ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৪৪
অবন্তিকা_তৃপ্তি
রাত ১২:৩০, সিদ্দিক মহলের ছাদে!
আজ স্বামী স্নিগ্ধের বুকে অদম্য সাহস। ধ্রুবর সাথে কথা বলার পর থেকেই এই সাহসের উৎপত্তি। আজ স্বামী স্নিগ্ধ প্ল্যান করেছে স্ত্রী কায়ার সাথে একঘরে ঘুমাবে; এবং স্রেফ ঘুমাবেই। শক্ত করে পেছন থেকে মেয়েটাকে পিসে ধরবে নিজের বুকের সাথে, আর সারারাত গল্প করে ফজর পরে ঘুমিয়ে যাবে একে অন্যের আলিঙ্গনে।
কায়াকে রাজি করাতে এতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি অবশ্য। এক ফোঁটা চোখের পানি: আর বস্তাপচা এমশবাল ব্লাকম্যাইল। ব্যস্ত মেয়েটা আবার স্বামীর কাঁদোকাঁদো ইমোশন চোখেই দেখতে পারেনা, মুহূর্তেই গলে পরে মোমের ন্যায়।
যেই ভাবা সেই কাজ!
ভীষন সতর্কতার সাথে আশপাশ দেখতে দেখতে স্নিগ্ধ পা টিপেটিপে ছাদের চৌকাটে পা রাখলো। আশপাশে উকি দিয়ে দেখলো— কোথায় কায়া আছে।
ওই তো দূরেই, রেলিংয়ের সাথে হেলান দিয়ে আছে কায়া,বাহির দেখছে। গায়ে একটা চাদর, শীতে কাপতে কাপতে অপেক্ষা করছে স্বামীর। স্নিগ্ধের ঠোঁটে হাসি ফুটলো কেন যেন।
ও দ্রুত এগিয়ে গিয়ে: পেছন থেকে ঝাপটে ধরল কায়াকে। ওড়কে বেচারি কায়া পরপুরুষ ভেবে আতঙ্কে চিৎকার করতে যাবে তার আগেই স্নিগ্ধ ওর মুখ চেপে ধরে, দেয়ালে মিশিয়ে দিয়ে আতঙ্কিত স্বরে বলল———— ‘আরে. . আমি, আমি! ডোন্ট শাউট।’
কায়া স্নিগ্ধের হাত মুখ থেকে সজোরে সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল এবার———‘এটা কেমন মশকরা; স্নিগ্ধ?’
স্নিগ্ধ স্রেফ হাসলো। কায়াকে টেনে এনে নিজের সাথে মিশুয়ে দুহাতে ওর কোমর চেপে ধরে নিভু কণ্ঠে শোনাল———‘স্বামী-স্বামী টাইপস মশকরা, মিসেস।’
কায়া তখনও রেগে চোখ গরম করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে: স্নিগ্ধ এবার ভীষন ভাবুক কণ্ঠে কায়ার কোমর চেপে ধরে বলল——‘আচ্ছা: ওয়ান ডাউট। তুই মিসেস স্নিগ্ধ ওর মিসেস সিদ্দিক? কোনটা? হ্যাঁ?’
কায়া মাথা তুলে লম্বা-উচ্চ স্নিগ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল: জবাবও এলো একসময়——-‘অনলি মিসেস স্নিগ্ধ।’
বলে স্নিগ্ধের বুকে মাথা রাখলো; দুহাতে চেপে ধরলো স্বামীর বলিষ্ট পিঠ। স্নিগ্ধের হঠাৎ ভীষণ আদুরে লাগলো কায়াকে: ও অত্যন্ত মায়া নিয়ে কায়াকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললো——-‘আই লাভ ইউ, কায়া জান। আমরা কবে একসাথে থাকবো, আই কান্ট ওয়েট এনিমোর।’
কায়া স্নিগ্ধের বুকে নাক ঘষতে ঘষতে জবাব দিল——-‘আমিও ২। আর শেষের প্রশ্নের উত্তর; জানিনা, কিছু জানিনা। আপনি জানেন এটার উত্তর, আমার জানা নেই। আমি বিয়ে করেছি লুকিয়ে- এটা ভাবলেই আমার আতঙ্কে বুক ধরফর করে উঠে। কেউ জানতে পেলে——‘
স্নিগ্ধ সাথেসাথেই কায়ার কপালে শক্ত একটা চুমু খেয়ে ওকে চুপ করিয়ে দিল———‘আমি জানি উত্তর; সময় এলে তোকেও জানিয়ে দেব। এখন চুপ; জাস্ট আমাকে ফিল কর এখন, আর আমাকেও করতে দে।’
বলে স্নিগ্ধ কায়ার পরনের চাদরটা গা থেকে আস্তে করে সরিয়ে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলল— ‘তোর গায়ে শালের পরিবর্তে আমার ডেনিম জ্যাকেটটা বেশি মানাবে।’
কায়া উত্তর দিল না। স্রেফ তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধের মুখটার দিকে। স্নিগ্ধ আস্তে করে চাদরটা সরিয়ে দিয়ে কায়ার শরীরে ওর জ্যাকেট জড়িয়ে দিল। চাঁদের শীতল বাতাসে এবার হয়তো ওর ঠান্ডা লাগছে। স্নিগ্ধের মুখ তীব্র শীতে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে দেখে কায়া বললো— ‘ঠান্ডা লাগছে তো আপনার; কাপছেন।’
‘হুঁ? ঠান্ডা লাগছে?’ — স্নিগ্ধ কাপতে কাপতে বলল।
তারপর কায়ার দিকে বাঁকা চোখে চেয়ে অশ্লীল কণ্ঠে বলল———‘তাহলে তুই গরম করে দে আমাকে।’
বলে কায়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, একটা স্বৈরাচারী স্বামীর ন্যায় কায়ার ঘাড় থেকে জ্যাকেটটা একটু সরিয়ে নিয়ে মুখ ডুবালো আস্তে করে ওখানটায়। নাক-মুখ ডুবিয়ে ছোট ছোট চুমু খেতে খেতে বলে গেল————‘তোর গায়ের পারফিউম: উম। স্মেলটা মারাত্মক। এতটা সফ্ট ঘাড়; মনে হচ্ছে তুলোতে চুমু খাচ্ছি। তুই কোলবালিশ হিসেবে বেস্ট।’
‘ছিহ্।’ — কায়া ঘাড় সঙ্কোচিত করে; মৃদু চিৎকারে শাসিয়ে উঠল।
স্নিগ্ধ ঘাড় থেকে মুখ তুলে কায়ার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল; চোখ গরম কোরে চেষ্টা করে পুনরায় স্বৈরাচারী স্বামীর ন্যায় বললো———‘এই‘ছিহ্ মানে কি? এখনো আমার গার্লফ্রেন্ড তুই? বউ হয়ে নাক চিটকাস কেন এখনো? ছুতে পারিনা?’
কায়া স্নিগ্ধের বাচ্চাদের মতো রাগ দেখে হেসে উঠে স্নিগ্ধের বুকে হাত ঠেলে ওকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল———- ‘না জনাব, ছুঁতে পারেন না। কারণ আমি অভ্যস্ত নই বউ সম্পর্কটায়।’
‘কিন্তু আমি তো স্বামী সম্পর্কটায় অভ্যস্ত, কায়া!’ — স্নিগ্ধ বাচ্চাদের মতো মুখ করে কথাটা বলে পুনরায় কায়ার ঘাড়ে আবার মুখ ডুবালো। নাক দিয়ে যেন টেনে টেনে ঘ্রাণ নিতে লাগল ঘাড়ের ওই অংশ থেকে।
ওদিকে কায়ার ঘাড়ে স্নিগ্ধর ছোট ছোট চুমু খাচ্ছে, আর ওদিকে চুমুর তালে শিউরে উঠছে কায়া বেচারি।
আচমকা, স্নিগ্ধ হঠাৎই চুমুর বদলে ঘাড়ে দাঁত বসাতেই কায়া ব্যথাতে চিৎকার দিল। স্নিগ্ধ সাথে সাথেই ওর মুখ আটকে দিল————- ‘ইয়া আল্লাহ! এটা কেমন আওয়াজ! কেউ শুনলে. .!’
কায়া সাথেসাথে নিজেকে সামলেচোখ রাঙাল——— ‘তাহলে কামড় দেবেন না।’
‘হুঁ?’ — স্নিগ্ধ সেসব গায়েও মাখল না। এবার নিজের মতো আলগোছে কায়ার জ্যাকেটটা খুলে ফেলে দিল। কায়া তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধর চোখের দিকে———- ‘কি করছেন আপনি?’
স্নিগ্ধ কায়াকে পাজকোলে তুলে নিল আচমকা। ছাদের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই বেচারি আতঙ্কে কায়া ছটফটিয়ে উঠল———-‘‘ইয়া মা–বুদ! ছাড়ুন, কোথায় যাচ্ছেন আপনি! আল্লাহ! স্নিগ্ধ, বড় মা নিচে; কেউ দেখে নিলে সর্বনাশ! স্নিগ্ধ, পাগলামি করে না। আল্লাহ দোহাই! নামান আমাকে।’
কায়া ছটফট করতে করতে বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে, এই বুঝি কেউ এলো: কেউ দেখে ফেলল। স্নিগ্ধ তখন কায়ার কোমরটা শক্ত করে জাপটে ওকে আরও নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে হো হো করে গানে সুর তুলেছে—-
— Rat ka nasha abhi
aankh se gayan nahi —
কায়া এই গান শুনে তো রীতিমতো হতবাক হয়ে তাকাল স্নিগ্ধর দিকে। স্নিগ্ধ কায়াকে নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে গেল। তারপর আলগোছে আশপাশে না তাকিয়ে সোজা দরজার সিটকিনি আটকে দিল।
শামিমা তখন সবে পানি নিতে রান্নাঘরে এসেছিলেন। পুরোটা দৃশ্য তার চোখের সামনেই ঘটল সেবার। তিনি দেখলেন রাতের আধারে তার ছেলে চোরের মতো কুহুর মামাতো বোনকে নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে সিটকিনি তুলেছে।
শামিমার হাত থেকে আর পানির জগ উঠল না। উনি ধড়ফড় করা বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সেভাবেই, কাপতে থাকেন থরথরিয়ে!
রাসেল ভাইয়ের চায়ের দোকান, শ্রীমঙ্গল!
সম্পূর্ণ একটাদিন; একটারাত পার হয়ে যাবার পরেও; কাব্য-কুহুর মধ্যকার ফাটল জোড়া লাগল না সেদিন আর। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে— সবসময়ের মতো এবার আর কাব্যও এগিয়ে গেল না কুহুর রাগ ভাঙ্গাতে। বরং ও এই একটাদিন পুরোটাই ও রিসোর্টের বাইরে আবিরের সাথে ঘুরে ফিরে বেড়িয়েছে। কুহুকে দেখে রাখার জন্যে আবিরের বোনকে পাঠিয়ে দিয়েছে ওর কাছে। সেদিন রাতেও কাব্য রিসোর্টে ফেরেনি। বন্ধুর সাথে শ্রীমঙ্গলের অলিগলিতে থেকেছে, রাতে ওর বাসাতেই থেকেছে। তবুও- একবারের জন্যে কুহুর মুখোমুখি হয়নি, হয়তবা চক্ষুলজ্জায় কিংবা আত্ম-সম্মানে আঘাতের রাগে।
কাব্যের হানিমুনে এসে স্ত্রী থেকে রাত-দিন বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ানো—- আবির সবটাই লক্ষ করছে এইবার। তখন ওর সামনে কাব্য কোকের বোতল থেকে ঢকঢকে করে কোক গিলছিল, ওর মনটা আজ ভীষণ উষ্কখুষ্ক। অব্দি কথাও বলছে ভীষণ মেপেঝেপে; কোথাও যেন খুইয়ে খুইয়ে থাকছে পুরোটাক্ষন। আবির দূর টুকে কাব্যকে দেখছে তীক্ষ নজরে— ভাবছে এসবই। ওভাবেই চায়ের বিল মিটিয়ে এগিয়ে এলো এইবার; কাব্যের কাছে।
কাব্যের পাশে বেঞ্চটায় বসলো কিছুক্ষণ——চুপ করে, কথা না বলে। স্রেফ কাব্যের আচরণ দেখল; ওর শিভারিং হওয়া হাত দেখল, ওর কুচকানো ভ্রু দেখলো; সাথে এও দেখলো ঘাড়ের নখের আঁচড়— যা প্রায় ফেইড হয়ে আসছে। ফজর আজান হচ্ছে দূরে কোথাও, তখনো সূর্য উঠেনি। শীতকালে এমনিতেই কুয়াশায় সূর্য দেখা যায়না ভোরে। তারউপর কাব্য এই শীতে একটা জ্যাকেট পড়ে সারাদিন; সারারাত বাইরে থেকেছে। সারারাত বাইরে থাকলে জ্যাকেটেও কি শীত মানে। এইতো হাচি দিচ্ছিলো একটু আগে, নাক লাল হয়ে যাচ্ছে। জ্বর-টর উঠছে নাকি? বলা যায়না—-হতেও পারে। কাব্যের আবার শীতকালে ঘনঘন ফিভার হয়।
আবির একসময় কাব্যের দিকে চেয়ে থেকে বলে উঠলো——-‘জানিস কাব্য? আমরা মুসলিমরা মদের পরিবর্তে কোক খেয়ে ব্রেকআপপার্টি করি।’
কাব্য কোক খাওয়া থামিয়ে দিয়ে আবিরের দিকে তাকালো। পরপর চছোট একটা হাসি ছুড়ে আবার কোক খেতে লাগলো। আবির এবার কাব্যের দিকে চেয়ে আস্তে করে প্রশ্নটা করো——-‘কাব্য? কি হয়েছে তোর?হু? আপসেট?’
কাব্য কোক গিলতে গিলতে জবাবে বলল——‘হু? কি হবে আবার? কোনো আপসেট-ট্যাপসেট না।’
কাব্যের মিথ্যাটা এতটা সহজে গিললো না আবির। শান্ত কণ্ঠে বলল——‘কুহুর সাথে কি নিয়ে ঝামেলা এইবার?’
কাব্য কোক গেলা থামিয়ে তাকাল পাশ ফিরে।আবির ভ্রু উঁচিয়ে ওর দিকে জবাব শোনার আশাতেই তাকিয়ে আছে। কাব্য হাসলো স্টেফ: পরপর আবার কোক গিলে বলল——‘নাথিং, কি হবে আবার ওর সাথে?’
আবির এবার কাব্যের কাঁধে হাত রাখলো। কাব্য কোকের বোতল আস্তে করে বেঞ্চের উপর ঠেসে রেখে গম্ভীর চোখে সামনে তাকিয়ে থাকল। আবির ভীষণ নরম কণ্ঠে বলল——‘কাল সারাটাদিনতুই রিসোর্টে যাস নি; আজ ফজর আজান দিচ্ছে— এখনো উঠছিস না—একইভাবে বসে আছিস। কুহু অপেক্ষা করছে তোর জন্যে। মেয়েটা তোর সাথে ঘুরতে এসেছে: আর তুই এখানে বসে আছিস।’
কাব্য দায়ছাড়াভাবে চায়ের দোকানদারের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলল——-‘এই রাসেল; আরেকটা কোক প্লিজ।’
চা দোকানের চোকড়াটা ছুড়ে মারল একটা কোকের বোতল কাব্যের দিকে। কাব্য সাথেসাথেই দক্ষ হাতে কোকের বোতলটা ক্যাচ করে নিলো। সেটার ছিপি খুলতে খুলতে বললো—‘চলে যাব একটু পর; রিসোর্টে। সূর্য উঠুক।’
আবির বলল——‘এখন চলে যা: সূর্য উঠার অপেক্ষা করবি কেন?’
কাব্য উত্তর দিল না এটার: বরং বলল——‘আজ ঢাকা চলে যাচ্ছি; ১০ টায় ফ্লাইট। সিলেট এয়ারপোর্ট অব্দি দিয়ে আসতে পারবি?’
আবির সাথেসাথে ভ্রু কুচকে ফেলল; ——‘আজ যাবি? কেন? আরও না দুদিন থাকার কথা?’
কাব্য থেমে গেল কেন যেন। তারপর কি মনে করে আবার ছিপি আটকে কোকের বোতলটা ছুড়ে ফেলল অবহেলায় দূরে। আবির দেখল এটাও।
কাব্য জ্যাকেট ঠিকঠাক করে উঠে দাড়িয়ে হা করে উপরে মাথা তুলে শ্বাস ফেল একটা। কুয়াশার শীতে শ্বাসের সাথে ধোয়া বের হলো ঘূর্ণিপাকের মতো। কাব্য ছন্নছাড়া কণ্ঠে বলল——‘কাজ আছে ঢাকায়; যেতে হবে।’
জ্যাকেটের পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে রাস্তার এককোন ঘেষে আবির-কাব্য। হাটতে হাঁটতে পাশ থেকে আবির বলে যায়——‘কিন্তু আজ কেন? আর কি কাজ তোর এত- যে হানিমুন ফেলেই চলে যাচ্ছিস?’’
কাব্য বলে যায়——‘জাতীয় ন্যাশনাল ফুটবল টিমে চান্স পেয়েছি। ওরা কল করছে বারবার, জয়েন করার জন্যে। ভাবছি এইবার জয়েন হয়ে যাব।’
আবির অবাক হয়ে বলল—-‘কিন্তু তুই তো ওদের মানা করেছিলি। বিয়ের পর কুহুকে একা করে কোথাও যাবি না বলে। তাহলে আজ একসেপ্ট করলি কেন?’
কাব্য মাথাটা নিচু করে একটা ক্ষুদ্র পাথর ধাক্কা দিতে দিতে সামনে নিয়ে যেতে থাকে: সেভাবেই বলে যায়—-‘কুহু থাকতে পারবে একা. . এখন থেকে। আমার নিজের জীবনটা গোছানো লাগবে এইবার। কেউ আমাকে ছেড়ে গেলে,ব্যস্ত থাকার জন্যে কিছু তো করা লাগবে। আর ভালো অফার; ফুটবল ন্যাশনাল টিম—— লটারি অফার ছেড়ে দেব কেন?’
আবির শেষের কথাটা ধরেনা; ওর ভাবনায় তখন আটকে আছে একটিই কথা——‘কেউ ছেড়ে গেলে: কিছু তো করা লাগবে’
আবির সাথেসাথেই অত্যাধিক টেনশনেই মাঝপথে হাঁটা থামিয়ে গেল। কাব্য তখনও হাঁটছিল: আবিরকে থেমে যেতে দেখে পেছন ফিরল এবার——-‘কি, থামলি কেন?’
আবির ভ্রু কুচকে বলল——‘তুই কুহুর সাথে ঝগড়া করে বেরিয়েছিস; রাইট?’
কাব্য শুনলো। পরপর ছোট করে হাসলো। ফিরে এসে আবিরকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল——‘মিয়া বিবির মধ্যে ঢোকা ঠিক না, দোস্ত। ব্রেইনকে এতো কষ্ট না দিয়ে পা চালা। মসজিদের নামাজ শুরু হয়ে গেছে অলরেডি।’
——————
পাঁঙ্গন রিসোর্ট; শ্রীমঙ্গল!
কুহু আজ সারারাত টেনশনে একগোটা ঘুমায়নি। ওদিকে আবিরের কিশোরী: পনেরো বছরই বোন ওর পাশেই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে— হুশ-জ্ঞান খুইয়ে।
কাব্য আজ রাতে বাড়ি ফেরেনি, সারাদিন-সারাটারাত ধরে বাইরে। এই শীতে কোথায় আছে জানেওনা। ফোন করবে তারও উপায় নেই, ফোনটা তো ওই ভেঙেছে। গতকাল রাগের মাথায় যা নয় তাই বলে দিয়েছে— কেন যেন কুহুর আফসোস হচ্ছে এখন। একবার তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল——ভিডিওটা কেন করেছে। বিষয়টা দুজন বসে ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করা যেত- আর সেখানে কুহু রাগারাগী করে ফেলেছে, সম্ভবত একটু বেশিই বলেছে।
কুহু একবার ভাবল— আবিরকে কল করবে। আবিরের সাথে নেই তো কাব্য? কিন্তু ওর কাছে তো নাম্বার নেই। ওহ. . এক সেকেন্ড। আবিরের ছোট বোনের কাছ থেকেও তো নম্বর নেওয়া যায়। ভাবনাটা মাথায় আসামাত্রই দৌড়ে গেল আবিরের ছোট বোন মাইরার কাছে— ওকে জেগে তোলার জন্যে। যেইনা তুলতে যাবে— দরজার বাইরে টোকা পরলো, আর সেইসাথে দরজার লক খোলার আওয়াজ হচ্ছে।
কুহু বুঝে গেছে কাব্য এসেছে। কুহু সাথেসাথে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কাব্য দরজা খুলেই সবার আগেই কুহুর উৎকুণ্ঠিত চেহারা খেয়াল করল। কুহু উত্তেজিত হয়ে কাব্যকে বলে গেল একের পর এক—‘কই ছিলেন আপনি সারাটারাত? হ্যাঁ? আমাকে অচেনা জায়গায় এভাবে রেখে চলে গেলেন? উত্তর দিচ্ছেন না কেন? বড়মা কল করেছে কতবার: আমার তাকে কি জবাব দেওয়ার কথা ছিল? মিথ্যে বলেছি আমি- যে আপনি সাথেই আছেন আমার। অথচ আপনি বলেও যাননি কোথায় যাচ্ছেন, আমাকে রেখে গেছেন ছোট একটা অবুঝ মেয়ের সাথে। এতটা কেয়ারলেস আপনি। এই জায়গার আমি কিছু চিনি? কোথায় খুঁজতে যেতাম আপনাকে: হ্যাঁ?’
কাব্য মাথাটা নিচু করে কুহুর সব কথা শুনে গেল; একটাবার কুহুর চোখের দিকেও তাকাল না অব্দি। কুহুর বকাঝকা শেষ হলে ছোট গলায়, মাইরাকে দেখিয়ে বললি——‘ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দে: নিচে আবির ওয়েট করছে।’
‘মানে?’ — কুহুরা এতসব কথার উত্তরে এ ধরনের উত্তর দিবে কাব্য— ভাবেনি ও।
কাব্য মাথার টুপিটা খুলে ক্যাপ পড়লো একটা। তারপর নতুন কেনা ফোনটার প্যাকেজিং আনবক্স করতে করতে শান্ত স্বরে বলল——-‘আমি বাংলায় বলেছি।’
কুহু কিছুক্ষণ কাব্যের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। পরপর আস্তে করে মাইরাকে ডেকে তুলে দিল ঘুম থেকে। মাইরা হিজাব পরে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে আবিরের সাথে চলে গেল নিজের বাসায়।
ওদিকে কুহুকে ওভাবেই হতবম্ব করে রেখে কাব্য নিজের মতো আনবক্স করতে পাগল নতুন কেনা আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স। কুহু চুপচাপ কাব্যের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মাথায় ব্রাউন কালারের একটা ক্যাপ পরে আছে, গায়ে ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট: জ্যাজেটের নিচে সাদা টিশার্ট। জ্যাকেটের ফাঁকে উকি দিচ্ছে ঘাড়ের মধ্যে নকশার মতো কুহুর পরশু রাতের করা নখের আঁচড়!
এভাবে; এই নখের আঁচড় দেখিয়ে দেখিয়ে এই লোকটা বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছে বন্ধুর সাথে? ছি; কি ভাবছেন আবির ভাই আল্লাহ জানে।
এই কাজের জন্যেও মনে হলো— একটা বকাঝকা করতে এই নির্লজ্জ পুরুষকে। কিন্তু বকল না। কাব্য চুপ হয়ে আছে ভীষণ, বকা দিলেও মাথাটা অব্দি কুহুর দিকে তুলছে না— শুধু শুনছে। এভাবে কথা বলে, রাগ করে আরাম পাওয়া যায়না।
কুহু একসময় কাব্যের পাশে বিছানায় বসলো। কাব্যের দিকে চেয়ে দেখতে লাগল ওর কাজ। কাব্য হঠাৎ হাচি দিল, নাক আবার লাল হয়ে যাচ্ছে। কুহু এবার যেন উদ্বিগ্ন হলো। কাব্যের তো আবার শীতে ঘনঘন অসুস্থ হওয়ার রেকর্ড আছে। আর সাথেসাথেই উঠে এসে কাব্যের দিকে তাকিয়ে বলল——‘হাচি. . দিচ্ছেন যে? জ্বর উঠলো না তো আবার।’
বলেই কপাল হাত ছোয়াতে যাবে; তার আগেই কাব্য ওর দিকে না তাকিয়েই কুহুর নাগালের বাইরে কপালটা সরিয়ে ফেলল। কুহু বোকার মতো হাত ওভাবেই নিয়ে কাব্যের এই কাণ্ড দেখল। কাব্য কপাল সরিয়ে কুহুর দিকে না চেয়েই শীতল কণ্ঠে বলল——‘ওভাররিঅ্যাক্ট করার কিছু নেই। ঠিক আছি আমি।’
কুহু হাত নামিয়ে ফেলল, নিচু কণ্ঠে বললো——‘আমি ওভাররিঅ্যাক্ট করছি? সারাটারাত শ্রীমঙ্গলের এই শীতের মধ্যে বাইরে ছিলেন: জ্বর হওয়ার চান্স বেশি। তাই চেক করছিলাম শুধু।’
কাব্য মাথাটা তখনও ক্যাপের আড়ালে নামিয়ে রেখেছে: সোজা হয়ে বসে মোবাইলের সেটিং ঠিক করতে করতে বলল——-‘জ্বর হলে এতো অধিক্ষেতার কিছুই নেই। লেস হার্মফুল সিমটম, ওভাররিঅ্যাক্ট এর চেয়ে মেডিকেশন বেশি কাজে দিবে। ডোন্ট বি সিলি।’
কুহুকে ওতগুলো কথা বলে কাব্য ফোনটা অন করে সবার প্রথমে কল দিল আবিরকে। আবির কথা বলল ওপাশে কিছু, কাব্য রিপ্লাই করলো——-‘গাড়ি পেয়েছিস?’
আবির উত্তর দিল——‘হ্যাঁ: আটটার গাড়ি আছে। কুহুকে বলেছিস?’
কাব্য আড়চোখে কুহুর দিকে চেয়ে দেখে; কুহু ভ্রু কুচকে ওর কথাই শুনছে। কাব্য চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল——‘বলব এখন। বাই।’
ফোন কেটে দিল কাব্য। কুহু পাশ থেকে আগেভাগেই বলল——‘গাড়ি? কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
কাব্য ভীষণ স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো——‘ঢাকায়, বাসায়।’
‘মানে! আজ কেন?’ —- কুহু চুড়ান্ত বিস্মিত।
কাব্য মোবাইলে কিছু একটা করছিল, থেমে গেল। এতক্ষণে কুহুর দিকে চেয়ে ভীষণ ঠান্ডা কণ্ঠে বলল——‘একচুলি. . আম নট গেটিং দ্য পয়েন্ট। এই রিঅ্যাকশন কেন? আমি তো অন্য রিয়াকশন এক্সপ্রেক্ট করছিলাম।ফরগেট ইট! এখানে থাকার কারণে দুজনের দম বন্ধ লাগছে: আর সেকেন্ডলি হানিমুন নামের তামাশা দেখার শখ নেই আমার। তাই চলে যাচ্ছি। সিম্পল!’
বলে কাব্য ফোন চার্জে দিয়ে টাওয়াল নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। কুহু তখনও আহাম্মক হয়ে কাব্যের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মাথায় তখনও ঘুরছে কাব্যের বলা দুটো কথা-
~ দুজনের দমবন্ধ লাগছে
~ হানিমুন নামের তামাশা
কাব্যের দমবন্ধ লাগছে এখানে, ওর সাথে থেকে? তামাশা বলতে কি বুঝিয়ে গেল সে? গতকালের বিষয়টা কি কাব্যকে খুব বেশি গায়ে লেগে গেছে? কষ্ট পেয়েছে খুব বেশি? কুহু বোধহয় একটু বেশি বলে ফেলেছে। নিজেরই কেমন যেন একটা লাগছে এখন। ওভাবে না বলে কাব্যের সাথে ঠান্ডা মাথায় কুহুর বিষয়টা এক্সপ্লেইন করা উচিত ছিল। তা না করে. . .
কুহুর ইচ্ছে হলো সরি বলতে। পরমুহূর্তে আটকে গেল। সরি বলার কি আছে এখানে? কাব্য ভাই ওসব ভিডিও না করে নিশ্চয়ই কুহু এতটা রিঅ্যাক্ট করতো না। এই দুনিয়ার কোন মেয়ে এই ভিডিও দেখে রিঅ্যাক্ট করবে না? আর কুহুর এই রিঅ্যাক্ট করার পেছনে কাব্য ভাইয়ের পূর্বের করা নিজেরই কুকীর্তি দায়ী। ঊর্মির সাথে এতটা মাখোমাখো সম্পর্ক না হলে তো কুহু নিশ্চয়ই তার কথা বিশ্বাস করতো, সাথে তাকেও।
কুহু চেয়েও: সেদিন আর দুটো শব্দ ‘সরি’ বলতে পারল না কাব্যকে। এই সামান্য দুটো অক্ষরটাই কুহুর সেবার ভীষণ: ভীষণ ভারি লাগলো; বোঝা মনে হলো।
না কুহু নিজে থেকে দায় স্বীকার করে সরি বললো, আর না আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হওয়া কাব্য নিজের বেদনা ভুলে সবসময়ের মতো স্ত্রী কুহুকে পুনরায় আগলে নিল।
তারপর……দুজনের দুদিকে টেনে রাখা সম্পর্কের সুতোতে ফাটল ধরলো। কাব্যও নিজের থেকে সুতোর টান ঢিলে করল না; কুহু টেনে ধরল সুতোকে আরও শক্ত করে— সুতো ছিঁড়তে শুরু করল একসময়। একটা ভালোবাসাময় সম্পর্কের ফাটল ধরার শুরুটা ঠিক এখান থেকেই শুরু হলো।
চলবে
এই পর্বে যদি আজকের রাতের মধ্যে ৬.৫ হাজার রিয়াক্ট, বা বেশিবেশি গল্প নিয়ে বড় কমেন্ট আসে আপনাদের— তাহলে পরশু আরেকটা পর্ব দিব কাব্য-কুহুময়। এবার থেকে সত্য সত্য রেগুলার দিব এখন থেকে, যদি আপনারা শর্ত পূরণ করতে পারেন আজকের।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১০
-
ডেনিম জ্যাকেট স্পয়লার (বিবাহ পরবর্তী)
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৫
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৭
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৭
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪২