Golpo romantic golpo ডেনিম জ্যাকেট

ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫৪


ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৫৪

অবন্তিকা_তৃপ্তি

The Waterfront Convention Hall. . .
হলটায় আজ আয়োজন করা হয়েছে সিদ্দিক বাড়ির ছোট ছেলে শাহবির সিদ্দিক স্নিগ্ধ- কায়ার বিয়ের। প্রায় বছরখানেক প্রেমের সম্পর্কের উত্থাল-পাত্থাল উঁচু-নিচু বাঁক পেরিয়ে আজ তারা কবুল পড়বে একে অন্যের জন্যে।

স্নিগ্ধ আজ রাজার মতো সেজেছে, পাশে লাজুক মুখে বসে আছে তার জীবনের একমাত্র রানী।

স্নিগ্ধের গায়ে প্যাস্টেল রঙের শেরওয়ানি; কায়ার গায়ে জড়ানো ডার্ক রেড শাড়ি, আজ ভীষন গয়নাও পড়েছে—- দুজনকে একসাথে চমৎকার দেখাচ্ছিল।

স্নিগ্ধের হাতে পরপর গিফট এসে দিয়ে যাচ্ছেন গেস্টরা; স্নিগ্ধ সেশন রিসিভ করতে করতে ক্লান্ত প্রায়। ওদিকে বেচারি কায়া স্টেজে ওর পাশে বসে কড়া চোখে বারবার ঘুরেফিরে তাকাচ্ছে স্নিগ্ধের দিকে। হয়তোবা স্নিগ্ধ সেটা বুঝলো, শেষবারের মতো গিফট পাশে রেখে কায়ার হাতটা ধরলো সবার অগোচরে, কায়া সাথেসাথে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কটমট কণ্ঠে বললো————‘ছুঁবেন না সরেন, অসভ্য লোক।’

মুখ লুকিয়ে হাসে স্নিগ্ধ। পরপর ভ্রু কুচকে কায়াকে আগাগোড়া দেখে নাক মুখ কুচকে বলে উঠল———-‘আমি অসভ্য? ইয়া খোদা; এই মেয়ে বলে কি!’

কায়া প্রায় কেদেই দিবে———-‘আপনি আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছেন কেন? আমি পাসওয়ার্ড চাইলে দিতাম না, তাও!’

স্নিগ্ধ জবাব দিল————‘আমার ফেসবুক আইডি তোর মোভাইল লগইন করা; আমি কিছু বলেছি? তো তোর আইডি আমার কাছে থাকলে কি?’

কায়া চোখ কুচকাল———‘আপনি . . আপনি সার্চ লিস্ট কেন দেখলেন? আমার প্রাইভেসি নাই?’

স্নিগ্ধ এবার ভ্রু উচায়————‘ওহ, তাহলে এই ব্যাপার! ম্যাডাম যে লুকিয়ে লুকিয়ে ডার্ক রোমান্টিক প্রেমের গল্প পড়েন ফেসবুকে— এটা জেনে যাওয়াতেই এত রাগ?’

কায়া থতমত খেলো———-‘মো. .মোটেও না: আমি এমনিতেই বলেছি।’

স্নিগ্ধ এবার একটু এগিয়ে আসে, কায়া এবার ঢোক গিলে শুকনো। স্নিগ্ধ কায়ার মুখের কাছে মুখ এনে সবাইকে দেখতে দেখতে ফিসফিস করে বলে উঠে—————‘ছি, ছি! তলে তলে এগুলা করতি তুই? আইডি হ্যাক না করলে তো জানতামই না। কমেন্ট কি করতি? নেক্সট আপু? লাইক সিরিয়াসলি? নেক্সট? ওই নষ্ট গল্পের নেক্সট পর্ব চাইতি তুই? ইয়া খোদা। আমার ভাবলেই তো বিপি হাই হয়ে যাচ্ছে।’

স্নিগ্ধ নাটক করে শ্বাসকষ্টের এক্টিং করতেই: কায়া কাতর কণ্ঠে বলল————-‘স্নিগ্ধ: অনেক ভালো না আপনি? আমার আইডি প্লিজ ব্যাক করে দাও, প্লিজ।’

স্নিগ্ধ সাথেসাথেই সরে বসে, ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল———-‘একদমই না। নতুন আইডি খুলে দিব; বসেবসে প্রাকটিকাল কিছু শিখবি। এগুলা ফাতরামী শিখলে . . নষ্ট হয়ে যাবে মাইন্ড।’

কায়া এই কেদে ফেলবে ভাব———-‘স্নিগ্ধ: ভালো হচ্ছে না কিন্তু। আমার অনেক পুরনো আইডি ওইটা, অনেক স্মৃতি আছে। আর এটা নিয়েও আপনি লেগপুল করবেন? তাও আজকের দিনে? বিয়ে আজ আমাদের।’

স্নিগ্ধ আরাম নিয়ে; বড্ড আমোদেই বলল———‘করব আমি:এটা লেগপুল করার মতোই কাজ। তুই যে ভেতরে ভেতরে ডার্ক রোম্যান্স লাভার এটা আগে জানা উচিত ছিলো না আমার? বল?অথচ আমি কাছে এলেই চেঁচাস। তুই চেচাবি কেন? তুই তো আরও আমার নাম নিয়ে স্বরবর্ণ বলবি, যা গল্প পড়িস, করা উচিত। খোদা, আমার ভাবলেই কেমন লাগছে, ইয়াক!’

স্নিগ্ধের বমি করার ভান করল। কায়া সাফাই গায় বলল———‘আগে পড়তাম তো , এখন পড়িনা এসব।’

স্নিগ্ধ সাথেসাথেই বলল——-‘আগেই বা কেন পড়তি? আমাকে কল্পনা করেই পড়তি নাকি? ছি, কায়া। আমি কিন্ত মোটেও ওমন না: আমি ভদ্র ঘরের ভদ্র ছেলে। আর তুই কিনা আমাকে অভদ্র ভেলে ভেবে এসব কল্পনা করতি।ইয়াক!’

রাগে-জেদে কায়া এই কেদে দিবে ভাব। জেদ উঠে চিমটি কাটল স্নিগ্ধের হাতে: সজোরে। চোখ পাকিয়ে বলল———-‘বেশি বেশি না? মেরে দেব একদম। বিয়েই করব না তাহলে আজ।’

স্নিগ্ধ কিছু বলার আগেই: কাব্য এগিয়ে এলো। কাব্যকে এগিয়ে আসতে দেখে কায়া চুপ হয়ে গেল। স্নিগ্ধ বেচারা হাতের চিমটি কাটার অংশ মালিশ করতে করতে একবার করুন চোখে কায়ার দিকে তাকালো, কায়া ওসব পাত্তা না দিয়ে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল দ্রুত।

কাব্য এগিয়ে এসে স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে জানতে চাইল———-‘খেয়ে নিবি আগে: ফটোশুট পরে কর?’

স্নিগ্ধ কায়ার দিকে তাকাল, গলা খাকারি দিয়ে বললো——-‘খাবি? ক্ষুধা লাগছে?’

কায়ার অবশ্য ক্ষুধা লেগেছে। ও শুকনো মুখে বলল———‘খেয়ে ফেললে ভালো হবে।’

স্নিগ্ধ কাব্যের দিকে তাকাল———-‘টেবিল সেট করো, আগে আমাদের বসিয়ে দাও এক ফাকে।’

কাব্য গেল টেবিল সেট করতে।

ধ্রুব-অদিতি এসেছে বিয়েতে। ধ্রুবর কোলে দু বছর বয়সী ধীর ঘুমিয়ে গেছে। বেচারা আজ পুরো বিয়েতে বাকি বাচ্চাদের সাথে বড্ড হইচই করেছে, ক্লান্তিতে তাই এখন আর চোখ মেলতে পারছে না। ধ্রুবও তাই ছেলেকে কোলে করেই পুরো বিয়েতে কাজ করেছে।

অদিতি এসে কায়ার পাশে দাড়ালো। কায়ার কানের কাছে এসে ফিসফিসাল———‘ফার্স্ট নাইটের জন্যে অগ্রিম সমবেদনা, গার্ল।’

কায়া তাকাল মাথা তুলে, বুঝেনি ও এই কথার অর্থ। অদিতি ওর চোখের চাওনি দেখে বাকা হেসে বললো————-‘প্রেমের বিয়ে তো? আজ এমনিতেই তোর খবর আছে। তবে ভয় পাস্ না, সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে হবে; হু? স্বামীদের বশ করা শিখতে হবে? আমার মতো, হু?’

কায়া শেষের কথা শুনে হেসে ফেলল, বলল———‘ধ্রুব ভাই তোমার বশে? অথচ আমি তো দেখি তুমিই ভাইয়াকে ভয় পাও।’

অদিতি ভ্রু কুচকে তাকাল। পাশ থেকে ধ্রুব ডাকল———-‘অদিতি, দেরি হচ্ছে। ধীর আরাম পাচ্ছে না মেইবি এভাবে ঘুমিয়ে। যাওয়া উচিত আমাদের।’

অদিতি সরে এলো। কায়া হাসছে তখনও। অদিতি-ধ্রুব দুজনেই স্নিগ্ধের দিকে তাকিয়ে গিফট এগিয়ে দিল। স্নিগ্ধ হেসে বলল————‘কি আছে এটাতে?’

অদিতি ভ্রু উচায়———‘কি দিলে খুশি হবেন, ভাইয়া?’

স্নিগ্ধও হেসে উত্তর দিল———-‘আপাতত আপনার বোনকে গিফট হিসেবেই পেয়ে খুশি। থ্যাংক ইউ আপু, ভাইয়া। বিয়েটা হবার পেছনে আপনাদের দুজনের হেল্প আছে।’

ধ্রুব ধীরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জবাব দিল————-‘স্নিগ্ধ. . আমাদের বাড়িতে দাওয়াত থাকলো নতুন বর-কনের। জানিও কবে যেতে পারবে।’

স্নিগ্ধ মাথা দুলাল———‘জি জানাব।’

ধীর ঘুমের ঘোরেই ধুর্বির ঘাড়ে নাক ঘষে নাকে কেদে উঠে বিড়বিড়ায়———‘ম. .ম. .মা য. যাব।’

ধ্রুব ধীরের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবার ঘুম পড়িয়ে দিল। অদিতির দিকে তাকাল———-‘যাই এখন?’

অদিতিও স্নিগ্ধ-কায়ার দিকে চেয়ে বাই বলে চলে গেল।

কাব্য টেবিল সেট করছিলো। অথচ এত কাজের মধ্যেই ওর দুই-হুডেড আইজ বারবার ঘুরেফিরে একজনের উপরেই পড়ছে। বেকবারার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে সেজন্যে।

কারণ. . কুহু আজ বেশ গুছিয়ে মিন্ট-লেমন রঙের শাড়ি পড়েছে। বেশ সুন্দর করে চুল কার্ল করে ছেড়ে রেখেছে, সাথে স্মুকি মেকআপ। ওমন সেজে বেচারা স্বামী কাব্যের চোখের সামনেই বারবার ঘুরছে-ফিরছে, একটুও দয়া না দেখিয়ে।
কাব্যের খুব নজরে পড়ছে আজ শুধু। কাব্য একসময় অস্থির ভঙ্গিতে আর থাকতে না পেরে বাবুর্চিকে বলে আসলো খাবারের কথা।

পরপর এগিয়ে গীতে কুহুকে ডাকে———-‘এইযে. . এদিকে আয়।’

কুহু তো খুশি: দ্রুত শাড়ির আঁচল সামলে লাফিয়ে এগিয়ে এলো কাব্যের সামনে। কাব্য ওর হাতটা চেপে ধরলো গম্ভীর মুখে, তারপর ওকে নিয়ে একপাশে টেনে নিয়ে গেল। কুহুও কাব্যের হাত ধরে গেল ওদিকে, দোনা-মোনা ছাড়াই— ওর চোখ-দুটো তখনও দেখছে কাব্যের হাতের মুঠোতে নিজের ছোট-মোটো মেয়েলি হাতটা।

কাব্য ওকে একটা লুকানো জায়গায় এনে থামালো। কোমরে হাত রাখতেই: কুহু এ যাত্রায় চমকে উঠে বলল———‘আল্লাহ এখানে কেন? লোক চলে আসবে তো।’

কাব্য বিরক্ত হয়ে কুহুর মুখের দিকে তাকাল, গম্ভীর কণ্ঠে বলল——-‘সেফটিপিন দে একটা। আছে সাথে?’

কুহু ভ্রু কুচকালো, কিছু না বুঝে দিল একটা পিন। কাব্য সেটা নিয়ে কোমরের পাশটায় শরীর সাথে ভালো করে লাগিয়ে উন্মুক্ত অংশটা ঢেকে দিতে দিতে বলল———‘রাতে আমার সামনে কোমর দেখাবি, কিন্তু এখন বাইরের লোকদের কেন দেখানো হচ্ছিল?’

কুহু লজ্জা পেয়ে গেল, মিনমিন করে জবাবটাও দিল—-‘খেয়াল করিনি আমি, সরি।’

কাব্য সেফটিপিন লাগিয়ে উঠে এসে কুহুর মুখোমুখি দাঁড়ালো। কুহু লম্বায় কাব্যের বুক সমান, পারফেক্ট হাইট ডিফারেন্স। কুহু মাথা তুলে স্থির, অপলক স্বামী কাব্যের চোখের দিকে চেয়েই রইলো ওভাবেই। কাব্য ঝুঁকে আসে, ওর কানের কাছে ঠোঁট এনে কানের লতিতে আস্তে করে একবার ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল——‘স্বামীর পছন্দের জিনিসের খেয়াল রাখতে শিখতে হয়না, হু?’

কুহু হেসে ফেসে নিঃশব্দে, কি ভালো যে লাগল এই কথাটা — ইস!

ও চোখ বুজে কাব্যের গলা জড়িয়ে ধীরে কাব্যের ঘাড়ে মুখ লুকালো। কাব্যও পালটা হেসে ওকে একহাতে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলো।

কুহু ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে জানতে চাইলো———-‘স্ত্রীর ব্যাপারে স্বামীর পছন্দের আর কি কি জিনিস আছে? বললে খেয়াল রাখতে সুবিধা হয়।’

কাব্যও ওকে জড়িয়ে ধরে জবাব দিল একটার পর একটা———‘স্বামী কাব্যের তার স্ত্রীর চুল অনেক পছন্দের, স্ত্রীর মুখটা, মুখের মায়াবী আদল, স্ত্রীর নির্লজ্জতা; রাতে তাকে শাড়ি পরে উষ্কে দেওয়ার ভঙ্গিমা, আর . . তার স্ত্রীর ছেলেমানুষি প্রেম। স্বামীর কাব্যের তো তার স্ত্রীর সবটাই পছন্দের।’

কুহু লজ্জায় কাব্যের ঘাড়ে নাক ঘসে চোখ বুজে ফেলে, জবাব দিল ভীষন নাজুক কণ্ঠে একসময়————-‘রাখব: সবটার খেয়াল রাখব।’

কাব্য ভীষণ শান্তি পেয়ে কুহুকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে; বুকের মধ্যেই যেন পিসে ফেলতে চাইল একসময়।

‘আল্লাহ. . তোরা এখানেও শুরু করে দিয়েছিস।’ —— তানিমের এক চিৎকারে কুহু সাথেসাথে চমকে উঠে কাব্যকে ছেড়ে দিল। কাব্যের মুখের দিকে চেয়ে দ্রুতপায়ে শাড়ির কুচি সামলে দৌড় দিল একটা। ওদিকে কাব্যের মুখটা থমথমে:যেন একটা বাচ্চার হাত থেকে তার পছন্দের খেলনা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বেচারার তো মুখের দিকেই তাকানো যাচ্ছে না।

সমস্ত ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গেল কাব্যের, ও এবার তানিমের দিকে তাকিয়ে রেগেই বলল———‘কাবাবের হাড্ডি হতে কে বলেছিল তোরে? আসার পর থেকে জ্বালাচ্ছিস। রাস্কেল।’

তানিম হেসে হেসে কাব্যের পাশটায় দাঁড়াল, টিটকারি করে বলল——‘এই. . তোর না বোন লাগে কুহু? বোনের সাথে চিপায় চুপায় এসব করিস? এখন তোর লজ্জা লাগে না কাব্য? সেই তো বোনার সাথেই চিপায় ঘুরিস। আমারই লজ্জা লাগছে তোদের এভাবে দেখে।’

তানিম লজ্জা পাওয়ার ভান করতেই কাব্যের একটা ঘুষি পরল ওর মাথার উপর। কাব্য দাঁতে দাঁত পিসে বলল———-‘বউ হয় ও এখন। বউয়ের সাথে চিপায় যাব না তো তোর সাথে যাব? ইডিয়েট।’

তানিম ফোড়ন কাটে———‘বউ. . .বোন হয়না আর?’

বারবার এই ‘বোন’ – শব্দটা শুনতে শুনতে কাব্য ত্যাক্ত-বিরক্ত ভীষণ। তানিমের দিকে খেয়ে ফেলা লুক দিয়ে অপাশটায় চলে গেলো। তানিম পেছনে দাড়িয়ে শয়তানের মতো হাসছে। কাব্যকে জালিয়ে হেব্বি মজা পাওয়া যাচ্ছে আজকাল। বেচারা ফেঁসেছে রে ফেঁসেছে।
——————-
সিদ্দিক বাড়ির সদস্যরা বর-কনে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে রাত বারোটায়। বাড়ির সবাই টায়ার্ড হয়ে যে যার রুমে শুয়ে পড়েছে।
আজ সারাদিন অনেকটাই ধকল গেছে।

বাসর রাতে কায়াকে স্নিগ্ধের রুমে বসিয়ে গেছে কুহু আর কিছু মেয়ে, সম্ভবত স্নিগ্ধের কাজিনগ্রুপের মেয়েরা।

ওদিকে কায়া এই রুমে আসার পর থেকে শুধু আল্লাহ-আল্লাহ জপছে: স্নিগ্ধ যেভাবে ওকে ভয় দেখাচ্ছে, জীবনে ডার্ক রোমান্টিক গল্প পড়ার শখ ঘুচে গেছে কায়ার: মরে গেলেও আর কোনদিন কায়া ওসব পড়বে না। আজই ফেসবুক থেকে সমস্ত পেইজ আনফলো দিবে। তাও কোনমতে আজকের রাতটা পার পেলেই হলো।

অনেকক্ষণ পর স্নিগ্ধ এলো রুমে: দরজাটা লাগাল ভীষণ আস্তে, নিশব্দে— আশপাশ দেখে। হয়তবা বেচারার লজ্জা লাগছিল; এভাবে সবার সামনে বউ নিয়ে দরজা বন্ধের আওয়াজ করতে।

দরজাটা লাগিয়ে পরপর কায়ার দিকে এগিয়ে গেল। কায়া বিছানায় গোল হয়ে বসা: ঘোমটা টানা মাথার উপরে।

স্নিগ্ধ অনেকক্ষণ কায়াকে দাড়িয়ে থেকে দেখলো। বিছানায় বসলো না।
খানিক পর গম্ভীর কণ্ঠে বলল————‘মিসেস স্নিগ্ধ. . বিয়ের রাতে স্বামীকে সালাম করতে হয় বউদের। কে করবে এটা? তোমার মা কিছু শেখান নি তোমাকে?’

কায়া ঘোমটার নিচে তাকাল কড়া চোখে স্নিগ্ধের দিকে। স্নিগ্ধ দাড়িয়ে আছে: ঘোমটা খুলবে না এসে? কায়া তবুও উঠল। উঠে সালাম করতে যাবে পায়ে,ওমনি স্নিগ্ধ ওকে বুকে টেনে নিলো।

কায়া জমে গেল সাথেসাথেই, স্নিগ্ধ সিনেমার মতো কায়াকে বুকে টেনে অ্যাকটিং করে বলল————‘বউ. . তোমরা জায়গা তো আমার বুকে: ওখানে নয়।’

কায়ার মেজাজ গরম হচ্ছে ভীষণ। ও জোর করে স্নিগ্ধের থেকে সরে এলো। পরপর ভ্রু কুচকে বিছানায় বসলো। স্নিগ্ধ পাগড়ি খুলে রাখলো একপাশো তারপর কায়ার দিকে ফিরে শয়তানি হাসি হেসে পাঞ্জাবির বোতামে হাত রাখতেই কায়া চমকে উঠে বলল——-‘এটা কি হচ্ছে?’

স্নিগ্ধ ভ্রু বাকিয়ে তাকালো———‘আমি ডার্ক রোমান্টিক মুডে আছি, সো যা হবার তাই হচ্ছে।’

কায়া কাঁদো-কাঁদো হয়ে গেল একদম, ঠোঁট কাপছে; কোনরকমে বললো———-‘আপনি এত খারাপ, ছি! এমনটা জানলে আমি জীবনেও আপনাকে বিয়ে করতাম না স্নিগ্ধ।’

স্নিগ্ধ হাসছে, হাসতে হাসতে এগুলো———‘খারাপ তো সবে শুরু। রিগ্রেট হচ্ছে? আমাকে বিয়ে করে? ইশশিরে!’

কায়া পাশে থাকা কুশন ছুড়ে ফেলল স্নিগ্ধের দিকে———‘আর এক পা এগুলে. . ! মেরে ফেলবো জানে।’

স্নিগ্ধ কুশন ক্যাচ করেছে দক্ষ হাতেই, আশ্চর্য হবার ভান করে বলল————‘বিছানায় আরও দুটো আছে এখনো।’

‘কি?’ —- কায়া বুঝে না।

স্নিগ্ধ ভ্রু বাকিয়ে দেখিয়ে বলল——-‘কুশন। সব ছুড়তে শুরু কর; তোর ছোড়া-ছোড়ি শেষ হলে আমি এগুব। ডার্ক রোমান্টিক গল্প পড়িস; আর আর আমি সেসব এপলাই করলেই দোষ। এ কি নাইনসাফি।’

কায়া সাথেসাথে কান চেপে ধরে দুহাতে, চেঁচিয়ে বলল———‘আল্লাহ. . আর জীবনেও ডার্ক কিছু পরব না স্নিগ্ধ, আল্লাহর ওয়াস্তে আজকের জন্যে মাফ দেন।’

স্নিগ্ধ কিছু বলল না: বাকা হেসে হ্যান্ডকাফ বের করল পকেট থেকে। কায়ার দিকে বাড়িয়ে বলল——-‘এটা চিনিস?’

কায়া সাথেসাথে পিছিয়ে গেল: আমতা-আমতা করে বলল———‘ খ. . . খবরদার স্নি. . স্নিগ্ধ।’

স্নিগ্ধ অবাক হয়ে বলল———‘আরে, চিনিস দেখছি। আর খবরদার কি? এটা আমার ফ্রেন্ড দিয়েছে, রাকিব যে? পুলিশে চাকরি করে: আজকের জন্যে রাখতে বললো আমার কাছে। ভাবছি এটা দিয়ে কিছু কাজে লাগানো যায় কি না। এটা কি কাজে লাগে, বল তো? তোর তো ভালই আইডিয়া আছে।’

কায়া এবার রেগে-মেগে ঘোমটা ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল। চুড়ান্ত ঝগড়াটে মহিলার মতো, স্নিগ্ধের দিকে আঙুল তাক করে বলল———-‘মজা আর না স্নিগ্ধ। বেশি হয়ে যাচ্ছে: আমার অস্বস্থি বুঝতে পারছো না তুমি। না করেছি এসব করবে না, তারপরও . . এমন করলে আমি বাসর রাতও মানব না: অন্য রুমে চলে যাব কিন্তু বলে দিলাম।’

আপনি থেকে তুমি? ঠিক এইবার স্নিগ্ধের টনক নড়ল। সাথেসাথেই হ্যান্ডকাফ রেখে দিল ড্রয়ারে, এগিয়ে এলো দ্রুত কায়ার দিকে।

স্নিগ্ধ কায়ার হাত ধরতেই কায়া ঝাড়ি দিয়ে সরিয়ে দিল, মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল রাগে-তেজ দেখিয়ে। স্নিগ্ধ আবার ধরল; কায়া আবার ছেড়ে দিল। একপর্যায়ে স্নিগ্ধ কায়াকে টেনে এনে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে———‘সরি, সরি সরি। আমি জাস্ট বোঝাতে চেয়েছি এসব ফ্যান্টাসি পড়তে যতটা না মজা: বাস্তবে এক্সপ্লোর করা খুব ভয়াবহ। আমি অনেকদিন তোকে মানা করেছি: কায়া। তাও আমাকে লুকিয়ে অন্য আইডি থেকে তুই এসব পরতি। পড়িস নি? মিথ্যা বলবি না।’

কায়া চোখ নামিয়ে নিল, জবাব নেই ওর কাছে। স্নিগ্ধ কায়ার থুতনি চেপে ওর মুখটা তুলে ধরে বলল———‘তাই একটু শিক্ষা দিলাম আরকি। আরেকবার যদি দেখি আমাকে লুকিয়ে এসবই পরেছিস আবার. .!’

কায়া সাথেসাথেই বলল———-‘পরব না। আর জীবনেও পরবনা, মাফ চাই।’

স্নিগ্ধ হেসে কায়ার কপালে চুমু খেলো——-‘গুড গার্ল।’

কায়ার স্নিগ্ধের বুকের সাথেই পড়ে থাকল। স্নিগ্ধ একসময় ডাকল বড্ড নরম সরে———-‘কায়া, জান?’

কায়া স্নিগ্ধের বুকের মধ্যেই পরে আছে: আরামে; চোঝ-দুটো শান্তিতে বুজে। স্নিগ্ধের ডাকে আস্তে করে জবাব দিল——-‘হু?’

স্নিগ্ধ কায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল———-‘গোসল করা উচিত মেইবি আমাদের। সারাদিনের ধকলের রেশটা যেত।’

কায়া হয়তো বুঝে; চুপচাপ সরে এলো। স্নিগ্ধকে রেখে লাগেজ থেকে শাড়ি বের করতে গেলে স্নিগ্ধ বলল———-‘শাড়িতে কমফোর্ট পাবি? কামিজ পরে ফেল নাহয়?’

কায়া শুনে শাড়ি বের করতে করতে বলল————‘আমার শখ ছিল বিয়ের পর শাড়ি পরব অলয়েজ। কনফোর্ট না পেলে বদলে নেব পরে। এখন পরি।’

কায়া শাড়ি নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। স্নিগ্ধ মোবাইল নিয়ে বসল। আজ বেশ কটা ছবি তুলেছে ওর বন্ধুরা— সেসব পাঠানো হয়েছে সবটাই স্নিগ্ধের নম্বরে।

স্নিগ্ধ সেখান থেকে একটা ছবি নিয়ে কায়ার মুখটা কেটে নিজের ইনস্টাতে পোস্ট দিল: ফেসবুকেও দিল। সাথে ক্যাপশন দিল—

‘ফ্রম পাতানো বোন টু বউ! Beginning of a New Journey!’

সাথে কায়ার ফেসবুক আইডিটা নিজের আইডিতে ম্যারেড স্ট্যাটাস দিয়ে এড করে দিল।

পোস্ট দিয়ে ফোন রাখতেই দেখে কায়া বেরিয়েছে। স্নিগ্ধ নিজেও গোসল করে এসেছে, রুমেই কাপড় বদলে ফেলে ঘরের ট্রাউজার-টিশার্ট পরে নিয়েছে। কায়া বেরুতেই কায়ার জন্যে বিছানায় ওর খালি পাশটা দেখিয়ে বলল———-‘আয়।’

কায়া লজ্জা পেল কেন যেন। মিনমিন করে এসে স্নিগ্ধের পাশটায় শুলো, বেশ দুরুত্ব রেখে। দূরত্ব রেখে নিজের বালিশে মাথাটা রাখা মাত্রই স্নিগ্ধ একঝাপে এগিয়ে এসে ওকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মাথা রাখল। কায়া যেন থরথরিয়ে কেপে উঠল। স্নিগ্ধ ওর ঘাড়ে নাক-মুখ ঘষতে ঘষতে ভীষণ লো ভয়েজে ফিসফিসালো———‘দূরে শুলি কেন?’

কায়া মিনমিন করে উত্তর দিল———‘দু. .দূরে কই?’

স্নিগ্ধ ঘাড়ে নাক ঘষে হাস্কি ভয়েজে বলল————‘তাহলে আমি মিথ্যা বলছি?’

কায়া জবাব দিল না, বেচারিকে স্বামী স্নিগ্ধের ওমন স্পর্শ পাথর করে দিচ্ছে ক্রমাগত। শরীরও বোধহয় অবশ হয়ে আসতে চাইছে, পা মুচড়ে আসতে চাইছে শুধু।

স্নিগ্ধ কায়ার ঘাড়ে নাক ঘষে ঘ্রাণ টেনে নিলো। কায়া শাড়ির আচল খামচে ধরে চোখ খিছে ফেলল একসময়।

একসময় স্নিগ্ধও লো ভয়েজে জানতে চাইল———‘ঘুম হয়েছে আজ? ঘুম ধরেছে এখন? টায়ার্ড?’

বোকা না কায়া, বুঝে এ কথার অর্থ। স্নিগ্ধের দিকে না ফিরেই কোনরকমে জবাব দিল——-‘উহু।’

স্নিগ্ধ হাসলো। ফোড়ন কেটে বলল———‘ডার্ক রোমান্টিক স্বামী চাস নাকি, সফ্ট রোমান্টিক স্বামী? তোর রাত আজ, তোর মর্জিমতোই প্লে করবো।’

কায়া এবার রেগে উঠে: গায়ের জোরে খামচে ধরে স্নিগ্ধের হাত। স্নিগ্ধ হাসতে হাসতে কায়ার গালে চুমু খেলো——-‘মজা করছিলাম: মজা করছিলাম। রাগিস না।’

কায়া আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। স্নিগ্ধ কায়ার ঘাড়ে ঠোঁট চেপে ধরে। কায়ার হাতটা টেনে এনে আঙ্গুলের ভাজে চেপে ধরে। একসময় বলে————‘এই একটা রাতের জন্যে কত কি করলাম আমরা। তাইনা? অদ্ভুত ব্যাপার. . আমরা স্বামী-স্ত্রী রূপে একই বেডে শুয়ে আছি। কেউ এখন থেকে আমাদের কিছু বলবে না, ইনফ্যাক্ট আম্মুও না। তোর গুনধর বাপও না।’

কায়া স্নিগ্ধের বুকে গা এলিয়ে দিয়ে শুনতে থাকে চুপচাপ। স্নিগ্ধ একসময় দোনা-মোনা করতে থাকে: নার্ভাস কণ্ঠে কোনরকমে বলল————-‘তুই কি রাজি? মানে আজ রাতে? যদি বলিস অপেক্ষা করব। আমি আসলে জোর জবরদস্তি চাইছি না। তুই. .তুই কি বুঝতে পারছিস? আসলে. . আমি. .’

স্নিগ্ধের গলা কাপছে; প্রচন্ড নার্ভাস—- বুঝতে পারছে না এসব ব্যাপারে কনসেন্ট নেওয়াটা আদৌ হচ্ছে কিনা ঠিকঠাক।

কায়া থামল ওদিকে, জোরে একটা শ্বাস নিয়ে এদিক ফিরে সোজা স্নিগ্ধের বুকের সাথে নাক-.মুখ ঘষে ওকে জড়িয়ে ধরলো। বলল———-‘ধৈর্য্যের অনেক পরীক্ষা দিয়েছেন; আর নেব না।’

স্নিগ্ধ হা হয়ে যায়। কায়াকে অবাক চোখে একবার দেখেই পরপর হেসে উঠে নিঃশব্দে। কায়াকে সাথেসাথেই নিজের বুকের নিচে ফেলে দিল, কায়া লজ্জায় দুহাতে মুখ ঢাকে।

স্নিগ্ধ হাসে: গুনগুন করে গান গায়,

—আজ তোকে পেলে রাতে
ওরে রাত যদি আসে
আমি সে রাতের চাইনা তোর ভোর
ভোর. ভোর. চাইনা তো ভোর রে কায়ার বাচ্চা!

কায়া লজ্জায় স্নিগ্ধকে খাঁমচায়——-‘ছি: অসভ্য কোথাকার!’

চলবে

এই পর্বে প্লিজ সবাই বেশি বেশি যেভাবে পারেন রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট কবেনে। পেইজের রিচ একদম তলানিতে।
৭ হাজার রিঅ্যাক্ট এলেই নেক্সট পর্ব আপলোড দিয়ে দিব।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply