ডেসটেনি [ ১৭ ]
সুহাসিনি_মিমি
তাজধীরের প্রস্থান ঘটেছে বহুক্ষন আগেই। মিনিটের কাঁটা পরপর পাঁচবার অতিক্রম করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। প্রিয়ন্তী ঠিক যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিল, এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়েই থাকলো। নড়লচড়ল না। চোখদুটো নিষ্প্রভ শূন্যে,স্থির, টলমল। টলমল করে ওঠা পানিটুকু আর আটকে রাখতে পারল না মেয়েটা এবার। গড়িয়ে পড়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। দেখতে দিবেনা কাউকে নিজের এই দুর্বলতা। ভালোবাসায় ব্যর্থ হওয়া এই অশ্রুজল দেখানোর মত বোকা সেতো নয়। মানুষ যে হাসবে। মজা নিবে।
লোকটার বলা একেকটা বাক্য তীরের ফলার মতোই বিদীর্ণ করে দিয়েছে ওর হৃদয়ের কোমল আবরণটা।প্রতিটা বাক্যয় যে ধারালো ছুরির মতো এসে বিঁধছে বুকের ভেতর।।পিষে দিচ্ছে অন্তরটা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চারপাশটা কেমন যেন নিষ্প্রাণ লাগছে, বিষন্ন ঠেকছে। আশ্চর্য! রঙিন পৃথিবীটাও ধুম করেই রংহীন হয়ে গেছে!
তাহলে কি সত্যিই তার দিক থেকে কিছুই ছিল না? এক বিন্দু অনুভূতিও নয়? এতদিন যা যা করেছিল সবটাই মজা ছিল ? নাকি সে-ই অতিরঞ্জিত কল্পনায় নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?যুক্তির এই অতর্কবিতর্ক খেলায় হার মানলো সে। ঠিকই তো! লোকটা তো সত্যিই কখনো ওকে ঐরকম কোনো আসসাস দেয়নি। না কোনোদিন নিজে থেকে ঐরকম কিছু বলেছে। না দিয়েছে প্রতিশ্রুতি। ও-তো নিজে নিজে ভেবে নিয়েছে সবকিছু নিজের মত করে। কিন্ত ও না-হয় ভুল বুঝেছে। কিন্ত শ্রেয়া যে বলল লোকটার ওর প্রতি অনুভূতি আছে। ওয়েট শ্রেয়া?
শ্রেয়ার কথা মাথায় আসতেই মস্তিষ্ক পুনরায় তরাক করে জ্বলে উঠল ওর। শ্রেয়া, এই শ্রেয়ার বাচ্চাই তো ওকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে এসেছে এতদিন। একের পর এক মায়াবী ব্যাখ্যায় ওকে বিভ্রান্ত করে গিয়েছে প্রতিনিয়ত। ভুল স্বপ্নের বীজ বপন করেছে ওর অন্তরে। ওই মেয়ের পাল্লায় পড়ে ও ধরে নিয়েছিল লোকটা ওকে পছন্দ করে। আজ একমাত্র এই শ্রেয়ার জন্য এতটা অপমানের সম্মুখীন হতে হলো ও-কে। নিজের আত্মসম্মান সব কিছুর বিসর্জন দিয়ে নিজ থেকে এতটা ছোট হয়ে লোকটার কাছে এসেছিল নিজের অনুভূতি জাহির করতে। বিনিময় কি পেল? তিরস্কার। সোজা বাংলায় রিজেক্ট হতে হওয়া?
“শ্রেয়ার বাচ্চাআআআআ!”
কথাটা চিরবির করে দাঁতে দাঁত পিষে বলেই সোজাসুজি নিজের রুমের দিকে ছুটলো ও। থামলো না এক সেকেন্ডও। সোজা নিজের কক্ষে এসে থামল পা দুটো।
বুকে জমাট বাঁধা, অস্থিরতা প্রতিটি শ্বাসে বিস্ফোরিত হতে চাইছে। বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে।তখন তড়িঘড়ি করে বের হওয়ার সময় ফোনটা রুমেই ফেলে গিয়েছিল।রুমে ঢুকেই বিছানার উপর পড়ে থাকা ফোনটা তুলে ব্যস্ত হাতে।
ডিরেক্ট কল লাগালো শ্রেয়াকে। ওপাশে কয়েকবার রিং হতেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ফোন রিসিভ করল শ্রেয়া। ঘুমঘুম স্বরে, অলস ভঙ্গিতে উত্তর করল,
“হ্যালো”
প্রিয়ন্তী দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে ধাতস্ত করে নিলো এযাত্রায়। মাথা গরম করবেনা। যতটা সম্ভব নিজেকে দমিয়ে রেখে স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“কই আছিস তুই?”
ওপাশ থেকে হাই তুললো শ্রেয়া। বলল,
“এই কুত্তামরা সকালে আর কই থাকমু? বাসাতেই আছি। এত সকালে কল দিছিস কেন ভাই?”
প্রিয়ন্তী চোখ বন্ধ করে আলগোছে নিঃশ্বাস ফেলল। নিজেকে সংযত রাখার শেষ চেষ্টা চালালো আরেকদফা। বলল সোজাসাপ্টা,
“দেখা কর আমার সঙ্গে। এক্ষুনি।”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো শ্রেয়ার বিস্মিত স্বর,
“এই সাত সকালে? আমি উঠবো?তোর কি মনে হয় আমি এত সকালে উঠার মানুষ?পারবোনা ভাই!”
“আরেহ আয় না। তোকে একটা স্পেশাল ট্রিট দিবো আমি আজ!”
ট্রিট শব্দটা শোনতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল তখুনি। বলল,
“এমা! সত্যি ট্রিট দিবি দোস্ত? আগে বলবি না! দাড়া, এখনই রেডি হচ্ছি।এই দাড়া! হঠাৎ ট্রিট কিসের রে? তোর আবার বিয়ে ফিক্সড হয়ে গেল নাকি ওই কমান্ডারের সঙ্গে?”
এপাশে প্রিয়ন্তীর চোখে তখন দপদপ করে জ্বলছে রাগের আগুন। তবুও নিজেকে সংযত রাখল। বলল টেনে টেনে,
“ওটা আসলেই জানতে পারবি। সারপ্রাইজ থাক। কেমন?”
একটু থেমে আবার বলল,
“তুই আগে জলদি আয়। তোকে ট্রিট দেওয়ার খুশিতে আমার তো আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছি না। আসবিনা?”
“তুই ট্রিট দিবি আর আমি মিস করবো?আমাকে জাস্ট পাঁচটা মিনিট দে। রেডি হয়ে এখনই বের হচ্ছি। শোন না—কলেজ রোডে নতুন একটা ক্যাফে খুলছে, শুনছি আইটেম গুলো নাকি দারুণ! ওখানে নিবি?”
“আজ তোকে কলেজ রোডের সব ক্যাফেতেই ঘুরাবো আমি। তুই আগে বের তো হ।”
কলেজ রোডের ব্যস্ত প্রান্তে এসে থামল প্রিয়ন্তী। কলেজ, ভার্সিটি অফ থাকায় এখানটায় নিত্যদিনের মত তেমন যানজট নেই। তবুও রাস্তার দু’পাশে কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীরা সকালের বেচ শেষে এসে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। প্রিয়ন্তী নেমে আসেপাশে চোখ বুলাতেই দূর থেকেই চোখে পড়ল—”ক্যাপ্টেন টেবিলস” এর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়া কে। সকাল বেলা আসবেনা বলেও দিব্যি সাজগোজ করে নায়িকা সেজে এসে দাঁড়িয়েছে।
সুপ্ত জমে থাকা রাগ বুক চিরে বের হতে চাইলো ওর। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল মুহূর্তেই। এক পা, দুই পা এগোতে এগোতে হঠাৎ থেমে যেতেই শ্রেয়া ভ্রু টানটান করে চেয়ে রইলো। প্রিয়ন্তী যখন থেমে গিয়ে নিঃশব্দে পায়ের জুতো একটা খুলে হাতে তুলে নিলো বোকা শ্রেয়া ভাবল হয়তো বান্ধবীর জুতো ছিঁড়ে গেছে।
কিন্তু এরপরের দৃশ্যটা বুঝতে ওর এক সেকেন্ডও লাগল না। বান্ধবীকে জুতো হাতে নিয়ে পাগলের মত তেড়ে আসতে দেখে হতভম্ব শ্রেয়ার দুর্বল মস্তিষ্কে হঠাৎ করেই বিপদের ঘণ্টা বেজে উঠল। আশঙ্কা জনক পরিস্থিতির আচ করতেই তৎক্ষণাৎ রাস্তার উল্টো মুখে হয়ে দিলো ভোঁ দৌড়।
পেছন থেকে প্রিয়ন্তীর বজ্রকণ্ঠ গর্জে উঠল তখনি,
“শ্রেয়ার বাচ্চা! দাঁড়া তুই! আজকে তোর খবর আছে! দাঁড়া বলছি!”
রাস্তার মাঝখানে শুরু হলো দুই বান্ধবীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। আশেপাশের লোকজন থেমে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। শ্রেয়া দৌড়াতে দৌড়াতেই হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচিয়ে উঠল,
“এইই কী ভাই! ট্রিটের লোভ দেখায়া জুতো দিয়া মারতে আসছিস কেন? আমি কী করছি?”
“কি করেছিস? আজকে তোকে আমি সেই হিসাব বুঝামু! দাড়া শুধু!”
শ্রেয়া কি বলদ নাকি? বলদামি করে ট্রিট এর লোভে চলে আসলেও দাঁড়িয়ে পড়ার মত বোকামি সে আর করবেনা।শ্রেয়া খুব ভালো করেই অবগত এই মেয়ে একবার রেগে গেলে সহজে থামার পাত্রী নয়। এই মেয়ের রাগ যেমন তীব্র, তেমনি অপ্রতিরোধ্য।ওকে সামলানোর সাধ্যি আছে নাকি ওর? তাই প্রাণ বাঁচানোই এখন একমাত্র লক্ষ্য ভেবে সপাটে দিলো দৌড়।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ করে ঘটল এক বিপত্তি। শ্রেয়া কে উদ্দেশ্য করে মারা জুতোটা আচমকাই গিয়ে লাগলো ক্যাফের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা এক সুপুরুষে। বেখেয়ালি প্রিয়ন্তী কিছু বুঝে উঠার আগেই জুতোটা গিয়ে সোজাসুজি লোকটার কপালে লাগল। ততক্ষনে থেমে দাঁড়িয়েছে শ্রেয়া ও । লোকটা ব্যথায় আর্ত শব্দ করে থেমে দাঁড়িয়েছে ইতিমধ্যে। কপালে হাত চেপে ধরে তাকিয়েছে নিচে। পায়ের কাছে মেয়েলি জুতো আর তার থেকে মাত্র কিঞ্চিৎ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে দেখে রীতিমতো কুচকানো কপাল টানটান হয়ে এলো সেই মানবের।
প্রিয়ন্তী থমকে দাঁড়িয়ে জিভে কামড় বসিয়েছে। এটা কি হলো? এই ব্যাটা খাম্বা আসলো কোথেকে ওদের মাঝে?ভালো করে লক্ষ্য করল একবার লোকটার কপালে। কেটেছে কিনা দেখতে। তবে বলিষ্ঠ দেহি সেই পুরুষের কপালে রক্তর দেখা না মিলায় খানিকটা স্বস্তির নিঃশাস ফেললো এযাত্রায়। মনে মনে ঠিক করল মাফ টাফ চেয়ে কোনোরকম কেটে পরবে। তবে ততক্ষনে লোকটার পিছনে থাকা দুজন কালো পাশাকদারি ইনফর্ম পড়া বডিগার্ড মত ব্যক্তিতে দেখতেই প্রিয়ন্তীর মাথা চক্কর কাটার উপক্রম হলো ভয়ে।
একবার ভালো করে আবারও তাকালো লোকটার দিকে। গায়ে কালো সুট পড়া। হাতে বেশ নামি দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি। চোখে কালো সানগ্লাস। সবমিলিয়ে স্পষ্ট লোকটা যে সাধারণ কেউ নয়। আর বেরিয়ে আসা সেই ব্যক্তি দুজনও নিশ্চই এর বডিগার্ড হবে। ভয়ে ভয়ে শুষ্ক গলায় ঢুক গিলল প্রিয়ন্তী এবার।
গাঢ় রঙের সুটে মোড়ানো সুঠাম দেহি মানুষটা কাঁধ টানটান করে চোখের রোদ চশমা টা খুলতেই চোখাচোখি হলো একজোড়া অলিভ গ্রিন রঙা চোখের মনিতে।
প্রিয়ন্তী অবাক হলো এযাত্রায়। এমন অদ্ভুত চোখের মণি বিশিষ্ট পুরুষ অন্যান্য দেশে থাকলেও বাংলাদেশে কখনো এর আগে দেখেনি ও। কিন্তু লোকটা ওকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল উল্টো,
“আপনি ঠিক আছেন তো? পায়ে কোথাও লেগেছে?”
প্রিয়ন্তী হকচকিয়ে উঠল। বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়ল যেন। বিভ্রান্তিতে তাকালো লোকটার দিকে।
জুতোটা তো একবারে কপালেই লেগেছে ! এইরে জুতোর বারি খেয়ে ব্যাটার মাথার ইস্ক্রু আবার ঢিলে হয়ে গেল নাকি?কাম সারছে।
নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিক করল উল্টো রাগ দেখানোর ভান করবে ও। নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল ও,
“ঠিক থাকব কী করে? আপনি মাঝখান দিয়ে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে গেলেন হ্যাঁ?আপনার জন্য আমার টার্গেট মিস হয়েছে! আমার জুতো…
কথা শেষ না করেই তাড়াহুড়ো করে নিচে পড়ে থাকা জুতোটা তুলে নিয়ে পায়ে গলাতে লাগল ও। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ড দু’জন একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ী করল। কিন্তু বসের হাত তুলে ইশারাতেই থেমে দাঁড়ালো পরপর।
“এইভাবে মাঝরাস্তায় দৌড়াচ্ছিলেন কেন? যদি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা ঘটত?”
প্রিয়ন্তী আবার কপাল কুঁচকে তাকাল। এই ব্যাটা কি পাগলাগারদ থেকে উঠে এসেছে নাকি? আজব?
নিজে আঘাত পেয়েও উল্টো তাকে নিয়েই চিন্তা করছে! মনে মনে বিড়বিড় করল,নিশ্চই ব্যাটা কোনো ধনী বাপের আদরের বখে যাওয়া ছেলে হবে হয়তো। তাই সঙ্গে দেহরক্ষী নিয়ে ঘোরে! তারপরই চোখ গেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়ার দিকে—যে কিনা পুরো দৃশ্য দেখে হা করে তাকিয়ে আছে!দমিয়ে রাখা রাগের পারদ আকাশচুম্বী হল তখন।
ভালোয় ভালোয় সেখান থেকে কেটে পড়ার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয়ত শ্রেয়াকে ওইভাবে নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাগে ফুঁসে উঠে আবার দৌড় দিল প্রিয়ন্তী।
“মাগো!”
বলেই চেঁচিয়ে উঠেই শ্রেয়াও দৌড় দিল সামনে।
কিন্তু কয়েক পা যেতেই—একটা ইটের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে হমরি খেয়ে পড়ল শ্রেয়া।ভারসাম্য রাখতে না পেরে প্রায় বসেই পড়ল রাস্তায়।
অগত্যা থেমে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী ও। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু শ্রেয়ার মুখের কষ্টের ছাপটুকু চোখে পড়তেই ভেতরের কঠোরতা খানিকটা নরম হয়ে এল ওর। উদ্বিগ্নতায় আহাজারী করে উঠল বান্ধবীর উদ্দেশ্য,
“কোথায় লাগছে?”
শ্রেয়া মুখ কুঁচকে পা ধরে বলল,
“এইখানে। মনে হয় মচকে গেছে।”
প্রিয়ন্তী একটা বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তবুও নিচু হয়ে পা’টা দেখল। বলল,
“চল, বসতে হবে কোথাও।”
শ্রেয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে পাশে থাকা ক্যাফেটায় গিয়ে বসল দুজনে। ওদিকে এতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা প্রিয়ন্তী চোখের আড়াল হতেই অগোচরে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আমার ব্লুবেরি!এতটা বড় হয়ে গেছো তুমি এই দু’বছরে?”
ক্যাফেতে ঢুকে শ্রেয়া আস্তে ধীরে পা তুলে চেয়ারের ওপর তুলে রাখল। তাড়াহুড়ায় ঠান্ডা পানি নিয়ে এলো প্রিয়ন্তী। তারপর ক্যাফে থেকে বরফ এনে চেপে ধরলো আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটায়। বরফটা পায়ে ছোঁয়াতেই কেঁপে কেঁপে উঠল শ্রেয়া। খানিকক্ষণ বাদে কিছুটা স্বস্তি পেয়ে এবার চোখ তুলে তাকাল প্রিয়ন্তীর দিকে। বললো কৌতূহলি হয়ে,
“আচ্ছা এখন বলতো বোন ব্যাপারটা কী?এমনে বাঘিনীর মতো ক্ষেপে আছিস কেন? কী সুন্দর করে ট্রিটের লালসা দেখাইয়া এভাবে হায়নার মত আক্রমণ করার মানে কী বইন?”
উত্তর দিতে সময় নিলো প্রিয়ন্তী। সময় নিয়ে মুখের জবান কঠোর করে বলল,
“তোকে আমার কি করতে মন চাচ্ছে জানিস? ভাগ্য ভালো তোর পায়ে চোট পাইছিস। না হলে তোর দুইটা পা আমি নিজেই ভাঙতাম আজকে!”
শ্রেয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল,
“আরে কিন্তু হইছে টা কী?”
প্রিয়ন্তী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। ফুসতে ফুসতে বলল,
“কী হইছে মানে? তুই জানিস না কী হইছে?”
“না কইলে জানবো কেমনে? আগে ক বাল!”
“তোর কথায় আমি আজকে ব্যাটার সামনে নিজের ফিলিংস জাহির করসিলাম।”
শ্রেয়া মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসল,
“ওমা! সত্যি? তারপর?”
“তারপর আর কী! উনি সরাসরি আমার মুখের উপর রিজেক্ট করে দিসে।প্রত্যাখান করেছে আমায়। উনার তরফ থেকে বাকি কিছুই নেই। নাথিং। মানে বুঝতে পারছিস কতটা অপমানিত হতে হয়েছে আমায়? আর এইসব কিছুর জন্য দায়ী তুই। তোর জন্য হয়েছে সব।”
কপালে বরাবরের মতোই দুটো মোটা মোটা ভাজপড়লো শ্রেয়ার। আশ্চর্যয় হতবিহুল হয়ে বলল,
“এহ!”
“এহ না হ্যা!”
প্রিয়ন্তী থামল না এবার। একে একে সব খুলে বলল—কীভাবে সে নিজের অনুভূতি জানিয়েছিল, কীভাবে কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কীভাবে প্রতিটা কথা তার আত্মসম্মানকে আঘাত করেছে সবটা। যা শোনামাত্রই একবারে, স্থির, স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়ে বসে রইলো শ্রেয়া কীয়তক্ষন। মেয়েটা রীতিমতো থ’ হয়ে বসে হিসাব মিলাতে ব্যস্ত মনে মনে।
বান্ধবীকে এভাবে নিশ্চুপ, স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে দেখে প্রিয়ন্তীর বিরক্তি আরও বাড়লো বৈকি। সে এখানে নিজের কষ্টে জর্জরিত হওয়ার কাহিনী শুনালো কোথায় ওর বান্ধবী সায় মিলিয়ে ওকে শান্তনা দিবে, নিজের দোষ স্বীকার করবে ওকে ভুলভাল বুঝানোর জন্য টা না করে মেয়েটা অন্য দুনিয়ায় আটকা পরে আছে? বিরক্তিতে ধাক্কা দিয়ে বলল প্রিয়ন্তী,
“শ্রেয়ার বাচ্চা! এভাবে চুপ করে আছিস কেন?”
“আরে থাম। ভাবতে দে আমাকে।”
“কী ভাবছিস তুই?”
সন্ধিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করল প্রিয়ন্তী। শ্রেয়া কপাল কুঁচকে বলল,
“উনার যদি সত্যিই কোনো মেয়েদের প্রতি ইন্টারেস্ট না থাকে, তাহলে উনি কি…?”
বাকিটা শেষ করার আগেই দুই বান্ধবী একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ী করল বিস্ময়ে। মুখ দিয়ে বেরোলো না একটি বাক্যও। দু’জনের চোখই তখন প্রায় কপালে উঠে গেছে প্রচন্ড আতঙ্কে। ওয়েটার ছেলেটি কফির মগ নিয়ে ডাকল তখন,
“ম্যাম আপনাদের কফি।”
ওয়েটার ছেলেটা টেবিলে কফি রেখে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ওভাবেই। কোনো সাড়া না পেয়ে আবার ডাকল ওদের। তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে শেষমেশ একটু জোরেই টেবিলে শব্দ করে বলল,
“ম্যাম, কফি। “
চমকে উঠল দু’জনেই একসঙ্গে। একসাথে তাকাল ছেলেটার দিকে। তারপর আবার একে অপরের দিকে তাকালো। অমনি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বিকৃত করে, শরীর ঝাঁকিয়েদু’জন একসাথে চেঁচিয়ে উঠল আতঙ্কে,
“ইয়াক!ছি!”
ওয়েটার ছেলেটা হতভম্ব। বিস্মিত হয়ে হাতের সাহায্য নিজের মুখে দেখল কিছু লেগে আছে কিনা। নিজের গাল, নাক, চিবুক—সব ছুঁয়ে দেখল। তারপর নিচের জামাটাও দেখে নিল একবার। কোথাও কিছুই না পেয়ে আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল ছেলেটা। ধীর পায়ে সরে গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। এদিক-ওদিক ঘুরে নিজের চেহারা খুঁটিয়ে দেখল। এসময় পাশ থেকে আরেকজন সহকর্মী জিজ্ঞেস ককরে বসল,
“কী রে? কী দেখছিস?”
ছেলেটা মাথা চুলকে জবাবে বলে,
“কিছুই বুঝতেছি না ভাই ওই দুইটা মেয়ে আমার দিকে তাকায়া এমন রিয়্যাক্ট করল কেন হঠাৎ? “
ওদিকে দু’জনেই তখনো স্তব্ধতার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শ্রেয়া বিস্ময়ে চুপ, আর প্রিয়ন্তী কপাল কুঁচকে,আঙুল দিয়ে চুল জড়িয়ে ভাবনার ভেতর ডুবে আছে পুরোপুরি। কি ভাবছে কে জানে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎই সেই নীরবতা ভাঙলো শ্রেয়া। বলল,
“ভাই সিরিয়াসলি!আমার তো ভাবতেই গা ঝিরঝির করছে! এই জন্যই তো ব্যাটা তোকে রিজেক্ট করছে!
নাহলে তোকে রিজেক্ট করার সাধ্যি কার আছে বল? আমি যদি ছেলে হতাম—কসম করে বলছি—এতদিনে তোকে কিডন্যাপ করে হলেও তুলে নিয়ে যেতাম! আর তাও যদি না পারতাম, ব্ল্যাক ম্যাজিক করে হলেও অন্তত তোকে পটিয়ে ফেলতাম! তুই ভাব, আমাদের কলেজ থেকে শুরু করে ভার্সিটির প্রতিটা ছেলে তোর পেছনে ঘুরে, কলেজের ক্রাশ ভিপি পর্যন্ত তোর উপর ক্রাশ খেয়ে প্রপোস করেছিল!আর সেই তোরে কিনা মুখের উপর রিজেক্ট করে দিসে ওই ব্যাটা নিরামিষের বাচ্চা!”
একটু থেমে আবার ভাবুক গলায় বলল,
“আচ্ছা দাড়া, এই জন্যই বোধহয় ব্যাটা এখনো বিয়ে করে নাই। আসছে তার নাকি মেয়ে মানুষে ইন্টারেস্ট নাই। সালা নিরামিষ মেয়েদের প্রতি ইন্টারেস্ট থাকবে কেমনে তোর তো ভালো লাগে ছেলেগো। আর এখনকার দিনে এই জিনিসটা ভাই পানিভাতের মত নরমাল হয়ে গেছে। এই ডিফেন্সের বয়স্ক লোকগুলোই এরকমটা বেশি থাকে। ভালোই হইসে আগে থেকে সব ক্লিয়ার হয়ে গেল। থাক দোস্ত! তুই চিন্তা করিস না। তোর জন্য আমি একদম রাজপুত্র ধরে আনবো!
ব্যাটা নিজেকে কী ভাবে? এর থেকে হ্যান্ডসাম ছেলে দুনিয়ায় নাই নাকি?”
হঠাৎ কিছু মনে পড়ে জিজ্ঞেস করল আবার,
“এই, একটু আগে যার কপালে তুই জুতো মারছিলি—উনাকে কি তুই আগে থেকে চিনিস?”
অন্যমনস্ক স্বরে বলল প্রিয়ন্তী,
“না তো। তবে লোকটাকে দেখে আমার মোটেও বাংলাদেশি মনে হয় নাই। চোখগুলো না কেমন যেন অদ্ভুত।”
শ্রেয়া চোখ টিপে হেসে বলল,
“যাই বলিস—লোকটা কিন্তু সেই হ্যান্ডসাম! এইরকম একটা হ্যান্ডসাম ছেলে ধরে তোকে বিয়ে দিমু। তারপর ওই নিরামিষ কমান্ডারের সামনে দিয়ে জামাই নিয়ে ঘুরঘুর করবি।ছেলেপুলে হলে লেংটাই কোলে তুলে দিবি। ব্যাটা তখন জ্বলে পুড়ে কয়লা হবে! আর হওয়ার বোধহয় চান্সও নেই। ওর তো তোকেও না তোর জামাইকে মনে ধরবে!”
প্রিয়ন্তী এবার বিরক্ত হয়ে হাত তুলে থামাল বান্ধবীকে,
“হয়েছে! হয়েছে। তোর বুদ্ধিতে আমি আর এক গ্লাস পানিও খাব না জীবনে। আমার ঢের শিক্ষা হয়ে গেছে এইজন্মে!”
.
.
.
.
রাত প্রায় তখন দু’টা ছুঁই ছুঁই। নৌঘাঁটির চারপাশে নেমে এসেছে এক ধরনের গা ছমছমে নীরবতা। ঠিক তখনই গেটের সামনে এসে থামে একটি কালো জিপ।জিপের হেডলাইট নিভে যেতেই ডিউটিতে থাকা সেলররা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। গেট খুলে দেয় নিঃশব্দে। জিপটা ভেতরে ঢুকে গিয়ে থামে প্রশাসনিক ভবনের ঠিক সামনের প্রাঙ্গনে।ওয়্যারলেসে খুব নিচু গলায় ভেসে আসে,
“Lieutenant Commander Azaan has arrived.”
গাঢ় নেভি ইউনিফর্মে মোড়া সুঠামদেহটা। সাদা রঙের ফুল স্লিভ শার্ট, পরিপাটি করে ইস্ত্রি করা। কাঁধের ওপর এপোলেটে ঝলমল করছে তার র্যাঙ্ক—দুটি সোনালি স্ট্রাইপের মাঝে একটি চিকন স্ট্রাইপ। যা মূলত নির্দেশ করে তার রাঙ্কিং অবস্থান।
বুকের বাম পাশে কালো রঙা ন্যামপ্লেটে লিখা, “তাজধীর সিদ্দিক”, তার নিচে সারিবদ্ধভাবে বসানো রঙিন রিবন বার। যেসব একেকটা মূলত তার অর্জন আর দায়িত্বের নীরব সাক্ষী।শার্টটা গুঁজে রাখা সাদা প্যান্টের ভেতরে। কোমরে বাধা পরিপাটি বেল্ট, যার বকলস চকচকে,ফকফকে।
পায়ে কালো পালিশ করা জুতা। জুতোগুলো এতটাই ঝকঝকে যে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায় তাতে। আর সবথেকে বেশি আকর্ষিত করে মাথায় থাকা সেই সাদা পিকড ক্যাপটা। পুরুষালি গম্ভীর চেহারাটা দৃশ্যমান হয়ে ফুটে উঠে একবারে। ক্যাপটার সামনে আবার নৌবাহিনীর প্রতীক খচিত।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নৌ-সেনা দ্রুত এগিয়ে এসে সিনিয়র কর্মকর্তার কানে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“স্যার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিদ্দিক আজান ইজ ব্যাক।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অপেক্ষামান বৈঠক। একটি কনফারেন্স রুম। মাঝখানে বড় টেবিল, চারপাশে বসে আছেন সব উচ্চপদস্থ নৌ-কর্মকর্তারা। দেয়ালে টানানো বড় স্ক্রিনে ভেসে উঠছে সমুদ্রপথের মানচিত্র। কয়েকটা জায়গা লাল চিহ্ন দিয়ে মার্ক করা।
একজন সিনিয়র অফিসার গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,
“এই অপারেশনটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই মিশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবং আমরা অপেক্ষা করছিলাম শুধু একজনের জন্য।”
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সরাসরি দরজায় দাঁড়ানো তাজধীরের উপর।পরপর বললেন তিনি,
“লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিদ্দিক আজান।”
আরও ঘনীভূত হয়ে এলো সেই নিস্তব্ধটা। যখন তিনি
এই অপারেশনের নেতৃত্বর দায়িত্ব তাজধীরের উপর বর্তাল। দূরের এক কোণে—তিনজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। তাজধীর কে দেখতেই তিনজনের চোখে একসাথে ঝলসে উঠল তৃপ্তির হাসি।
একজন নিচু স্বরে বলল,
“ফাইনালি শালায় আসছে!”
তাঁরা তিনজনই একই র্যাংকের। কিন্তু তিনজনের দক্ষতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্ণব হলো ডিজিটাল দুনিয়ার জাদুকর। তাকে এই নামেই ডাকে বাকিরা। তার আঙ্গুল সর্বদা ল্যাপটপের মধ্যেই আটকা থাকে।
এমন কোনো সিকিউরিটি সিস্টেম, কোনো সার্ভার—তার কাছে অজেয় নয়। মুহূর্তেই দেশের সমস্ত গোপনীয় তথ্য ভেঙে এনে ফেলতে পারে সে। তবে এখানে তার হাতের সঙ্গে মুখেরও এক অদৃশ্য মিল রয়েছে। তার হাত যেমনে চলে মুখটাও তেমনেই গড়গড় করে চলতেই থাকে চব্বিশ ঘন্টা।
দ্বিতীয়জন,শেহরোজ। ট্রিগারে হাত পড়লে সে হয়ে ওঠে নিখুঁত নিশানাবাজ।দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করা তার জন্য দুধভাত। দশটা বিল্ডিং পেরিয়েও রুমে থাকা কোনো মানুষকে টার্গেট করলে তার নিশানাভেদ হয়না। তবে মেজাজের দিক থেকে সে বড্ড শর্ট টেম্পার। মুহূর্তেই রেগে উঠে। মাঝে মাঝে দেখা যায় রাগ কন্ট্রোল করতে হিমশিম খেয়ে যেখানে সেখানে শুট করে বসে।
তৃতীয়জন—ফাহিম। পেশায় নৌবাহিনী হলেও সমুদ্রই তার আসল জায়গা। অক্সিজেন ছাড়া দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে পারে সে।সমুদ্রের অন্ধকার গভীরতাও আটকাতে পারেনা তাকে। এই তিনজনের গ্রুপ লিডার তাজধীর।সর্বমিলে গড়ে উঠেছে চারজনের এক বিশেষ টিম। তাদের কোডনেম—
“লেভায়াথান”সমুদ্রের গভীরতম অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকরতম এক দানবের নামানুসারে।
সিনিয়র অফিসার আবার বললেন,
“অপারেশন কোড: লেভায়াথান-০৭।এই মিশনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমরা দিচ্ছি—টিম লেভায়াথানকে।”
“কপি দ্যাট, স্যার। ওই ট্রায়ার্ড আওয়ার বেস্ট!”
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনও সোজা হয়ে দাঁড়াল ততক্ষনে। তারা প্রস্তুত। নিজের জীবন বাজি রেখেও দেশকে রক্ষা করতে প্রস্তুত তাঁরা সকলেই।
:
:
:
:
ব্রিফিং শেষ হলো বেশ কিছুক্ষন সময় নিয়ে। আলোচনা শেষ হতেই দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়েও আপাতত একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সবাই।তাজধীর ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো কনফারেন্স রুম ছেড়ে । দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিতে শরীরটা মেচমেচ করছে তার। তাই সরাসরি নিজের পার্সোনাল কোয়ার্টারের দিকে রওনা দিল তখনি।
মাঝারি পরিসরের একটা বেডরুম। এক পাশে খাট, অন্য পাশে কাভার্ড রাখা শুধু। দেয়ালের মাঝামাঝি রয়েছে একটা টেবিলে। ওতে কিছু ফাইল আর নেভির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখা।
আজান প্রথমেই কাভার্ডের দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলল সেটার দরজা। ভেতরে ঝোলানো ইউনিফর্ম, আর কিছু ক্যাজুয়াল পোশাক ছাড়া বেশি কিছুর অস্তিত্ব নেই। সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজানো।অমনি
দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল বাকি তিনজন।
অর্ণব ঢুকেই ছুড়ে দিলো কটাক্ষভরা প্রশ্নখানা,
“কিরে ভাই এইবার যে গেলি। গিয়ে তো একদম গায়েব! না কোনো ফোন, না মেসেজ—এরকম তো তুই কোনোদিন করিস নাই। ব্যাপার-স্যাপার কী? বিয়ে-টিয়ে করে সরাসরি বউ রেখে আসছিস নাকি বাসায়?”
স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততায় কথাটা এড়িয়ে গেল তাজধীর। ফাহিম আয়েশ করে গিয়ে বসল গুছানো খাটটায়।বলল,
“হাবভাব দেখে তো মনে হয় কিছু একটা গন্ডগোল করে আসছেই এবার। দেখছিস না মুখের বারোটা বাজিয়ে রেখেছে আসা থেকেই। ভাবিকে রেখে আসতে মন চাইনাই তাইনারে?”
অর্ণব বলল মাঝখানে,
“রেখে আসতে মন না চাইলে পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে আসতি। তোর ওই পকেটে দুইতিনজন ঢুকে যাবে অনায়াসে।”
তাজধীর মনোযোগ দিলোনা সেখানে। ব্যস্ত হাতে কাভার্ড খুঁজতে লাগল সে। কাঙ্খিত জিনিসটি খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে একের পর এক কাপড় নাড়াচাড়া করতে লাগল।তবে তাতেও খুঁজে না পেয়ে তার কপালে ভাঁজ পড়ল দুটো।পেছন থেকে অর্ণব ডাকল তখন,
“কিরে আবারো কিছু মিসিং?”
ঘুরে দাঁড়ালো তাজধীর।বিরক্তিতে বলল,
“আম্মুর দেওয়া টি-শার্টটা খুঁজে পাচ্ছি না এবার।”
অত্যন্ত সিরিয়াস শোনালে এবার ফাহিমের কণ্ঠখানা,
“বুঝলাম না ভাই, সবকিছু ছেড়েছুড়ে শুধু তোর জিনিসপত্রই কেন মিসিং হয় প্রতিবার?”
তাজধীর সন্দেহভরা চোখে তাকাল ওদের দিকে। নিরেট কণ্ঠে বলল,
“সেটা তো তোরা বলবি। তোরা ছাড়া এই রুমে ঢোকার পারমিশন তো আর কারো নাই।”
চমকে উঠল উপস্থিত তিনজনেই। গুরুগম্ভীর হয়ে বলল প্রত্যেকে,
“ওহ হ্যালো! আমাদেরকে কি তোর চোর মনে হয়? এতকিছু ছেড়ে ছুড়ে শেষমেশ তোর জামাকাপড় চুরি করবো?
অর্ণব বলল,
“আর করেই বা কী করবো? তোর ওই দৈত্যের মতো শরীরের একেকটা শার্ট, টি শার্ট এ আমরা তিনজন একসঙ্গে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারবো।
ফাহিম সন্দীগ্ন হয়ে বলল,
“একটা জিনিস খেয়াল করছিস?সবসময় কেন ওর জিনিসই হারায়? মাঝে মাঝেই কিছু না কিছু মিসিং হয় ওর। আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে এবার ভাই।এই তোর সাথে কোনো জিন-টিন নাই তো?”
সাথে সাথেই ফাহিমের মাথায় চাপর মারল অর্ণব। আপত্তি জানিয়ে সংশোধন করল বন্ধুকে,
“এই গাধা! ছেলেদের সাথে জিন থাকে না—পরি থাকে, পরি! তোর উপর কোনো খারাপ পরি আসর করে নাই তো?”
তাজধীর বেজায় বিরক্ত হয়ে কপাল চুলকে জানাল কাঠ কাঠ,
“কি সব আউল-ফাউল বকছিস তোরা! যা, বের হ… ফ্রেশ হব আমি।”
“আমরা কি তোর ওই জলহস্তী মার্কা বডি দেখতে আগ্রহী নাকি?তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। আমরা যাচ্ছি ট্রেনিং গ্রাউন্ডে (নৌ স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং জোন) জুনিয়রদের একটু দেখে আসি।”
বলেই একত্রে বেরিয়ে গেল তিনজন। তাজধীর কিছুক্ষন ভাবুক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পরপর কাবার্ড খুলে একটা ট্রাওজার আর টি শার্ট নিয়ে ঢুকে পড়ল শাওয়ারে।
:
:
:
:
ফ্রেশ হয়ে বেরোতে বেরোতে সময় গড়ালো দশটায়। ইউনিফর্মের কড়াকড়ি ছেড়ে তাজধীর গায়ে চাপিয়েছে একটা সিম্পল টি-শার্ট আর ট্রাউজার।
চারবন্ধু মিলে হাসিঠাট্টা করতে করতে পৌঁছালো গেল নৌ স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং জোনে।
বিস্তর খোলা মাঠ।এক পাশটায় অবস্ট্যাকল কোর্স, অন্য পাশে শুটিং রেঞ্জ, মাঝখানে চলছে নতুন রিক্রুটদের প্রশিক্ষণ।
ট্রেনিং নেয়া সকলেও দূর থেকে চারজনকে দেখে থমকে দাঁড়ালো। এতক্ষন যাবৎ থাকা হাসিখুশি মুখগুলো নিস্তেজ হয়ে এলো নিমিষেই। প্রত্যেকের চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল চাপা আতঙ্ক। টানটান দয়ে দাঁড়ালো সকলেই।শুরু হয়ে গেল ওদের মধ্যে ফুশুর ফাশুর।
“এই কয়দিন একটু শান্তিতে ছিলাম। শেষ শান্তি শেষ। অশান্তি আবার ফিরে আসছে যে!”
কাজের ক্ষেত্রে তাজধীরের কঠোরতা কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে পুরো ইউনিটে।তার কাছে
ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।ওই বাজপাখির মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে এড়িয়ে পার পেতে পারেনা একটি কাক পক্ষীও। একটু এদিক সেদিক হলে শাস্তি নিশ্চিত। তবে তার সব শাস্তিই হয় শুধুমাত্র হাত কেন্দ্রিক। যার কারণে সবাই তাকে অগোচরে নাম দিয়েছে গাব্বার সিং!তার লিস্টে থাকা শাস্তিগুলোর মধ্যে বিশেষ হচ্ছে,
“প্রথমে ৫০টা পুশ-আপ। তারপর হাতের ওপর ভর দিয়ে প্ল্যাঙ্ক ধরে থাকতে হবে মিনিটের পর মিনিট।”
“ভারী ডাম্বেল তুলে রেখে “স্ট্যাটিক হোল্ড” হাত নামানো যাবে না, যতক্ষণ না সে নিজে বলে।”
রশি বেয়ে ওঠা—বারবার, যতক্ষণ হাত অবশ হয়ে না যায় ঠিক ততক্ষন। মাঝে মাঝে তো এক হাতে পুশ আপ নিতেও বলে। অসম্ভব হলেও তার রুলস এটাই। কম সহজেই কি তাকে গাব্বার সিং নাম দিয়েছে এরা? একজন নতুন রিক্রুট তো সাহস সঞ্চয় করে সোজাসুজি বলেই বসল,
“স্যার আপনি এত তাড়াতাড়ি চলে আসলেন?আপনার ছুটি শেষ?”
তাজধীর থামল।চোখ তুলে তাকাল নির্লিপ্ত।
“কেন?আমি আসাতে খুশি হওনি তোমরা?”
ছেলেটা তোতলাতে তোতলাতে উত্তর করল মাথা নেড়ে,
“না-না স্যার! কী বলেন স্যার। আপনি আসলে আমরা খুশি হব না কেন! আমরা তো, আমরা তো আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম!”
পাশ থেকে আরেকজন যোগ করল,
“জি স্যার! আপনাকে অনেকদিন দেখি না খুব মিস করছিলাম!”
আরেকজন বাড়িয়ে বলল,
“আমরা তো বারবার স্যারদেরও জিজ্ঞেস করছিলাম—আপনি কবে আসবেন!”
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তিন বন্ধু মুখ চেপে হাসছে তখন। ভুলক্রমে ওরা ছাড় দিলেও তাজধীরে তরফ থেকে ছাড় পাওয়া অসম্ভব। তাজধীর পকেটে দুই হাত গুঁজে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপর রেশ টেনে বলল,
“তাই নাকি? এত মিস করছিলে আমায়?এত মিস করছিলে দেখেই তো তোমাদের ভালোবাসার টানে ছুটে আসলাম তোমাদের কাছে।”
“ভালোবাসা না, টর্চার!”
মনে মনে বললেও মুখে বলল,
“জিহ স্যার! আপনাকে দেখে সত্যিই খুব খুশি লাগছে আমাদের!”
পাশ থেকে বিড়বিড় করে একজন আরেকজনের কানের কাছে ঝুকে বলে যাচ্ছে,
“আজ থেকে হাত গুলোর এক্সট্রা কেয়ার রাখতে হবে। এতদিন আরামে থাকলে এবার এগুলোর উপর দিয়ে যে সোজা সুনামি, টর্নেডো, হারিকেন, সিডোর সব যাবে”
চলবে….
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনী মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি পর্ব ৬
-
ডেসটেনি পর্ব ২
-
ডেসটেনি পর্ব ৭
-
ডেসটেনি পর্ব ১২ (প্রথম অংশ)
-
ডেসটেনি পর্ব ১৬
-
ডেসটেনি পর্ব ৩
-
ডেসটিনি পর্ব ৫
-
ডেসটেনি গল্পের লিংক
-
ডেসটেনি পর্ব ১৫
-
ডেসটেনি পর্ব ১১