Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪০


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি

পর্ব-৪০

মধ্যরাত। ধানমন্ডির আকাশটা আজ মেঘলা, তামাটে রঙের এক অদ্ভুত আভা চারদিকে এক রহস্যময় মায়া ছড়িয়ে রেখেছে। ফারহান ছাদের রেলিং ধরে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আঙুলের ডগায় জ্বলন্ত সিগারেট থেকে পাতলা ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে, যা পরক্ষণেই রাতের বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে বিলীন অস্তিত্বের মতো। ফারহানের দৃষ্টি বহুদূরে প্রসারিত—হয়তো সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারের কোনো এক বিষাক্ত স্মৃতির গহীনে ডুব দিয়ে সে খুঁজছে নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে।

হঠাৎ পেছনের দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। ফারহান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ফারিহা ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে। ফারিহা মেয়েটা বরাবরই খুব পরিশীলিত আর মার্জিত।

স্কুল-কলেজের দিনগুলোতে সে ছিল ফারহানের মতোই প্রথম সারির মেধাবী ছাত্রী। বন্ধুদের আড্ডায় সে যতটা চঞ্চল, ব্যক্তিগত পরিসরে ততটাই গম্ভীর আর মায়াবী।

ফারহান ফুসফুস থেকে ধোঁয়া ছেড়ে নিচু স্বরে বলল, “তুই এত রাতেও ঘুমাসনি ফারিহা? নিচে তো সবাই ঘুমে কাদা।”

ফারিহা এসে রেলিংয়ের ওপর হাত রাখল। রাতের ফুরফুরে বাতাসে ওর ওড়নাটা অবাধ্য হয়ে উড়ছে। সে শান্ত গলায় উত্তর দিল, “ঘুম আসছিল না রে। কেন জানি মনের ভেতরটা কু ডাকছে, অস্থির লাগছে খুব। কিন্তু তুই এখানে একা একা কী করছিস?”

“আকাশের চাঁদ দেখছি,” ফারহান বিষণ্ণ স্বরে উত্তর দিল। ওর কণ্ঠে এক অদ্ভুত উদাসীনতা।

ফারিহা মৃদু হাসল, তারপর ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “আর কতকাল এভাবে আকাশের মরা চাঁদ দেখবি ফারহান? এবার বাস্তবে একটা চাঁদ দেখার চেষ্টা কর।”

ফারহান কথাটা ঠিক ধরতে পারল না; ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। ফারিহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করল, “বলছি যে, আমাদের সার্কেলের সবার দিকে তাকিয়ে দেখ—সবাই প্রেম করছে, কারো তো বিয়েও ঠিক হয়ে যাচ্ছে। তুই কেন এখনো এমন একলা পড়ে আছিস? সেই স্কুল-কলেজ থেকে তোকে দেখছি, তুই চিরকালই একা। পড়াশোনায় রোল নম্বর এক ছিলি, ক্লাসের ক্যাপ্টেন ছিলি—কত মেয়ে তোর জন্য পাগল ছিল, কতজন তোর সাথে একটু কথা বলার জন্য পথ চেয়ে থাকত… তুই কি একবারও কারো দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলি না?”

ফারহান সিগারেটের শেষ টান দিয়ে সেটাকে মেঝেতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে ফেলল। ওর ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল—যা হয়তো নিজেকেই বিদ্রূপ করা। সে খুব নির্লিপ্ত গলায় বলল, “ওসব আজেবাজে বিষয়ে পাত্তা দিলে আর রোল নম্বর এক হওয়া লাগত না ফারিহা। ক্লাসের ক্যাপ্টেন হিসেবে ডায়েরিতে নাম তোলার চেয়ে আমার নিজের লাইফটা কন্ট্রোল করা তখন বেশি জরুরি ছিল।”

ফারিহা কিছুক্ষণ থমকে রইল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে ফারহান কোনো একটা সত্য আড়াল করতে চাইছে। সে আরও একটু নরম গলায় বলল, “কিন্তু এখন তো আর সেই স্কুলের দিন নেই ফারহান। জীবনটা তো এভাবে মরুভূমির মতো কাটিয়ে দেওয়া যায় না। কারো জন্য কি তোর মনে সত্যি একটুও জায়গা নেই?”

