ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৫৩
অবন্তিকা_তৃপ্তি
সিদ্দিক মহল, কাব্যদের ফ্ল্যাট, সকাল ৯ টা. .,
তখন অনেকটাই ভোর, সকালের কমলাটে সূর্যের আলো কাব্যদের বিছানায় লুতুপুতু খেতে শুরু করেছে। ওদিকে সারারাত জেগে থাকা কুহু কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছিল মাত্র। ঘুমের ঘোরেই সূর্যের এমন আলোতে চোখমুখ কুচকে পাশ থেকে কুশন নিয়ে নাকে-মুখে চেপে ধরে অস্পষ্ট সুরে চেচালো—‘এই প. . পর্দাটা খুলেছেন কেন, ই. .ইশশ।’
কুহু কুঁচকানো মুখে পাশ ফিরে বালিশ চেপেছে মুখে। কাব্যে চোখেও আলো লাগছে, ওর পাতলা ঘুমটুকু ভাঙল এসময়েই। দুহাতে চোখ ঘষে, ডলে চোখ খুলে সরাসরি জানালার দিকেই তাকাল কাব্য। ঘুমানোর আগে কুহুকে নিয়ে জানালার পাশটায় দাড়িয়ে অনেকক্ষণ গল্প করেছিল; সেসময় পর্দাটা খুলে দিয়েছিল, পরে আর লাগানোর কথা মনে নেই।
কাব্য ঘাড় সামান্য বাকিয়ে ঘুমন্ত কুহুর দিকে একবার তাকাল। বেচারীর ঘুম সম্ভবত পণ্ড হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই, বারবার এপাশ-ওপাশ ফিরছে। কাব্য মৃদু হেসে কুহুর মুখ থেকে কুশন আলগোছে সরিয়ে দিল— নাহলে দমবন্ধ হয়ে যাবে। কুহু ঘুমে সেসব খেয়ালও করেনি; কাব্যের বুকে মুখ ঘষল আদুরে ভঙ্গিতে, ওভাবেই।
কাব্য মৃদু হেসে, কুহুকে একহাতেই ধরে রেখে হামাগুড়ির মতো করে জানালার দিকে হাত বাড়াল,, অনেকটা দূরেই, তবুও বেশ কসরত করে পর্দাটা টানল একহাতেই।
তারপর আবার সতর্ক চোখে কুহুকে দেখে নিলো— না ঘুম ভাঙেনি। কাব্য ঘড়ি দেখে, নয়টার উপরে বাজে। বিয়ে আছে আজ বাড়িতে; উঠা উচিত দুইজনেরই এখন। একটু পরেই শামিমা কাউকে পাঠাবেন ডাকতে।
কাব্য কুহুর এলোমেলো, অগোছালো চুলে হাত বুলায়, ডাকে বড্ড আহ্লাদ দেখিয়ে, ভীষন নরম-নরম কণ্ঠে———‘কুহু..সোনা. .গেট আপ।’
কুহু বিরক্ত হয়ে কাব্যকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মুখ কুচকায়———‘প্লিজ. ঘু. .ঘুমাই না, আর একটু।’
কুহু বলতে বলতে ঘুমিয়েছে আবারও। কাব্য কুহুকে বুকের সাথে মিশিয়ে একহাতে চুলে হাত বুলিয়ে ডাকতেই থাকে অনবরত—-——‘আর ঘুম কীসের, হু? বিয়ে আছে না বাড়িতে? শুধু স্বামীকে সিডিউজ করলেই হবে? বাড়িতে বিয়ে আছে; কে দেখবে?’
কুহু স্থির: চোখ মুখ কুচকে কাব্যের গায়ের সাথে মিশে ঘুম-ঘুম কণ্ঠে বললো কোনরকমে——‘আ. .আপনি দেখবেন; এখন ঘুম ভাঙবেন না প্লিইজ। আমি ঘুমে মারা যাচ্ছি।’
বলতে বলতে কুহু কাব্যের কাছ থেজে কুশন নিয়ে আবার নাকে-মুখে চেপে ধরে। কাব্য হেসে উঠে, পরপির কুশন সরিয়ে নিতে নিতে আবার ডাকে——-‘আর না, ঘুম আসলে রাতে ঘুমাবি, একটুও ডিসটার্ব করব না আমি। কিন্তু এখন উঠ প্লিজ; একটু পরেই আম্মু চলে আসবে ডাকতে।’
কুহু এ যাত্রায় চোখ-টোখ খুলে ভীষণ বিরক্ত হয়ে কাব্যের দিকে তাকালো মাথা তুলে। কাব্য ওর এমন তাকানো দেখে বড্ড বেচারার মতো বলল———‘ওভাবে কি দেখছিস? আমিও তো চাই তুই ঘুমা। কিন্তু বাইরের. .? আর ঘড়ি দেখ: ৯ টা বাজে সোনা।’
কুহু বোধ হলো এইবার, ও কাব্যের দিকে তাকিয়ে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। পরপর বুঝতে পেলেও বেশ দেরি হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে কাব্যের হাতের উপর মাথাটা এলিয়ে রেখে কাব্যের মুখের দিকে তাকাল।
কাব্যও মৃদু হেসে কুহুকে আগলে নিলো ওর পাশটায়, সাথে ভ্রু উচালো——‘কি?’
কুহু ভীষণ আদুরে চোখে কাব্যের মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। পরপর আরো ঘেষে এলো কাব্যের গায়ের সাটগে, কাব্য আগলে নিলো ওভাবেই। কুহু হাত উঁচিয়ে গালের খোচা খোচা দাড়িতে হাত দিয়ে সেখানে ধীরে-ধীরে রেখা টানতে টানতে চুড়ান্ত আবেগে বলে যায়——-‘জানেন? আজ আমার . .আমার না আজ সবকিছু পরিপূর্ণ লাগছে। আশপাশে কিছু আর ভালো লাগছে না। শুধু কেমন যেন একটা শান্তি লাগছে মনের মধ্যে অনেক। এটা. . এটা ঠিক বোঝাতে পারব না আমি সেটা আপনাকে।’
কাব্য কুহুকে কোমর চেপে আগলে নিয়ে।বলল———‘বোঝানো লাগবে না। কারণ আই নো, এই দিনটার অপেক্ষা তুই-আমি দুজন-ই করেছি।’
কুহু কাব্যের গালে হাত রেখে টলমল চোখে তাকায় বলল———-‘কষ্ট পেয়েছেন না? এ কদিন?’
কাব্য কুহুর হাতটা টেনে চুমু খেলো হাতের তালুতে, জবাটাও দিল সাথে————‘উহু: এখন এই তোকে পেয়ে সব ভুলে গেছি: কিচ্ছু মনে নেই আর।’
কুহু কাব্যের চুমু খাওয়া দেখলো। পরপর কাব্যের দিকে চেয়ে হঠাৎ-ই প্রশ্ন করলো——————-‘আচ্ছা? আপনি জানতে চাইবেন না কালকে রাতে আমি কেন এত তাড়াহুড়ো করলাম?’
কাব্য ভ্রু উচালো, দুষ্ট স্বরে কানের কাছে ফিসফিসালো——-‘কারণ ইউ আর হর্ন. . !’
‘ইশ, নির্লজ্জের জাত। চুপ!’ —— কুহু চোখ-মুখ কুচকে চেঁচিয়ে উঠে কাব্যের হাতের মধ্যে থাপ্পড় বসায়।
কাব্য হাসতে হাসতে সিরিয়াস হয়ে বললো———‘আচ্ছা চুপ আমি: তুই বল।’
কুহু আবার থামলো; ঢোক গিলে কাব্যের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে নিয়ে নিভু স্বরে বলে উঠে আকস্মিক——‘আমার . . আমার একটা ব. .বাচ্চা চাই কাব্য। জাস্ট একটা।’
কাব্যের ভ্রু সাথেসাথেই কুচকে গেল, কুহুজে বুক থেকে সরানোর চেষ্টা করে আশ্চর্য হয়ে বলল——-‘পাগল হয়েছিস নাকি. এখন কিসের বাচ্চা?’
কুহু কাব্যকে ছাড়েনি, বরং কাব্যের হাতটা নিয়ে আলগোছে বড্ড অধিকারে নিজের পেটের উপর নিয়ে রাখে। কাব্য কুহুর পেটের দিকে তাকিয়ে ওর মুখের দিকে তাকায়। কুহু টলমল চোখে বলে দিল———-‘আপনি বুঝবেন না, আ. . আমার আজকাল নিজেকে খুব খালি খালি লাগছে। বারবার মনে হচ্ছে— ও নেই: আমার বাচ্চাটা আর নেই কাব্য ভাই। বারবার আমার মাথায় আসে—-আমার জন্যেই হয়তোবা ও নেই; আমি দায়ী এসবের জন্যে। আর আপনিও কষ্ট পাচ্ছেন, আমাকে বলেন না দেখে আমি কি দেখিনা? কালকে রাতে আপনার হাতে ওর আল্ট্রা ছবি ছিলো; আপনি আমাকে দেখে যে লুকিয়ে ফেললেন, আমি দেখিনি ভেবেছেন?’
কাব্য কুহুর কাছে ধরা পরে চোরের মতো মুখ লুকিয়ে নিলো————-‘এমনটা না. .আসলে. .!’
কাব্যকে বলতে না দিয়েই: কুহু আবার জেদ দেখিয়ে বলল————-‘যেমনটাই হোক. . এখন আমার ওকে আবার চাই, প্লিজ। আপনি একটু বুঝুন।’
কাব্য ঢোক গিলে: কুহুর পেট থেকে হাত সরিয়ে নিতে নিতে বলল———‘আসবে কুহু; ও আবার আসবে। তবে এখন না: হু? আরও পরে।’’
কুহু অধৈর্য ভঙ্গিতে জবাব দিল—-‘কেন পরে? আমার চাওয়ার কি কোনো দাম নেই আপনার কাছে? ফ্যামিলি প্ল্যানিং কি আপনি করবেন শুধু?’
কাব্য ভ্রু কুচকালো———‘আমি কখন ফ্যামিলি প্লানিং করলাম? আগেরটা তো এক্সিড.. .!’
কুহু আর বলতে দিল না, সাথেসাথেই কাব্যের মুখ চেপে ধরে———‘এক্সিডেন্ট না: আমাদের ভালোবাসার কারণে এসেছিল ও।’
কাব্য তাকিয়ে রইল অপলক কুহুর দিকে। পরপর কুহুর হাত মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে কুহুকে টেনে এনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে শান্তস্বরে বোঝালো——‘আমি বুঝি কুহু তোর কেমন লাগছে। তবে এখন না কুহু। বোঝার চেষ্টা কর. . তোর পড়াশোনা এখনও বাকি: আর আমিও চাকরি নেইনি। ফুটবল ফিল্ডে নিজের জায়গা করতেও তো টাইম লাগবে, বাবা। তারউপর তোর সবেই একটা মিসক্যারেজ হয়েছে; বাড়ির সবাই শেষে আমাকেই ধরে পেটাবে।’
কুহু মাথাটা নামিয়ে নিলো; ঠোঁট চেপে ধরে কান্না আটকে ফেললো। কাব্য বুঝে ওসব, ওর গোলগাল মুখটা ধরে নিজের সামনে তুলে ধরল, চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলল——-‘কাঁদছিস কেন? বাচ্চা নেব না তো বলিনি, নেব তো।’
কুহু টলমল চোখে চেয়ে জবাব দিল———-‘আমার এখন চাই; আপনি বুঝবেন না, আমার বুকটা খালি খালি লাগছে কাব্য। বারবার মনে হয়— ও আর নেই। আমি ওর জন্যে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম।’
কুহুর ভাঙা গলা। কাব্যও ধীরে-সুস্থে জবাব দিল ———-‘আচ্ছা; বাচ্চা চাই তো? ঠিক আছে, নেব। কিন্তু আপাতত তুই পড়াশোনা আর আমার সংসারে ফোকাস কর। বাচ্চা আল্লাহ চাইলে আমরা সময়মত নেব: হু? আবেগে পরে আবার ভুল করতে চাইনা আমি।’
‘আমাদের বাচ্চা ভুল ছিল? ——— কুহু বোকার মতো তাকালো।
কাব্য কুহুর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বোঝাল আবার——‘আমি তো একবারও বলিনি ও ভুল ছিল। কিন্তু সময়টা তো ভুল ছিল কুহু। আমাদের সম্পর্ক সেদিন ঠিক থাকলে আমি নিশ্চয়ই এ বিষয়টা খেয়াল রাখতাম। ডক্টর বলেছে— মিসক্যারেজ হবার পেছনে তোর মানসিক অশান্তি; অস্থিরতা প্লাস তোর অপরিপক্কতাও দায়ী।’
কুহু স্রেফ তাকিয়ে রইল। কাব্য আবার বলে———‘তুই খুশী থাক সোনা। আগের মতো হয়ে গেলেই আমরা এক ফাকে বেবি নিয়ে নেব, ঠিক আছে? পড়াশোনা বেবি নিয়ে চালিয়ে যাবি: সমস্যা কি? আম্মু আছে; চাচী আছে: প্রবলেম হবে না বেবি বড় করতে। কিন্তু এখন না।’
কুহু বুঝে এবার কাব্যের সমস্ত কথা। কাব্য ওর কপালে চুমু খেয়ে বলে———‘আমি যা বললাম মনে থাকে যেন? আমি যেন আর না শুনি আমার অগোচরে তুই কিছু করেছিস। যাই করবি এখন থেকে আমাকে জানাবি। আমি হাপিয়ে গেছি কুহু: আর কোনো ঝামেলা চাইছি না লাইফে। অন্তত তোর থেকে না। এখন থেকে আমরা যা করব; একসাথে একে অন্যকে জানিয়ে করবো, ঠিক আছে?’
কুহু মাথা নাড়ল ধীরে। কাব্য আবার ঘড়ি দেখে: সময়টা পেরিয়ে যাচ্ছে। কুহুর দিকে তাকিয়ে বলল——-‘এখন উঠতে হবে? ওয়াশরুমে কি একসাথে যাবি?’
কুহু সাথেসাথে লজ্জা পেয়ে গেল। কাব্যের বুকের উপর থাপ্পড় বসালো চোখ-মুখ কুচকে ———‘অসভ্য, আপনি যান আগে।’
কাব্য আহাম্মক হয়ে গেল———‘ওমা. কে কাকে অসভ্য বলছে? কাল রাতের সিনারি কি তার মনে নেই?’
কুহু লজ্জায় দুহাতে কুশন চেপে মুখ লুকিয়ে ফেলে. .কিসব বলে কাব্য—ইশ!
কাব্য কুহুর মুখ থেকে কুশন সরিয়ে দেওয়া চেষ্টা করতে করতে বলল———-‘কেউ চাইলে এই ভরদুপুরে আমি আবার তাকে সেটা মনে করিয়ে দিতে পারি। দেব নাকি?’
কুহু কুশন মুখের উপর শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচায়———‘ছি, অসভ্য। গোসলে যান এক্ষুনি।’
কুহুর ওভাবে চেচানোতে কাব্য কান চেপে ধরে , হেসে উঠে নিঃশব্দে। আর বেচারিকে জ্বালালো না, পরপর উঠে গেল। ফ্লোরে ওদের জামাকাপড় ছড়ানো-ছেটানো। ধীরে-সুস্থে সেসব নিয়ে ঝুড়িতে রাখলো— কাব্য বড্ড নিট-ক্লিন ছেলে কি না। তারপর টাওয়াল নিয়ে গেল ওয়াশরুমে। ওদিকে কুহু লজ্জায় আর কুশন সরালো না বাকিটাক্ষন।
———————
সিদ্দিক মহল, দুপুর ১১ টা।
সিদ্দিক বাড়িতে আজ বিয়ে।
শিরোনাম—- স্নিগ্ধ ওয়েডস কায়া! বেশ সুন্দর শোনাচ্ছে না ওদেরকে দুজনকে একসাথে, একশব্দে?
বিয়ে উপলক্ষে—-সকাল থেকে হুড়মুড় করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বিয়ের। কাব্য সেই-যে ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগেছে আর এক ফোঁটা বিশ্রাম নেওয়ার অব্দি টাইম পাচ্ছে না। বড় ভাই হিসেবে শামিমা বিয়ের অর্ধেক কাজ-ই বলতে গেলে কাব্যের উপরে ছেড়ে দিয়েছেন। সেদিক থেকে কুহুও ব্যস্ত, হাতে-হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছে শামিমার। এইতো মাত্রই টাকার মালা দুটো বানিয়ে সেটা সেইফ জায়গায় রেখে এসেছে। স্নিগ্ধের পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করা হয়েছে: সেটা রেখে এসেছে স্নিগ্ধের রুমে। কায়ার বাড়িতে মিষ্টি পাঠানো হবে, সেসবের হিসেব কষে মিষ্টির জন্যে মানুষ পাঠিয়েছে দোকানে।
সবাই সকাল থেকেই কাজ করতে যেখানে ব্যস্ত: সেখানে স্নিগ্ধ সারাটারাত কায়ার সাথে ফোনে কথা বলে— এখনো ঘুমাচ্ছে। শামিমাও ডাকেননি ছেলেকে। বড়ভাবী হিসেবে কুহু দায়িত্ব নিয়ে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে— আজ স্নিগ্ধের ঘুম কতটা দরকারি— ঘুমাক ও। শামিমা কি বুঝলেন কে জানে— তবে আর বিরক্ত করলেন না।
কুহু সোফায় বসেছে সবে: হাতে একটা কাগজ। সোফার সামনে লাগেজ থেকে টেবিলে ঢেলে রাখা হয়েছে পাঁচ কাপড়ের কাপড়-চোপড়। স্নিগ্ধের বাড়িতে একটা নিয়ম আছে— বিয়ে বাড়িতে আসা আত্মীয়-স্বজনদের কাপড় দেওয়া হয় বর-পক্ষ থেকে।
কুহু আপাতত দেখে দেখে যার যার কাপড়ে তার নাম লিখে রাখছে; কাকে কোনটা দেওয়া হবে। নাহলে পরে ঝামেলা হয়ে যাবে।
কাব্য সবেই ঘরে ঢুকেছে, হাতে বোঝাই করা মিষ্টির প্যাকেট। কাব্য ঘরে ঢুকতেই একটা কাজের লোক এসে মিষ্টির সব প্যাকেট ওর হাত থেকে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো। সবাই এম-ই ছুটছে আজ ভীষণ, কারোর-ই দম নেবার ফুরসত নেই।
ওদিকে বাইরে থেকে এসে বেচারা কাব্যও ঘেমে একাকার; কুহুকে সোফায় বসা দেখে এসে বসলো সোফাতে কুহুর পাশে।
কাব্যকে দেখে কুহু হিসেবের খাতাটা রেখে কাব্যের দিকে তাকাল। কাব্য সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজেছে, গলায়-মুখে ঘাম। পরনের শার্টও ঘেমে কুচকে আছে।
কুহুর বড্ড মায়া হলো। ও খাতাটা রেখে রান্নাঘর থেকে ঠান্ডা পানি এনে কাব্যের দিকে বাড়াল————‘এই. .পানি নিন।’
কাব্য চোখ খুলে তাকাল, কুহুর বাড়িয়ে দেওয়া পানি দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে এক ঢোকে পুরোটাই খেলো। পরপর গ্লাসটা কুহুর দিকে বাড়িতে দিতে দিতে বলল———-‘ঘুমে পাগল পাগল লাগছে কেন যেন।’
কুহু শুনে পানির গ্লাস শক্ত করে চেপে ধরে: মাথাটা নামিয়ে মিনমিন করে বলল———-‘কাল. .কাল রাতে ঘুম হয়নি হয়তো সেজন্যে।’
কাব্য শুনে চুপ করে গেল। বসার ঘর না হলে কুহুকে পাল্টা লজ্জা দেওয়া যেত। এখন কুচু বললেও কেউ শুনে ফেলবে। কুহুকে লজ্জা দেওয়ার ইচ্ছেটা কোনরকমে দমন করে কাব্য কুহুকে টেনে এনে ওর পাশে সোফায় বসালো। কুহু আতকে উঠে বলল———-‘আল্লাহ. .কেউ দেখবে তো। এভাবে টানে কেউ?’
কাব্য আশপাশ ভালো করে দেখে নিলো; কেউ নেই এখন আশেপাশে।
কাব্য এবার অভদ্র হলো, কুহুর ওড়না টেনে কপাল-গলার ঘাম মুছতে মুছতে কুহুর দিকে চেয়ে নিভু স্বরে দুষ্টু ইঙ্গিতে বললো————-‘কাল রাতে ঘুমাতে দিলে তো আর ঘুম লাগত না। বড্ড নিষ্ঠুর আমার বউ; রাত হলেই সে শাড়ি পড়ে ঘুরঘুর করে আমার সামনে— না চাইতেও তখন আমার রাত জাগতে হয়।’
কুহু লজ্জা পেল, মিনমিন স্বরে বলল———-‘ধৈর্য কম বলেই তো রাত জাগা লাগছে। বউ শাড়ি পড়লেই বুঝি তর সয়না।’
কাব্য হাসলো; কুহুর কোমরের ওখানে শক্ত একটা চিমটি কেটে বলল————‘আমার তর সইলেই বউয়ের সয় না। রাত না জাগলে মেরে ফেলার হুমকি দেয় আজকাল।’
কুহুর কোমরে ওভাবে চিমটি কাটায় ব্যথা লাগল; নাক-মুখ কুঁচকে বললো————-‘মানে? আমি কখন মেরে ফেলার হুমকি দিলাম। আর চিমটি কাটলেন কেন? ব্যথা পেয়েছি আমি।’
কাব্য হেসে কুহুর কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিলো। সোফায় আবার গা এলিয়ে দিতে দিতে বলল———‘ক্লান্ত লাগছে ভীষণ।’
গলার এমন স্বরে কুহুর বড্ড মায়া লাগল এ মানুষটার জন্যে। কাব্যের থেকে ওড়না ছাড়িয়ে নিয়ে এবার নিজেই ওর গলার ঘাম মুছে দিতে দিতে কাতর কণ্ঠে বললো———‘বড্ড পরিশ্রম যাচ্ছে না?’
‘হু!’ —- কাব্য ক্লান্ত কণ্ঠে জবাব দিল, চোখটা তখনও বুজে রাখা।
‘বন্ধু. . এ আমি কি দেখছি?’ ——— তানিমের গলা শুনে কাব্য ছিটকে এসে সরে দাঁড়াল কুহুর থেকে। কুহু ফ্যালফ্যাল চোখে তানিমের দিকে চেয়ে আবার কাব্যের দিকে তাকাল।
তানিম হা হয়ে কুহু-কাব্যের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর এমন তাকানোর রহস্য কাব্য বুঝে। কাব্য থমথমে ভঙ্গিতে কুহুর দিকে চেয়ে বলল———‘তুই কাজ শেষ কর: আমি আসছি।’
কাব্য কথাটা বলে সোফা থেকে উঠে তানিমের কাঁধ ধরে ওকে টেনে নিয়ে চলে গেল বাইরে। বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল দুজন।
তানিমের মুখ এখনও হা। কাব্য ওর মুখ দেখে গলা খাকারি দিল। পরপর তানিমের মুখ থুতনি চেপে বন্ধ করে দিয়ে থমথমে কণ্ঠে বললো——-‘ওভাবে তাকিয়ে থাকার কিছু নেই।’
তানিম এখনো হতবম্ব, বলল———‘কুহু. .ও তোর পাশে বসে ওগুলা. . এই তোদের মধ্যে কবে ঠিকঠাক হলো সব?’
কাব্য গলা খাকারি দিয়ে আশপাশ দেখতে দেখতে বলল———‘হয়েছে যেভাবেই হোক। তোর জানার দরকার নেই।’
তানিম এখনো ব্যাপারটা হজম করতে পারছে না: বেচারা শক খেয়েছে সম্ভবত, বলল———‘ভাই সিরিয়াসলি? কবে কিভাবে ঠিক হলো? একটু তো বল। এই অসম্ভবটা সম্ভব হলোটা কেমনে? আমি ওবেক আগ্রহী জানার জন্যে।’
কাব্য চোখ রাঙ্গিয়ে বলল———‘তুই আগ্রহী হলেও আমি বলার জন্যে আগ্রহ-বোধ করছি না। আর তোর মতো ডাফারকে তো আরো আগে না।’
কথাটা বলে কাব্য চলে যাবে: তার আগেই তানিম ওর শার্টের কলার চেপে ধরে আটকে ফেলে।
‘এই তোর ঘাড়ে এটা কি খামছির দাগ?’ —- তানিম আহাম্মক হয়ে কাব্যের শার্টের কলারটা সরিয়ে দেখে।
কাব্য বোকার মতো ঘাড়ের দিকে তাকাল। পরপর যা বোঝার বুঝে সাথেসাথেই তানিমের হাত সরিয়ে কলার ঠিক করতে করতে বলল———-‘না. . আমার নখ লেগেছে।’
তানিম এবার হেসে ফেলে; দুষ্টু হাসি ছুড়ে ইঙ্গিত দেখিয়ে বলল———‘তোর তো নখ-ই নেই: আগে কামড়ে খেতি: এখন একদম গোড়া থেকে কেটে ফেলিস। কাকে বোকা বানাচ্ছিস?’
কাব্য থমথমে মুখে তাকালো—- তানিমকে এই মুহূর্তে ঘুষি কয়েকটা মারতে পারলে ভালো লাগতো।
ওদিকে তানিম এখনো সন্দেহের চোখে চেয়ে বলল—————‘কি রে? আমি যা ভাবছি তাই . . ভাই কাল রাত জাগার পর কেমনে আজ এত কাজ করছিস? কালকে রাতেও তোর এসব করা লাগে? ধৈর্য নেই একদম তোর। ছি!’
কাব্য এবার রেগেমেগে তানিমের পিঠে থাপ্পড় বসিয়ে বলল——-‘ব্যাস: আর না। আমার বউ, আমার যা ইচ্ছা করব। তোর কি? বিয়ে খেতে এসেছিস খেয়ে চলে যাবি। এদিক-ওদিক নজর দিবি না খবরদার।’
তানিম ভ্রু বাকায়, বলল———-‘নজর দিব না বলছিস? এখন তো আরও বেশি করে দেব: নখ-টা কার বের করা লাগবে না খুঁজে?’
‘মাইর খাইস না আমার হাতে তানিম।’ —— কাব্য রাগী কণ্ঠে চোখ কুঁচকায়।
তানিম এবার থামে: ভীষণ বিরক্ত হয়ে এবার বলে উঠে————‘বোনের সাথে যে এসব করিস এখন. .লজ্জা লাগে না এখন? তোর না বোন হয় কুহু। ছি. ছি!’
কাব্য চোখ উল্টে ফেলে হতাশ-ভঙ্গিতে। পরপর তানিমের দিকে বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকায়। তানিম যা বুঝেছে. .ওকে আর শান্তি দিবে না। কুহুজে বোন বলে কি বিপদে পড়েছে . .সেটা কাব্য ভালো ভাবেই একজন বুঝতে পেরেছে। এতদিন কুহুর হাতে মারা খেলো; এখন এই খচ্চরের হাতে লেগপুল খাচ্ছে। অতিষ্ট ভঙ্গিতে কাব্য তানিমকে কিছু বলতে যাবে: তার আগেই ঘর থেকে কুহু ডাক দিল————-‘এই শুনুন. . একটু রুমে আসুন তো। আমাদের বাথরুমের গিজার কাজ করছে না।’
‘এই. .শুনুন. আহা! বোনের কণ্ঠে ভাইয়ের জন্যে কি দরদ। যা শুনে আয় তোর বোন কি বলে।’ ——- তানিম মুখ চেপে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে। ওদিকে কাব্য দারুণ, চুড়ান্ত বিরক্ত হয়ে দুটো গা-লি দিল তানিমকে। পরপর মাথা ঝাড়ি দিয়ে সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ঘরে গেল। কুহু ডাকছে কেন দেখা লাগবে।
চলবে
নেক্সট পর্ব পরশুই চলে আসবে। তার আগে এই পর্ব এ ৭ হাজার রিঅ্যাক্ট,আর বেশি বেশি কমেন্ট করে ফেলুন।
রমাদান মোবারক সবাইকে।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৭
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৬