটে চলেছি তখনো।
যে আভিজাত্য আর ক্ষমতার জোরে আমি তাকে আমার করে নিয়েছিলাম, সেই একই ক্ষমতা তাকে আমার থেকে যোজন যোজন দূরে ঠেলে দিতে লাগলো দিনের পর দিন।
তারপর সেই সাংসারিক জীবনে একের পর এক ভুল ঘটতে লাগলো। দাম্পত্য জীবনের কলহ বাড়তে লাগলো। অথচ আমি কি চেয়েছিলাম? নিজের কাছে প্রশ্ন করার পর উত্তর পেলাম না।
আমার জেদ আমার সত্তাকে আবারও সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গলিতে হারিয়ে ফেললো।
তার কোনো কথা নেই, কোনো অনুযোগ নেই। কিন্তু চাহনিতে সেই পরিচিত অবজ্ঞা। মনে হলো আমি স্রেফ তার জীবনের একটা দুঃস্বপ্ন। সে স্বপ্নে তো ভুলেও নয়। দুঃস্বপ্নেও আমাকে কখনো দেখেনি।
আমার বুকে কখনো তাকে মাথা রাখতে হবে এটা সে কল্পনাও করেনি। আমার স্পর্শ, আমার ঘ্রাণ আমার ছায়াটাও সে সহ্য করতে পারছিল না অথচ তখনো চলছিল মানিয়ে নেওয়ার একটা অতি জঘন্য নাটকীয় খেলা। আমি তা চাইনি। অথচ এটা জানি অধিকাংশ মানুষ সংসারটা করে সং সেজে। কিন্তু তাকে সং সাজে দেখতে চাইনি আমি।
আমি তাকে ভালোবাসছি এটা নিয়ে সে সারাক্ষণ দ্বিধায় ভুগতো। এটা অস্বাভাবিক নয়। আমিই তাকে এমনটা ভাবতে বাধ্য করেছি।
সে খোলা আকাশে মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে চাওয়া পাখি। আমি বদ শিকারি তাকে ভালোবাসার লোভ দেখালে সে ফিরবে কেন? ভালোবাসার অধিকার যেমন আছে। তেমন ভালোবাসতে দেয়ার অধিকারও।
আমার কাছে বিয়ে আর এই সংসার জগতটা বরাবরই নাটকীয় মনে হতো। একটা মেয়ে সংসারে এসে সুখের চাদরে মুড়ে থাকলে পুরোনো সবকিছুর ভুলে গিয়ে নিজেকে সবকিছুতে সঁপে দেয় এটাই ছিল আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বলা যায় অন্ধ বিশ্বাস। সংসারের প্রতিটি পুরুষ সেটাই ভাবে। কিছু মেয়েরা সেটাই প্রমাণ করতে উঠে লেগে পড়ে।
কিন্তু সে আলাদা। তাকে তো আলাদা হতেই হতো।
সে আমাকে প্রতিটা দিনই শিখিয়েছে সে আমার বুকে ঠাঁই চায়। কিন্তু আমি জোর করে কাছে টানলে নয়।
খুব মন খারাপের সময়ে যখন মনে হবে কেউ নেই আমার? এই মনের ভীষণ অসুখ। তখন মুখ গুঁজে কাঁদার জন্য। এই একটা বুকেই সে তার চোখের পানি মুছতে চেয়েছে বরাবরই। চোখ মুছে দিয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বুকের সাথে মিশে থাকার সেই অনুভূতিটুকুর সাথে প্রথম পরিচয় সেই আমাকে করিয়েছে।
সে আমার হাত ধরতে চেয়েছে। কিন্তু আমি শক্ত করে হাত ধরার পরে নয়।
যখন মনে হবে এই হাতটা ধরলে আমার কাঁপুনিটা কমে যেত। আমার সব ভয় কেটে যেত। আমারও দুঃখ বোঝার, কথা শোনার কেউ আছে এমন মনে হতো, তখন। আর আমাকে হাত ধরতে হয়নি। আমি হাত বাড়ানোর আগেই তার পাঁচ আঙুলের জায়গা হয়েছে আমার পাঁচ আঙ্গুলের ভাঁজে।
সে আমার স্পর্শকে প্রতিবার অনুভব করতে চেয়েছে। আমি তাকে জোর করে নিজের সাথে চেপে ধরলে নয়।
যখন সুখদুঃখের গল্প করতে করতে, মনের সব দুঃখ, কষ্ট, ব্যাথা যন্ত্রণা উগরে দেয়ার পর, ভেজা চোখ মোছামুছির পর, চোখে চোখ স্থির হয়ে দুটো মন টেনে একজায়গায় করে বলবে আমাকে পুরো শরীর বিষণ্ণ ব্যাথায় কাতর। আমাকে ছুঁয়ে দাও। ঠিক.. ঠিক তখন!
আমি তার শরীর ছুঁয়েছি। তখন সে হাসেনি। আমি তার হৃদয় ছুঁতে চেয়েছি। অথচ তখনই সে ঝরঝর করে কেঁদে উঠলো। আমি ওই কান্নার বৃষ্টিতে আমার শার্টের বুকটা ভেজানোর অপেক্ষায় ছিলাম। উপায়টুকু জানা ছিল না।
সে আমার দিকে সরাসরি কখনো মুগ্ধ হয়ে তাকায়নি। তাকে কষ্ট দেয়ার পর সে যখন পরে আমাকে আবার ভিন্ন একটা মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করতো তখন সে যেভাবে আমার দিকে চোরা দৃষ্টিতে তাকাতো সেটাই আমার জন্য মুগ্ধতার চাহনি ছিল।
সে আমার কোনো কাজেই হাত দিত না।
কিন্তু গভীর রাতে যখন আমি ল্যাপটপে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ডেস্কেই ঘুমিয়ে পড়তাম, তখন সে খুব সন্তর্পণে এসে আমার গায়ের ওপর কম্বলটা টেনে দিত। আমি টের পেতাম, কিন্তু চোখ মেলতাম না।
খাবার টেবিলে সে কখনো আমার পছন্দের কথা জানতে চায় না। কিন্তু আমি লক্ষ্য করি যে তরকারিটা আমি একটু বেশি আগ্রহ নিয়ে খাই পরের দিনগুলোতে সেই পদটাই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে রান্না হয়।
কোনো কোনো ঝগড়ামুখর বিকেলের পর, আমি যখন বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকতাম, সে পেছন থেকে এসে পর্দা ঠিক করার বাহানায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো। সে জানতো, আমি জানি সে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার স্পর্শ নিতে আসত না, কিন্তু আমার উপস্থিতির আশেপাশে তার সেই নিঃশব্দ অবস্থানটুকু আমাকে বোঝাতো যে, ঘৃণা করতে করতেও সে আমার অভ্যেসে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার সেই বিস্ময়মাখা চাহনি। মেয়ের সাথে যখন আমি ধুলোবালি মেখে লুতোপুটি খেলি, তখন সে আড়াল থেকে একপলক তাকায়। সেই দৃষ্টিতে থাকাটা দ্বন্দটা তাকে অবাক করে এই ভেবে, এই মানুষটাই সেই উদ্ধত শিকারি?
সেই এক মুহূর্তের ‘অন্যরকম আমি’কে আবিষ্কার করার আনন্দে তার চোখের মণি দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠতো।
রাতের বেলা যখন আমি অঘোরে ঘুমানোর ভান করি সে মাঝেমধ্যে আমার হাতের তালুতে নিজের আঙুল রাখে। জানে আমি ধরবো না। তারপরও।
তার সেই ভীতু আঙুলের স্পর্শ আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা মানে স্পর্শ নয়। অনুভব করা।
সম্পর্কের সবটুকু মাধুর্য যে সরাসরি প্রকাশে থাকে না, তা আমি তাকে দেখেই বুঝেছি।
তার অবহেলা অবজ্ঞা পাহাড়ের মতো অটল, কিন্তু সেই পাহাড়ের খাঁজেই নাম না জানা কত বুনো ফুল যে লুকোনো। একদিন সেই চাদর তুলে ফেললে হয়তো দেখা যাবে পৃথিবী সমান একটা বাগান হয়ে আছে।
সে এখন আমার কন্যা সন্তানের মা। অথচ সে এখনো আমার ভালোবাসায় পুরোপুরি বিশ্বাসী না। এখনো আমি তার চোখের দিকে না তাকিয়ে কথা বললে সে মনে করে সেই চোখ দিয়ে আমি অন্য কাউকে দেখছি। মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে কথা বললে সে হাজারটা অহেতুক চিন্তা করে বসে থাকে। সে এখনো মনে করে আমি তাকে ভালোবাসি না।
আমি বদ শিকারি আর সেই অভিমানী উড়ালপঙ্খীর একাকী সংসারের বয়স মাত্র চারদিন।
এই চারদিন আমি তাকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবিষ্কার করেছি।
অভিমানী স্ত্রী
যত্মবান মা
সদ্য প্রেমে পড়া চঞ্চলা প্রেমিকা
আর তার আমার দ্বিধার সংসারের একটা প্রশ্নচিহ্ন।
সে আজও আমাকে ভালোবাসে বলেনি। আমিও চাই না বলুক। আমার তৃষ্ণা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে সে হাজারবার ভালোবাসি বললেও আমার তৃষ্ণা কমবে না।
কিছু তৃষ্ণা আজন্ম থাকুক।
গতরাতে সে আমার বুকে উপর উঠে এল। সচরাচর এমন হয় না। আমি অবাক হলাম।
“এই তাজদার সিদ্দিকী শুনুন।”
“কী?”
“কেমন হতো আমরা আগে থেকে প্রেমিক প্রেমিকা হতাম। তারপর বিয়ে করতাম? তখন এতকিছু তো হতো না?”
আমি মনে মনে হাসলাম। আগে থেকেই প্রেমিক প্রেমিকা হলে, আমরা এখন শুধু দম্পতিই হতাম। যা আর পাঁচটা দম্পতি হয়। বিয়ের পর প্রেমিক প্রেমিকা হতে পারে ক’জনা?
Share On:
TAGS: তাজমহল সিজন ২, প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৯
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৫
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৬
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৯
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২২
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১০
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৫