ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৫০
অবন্তিকা_তৃপ্তি
—-‘মিসেস কাব্যের মিসক্যারেজ হয়েছে। আমরা মাত্রই এমব্রায়ো ওয়াশ করে ক্লিন করে দিয়েছি।’
কাব্য দৌড়াতে দৌড়াতে সবেমাত্র এসেছিল হাসপাতালের দোরগোড়ায়। হাসপাতালে পা রাখামাত্রই ডক্টরের এমন একটা খবরে কাব্য মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল। আর এক পা-ও এগোতে পারল না। ও ঠান্ডা হয়ে গেল একদম, হাঁ করে ডক্টর মিরাজের দিকে চেয়ে থাকল। স্নিগ্ধ দূর থেকে কাব্যকে দেখে চমকে উঠল। কাব্যের অবস্থা ভীষণ করুণ, শার্ট এলোমেলো।
একসময় হাতের ডেনিম জ্যাকেটটা আলগোছে হাত থেকে পড়ে গেল। দুমড়ে-মুচড়ে গেছে কাব্য, ওর চোখ কাউকে কিছু বলতে চায়। পারে না কেন যেন! ওর চোখ আশ্চর্য আজ, হাঁ করে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে আরেকবার চূড়ান্ত বোকার মতো কুহুর কেবিনের দিকে তাকায়।
স্নিগ্ধ এগিয়ে আসে, কম্পিত গলায় ডাকে———‘ভাই… ভাইয়া!’
ওদিকে কেবিনে পরে থাকা সদ্য সন্তান হারানো কুহুর স্বামী কাব্য হা করে বোকার মতো তখনও ডক্টরের দিকে চেয়ে আছে, পুরো ব্যাপারটা ওর মাথায় তখনও ভালো করে ঢোকেওনি। এসব… এসব কী হচ্ছে?
ডক্টর কাব্যকে দেখলেন, সাথেসাথে ডাকলেনও———‘তো আপনি পেশেন্টের হাজব্যান্ড?’
কাব্য এগিয়ে এলো দু’কদম; আস্তে আস্তে, ভঙ্গুরের মতো, তখনও ওর চেহারা বোকা-বোকা বড্ড। ডেনিম জ্যাকেটটার ওপর হাঁটতে গিয়ে একবার হোঁচট খেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল সাথেসাথে। ডক্টরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কুহুর কেবিনের দিকে ইশারা করে বলল———‘আম. . আমার স্ত্রী… ঠিক আছে? সুস্থ আছে?’
ডক্টর মিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, উত্তরে বললেন———‘হ্যাঁ, সুস্থ আছে, শান্ত হন আপনি। উনি মূলত প্রেগন্যান্ট ছিলেন দু’মাসের। সম্ভবত আপনার স্ত্রী এটা জানতেন। সার্জারির আগেও উনি বারবার বলছিলেন বাচ্চাটাকে যেকোনো মূল্যে বাঁচানোর জন্য। উই ট্রাইড; বাট সরি মিস্টার কাব্য, এই বাচ্চাটা আপনাদের ভাগ্যে ছিল না।’
কুহু জানতো বাচ্চার কথা? কাব্য আহাম্মক হয়ে গেল… কুহু কবে থেকে এটা জানতো? ওকে একবারও বলেনি? আর দু’মাস… তার মানে সিলেটের ওই রাতের পর…এসব. ।
কাব্য একটা শুকনো ঢোক গিলল। ফ্যালফ্যাল চোখে কুহুর কেবিনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো আরেকবার।
ডক্টর মিরাজ, মর্মাহত কণ্ঠে প্রফেশনাল দিক থেকে বললেন———‘মিসেস কাব্য মানসিক দিক থেকে খুব উইক এখন। জ্ঞান ফিরতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে। আমি চাইছি, উনার হাজব্যান্ড কএকবার উনাকে রেস্টরুমে দেখে আসুন। বেটার ফিল করবেন উনি, হু?’
কাব্য আবার তাকালো ডক্টরের দিকে। ডক্টর মিরাজ কাব্যের কাঁধে হাত রেখে চাপড় দিয়ে বললেন———‘বি স্ট্রং, ইয়াং ম্যান। আল্লাহর জিনিস আল্লাহ নিয়ে নিয়েছেন। ডোন্ট বি আপসেট।’
কাব্য তাকিয়ে রইলো উনার দিকে। আল্লাহ জিনিস আল্লাহ নিয়ে নিলেন. .কথাটা মাথায় ঘুরতে লাগলো ক্রমশ। ডক্টর মিরাজ মৃদু আশ্বাস দিয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন ততক্ষণে।
কাব্যকে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে শামিমা ধীর পায়ে কোরআন শরীফ রেখে এগিয়ে এলেন। কাব্যের হাতটা ধরতেই কাব্য তাকাল উনার দিকে। শামিমা কান্না অনেক কষ্টে আটকে রেখে থেমে-থেমে উচ্চারণ করলেন———‘কুহু .. মেয়েটা আজ এয়ারপোর্ট যেতে চেয়েছিল তোকে রিসিভ করতে। সেজেছিল আজ, প্রথম. . প্রথমবারের মতো জানিস শাড়িও পরেছিল। ওকে আজ অনেকদিন পর আমি এত খুশি দেখেছিলাম। কিন্তু… এত খুশিতে… কুহু— আর তোর বাচ্চাটা!’
শামিমা সাথেসাথে আঁচলে মুখ লুকিয়ে চুপচাপ সরে অন্যপাশে চলে গেলেন। ছেলের সামনে কাঁদতেও পারছেন না ঠিকঠাক। কাব্যের মুখ-চোখ কেমন শুকনো, মায়ের কান্না দেখলেও নিজে না ভেঙে পড়ে।
কাব্য শামিমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়েই রইল অবাক হয়ে। কুহু ওর জন্য সেজেছিল? ওর জন্য? কুহুর এই বাজে-খারাপ স্বামীর জন্য ও সেজেছিল? কেন? কাব্য তো কিছুই প্রুভ করেনি এখনো।
কাব্যের মাথা ঘুরছে ভীষণ। স্নিগ্ধ এলো, কাব্যের পাশে দাঁড়িয়ে নিচু কণ্ঠে বলল———‘কু. . ভাবিকে একবার দেখে আসো ভাই। ভালো লাগবে।’
কাব্য স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে দেখল, পরপর ধীর পায়ে এগোল কুহুর কেবিনের দিকে। যতটা কদম ফেলছিল মেঝেতে: ততই যেন ওই বাবা-বাবা বুকটা হু-হু করে কাঁদছিল নিরবে, অথচ কেউ দেখেনি তখন কাব্যে বুকের কান্না।
কেবিনে ঢুকে কাব্য মূর্তির মতো কুহুর পাশের চেয়ারটায় এসে বসেছে সবে। ওর চোখদুটো জ্বলছে ভীষণ। কান্না ধেয়ে আসছে, তবু কাঁদতে পারছে না। চোখ টলমলে, নাক টসটসে লাল। অবশ হয়ে কুহুর পাশে চুপচাপ বসে রইল, একদৃষ্টিতে কুহুর শুকনো-অসুস্থ-অজ্ঞান মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কুহুর মুখে ইনহেলার মাস্ক। চুপ করে ও শুয়ে আছে। শামিমার ভাষ্যমতে, কুহুর পরনে একটা শাড়ি ছিল আজ। সেটা সম্ভবত খুলে সার্জারির আগে পেশেন্ট ড্রেস পরানো হয়েছে। কাব্য হা করে উপরের দিকে চেয়ে একটা শ্বাস ছেড়ে আবার সোজা হয়ে নড়েচড়ে চেয়ারে বসার চেষ্টা করল। তারপর আবার কুহুর পেটের দিকে তাকাল। ওইখানে একটু আগেও, কাব্যের একটা ছোট অস্তিত্ব ছিল। যা এখন. .এখন আর নেই… মারা গেছে!
ওই ছোট জানের উপর ছুড়ি চালানো হয়েছিল একটু আগে. .! কাব্যের চোখটা আবার জ্বলছে, গলাটা কাঁপছে আবার।
কুহু. .কুহু এই বাচ্চা নিয়ে খুশি ছিলো? কাব্যের বাচ্চা পেটে রেখে ও খুশি ছিলো? কাব্যের বুকটা কাপছে। কুহুর জীবনে কাব্য যেমন এইটা আগাছা হয়ে থেকে গেছে, তেমনি কাব্যের অভাগা সন্তানও কুহুর জীবনে আগাছাই থেকে গেল। দুজনের একজনেও কুহুকে পেল না, আহ!
কাব্য হাত বাড়িয়ে কুহুর মাথার উপর রাখলো, আলতো করে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওপরহাত কুহুর পেটের ওপর রাখল। পরমুহূর্তেই আতঙ্কে আবার হাত সরিয়ে নিল। চোখ-মুখ ওর ভয়ার্ত। কাঁপতে কাঁপতে চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
কেবিন থেকে বেরিয়ে আসতেই স্নিগ্ধ এগিয়ে এলো———‘ভাইয়া!’
স্নিগ্ধের নরম গলা। কাব্য পিলারের সামনে মুখ লুকিয়ে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। স্নিগ্ধের কথায় চোখ মুছে ফিরে তাকাল।
ভাইকে দেখে স্নিগ্ধ থামল একটু, নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো——‘ভাবিকে দেখলে?’
কাব্য জবাব না দিয়ে চুপচাপ এসে বেঞ্চে বসলো। দু’হাত মুঠো করে মুখের সামনে ধরে রাখল। তারপর কেটে গেল কয়েক ঘণ্টা. .
পুরো তিন ঘণ্টা কাব্য ওভাবেই বসে ছিলো ওই জায়গা, কোনো হাউমাউ করেনি, জাহির করেনি কিছুই, একটা শব্দও উচ্চারণ করল না ওই জায়গায়। মূর্তির মতো স্রেফ বসে ছিল, অথচ বাকিরা সেখানে ছিলো অস্থির-ভঙ্গুর!
সবাই এক বাচ্চা হারিয়ে কত কাঁদল, কত কষ্ট পেল… আর কাব্য? ও কষ্ট পেল না? এরা কি বুঝবে কাব্যের হৃদয় ঠিক কতটা চূর্ণ হয়েছে? সন্তানের খবর পাওয়ার আগেই পেল তার মৃত্যুর খবর— এর চেয়ে দুর্বিষহ কোনো খবর একজন বাবার জন্য হতে পারে?
উপরওয়ালা কাব্যের দুঃখের ভারে এই একটা দুঃখ ঢেলে একদম ষোলকলা পূর্ণ করে দিলেন আজ। এর থেকে বেশি কষ্ট-যন্ত্রণা আর বোধহয় শাহরিয়ার সিদ্দিক কাব্যের পাবার নেই।
তিন ঘণ্টা পর,
কুহুর জ্ঞান ফিরেছে, একজন নার্স এসে বলে গেল মাত্রই খবরটা। কাব্য শুনেছে কি না কে জানে। তবু স্নিগ্ধ এগিয়ে এলো, দোনামোনা করে কাব্যকে ডাকল———‘ভাই… ভাবির জ্ঞান এসেছে। যাবে না?’
কাব্য এতক্ষণে মাথা তুলল। স্নিগ্ধের দিকে তাকাতেই স্নিগ্ধ কাব্যের চোখ দেখে ভয় পেয়ে গেল। এতটা লাল হয়ে আছে চোখ-দুটো, মনে হচ্ছে কান্না আটকে রাখার কারণেই হয়েছে। কাব্য ঢোক গিলল, মাথার চুল এলোমেলো করে ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়াল। অথচ স্নিগ্ধ স্পষ্ট দেখতে পেল—- কাব্যের হাতদুটো কি অস্বাভাবিক কাঁপছে।
কাব্য এলোমেলো চোখে আশপাশে কী যেন পাগলের বেশে খুঁজল। পরপর নিজেকে সামলে এগিয়ে গেল কুহুর কেবিনের দিকে।
রেস্ট রুমে কুহু নিথর হয়ে বেডে শুয়ে আছে। কাঁদছে নিঃশব্দে, বালিশ ভিজছে একের পর এক অশ্রুর পানিতে, এক হাত পেটের ওপর চেপে রাখা। কাব্য দূর থেকে কুহুকে ওভাবে পরে থাকতে দেখেই ওখানেই ভেঙে গেল— একদম গুঁড়িয়ে গেল সেখানেই।
কুহু বেডে শুয়েই কাব্যকে দূর থেকে দেখল। সাথেসাথে উত্তেজিত হয়ে বসার চেষ্টা করল———‘কাব্য… কাব্য ভাই! আপনি… আপনি…!’
কুহুকে অসুস্থ শরীরে বসতে দেখেই কাব্য দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়াতেই কুহু লাফিয়ে ওর বুকে এসে পড়ল। কুহুর এভাবে লাফিয়ে ওর বুকে পড়াতে কাব্য আচমকা ধাক্কা খেয়ে দু’কদম পিছিয়ে যেতে যেতেও কুহুকে শক্ত করে ধরে নিল। কুহু এসব দেখে না, পি কাব্যের বুকে মাথা রেখে ওর বাহুর শার্ট খামচে ধরে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে কাঁদছে আর বলছে———‘আমার বাচ্চা… আমার বাচ্চাটা আর নেই কাব্য ভাই। আমার বাচ্চা… বাচ্চাটাকে ওরা… ওরা ফেলে দিয়েছে! কাব্য ভাই… আমাদের বাচ্চা… আমাদের ছিল ওটা… আর নেই, নেই আর, ফেলে দিয়েছে ওরা।’
কাব্যের চোখ থেকে এবার এতক্ষণে জমিয়ে রাখা এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। ও শক্ত করে কুহুর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরল, দুহাতে ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। কুহু কাব্যের হাত ছেড়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দু’হাতে কাব্যের মুখ চেপে ধরে বলতে থাকে—————‘আমি… আমি বলেছি… জানেন? আমি বলেছি ওই মরা বাচ্চাটা আমার পেটে তোমরা রেখে দাও। ফেলো না ওকে— বলেছি আমি। বিশ্বাস করেন? তবু রাখেনি ওরা। ফেলে দিল। আমার সামনে আমার ওইটুকু বাচ্চাকে ওরা কাটল, ফেলল।’
কাব্য দুহাতে কুহুর মুখ ধরল; চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বলল———‘শান্ত হো কুহু; শান্ত হো।’
কুহু শুনেওনা ওসব সান্তনার বাণী। ও আবারও কাব্যের বুকে লুটিয়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো এ যাত্রায়, ক্লান্তস্বরে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো——‘আমার পেট… আমার গর্ভকে ওরা খালি করে দিল আবার কাব্য ভাই। খালি করে দিল।’
এই এক কথাতে এতক্ষণ নিজেকে দমিয়ে রাখা, জমিয়ে রাখা শক্ত কাব্যের চোখ থেকে ওর নিজের অজান্তেই অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ও কুহুকে বুকের মধ্যে শক্ত করে ধরলো, আরও জোরে, অধিকার দেখিয়ে। স্বামী কাব্য তার মৃত বাচ্চার মা-কে নিজের সাথে চেপে ধরে রেখেছে কোনও এক দৈব অধিকার দেখিয়ে। ওটা দৈব অধিকার না, ওটা ভালোবাসা-সম্মান-বিয়ের অধিকার।
কুহু বড্ড পাগলামি করছিল। কাব্যকে অস্থির করে তুলছিল নিজের সাথে। এবার না পেরে কাব্য ইশারায় নার্সকে ডাকলো। নার্স পাশে দাঁড়াতেই কাব্য নিভু স্বরে বলল———‘ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিন ওকে। শি নিডস রেস্ট।’
নার্স মাথা নাড়লো, ইনজেকশন আনতে গেলেই কুহু ঝাঁকি দিয়ে নার্সের হাত সরিয়ে কাব্যের গলা জড়িয়ে ধরে পাগলামি করে বলল———‘আমি এখানে থাকব না কাব্য ভাই। বাসায় যাব এখুনি, প্লিজ। আমার বাচ্চা এখানেই ম রেছে কাব্য ভাই, ওরা মে-রেছে। আমি ওদের দেখলেই না আমার আত্মা চিৎকার করে কাঁদে। আমি এখানে থাকব না। থাকব না প্লিজ।’
কাব্য কুহুর মুখ দু’হাতে ধরে বুঝিয়ে বলল———‘থাকতে হবে কুহু,ইউ নিড ট্রিটমেন্ট।’
সাথেসাথে কুহু ধমকে উঠল———‘আমি বাসায় যাব বললাম না? শুনতে পাননি?’
কুহুর চিৎকার করে ধমকানোতে নার্স অব্দি থমকে গেল। কাব্য নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকে, কুহু সাথেসাথেই কাব্যর বুকে মুখ লুকিয়ে নিলো। বলতে থাকে———‘সরি; বকলাম না? আর বকব না, সরি সরি সরি।’
কাব্য কিছু বলল না। কুহুকে বুকের মধ্যেই লুকাতে দিল, বরং নার্সের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে। তার আগেই নার্স নিজে থেকেই জানালো———‘আপনি ডক্টরকে ফোর্স করলে উনি পেশেন্টকে ডিসচার্জ দিয়ে দেবেন। এটা রুলস আছে হসপিটালের।’
কাব্য আশা নিয়ে তাকাল নার্সের দিকে। নার্স নিচু গলায় বলল——‘‘আপনি ডক্টরের সঙ্গে কথা বলুন। প্লিজ বলবেন না যে আমি বলেছি।’
বলা শেষ হলে নার্স চলে গেল। কাব্যের বুকে মুখ লুকিয়ে কুহু হাঁপাচ্ছে বড্ড। এতক্ষণ হম্বি-তম্বির পর ক্লান্ত হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়লেও কাব্যের শার্টের হাতা এখনো শক্ত করে ধরে আছে। কাব্য তাই না পেরে ওভাবেই একহাতেই ফোন বের করে স্নিগ্ধকে কল দিল। ওপাশে কল রিসিভ হলে, কাব্য একহাতে কুহুকে আগলে ধরে বললো স্নিগ্ধকে———‘ডক্টরের সঙ্গে কথা বল। বাসায় যাব আমরা। কুহু থাকতে চাইছে না।’
‘ওকে ভাই।’ —— স্নিগ্ধ ফোন কেটে ডক্টরের কেবিনের দিকে দৌড়াল।
———————-
সিদ্দিক মহল, কাব্যদের ফ্ল্যাট, রাত ১০টা. . ,
কুহু ঘুমাচ্ছে বিছানায়। চোখ-মুখ এ দুদিনেই শুকিয়ে গেছে পুরোই; যেন মনে হচ্ছে মেয়েটার উজ্জ্বল শরীরে মরিচা পড়েছে।ওদিকে কুহুকে ঘুমে রেখে কাব্য থেকে শুরু করে পুরো সিদ্দিক পরিবার কাব্যদের ফ্ল্যাটের ড্রইং রুমে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছেন।
কাব্য একপাশের সোফায় চুপ করে বসে থাকে।আলোচনার কোথাও সে কোনো একটা কথাও বলেনি এখন অব্দি। অবশ্য সেদিনের পর কাব্য নিজেও ভীষণ চুপচাপ হয়ে গেছে। জরুরি কথা ছাড়া আজকাল ঠিকঠাক কথাও বলে না।
আলোচনার এ পর্যায়ে আনোয়ার কথা তুললেন——‘এটা কিভাবে হবে? অলরেডি লোকেদের ইনভাইট করা হয়ে গেছে। এখন কিভাবে বিয়ে পেছাব?’
শামিমা দুর্বল কণ্ঠে উত্তর দিলেন——‘জানি না আমি, কিচ্ছু জানিনা কিভাবে কি করবে? কিন্তু আমার বড় ছেলের এই মুহূর্তে আমি ছোট ছেলের জন্য আনন্দ উৎসব করতে পারব না। আমার ওই মনের জোর নেই।’
আনোয়ার নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কবিতা শামিমাকে বললেন——‘আপা… লোকেদের কি বলবে?’
শামিমা সাথেসাথে তেজ নিয়ে বললেন——‘আমার কাব্য-কুহুর এই অবস্থা লোকে দেখছে? লোকে সহ্য করছে? আমরা সহ্য করছি। এই ছোট দুই ছেলে-মেয়ে এসব সহ্য করছে, এই পরিস্থিতি দিয়ে এই ছেলে-মেয়ে দুটো যাচ্ছে। ওরা কেউ দেখছে এসে?’
সাদাত এবার স্নিগ্ধের দিকে তাকালেন——‘তোর কি মত স্নিগ্ধ? বিয়ে এক মাস পেছাবি?’
স্নিগ্ধ কাব্যের দিকে চেয়ে, এতক্ষণে কথা বলল——‘ভাইয়ার এই অবস্থায় বিয়ে করব না আমি। এত মাস অপেক্ষা করেছি; আর এক মাস করব, প্রবলেম নেই।’
‘স্নিগ্ধ… বিয়ে করবে। হলুদ আগামীকালই হবে।’ —— কাব্য এতসব কথার মধ্যে হঠাৎ নিজের নীরবতা ভেঙ্গে বলে উঠল।
শামিমা তাকালেন অবাক হয়ে ছেলের দিকে——‘কুহুর এই অবস্থা…!’
কাব্য সোজা হয়ে বসে শামিমার দিকে তাকাল এবার। সোজাসুজি বলল——‘তো? আমাদের এই অবস্থার জন্য কতদিন সব বন্ধ হয়ে থাকবে আম্মু? তুমি আমারটা দেখছ, আর স্নিগ্ধ-কায়া, ওরা? ওরা তিন-তিনটে বছর অপেক্ষা করেছে। তিনটা বছর কিন্তু কম না আম্মু। আর না…!’
স্নিগ্ধ কথা বলার চেষ্টা করল——‘ভাই… তোমাদের এই অবস্থা. .!’
কাব্য সাথেসাথেই ধমকে উঠে————-‘তো? কী হয়েছে আমাদের? মরেছি আমরা? বাচ্চা আর আসবে না? আমাদের আমরা নিজেরাই সামলে নেব। তুই বিয়ে কর। কায়া কথা ভাব একবার। ওর অপেক্ষা আর বাড়াস না। বিয়ে করে ফেল; যত দ্রুত। যা হইচই করার সব করবি। মনমরা হয়ে বিয়েতে থাকলে মে-রে ফেলব একদম। বিয়ে বিয়ের মতোই হবে। কুহুর রিফ্রেশমেন্ট দরকার, এই বিয়েটা ওর জন্য ভালো।’
কাব্যের এক কথাতে ড্রইং রুমে বসে থাকা প্রত্যেকের মধ্যকার দ্বিধা ভেঙে গেল। শামিমা কাব্যকে কিছু বলতে যাবেন, কাব্য উঠে গেল সোফা থেকে। নিজের ঘরে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো শামিমার দিকে চেয়ে বলল————‘তোমরা এক ছেলের জন্য ভাবতে গিয়ে আরেক ছেলের প্রতি স্বার্থপর হইও না আম্মু। সব বাচ্চাই সমান আদরের-কষ্টের; হোক সেটা মৃত বা জীবিত।’
কাব্য চলে গেল নিজের রুমে। অথচ বসার ঘরটাকে রেখে গেল নিশ্চুপ, থমথমে। সবাই ফ্যালফ্যাল চোখে কাব্যের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কাব্য কখনো কেন মুখ ফুটে বলে না, ওর-ও কষ্ট হচ্ছে। এভাবে কেন গুমরে মরছে ছেলেটা?
——————————
কাব্য নিজের রুমে ঢুকে একবার সতর্ক চোখে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা কুহুকে দেখে নিল। তারপর ভীষণ নিঃশব্দে, আলগোছে দরজার সিটকিনি তুলল—-পরপর আবার দেখে নিল কুহুর ঘুম ভেঙেছে কি না। না, ভাঙেনি।
কাব্য ছোট শ্বাস ফেলে চুপচাপ এগিয়ে গেল কুহুর শিয়রের দিকে। দুপুরে ভীষণ জ্বর উঠেছিল কুহুর। জ্বরটা আবার মাপতে হবে। কাব্য থার্মোমিটার বের করে জ্বর মাপতে দিল, ভীষণ সাবধানে-যেন মেয়েটার ঘুম না ভাঙ্গে। থার্মোমিটারে জ্বর স্বাভাবিক দেখাচ্ছে।
কাব্যকে আশ্বস্ত হতে দেখা গেল এবার। ভীষণ নিঃশব্দে মেডিসিন বক্সটা ড্রয়ারে রেখে এবার চেয়ার থেকে উঠে যাবে, হঠাৎ ওর হাত চেপে ধরে কুহু। কাব্য থমকে গেল এ যাত্রায়। পেছন না ফিরেই বুঝতে পারল কার হাত এটা। কাব্য ছোট একটা শ্বাস ফেলল স্রেফ।
কুহু আস্তে করে জিজ্ঞেস করল———‘চুপচাপ চলে যাচ্ছিলেন কেন?’
কাব্য জবাব না দিয়ে কুহুর হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই, কুহু নাছোড়বান্দার মতো কাব্যের হাতটা এবার দুহাতে ধরে বলল——‘ছাড়বো না, আপনি আমার সাথে কথা কেন বলছেন না? কী হয়েছে?’
কাব্য হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই কুহু আরও শক্ত করে ধরে। কাব্য ছোট শ্বাস ফেলে পেছন ফিরে তাকাল এতক্ষণে। কুহুর শুকনো-অসুস্থ মুখটুকু দেখে নিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো, মাথাটা নামিয়ে বলল——‘বলার কিছু নেই তাই। তোর ঘুমানো উচিত এখন।’
বলে আবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই, কুহু ছাড়লও না। শক্ত করে ধরে আবার নরম কণ্ঠে বলল——‘আপনি… আপনার কিছু বলার নেই? সত্যিই নেই?’
কাব্য একবার কুহুর চোখের দিকে তাকাল; পরপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ড্রয়ার দেখিয়ে বলল————‘আমার নির্দোষ হওয়ার সমস্ত প্রুফ ড্রয়ারে রাখা পেনড্রাইভে আছে। সময় করে দেখে নিস।’
কাব্য কথাটা শেষ করলো। এই কথা শুনে কুহুরা মুখটা শুকনো হয়ে গেল। নীচু স্বরে বলল——‘আমি এটা জানতে চাইনি। সত্যি চাইনি।’
কাব্য মাথা তুলে তাকাল এবার——‘কেন? আমাদের সম্পর্ক এটার উপর ভিত্তি করেই টিকে ছিল।’
কুহুর বুকটা ছলছল করে উঠল। ও একটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলালো, পরপর কাব্যের হাতটা নিয়ে আলতো করে নিজের মুখে-গালে ঘষল, কাব্য স্রেফ তাকিয়ে রইলো। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই কুহু কাব্যের চোখে চোখ রেখে বলল———‘আমি… আমি… সরি। সবকিছুর জন্য।’
কাব্য এবারেও স্রেফ তাকিয়ে রইল। কুহু কাব্যের হাতের পিঠে চুমু খেয়ে ওই হাতটা ধরে রেখেই ড্রয়ার থেকে পেনড্রাইভ বের করে পানির গ্লাসের ঢাকনা খুলে পানিতে চুবিয়ে ফেলল, পুরোটাসময় কাব্যের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। এতকিছু দেখেও কাব্য তখনও কিছু বলল না। কুহু ইচ্ছেমতো পেনড্রাইভটা পানিতে চুবিয়ে ফুলিয়ে ফেলল পুরো পেনড্রাইভ। তারপর পানি থেকে বের করে একহাতেই পেনড্রাইভ দেয়ালে ঘষে ঘষে সেটার সেনসিটিভিটি পুরোপুরি নষ্ট করে রীতিমত ছুড়ে ফেলল জানালা দিয়ে বাইরে।
কাব্য পুরোটাই দেখল, চুপ করে, একটা শব্দ না করে। ওর একটা হাত তখনও কুহুর একহাতেই ধরে রাখা। ও তখনও, এতকিছু দেখার পরও কিছুই বলল না। কুহু পেনড্রাইভ ফেলে কাব্যের হাতটা দুহাতে ধরল এবার। আদরের কণ্ঠে বলল———‘আমার কোনও প্রুফ চাই না। আমার শুধু একটা সম্পর্ক চাই, ভালোবাসার সম্পর্ক, আপনার সাথে, আপনার হাত ধরে, ব্যাস।’
কাব্য এটা শুনে হঠাৎ হেসে উঠল। ফিক করে হাসতেই কুহু তাকাল ওর দিকে। কাব্য মলিন হেসে ঠান্ডা স্বরে বলল———‘সম্পর্ক আমিও চেয়েছিলাম কুহু। তোর কাছে একটা সুযোগ আমিও চেয়েছিলাম। এতদিনে, ফাইনালি বরাবর হলো দুজনের পাল্লাই।’
কুহুর চোখ থেকে পানি পড়ললো সাথেসাথেই, এই এক কথার পরেই। কাব্য হা করে একটা শ্বাস ছাড়ে, পরপর ক্লান্ত কণ্ঠে বলল———‘তবুও কুহু আমি রিভেঞ্জ নেব না, কিছুই বলব না তোকে। তুই আমার ওয়াইফ; ভালোবাসার সম্পর্ক. .এটা তুই চাইতে পারিস, এটা তোর হক। তবে… আমার একটু স্পেস দরকার। আমার এসব. .অস্থির লাগছে আমার খুব, একটু স্পেস পেলে হয়তবা ভালো লাগবে। জাস্ট কদিন, আই হোপ তুই হেল্প করবি।’
কুহু তাকিয়ে রইল কাব্যের মুখটার দিকে। পরপর কাব্যের হাতের পিঠে ছোট করে একটা চুমু খেয়ে ফের তাকাল কাব্যের দিকে, মৃদু স্বরে বলল——‘সোজা বাংলায় আমার থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছেন— তাই তো?’
কাব্য কিছু বলল না, স্রেফ চোখ ফিরিয়ে নিল। কুহু হাসলো, কাব্যের হাতটা আচমকা ছেড়ে দিল। কাব্য এভাবে ছেড়ে দেওয়াতে ওর হাতের দিকে একবার চেয়েই কুহুর দিকে তাকাল। কুহু মৃদু হেসে বলল———‘ঠিক আছে, আপনি এতদিন আমার জন্যে অপেক্ষা করতে পারলে আমিও পারব। তবে একটা কথা… আপনি যেভাবে আমাকে মানানোর চেষ্টা করে আমার পিছু পিছু ঘুরেছেন, তেমনটা আমিও করব।’
‘মানে?’ —— কাব্য বুঝেনি।
কুহু আরাম করে উঠে বিছানায় হেলান দিয়ে কাব্যের দিকে তাকাল, ঠোঁটে হাসি রেখে বললো———‘মানে হচ্ছে… আপনি বাধ্য হবেন আমার কাছে আসতে, আমাকে ছুঁতে, আমি নিজে বাধ্য করব আপনাকে। আমার কথার মানে এটা ছিলো।’
কাব্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল, পরপর বললো——‘আমি রেগে নেই তোর উপর, এসব ছেলেমানুষি করার কোনো দরকার নেই।’
কুহু জবাব দিল আমোদেই——‘আমি কখন বললাম আপনি রেগে আছেন আমার উপর। আমি তো শুধু বললাম, আমি মাছির মতো ভনভন করব আমার পার্সোনাল মিষ্টির আশপাশটায়, ব্যাস এটুকুই।’
কাব্য তাকিয়ে কুহুর মতিগতি বোঝার চেষ্টা করল, আফসোস কিছুই বুঝতে পারলো না। পরপর নিরাশ ভঙ্গিতে চুপচাপ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। দরজার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ পেছন থেকে কুহু আবার, বহুদিন আগের মতো খুশি-উচ্ছাস কণ্ঠে নিয়ে বলে জোরে বলে উঠলো———‘কাব্য. . . আই লাভ ইউ।’
কাব্য থেমে গেল, কেপে উঠল কাব্যের পুরোটা শরীর-তন-মন-রুহ ওই একটা কথাতেই।
চলবে
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৭
-
ডেনিম জ্যাকেট স্পয়লার (বিবাহ পরবর্তী)
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫৩
-
ডেনিম জ্যাকেট গল্পের সকল পর্বের লিংক
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২