ফারহান এবার কোনো উত্তর দিল না। তার চোখের সামনে তখন মেক্সিকোর সেই উগ্র, জেদি আর মায়াবী মেয়েটা—লুসিয়া ভেসে উঠল। ফারহান মনে মনে ভাবল, ‘আমি তো বাস্তবের সেই চাঁদটাকে ছুঁতে গিয়ে নিজেই আরো বেশি কলঙ্কিত হয়ে গেছি ফারিহা। আমার জীবনে এখন স্নিগ্ধ চাঁদের আলো নয়, বরং জমাট বাঁধা অন্ধকারই বেশি মানায়।’

ফারিহা ফারহানের এই পাথুরে নীরবতা দেখে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে শুধু দেখল, জ্যোৎস্নার আলোয় ফারহানের মুখটা এক কঠিন ভাস্কর্যের মতো শক্ত হয়ে আছে। সে ঘুণাক্ষরেও জানত না যে, মেক্সিকোর এক বিষাক্ত নারী আজই তার ডিজিটাল জগত তছনছ করে দিয়েছে—শুধুমাত্র এই মানুষটার ওপর নিজের একচ্ছত্র অধিকার জাহির করতে।

ধানমন্ডির সেই নিস্তব্ধ ছাদে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দটা হঠাৎ যেন আরও প্রখর হয়ে উঠল। ফারহান কিছুক্ষণ আগে নেভানো সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা রেলিংয়ের এক কোণায় পড়ে থাকতে দেখল। ওর চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি সামনের কোনো এক অদৃশ্য বিন্দুর দিকে স্থির। ফারিহার কথার এই ঘোরানো প্যাঁচ আর রূপকগুলো এই মুহূর্তে ওর ঠিক সহ্য হচ্ছে না।
ফারহান পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে আরেকটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরল। লাইটারের নীল শিখাটা রাতের অন্ধকারে একবার জ্বলে উঠতেই ওর পাথুরে মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। দীর্ঘ এক টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সে সরাসরি ফারিহার চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “কী বলতে চাইছিস সরাসরি বল তো ফারিহা? কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে লাভ নেই, আমি তোর মনের ধাঁধা মেলাতে আসিনি।”

ফারিহা বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। ওর দীর্ঘদিনের জমানো কথাগুলো আজ যেন সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে কাঁপাকাঁপা গলায়, অনেকটা মরিয়া হয়ে বলতে শুরু করল—”সরাসরিই বলছি ফারহান। আমি জানি তুই ঠিক কেমন। সেই স্কুল লাইফ থেকে তোকে দেখছি, তুই পড়াশোনা আর নিজের গণ্ডি ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝতি না। তুই কখনো প্রেমে পড়িসনি, আর আমি জানি তুই কোনোদিন পড়বিও না। তোর মনে আগেও কেউ ছিল না, এখনো নেই—তুই এক নিরেট পাথরের মতো একা।”

ফারিহা একটু থামল, নিজের সাহস সঞ্চয় করে এক পা এগিয়ে এসে ফারহানের খুব কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “কিন্তু ফারহান… আমি তো সেই স্কুল লাইফ থেকে তোকে পছন্দ করি। শুধু পছন্দ না, আমি তোকে ভালোবেসে এসেছি নিঃশব্দে। আমি চাই আমাদের পরিবারকে জানিয়ে সরাসরি তোকে বিয়ে করতে। আমাদের দুই ফ্যামিলির জানাশোনা তো বহুদিনের। তুই কি… তুই কি আমাকে তোর জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিবি?”

ফারহান যেন এক মুহূর্তের জন্য জীবন্ত কোনো পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। ফারিহার এই সরাসরি প্রস্তাবটা ওর কাছে একদম অপ্রত্যাশিত ছিল না, কিন্তু এই চরম মুহূর্তে এটা এক বিশাল বড় পাহাড়সম বোঝার মতোই লাগলো। ওর মস্তিষ্কের কোণায় তখন মেক্সিকোর সেই ধুলোবালিমাখা অ্যাপার্টমেন্ট, আর লুসিয়ার সেই অবাধ্য জেদি মুখ আর সেই ভালোবাসার চাউনি সিনেমাটিক রিলে ভেসে উঠছে।

ফারহান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল— ‘ফারিহা, তুই যাকে পবিত্র আর সিঙ্গেল ভাবছিস, সে আসলে মেক্সিকোর এক বিষাক্ত গোলকধাঁধায় আটকে আছে। তোকে বিয়ে করা মানে তোকে এক জীবন্ত নরকের আগুনের মুখে ঠেলে দেওয়া। আমি তো নিজেই এখন এক ফেরার আসামি।’

ফারহানকে নিশ্চুপ দেখে ফারিহা আবার মৃদু, আর্ত স্বরে বলল, “তুই কি কিছুই বলবি না ফারহান? আমি জানি আমি তোর মতো অতটা ব্রিলিয়্যান্ট নই, কিন্তু আমি তোকে সারাজীবন আগলে রাখতে পারব। তুই কি আমাকে একবার সুযোগ দিবি?”

ফারহান ধীরপায়ে রেলিং থেকে সরে এল। ওর চোখের মণি দুটো এখন তীক্ষ্ণ আর নির্লিপ্ত। সে খুব শান্ত কিন্তু ভারী গলায় উত্তর দিল—”ফারিহা, জীবনটা কোনো স্কুল বা কলেজের রেজাল্ট শিট নয় যে আমি ১ নম্বর হয়েছি বলে তুই আমাকে রিওয়ার্ড হিসেবে পাবি। আমি এখন এমন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, যার শেষ আমি নিজেও জানি না। তোকে উত্তর দেওয়ার আগে আমাকে নিজের ভেতরের সত্তার সাথে লড়তে হবে।”

ফারহানের কণ্ঠস্বর এখন আর আগের মতো উদাসীন নেই; তাতে এক গভীর হাহাকার আর তীব্র দহন মিশে আছে। ফারিহার সোজাসাপ্টা প্রস্তাবটা ওর বুকের ভেতর এক অপরাধবোধের পাহাড় তৈরি করেছে, যা নামানো ওর সাধ্যের বাইরে।

ফারহান রেলিং ধরে দীর্ঘক্ষণ নিথর হয়ে থাকার পর ফারিহার দিকে ফিরে তাকাল। ওর চোখ দুটো যন্ত্রণায় লাল হয়ে আছে। সে খুব ধীর আর ভাঙা গলায় বলল—”ফারিহা, আমি জানি আমি তোকে এখন অনেক বড় কষ্ট দিচ্ছি। হয়তো এই কথাটা তুই আরও আগে বললে আমি গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখতাম। তখন হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতো, অনেক বেশি শান্ত আর স্বাভাবিক। কিন্তু এখন… ফারিহা সরি, প্লিজ আমাকে মাফ করিস। আমি তোকে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে পারব না।”

ফারিহা আকাশ থেকে পড়ল। ওর চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করে উঠল, যা গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। সে অবিশ্বাসের সুরে ফিসফিস করে বলল—”কেন ফারহান? তুই কি… তুই কি তবে অন্য কাউকে তোর মনে জায়গা দিয়ে ফেলেছিস? আমার চেয়েও বেশি কেউ কি তোর জীবনে চলে এসেছে যার জন্য তুই আমাদের এত বছরের চেনাজানা মুহূর্তেই অস্বীকার করলি?”

ফারহান একটা তপ্ত নিঃশ্বাস নিয়ে আকাশের তামাটে আভার দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক যন্ত্রণাময় বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে ধরা গলায় স্বীকার করল—”হ্যাঁ ফারিহা। একজনকে স্রেফ পছন্দ নয়, আমি তাকে পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছি। আসলে আমি কখনোই প্রেমে পড়তে চাইনি, আমি আমার মতেই ছিলাম—খুব শান্ত, খুব একা। কিন্তু ওই মেয়েটা… ওই মেয়েটা ঝড়ের মতো আমার জীবনে এসে সবকিছু তছনছ করে দিল। ওর একরোখা জেদ আর অদ্ভুত মায়া দিয়ে আমাকে পুরোপুরি বন্দি করে ফেলেছে সে। আমি এখন চাইলেও ওর জায়গা অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ করতে পারছি না। আমি সত্যিই নিরুপায় ফারিহা!”

