ডেসটেনি [ ৭ ]
সুহাসিনি_মিমি
সারারাতের দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি শরীরজুড়ে ভর করছে সবার। তাইতো যে যার রুমে ঢুকেই দরজা টেনে নিলো সোজা। এরপর ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে হালকা পাতলা খেয়ে শরীর ছেড়ে দিলো বিছানায়। যেহেতু ওরা প্রায় বেশ কয়েকদিন থাকার মনস্থির করেই এসেছে সেই সুবাধে আপাতত আজকের দিনটা বিশ্রাম করেই কাটাবে বলেই ঠিক করল। তাতে যে শরীর মন দুটোই ফুরফুরে হবে। আর ঘুরার জন্য এই দুটো থাকাই অত্যাবশ্যক!
দুপুরের দিকে মিতালীর ডাকেই আবার একত্র হলো সকলে।জড়ো হলো হোটেলের নিচতলার রেস্টুরেন্টটায়। ওরা এসে টেবিলে বসতেই ওয়েটার এসে মেন্যু এগিয়ে দিল। কে কী খাবে তা নিয়ে কিছুক্ষণের আলোচনাও চলল। শেষ পর্যন্ত পাভেলের পছন্দে কয়েকটা আইটেম ফাইনাল করা হলো। গরম ভাত, কাবাব, চিকেন রোস্ট, ভেজিটেবল, আর সঙ্গে সিলেটি বিশেষ কিছু পদ। মিতালী বাড়তি করে ডেজার্টও যোগ করল সঙ্গে। বলল এত দূর এসে মিষ্টি না হলে চলে নাকি!
খাবার আসতে সময় লাগল অনেকটা। সেই ফাঁকে নিজেদের মধ্যই কিছু কথাবার্তা জমে উঠল ওদের। হাসিবও এসেছে সাথে। বসেছে তাজধীরের পাশ ঘেঁষে। তবে দৃষ্টি তার সরাসরি বন্ধুর বোনের পাশে থাকা রমণীতে আটকে। প্রিয়ন্তী বান্ধবীর সঙ্গে মেসেজ করছিলো তখন। দৃষ্টি নামিয়ে ধ্যান জ্ঞান ডুবে মেসেজ করছে বান্ধবীকে। চেয়ারে হেলান দিয়ে দুষ্টু চোখে সেটায় দেখেছিলো হাসিব। তাজধীর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে থাকলেও বেশ খেয়াল করল সেসব। পা দিয়ে বন্ধুর পায়ের উপর চেপে ধরাতেই ব্যথায় ধ্যান ছুটে হাসিবের। প্রশ্নবোধক চোখে তাকায় বন্ধুর পানে। ভ্রু কুঁচকে ইশারায় জানতে চায় কি হয়েছে? অমন সময় সবার উদ্দেশ্য মিতালীই প্রথমে বলে উঠে,
“জায়গাটা কিন্ত আমার সত্যিই ভালো লেগেছে ভাইয়া। এখানের প্রত্যেকটা স্পট কিন্ত তোমরা আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখাবে বলে দিলাম। একটাও আমি লিস্ট থেকে বাদ দিতে চাইনা!’
মিতালীর কথা শুনে প্রথমে হেসে উঠল পাভেল। গ্লাসের পানি ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“তোমার লিস্ট শুনে তো মনে হচ্ছে আমরা গাইড, আর তুমি ট্যুরিস্ট!”
মিতালী ঠোঁট গোল করে প্রতিবাদ করল তখন,
“অবশ্যই! এত দূর এসে কিছু মিস করা যাবে না। এই ভাইয়া, আগে থেকেই বলে দিলাম কিন্তু হু!”
তাজধীর নীরব হয়ে বসে তখনো। বলল সহজ গলায়,
“যতটা পারি দেখাবো। তবে একটা কথা, ঘুরতে হলে সকালের ঘুম একটু কমাতে হবে সবাইকে। এখানে টুরিস্ট স্পট অনেক। প্রত্যেকটা তো আর দেখা যাবেনা। তাহলে মাস লেগে যাবে। পরিমিত সময়ে যতটুকু পসিবল ঘুরতে পারবি!”
এরপর থেমে আবারও বলে উঠল আকস্মিক,
“কি মিস প্রিয়ন্তী? পারবেন তো উঠতে?”
ঘুমের কথাটা কানে যেতেই চোখ তুলে তাকালো প্রিয়ন্তী। লোকটা যে কথাটা একান্তভাবেই ওকে উদ্দেশ্য করে বলেছে বেশ বুঝতে পারল। এই লোক খোঁচা মারা ছাড়া আর পারেটাকি? প্রিয়ন্তী তাকাতেই চোখা চোখি হলো ওদের দুজনের। তাজধীর তো ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। মেয়েটার ফ্যাকাসে মুখটা দেখে মজাও নিলো বেশ। ওদিকে হাসিব তখন বলল,
“তা হলে তো শুরুতেই সমস্যা ভাই! আজ সকালে ষোলো বার এলার্ম দেয়ার পর উঠতে পেরেছি।”
হাসির রেশ টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। প্রিয়ন্তী ফোন থেকে দৃষ্টি তুলে হালকা হেসে আবার নিচে নামাল চোখ। কিন্তু সেই ক্ষণিক হাসিটুকুই যেন কারও চোখ এড়াতে সক্ষম। তাজধীর এক পলক তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। হাসিব এবার একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস স্বরে বলল,
“ভাবছি কালই সবাইকে নিয়ে জাফলং যাওয়া যায়। জায়গাটা না দেখলে সিলেট আসাটাই কিন্ত বৃথা।”
পাভেল সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল,
“জাফলং, বিছানাকান্দি… তারপর লালাখাল। একদিনে কুলাবে?”
“না কুলালে দুই দিন,আমার কোনো তাড়া নেই।”
মিতালী দৃঢ় গলায় বলল। ওয়েটার একে একে খাবার সাজিয়ে দিতে লাগল টেবিলে। গরম ভাতের ধোঁয়া, মসলার গন্ধ, কাবাবের সুবাস— মুহূর্তেই কথাবার্তার জায়গা দখল করে নিল খাবারের লোভনীয় উপস্থিতি।
প্রিয়ন্তী চুপচাপ প্লেটে খাবার তুলে নিচ্ছিল। হঠাৎ পাশ থেকে হাসিব মজা করে বলল,
“আপনি এত চুপ কেন? না কি সিলেটের হাওয়া ভালো লাগেনি?”
প্রিয়ন্তী ভ্রু তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি এনে প্রত্তুত্তর করল,
“হাওয়া ভালো বলেই তো চুপ করে উপভোগ করছি। কথা বললে সব সৌন্দর্য মিস হয়ে যাবে।”
হাসিব নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
“ওহ্, তার মানে আমরা বেশি কথা বলে জায়গাটার সৌন্দর্য নষ্ট করছি!”
তাজধীর বলল,
“এক্সপার্ট হয়ে গেছিস দেখছি। বলার আগেই বুঝে গেছিস বাহ্!”
বলেই তাজধীর গম্ভীর স্বরে বলল আবার,
“খাবার ঠান্ডা হচ্ছে, আগে খাওয়া স্টার্ট করা যাক!”
ঐদিন আর কেউ বাইরে বের হলো না। দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি ভর করে সবাই অলসতায় পার করল দিনটা। বিকেলের দিকে শুধু সামান্য সময়ের জন্য কাছাকাছি গিয়ে লেইক পার ঘুরে ফিরে যে যার মতো আবার হোটেলে ফিরে এল। এরপর সিলেটের আকাশে নেমে এলো সন্ধ্যা। মাগরিবের আজান ভেসে এলো তখন।
রুমে ফিরে প্রিয়ন্তী ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ফেসবুকে সময় কাটাচ্ছিল চুপচাপ। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই জানতে পারল এই হোটেলের রুফটপটা নাকি অসাধারণ সুন্দর। কথাটা শুনেই কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না ও। একা একাই বেরিয়ে এল রুম ছেড়ে। উদ্দেশ্য আপাতত রুফটপ টা একটু ঘুরে দেখার।
লিফ্ট ধরে সোজা উঠে এলো উপরে। উপরের ফ্লোরে পা রাখতেই এযাত্রায় একটু অবাকই হলো বটে। থমকানো দৃষ্টি গিয়ে পড়ল পুরো রুফটপ জুড়ে। মাথার উপরে বিস্তৃত খোলা আকাশ। চারোপাশে শহরের অসংখ্য টিমটিমে আলোয় ভর্তি দালানকোঠা। আর সেই আলো-আঁধারির মধ্যে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে চারদিকে তাকিয়ে রইলো প্রিয়ন্তী।
রুফটপের একপাশে ছোট্ট ওয়াটারফল আর অগভীর পানির ধার সাজানো। সেই জায়গাটাই টানল ওকে। সমুদ্র, নদী, ঝর্নায় ওর জড়তা কাজ করলেও এই পরিষ্কার স্বচ্ছ নীল তকতকে পানি উপেক্ষা করার সাধ্যি ওর নেই। তাইতো সবকিছুর উর্ধে গিয়ে সোজা এগিয়ে গিয়ে পা দুটো পানিতে ডুবিয়ে বসে পড়ল ও। পায়ে ঠান্ডা পানির ছোয়া পেতেই মস্তিষ্কে এক ধরণের শীতল আমেজ বয়ে গেল যেন। বেনিশ হয়ে গেল সমস্ত ক্লান্তি। এরপর হাতে থাকা ফোনটা দিয়ে চারপাশের কিছু ছবি তুলল। ফেইসবুকে খুব বেশি একটা ছবি না ছাড়লেও ঘন ঘন স্টোরি ছাড়ার বদ অভ্যাসটা আছে ওর। সেই অভ্যাসের বশবর্তী হয়েই ভিজিয়ে রাখা পা দুটোরও কয়েকটা ছবি তুলল পরপর। অমনি একদম আকস্মিক পাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত পুরুষালি এক কণ্ঠ,
“কি মিস প্রিয়ন্তী? এভাবে একা একা বসে কার বিরহে নীরবতা পালন করছেন?”
অপ্রস্তুত মুহূর্তে কেউ হঠাৎ পেছন থেকে কথা বললে মানুষ যেভাবে ঘাবড়ে যায় বা আঁতকে উঠে প্রিয়ন্তীও ঠিক সেইভাবেই চমকে উঠল। একে ইংরেজিতে স্টার্টল বা স্টার্টলড রিঅ্যাকশন বলে। হুট্হাট কেউ পিছন থেকে এসে কথা বললে এভাবেই ভড়কে যাওয়ার স্বভাব ওর ছোট বেলার। এই সময়ও অন্যমনস্ক থাকার দরুন পাশে যে কেউ এসে বসেছে, টেরই পায়নি ও। ওদিকে আকস্মিক চমকে ওঠার ধাক্কায় হাতে থাকা ফোনটা ফসকে সোজা গিয়ে পড়ল স্বচ্ছ পানিতে।
“আহ!”
গলা থেকে আটকে আসা শব্দ বেরোল কষ্টভরা স্বরে।। প্রিয়ন্তী স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল কীয়তক্ষণ। নীলচে স্বচ্ছ পানির ভেতর ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে ওর ফোনটা। নিজেকে ধাতস্ত করতেই তাড়াহুড়ো করে ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু ততক্ষণে ফোনটার ঠাই হয়েছে পানির তলায়। চোখের সামনে ডুবে থাকা ফোনটার দিকে তাকিয়ে ওর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল মুহূর্তেই।
এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করার পর পাভেল নিজের হাতে কিনে দিয়েছিল এই ফোনটা। এটাই ওর জীবনে ব্যবহুত প্রথম ফোন ছিল। কত যত্ন করে ব্যবহার করেছে এতদিন। একটা আঁচড়ও লাগতে দেয়নি। নিজের শরীরের চাইতেও বেশি যত্নে রেখেছিলো ও সেটা। আর আজ এক মুহূর্তের অসাবধানতায় সব এভাবে পানিতে ডুবে গেল?
তাজধীরও পরিস্থিতি বুঝে একটু থমকে গিয়েছিল বটে । বুঝতে পারেনি ঘটনা এতদূর অব্দি চলে যাবে। ও দ্রুত ঝুঁকে ফোনটা তুলতে হাত বাড়াল, কিন্তু তার আগেই প্রিয়ন্তী সরে গেল। রুদ্ধস্বাসে বলল,
“খুশি তো? খুব মজা লাগছে নিশ্চই এবার?”
বলতে বলতে নাক টানল মেয়েটা।
“সবসময় মজা করতে হবে? মানুষটা চুপচাপ বসে থাকলেই এসে খোঁচা দিতে হবে ? এবার হ্যাপি তো?”
বলেই ও চোখ মুছে নিল হাতের উল্টো পিঠে। ওদিকে তাজধীর হতভম্ব প্রায়। বুঝতে পারছে মেয়েটার মনগতির নাজেহাল অবস্থা। তবে সেতো আর ইচ্ছাকৃত ভাবে করেনি কিছু। এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে। এরই মাঝে আবারও বলে উঠল,
“জানেন এই ফোনটা কী ছিল আমার কাছে? এটা আমার ভাইয়ের দেওয়া আমার প্রথম ফোন ছিল।একটা আঁচড়ও লাগতে দেইনি এত..
পুরো কথা শেষ করতে পারল না আর। গলাটা কেমন আটকে আসছে ওর। তাজধীর শান্ত গলায় বলল,
“আমি ইচ্ছা করে..
“না, কিছু বলবেন না প্লিজ! সবসময় আপনাকে সহ্য করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা না করলেই কি হয়না আপনার?”
বিস্ফোরিত হয়ে চেচাচ্ছে প্রিয়ন্তী। চোখে জল চিকচিক করছে মেয়েটার। তাজধীর ও খানিকটা বিস্মিত। ঠিক সেই সময়েই রুফটপের দিকে হাঁটতে হাঁটতে এসে হাজির হলো হাসিব। দূর থেকেই সে পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করল। মেয়েটা এভাবে বন্ধুর ওপর রেগে গেছে কেন— প্রথমে বুঝতে পারেনি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর চোখে পড়ল পানির নিচে ঝিলমিল করতে থাকা ফোনটা। মুহূর্তেই পুরো ব্যাপারটা তার মাথায় পরিষ্কার হয়ে গেল।হাসিব এগিয়ে এসে পরিস্থিতি হালকা করার ভঙ্গিতে বলল,
” কী রে ভাই! মেয়েটার ফোনটা পানিতে ফেলে দিয়েছিস নাকি? হায় আল্লাহ, কি করেছিস এটা?”
প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“দেখছো তো, আমাদের কমান্ডার সাহেবের কীর্তি!”
তাজধীর চোখ সরু করে তাকাল বন্ধুর দিকে। সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা। হাসিব একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও দ্রুত সুর পাল্টাল,
“আচ্ছা আচ্ছা, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আগে ফোনটা তো তুলতে হবে!”
বলে সাথে সাথে হাত তুলে স্টাফদের ডাক দিল হাসিব। যেহেতু হোটেলটা ওরই দায়িত্বে, নির্দেশ পৌঁছাতে সময় লাগল না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একজন কর্মচারী ছোট্ট জাল আর লম্বা রড নিয়ে ছুটে এল সেখানে। পানির ধার ঘেঁষে ঝুঁকে খুব সাবধানে রড নামাল সে। তারপর এক টানে ফোনটা তুলে আনল ছেলেটি। পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে ফোনের গা বেয়ে। হাসিব সেটা হাতে নিয়ে আলতো করে ঝেড়ে প্রিয়ন্তীর দিকে বাড়িয়ে দিল।বলল,
“নাও, ইশ ফোনটা শেষ! আর ঠিক kora যাবেনা বোধহয়!”
প্রিয়ন্তী ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল সেখান থেকে। প্রিয়ন্তী যেতেই হাসিব বসে থাকা বন্ধুর দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“ফোনটা ফেললি কিভাবে রে? কিছু মনে করিস না ভাই, আসলে মেয়েলি বিষয়ে আমি খুবই সেনসিটিভ জানিসতো, তাই অল্পতেই হাইপার হয়ে যাই।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই তাজধীর বিরক্ত ভঙ্গিতে এক পা এগিয়ে দিতেই অপ্রস্তুত হাসিবের পায়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক নিমেষে সে সোজা গিয়ে পড়ল পানিতে। কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল চারপাশ। তাজধীরের চোখ দুটো রাগে লালচে হয়ে উঠেছে তখন। চোয়ালও শক্ত। কিছু না বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল ও। হয়তো প্রথমবার— কোনো মেয়ের মুখ থেকে এভাবে কথা শুনেছে বলে?
সেই অস্বস্তি নিয়েই রুফটপ ছেড়ে চলে গেল তাজধীর। পানির ভেতর দাঁড়িয়ে হাসিব দাঁত চেপে উঠে এল। ঠিক তখনই ফর্মাল শুট বুটে নিজেদের ওউনারকে এভাবে পানিতে ভিজতে দেখে সৌজন্যেতায় এক ওয়েটার দৌড়ে কাছে এসে বলল,
“আরেহ স্যার! আপনি পড়লেন কিভাবে? হাত দিন, উঠিয়ে দিচ্ছি!”
হাসিব ভিজে চুল ঝেড়ে দাঁত বের করে হাসল। হাত বাড়িয়ে বলল,
“আসো, দেখাই কিভাবে পড়েছি?”
ছেলেটি সরল মনে হাত বাড়াতেই হাসিব হঠাৎ টান দিল।
“এইভাবে!”
ওয়েটারটাও ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ল গিয়ে। হাসিব হো হো করে হেসে উঠে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ভিজে কাপড় থেকে পানি ঝরছে। আর সে মাথা নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করল,
“সালা বন্ধুদের ওপর ভরসা করা সত্যিই বিপজ্জনক!”
রুফটপ থেকে ফিরে এসে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়ন্তী। হাতে ভেজা ফোনটা শক্ত করে ধরে বিছানার ধারে এসে বসল ও। ফোনটা অন করার চেষ্টা করল কয়েকবার পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে। তবে হেতে লাভ হলোনা কোনো।
এসএসসিতে ভালো ফল করেছিল বলে কত খুশি হয়ে কিনে দিয়েছিল ওর ভাই ফোনটা। এতদিন কত যত্নে ব্যবহার করেছে প্রিয়ন্তী এটা । নিজের জিনিসে সে এমনিতেই যত্নশীল, আর প্রিয় মানুষের দেওয়া হলে তো আরও বেশি। একটা দাগও লাগতে দেয়নি এত বছরেও। চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল ওর ।
রুমের ভেতর নীরবতা ঘনীভূত হতে লাগল। বাইরে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামল। বিছানায় বসে কখনও ফোনটা হাতে নিচ্ছে, আবার নামিয়ে রাখছে প্রিয়ন্তী। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে একটু পরেই হয়তো অন হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হতে হলো বিনিময়ে।
রাত তখন ৯ টার কাছাকাছি। ওই সময় দরজায় টোকা পড়ল ওর। প্রিয়ন্তী চোখ মুছে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো মিতালীকে।
“চলো, সবাই নিচে চলে গেছে। ডিনার করবে না?”
প্রিয়ন্তী মাথা নাড়ল। কণ্ঠটা ক্লান্ত শোনাল বড্ড। বলল,
“আমি যাব না ভাবি। খিদে নেই। তোমরা যাও।”
মিতালী একবার তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল। তারপর নরম গলায় বলল,
“এমা কেন যাবেনা? আর তোমার ফোন বন্ধ কেন? তোমার ভাই কতবার ফোন ফিয়েছিল তোমায়?”
“কিছুনা ভাবি। তুমি ভাইয়াকে বলো আমার খুদা নেই।”
“তোমার ভাই মানবে ভাবছো? এই তোমার কি হয়েছে বলোতো? মন খারাপ?”
“তেমন কিছু না ভাবি!”
মিতালী আর বেশি ঘাটাল না। চলে গেল। গিয়ে পাঠালো পাভেল কে। পাভেলের ডাক শুনেই প্রিয়ন্তী দ্রুত এসে দরজা খুলল। বোনের ফ্যাকাসে মুখটা পরখ করে পাভেল বলল সোজাসাপ্টা,
“কি হয়েছে?” নরম গলায় জিজ্ঞেস করল পাভেল।
প্রিয়ন্তী দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিলো। পলক ঝাপ্টে বলল,
“কই কিছু নাতো ভাইয়া। এমনি।”
“আমার কাছে কিছু লুকানোর চেষ্টা করিস না, প্রিয়।ভাইকে বল, কি হয়েছে?”
কথাটা শুনতেই বাঁধ ভাঙল প্রিয়ন্তীর ধৈর্য্যর। গিয়ে বসল বিছানার ধারে। অনেকটা সময় চুপ অগত্যা বলে উঠল,
“আমার ফোনটা পানিতে পড়ে গেছে ভাইয়া। অন হচ্ছে না।”
এরপর পুরো ঘটনাটার বলল। তবে তাজধীরের কথা এড়িয়ে গেল। শুধু বলল— হাত ফসকে পানিতে পড়ে গেছে। পাভেল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শুনল সবটা।তারপর এক পলক বোনের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“আরে বোকা মেয়ে, এই জন্য এত কাঁদতে হয় নাকি? ফোন নষ্ট হলে আবার কিনে দেবো।”
প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করেই বলল,
“তুমি তো জানো এটা তোমার দেওয়া প্রথম গিফট ছিল। আমার কাছে খুব স্পেশাল ছিল।”
পাভেল মুখটা নরম করে বোনের মাথায় আলতো করে হাত রাখতে রাখতে বলল,
“হ্যাঁ, জানি। আর এবারও আমিই কিনে দেবো। সেটাও স্পেশাল হবে। আমার বোনের কাছে আমার দেওয়া প্রতিটা জিনিসই স্পেশাল হবে— এইটাই তো চাই।”
কথাটা শুনে প্রিয়ন্তীর চোখ আবার ভিজে উঠল।
পাভেল উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“এখন খেতে আয় কেমন? আমরা নিচে অপেক্ষা করছি!”
নিচ থেকে সবাই মিলে উঠল হাসিবের গাড়িতে। সামনে হাসিব ড্রাইভ করছে, পাশে বসেছে তাজধীর। পেছনের সিটে মিতালী, প্রিয়ন্তী, আর পাভেল। গাড়ির ভেতর হালকা গল্প চললেও আজ প্রিয়ন্তী একদম চুপচাপ। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে নিস্প্রান হয়ে। হাসিব রিয়ার ভিউ মিররে একবার তাকিয়ে বুঝতে পারল, মেয়েটার মন এখনও ভারী। ঠিক তখনই পাভেল সামনে ঝুঁকে বলল,
“ভাই, একটা ভালো মোবাইল শোরুমের সামনে গাড়িটা একটু থামাবেন?”
হাসিব একটু অবাক হলেও কিছু বলল না। কয়েক মিনিট পর শহরের এক বড় মোবাইল শোরুমের সামনে গাড়ি পার্ক করল। নিয়ন আলোয় ঝলমল করছে দোকানটা। পাভেল নেমে মিতালীকে ইশারা করল। তারপর প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“চল।”
প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,
“না ভাইয়া,থাক লাগবে না।”
“চল বলেছি।”
ভেতরে ঢুকতেই প্রিয়ন্তী বুঝে গেল আসল ব্যাপারটা। সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
“না ভাইয়া… লাগবে না। পরে দেখা যাবে।”
পাভেল হালকা হেসে বলল,
“পরে না, এখনই।”
পাশ থেকে হাসিব মজা করে বলল,
“আরে ভাই, এত তাড়াহুড়ো কেন? ডিনার শেষেও তো আসা যেত!”
পাভেল নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল,
“আমার বোনটা একটু আলাদা। ওর পছন্দের জিনিস, অতি যত্নের কিছুই নষ্ট হলে ওর গলা দিয়ে খাবার নামে না।”
কথাটা শুনে প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করে ফেলল। শোরুমের স্টাফ একের পর এক ফোন দেখাতে লাগল। প্রিয়ন্তী প্রথমে না চাইতেও ধীরে ধীরে কয়েকটা মডেল হাতে নিল। আলোয় ঝলমল করা ডিসপ্লে, ক্যামেরা, রঙ— সব দেখে শেষ পর্যন্ত তার চোখ গিয়ে থামল একটাতে।
স্টাফ বলল,
“এটা Samsung Galaxy S24, ম্যাডাম। লেটেস্ট সিরিজের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। ক্যামেরা অসাধারণ, আর ডিজাইনটা অনেক স্লিম। মেয়েদের হাতে খুব এলিগেন্ট লাগে।”
প্রিয়ন্তী ফোনটা হাতে নিয়ে চুপ করে রইল। রঙটা নরম। ধরতেও হালকা। নিতে আগ্রহী হলেও দাম শুনে সরে যেতে চাইলো। প্রায় সত্তর হাজার টাকার কাছাকাছি। বাব্বাহ এত দাম!
“না ভাইয়া, এটা অনেক দামি। লাগবে না।”
“তুই শুধু বল, ভালো লেগেছে?”
প্রিয়ন্তী খুব আস্তে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। কিন্তু…
“তাহলে এটিই নেব। ফাইনাল!”
বিল কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গিয়ে পাভেল ওয়ালেট বের করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কার্ড এগিয়ে ধরল কেউ। শান্ত গলায় বলল,
“এটা দিয়ে দিন।”
পাভেল অবাক হয়ে তাকাল। তাজধীর কে কার্ড বাড়িয়ে রাখতে দেখে কপাল টানটান করে বলল,
“আরে ভাই, আপনি কেন দিবেন?”
বিনিময়ে শুনতে পেলো সহজ সরল গলায় স্বীকারোক্তি,
“ফোনটা আমার জন্যই পড়েছে পাভেল। আমি না গেলে হয়তো এমনটা হতো না। তাই এটা আমাকেই দিতে দাও!”
চলবে…..
(৫ হাজার রিয়েক্ট আর ৫০০+ কমেন্ট না উঠলে পরবর্তী পর্ব আসবে না )
ইবুকের সঙ্গে এটার কোনো মিল নেই। ইবুক পুরোটাই আদর আদর রোমান্টিক টাইপস। যারা পড়েছেন তারা হয়তো জানেন। আর যারা পড়েননি দ্রুত আমিষ কমান্ডার সাহেবকে পড়ে ফেলুন 🫶
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনী মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি গল্পের লিংক
-
ডেসটেনি পর্ব ৬
-
ডেসটেনি পর্ব ১
-
ডেসটিনি পর্ব ৫
-
ডেস্টিনি পর্ব ৪
-
ডেসটেনি পর্ব ৩
-
ডেসটেনি পর্ব ২