Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ডেসটেনি

ডেসটেনি পর্ব ১৬


ডেসটেনি [ ১৬ ]

সুহাসিনি_মিমি

“তবে একটাই কাপল সিট খালি আছে আপাতত। সেটায় করেই যেতে হবে আমাদের দুজনকে।”

লোকটার শেষক্ত বাণীতে বিস্ময়ে প্রিয়ন্তীর মুখটা হাঁ হয়ে রইলো কিছুপল। সিট্ পাওয়ার খুশিতে কীয়তক্ষণের জন্য মুখে যেই স্বস্তিটুকু ফুটে উঠেছিল? বিলীন হয়ে গেল তা এক নিমিষেই।গলায় ঝরে পড়ল প্রচন্ড অবিশ্বাসের সুর,

“মা মানে! কাপল সিট্?”

“জি,একটাই সিট। নিতে চাইলে এটাতেই যেতে হবে।আদারওয়াইজ কিছু করার নেই!”

প্রিয়ন্তী ভাঙা ভাঙা স্বরে ব্যক্ত করল,

“না মানে… আমি তো… আমরা… আলাদা কোনো, মানে দুজন একসঙ্গে কিভাবে?”

তাজধীর ভ্রু কুঁচকে নিরেট গলায় থামালো ও-কে,

“আপনি চাইলে আমি নেমে যেতে পারি। আপনি একাই চলে যান।এই বাস একই স্টানে নামবে। এখানে উঠলে ডিরেক্ট সেখানে গিয়েই থামবে।”

প্রিয়ন্তী সাথে সাথে আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না না! তা কেন হবে?”

“তাহলে আপনার কোনো সমস্যা নেইতো?”

উত্তরে প্রিয়ন্তী মৌন থেকেই ওড়নাটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলো গায়ে। চোখ সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,

“ঠিক আছে। যেহেতু আর কোনো অপশন নেই, তাই আমার কোনো আপত্তি নেই। কিছুক্ষনেরই তো ব্যাপার!”

হেলপার এসে ডেকে গেলো আরেকবার। তাড়া দিয়ে জানালো বাস ছেড়ে দিবে এখুনি। সবাইকে উঠে আসতে। কথামতোই বাসে উঠে এলো ওরা দুজন। হেলপার ওদের সিট দেখাতেই প্রথমে পর্দা সরিয়ে ভিতরে গিয়ে বসল প্রিয়ন্তী। তাজধীর একপাশে সরে দাঁড়ালো।

মোটা মোটা সাদা পর্দায় ঢাকা দুজনের শোয়ার উপযুক্ত একটুখানি জায়গায়। দু’পাশে ছোট ছোট কেবিনের মতো দুটো জয়েন করা বেড। নিচে পাতলা ম্যাট্রেস সেই সাথে পাশে ছোট ছোট বালিশ রাখা। মাথার কাছে একটা চার্জিং পয়েন্ট। প্রিয়ন্তী এসে জানালার পাশটায় ঘেঁষে বসল। বাইরে তখন রাতের মধ্যভাগ চলমান। প্রিয়ন্তী জানালার পর্দা গুলো টেনে রাখলো একপাশে। রাস্তায় থাকা স্ট্রিটলাইটের আলোয় দৃশ্যমান হয়ে উঠল ওদের সিটটুকু।

তাজধীর তখনো সিটের বাইরে দাঁড়িয়ে। গাড়ির বডির সঙ্গে একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় পেরিয়ে গেছে কয়েক মিনিট। হঠাৎই হেলপার ছেলেটা এসে দাঁড়াল পাশে।খানিকটা কাইকুই করে বলল,

“স্যার?”

তাজধীর তাকাতেই ছেলেটা একটু মুচকি হেসে বলল,

“মেডামের সাথে কি ঝগড়া হইছে নাকি?”

তাজধীর ভ্রু কুঁচকে বলল,

“মানে?”

“না মানে আপনি বাইরে দাঁড়ায়া আছেন, আর ম্যাডাম ভিতরে। তাই ভাবলাম ঢুকতে দিচ্ছে না নাকি?”

চোখ টিপে হাসল ছেলেটা। তাজধীর খানিকটা অস্বস্তিতেই পড়ল তাতে। এরা যে ওদের হাসব্যান্ড ওয়াইফ ভেবেছে বুঝতেই অস্বস্তিটা আরও গাঢ় হলো। গুরুগম্ভীরতায় আওড়াল,

“নাথিং লাইক দ্যাট!”

ছেলেটা মাথা নাড়ল। ঠোঁটের কোণে হাসির রেশটুকু অক্ষুন্ন রেখেই বলল ফির,

“আচ্ছা আচ্ছা বুঝছি স্যার। তবে আপনাকে সিটে গিয়ে বসতে হবে যে স্যার। স্লিপার কোচ তো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে বুঝেনিতো অন্যজনের প্রব্লেম হবে!”

বলেই ছেলেটা আর দাঁড়িয়ে থাকলোনা। ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসল। তাজধীর নীরবে শ্বাস ছাড়ল একটা। একি মুসিবতে জড়িয়ে গেছে সে। অতঃপর
না চাইতেও হাত বাড়িয়ে পর্দাটা সরাল। ঢুকল ভিতরে।
প্রিয়ন্তী জানালার দিকে তাকিয়ে এক ধ্যানে বসে আছে। তাজধীর ভেতরে ঢুকে এক মুহূর্ত থামল।
এসে বসল ঠিক মেয়েটার মুখোমুখি হয়ে। মাঝখানে দুজনের মধ্যে সিটের দৈর্ঘ্যতা অনুযায়ী দূরত্ব।

ওদিকে আলগা হয়ে যাওয়া ওড়নাটা তাজধীরকে ঢুকতে দেখেই তড়িঘড়ি শরীরের সঙ্গে শক্ত করে পেঁচিয়ে নিল প্রিয়ন্তী।তাজধীর চোখ সরিয়ে নিল তৎক্ষণাৎ। এভাবেই কাটলো বেশ কিছুটা সময়।
তাজধীরের কাছে বিষয়টা খানিকটা অস্বস্তিকর লাগলেও—প্রিয়ন্তীর কাছে ঠিক উল্টোটাই মনে হচ্ছে। ওর বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে আসছে। বরংচ মনে হচ্ছে এই পথটুকু যেন শেষ না হোক। অনন্তকাল জুড়ে বয়ে চলুক এই গন্তব্য। ইশ! ঘড়ির কাটায় সময়টা যদি থেমে যেত!তাহলে কি ও এভাবেই ওর এই নিরামিষ কমান্ডার টাকে দেখতে পেতো?

তাজধীর না তাকালেও প্রিয়ন্তী এক মুহূর্তের জন্য ও চোখ সরাতে পারছে না । মৃদু আলোয় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তাজধীরের দিকে। বাসের ভেতরের লাইটটা অফ করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। পর্দা সরানো থাকায় বাইরের রাস্তার আলো মাঝে মাঝে এসে পড়ছে ওদের উপর—কখনো স্পষ্ট, কখনো আধো অন্ধকার হয়ে বেসে উঠছে প্রিয়তমর মুখটা।

এই আলো-ছায়ার খেলায় লোকটাকে যেমন আরও অন্যরকম লাগছে। হঠাৎই তাজধীর চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনার।অমনি চট করে দৃষ্টি সরিয়ে নিল প্রিয়ন্তী। অস্বস্তি কাটাতে পেছনে থাকা বালিশ দুটো থেকে একটা টেনে নিয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আপনি চাইলে একটু হেলান দিয়ে বসতে পারেন। আরাম লাগবে।”

বিনাবাক্যয় বালিশটা ওর হাত থেকে নিয়ে বাসের বডির সঙ্গে হেলিয়ে রেখে একটু আরাম করে বসল তাজধীর। প্রিয়ন্তী লোকটার নড়াচড়া, বসার স্টাইল সবকিছুই দেখল।

সময় গড়াতে লাগল। প্রিয়ন্তী জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখে ঘুম এসে ভর করেছে—নিজেও বুঝতে পারেনি মেয়েটা। তাইতো ঘুমের কাছে হার মেনে মাথাটা কাত হয়ে এলো একটা সময়।
একটু একটু করে হেলে পড়ে একটা সময় গভীর ঘুমিয়ে ঢলেও পড়ল।

ওদিকে তাজধীরও কিছুক্ষণ পর চোখ বন্ধ করেছিল।
ক্লান্তি থাকায় সময়ের স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে কেবলই চোখ দুটো লেগে এসেছিলই অমনি পায়ের উপর কোনো কিছুর স্পর্শে চট করে চোখ খুলে তাকাল সে।
আর তাকিয়েই—থমকে গেল পুরো। তার উরুর ওপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছড়িয়ে আছে প্রিয়ন্তীর দুটো পা। মেয়েটা পুরো শরীরটা ছেড়ে এক কাত করে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে অজান্তেই। বাইরের রাস্তার স্ট্রিট লাইটের আলো ক্ষণে ক্ষণে ভেসে এসে সেই দৃশ্যটাকে স্পষ্ট করে তুলছে আরও। নরম, ফর্সা মেয়েলি দুটো পা উঠিয়ে দিয়েছে তাজধীরের উরুর উপর। তাজধীরের দৃষ্টি আটকে রইল কয়েক সেকেন্ড।তারপর হঠাৎই চোখ তুলে তাকাল প্রিয়ন্তীর দিকে।
আর তাতেই যেন ঘটলো আরও মোহা অঘটন। মেয়েটার মাথার ওপর থাকা জর্জেটের ওড়নাটা সরে গিয়ে একপাশে পড়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল ছুঁয়ে আছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রমণী থেমে থেমে শ্বাস নিচ্ছে। তাজধীর ঝট করে সরালো নিজের দৃষ্টি। বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি জমে উঠছে তার।হাঁসফাঁস লাগছে, অস্থির লাগছে ব্যাপক। হঠাৎ কেন এমনটা লাগছে সে নিজেও বুঝতে পারছেনা।

