Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ডেসটেনি

ডেসটেনি পর্ব ৮


ডেসটেনি [ ৮ ]

সুহাসিনি_মিমি

অতিরিক্ত বিস্ময়ে মানুষ যেমন কিছুক্ষনের জন্য কিংকত্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরে, লোপ পায় বিবেক বুদ্ধি, হাসিবের অবস্থাটাও হচ্ছে সেইরকম। বিস্ময়ে বেচারার চোখ দুটো এতটাই বড় হয়ে উঠেছে যে মনে হচ্ছে আর একটু হলেই কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে! যে মানুষটার পকেট থেকে এক টাকাও সহজে বেরোয় না— সেই মানুষ আজ স্বেচ্ছায় সত্তর হাজার টাকার বিল মিটিয়ে দিচ্ছে? ঘটনাটা তার কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য যে!

তাজধীর আদতে কৃপণ নয়, কিন্তু ভীষণ হিসেবি গোত্রের মানুষ সে। অযথা খরচ সে করে না। বন্ধুরা অন্তত তাকে কখনোই অপচয় করতে দেখেনি। তাই আজকের এই দৃশ্য হাসিবের কাছে অলৌকিকের কম কিছু নয়।

বিলিং মেশিনে কার্ড সোয়াইপ হলো। রসিদ বেরিয়ে এলো। তাজধীর নির্বিকার ভঙ্গিতে স্লিপে সাইন করল। পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয়ন্তী নিঃশব্দে সব দেখছে। নতুন ফোনের বাক্সটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও পাভেলের পিছনের দিকে। তাজধীরের পিছন সাইড টুকুই দেখা যাচ্ছে তাতে। লোকটা কি রেগেমেগে বিল পে করছে নাকি?একবার মন চাইলো লোকটার চেহারাটা পরখ করার। তবে হলোনা। পাভেলের কাছ থেকে জোরাজোরি করেই একপ্রকার বিল পে করল তাজধীর। কাজ শেষ হতেই পাভেল মিতালী আর প্রিয়ন্তী কে নিয়ে বেরিয়ে এলো শোরুম ছেড়ে।

ওদিকে ঠিক এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল হাসিব। শোরুম থেকে বেরোতেই অধৈর্য হাসিব একহাতে তাজধীরের কনুই চেপে ধরল শক্ত করে। এরপর কানের কাছে ঝুঁকে ফুসফাঁস করে বলে উঠল,

“কিরে ভাই, ব্যাপার-স্যাপার কী? জীবনে তো দেখলাম না আমাদের একটা সুতা কিনে দিতে! আর সেখানে সোজা সত্তর হাজার! ভাবা যায়! এই অধমকে তো একটা সুটাও কিনে দিলি না কোনোদিন!”

তাজধীর প্রথমে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল বন্ধুর দিকে। হাসিব খুব আগ্রহ নিয়েই কথাটা বলে থেমেছে তখন। হঠাৎই হাসিবের হাত চেপে ধরল তাজধীর। বলল,

“চল।”

“কোথায়?”

উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওকে প্রায় টেনে টেনে নিয়ে গেল রাস্তার পাশের একটি ছোট দোকানের সামনে। দোকানটা সেলাইয়ের সামগ্রীর। নানা রঙের সুতা, বোতাম, ফিতা সাজানো কাচের তাক জুড়ে।
দোকানদারের দিকে তাকিয়ে তাজধীর শান্ত গলায় বলল,

“আপনার দোকানের সবচেয়ে এক্সপেনসিভ সুতো কোনটা? ওটা দেখান।”

হাসিব হতভম্ব। মুখ হাঁ হয়ে গেছে প্রায়। ওর বন্ধু করছেটা কি? দোকানদারও কিছুটা বিস্মিত হলো যেন তাতে। তাক থেকে যত্ন করে একটি ছোট প্যাকেট নামাল। বলল,

“এই যে স্যার, এটা সবচেয়ে দামি।”

তাজধীর আঙুলের ইশারায় হাসিবের দিকে দেখিয়ে বলল,

“ওকে দিন।”

হাসিব যেন বোঝার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। দোকানদারের বাড়িয়ে দেওয়া সুতার প্যাকেটটা বিস্ময়ে মুখ হা করেই নিলো হাতে। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার মত করে মুখটা এইটুকুন হয়ে এলো ওর।
তাজধীর জিজ্ঞেস করল,

“কত?”

দোকানদার দাম বলতেই তাজধীর বিনা বাক্যব্যয়ে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে বিল মিটালো।
তারপর হাঁটা শুরু করতে করতে বন্ধুর হাঁ করে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে উৎসুক স্বরে বলল,

“একটাই বন্ধু তুই আমার। তোর কোনো ইচ্ছা আজ পর্যন্ত অপূর্ণ রেখেছি বল? নে, এটাও পূরণ করে দিলাম। দোকানের সবচেয়ে দামি সুতাটাই কিন্তু কিনে দিয়েছি তোকে। এইবার এট লিস্ট এই লেইম এক্সকিউজ দিসনা আর!”

কথা শেষ করে নিজের মনে সামনে এগোলো তাজধীর। হাতে সোনালী রঙা সুতোটা শক্ত করে চেপে ধরে বোতা মুখে দাঁড়িয়ে রইলো হাসিব। পরপর কিছু একটা মনে করে অবুঝের মত মাথা চুলকালো। ব্যাপার টা কি হলো? সেকি এই সুতোর কথা বলেছে নাকি? ওটা তো কথার কথা! এই বান্দার সঙ্গে কোনোদিন কিছুতেই পেরে উঠতে পারেনি। আর পারবেওনা। হাল ছাড়লো বেচারা হাসিব!


শহরের ভিড় ঠেলে ওদের গাড়িটা এগিয়ে গেল গন্তব্যের দিকে। সিলেটের বিখ্যাত পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট। রাত বাড়লেও জায়গাটার সামনে মানুষের ঢল যেন কমার নাম নেই। আলোয় ঝলমলে সাইনবোর্ড, নিচতলায় অপেক্ষমাণ মানুষের লম্বা লাইন, ভেতর থেকে ভেসে আসা গরুর মাংস আর ভুনার ঘ্রাণ— সব মিলিয়ে একেবারে উৎসবের আমেজ।

পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট মূলত তাদের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংস, কালাভুনা, নেহারি আর দেশি ভর্তার জন্য বিখ্যাত। বহু বছর ধরে স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের পর্যটকদের কাছেও এটি যেন এক আবেগের নাম। “সিলেট গেলে পাঁচ ভাইতে খেতেই হবে”— এমন অলিখিত নিয়ম প্রায় সবারই কমবেশি জানা।

নিচতলায় পা রাখতেই গরম ভাতের ধোঁয়া আর মসলার ঝাঁঝালো সুবাস নাকে এসে লাগল। টেবিল ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। কেউবা প্লেট হাতে করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খাচ্ছে। ওয়েটারদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ লেগেই আছে। এলোমেলো, অস্থির হয়ে চুটাছুটি করছে সকলে।
ভিড় দেখে হাসিব বলল,

“নিচে বসা মুশকিল হবে। চল দোতলায় দেখি।”

এরপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল তারা। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে পরিস্থিতি প্রায় একই। টেবিলগুলোতে গিজগিজ করছে মানুষে। মিতালী চারপাশ দেখে বিস্ময়ে চোখ বড় করে বলল,

“আমাদের গ্রামে ফ্রিতে বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানেও তো এত ভিড় হয় না ভাই!”

পাভেল হেসে ফেলল। প্রিয়ন্তীও অবাক চোখে চারপাশ দেখছে। হাসিব গর্বমিশ্রিত হাসি হেসে বলল,

“মিতালী এইটা কিন্তু সিলেটের আবেগ। এখানে শুক্রবার-শনিবার তো জায়গা পাওয়া মানেই লটারি জেতা! লোকজন দূর-দূরান্ত থেকে আসে শুধু এই গরুর মাংস খাওয়ার জন্য। আর ট্যুরিস্ট সিজনে তো কথাই নাই! সবাই ভাবে, পাঁচ ভাইতে না খাইলে ট্রিপটাই নাকি কমপ্লিট না!”

পাভেল পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে যোগ করল,

“মানে এখানে খাওয়া একটা স্ট্যাটাস ইস্যু?”

হাসিব কাঁধ ঝাঁকাল,

“স্ট্যাটাস না ভাই, স্বাদ! একবার খাইলে তারপর বুঝবেন।”

ঠিক তখনই এক ওয়েটার এসে জানাল একটু অপেক্ষা করলে টেবিল খালি হবে। সবাই এক কোণে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাজধীরের ধৈর্য ক্রমেই ফুরিয়ে এসেছে। চারপাশে গিজগিজ করছে মানুষজনে। টেবিল ফাঁকা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। একসময় সে গম্ভীর মুখে ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভিআইপি কোনো সিট নেই এখানে?”

ওয়েটার অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সঙ্গে সঙ্গে। জানাল,

“না স্যার, আজকে খুব রাশ। রিজার্ভেশনও ফুল।”

তাজধীর সংক্ষিপ্তভাবে “হুঁ” বলেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অস্বস্তিতে কপাল কুঁচকে আসছে তার। প্রথমত এরকম জনবহুল জায়গায় নিজেকে কিছুটা আনকমফোর্টবল ফিল করে সে। নেহাত পরিবার নিয়ে এসেছে বলে! নাহলে এখানে ভুলেও পা মারাতো না সে।

ওদের থেকে সামান্য দূরের এক টেবিলে বসে থাকা কয়েকজন পুলিশের দৃষ্টি আচমকাই পড়ল সেদিকে। ওদের মাঝখানে বসা ব্যক্তিটি কপাল টানটান করে তাকাল অমনি। কাঁধে স্টার লাগানো চকচকে ইউনিফর্ম। লোকটার চোখ স্থির হয়ে রইল কিছুক্ষনের জন্য তাজধীরের উপরেই।

পরের মুহূর্তেই চেয়ারের হাতল ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন সেই ভদ্রলোক। কপাল টানটান করে এগিয়ে এলো সম্মুখে। এ কাকে দেখছেন তিনি? বর্তমান নেভির লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিক আযান এখানে! সাধারণ অতিথির মতো দাঁড়িয়ে আছেন!অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

দ্রুত এগিয়ে এলেন তিনি।এসে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন ওদের সামনে। সম্মানসূচক ভঙ্গিতে বললেন,

“আরেহ! ছোট ভাই? তুমি এখানে? কখন এলে? আমাদের শহরে এলে অথচ একবারও জানালে না কেন?”

চারপাশের পুলিশ সদস্যরাও উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট জানাল সঙ্গে সঙ্গে। তাজধীরের মুখভঙ্গি তখন কঠোর, সংযত। সামান্য মাথা নেড়ে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল সে,

“ রিল্যাক্স, ভাই! ফ্যামিলি টাইম স্পেন্ড করতে এসেছি হুট্ করেই। তাই বলা হয়নি আরকি!”

এইসপি নুরুলুজ্জামান বললেন,

“তাই বলে এভাবে হুট্ করেই কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে আসাটা কিন্ত ঠিক হয়নি তোমার। আর দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো আমাদের সঙ্গে বসবে।”

তাজধীর প্রথমে না করতে চাইলেও অফিসারের আন্তরিক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হলো। তাদের টেবিলের একপাশ খালি করে দেওয়া হলো দ্রুত।
ওদিকে মিতালী, পাভেল, হাসিব সবাই একটু হতবাক। বিশেষ করে হাসিবের মুখের বারোটা বেজে আছে কোনো এক কারণে। এতক্ষন বন্ধুর আড়ালে চুপটি ঘেরে দাঁড়িয়েছিল ও। ওখানে গিয়ে বসে পড়ার আগে তাজধীর সংক্ষেপে বলল,

“ও মিতালী আমার ছোট বোন। আর ও পাভেল মিতালীর হাসব্যান্ড।”

কথা শেষ হওয়ার আগেই এইসপির দৃষ্টি গিয়ে থামল সরাসরি প্রিয়ন্তীর ওপর। মেয়েটি শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে তখনো। অফিসার হেসে বললেন,

“ওহ্‌! আর এটা আমাদের ভাবি নাকি ছোটভাই?”

‘ভাবি’ শব্দটা শুনতেই তরাক করে চোখ তুলে তাকালো প্রিয়ন্তী। মেয়েটার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল যেন আকস্মিক। অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলল।
তাজধীর সঙ্গে সঙ্গে সংযত গলায় বলল,

“ইউ আর মিস্টেকেন, অফিসার। শি ইজ নট মাই ওয়াইফ। পাভেলের বোন ও!”

এইসপি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন।বললেন,

“ওহ, আই অ্যাম সো সরি। ভুল হয়ে গেছে। তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন বোন? বসো, বসো!”

প্রিয়ন্তী মাথা নিচু রেখেই বসল মিতালীর পাশে। পাভেল বসেছে তাজধীরের একপাশে। এইস্পির মুখোমুখি হয়ে বসেছে তাজধীর। হাসিব তখনো উল্টো মুখী হয়ে দাঁড়িয়ে। ভদ্রলোক এবার ডাকলেন হাসিব কে। বললেন,

“তুমি এখানে কি করছো? আবার কোন মেয়ের পিছন ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছো এখানে? এইবার কিন্ত তোমার বাবা এসে রিকোয়েস্ট করলেও ছাড়বো না বলে দিচ্ছি!”

হাসিব বুঝলো খচ্চরটা ওকে চিনে ফেলেছে ঠিকই। শালার ইগলের চোখ বলতেই হবে। তাজধীর ভ্রু কুঁচকে চাইতেই ভদ্রলোক বললেন,

“ডোন্ট সে এটা তোমাদের সঙ্গে এসেছে?”

“আপনি চিনেন ওকে?”

“নিঃসন্দেহে! খুব ভালো করেই। দুইদিন পর পর একেকটা মামলা খেয়েই তো আমাদের এখানে এসে হাজির হয়। থানায় রাখা এর মামলার খাতা পুরালে দুইদিনের রান্না হয়ে যাবে!”

তাজধীর খুব কৌতূহলি হলো যেন এবার। হাসিব কে সে স্কুল লাইফ থেকেই চিনে। সেতো ওরকম ছেলে নয়। তাহলে অফিসারের কি কোনো ভুল হচ্ছে নাকি? বেশ সম্রান্ত পরিবারের ছেলে হাসিব। বাবা মায়ের আদরের দুলাল ও। পরিবারের লোকেরাও তো খুব নম্র ভদ্র! তার এসব ভাবনার মাঝেই ভদ্রলোক আবার বলতে লাগলেন,

“মেয়েদের ইস্পেশাল মামলা আছে এর নামে। তারউপর দুইদিন পরপর মাতাল হয়ে গাড়ি চালায়। লাইসেন্স তো বোধহয় বাড়ির লকারে তালা মেরে রেখে দিয়েছে একবারে । যার তার উপরে গাড়ি উঠিয়ে দেয়। আর এর বাপ্ এসে এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় এই হতচ্ছাড়া কে!”

“বড় ভাই, এই সময় এতকিছু বলাটা কি খুবই জরুরি? এখানে কিন্ত আমি আপনার ইস্পেশাল গেস্ট এর ইস্পেশাল ফ্রেন্ড!”

“এহ সত্যিই তোমার ফ্রেন্ড তাজধীর?”

ভ্রু গুটিয়ে প্রশ্নণাত্মক চোখে চেয়ে রইলেন ভদ্রলোক উত্তরের আশায়। তাজধীর বলল সোজাসাপ্টা,

“মনে তো হচ্ছে সেটাই!”

“এর থেকে দূরে থেকো। এর বাতাস ভুলেও শরীরে লাগিয়ো না। আমি ওয়ার্নিং করেছি বিধায় আমার ছোট বোনের পিছনে লাগতেও সময় লাগায়নি এই ছেলে!”

“আমার ভয়েই গেছে আপনার ওই ট্যারা বোনের পিছনে লাগতে!”

“মুখ সামলে কথা বলো বেয়াদপ!”

“হাসিব !”

তাজধীরের ধমকে চুপসে গেল বেচারা হাসিব। মনস্থির করল খাবারে। এইসপির নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যেই ওয়েটাররা ব্যস্ত হয়ে উঠল। একে একে বড় বড় থালা সাজিয়ে দেওয়া হলো টেবিলজুড়ে। গরম ভাতের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। পাশে ঘন ঝোলের গরুর কালাভুনা। যার ওপরভাগে ভাসছে ঝরঝরে তেল। সঙ্গে দেশি মুরগির রোস্ট, ডাল, লেবু কাঁচামরিচের থালা, আর পাঁচ ভাইয়ের বিখ্যাত ভর্তার আয়োজন— বেগুন, আলু, শুঁটকি, টমেটো— প্রতিটা আলাদা আলাদা বাটিতে।

চারপাশের পুলিশ সদস্যরা তাজধীর বসতেই আবারও উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল। তাজধীর শান্ত কণ্ঠে বলল,

“প্লিজ, সিট ডাউন। নরমাল থাকুন। আমরা এখানে অতিথি।”

খাবার পরিবেশন শুরু হলো। প্লেটে ভাত তুলে তাজধীর অল্প করে কালাভুনা নিল শুধু। খাওয়ার মাঝে মাঝেই এইসপির সঙ্গে কথা বলছে সামান্য হাত সামান্য নেড়ে নেড়ে। কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করছে হয়তো।ওদিকে খাবার খাওয়ার ফাঁকে প্রিয়ন্তী আড়চোখে তাকিয়ে দেখছিল লোকটাকে। জলপাই রঙের পোলো টি-শার্টে লোকটাকে আজ আলাদা লাগছে। হাতে পরা ঘড়িটার ধাতব ফ্রেম আলোয় চকচক করছে। মুখে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য। ভ্রু সামান্য কুঁচকে যাচ্ছে কথা বলার মাঝে মধ্যেই।

একজন মানুষ এতটা পারফেক্ট কিভাবে হতে পারে? কিভাবে? ওর মাথায় আসেনা। লোকটা কে এতটা সুদর্শন হতে হবে কেন? প্রিয়ন্তীর মনে প্রশ্ন জাগল।
এই মানুষটিই কি একটু আগে রুফটপে ওর ওপর বিরক্ত হয়েছিল? ও কি তখন সত্যিই বেশি রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছিল? কথাগুলো মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন হালকা অনুশোচনার
ঝড় বইলো। তারপর থেকেই তো লোকটা ওর সঙ্গে কথা বলা দূর তাকাচ্ছে না অব্দি। এই নির্লিপ্ততাই কি তবে অভিমান? নাকি কেবল পেশাদার দূরত্ব?

প্রিয়ন্তী চামচে অল্প ভাত তুলে নিলেও খেতে পারছিলো না ঠিকমতো। তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল তাজধীরের দিকে। লোকটা কি ওর ওপর সত্যিই রেগে আছে? ওকি সরি বলবে লোকটাকে একবার? নাকি তাতে আবার পার্ট দেখাবে বেশি?

**

খাওয়াদাওয়ার পালা শেষ হলো বেশ সময় নিয়ে। একে একে সবাই নিচে নামল। বাইরে শীতল বাতাস বইছে। রাস্তার লাইটের হলদে আলোয় চারপাশ ঝাপসা উজ্জ্বল। সামনে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের জিপগাড়ি। মিতালী, পাভেল, প্রিয়ন্তী আর হাসিব একটু দূরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ঠিক তখনই এইসপি নুরুলুজ্জামান গলা নামিয়ে ডাকলেন তাজধীর কে,

“তাজধীর, একটু সাইডে আসো তো। তোমার সঙ্গে দু’কথা ছিল।”

খানিক ইতস্তত গলায় ডাকলেন তিনি।তাজধীর সংযতভাবে মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল। জিপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল দু’জনে। নুরুলুজ্জামান গলা খাঁকারি দিলেন,

“আসলে বিষয়টা অফিসিয়াল নয়। পার্সোনালই বলা চলে। তাই একটু অস্বস্তি হচ্ছে বলতে। কিভাবে যে বলি..

তাজধীর শান্ত চোখে তাকাল।বলল,

“বলুন, ভাই।”

অফিসার একটু আকুপাকু করলেন প্রথমে। এরপর বললেন,

“তুমি তো আমার ছোট ভাইকে চেনো তাইনা। জানো ও কেমন ছেলে। আসলে ওর জন্য পাত্রী দেখছি অনেকদিন যাবৎ । বলতে পারো পাত্রী দেখতে দেখতে আমরা প্রায় টায়ার্ড হয়ে গেছি। পুরো সিলেট শহর তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছি। কিন্তু কোনো মেয়েই ওর পছন্দ হচ্ছে না।”

তিনি একটু থামলেন। তারপর নিচু স্বরে বললেন,

“বলছিলাম কী তোমার বোনের যে ননদ মেয়েটা, মেয়েটা কিন্ত খুব মিষ্টি দেখতে।”

এই কথাটুকু শুনেই তাজধীরের চোখ অনিচ্ছায় সরে গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়ন্তীর দিকে। মেয়েটা একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে। পাকিস্তানি থ্রি-পিসের ওড়নাটা দুহাতে চেপে ধরে আছে। চুলগুলো খোলা। বাতাসে উড়ছে আলতো করে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। এক মুহূর্তের জন্য তাজধীরের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল।নুরুলুজ্জামান আবার বললেন,

“ওই মেয়েটাকে আমি আমার ভাইয়ের জন্য পছন্দ করেছি। এখন তুমি কী বলো?”

তাজধীর দৃষ্টি সরালো। গলার ধরণ পাল্টালো ওর এইবার। বলল,

“ও তো বাচ্চা। বাচ্চা একটা মেয়ে।”

“ভার্সিটিতে পড়ে বললে তো?”

“তবুও। বয়স কম।”

“দেখো, মেয়েটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। যদি এখন না-ও হয়, আপাতত কাবিন করে রাখা যায়। পরে সময়মতো তুলে নিয়ে আসব।”

কথাটা শুনে তাজধীরের ভ্রু কুঁচকে গেল।বলল অনিচ্ছায়,

“ওর ভাই বোধহয় রাজি হবে না।”

“তুমি বললে হবে। তোমার কথা ওরা শুনবে। আমি সত্যি বলছি, তাজধীর। অনেকদিন ধরে খুঁজছি। এমন মেয়ে পাইনি। একটু দেখে-শুনে কথা বলো না? তোমার ওপর ভরসা আছে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। ভদ্রলোকের রিকোয়েস্ট ফেলাতে পারলেন না তাজধীর। আসস্থ করলেন,

“আচ্ছা দেখি কী করা যায়। এখনই কিছু বলছি না। কথা বলে জানাব।”

নুরুলুজ্জামানের মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।বলল উঠচ্ছসিত হয়ে,

“এইটুকুই চাইছিলাম। তুমি ভেবে দেখো।”

কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে তিনি জিপে উঠে বসলেন তিনি। করলেন গাড়ি স্টার্ট। লাল-নীল আলো একবার ঝলসে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল রাস্তার মোড়ে। জিপটা চোখের আড়াল হতেই হাসিব হাঁফ ছেড়ে দৌড়ে এলো বন্ধুর কাছে। তাজধীরের কাঁধে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

“কী বলে গেল শালায়? “

“মুখের ভাষা ঠিক কর আগে।”

হাসিব মুখ বাঁকাল।বলল,

“আরেহ বাদ দে। শালা একটা চিজ! আমার বাপের কাছ থেকে মাসে মাসে মোটা অংকের টাকা যায় ওর পকেটে। তারপরও আমাকে দেখলেই নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে!”

হাসিব ফোন বের করে ড্রাইভারকে কল দিয়ে বলল,

“গাড়িটা সামনে আনো। হ্যাঁ, আমরা নিচেই আছি।”

এমন সময় মিতালী মুখ কুঁচকে বলল,

“উফ্‌ বোধহয় বেশি খেয়ে ফেলছি। আমার কেমন বমি বমি লাগছে। অসস্তিও হচ্ছে। একটু পান খেলে হয়তো ভালো লাগবে।”

হাসিব সঙ্গে সঙ্গে জানাল,

“চলো চলো, ওদিকেই মসলা পানের দোকান আছে।আমারও খেতে ইচ্ছে করছে। পাঁচ ভাইয়ের পানের খ্যাতি শুনেছো না?”

পাভেল বলল,

“চলো তাহলে গিয়ে নিয়ে আসি।”

হাসিব প্রিয়ন্তীর দিকে তাকাল। জানতে চাইলো,

“তুমি আসবে?”

প্রিয়ন্তী মাথা নেড়ে না বুঝালো। হতাশ চিত্তে ঘুরে দাঁড়ালো হাসিব। চললো দোকানে। তিনজন রাস্তার ওপারে চলে গেল। রাস্তায় এখন শুধু প্রিয়ন্তী আর তাজধীর। বাতাস একটু জোরে বইছে তখন। প্রিয়ন্তীর ওড়না উড়ছে আলতো করে। দুহাতে চেপে ধরল জর্জেটের কাপড়টা। একটু মুখ উঁচিয়ে তাকালো সামনে। লোকটা ওর থেকে সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। এই একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল সে।
লোকটা ওর সঙ্গে কথা বলছে না। রুফটপের ঘটনার পর থেকে যেন ইচ্ছে করেই দূরত্ব রেখেছে। লোকটার এহেন নির্লিপ্ততা,ওকে অগ্রাহ্য করা কেন যেন অসহ্য লাগছে প্রিয়ন্তীর। সে কি সত্যিই রেগে আছে?
ওর কি সরি বলা উচিত? অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করছে বুকের ভেতর। কেন কষ্ট হচ্ছে—তার উত্তরও ঠিক জানা নেই ওর। প্রিয়ন্তী মনে মনে ঠিক করল লোকটার সঙ্গে কথা বলবে। সরি বলবে। ও ঠোঁট ভিজিয়ে একটু এগিয়ে দাঁড়াল। কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই যাবে অমনি তাজধীর এক পা এগিয়ে এল। দাঁড়ালো খুব কাছে। এরপর কাঁধ নামিয়ে
সামান্য ঝুঁকে হাঁস্কি টোনে বলে থামল,

“কি ব্যাপার মিস প্রিয়ন্তী? যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই দেখি আপনাকে সবার চোখে ধরে যাচ্ছে। সরাসরি ঘরে তুলতে চাচ্ছে। বুঝলাম না—সবাই ঘুরেফিরে কেন আমার বাচ্চার মা’টার দিকেই নজর দিচ্ছে? এই জুলুম সহ্য হয় বলুন? এ যে ঘোর অন্যায়!

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply