Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ডেসটেনি

ডেসটেনি পর্ব ১৪


ডেসটেনি [ ১৪ ]

সুহাসিনি_মিমি

“হবেনা? আমার তাজধীর ভাই পরপর দুই দুইবারের “BWF”ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্যাডমিন্টনে!”

হীরার মুখ থেকে কথাটা বেরোতেই চারপাশেই শুরু হলো কীয়তক্ষণের নিস্তব্ধতা। সরাসরি “BWF ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন!এটা কি কোনো সাধারণ বিষয়?নাহ! এটা মোটেও কোনো সাধারণ বিষয় না। কতশত তরুণ, যুবকের স্বপ্ন এটা। একবার সেই ট্রফি হাতে নিয়ে চুমু খাওয়া। সবথেকে বড় কথা বাংলাদেশ পেরিয়ে সোজা বিদেশের মাটিতে গিয়ে উইন হয়ে সেই মর্যাদা অর্জন করা চারটিখানি কথা নয়।

পাভেল অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল তাজধীরের দিকে। হাসিব ঠোঁট চেপে মুচকি হাসছে। সে বিষয়টা জানে দেখেই তো তখন পাভেল কে ওয়ার্ন করেছিল। মিতালী আগে থেকেই জানার সুবাধে ততটাও অবাক হয়নি। অন্যদিকে প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল যেন। এই লোকটা সত্যিই ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন! ওর চোখ দুটো আশ্চর্যে বড় বড় হয়ে আছে। তাকিয়ে আছে তাজধীরের দিকেই। লোকটা তখনও বড্ড স্বাভাবিক। না কোনো গর্ব, না কোনো বাড়াবাড়ি কিছুই খুঁজে পেলোনা প্রিয়ন্তী লোকটার মধ্যে।পাভেল এবার এক ধাপ এগিয়ে এসে বিস্ময় মাখা গলায় বলল,

“সিরিয়াসলি ভাই? আপনি তো কিছুই বললেন না এতক্ষণ!”

“বলবার মতো তো কিছু মনে হয়নি।”

একদম শান্ত,স্বাভাবিক নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর। এই নির্লিপ্ত উত্তরটাই সবাইকে আরও বেশি অবাক করে দিল যেন।পাভেল প্রথমে কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই চোখ কপালে তুলে বলল,

“এক মিনিট, মানে—আপনি সিরিয়াসলি বলছেন ভাই? আপনি আসলেই “BWF ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন?”

তাজধীর খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল,

“হুম।”

এই “হুম” টুকুই যেন আরও বড় ধাক্কা হয়ে এলো পাভেলের কাছে।ছেলেটা ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না ভাই, এটা কিন্ত অন্যায় করা হয়েছে আমাদের সঙ্গে!আমরা দুইজন মিলে হাপিয়ে গেলাম, আর আপনি একা দাঁড়িয়ে আমাদেরকে হারালেন! এখন বুঝতেছি—আমরা আসলে কার সাথে খেলতেছিলাম। এমনটা জানলে জীবনেও আপনার সঙ্গে খেলার নাম নিতাম না!”

হাসিব এবার হেসে বলল,

“আমি প্রথমে বললে হয়তো তুমি বিশ্বাসই করতে না! তাই চুপ ছিলাম।”

পাভেল অতি আশ্চর্য হয়ে শুধাল,

“আমার তো এখনো বিস্বাস হচ্ছেনা। হায় আল্লাহ, আমি তো দেখছি ক্লাস ফাইভের অনুপম গাইডের সঙ্গে ঘুরছি আমরা। অল ইন ওয়ান!’

হীরা গর্বে ঝলমল করে উঠল তখন,

“শুধু চ্যাম্পিয়ন না—পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আমার তাজধীর ভাই! এটা কিন্তু সোজা কথা না!”

প্রিয়ন্তী চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনলো পরপর কথাগুলো। সবার মুখ থেকে লোকটা সম্পর্কে প্রশংসার বন্যা বয়ে গেলেও এই মেয়েটার মুখ থেকে বের হওয়া সামান্য কথাটুকুতেই ভিতরটা অস্বস্তিতে টইটুম্বুর হলো প্রিয়ন্তীর।এই হীরা নামের মেয়েটির উপস্থিতিতে বরাবরই এক অকারণ জ্বালা বয় ওর অন্তরে।
নিজের অজান্তেই চোখ দুরো আবার হীরার দিকে চলে গেল। মেয়েটা এখনো তাজধীরের পাশে দাঁড়িয়ে। হেসে হেসে কথা বলছে। বলেই যাচ্ছে। থামার আর কোনো নাম গন্ধ নেই। লোকটার সঙ্গে চিপকে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন ওটাই ওর কমফোর্ট জায়গা। পাশেই তো নিজের ভাই দাঁড়িয়ে আছে। কই তার সঙ্গে তো এমন চিপকে দাঁড়ায়না। আর লোকটাও কেমন নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে। আশ্চর্য!

পাভেল তখনো নিজের উত্তেজনা থামাতে পারছে না।হাস্যত্মক গলায় তাজধীর কে উদ্দেশ্য করে আওড়াল,

“ভাই, একটা সেলফি তো নিতে হবে আপনার সাথে!যাতে বাড়ি ফিরে বন্ধুদের বলতে পারি আমি একদিন এক ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নের সাথে খেলছি!”

বলেই হাসতে হাসতে ফোন বের করল পাভেল।
হাসিব বলল,

“এইটা তো তাহলে তোমার লাইফের হাইলাইট হয়ে যাবে পাভেল!”

“অবশ্যই!এই সুযোগ কি বারবার আসে নাকি!”

বলেই সবাই হু হ্যা শব্দতে ফেটে পড়ল একপল। শুধু প্রিয়ন্তী বাদে। মেয়েটা তখনো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। ইতিমধ্যে হীরা মেয়েটি হালকা ঝুঁকে তাজধীরের হাতে একটা ঠান্ডা পানির বোতল ধরিয়ে দিয়েছে। তাজধীর হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিতে গেলে মেয়েটা আবার নিজ নিজেই বোতলের ছিপিটা খুলে এগিয়ে দিলো। তাজধীর ও বিনা বাক্যয় এগিয়ে নিয়ে ঢকঢক করে খেলো পানিটুকু।শুধু এতটুকুতেই থেমে নেই মেয়েটা। তাজধীর পানি খাওয়া শেষ করতেই মেয়েটা হাত থেকে একটা টিস্যু বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“তাজধীর ভাই ঘামটা মুছে নিন। রিফ্রেস লাগবে।”

প্রিয়ন্তীর আঙুল মুঠো হয়ে এলো অজান্তেই। মনে মনে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে,

“এতটা আপন ভাব কোথা থেকে আসে মেয়েটার ?”

কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখেই গেল শুধু। নিজের ভেতরের সেই ক্ষুদ্র, খচখচে অনুভূতিটাকে লুকিয়ে রাখলো একপাশে। পাভেল সেলফি তোলার জন্য ফোনটা সামনে ধরতেই সবাই একটু গুছিয়ে দাঁড়াল। হাসিব তাজধীরের কাঁধে হাত রাখল। পাভেল একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল উত্তেজনায় টগবগ করতে করতে।হাসিব তখন ডাকল বোনকে,

“এই তাজধীরের পার্সোনাল কেয়ার টেইকার সামনে আয়।”

ভাইয়ের ডাকে মেয়েটা গিয়ে দাঁড়ালো সেখানে। সব জায়গায় ফেলে ফুলে সোজাসুজি তাজধীরের পাশে গিয়েই দাঁড়াতে হলো? এই মেয়েটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছে না? পাভেল ডাকলো তখন প্রিয়ন্তী কে। তবে প্রিয়ন্তী ভাইয়ের ডাক শুনেও শুনলোনা। উল্টো চট করে ঘুরে দাঁড়াল ও। কেউ কিছু বোঝার আগেই হনহন করে হাঁটা শুরু করল বাড়ির সোজা ভেতরের দিকে। পাভেল অবাক হয়ে ডাক দিল আবার,

“এই প্রিয়! কোথায় যাচ্ছিস? ছবি তুলবি না? “

প্রিয়ন্তী থামল না।আর না তাকালো। অতি দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল সামনে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একটু হতভম্ব হলেও আমলে নিলো না বিশেষ।


সময় অতিবাহিত হয়েছে প্রায় দু ঘন্টা। এই পুরোটা সময় প্রিয়ন্তী নিজের রুমেই বন্দি থেকেছে। বের হয়নি একবারও। দরজা বন্ধ করে রুমের পর্দা টেনে বাইরের পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বসে আছে এক ধ্যানে। তবে রুমে বসে থাকলেই কি আর শান্তি মিলে? মিলে না। তাইতো অস্তির হয়ে এখানে সেখানে পায়চারি করছে ও। করেই যাচ্ছে। পা দুটোও ব্যথা হয়ে গেছে সেদিকেও খেয়াল নেই। শেষমেশ আর থাকতে না পেরে ফোনটা তুলে নিয়ে তৎজলদি
কল লাগাল শ্রেয়াকে। প্রথমবার রিং হতেই রিসিভ হলো ফোনটা। শুনতে পেল,

“হ্যালো”

ওপাশ থেকে কথাটা শেষ হওয়ার আগেই প্রিয়ন্তীর ধৈর্য্যর বাদ ভেঙে গড়গড় করে আওড়াল,

“তুই চুপ থাক! একটা কথাও বলবি না আগে!”

শ্রেয়া থমকে গিয়ে বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আরে কি হলো আবার?”

“কি হলো? তুই জানিস কি হচ্ছে এখানে?”

“আরেহ ভাই না বললে জানবো কিভাবে?”

“একটা পিচ্চি মেয়ে! মেয়েটা পুরো সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ভাই। আর আমি কিনা বসে বসে এসব দেখবো?”

“আরে ধীরে বল কি হয়েছে ? আবার ওই হীরা কিছু করেছে? “

প্রিয়ন্তী প্রায় চেঁচিয়ে উঠল এবার,

“হ্যাঁ ওই হীরাই !মেয়েটার সাহস দেখছিস? সামনে সামনে এমন ভাব করছে যেন—যেন,

কথাটা শেষ করতে পারল না। নিজেই থেমে গেল।
শ্রেয়া একটু নরম গলায় বলল,

“তুই ওভাররিয়্যাক্ট করছিস না তো?”

“না! একদম না!তুই দেখলে বলতিস। মেয়েটা এমন সব কার্যকলাপ করছে আমার দেখেই গাঁ জ্বলে যাচ্ছে। আর ওই ব্যাটা নিরামিষ তো কিছুই বলছে না!”

“হয়তো উনি ছোট বোনের মতোই..

“থাম!এই ডায়লগটা আর বলবি না প্লিজ! ছোট বোনের সাথে কেউ এমন করে?”

“আমার তো মনে হচ্ছে—তুই সিরিয়াসলি জেলাস হচ্ছিস রে প্রিয়। তুই শেষমেশ ভাইয়ের সম্মন্ধির উপরেই ফিসলে পড়লি? “

প্রিয়ন্তী দাঁত চেপে বলল,

“আমি জেলাস? ওই পিচ্চি বাচ্চার উপর? প্লিজ!”

“তাহলে এত রাগ কেন?”

এই প্রশ্নটাই এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল প্রিয়ন্তীকে।কিন্তু পরক্ষণেই আবার গর্জে উঠল ও,

“রাগ করবো না? আমার চোখের সামনে এসব হবে আর আমি চুপ করে থাকবো?”

শ্রেয়া একটু সিরিয়াস হলো এবার,

“তুই কি করতে চাইছিস তাহলে?”

প্রিয়ন্তী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,

“মেয়েটাকে সাবধান করতে হবে। এখুনি। দেরি হওয়ার আগেই!”

“কি?! তুই পাগল নাকি?কি বলবি ওকে?”

“যা বলা দরকার তাই বলবো!এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।”

“দেখ, পরে আবার ঝামেলা হয়ে যাবে কিন্তু—”

“যা হওয়ার হবে!আমি চুপ করে থাকবো না।”

শ্রেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,

“তুই এখন রেগে আছিস। একটু ঠান্ডা হ—”

“আমি একদম ঠিক আছি! ঠিক আছি বলেই বলছি।”

ওপাশে আর কিছু বলল না শ্রেয়া। কথোপকথনটা শেষ হলো একরাশ অস্বস্তি রেখে।ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়ন্তী।
তারপর গভীর একটা শ্বাস নিল। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। বিড়বিড় করল নিজে নিজেই,

“কিছু না। কিছু না। এভাবে রিঅ্যাক্ট করা ঠিক না প্রিয়ন্তী। বি নরমাল ওকেয়? “

কিন্তু মনের ভেতরের আগুনটা ঠিকই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। থামার নাম নেই। কিছু একটা ভেবে রুম থেকে বেরিয়ে এলো ও। দরজাটা খুলে বাইরে বের হতেই—চোখ গিয়ে আটকে গেল ঠিক সামনে।
করিডোরের একটু দূরে একটা দরজা খুলে বের হলো হীরা। আর সেই দরজাটা প্রিয়ন্তী খুব ভালো করেই চেনে। ওটাটেই তো তাজধীর কে থাকতে দেয়া হয়েছে।
হীরা মেয়েটাকে এই অসময়ে তাজধীরের রুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে মোটা মোটা কয়েকটা ভাজ পড়ল প্রিয়ন্তীর কপালে। চোখ বড় বড় হয়ে তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ।মেয়েটা এই সময়ে লোকটার
রুম থেকে বের হচ্ছে কেন ? মাথার উপর ছোটোখাটো বাজ পড়ল তৎক্ষণাৎ। পরক্ষণেই মুখের অভিব্যক্তি বদলালো। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল অমনি।
ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে গেল সামনে। সোজা গিয়ে দাঁড়াল হীরার সামনে।ধারালো, ঠান্ডা গলায় বলল,

“এই পিচ্চি, এখানে আসো।”

হীরা একবার তাকাল।তারপর যেন কিছুই শোনেনি এমন ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল।
এই অবহেলাটাই আগুনে ঘি ঢেলে দিতে সক্ষম।
প্রিয়ন্তীর গলা এবার আরও কড়া, আরও শক্ত শুনালো,

“এই মেয়ে! এখানে এসো। বড়োজন ডাকছে—শুনতে পাও না?”

পরপর ডাকে থেমে দাঁড়াল হীরা। মাথাটা সামান্য কাত করে, ভ্রু কুঁচকে এমন একটা ভাব নিল—যেন সত্যিই কিছু বুঝতে পারছে না সে। তারপর শান্ত গলায় বলল,

“আমাকে ডাকছো?”

প্রিয়ন্তী থমকালো, ভরকালো। মেয়েটা ওকে তুমি বলে সম্মোধন করছে? “তুমি?”সামান্য একটা বাচ্চা মেয়ে কিনা ওকে তুমি বলে ডাকছে? মেয়েটা কি জানে না সে বয়সে বড়? প্রথম দেখাতেই কেউ বড়দের সাথে এভাবে কথা বলে? ভেতরের রাগটা আরও খানিকটা বাড়ল ওর । তবুও নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিয়ে ঠাণ্ডা, চাপা কড়া স্বরে বলল,

“তুমি টেনে পড়ছো না এবার?”

হীরা বিন্দুমাত্র দেরি না করে উত্তর দিল,

“হুম।”

এই ছোট্ট, নির্লিপ্ত উত্তরটাও প্রিয়ন্তীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল।সে আবার জিজ্ঞেস করল,

“তুমি জানো আমি কিসে পড়ি?”

হীরা কাঁধ ঝাঁকাল। খুবই স্বাভাবিকভাবে বলল,

“না বললে জানবো কিভাবে?”

এইবার সত্যিই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম হলো প্রিয়ন্তীর।কেমন ছিরি কথাবার্তা! ভদ্রতার ছিটেফোঁটাও নেই। অসভ্য মেয়ে একটা। দাঁত চেপে নিজেকে ধরে রেখে, গলার স্বরটা খানিকটা নামিয়ে রেখেই বলল,

“বাদ দাও।”

এক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,

“তবে যেহেতু টেনে পড়ছো, তোমার বয়স বড়োজোর ১৬ এর বেশি হবেনা। আর আমার বয়স জানো?”

হীরা এবার চুপ করে তাকিয়ে রইল। প্রিয়ন্তী নিজেই বলে গেল,

“২৬ বছর। কিসে পড়ি জানো? প্রায় পড়াশোনা শেষ। তোমার থেকে গুনে গুনে দশ বছরের বড় আমি।আমায় তুমি তুমি করে বলছো—কোন আক্কলে, হ্যা?”

হীরা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল প্রিয়ন্তীর দিকে। যেন কথাগুলো ঠিকমতো হজমই করতে পারছে না সে। তারপর হঠাৎ করেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই বলে উঠল,

“কি বলেন! আপনার এত বয়স? কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হয় না আপনি এতটা… বুড়ি!”

প্রিয়ন্তীর চোখ কটমট করে উঠল। ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছে দাবানলের মত দাউ দাউ করে। তবুও কোনোভাবে নিজেকে সামলালো। মনে মনে বিড়বিড় করল

“তোমায় দেখলেও তো মনে হয় না তুমি এতটা পাকনা…”

মুখে বলল,

“বাদ দাও। ওদিকে কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”

হাতের ইশারায় পেছনের রুমটার দিকে দেখাল প্রিয়ন্তী। হীরা একবার পেছনে তাকাল, তারপর আবার প্রিয়ন্তীর দিকে ফিরে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“এটা আমাদের বাড়ি। আমার যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাব। আপনাকে কেন বলবো?”

এক মুহূর্তের জন্য প্রিয়ন্তীর মন চাইলো ঠাস ঠাস করে মেয়েটার দু গালে দুটো কষিয়ে চর বসাতে। পাছে ওর কিঞ্চিৎ শান্তি লাগে যদি। নিজেকে বহু কষ্টে সামলালো ও। এমনিতেই ওর একটু আকটু রেকর্ড আছে। বান্ধবীদের কেউ ইভটিজিংয়ের শিকার হলে গিয়ে ছেলেদের সাথে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া, ঝগড়া করা—এসব ওর জন্য নতুন কিছু না। কিন্তু এখন?
একটা পুচকে মেয়ের সাথে এসব করে বসা—তা সে করতে চায় না। গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সংযত করল। তারপর যথাসম্ভব নরম সুরে বলল,

“হ্যাঁ, আমি জানি এটা তোমাদের বাড়ি। তুমি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারো।”

একটু থামল। চোখ সরাসরি হীরার চোখে রেখে দাঁত কীটমিট করে আওড়াল,

“কিন্তু একটু আগে তুমি যার রুম থেকে বের হলে—সে মানুষটা কিন্তু আমার।”

“হ্যাঁ?কার কথা বলছেন আপনি?”

“তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কার কথা বলছি।

সন্ধিগ্ন গলায় বলল হীরা,

“তাজধীর ভাই?”

বিনিময়ে প্রিয়ন্তী সোজা হয়ে দাঁড়ালো। গলায় অদ্ভুত এক দৃঢ়তা এনে বলল,

“জি। তুমি হয়তো জানো না… কিন্তু উনার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। অফিশিয়ালি এখনো অ্যানাউন্স হয়নি, তাই কেউ জানে না। তবে খুব শীঘ্রই জানানো হবে। তখন তোমাদেরও ইনভাইট করা হবে।”

কথাগুলো একেবারে মেপে মেপে বলল প্রিয়ন্তী। হীরার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল মুহূর্তেই।চোখের ভেতরের ঝিলিকটা নিভে গেল হঠাৎ। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল মেয়েটার। কিছুক্ষন হতভম্বর হতো নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েই রইলো টলমল চোখে। ছোটবেলার সেই লুকিয়ে রাখা অনুভূতিটা—যেটা হয়তো সে নিজেও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি—এক নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কিশোরী বয়সের প্রথম ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খেলো মেয়েটা। হীরার গলা কেঁপে উঠল সামান্য,

“আপনি… আপনি কি সত্যিই বলছেন?”

প্রিয়ন্তী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

“মিথ্যা বলে লাভ কি?বাদ দাও… কিছুদিন পর উনিই তোমাদের জানিয়ে দিবে।”

একটু এগিয়ে এসে বলল ফির,

“এখন রুমে যাও। আর হ্যাঁ, মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। আগে আমার পজিশনে, আমার বয়সে আসো এরপর তোমার জন্য এর থেকেও ভালো ছেলে নিয়ে আসবো আমরা।যেহেতু সম্পর্কে তোমার ভাবিই হতে যাচ্ছি, তাহলে তো আমাদের মধ্যে যোগাযোগ থাকবেই, তাই না?”

হীরা কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনলো শুধু।
চোখ দুটো নিচু। মুখটা ফ্যাকাশে, নিস্তেজ হয়ে গেছে নিমিষেই ।প্রিয়ন্ত ঘুরে দাঁড়ালো তৎক্ষণাৎ। হাঁটা
ধরলো নিজের রুমের দিকে। অবশেষে শান্তি পেলো মনের কোণে।।মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু হলেও নেমে গেছে।

প্রিয়ন্তী মেয়ে হলেও—এই এক জায়গায় সে ভীষণ কনজারভেটিভ। তার কাছে “নিজের” মানে—
শুধু নিজেরই। সেখানে অন্য কারো হস্তক্ষেপ?
উহুম অসম্ভব। সেটা সে কখনোই মেনে নিতে পারে না।
হোক সেটা সম্পর্ক, হোক সেটা মানুষ। যেটা তার— সেটা শুধু তারই থাকবে।সেটায় অন্য কারো সামান্য স্পর্শ টুকুও বরদাস্ত করবে না সে।তাইতো জীবনে এই প্রথমবার মিথ্যা বলে নিজেকে ২৬ বছরের দাবি করল। এখন কোন মুখে মেয়েটাকে ও বলবে যে মেয়েটার থেকে জাস্ট গুনে গুনে ২ আড়াই বছরেরই বড়। তাহলে থাকবে ওর মান সম্মান? নাক কাটা যাবে না?


হাসিবদের বাড়ির সামনের ডান পাশটার বেশ কিছু জায়গায় জুড়ে বানানো হয়েছে একটা বিশাল সুইমিং পুল। চওড়া, লম্বা, আর গভীরতার তারতম্যে সাজানো একেবারে রাজকীয় স্টাইলে। স্বচ্ছ ত্বকতকে নীল পানিতে নিচে থাকা সাদা টাইলস গুলো চকচক করছে। পুলের চারদিকে ছোট ছোট ঝর্ণা—পাতলা ধারা হয়ে টুপটাপ করে পানি পড়ছে।

গাছের ডাল থেকে, দেয়ালের ধারে, এমনকি ঝর্ণার পাশেও ঝুলছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলো। মিটমিট করে জ্বলে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। আকাশে মস্ত বড় এক চাঁদ উঠেছে আজ। রাত তখন সাড়ে দশটা। এই নিস্তব্ধ, মায়াময় পরিবেশে পুলের এক কোণায় বসে আছে প্রিয়ন্তী।

পরনে কালো লেগিন্স। নিচের অংশটা একটু তুলে নিয়ে ফর্সা পা দুটো ডুবিয়ে রেখেছে ঠাণ্ডা নীল পানিতে। হালকা ঢেউ লেগে লেগে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর মসৃন কোমল মেয়েলি ত্বক। চুপচাপ বসে বসে নির্জন জায়গার চারপাশটা দেখছে ও। মনটা হুট্ করেই ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। তন্মধ্য ওর পাশে এসে বসল কেউ একজন। মেয়েটা প্রকৃতি বিলাসে এতটাই নিমগ্ন ছিল যে খেয়ালই করেনি। পরপর অতীব পরিচিত সেই গভীর, পুরুষালি গলা কানে এলো ওর,

“মিসের কি মন খারাপ?”

প্রিয়ন্তী চমকে তাকাল। আর তাকিয়েই থমকে গেল ওর ওই দৃষ্টিযুগল। ওর পাশে সামান্য খানিকটা দূরত্ব রেখেই বসেছে তাজধীর। কালো রঙের ফিটিং টি-শার্ট, সাথে কালো ট্রাউজার। পা দুটো পানিতে ডুবিয়ে বসে আছে ঠিক ওর মত করেই। ভেজা পানিতে পুরুষালি পায়ের পশমগুলো লেপ্টে আছে।
প্রিয়ন্তী কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইল। চোখ সরাতে পারল না আর। মেয়েটার থেকে সদুর প্রত্তুত্তর না পেয়ে তাজধীর আবার বলল,

“খুব বেশি মন খারাপ নাকি আপনার, মিস প্রিয়ন্তী?”

এবার প্রিয়ন্তীর ধ্যান ভাঙল। লোকটার শরীর থেকে আসা হালকা, মিষ্টি একটা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগল ওর। এই গন্ধটা অদ্ভুতভাবে ওর কাছে পরিচিত। শুধু এই মানুষটার কাছ থেকেই এই ঘ্রানটা পায় সে।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো এই ঘ্রাণে নাক ডুবিয়ে দিব্যি অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে গোটা একটা জীবন। নিজেকে সামলে নিয়ে ছোট করে বলল,

“মন খারাপ হবে কেন?”

“ হওয়াটাই স্বাভাবিক নয়কি? আফটার অল, আপনার ভাইকে আমি হারিয়ে দিয়েছি। ভাইকে হারতে দেখে বোনের মন খারাপ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। তাই না?”

প্রিয়ন্তী এবার বিরক্ত হলো। এত সুন্দর একটা মুহূর্ত এই লোকটার এমন ঘুরপ্যাচ করে টিজ করে কথা বলে নস্ট করতেই হবে। নাহলে যে পেটের ভাত হজম হবেনা। যত্তসব।

“আচ্ছা, আপনি সবসময় আমাকে পিঞ্চ না করে কথা বলতে পারেন না?”

তাজধীর মুচকি হেসে বলল,

“বাহ্! মিসের তো দেখি মেজাজ একদম চটে আছে ভাইয়ের জন্য। এটা কি ঠিক বলুন?”

বলে একটু থামল। পরপর আবার বলতে লাগল,

“কোথায় আপনার বাচ্চার বাবা জিতার খুশিতে হইহুল্লোড় করে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখবেন—সেখানে ভাইয়ের হারানোর দুঃখে নির্জন জায়গায় এসে ঘাপটি মেরে বসে কষ্ট বিলাস করছেন?”

লোকটার এহেন তির্যক বাক্যয় প্রিয়ন্তীর মেজাজ আরও চড়ে গেল। ঠিক এই মুহূর্তে লোকটার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে অনেক আগেই উঠে যেত সে। কিন্তু এই মানুষটার পাশে থাকতে খারাপ লাগছে না। বরং—অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে। এমন ভালো লাগাটা এর আগে কোনোদিন কোনো ছেলের জন্য অনুভূত হয়নি ওর। তাইতো মোহর বসে হঠাৎই করে বসল এক অবাঞ্ছিত প্রশ্ন,

“আচ্ছা, আপনি এত সুন্দর করে খেলেন কিভাবে? আমি তো ভাবতেও পারিনি আপনি ব্যাডমিন্টনও খেলতে পারেন! আচ্ছা, এমন কি আছে যেটা আপনি পারেন না বলুন তো ?”

তাজধীর পানির দিকেই তাকিয়ে ছিল।চোখ না তুলেই গম্ভীর গলায় উত্তর করল,

“মাঠ থেকে শুরু করে ঘাটে—সব জায়গায় পারফর্ম করা শেষ। আপাতত শুধু খাটটাই বাকি আছে।
তবে আপনি চাইলে সেটাও খুব শীঘ্রই ফুলফিল হয়ে যেতে পারে, মিস প্রিয়ন্তী।”

প্রথমে কথার মানে ধরতে না পারলেও কিছুক্ষন বোকার মত বসে থেকে কথার মিনিং আয়ত্তে নিতেই কপাল কুঁচকে বলল,

“মানে?”

“এইযে মানে—আপনাদের সামনে একটা মানুষ সিঙ্গেল হয়ে ঘুরে ফিরছে, সেটা কি আপনাদের চোখে পড়ছে না?আপনারা যদি আমার সিঙ্গেল লাইফ গুচানোর দায়িত্ব না নেন, তাহলে কে নেবে বলুন?”

“মিতু তো বিয়ে করে আপনার ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত। আম্মুর শরীর ততটা ভালো না যে এইসব নিয়ে মাথা ঘামাবে। কিন্তু আপনি তো আছেন।আপনিই না হয় আমার সেই দায়িত্বটা নেন।”

প্রিয়ন্তী অবুঝের মতোই জিজ্ঞেস করল,

“কোন দায়িত্ব?”

তাজধীর এবার সোজা হয়ে বসল। বলল,

“অবশ্যই মেয়ে দেখার দায়িত্ব।এই বয়সে এসেও যদি বিয়ে করতে না পারি, তাহলে আমার নেভি লাইফে কলঙ্ক লেগে যাবে না? আমার ফ্রেন্ডরা অলরেডি বিয়ে করে বাচ্চা নিয়ে সেটেল।”

একটু থামল সে। পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আর আমি? সামান্য একটা বউ-ই খুঁজে পাচ্ছি না। এটা কি সয়, বলুন?কি, নিবেন নাকি আমার এই দায়িত্বটা, মেডাম?”

প্রিয়ন্তীর মেজাজ এবার ভেজায় চটে গেলো।মায়ের কাছে এসেছে এই লোক মাসির দরদ দেখাতে। ধুম করে উঠে দাঁড়ালো ও। এখানে আর এক মুহূর্ত ও থাকবেনা ভেবে সোজাসুজি পা বাড়াল বাড়ির ভিতরের দিকে। পরপর আবার কিছু মনে পরতেই থেমে দাঁড়ালো। উল্টো না ঘুরে বলে গেল যেতে যেতে,

“তাহলে দোয়া করবো আপনি আজীবন এই সিঙ্গেলের তকমা লাগিয়েই ঘুরবেন কমান্ডার সাহেব!”

বলেই গটাগট ধূপধাপ পা ফেলে চলে গেল সেখান থেকে। তাজধীর কথাটা শুনতেই কিছু উত্তরে করবে তার আগেই ওর পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট হয়ে বেজে উঠলো। কপাল কুঁচকে ফোনটা পকেট থেকে বের করে চোখের সামনে ধরতেই কুচকানো কপাল আরও কুচকালো ওর। ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে টানটান হয়ে বসে পরপর পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল,

“ইয়েস লেফট্যানেন্ট কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিক স্পিকিং!”

ওপাশ থেকে উত্তর এলো সাথে সাথেই,

“কমান্ডার , ইওর লিভ ইজ ওভার। ইও আর রিকুইরিড টু রিপোর্ট ব্যাক উইথিন দ্যা নেক্সট ফর্টি -এইট আওয়ার্স। দিজ ইজ আ ডিরেক্ট অর্ডার!”

চলবে…..

(পর্যাপ্ত রিয়েক্ট আর ৪০০+ কমেন্ট না আসলে পরবর্তী পর্ব আসবে না। আপনাদের সহজ কথায় ধরেনা। গত পর্বের রেস্পেক্ট দেখেছেন? )

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply