ডেনিম জ্যাকেট — পর্ব ৪৭
অবন্তিকা_তৃপ্তি
শার্লিন এবার রেগে গিয়ে ধমক দিল———‘ফোন কাটবি না। আর ছাগল আমি না; ছাগল হলি তুই। গাধীর বাচ্চা… তুই প্রেগন্যান্ট!’
কুহু শার্লিনের এই বিস্ফোরক কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সটান শোয়া থেকে বসে গেল। আহাম্মক হয়ে নিজের পেটের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে কাব্যের ঝুলিয়ে রাখা ফোটোর দিকে তাকালো। এতক্ষণে… ঠিক এতক্ষণে কাব্যের রাগী-জেদী-একরোখা স্ত্রী কুহু সবকিছুর হিসাব মেলানোর চেষ্টা করল এবার; এতক্ষণে…!
ওদিকে কুহুকে একদম চুপ হয়ে যেতে শোনে, শার্লিন ফোনের ওপাশ থেকে বারবার ভীষন উচ্ছাস; চুড়ান্ত আগ্রহ নিয়ে একের পর এক বলে যাচ্ছে— ‘কুহু… তুই . . শুনছিস? একবার টেস্ট করানো দরকার।অব. .কিট লাগবে না? আচ্ছা সমস্যা নাই! কিট আনছি আমি। ৫ মিনিট দে আমারে।’
কুহু তখনও নিশ্চুপ। শার্লিন এবার থামল, পরপর কুহুকে শাসিয়ে উঠে বলল——-‘কুহু. . খবরদার উল্টাপাল্টা কিছু ভাবলে… শুনছিস আমি কী বলছি? বাচ্চটা তোরও, কিছু করবি না ওকে। আমি আসছি, অলরেডি বেরিয়ে পড়েছি আমি।’
কুহু কিছু না বলে, শার্লিনকে থম করে রেখে আলগোছে ফোনটা কেটে দিল।
ওর মাথাতে তখন ঘুরপাক খাচ্ছে—‘বাচ্চাটা তোরও।’
কুহু একইভাবে ফোন হাতে নিয়ে একদৃষ্টিতে দেয়ালে বড় ফ্রেমে করে ঝুলিয়ে রাখা কাব্যের ফোটোটার দিকে চেয়ে রইলো। ছবিতে কাব্য শামিমার কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শামিমার আরেক পাশে কুহু, মুগ্ধ চোখে কাব্যের মুখের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে আছে; ওর ঠোঁটে লাজুক হাসি আলো ছড়াচ্ছে কি সুন্দরভাবে। ওই মুগ্ধ চোখ কাউকে ভালোবাসত তখন… আজ? আজ বাসে না?
ভালো না বাসলে… এই বাচ্চা! বলা হয়; বাচ্চা নাকি স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার প্রমাণস্বরূপ আসে।
কুহু-কাব্য ভাইয়ের ভালোবাসা আছে আদৌ? হয়তো আছে! হয়তো কি? কুহু তো এখনো ভালোবাসে তার কাব্য ভাইকে! কিন্তু ও যে. . অভিমান, কুহুকে বানিয়ে দিয়েছে হার্টলেস, পাথরের মতো শক্ত!
একটাসময় কুহু নিজের অজান্তেই জামার উপরে পেটের উপর আলতো করে হাতটা ছোঁয়াল। কেন যেন কেঁপে উঠল সাথেসাথেই! এই পেটের ভেতরে সত্যি কি কেউ আছে? একটা বাচ্চা?
বাচ্চাটা কুহুর; কুহু-কাব্যের! কিন্তু এখন. .এখন কেন ও এলো? এখন তো তার বাবা-মায়ের মধ্যে কিছুই ঠিক নেই, কিছুই না। পায়ের তলায় পিষে মরছে তার বাবা-মায়ের চোরাবালির সংসারটা! এখন কেন ও এলো?
কুহুর হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে এবার। পাগলের মতো ফোনটা দ্রুত হাতে তুলে কাব্যের নম্বরে কল দিতে গেল— পরপর হাতটা কাপতে কাপতে গিয়ে থেমে গেল। কাব্য ঢাকায় নেই, মূলত বাংলাদেশেই নেই। একটা অজানা কারণে লন্ডন গেছে। কুহু জানে না কেন… সেখানে যাওয়ার পর কুহুর সাথে যোগাযোগ নেই। কুহুও এবার ইচ্ছে করেই যোগাযোগ করেনি আর। কেন করবে? লন্ডন কেন গেছে… কুহু কি বোঝে না? ঊর্মি আছে তো সেখানেই!
কুহু ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে পেট খামচে ধরে দু’হাতে, অস্থিরভাবে বলে যায়———‘আমার বাচ্চা. . বাচ্চা! তোর. . তোর এখন আসা উচিত হয়নি…কেন আসলি? কেন?’
পরপর আবার বলতে থাকে—-‘সব আমার দোষ! আমি দোষী. আমারই সতর্ক থাকা উচিত ছিল। রাগের মাথায় এমন একটা রাতের পর কেন মেডিসিন নিলাম না? উফ উফ উফ! কী করে ফেললাম এটা আমি।’
পাগলের মতো প্রলাপ বকছে কুহু। হয়তবা কুহুর বড্ড আফসোস হচ্ছে আজ! কাকে পাবে ও এমন একটা মুহূর্তে! কী করা উচিত ওর! কুহু জানেও না। ও শুধু জানে, ওর কেমন একটা পেট-মোচড়ানো অনুভূতি হচ্ছে। চারপাশটাই গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। ভালো লাগছে না, একটুও ভালো লাগছে না চোখের সামনে নিজের সংসারটাকে এভাবে ভাঙতে দেখে; ভেসে যেতে দেখে।
কুহু যখন পাগলপ্রায় তখন শার্লিন দৌড়াতে দৌড়াতে এলো। কলিং বেল কয়েকটা একসাথে বাজল। কুহু উঠে দরজা খুলে দিল। শার্লিন কুহুকে সামনে পেয়েই এতক্ষণে,রীতিমত কুহুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, লাফিয়ে উঠে বলতে থাকে———‘ইয়ার . . আই অ্যাম সো হ্যাপি ফর ইউ।’
কুহু কুহুর শরীর শার্লিনের সাথে জড়িয়ে আছে, অথচ মুখটা নিষ্প্রাণ। শার্লিন অনর্গল কথা বলে নিজের খুশি প্রকাশ করছে অথচ কুহু কিছু বলছেও না। অনুভূতিহীন স্রেফ শুনে যাচ্ছে শার্লিনের কথাগুলো। শার্লিন ওভাবে কুহুকে ভোঁতা থাকতে দেখে সরে দাঁড়ালো। কুহুর পেটের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সন্দিহান চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল———‘বাচ্চাটার কিছু করিস নি তো?’
কুহু শুনলো, তাকিয়ে রইল শার্লিনের দিকে। কুহুকে ওভাবে নীরব থাকতে দেখে শার্লিন এবার ভয় পেয়ে যায়। কুহুর হাত ঝাঁকিয়ে বলল———‘কথা বল। কিছু করিস নি তো আবার?’
কুহু এবার, এতক্ষণে জবাব দিল অনুভূতিহীন———‘না, কিছু করিনি। ও আছে।’
শার্লিন যেন হাঁফ ছাড়ল। পরপর কুহুর হাতে কিট ধরিয়ে দিয়ে বলল———‘টেস্ট করে আয়। রুলস লেখা আছে প্যাকেটে।’
বলেই ঠেলেঠুলে কুহুকে পাঠিয়ে দিল বাথরুমে। দশ মিনিট পর বেরিয়ে এলো কুহু। হাতে কিট, একবারও ওই কিটের দিকে তাকায়নি কুহু। সেভাবেই তুলে দিল শার্লিনের হাতে। শার্লিন অপেক্ষা করছে রেজাল্টের জন্য। ভীষণ চিন্তিত ও। কি আসে কিটে কে জানে!
কুহু বিছানায় বসে আছে। শার্লিন কিট হাতে রুমের মধ্যে পায়চারী করছে। খানিক পর কিটে দুটো লাল দাগ দেখার সাথে সাথেই লাফিয়ে উঠল শার্লিন———‘আল্লাহ… আল্লাহ… এসেছে, এসেছে দুটো দাগ। দেখ কুহু, দুটো দাগ।’
বলে খুশিতে ঝাঁপিয়ে উঠে কুহুকে কিট দেখাল শার্লিন। কুহু নিষ্প্রাণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল———‘দুটো দাগ? তার মানে… কী?’
শার্লিন কুহুর মাথায় চাপড় দিয়ে বলল———‘তার মানে তুই প্রেগন্যান্ট, গাধী।’
শার্লিন হাঁটু গেড়ে বসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল কুহুকে। কুহু একদম চুপ। একটা কথাও উচ্চারণ করেনি। কোনো উচ্ছ্বাসও দেখায়নি বাচ্চাটাকে নিয়ে। শার্লিন ছেড়ে দিয়ে কুহুর গালে হাত রাখল। কুহু ওর স্পর্শতে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকায় শার্লিনের মুখের দিকে।
কুহুর বোকা-সোকা মুখের দিকে চেয়ে নরম কণ্ঠে বোঝায়———‘দেখিস কুহু… এই বাচ্চাটা তোদের দু’জনকে খুব কাছে নিয়ে আসবে। তোর ভাঙাচোরা সম্পর্ক এবার ঠিক হয়ে যাবে আমার মনে হচ্ছে।’
কুহু ফ্যালফ্যাল চোখে শার্লিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। খানিক পর থেমে থেমে বলল———‘আর. .আর যদি না হয় সেটা… বাচ্চাটা একটা অ. .অসুস্থ সংসারে যদি আসে?’
শার্লিন এবার থমকাল। পরমুহূর্তে হাসার চেষ্টা করে বলল———‘নেগেটিভ ভাবছিস কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে কুহু। তুইও এবার পাগলামি কমিয়ে দে। অন্তত বাচ্চাটার জন্য ভাব, কুহু। একবার কাব্য ভাইয়ের সাথে সব মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা তো কর। তাকে কষ্ট দিয়ে তুই নিজেও কি ভালো আছিস? ওদিকে উনি কষ্ট পাচ্ছে, আর এদিকে তুই।’
কুহু তাকিয়ে থাকে শার্লিনের হাতে ধরা কিটটার দিকে। পরপর তাচ্ছিল্য হেসে বলে——‘একটা বাচ্চা! আমার আর কাব্য ভাইয়ের বাচ্চার কতটা শখ ছিলো একটাসময় আমার। ছোটবেলায় ভাবতাম— আমার বাচ্চা কাব্য ভাইকে বাবা ডাকবে, প্রেগন্যান্সিতে আমি বড্ড ন্যাকামি করবো; আর কাব্য ভাই সিনেমার নায়কদের মতো আমাকে আগলে রাখবেন।’
বলে কুহু শব্দ করে হাসতে থাকে——‘আগলে রাখা. . ন্যাকামি! আহ!’
পরপর আচমকা ঝরঝর করে কেদে ফেলে কুহু। শার্লিন অবাক হয়ে কুহুকে চেপে ধরে। কুহু কাঁদতে কাঁদতে বলল———‘আমার অসহ্য লাগছে সব। এই পেটের নিষ্পাপ বাচ্চাটাও আমার এখন অসহ্য লাগছে শার্লিন। আমার এই জীবন চাই না। আমি বাঁচতে চাই আগের মতো। কেন পারছি না বল তো? কেন?’
একটু থেমে, ক্লান্ত স্বরে কুহু জবাব চাইল কারোর থেকে—-——‘সবসময় আমিই কেন শার্লিন? আমিই কেন? বলতে পারিস?’
শার্লিন সাথেসাথেই কুহুর মাথাটা চেপে নিজের ঘাড়ে রাখল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীরে ধীরে বলে যায়———‘একবার নত হলে কিছু হয় না কুহু। হয়েই যা নত। কাব্য ভাইকে সব ভুলে একটা সুযোগ দে। সংসারটাকে একটাবার চোখটি মেলে চেয়ে দেখ। ঊর্মি, সিয়াম ভুলে যা— ওসব। ভুলে যা প্লিজ।’
কুহুর কান্নায় শার্লিনের ঘাড় ভিজে যাচ্ছে। ওভাবেই ক্লান্ত হয়ে হাপিয়ে ওঠে ও। শার্লিন সাথেসাথেই কুহুকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কুহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল———‘আল্ট্রা করানো লাগবে একবার। কাব্য ভাইকে নিয়ে হসপিটালে যাস।’
কুহু চোখ বুজে, ক্লান্ত স্বরে জবাব দিল———‘কাল আমি একা যাব হসপিটালে।’
শার্লিন কিছুটা ভয় পেল এবার———‘কেন? একা কেন?’
কুহু মলিন হাসল। চোখ খুলে শার্লিনকে দেখে বলল———‘ভয় নেই। বাচ্চাটাকে মারব না আমি। ও আমারও বাচ্চা।’
শার্লিন চোখ কুঁচকে কুহুকে দেখল। কুহুর হাবভাব ওর ভালো ঠেকছে না। তাই বলল———‘কালকে যাচ্ছিস? তাহলে আমিও যাব তোর সাথে। তোর উপর ভরসা নেই। একা ছাড়ছি না আমি তোকে।’
কুহু চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করে বলল———‘যাস।’
—————————-
‘আই লাভ ইউ. .কাব্য ভাই!’
কাব্যের কানের কাছে এই একটা বাক্য প্রতিধ্বনি হয়ে চারপাশে ঝুমঝুমিয়ে উঠে রীতিমত। কাব্য ঘামতে শুরু করে আবার। কাব্য ঘুমের ঘোরে শোনে কুহু মাতাল কণ্ঠে ওর কানের কাছে নলে যাচ্ছে——‘একটু আদর করবেন, কাব্য ভাই? এই একটু? প্লিজ?’
তারপর সেদিনের ওই রাত! রাতের একেকটা মুহূর্ত কাব্যের চোখে ধরা দিতে থাকে। কাব্য এই তীব্র শীতেও ঘামতে থাকে। তারপর একটা থাপ্পড়! সাথেসাথে কাব্যের ঘুম ছুটে গেল। ও রীতিমত ধপাস করে উঠে বসলো। হাপাতে হাপাতে পাশের টেবিল লাইটটা জালিয়ে দিল। কয়টা বাজে এখন? ঘড়ি দেখে বুঝল— এখন লন্ডনে মধ্যরাত! গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ ভালোই পাওয়া যাচ্ছে এত রাতেও।
কাব্য হাতের তালুতে ঘাম মুছে বাথরুমে ঢুকে। পানি ছিটিয়ে রুমে এসে দেখে তানিমের কল। কাব্য ছোট একটা শ্বাস ফেলে কল ব্যাক করল। তানিম ওপাশ থেকে কল রিসিভ করল——-‘কি রে? ঘুমাস নি?’
কাব্য তখনো হাপাচ্ছিলো। সোফায় বসে বলল——-‘উহু. . দুঃস্বপ্ন দেখেছি, ঘুম ভেঙ্গে গেছে।’
তানিম বলে গেল——-‘কি দুঃস্বপ্ন?’
কাব্য ক্লান্ত হেসে সোফায় মাথাটা পুরোটাই হেলিয়ে দিয়ে বলল———‘আছে একটা। বাদ দে। ওদিকের খবর কি?’
তানিম এবার টিপ্পনি কেটে বলল——-‘কার? তোর পাখি?’
কাব্য তানিমের মজা-মশকরা দেখে চোখ উল্টায় হতাশায়—-‘তানিম. ..মাথা খাস না আবার আমার। মেজাজ ভালো নেই। খবর দে আজকের।’
তানিম বিরক্ত হয়ে বলল——-‘তুই কেন ওকে কল করিস না? তোদের মাঝখানে আমাকে স্পাই করে রেখেছিস।’
কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে——‘ওকে কল করার সাহস আর ধৈর্য কোনোটাই আমার মধ্যে আর নেই, তানিম।’
কাব্যের এমন গলা শোনে তানিম এবার সিরিয়াস হয়ে বলতে থাকে——‘তোর ভাই, আন্টি এরা বেরিয়েছে শপিং করতে। তোর বাড়ির কাজের লোক আজ কুহুর জন্যে মুরগি রেঁধেছিলো। কুহু মুখে তুলেনি সেটা। যা জেনেছি— কুহুর খাবার-দাবার কমে গেছে, ওজন কমেছেও সম্ভবত। আবার আজ হুট করে শার্লিন তোদের ফ্ল্যাট গিয়েছিল। দু বান্ধুবি অনেকক্ষণ জড়াজড়ি করে কিসব বলছিল: শোনা যায়নি। তবে ইমোশনাল ছিলো ওরা। বাকিটা আজ আর জানতে পারিনি।’
কাব্য ভেবে যায়, বিড়বিড় করে বলে যায়—-‘ইমোশনাল কি কথা বলতে পারে এরা? কুহুর খাওয়া দাওয়া কমে গেছে, কেন? আম্মু কি দেখেনা এসব? কল দেওয়া লাগবে একটা আম্মুকে।’
তানিম কোনরকমে শোনে বললো——-‘তোর বউয়ের তো আবার অতি ইমোশন, এটা অবাক হওয়ার কোনো ব্যাপারই না। তোর বউ তো হুদাই কাদে, খাওয়া কমিয়ে দেবদাসী হয়ে যায় মাঝেমধ্যে। টেনশন নিস না, এখন সেরকমই কেইস হবে হয়তো।’
কাব্য কেন যেন ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারলো না। কুহুর শরীর খারাপ নয়তো? কাব্যের মনটা উসখুস করে উঠে হঠাৎ। তানিম জিজ্ঞেস করে——-‘কবে আসছিস?’
কাব্য নিজের ভাবনায় লাগাম টানে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিল——-‘৫ দিন লাগবে।’
‘আরও ৫ দিন? ইয়া খোদা। গায়ে হলুদে থাকবি তো?’ —- তানিম জিজ্ঞেস করে।
কাব্য জবাব দিল———‘হলুদের দিনই আসব।’
‘আর প্রমাণ? ওগুলো?’ —- তানিম গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল।
কাব্য হাসলো এ যাত্রায়! আরাম করে সোফায় এক হাত মেলে দিয়ে বাকা হেসে জবাব দিল——-‘এবার ওগুলো সঙ্গে করেই উনার কাছে যাব। তারপর শুরু করব আমার খেলা। অনেক ঘুরিয়েছে না আমাকে নিজের পেছনে? এবার ওর পালা!’
তানিম হেসে উঠে——-‘কুহুর কপালে আসলেই শনি নাচছে। মেয়েটা নিজেই এত ভুল বুঝেছে শুনলে লজ্জায় পড়বে, দেখিস। আফসোস করবে অনেক।’
কাব্য শুনলো। জবাব না দিয়ে একদৃষ্টিতে মানিব্যাগে থাকা কুহুর হাস্যোজ্জ্বল ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। একটাসময় বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ছবিটায় কুহুকে ছুয়ে দিতে দিতে হঠাৎ মুখটা বাড়িয়ে চুমু খেয়ে বসলো ছবিটায়!
—————————
গ্রিন কেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা!
কুহুর নগ্ন পেটে জেল ক্রিমের উপর ধীর ভঙ্গিতে; মনোযোগ দিয়ে ট্রান্সডিউসার ঘোরাচ্ছেন ডক্টর মিতা। পাশেই কুহুর হাতটা শক্ত করে চেপে ভীষণ আগ্রহী চোখে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে শার্লিন। ট্রান্সডিউসার দিয়ে যতবার একটু গভীরে চাপ দিচ্ছেন মিতা, কুহু চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলছে বারবার। আর সেই সাথে শার্লিনের হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরছে।
মিতা এবার হাসলেন, ট্রান্সডিউসার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কুহুকে দেখাতে লাগলেন———‘মিসেস কাব্য… এই দেখুন আপনাদের বেবি। দেখতে পাচ্ছেন?’
কুহু এবার ব্যথা, অস্বস্তি ভুলে চোখ খুলে ভীষণ আগ্রহে তাকাল মনিটরের দিকে। একটা অস্পষ্ট, অসম আকৃতি কিছু ঘুরছে ডিসপ্লেতে। কুহু সাথেসাথে অবাক হয়ে শার্লিনের দিকে তাকাল। শার্লিন হেসে উঠে কুহুর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল———‘দিস ইজ ইয়োর বেবি। তোদের বাচ্চা। এটা তোর পেটেই বড় হবে। ফিলিংস অ্যামেজিং, না?’
কুহু চোখ টলমল করে উঠল, মাথা নেড়ে আবার তাকাল ডিসপ্লের দিকে। অতি আগ্রহ, অবাক হওয়ার কারণে কুহু এবার ভীষণ বাচ্চাসুলভ প্রশ্ন করে বসে ডাক্তারকে———‘ছেলে না মেয়ে, ডক্টর?’
ডক্টর হেসে বললেন———‘আপনার কী চাই? কী প্ল্যান করেছিলেন আপনারা?’
কুহু চুপ হয়ে গেল। প্ল্যান? কিছুই তো প্ল্যানমাফিক হয়নি। যদি হতো— তাহলে কাব্য ভাইয়ের বাচ্চা কুহুর পেটে থাকত না আজ। কুহুকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে ডক্টর মিতা বললেন———‘ডোন্ট ওরি। বেবির জেন্ডার এখন জানা যাবে না। পরে জানতে পারবেন। রেগুলার চেকআপ করাবেন। নেক্সট টাইম আপনার হাজবেন্ডকে নিয়ে আসবেন, হু?’
শার্লিন মলিন চোখে কুহুর দিকে তাকাল। হঠাৎই কুহু ভীষণ চুপচাপ হয়ে গেছে। তাই শার্লিনই জবাব দিল———‘ওর হাজবেন্ড দেশের বাইরে এখন। এলে উনিই নিয়ে আসবেন।’
ডক্টর মিতা কিছু মেডিসিন লিখে দিলেন। কুহুকে অনেক রকম পরামর্শ দিলেন। কুহু শুধু চুপচাপ শুনে গেল। ডক্টর মিতা বললেন———‘মিসেস কাব্য… টেনশন নেবেন না। হাজবেন্ড দূরে থাকলে এসব একটু মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। আমার হাজবেন্ডও আমেরিকাতে ডিগ্রির কাজে ব্যস্ত। আমাদের দুজনের মন খারাপ একই।’
কুহু মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো ডক্টর মিতার দিকে। উনার চোখ-মুখ টিকরে লাজুক কিছু সুখের আলো ঝড়ছে! কী ভীষণ সুখী দম্পতি ওরা—চোখ-মুখ দেখেই বোঝাই যায়। কুহু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। শার্লিন ডাকতেই ওর ধ্যান ভাঙল।
কুহু কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে একটা চেয়ারে বসলো। শার্লিন একটা ডালিমের জুস কিনে এনেছিল; কুহুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল———‘খা।তোর শরীরের জন্যে দরকারি এগুলো এখন।’
কুহু আলগোছে জুস সরিয়ে দিল। ও চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সামনে, নিশ্চুপ গভীর চিন্তায় মগ্ন। শার্লিন ওকে এভাবে দেখে চুপ করে এসে ওর পাশটায় বসলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুহুর কাঁধে আলতো করে হাত রাখতেই হঠাৎ একইভাবে সামনে তাকিয়ে কুহু বলে উঠে ভীষণ নিথর ভঙ্গিতে———‘শার্লিন. . আমার . .আমার বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী?’
শার্লিন শুনলো। পরপর জুস ধরে রাখা হাতটা নামিয়ে শান্ত স্বরে বলল———‘তুই কী চাস? কেমন ভবিষ্যত চাইছিস?’
কুহু এবার ঘাড় ফিরিয়ে শার্লিনের দিকে তাকালো। শার্লিন ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে আবার——-‘বল. .কি চাচ্ছিস তুই?’
কুহু চোখ ঘুরিয়ে আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্টের দিকে তাকাল। একটা অস্পষ্ট চিত্র, অথচ মনে হচ্ছে, এই চিত্রটাতে কতটা প্রাণ জমা আছে। বারবার কুহুর মনে হচ্ছে— এটা ওর বাচ্চা। শুধুমাত্র ওর উপর ভরসা করেই ওর পেটে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে। এই ছোট্ট বাচ্চার কাছে কুহুই এখন সব, কুহু ওর মা। ও ভরসা করে আছে— ওর মা এখানে, ওর জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী তৈরি করছে।
এবং কুহু চাইলেই সব সম্ভব। নিজের বাচ্চাকে একটা সুস্থ সম্পর্ক, সুস্থ পৃথিবী ও চাইলেই দিতে পারবে। এতে কুহু ছোট হলে হোক— অতীত ভুলে গেলে যাক। শুধু এই বাচ্চাটা কুহুর কাছে থাকুক। সুস্থ থাকুক— মানসিক, শারীরিক দুইভাবেই।
কুহুকে নিশ্চুপ দেখে শার্লিন কুহুকে ডাকল———‘কুহু…!’
কুহু থামে, আচমকা একদম হঠাৎ করে বলে উঠল———‘আমি. . আমি আমার সংসার গোছাবো! আজ থেকে. . এখন থেকে! আমি পারব. . আমার বাচ্চার জন্যে আমি পারব!’
শার্লিন অবাক হয়ে তাকাল কুহুর দিকে। কুহু ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল শার্লিনের দিকে। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলে যায়——-‘সংসারটা আমার না, শার্লিন, হু? বল তুই? আমার সংসার আমি কেন একটা বাইরের মেয়ের জন্যে নষ্ট করব? আমার সাফার করেছি, আমার বাচ্চা কেন একটা বাইরের মেয়ের জন্যে সাফার করবে? আর আমি দিব কেন সেটা? বল তুই? বাচ্চা. . ও তো নিষ্পাপ!’
শার্লিন এবার খুশিতে হেসে উঠে, সাথেসাথে মাথা দুলায়——-‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাই. . সেটাই তো!’
কুহু আবার বলে যায়——-‘যা হয়েছে . . হয়েছে। আর না! আমি ভাবছি কাব্য ভাই এবার লন্ডন থেকে ফিরলে আমি উনার সাথে বসবো। কথা বলে সবটা ঠিক করে ফেলবো। জানিনা কতটা কি পারব. . অন্তত সমঝোতা করব।’
শার্লিন অবাক হয়ে তাকাল, কুহুর হাতটা চেপে ধরে ও খুশিতে। কুহু বলে যায়———‘আমি আমার বাচ্চাকে একটা সুস্থ সম্পর্ক দেব, শার্লিন। এই ভাঙা চোরাবালির সংসার নয়। ও এসে দেখবে, ওর বাবা-মা সুখী, একসাথে হাসছে। এখানে একটা সুস্থ পৃথিবী তৈরি করে রেখেছে ওর জন্য। আমার বাচ্চা এসব ডিজার্ভ করে… করে না বল?’
শার্লিন সাথেসাথেই বলল———‘করে কুহু, অবশ্যই করে।’
কুহু কথা বলতে বলতে হাপিয়ে উঠেছে একপ্রকার! শার্লিন ওকে সান্ত্বনা দিয়ে কুহুর মাথায় নিজের ঘাড় চেপে রাখল। কুহু মাথা হেলিয়ে নিজের পেটে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলে যায়——‘কাব্য ভাই. .ক. . কবে আসবেন? একটা সমঝোতার সংসার নিয়ে আমার কথা বলার আছে উনার সাথে। অনেক অনেক কথা!’
কুহু তখনও বিড়বিড় করে নিজের মতো বলে যায়——‘কথা আছে. . অ. .অনেক অনেক কথা! সমঝোতার সংসার নিয়ে কথা।’
শার্লিন মলিন হেসে ঘাড় নামিয়ে কুহুর দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর বুকটা কষ্টে ভার লাগছে। কুহুর এই অবস্থা দেখে. .ভেতরটা য ন্ত্রণা করছে ভীষণ.! কুহুর জীবন এমন না হলেও পারত!
অথচ. . একজোড়া শালিকের সম্পর্কের এই দ্বিধা-দন্ধ. .এ সবটাই দূর থেকে শকুনি নজরে দেখে যায় সিয়াম। ও এতক্ষণ সবটা দেখে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসে সে কল করল কাউকে।
ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই, সিয়াম আশপাশ ভালো করে দেখতে দেখতে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল———‘ও প্রেগন্যান্ট। সম্পর্কটা ভীষণ নড়বড়ে এখনো, তাসের ঘরের মতো। ভাঙা যাবে সহজেই।’
চলবে
সমঝোতার সংসার চাই? নাকি ভালোবাসা, সম্মানের সংসার?
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২
-
ডেনিম জ্যাকেট স্পয়লার (বিবাহ পরবর্তী)
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৭
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৭
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৪