একটা মেয়ে মানুষ পাশে শুয়ে আছে দেখে কি? অতশত ভাবতে চাইলো না তাজধীর। আপাতত এখানে থাকা যাবেনা এটাই সিউর। মনে মনে এটাই ধাতস্ত করে ভাবল উঠে দাঁড়াবে। তবে উঠে যেতে চাইলে তো মেয়েটার পা দুটো সরাতে হবে। আর যদি তাতে মেয়েটার ঘুম ভেঙে যায়? এই চিন্তাতেই থেমে দাঁড়ালো।শুষ্ক গলায় কয়েকবার ঢোক গিলল তাজধীর। তারপর অতি সপ্তপর্ণে হাত বাড়াল—
প্রিয়ন্তীর পা দুটো আলতো করে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য। আশ্চর্য! তার হাত দুটো অভাবে কাঁপছে কেন হঠাৎ। সেলোয়ারটা অনেকটা পায়ের গোড়ালি থেকে উপরে উঠে থাকার দরুন ফর্সা মেয়েলি ত্বক উঁকি দিচ্ছে।

তাজধীর নিজেই হতভম্ব।সামান্য পা স্পর্শ করতেই তার হাত কাঁপছে এভাবে ? এত এত মিশন,
অপারেশন, ঝুঁকি, বিপদ—সব সামলাতে পারে যে মানুষ—আজ কিনা সামান্য একটা মেয়ের পা ছোঁয়ার সময় তার হাত এভাবে থরথর করে কাঁপছে?ছেহ!তার বন্ধুরা যদি জানতে পারে এই ঘটনা তাহলে থাকবে তার মান সম্মান?

একপর্যায়ে নিজের উপরই বিরক্ত হলো সে।মনে মনে কঠিন স্বরে বলল নিজেকে নিজেই,

“ফোকাস, তাজধীর। ইউ ক্যান দু ইট ব্যাটার! এ্যা! ফার ব্যাটার!”

পরপর বড় করে একটা শ্বাস ছাড়লো সে। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। হাত মুঠো করে ছাড়ল বারকয়েক। যে কিনা এত এত দেশদ্রোহী মেরে নিজের হাত র ক্তাক্ত করে বেড়ায় তার হাত কাঁপছে একটা মেয়ের পা স্পর্শ করতে গিয়ে? এখন ওর বন্ধুরা থাকলে নির্ঘাত এটা বলে মজা নিতো? কে হাত ছাড়া করবে এই সুযোগ?

তাজধীর এবার আরও কঠোর হলো।
খুব সাবধানে একদম আলতো করে—প্রিয়ন্তীর পা দুটো নিজের রান থেকে সরিয়ে দিল পাশে।মেয়েটার পা আরেকটু,মিনিমান আর কয়েক ইঞ্চি এদিক সেদিক হলেই পা দুটো ঠিক কোথায় গিয়ে লাগতো ভাবতেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠে এই কঠোর ব্যক্তিত্ববান মানুষটারও।


বাইরের ফিকে, ধূসর ভোরের আলোটুকুতে পিটপিট করে চোখ তুলে তাকালো প্রিয়ন্তী। কয়েক সেকেন্ড থম মেরে বসে থেকে হুঁশ ফিরল। জানালার বাইরে তাকাতেই বুঝল—ভোর হয়ে গেছে। চারপাশে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। তড়িৎ তাকালো আশেপাশে। কেউ নেই। আশ্চর্য লোকটা কোথায়? চলে গেল নাকি? পরপর নিজের অবস্থার দিকে তাকিয়ে থমকালো,ভরকালো মেয়েটা। সে পুরোটা লম্বা হয়ে শুয়ে ছিল এতক্ষন। লোকটা তো ঠিক অপর পাশটাই বসেছিল।ওর পা দুটো ছড়িয়ে ঠিক তাজধীরের জায়গাটাতেই রাখা! মুহূর্তেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল ওর । তাড়াতাড়ি পা গুটিয়ে সোজা হয়ে বসে
তাড়াহুড়ায় বালিশের পাশে পড়ে থাকা ওড়নাটা তুলে মাথায় জড়িয়ে নিল পুনরায়। চুলগুলো ঠিক করল।
নিজেকে গুছিয়ে নিল যতটা সম্ভব। ততক্ষনে বাসটা এসে থামলো কোথাও। অমনি পর্দার বাইরে থেকে নক করে ডাকলো তাজধীর,

“মিস প্রিয়ন্তী, উঠে পড়ুন। আমরা চলে এসেছি।”

“জি আসছি!”

**

তাজধীর আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল নিচে। প্রিয়ন্তী নামতেই ইশারায় ওকে নিয়ে এগোলো সামনে। হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা কাছ ঘেঁষে বিড়বিড় করে বলে উঠল,

“আপনার ঘুমানোর স্টাইলটা বড্ড বাজে মিস ব্লু হাফমুন। পরপুরুষ পাশে থাকলে মেয়েদের কে এভাবে ঘুমাতে নেই।”

কথাটা বলেই সোজা হাঁটা ধরল সামনে। প্রিয়ন্তী প্রথমে কথার মানে ধরতে না পারলেও মস্তিষ্কে একটু প্রেসার দিতেই পানির মত স্বচ্ছ হয়ে উঠলো বিষয়টা।
লজ্জায় মরিমরি হয়ে উঠল তৎক্ষণাৎ মেয়েটা।
ঘুমালে যে দুনিয়ার কোনো হুঁশ থাকে না ওর!ছোট থেকেই ওর ঘুমানোর ভঙ্গি এরকম। শত চেষ্টায় ও আয়ত্তে আনতে পারেনি তা। ঘুমালে কি আর মানুষের হুস থাকে নাকি?

“এইইই প্রিয়!!!”

দূর থেকে চেনা গলা শুনতে পেতেই প্রিয়ন্তী মাথা তুলে তাকালো সেদিকে। পাভেল আর মিতালী আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে ওখানটায়। পাভেল দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়াল। ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল বোনকে,

“কিরে? ঠিক আছিস? ঠিকঠাক মতো আসতে পারছিস তো?”

“হ্যা ভাইয়া,ঠিক মতোই এসেছি!”

তারপর হঠাৎ মনে পড়তেই তড়িঘড়ি বলতে লাগল,

“আমার ফোন? আমার ব্যাগ ওসব কোথায়?নিয়েছো তো?”

মিতালী এগিয়ে বলল তখন,

“সব ঠিক আছে। ভাইয়া আমাদের ফোন করে জানিয়েছিল। আমরা নামার সময় সবকিছু নিয়েই নেমেছি।”

প্রিয়ন্তী একটু থমকে তাকাল তাজধীরের দিকে।
মিতালী আবার বলল,

“ভাইয়া ড্রাইভারের ফোন দিয়ে কল দিয়েছিলো আমাকে। বলল তোমাকে নিয়ে টেনশন না করতে। এরপরের বাসেই নাকি আসছো তোমরা!”

পাভেল তাজধীরের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ধন্যবাদ ভাই, সত্যি বলতেছি, আপনি না থাকলে আজকে ওরে নিয়ে টেনশনেই মরতাম আমি !”


বাসস্ট্যান্ড থেকে বের হওয়ার পরই প্রিয়ন্তী যখন শুনল—ওরা সরাসরি নিজেদের বাসায় যাচ্ছে না, বরং আবারও তাজধীরদের বাসায় যাবে তখন মনে হচ্ছিল, চাপা পড়ে থাকা একটা ভার একটু একটু করে সরে যাচ্ছে ওর শরীর থেকে। তাহলে আরও কিছু সময় এই মানুষটার কাছাকাছি থাকা যাবে! এমনটাই তো চেয়েছিলো ও।

সকাল প্রায় আটটার দিকে ওরা পৌঁছালো সিদ্দিক কুঞ্জয়। তড়িঘড়ি এসে দরজা খুলে দিলেন মোহনা বেগম। ছেলে মেয়ে আসার খুশিতে খুব ভোরে উঠেই নাস্তা বানানোর কাজে লেগে পড়েছেন ভদ্রমহিলা।

“আহা, এসে গেছিস তোরা ? শুনলাম তোরা নাকি বাস মিস করেছিলি? ঠিকঠাক মত আসতে পারছিস তো?”

“আগে ফ্রেশ হয়ে আসি আম্মু?”

মিতালীর কথায় ভদ্রমহিলা সায় দিয়ে বললেন,

“যা যা। জামাই বাবাকে নিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেতে আয়। আমি ততক্ষনে টেবিলে নাস্তা লাগাচ্ছি। আযান, প্রিয়ন্তী তুমি ও যাও মা। ফ্রেশ হয়ে নাও গিয়ে । তারপর নাস্তা করো এসে ।”

কিছুক্ষনের মধ্যেই পুনরায় সবাই একত্রিত হলো।
টেবিল ভর্তি নাস্তা সাজানো সামনে। একে একে চেয়ার টেনে বসল সবাই। তাজধীর বের হয়ে যাবে নাস্তা শেষেই। মোহনা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন

“বাবা, আজকেই চলে যাবি নাকি?”

তাজধীর মাথা নাড়ল,

“হুম। দশটার মধ্যে রওনা দিতে হবে।”

পাভেল সাথে সাথে বলল,

“এত তাড়াতাড়ি? অন্তত একটু রেস্ট করবেন না ভাই?”

“এতদিন করেছিনা!ওতেই এনাফ।”

প্রিয়ন্তী চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল আগে। তবে ও উঠার আগে তাজধীরের ফোন আসলে সে উঠে চলে যায়।


বেলা তখন প্রায় দশটা ছুঁইছুঁই। ড্রয়িংরুমে সোফার এক কোণায় বসে আছে প্রিয়ন্তী। হাতে টিভির রিমোট, কিন্তু মনটা ওরমোটেও টিভির স্ক্রিনে নেই। শুনেছে লোকটা বেরিয়ে পরবে একটু পরেই। বাইরে গিয়েছে কিছু কাজে। অমনি ডোর বেল বাজতেই কাজের মেয়েটি দরজা খুলে দেয়। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে তাজধীর। হাতে একটা ফাইল জাতীয় কিছু ধরা। বেরিয়ে পড়বে কিছুক্ষনের মধ্যেই।প্রিয়ন্তী অবচেতনে মাথা তুলল।তাকালো সামনে। নেভি ব্লু রঙের ফরমাল স্যুট তার ভিতরে ফকফকে সাদা শার্ট জড়ানো লোকটার গায়ে। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। চোখেমুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য অটুট রেখেই এগিয়ে আসছে সামনে। লোকটাকে এই ভেসে দেখে প্রিয়ন্তীর হাত থেকে রিমোটটা কখন ফসকে সোফার উপরে পড়ে গেছে সেই হুস নেই মেয়েটার। ওর ওই অবাধ্য চোখ দুটো সরাতেই পারছে না। আচ্ছা এই সুদর্শন ব্যক্তিটার সাথেই সে গতকাল পুরো রাত কাটিয়েছে? একই সিটে? বিষয়টা কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছে না?

তাজধীর সোজা এসে দাঁড়াল ড্রয়িংরুমে। মোহনা বেগম তখন পাশের রুম থেকে বের হচ্ছিলেন।ছেলেকে দেখে এগিয়ে এলেন তিনি। ছেলে তার রেডি হয়ে বেরিয়েছে মানে চলে যাবে এক্ষুনি। অমনি চোখে পানি এসে টইটুম্বুর হলো মায়ের। আরও কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ছেলের নিকট। তাকালেন মায়ের মমতাময়ী ওই কাতর চোখ দুটো দিয়ে।

“চলে যাচ্ছিস বাবা?”

“আম্মু! এক কথা আর কতবার রিপিট করবে?ডিউটি আমার এটা। যেতে তো হবেই!”

“ডিউটি, ডিউটি সবই বুঝি,কিন্তু আমার কথাটাও একটু বুঝ।”

ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন,

“তুই এভাবে আর কতদিন থাকবি বল তো? মাসের পর মাস বাইরে থাকিস, দূরে থাকিস। মন চাইলে মাঝে মাঝে আসিস দুদিনের জন্য। আবার চলে যাস। এইবার তুই চলে গেলে মিতু ও চলে যাবে। আমি একা এই বাড়িটায় থাকবো কি করে বলতো? আমার কথাটা অন্তত একবার চিন্তা করে দেখ। তুই চলে গেলে আবার সেই আগের মতো দিন গোনা শুরু হবে আমার। কবে আসবি, কবে আবার দেখবো তোকে?আদৌ আসবি কিনা!”

তাজধীর একটু নরম হলো এবার। বলল,

“আম্মু… প্লিজ।”

মোহনা বেগম হাত তুলে থামালেন।বললেন,

“না, আজকে আমার কথা শুনবি তুই।পুরোটা শুনে তারপর যাবি। তুই বিয়ে করনা বাবা?আর কতদিন এভাবে একা থাকবি? আমারও তো বয়স হচ্ছে। কতদিন আর এভাবে থাকবো আমি?একটা মেয়ে আসলে আমার আর একা লাগবেনা। মেয়েটা আমার মিতু হয়ে আমার আশেপাশে থাকবে সবসময়। আমার এভাবে একা বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসবে বাবা। বাড়িতে একটা টুকটুকে বউ এলে তখন বউয়ের টানে ঠিকই মাসের পর মাস ছুটে ছুটে আসবি। দেখিস।

“তুই শুধু একটাবার বল। আমি অন্তত মেয়ে দেখা শুরু করি। বলছি না এখনই বিয়েটা কর। আমার মেয়ে পছন্দ হলে এরপর নাহয় তুই এসে দেখে পাকা কথা বলিস? তোর পছন্দ না হলে তো আমরা জোড় করবোনা। কোনোদিন জোড় করেছি তোকে কোনো কাজে? শুধু একটা বার মত দেনা বাবা?মায়ের অনুরোধ টুকু রাখবিনা?নাকি তোর অন্য কাউকে পছন্দ? পছন্দ করিস কাউকে? শুধু মেয়েটা কে সেটা বল আমি নিজেই সম্মন্ধ নিয়ে যাবো সেখানে!”

মোহনা বেগমের প্রতিটা কথাই ছুরির ফলার মত সোফায় বসে থাকা প্রিয়ন্তীর বুঁকের মধ্যে গিয়ে লাগছে। এতটা সময় দম খিচে বন্ধ করে বসে রয়েছে প্রিয়ন্তী। অপেক্ষা করছে লোকটা ঠিক কি বলে? ওর বান্ধবী শ্রেয়া তো বলেছিলো লোকটা ওকে পছন্দ করে। ভালোওবাসে। এটাও তো বলেছিলো দেখবি লোকটা একদম সোজা তার পায়ের কাছেই বিয়ের কথা জানাবে? ইশ! লোকটা কি তাহলে এখন ওর নাম উচ্চারণ করবে? বলবে হ্যা সে বিয়ে করতে চায়? তার একজন কে পছন্দ আছে অলরেডি? বলবে প্রিয়ন্তীর নামটা? হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে এলো অজান্তেই।

তাজধীর এতক্ষণ চুপ করেই শুনেছে মায়ের প্রতিটা আবদার।অবশেষে ভাঙে সে নীরবতা,

“তুমি যা বলছো সেটা আমি বুঝি আম্মি। তুমি একা থাক, কষ্ট হয়—সেটাও আমি জানি।কিন্তু প্রয়োজনে তোমায় আমি আরও দুটো ছোট ছোট মেয়ে এনে দিবো। যারা তোমার খেয়াল রাখবে পাশাপাশি বাড়ির ও খেয়াল রাখবে। তবে বিয়ে—এই জিনিসটা আমি এখন করতে চাই না আম্মু। এখন কেন কখনো জড়াতে চাইনা এসব সম্পর্কে। আমার লাইফটা তুমি জানো। আজ এখানে… কাল ওখানে… কখন কোথায় থাকতে হয়—নিজেও জানি না।এই লাইফে কাউকে এনে রেখে তার প্রতি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারবো—এই কনফিডেন্সটা আমার নেই। শুধু বিয়ে করলেই তো দায়িত্ব শেষ না। একটা মানুষকে সময় দিতে হয়, গুরুত্ব দিতে হয়, পাশে থাকতে হয়। যে মানুষটা আমার নামের সঙ্গে জুড়ে আমার ঘরে আসবে তারও তো কিছুটা এক্সপেকটেশন থাকবে আমাকে নিয়ে তাইনা?সেসব আমি ফুলফিল করতে পারবোনা আম্মু। আমার সঙ্গে এসব যায়না। যেভাবে আছি পারফেক্ট আছি। না আমার কোনো মেয়ে পছন্দ আর না আমি কারো আশায় পথ চেয়ে বসে আছি।”

মোহনা বেগমের চোখে জল জমে উঠেছে।তিনি সেটুকু মুছে বললেন,

“তাহলে তুই সারাজীবন এভাবেই থাকবি?”

“সারাজীবনের কথা বলছি না। কিন্তু এখন… না।”
যেদিন মনে হবে আমি প্রস্তুত সেদিন নিজেই আগে তোমাকে জানবো। তখন তুমি যাকে ভালো মনে করো দেখো।”

মোহনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।আর কিছু বললেন না।কিই বা বলবেন তিনি? এই ছেলে শুনবে সেসব? চোখের পানি যাকে টলাতে পারলো না, নরম করতে পারলো না তাকে আর কি দিয়ে আটকাবেন তিনি?

ওদিকে সোফায় বসে থাকা প্রিয়ন্তীর মনে হচ্ছিলো ওর নরম, স্বচ্ছ হৃদয়টাকে মাত্রই কেউ একদম বিশ্রী ভাবেই ভেঙে চুরে খন্ড বিখন্ড করে দিয়েছে।একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।লোকটা বিয়ে করতে চায় না? কমিটমেন্টে বিশ্বাস করে না?
তাহলে—তাহলে এতদিন যা হয়েছে সেগুলো কি ছিল?
বারবার মজা করে, ইঙ্গিত করে—ওকে “নিজের বাচ্চার মা” বলা। ওর দিকে ওইভাবে তাকানো,
ওর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলা। সবকিছু থেকে ঐভাবে প্রটেক্ট করা সেসব? সেসব কি ছিল?
এসব কি শুধুই মজা ছিল?নাকি—ও-ই ভুল বুঝেছে?
প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তৎক্ষণাৎ। ও তো এমন না।সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখা মেয়ে। ছেলেদের থেকে দূরে দূরে থাকা একটি মেয়ে। নিজেকে সামলে চলা, কখনো কোনো ছেলের জন্য—এভাবে অনুভব করেনি কিছুই। কোনোদিন ও না। কিন্তু এই মানুষটা—অজান্তেই ওর ভেতরে কিছু একটা তৈরি করে দিয়েছে।একটা টান,একটা দুর্বলতা বানিয়ে নিয়েছে নিজের প্রতি। আর আজ একটা বাক্যেই সবকিছু অস্বীকার? তাহলে ওর অনুভূতিগুলোর কি হবে?এভাবেই শেষ হয়ে যাবে ?না!এভাবে শেষ হতে পারে না।

প্রিয়ন্তীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।চোখে অদ্ভুত এক জেদ ফুটে উঠল। সে চুপ থাকবে না। যদি লোকটা সত্যিই কিছু না ভাবত—তাহলে এতদিন এভাবে কেন ব্যবহার করল ওকে ?কেন ওর মনে এমন অনুভূতি তৈরি হতে দিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ওর দরকার।সে নিজের অনুভূতিটাকে এভাবে মাটিচাপা দেবে না।আর সবচেয়ে বড় কথা—লোকটা আজ চলে যাচ্ছে।কবে আসবে—জানা নেই।আবার দেখা হবে কিনা—সেটাও অনিশ্চিত। হতে পারে এখানেই ওদের শেষ দেখা।


প্রিয়ন্তীর শক্তি অবশিষ্ট রইলো না আর ওখানে ওভাবেই বসে থাকার। তাইতো উঠে এলো সেখান থেকে। প্রথমে ভাবল লোকটাকে প্রত্যক্ষ ভাবে জিজ্ঞেস করবে, জানতে চাইবে সমস্ত প্রশ্নোর উত্তর। তবে পরোক্ষনে কি ভেবে যেন সিদ্ধান্ত পাল্টালো। ঠিক করল বাইরে যাবে একটু। সেই ভেবেই মিনিট পাঁচেকের মাথায় রেডি হয়ে নিচে নামল দ্রুত। ততক্ষনে তাজধীর কে বিদেয় দিয়ে এসেছে গেইট অব্দি ওর পরিবার। প্রিয়ন্তী তাড়াহুড়ায় দ্রুত নিচে নেমে এগোলো গেইট বরাবর। লোকটা কারো সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ফোনে। পিছন থেকে ডেকে উঠল মিতালী তখন,

“আরেহ প্রিয় কোথায় যাচ্ছ আবার?”

“একটু মোড়ের গলিতে যাবো ভাবি। একটু দরকার আছে!”

মিতালী চলে গেল ভিতরে। তাজধীর ফোন নামিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে বলল তখন,

“আমিতো ওইদিক দিয়েই যাচ্ছি, আসুন যাওয়ার পথে আপনাকে ড্রপ করে দিয়ে যাই!”

এতক্ষনে দমিয়ে রাখা রাগটুকু তড়বড় করে উগরে এলো বাইরে। চোখ মুখ খিচে ফোঁসফোঁস করে বলে উঠল প্রিয়ন্তী,

“কেন? আমার পা নেই? নাকি মুখ নেই? আমি একা যেতে পারবো না ? ছোট বাচ্চা আমি যে হারিয়ে যাবো? আর আপনি না মেয়েদের থেকে দূরে দূরে থাকেন। তাহলে এখন এমন আলগা দরদ দেখাতে এসেছেন কেন? আমি বলেছি একবারও আপনায় হেল্প করতে?”

তাজধীর ভ্যাবাচেকা খেয়ে ভ্রু তুলে বলল,

“মানে? হোয়াট আর ইউ টকিং এবাউট?জাস্ট ড্রপ করতেই তো বলেছি? এভাবে রিয়েক্ট করার কি হলো? স্ট্রেঞ্জ!”

প্রিয়ন্তী ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে অকপটে বলে উঠল,

“আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে!সময় হবে আপনার?”

তাজধীর হাতঘড়ির দিকে তাকাল এবার। পরপর ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“হবে। কিন্তু একটু দ্রুত বলবেন? আমার টাইম খুব লিমিটেড।”

এই তাড়াহুড়োটাই যেন প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিল।তবুও—সে নিজেকে সামলাল।গভীর করে একটা শ্বাস টানল। প্রিয়ন্তী ছোটবেলা থেকেই এমন স্বভাবের। ভিতর থেকে রাগ, ক্ষোভ, অভিমান টুকু বেশিদিন প্রশ্রয় দিতে পারেনা মেয়েটা। একটুও টেনশন নিতে পারেনা। অমনি অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বর আসে। খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়। ঠিক এখন যদি নিজের প্রশ্ন গুলোর যথার্থ উত্তর খুঁজে না পায় দেখা যাবে দুদিনের মাথায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে নিশ্চই। এসব ভেবেই নিজেকে শক্ত করল খুউব। বিসর্জন দিলো নিজের আত্মওহমিকার। গলার স্বর টানটান করে বলল,

“আপনি কি আমাকে পছন্দ করেন না?”

প্রশ্নটা হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো মুখ থেকে। তাজধীর ভ্রু কুঁচকে তাকালো।পরপর একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“আপনাকে অপছন্দ করার কোনো কারণ তো দেখছি না, মিস প্রিয়ন্তী।”

“আমি ওইভাবে বলছি না।”

“তাহলে?”

“ওই পছন্দ নয়। অন্যভাবে,অন্যভাবে পছন্দ করেন না আমায়? “

তাজধীর এবার একটু থামল।সন্দীহান হয়ে আওড়াল,

“মানে?”

প্রিয়ন্তী আর ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলল না।বললো
সোজাসুজি,স্পষ্ট,

“আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন না?আমার প্রতি আপনার কি কোনো সফট কর্নার তৈরি হয়নি?”

তাজধীর সত্যিই অবাক হলো এবার। কিন্তু সেটা পুরোপুরি প্রকাশ করল না। ভ্রু কুঁচকে, একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

“আপনার মাথায় হঠাৎ এইসব উদ্ভট প্রশ্ন আসছে কেন?”

“উদ্ভট?আপনার কাছে এটা উদ্ভট প্রশ্ন মনে হচ্ছে?”

থেকে বলল আবারও,

“আপনি জানেন আমি কতক্ষণ ধরে নিজেকে ধরে রেখে এসব বলতে এসেছি? আপনি কি জানেন—আমি এমন মেয়ে না, যে হুটহাট কারো সামনে দাঁড়িয়ে এসব প্রশ্ন করে বেড়াবো নিজের ইগো স্যাক্রিফাইস করে ?কিন্তু আপনি আমাকে সেই জায়গায় নিয়ে এসেছেন।আপনি বারবার এমনভাবে কথা বলেছেন… এমনভাবে আচরণ করেছেন—যেন…”

থামল প্রিয়ন্তী। গলা শুকিয়ে গেছে। এক সেকেন্ড চোখ নামাল।আবার তাকাল।বলতে লাগল,

“যেন আমি আপনার কাছে… স্পেশাল।তাহলে এখন বলছেন—আপনি বিয়ে করবেন না। কোনো কমিটমেন্ট চান না তাহলে এতদিন যা করেছেন—সেগুলোর মানে কি?আমাকে এভাবে অনুভব করালেন কেন?”

“আপনি হঠাৎ এসব ভাবছেন কেন, মিস প্রিয়ন্তী?
আমি তো আপনার সঙ্গে ওইভাবে কখনো কোনো কমিটমেন্টে যাইনি। আর না এমন কোনো ইঙ্গিত দিয়েছি… যেখান থেকে আপনার এমন অনুভূতি তৈরি হওয়ার কথা?”

অত্যন্ত সিরিয়াস হয়ে প্রশ্নটা করল তাজধীর। প্রিয়ন্তী আগের ন্যায় বলে গেল,

“তাহলে এগুলোর মানে কি?”

তাজধীর এবার একটু গম্ভীর হলো। গম্ভীর স্বরে প্রত্তুত্তর করল পরপর,

“বি সিম্পল।আপনি একটা ম্যাচিউর মেয়ে হয়ে হঠাৎ এভাবে ইম্যাচিউরের মত কথা বলছেন কেন?আর তাছাড়া আপনার আর আমার সম্পর্কটাই তো ওইরকমই—তাই না?আপনি আমার বোনের ননদ। সম্পর্কের হিসেবে আপনি আমার বেয়াইন।বেয়াইনের সাথে একটু-আধটু মজা করা—আই থিংক ইটস নরমাল। ওয়েট… আপনার কি সত্যিই মনে হয়েছে আমি সিরিয়াসলি ওইসব বলেছি?যদি আপনার এমন মনে হয়ে থাকে—অনেস্টলি, আই’ম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট।আমি কখনোই আপনাকে ওইভাবে কিছু মিন করে বলিনি। আপনি প্রথমে আমার সাথে মজা করেছেন… আমি রিটার্নে করেছি। এটুকুই।এইটার জন্য এটা ভাববেন না যে আমি আপনার সাথে কোনো খেলা খেলেছি বা প্রতিশোধ নিয়েছি।আই জাস্ট… এনজয়ড দ্য মোমেন্ট। একটা লাইট মজা।দেটস ইট!”

“দেখুন, মিস প্রিয়ন্তী।আপনার যদি সত্যিই মনে হয়ে থাকে আমি আপনাকে হার্ট করেছি… বা আমার জন্য আপনার ভেতরে এমন কোনো অনুভূতি তৈরি হয়েছ
তাহলে আমি এক্সট্রিমলি সরি।কারণ… আমি কখনোই আপনাকে ওই নজরে দেখিনি।আপনাকে আমি কখনো স্পেশাল হিসেবে ট্রিট করিনি।আপনি চাইলে বলতে পারেন—সিলেটে যা যা হয়েছে…আপনার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে থাকলেও—আমি একইভাবে হেল্প করতাম, একইভাবে অ্যাপ্রিশিয়েট করতাম।তারপরও যদি মনে হয় আমি ভুল করেছি… আপনাকে কোনো নেগেটিভ সাইন দিয়েছি—তাহলে আমি সত্যিই দুঃখিত। প্লিজ আমাকে মাফ করে দিবেন।”

একদমে কথাগুলো বলে থামে তাজধীর। পরপর তাকায় এলার্ম দেয়া ঘড়িটায়। টুট টুট শব্দ করছে হাতের যান্ত্রিক ডিভাইস টা। তাজধীর এবার একটু গরম হয়েই বলল,

“জিহ আর কিছু বলবেন?”

প্রিয়ন্তী নিঃসব্দে মাথাটা নাড়াল কেবল। তাজধীর একটা বড় করে স্বাস ছাড়ল অগোচরে। এরপর উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরল গাড়ির অভিমুখে। ড্রাইভার কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,

“ম্যাডাম কে পৌঁছে দিন কোথায় যেতে চায়!”

“আপনি যাবেন না স্যার?”

“আমার গাড়ি আসছে এখানেই।”

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply