ডেসটেনি [ ৩ ]
সুহাসিনি_মিমি
প্রিয়ন্তী লোকটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়েই দেখছিল। এই ডিফেন্সদের লোকেরা হয়ই এতটা সুদর্শন। বর্তমান ইয়ং জেনারেশনগুলো তো এই ডিফেন্সদের প্রতি অবসেসড! তাজধীর ঠিক তেমনই। লোকটার কণ্ঠস্বর, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, কথা বলার স্টাইল সবকিছুই কেমন ঘোরলাগা। প্রিয়ন্তীর এই ভাবনার ইতি ঘটে প্রকন্ড জোড়ে বজ্রপাতের শব্দে। আসে পাশেই কোথাও হয়েছে বোধহয়। বজ্রপাতের বিকট শব্দেই
চমকে উঠে প্রিয়ন্তী। কাঁধটা অনিচ্ছায় কুঁকড়ে যায় ওর। হাতের আঙুলগুলো ওড়নার কোণে শক্ত করে চেপে ধরে ।তাজধীর সেটা দেখল। কপালের মাঝখানের ভ্রুদুটো হালকা প্রসারিত করেই খেয়াল করল সবটা। মেয়েটা ভিজে গেছে অনেকটাই। ঠান্ডায় কাঁপছে রীতিমতো। সবকিছু লক্ষ্য করেই দরজার ফাঁক থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি দেখি খুব আনরোমান্টিক মিস,প্রিয়ন্তী?কোথায় মেয়েরা বজ্রপাতের শব্দে ভয় পেয়ে দৌড়িয়ে এসে সামনের জনকে জড়িয়ে ধরে,আকস্মিক বুকে হামলে পরে। কিন্ত আপনি দেখছি ঠিক তার উল্টোটাই? আপনার আবার গোপন কোনো সমস্যা নেইতো?”
প্রিয়ন্তী কথাগুলো শুনলেও বিশেষ আমলে নিলোনা। তাজধীর সরে দাঁড়াতেই ওর চোখ গিয়ে আটকে গেল ঘরের ভেতরের দৃশ্যে। পুরো দেয়ালজুড়ে সারি সারি একুরিয়াম। স্বচ্ছ কাচের ভেতর যেন বন্দি এক ক্ষুদ্র সমুদ্র। নীল, রুপালি, কমলা আর বেগুনি আলোছায়ায় নানান প্রজাতির মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে ওখানে। এর মধ্যে এমন বহু মাছ আছে যেগুলো প্রিয়ন্তী বাস্তবে তো দূরের কথা, ছবিতেও কখনো দেখেনি। কোনোটা লম্বাটে শরীর, কোনোটা ছোট কিন্তু আগুনের মতো উজ্জ্বল,কোনোটা আবার ডানার মতো পাখনা ছড়িয়ে জলের ভেতর নাচছে।
প্রিয়ন্তী আর অনুমতির তোয়াক্কা করল না। সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ল। দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল একুরিয়ামগুলোর সামনে। এতসব অদ্ভুত, বিরল প্রজাতির মাছ প্রিয়ন্তী আগে যে দেখেনি কোনোদিন।
সব মানুষদেরই কোনো না কোনো শখ, ইচ্ছে, আকাঙ্খা থাকে। প্রিয়ন্তীর ও আছে। সেটা হলো ফিশ কালেক্ট করা। ওর বাসা ভর্তি চার পাঁচটা একুরিয়াম। একুরিয়াম ভর্তি ছোট ছোট মাছ। যেগুলো বেশিরভাগ ওর ভাই-ই এনে দেয় ওকে। তবে কিছু কিছু ও নিজেও সংগ্রহ করেছে। কিন্ত এমন মাছ তো কখনো দেখেনি আগে। একেকটা একুরিয়ামে একেক প্রজাতির মাছ। আবার সেই প্রজাতি গুলোর মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন রঙের আছে। সবশেষে প্রিয়ন্তী দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল সবার শেষ প্রান্তে রাখা একুরিয়ামটার সামনে। ওখানে শুধু একটাই মাছ রাখা। যেটা সবার থেকে বেশি আকর্ষণীয় দেখতে। মাছটার লেজটাই যেন ওর আসল সৌন্দর্য—পরীর ডানার মতো বিস্তৃত, পুরো একুরিয়াম ভরে আছে। রেশমের মতো নরম পাখনা পানির ভেতর ধীরে ধীরে দুলছে। ইশ! আল্লাহর সৃষ্টি কতটা অমায়িক! প্রিয়ন্তী আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল ওর। একটু ঝুঁকে বাইরে থেকেই যেন মাছটা ধরতে চাইছে ও। ওভাবেই বলে উঠল,
“এত সুন্দর ফিশ! আমি তো কোনোদিন এমন মাছ দেখিনি।আপনিও মাছ পছন্দ করেন বুঝি? আচ্ছা এটার নাম কি?”
এতক্ষন মুগ্ধনয়নেই দেখছিলো তাজধীর সবটা। মাছ কালেক্ট করা তার ছোট খাটো একটা শখই বলা চলে।
সমুদ্রের মানুষ বলেই হয়তো,তার এমন অদ্ভুত অদ্ভুত শখ আছে।দূরদূরান্তের সমুদ্র থেকে সে নিয়ে এসেছে নানা দুর্লভ প্রজাতি। তবে প্রিয়ন্তী কেউ একইভাবে এসবের প্রতি এতটা কৌতূহল দেখে বিস্মিতই হলো বটে। জবাব দিলো সোজাসাপ্টা,
“ইটস ব্লু হাফমুন”
“ওয়াও এর নামটাও খুব সুন্দর। আচ্ছা আপনি এসব কোন দোকান থেকে এনেছেন? আমাকে বলবেন প্লিজ? আমি এরকম কয়েকটা নিতে চাই।”
তাজধীর ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ঠোঁট কামড়ে হাসলও অল্প। এরপর বলল,
“জি, সমুদ্রের তোলোদেশে থেকে এদেরকে তুলে এনেছি। বলতে পারেন ওয়ান কাইন্ড অফ কিডন্যাপ আরকি।”
“এমা আপনি সাঁতার জানেন? সমুদ্রের গভীরে গিয়েছিলেন সত্যিই? যদি ডুবে যেতেন?”
হঠাৎ উৎকণ্ঠায় মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রশ্নে নিজেই তাজ্জববনে গেল ও। খেয়াল আসতে নিজের বেয়াক্কল মার্কা প্রশ্নে নিজেই লজ্জা পেল। ইশ! কি বলদের মত প্রশ্নঃ করে ফেলেছে ও এটা? বেয়াক্কল প্রিয়ন্তী, তুই আস্তই একটা বেয়াক্কল! হাদারাম মেয়ে, যে মানুষটা বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই সমুদ্রের সাথে যুদ্ধ করে, তাকে কিনা জিজ্ঞেস করছে সাঁতার জানে কি না!
লোকটাও বোধহয় মজা নিলো ওর কথায়। তাইতো ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসি চেপে ধরেই উত্তর দিল,
“জি মেম, এই অধম একটু আকটু সাঁতার জানে আরকি! যতটুকু জানি,পানিতে ডুবে ম রার চান্স নেই আপাতত!”
প্রিয়ন্তী লজ্জায়, আরষ্ঠতায় জমে গেল। এতক্ষনে পুরো ঘরটা খেয়াল করল ও। সেখানে যত্রতত্র সাজানো নেভি ইউনিফর্ম, ক্যাপ, সারারকম সরঞ্জাম—
সবকিছু নিখুঁতভাবে, পরিপাটি অবস্থায় রাখা। শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেছে ভিজা কাপড়ে। কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে খানিকটা কাঁপতে লাগল ও। তাজধীর সেটা লক্ষ্য করে চুপচাপ কফি মেকারের কাছে গেল। মুহূর্তে দু’কাপ কফি বানিয়ে এনে এক কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নিন আপনার বাচ্চার বাবার হাতের এককাফ স্পেশাল কফি খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে, মিস প্রিয়ন্তী?”
আরেক কাপ হাতে নিয়ে নিজে দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। এযাত্রায় আবারো লজ্জা পেল মেয়েটা।
এইযা, ও আসলে এখানে কেন এসেছে সেটাই তো বলা হলোনা। কি করতে এসে কীভাবে নিজেকে ফাঁসিয়ে ফেলল এইভাবে? তবে এই মুহূর্তে শীত ও লাগছে ভীষণ। তাই অনিচ্ছায় কফিতে একমুখ চুমুক দিয়ে বলল,
“একটা কথা বলব?”
“জি বলুন!”
“আপনি প্লিজ প্রথমে আমাকে আপনি করে বলা বন্ধ করুন। আমি আপনার খুব ছোটই হব।”
তাজধীর হালকা হেসে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলল,
“কেন? কোথাও কি লেখা আছে যে ছোটদেরকে আপনি করে বলা যাবে না?”
“তানা, কিন্তু আপনার মুখ থেকে ‘আপনি’ শুনতে আমার কেমন যেন একটা লাগে।”
“তা কেমন লাগে, মিস প্রিয়ন্তী? সামথিং স্পেশাল ইস্পেশাল?”
প্রিয়ন্তীর লজ্জা আরও বাড়লো। মেয়েটাকে এভাবে বিব্রত হতে দেখে তাজধীর হাসি ধরে রাখতে পারল না যেন। মুহূর্তে গায়েব করল হাসিটুকু। এরপর বলল,
“আই জেনুইনলি ফীল মোস্ট কমফোর্টেবল এড্রেসিং এভেরিওন উইথ রেস্পেক্ট, রেগার্ডলেস অফ দেয়ার এইজ. ইটস সিম্পলি পার্ট অফ হু আই আম, এন্ড ইট ফীলস ন্যাচারাল টু মি.”
প্রিয়ন্তী কে হাঁসফাঁস করতে দেখে কথার মোড় পাল্টাল তাজধীর। বলল,
“কফিটা কেমন হয়েছে বললেন না তো?”
নে এইটারই বাকি ছিল যে! কথায় কথায় মজার ঠেলায় কখন যে কফি পুরোটা সাবাড় করে দিয়েছে সেই হুস কি আছে? ইশ! এখন কি বলবে। প্রিয়ন্তী চেয়ে দেখল লোকটা তখনো লোকটার কাপে ফুঁ দিয়েই যাচ্ছে। গরম ধোয়া বের হচ্ছে যে! ওর কাপে তো তোলায়ও অবশিষ্ট নেই একটুও। কফিটা হয়েছেই এমন। আর ছোট থেকেইতো ও গরম গরম খেয়ে অব্যস্ত। ফ্রেন্ডদের আড্ডায় সবার আগে ওর চায়ের কাপ খালি হয়। লজ্জায় কাচু মাচু করল। তাজধীর বুঝল হয়তো কিছুটা। স্বাভাবিক টোনেই বলল,
“চাইলে আরেক কাপ বানিয়ে দিতে পারি। দেবো?”
প্রিয়ন্তীর মাথা ঘুরতে লাগল লজ্জায়। ছিঃ!ছিঃ! এরকম লজ্জায় কোনো শুত্রু ও না পড়ুক। তবে আপাতত সবকিছুকে সাইডে রেখে মনস্থির করল এক জায়গায়। মনে মনে ঠিক করল, যা বলতে এসেছিল, সোজা বলে বিদেয় হবে এখান থেকে। এরপর আর কোম্মিনকালেও লোকটার সামনে পরবে না। ভনিতাহীন গলায় বলল,
“আপনার সঙ্গে আসলে কিছু কথা বলতে এসেছিলাম,
এরপর থেমে পুনরায় যোগ করল,
“সেদিন আসলে বান্ধবীদের সঙ্গে বাজী ধরে ঐরকম একটা কাজ করেছি। আসলে আমার বান্ধবীরাই আপনার আইডি সিলেক্ট করেছিল। আমার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু বাধ্য হয়েছিলাম একপ্রকার। নাহলে আমি ওরকম মেয়ে নই বিশ্বাস করুন। প্লিজ, আপনি কিছু মনে করবেন না। আর ভাইয়া বা ভাবিকে এই ব্যাপারে কিছু বলবেন না। ভাইয়া জানতে পারলে আমাকে খুব বকবে। আমি সত্যিই খুব সরি।”
নিজের কফির মগটা পাশেই ছোট একটা টেবিলের উপর রাখল তাজধীর। রাখতে রাখতে অত্যন্ত সাবলীল ভাবেই জানতে চাইল,
“কোন বিষয়ে সরি?”
“জিহ?”
প্রশ্নমাত্মক ভঙ্গিতে চাইল প্রিয়ন্তী। তাজধীর বলল,
“মানে ঠিক কোনটার জন্য সরি?বাচ্চাদের দুধের টাকা না দেয়ার জন্য? বিয়ের পরের দিন সকালেই আপনার ফেলে রেখে চলে যাওয়ার জন্য? না, আমার ‘গোপন সমস্যার’ কথা বলেছেন এজন্য? না কি বেড পারফরম্যান্স নিয়ে মন্তব্য করেছেন তারজন্য?
কোনটার জন্য সরি বলছেন? এছাড়া বাকি মেসেজ গুলোর কথা নাহয় নাই বললাম মানবতার খাতিরে!”
এইবার পুরোপুরি লজ্জায় মিউয়ে গেল মেয়েটা।
ছটফট করল। হাপুত্তাস করল। হাত কাঁপছে। পা কাঁপছে। কথা বের করতে চাইলেও, শব্দ আটকে যাচ্ছে গলায়। মেয়েটি নীরব হয়ে রইল কীয়তক্ষণ। লাজ আর লজ্জার মধ্যে নিজের সমস্ত অনুভূতি আটকে রাখল। শেষমেশ, কণ্ঠ ছোট করে কেবল বলল,
“সবকিছুর জন্যই।”
“কিন্তু মিস প্রিয়ন্তী, আপনার সব কথার মধ্যে একটা কথা কিন্তু আমার বেশ মনে ধরেছে। বিয়ে না করে, সংসার না করে, বাসর না করে, মোস্ট অফ অল পরিশ্রম না করেই সোজা বাচ্চার বাবা হওয়ার যে ব্যাপারটা! ফ্রিতে বাচ্চার বাবা হওয়ার এমন অপারচুনিটি হাতছাড়া করা কি উচিত, বলুন?আমি কিন্ত আবার সুযোগ সন্ধানী। তাই এই সুযোগ হাত ছাড়া করছিনা।”
প্রিয়ন্তী ভ্যাবাচ্যাকা খেল পুরোদমে। লোকটা আস্তই একটা অশ্লীল। সুযোগ বুঝে কথা শুনাতে হাতছাড়া করেনা। আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলোনা ওর। যেমনে এসেছিলো ওমনেই ঝড়ের বেগে সপাটে দৌড় লাগাল ও। এখানে আর এক মুহূর্ত ও থাকছেনা। নির্লজ্জ লোক কোথাকার। ফ্যামিলির কাছে কি ভোলাভালাই না সেজে থাকে। প্রিয়ন্তী দৌড় দিতেই পিছন থেকে ডাকল তাজধীর,
“আরেহ মিস প্রিয়ন্তী, বাচ্চার বাবা দাবি করতে না করতে দেখি,আমার জিনিস পত্রেও অধিকার দেখানো শুরু করে দিয়েছেন। কফির মগটা তো অন্তত রেখে যান।”
ব্যাস! এইবার ষোলো কলা পূর্ণ হলো। লজ্জায় মাটিতেই মিশে যেতে ইচ্ছে হলো মেয়েটার। শেষমেষ কিনা কফির মগ হাতে নিয়েই তোর দৌড় দিতে হলো হতচ্ছাড়ি কোথাকার? মনে মনে গালি ছুড়ল নিজেকে নিজেই।
চলবে…..
( আজকের পর্ব কেমন লেগেছে গায়িস? অসুস্থ শরীরেও লিখেছি। মতবাদ জানাবেন কিন্ত। আর রিয়েক্ট পর্যাপ্ত হলো পরবর্তী পর্ব ও খুব দ্রুতই আসবে ইনশাআল্লাহ 🫶)
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনী মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE