তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড
পর্ব_২৬
প্রিমাফারনাজচৌধুরী
“তুমি ট্যুরে যাচ্ছ না কেন?”
“যেতে ইচ্ছে করছে না।”
রওশনআরা একটু বিরক্ত হলেন।
“তোমার মুখে সবসময় এককথা নুভা। তুমি আর কতদিন আমাকে অশান্তি দেবে বলতে পারো?”
তাসনুভা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকালো।
“আমি তোমাকে অশান্তি দেই আম্মু?”
“দাও তো। এই বয়সে মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে বাচ্চা কাচ্চা পালে।”
” এত পড়াশোনা না করিয়ে ক্লাসে ফাইভেই বিয়ে দিলে পারতে।”
“নুভা সবকথার জবাব রেডি তোমার মুখে। একটার কোনোমতে সংসার হয়েছে। আমি জানিনা তোমাকে নিয়ে কি হবে।”
“তুমি কি আমাকে কিছু বলতে এসেছ?”
“তুমি বলতে দিচ্ছ কোথায়?”
“বলো।”
“তোমার বড়ো ভাইয়ার কাছে একটা সম্বন্ধ এসেছে। আমি তাজকে বলবো কিছুদিন সময় নিয়ে পাত্রকে দেখেশুনে কথাবার্তা সেড়ে নিতে।”
“ওকে ফাইন। যা ইচ্ছে করো। বাট আমি কেমন সেটা বিস্তারিত খুলে বলে দেবে। তারপর রাজি হলে ভালো।”
“বিস্তারিত মানে?”
“মানে ওই যে রান্নাবান্না আর ঘরের কাজকর্মে পটু নয় এগুলো।”
“তো রান্না শিখে নাও। এটা তেমন কঠিন কাজ না। রান্না না পারলে যেকোনো শ্বাশুড়িও কথা শোনায়।”
“যারা রান্না করতে পারে না তারা শ্বশুরবাড়িতে বকা খায়। যারা রান্না করতে পারে তারা রান্নাও করে, বকাও খায়। সো না পারলেই লাভ।”
রওশনআরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ঝিমলি এসে বলল,”নুভা মেজো ভাইয়া কথা বলতে চাচ্ছে তোমার সাথে।”
তাসনুভা দ্রুত মাথা নাড়লো।
“আমি কথা বলবো না। আমি ট্যুরে যাব না। আমার ভালো লাগছে না।”
ঝিমলি বলল,”আপনি যাচ্ছেন। আপনার হয়ে আমি বলে দিচ্ছি। সবাই যাচ্ছে আপনি না গেলে ভালো লাগবে না। আর আমি আমার ননদিনী ছাড়া যাব না। রুহাবও তার ফুপীকে ছাড়া যাবে না।”
তিতলি দরজার কাছে উঁকি দিয়ে বলল,
“আমিও না।”
তাসনুভা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকালো।
“তুমি এটা কি ধরনের ড্রেস পরেছ তিতলি? সালোয়ার কামিজ ওড়না তিনটা তিন ড্রেসের।”
তিতলি কোমরে হাত দিয়ে ঝিমলির দিকে তাকালো। ঝিমলি হেসে বলল,
“আল্লাহ! এটা কেমন মেয়ে!”
রওশনআরা তিতলিকে বলল,”কাপড় চেঞ্জ করে আসো। কোনো অশান্তি চাই না আমি।”
ভ্রমণের জন্য বেশ কয়েকটি জায়গার নাম তালিকায় থাকলেও, ছোট বাচ্চা আর মায়েদের আরামের কথা মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত একটি নামই চূড়ান্ত হলো। কক্সবাজার। যাতায়াতের ঝক্কি কম আর বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বিবেচনা করলে কক্সবাজারের চেয়ে ভালো বিকল্প আর কিছু হতে পারে না।
তাজদার এবং শাইনা ঢাকা থেকে সরাসরি রওনা হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই কক্সবাজার পৌঁছে যাবে বলে সবাইকে নিশ্চিত করলো। পরিবারের বাকি সদস্যরা চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করেছে।
আশরাফ সাবরিনা, রায়হান ঝিমলি, তৌসিফ শাওন, তিতলি তাসনুভা আর আনিস ড্রাইভার সহ মোট নয়জন বড়ো টয়োটা হাইয়েসে করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাসনুভা যেতে গড়িমসি করায় তাজদার গতরাতে ফোনের ওপাশ থেকে হুমকি দিয়েছে,
“হোয়াটস ইয়োর প্রবলেব নুভা? সবাই যাবে তুমি না গেলে কেমন দেখায়? তুমি না গেলে সবার যাওয়া আটকে দেব। আর কেউ যাবে না।”
সে বেশি রেগে যাচ্ছে দেখে ঝিমলি ফোন কেড়ে নিয়েছিল। রওশনআরা বলল,
“ভাইয়ের বকুনি খেতে ইচ্ছে করছিল ওর। আর কিচ্ছু না।”
ঝিমলি তাসনুভার পিঠে আলতোভাবে চাপড়ে দিয়ে হেসে বলল,”রেডি হয়ে নিন। আনিস ভাই গাড়ি ভাড়া করে রেখেছে।”
তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,”উনাকে একটা ফোন করি।”
দরজার কাছে গিয়ে ধীরেধীরে ফিরে তাকালো। তাসনুভা তাকে পিঠ করে বসলো।
গাড়ি এসে গেছে। তাসনুভার সবসময় রেডি হতে একটু সময় লাগে। তাই রায়হান তাকে বলেছে তাড়াতাড়িই রেডি হতে। তবুও তার দেরী হয়ে গেল।
বেরোনোর আগে শাওন আর আনিসের মধ্যে কথা কাটাকাটি লেগে গেল। অত দামী একটা শার্টে কীসের দাগ লাগিয়ে এখন শাওনের শার্ট নিয়ে টানাটানি করছে আনিস। শাওন তাই রেগে গেছে।
শাহিদা বেগম বললেন,”কোথাও বেরোনোর আগে তোদেরকে ঝগড়া করতেই হবে! আনিস তোর কি শার্ট কম বলতো? তুই দরকার পড়লে তোর বড়ো ভাইয়ের কাছ থেকে একটা নে।”
আনিস বলল,”আম্মা তোমার এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।”
শাহিদা বেগম তবুও ছাড় দিলেন না।
“দুজনেই তো নতুন শার্ট সেলাই করেছিস। তোরটা কোথায়? ওটাতে কি হয়েছে? শাওন বলছি কীসের দাগ যেন..
“আম্মা বললাম তো তোমাকে এসব ব্যাপারে না জড়াতে।”
দাদিমা এসে বলল,”আমার জন্য আচার আনিস বেশি করে।”
আনিস বলল,”তোমার দাঁত আছে যে আচার খাবে।”
“ধুর ব্যাটা। তোর বউয়ের জন্য মজুদ রাখবো।”
“কতদূর অব্দি ভেবে ফেলেছ।”
রায়হানের ডাক ভেসে এল।
“আনিস শাওন কোথায়?”
আনিস বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।
“আসছি রায়হান ভাই। তোমরা গিয়ে বসো।”
“তাড়াতাড়ি আসো। তাজ ফোনের উপর ফোন করছে।”
সবাই গাড়িতে এসে বসলো। কিছুক্ষণ পর তাসনুভা নেমে এল। ধবধবে একটা সাদা কূর্তি পরেছে সে। চুলের উপর চশমা আটকানো। অন্যদিন হলে সে বলতো জানালার পাশে আমি বসবো। আজ কিছু বলল না। তবে কিছু না বলায় সবাই তাকে জানালার পাশে বসার সুযোগ করে দিল। যদিও গাড়িতে এসি আছে। রওশনআরা আর জোহরা বেগম তাদের বাড়িয়ে দিতে এল। বললেন,
“সবাই সাবধানে যেও। তিতলি!”
তিতলি চিৎকার দিল,”প্রেজেন্ট স্যার।”
তার মাথায় একটা চড় বসালো তৌসিফ।
“দুষ্টুমি করবে না তুমি। সবাই ওকে একটু দেখে রাখবে।”
আনিস যেহেতু রাতে খাবার দিতে পারবে না। তাই তার কুকুরগুলোকে এখুনি খাবার দিয়ে দিচ্ছিল। খাবার দিয়ে আফসার সাহেবকে আবারও বলল,”আব্বা ওরা রাতে আবার এলে খেতে দিও।”
আফসার সাহেব হেসে ফেললেন।
“আচ্ছা আচ্ছা আমি দেখবো।”
ঝিমলি সাবরিনা ওর কুকুর বিড়ালকে খাবার দেয়া নিয়ে হাসাহাসি করছে। ঝিমলি বলল,
“আনিস ভাইয়ের বিয়ের বৈরাতী হিসেবে ওরা গেলে আর কাউকে যেতে হবে না।”
সাবরিনা বলল,”তার একটা বিড়াল নাকি বাচ্চা দেবে কিছুদিন পর। আম্মাকে বলেছে আম্মা আমার বিড়াল বাচ্চা দেবে। মাছ রান্না করে রাখবে রাতে। আম্মা বলে পোয়াতি বিড়ালের এত যত্ন। বউকে তো মাথায় তুলে রাখবে এই ছেলে।”
সবাই হো হো করে হাসতে লাগলো। আনিস এসে জানালা দিয়ে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,”সবাই চলে এসেছে?”
ঝিমলি বলল,”হ্যাঁ হ্যাঁ সবাইইই।”
তাসনুভা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে কানে ইয়ারপিস গুঁজে। আনিস ড্রাইভারের পাশেই বসলো। রায়হান, আশরাফ, আনিস, তৌসিফ আর শাওন সবাই মিলে রাজনৈতিক নানান আলাপসালাপ শুরু করে দিল। ড্রাইভারও সেখানে যোগ দিল। তাসনুভা মহাবিরক্ত। ইচ্ছে হচ্ছে এদের সবকটাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে।
তাজদার আর শাইনা পৌঁছে গেল দুপুর নাগাদ।
সায়মন বিচ রিসোর্টে চেক-ইন করে ফ্রেশ হয়ে নিল দুজন। একটু পরেই দুপুরের খাবারটা খেল একসাথে। একটু বিশ্রাম নিয়ে সুগন্ধা পয়েন্টে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে দেখতে সে হঠাৎ তাজদারের দিকে তাকালো। বলল,
“আপনাকে একটা কথা বলি?”
তাজদার কপাল কুঁচকে তাকালো।
“বলো।”
খুব বাতাস। শাইনার চোখমুখ ঢেকে যাচ্ছে চুলে। সে বলল,”এভাবে কপাল কুঁচকে তাকালে বলবো না।”
তাজদার পাশে থুতু ফেলে বলল,”এখানে কি বাতাসেও নুন থাকে? বলো কি বলবে।”
শাইনা বলল,”এবার তো একদমই বলবো না।”
তাজদার গর্জালো।
“পাগল নাকি। বলো কি বলবে।”
“না না।”
তাজদার কপাল কুঁচকে, নাক মুখ সিঁকেয় তুলে তার দিকে চেয়ে রইলো। শাইনা মুখ ভার করে এলোমেলো হাঁটতে লাগলো। তাজদার বলল,
“আচ্ছা চলো ফিরে যাই। আমার মাদার উঠে যাবে।”
শাইনা জবাব দিল না। তাজদার বলল,”কোথায় যাচ্ছ? আশ্চর্য! কি করেছি আমি? মুখ ভার কেন?”
শাইনা তার দিকে ফিরলো এবার। ধীরেধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“আমরা বিয়ের পর কক্সবাজার এসেছিলাম মনে আছে?”
“মনে থাকবে না কেন? ঐতিহাসিক হানিমুন।”
কত সহজে বলে দিচ্ছে। শাইনার এবার কেন যেন কান্না কান্না পাচ্ছে। সে ওই সময়টা ভুলতে চায়। যাতে প্রতিবার কক্সবাজার এলে তার মন খারাপ না হয়। তারা তো সুখেদুখে দিন কাটানোর শপথ করেছে। সেই জঘন্য স্মৃতিগুলো সে মনে রাখতে চায় না। তখনকার তাজদার সিদ্দিকীকেও না।
“কি হলো?”
“আমি ওই দিনগুলো ভুলতে চাই।”
“আমাকে ভালোবাসো। ভুলে যাবে।”
“আমি তো চাই ভালোবাসতে।”
“তাহলে পারছো না কেন? আমার চেহারা খারাপ?”
বলেই সে শাইনার দিকে ঝুঁকল। শাইনা তার গালে টুপ করে একটা চুমু খেল।
“যাহ শালা চুমুতেও নুন।”
তাজদার তার কোমর জড়িয়ে বলল,”আরেকটা দাও। চিনির ফিল আসবে।”
“অসম্ভব। ছাড়ুন।”
তাজদারের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও এলোমেলো হাঁটতে লাগলো সে। নেমে যেতে লাগলো সমুদ্রে।
এমন তো কথা ছিল না। তাজদার চিৎকার দিয়ে ডাকলো,
“এই এখন কেন পানিতে নামছো?”
“আমার ইচ্ছা। আপনি বেশি কথা বলেন ভাই।”
“ভাই?”
“হ্যাঁ ভাই চুপ করেন।”
“মাথা কি গেল নাকি? অ্যাই মমতাজ বেগম!”
চোখ মুছতে মুছতে সমুদ্রে নেমে যেতে লাগলো শাইনা। তাজদার তার পিছু পিছু দৌড়াতে লাগলো।
“শাইনা? মমতাজ? দাঁড়াও। এই মেয়ে। আরেহ।”
শাইনা কিছুদূর নেমে গিয়ে তার দিকে তাকালো। তাজদার দৌড়ে পানির মধ্যে নেমে গিয়ে শক্ত হাতে তার হাত ধরলো। তার চোখে থেকে পানি গড়িয়ে পড়েছে। তাজদার বলল,”কি হয়েছে তোমার?”
“কিছু না। চোখে নুন পড়েছে।”
তাজদার আচমকা শব্দ করে হেসে উঠলো। শাইনা তার দিকে চেয়ে রইলো। তাজদার হাসতে হাসতে বলল,”চোখেও নুন?”
শাইনা দু’হাতে পানি ছিটিয়ে তাজদারকে ভেজাতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরটা ভেঙে এল। কান্নার তোড়ে ঝাপসা হয়ে এল চারপাশ। তাজদার তার অট্টহাসি থামিয়ে মুহূর্তেই শান্ত হলো। শাইনাকে পরম আবেশে টেনে নিল নিজের বুকের খুব কাছে।
শাইনা কান্নার বেগ আরও বাড়ল। এখানে সে এসেছিল বুকভরা আশা নিয়ে, ভেবেছিল খোলা হাওয়ায় মনটা হালকা হবে। কিন্তু প্রকৃতির এই স্পর্শ তার জমানো কষ্টগুলোকে আরও উসকে দিল। তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। পৃথিবীর সমস্ত শব্দকে ছাপিয়ে নিজের হাহাকার আর আক্ষেপগুলো জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
তাজদার তাকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে সরাসরি চোখের দিকে তাকাল। হাঁটুতে হাতের ভর রেখে তার দিকে ঝুঁকে বলল,
“আচ্ছা বেশ তুমি কাঁদো। সবটুকু উজাড় করে কাঁদো। ভেতরে যা যা পাথরের মতো জমিয়ে রেখেছ, সব আজ বের করে দাও। যত জোরে পারো চিৎকার করো! এখানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কেউ নেই তোমার কথা শোনার। কেউ বিচার করতে আসবে না। করো, চিৎকার করো!”
শাইনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক বুক শূন্যতা নিয়ে সে চিৎকার করে উঠল। চিৎকার করতে লাগলো। সেই আর্তনাদ বাতাসের শব্দের সাথে মিশে দূর দিগন্তে মিলিয়ে যেতে লাগল।
সে তাজদারকে জোরে ধাক্কা মারতে মারতে বলল,
“আপনি আমাকে ছোটোবেলায় খুব কষ্ট দিয়েছেন। আমি খুব হীনমন্যতায় ভুগতাম তখন। আপনি তারউপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা দিতেন। আমার খুব কষ্ট হতো।”
“আর?”
“বিয়ের পরও কষ্ট দিয়েছেন। আপনি আমাকে বুঝতে চাননি। আপনি আমাকে পড়তে পারেননি। আপনি আমাকে জানতে চাননি। আপনি আমাকে পদেপদে কষ্ট দিয়েছেন। স্বামী সংসার নিয়ে দেখা সব স্বপ্ন আপনি ভেঙেচুরে খান খান করে দিয়েছিলেন।”
কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। এ কান্না সেই কান্না নয়।যে কান্না বিগত দিনগুলোতে নীরবে, একা একা কেঁদেছে। এ কান্না উজাড় করে দেওয়া কান্না।বুকের ভেতর জমে থাকা সবটুকু একসাথে বেরিয়ে আসার কান্না।
তাজদার শুধু তাকিয়ে রইল। কোনো বাধা দিল না, কোনো প্রশ্ন করল না। ছোটোবেলা থেকে আজ পর্যন্ত জমে থাকা যত অভিযোগ, যত অভিমান সব সে চিৎকার করে বলতে লাগল। এলোমেলো, কাঁপা কাঁপা গলায় চেপে রাখা যন্ত্রণাগুলো। নিজেকে দেয়া শাস্তিগুলো। সে কতদিন মন খুলে হাসেনি। প্রাণ খুলে কাঁদেনি। কতগুলো দিন মনপ্রাণ উজাড় করে কথা বলেনি।
তাজদার সিদ্দিকী ঠিক এটুকুই চেয়েছিল। আল্লাহর কাছে বারবার প্রার্থনা করেছে যেন তার মনের সব রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ একদিন তার সামনেই উগরে বেরিয়ে আসে। আজ সেই দিন। আজ তার সবচেয়ে বড়ো পাওনার দিন
শাইনা সব অভিযোগ জাহির করার পর বলল,
“তাই তো আমার ইচ্ছে হয়েছিল আপনাকে শাস্তি দেওয়ার। আমি আপনার কাঁদতে দেখতে চেয়েছি। খুব খুব ঘৃণা করেছি। আপনাকে ভেঙেচুরে খান খান করতে চেয়েছি আমি আপনাকে ভাঙতেও পেরেছি। তারপর…
তাজদার তাকে বুকে টেনে নিল। অনেক বড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,”তারপর টুকরো গুলো তোমাকেই কুড়িয়ে নিতে হলো। আমার আল্লাহর ইচ্ছায় এক সুতোয় বেঁধেছি। সেই সুতো তাঁর ইচ্ছেতে নড়বড় হয়েছে। আজ তার ইচ্ছেতে মজবুত হয়েছে। আর কেঁদো না। আমরা আবারও এই সমুদ্র আসবো। তুমি চিৎকার করে তোমার সব অভিযোগ জানাবে। আমি আমার।”
“আমি আর জীবনেও কাঁদবো না।”
“একদম না।”
“ওকে ওকে। চলুন। বাবুকে একা রেখে এসেছি।”
শাইনা তার মুখের দিকে তাকালো। তাজদার তার নাকে নাক ঘষে বলল,
“আল্লাহকে বলো আল্লাহ বরের শয়তানি ছাড়াতে গিয়ে নিজেই শয়তান সেজেছিলাম কিছুদিনের জন্য। মাফ করো।”
শাইনা তাকে ধাক্কা দিল তারপর তাকে ছেড়েছুড়ে চলে যেতে লাগলো। তাজদার তার যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো।
শাইনা যেতে যেতে কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। তারপর ধীরেধীরে তার দিকে ফিরে তাকালো।
“আমাকে ডেকেছেন?”
তাজদার হালকা হেসে মাথা নাড়তে লাগলো। হাসবে না কেন? সে কতোবার আকুল হয়ে ডাকে। মমতাজ কোনোদিন শুনতে পায়নি। আজ শুনতে পেল। সে হাসবে না?
ডাকেনি শুনেও শাইনা ছুটে এল। এসে লাফ দিয়ে তাকে তার গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়লো। গাল চুম্বন করে বলল,
“সিনেমার নায়কদের মতো ধরে রাখুন।
তাজদার তার কথায় হাসলো। শাইনা ধমকে বলল,
“চুপ। হাসবেন না।”
তাজদার হাসলো। এমনকি তার বাম চোখটা আজই প্রথম ভিজেছে। যারা শত দুঃখেও কাঁদতে পারে না। তাদের কি সুখের সময় একটু কাঁদা উচিত না?
তারা রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে বাড়ির সবাই হাজির। তিতলির আনন্দ দেখে কে? তাকে তৌসিফ শক্ত হাতে ধরে রেখেছে। সে সমুদ্র দেখতে চলে যাবে বায়না করছিল।
তাজনা তখনো ঘুম। তাকে ঘুমন্ত দেখে তাজদারের প্রাণ ফিরে এল। গালে অজস্র চুম্বন করে বলল,”আর কখনো আপনাকে ফেলে কোথাও যাব না আম্মু। প্রমিজ প্রমিজ প্রমিজ।”
শাইনা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল সেলোয়ার-কামিজ পরে। তাজদার কোনো কথা ছাড়াই শাড়ি বের করে দিল।
“দুঃখীত আপনাকে শাড়িই পরতে হবে।”
“শাড়ি পরা অনেক কষ্টের।”
তাজদার বলল,”আমি পরাতে জানি। লেট মি শো ইউ।”
বলেই সে শাইনাকে খুব গুছিয়ে শাড়ি পরিয়ে দিল। আঁচলটা কাঁধে তুলে দিতেই শাইনা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইলো। এই ব্যাটা পারেনা কি?
তাজদার তার দু-গাল আঁকড়ে ধরে ছোট্ট ছোট্ট চুমুতে সারামুখ ভিজিয়ে দিয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ।”
শাইনা বলল,”আই ফিল ইউ।”
“যাই ওদের দেখে আসি।”
রাতে বাতাস একটু কম। তখন সবাই বেরিয়েছে বাচ্চাদের নিয়ে। পূর্ণিমার আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। তৌসিফ, শাওন, আনিস একসাথে ফুটবল খেলছে। ফুটবলটা এনেছে তৌসিফ। রায়হান তাকে বকে যাচ্ছে। এখানে ফুটবল আনার কি দরকার ছিল?
সবাই মিলে হাঁটতে হাঁটতে খাওয়াদাওয়া করলো। আসার সময় ঝিমলি অনেক চানাচুর বিস্কিট চিপস জাতীয় খাবার দাবার এনেছে।
শাইনাকে একটু হাসিমুখে দেখে সাবরিনা ঝিমলি একসাথে বলাবলি করলো,
“মমতাজ বেগম দেখছি বরের কাছে গিয়ে ফিট অ্যান্ড ফাইন।”
শাইনা লজ্জা পেয়ে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,”মেজো ভাইয়ার বউয়ের সাথে কথা বলেছি। আমার তো খুব ভালো লাগছে। ভাবি কথা বলেছ?”
সাবরিনা বলল,”হ্যাঁ, মনে হচ্ছে মিশুক হবে।”
তিতলি একদৌড়ে একা একা বসে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকা তাসনুভার সামনে গিয়ে বসলো। চিপস বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আপু খাবে?”
তাসনুভা দুইপাশে মাথা নাড়লো। তিতলি বলল,
“একটা কথা বলবো?”
“বলো।”
“আই লাভ ইউ।”
তাসনুভা এই প্রথম তার দুষ্টুমি দেখে হাসলো।
“ঠু।”
“থ্রি, ফোর, ফাইভ, সিক্স, সেভেন, হান্ড্রেট, থাউজ্যান্ড, মিলিয়ন, বিলিয়ন।”
বলে সে লাফাতে লাফাতে চলে গেল। চিৎকার করতে লাগলো, গোল গোল গোল।
তৌসিফ এসে তাসনুভাকে বলল,”কিরে একা একা বসে আছিস কেন? কিছু খাবি?”
“না।”
“ভাবিদের কাছে যা।”
পরক্ষণেই তৌসিফ দেখলো সবাই জোড়া জোড়া হাঁটছে ছেলেমেয়ে নিয়ে। তৌসিফ হেসে বলল,
“একটা বিয়ে করে ফেল। আমিও ইউকে চলে যাব কিছুদিন পর। কখন আসতে পারব জানিনা। আমি তোর বিয়েটা দেখে যেতে পারবো।”
তাসনুভা জবাব দিল না। তৌসিফ তার চুল ঘেঁটে দিয়ে চলে যেতে যেতে আনিসের উদ্দেশ্য বলল,
“আনিস ভাই ইটস নট ফেয়ার। এইবার বল ছাড়েন।”
শাওন রেগেমেগে বলল,”না ও খেলুক একা একা।”
আনিস পায়ে ঠেলে বলটা তার দিকে পাঠিয়ে দিয়ে বলল,”আচ্ছা নে।”
তৌসিফ তার দিকে পানির বোতল ছুঁড়ে দিল। আনিস বোতলটা খপ করে ধরে ছিপি খুলে কুলকুচি করলো। তারপর পানি খেতে খেতে বালির উপর এসে বসলো ধপ করে।
কয়েকহাত দূরে তাসনুভা। হাওয়ায় তার চুল উড়ছে। আনিস সামনে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলো।
ওইদিকে শাইনা, ঝিমলি, সাবরিনা একসাথে আনিসের বউয়ের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো ভয়েস শুনে নিজেরাও ভয়েস দিয়ে কথাবার্তা বলছে।
তাসনুভা দু-হাতে নিজের দুবাহু ঢেকে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে করতে আনিসের দিকে তাকালো। চাঁদের আলোর সবটুকু তখন যেন আনিসের মুখে। তাসনুভা বলতে ইচ্ছে হলো, আনিস ভাই আপনার একটা ছবি তুলি?
কিন্তু সে বলতে পারলো না। সে কখনোই বলতে পারবে না। কিছু কথা কাউকে কখনো বলা যায় না। কিছু ইচ্ছে জন্মায় শুধুই নিজের ভেতর বেঁচে থাকার জন্য।
হঠাৎই সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর রিসোর্টের দিকে চলে যেতে লাগলো।
“নুভা চলে যাচ্ছে কেন?”
সবাই একসাথে তাকালো তাসনুভার দিকে। ঝিমলি আনিসের দিকে তাকালো চট করে।
আনিস সামনের সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। আনিস ভাই ফিরে তাকালো না কেন? তাহলে কি নুভার চলে যাওয়ার কারণটা উনিই সবচেয়ে বেশি জানেন?
সমুদ্রের নোনা জলের ওপর সাদা একখণ্ড মেঘের মতো ভাসছে একটা দেহ। ঠিক যেন একটা ডানাকাটা সাদা পরী।
চারপাশের ভিড় আর কোলাহল ঠেলে আনিস উন্মাদের মতো সামনে এগিয়ে গেল। দেখল তাজদার, রায়হান, আশরাফ আর তৌসিফ পাথর হয়ে গেছে। তাদের সবার মুখ ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য। তিতলি হাউমাউ করে কাঁদছে। তাকে ধরে রেখেছে ঝিমলি।
হৈচৈ আর সমুদ্রের গর্জনে চারপাশ মুখর। কিন্তু আনিসের কানে সব শব্দ ভোঁতা হয়ে আসছে।
সে মরিয়া হয়ে লোকজনকে কনুই দিয়ে সরিয়ে আরও সামনে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই দৃশ্যটা ওর চোখের মণি স্থির করে দিল। নোনা জলের ঢেউয়ে দুলছে তাসনুভার নিথর দেহটা। তার শ্রবণশক্তি মুহূর্তেই লোপ পেল।
চারপাশের আর্তনাদ, সমুদ্রের গর্জন কিছুই তার কানে পৌঁছাল না। শুধু স্মৃতির গভীর থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ক্রমাগত মস্তিষ্কে ধাক্কা দিতে লাগলো,
“আনিস ভাই আমার একটা ছবি তুলে দিন!”
চলমান…..
(শেষের দৃশ্যটুকু “আমার আছে জল” বই থেকে নেয়া।)
Share On:
TAGS: তাজমহল সিজন ২, প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১২+১৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৪
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২০
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৪
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৫
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৯
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৫+১৬
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩২
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩০
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৯