ফারিহা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ফুঁপিয়ে কেঁদে দিল সে। ওর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নটা চোখের সামনে কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে কান্নাভেজা গলায় চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল—”কে সে ফারহান? কে সেই মেয়ে যার জন্য তুই আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিলি? আমাদের এত বছরের বন্ধুত্ব আর আত্মার টান কি এক নিমিষেই তোর কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল?”

ফারহান এবার সরাসরি ফারিহার চোখের দিকে তাকাল। ওর কণ্ঠস্বর এখন অনেক বেশি গম্ভীর আর দৃঢ়, যেন সে নিজের ভাগ্যের কথা ঘোষণা করছে। সে স্পষ্ট করে নামটা উচ্চারণ করল—”সে হলো লুসিয়া চৌধুরী। এক মেক্সিকান নারী। অসম্ভব জেদি আর একরোখা স্বভাবের এক মেয়ে মানুষ। একদম উরনচণ্ডী একটা চরিত্র ওর। সে আর কেউ নয় ফারিহা… সে হচ্ছে আমার আদরের ছোট বোন তান্বীর ননদ।”

ফারিহা স্তব্ধ হয়ে গেল। ‘লুসিয়া চৌধুরী’ নামটা শোনার পর ওর আর কিছু বলার শক্তি থাকল না। সে অনুভব করল, ফারহান স্রেফ কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েনি, সে এক জীবন্ত অগ্নিকুণ্ডে পা দিয়েছে।

ফারিহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও, মেধার পাশাপাশি সহজাত মনের জোরে সে নিজেকে সামলে নিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারিহা জোর করে ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল।

সে ফারহানের কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত গলায় বলল, “ফারহান, শোন। আমি যে তোকে ভালোবেসে প্রপোজ করেছি—এটা তুই ভুলে যা। আমরা বন্ধু ছিলাম, সারাজীবন বন্ধুই থাকব। তোর খুশিতেই আমার খুশি। কিন্তু আমি ওই লুসিয়াকে একবার দেখতে চাই। কেমন দেখতে সে? যাকে নিয়ে আমাদের এই কাঠখোট্টা ফারহান এত পাগল হয়ে গেল!”

ফারহান একটু ইতস্তত করে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। ফোনের গ্যালারিতে কয়েকটা ছবি সে খুব গোপনে আগলে রেখেছিল। কাঁপা হাতে সে লক খুলে ফারিহার সামনে ফোনটা ধরল। স্ক্রিনে ফুটে উঠল মেক্সিকোর সেই প্রলয়ংকরী রূপসী—লুসিয়া চৌধুরী।

ছবিটা দেখা মাত্রই ফারিহার চোখের পলক আর পড়ছে না। লুসিয়াকে দেখে যে কেউ এক পলকে বুঝে নেবে সে কতটা আধুনিক আর স্মার্ট। তার চাহনিতে এক অদ্ভুত আভিজাত্য আর জেদ মিশে আছে। গায়ের রঙে সেই বিদেশি আভা, আর টানাটানা চোখের সেই মরণঘাতী ধার—অসম্ভব সুন্দর দেখতে সে। ফারিহা নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসল।

সে ফোনটা ফারহানের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “মেয়েটা সত্যি অনেক সুন্দরী ফারহান। মেক্সিকান আর বাঙালির মিশেল ওকে এক অপার্থিব রূপ দিয়েছে। এমন রাজকীয় চেহারার অধিকারী হলে তো যে কেউ পাগল হবেই। তোর পছন্দ আছে বলতে হবে।”

ফারহান ফোনের স্ক্রিনে থাকা লুসিয়ার মুখটার দিকে একবার শেষবার তাকিয়ে সেটা লক করে দিল। সে আকাশের মেঘলা তামাটে আভার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “ভুল বলছিস ফারিহা। সৌন্দর্যের মোহে পড়ে আমি ওর হাত ধরিনি। সৌন্দর্য তো আজ আছে কাল নেই। আমি আসলে ওর সেই আমার পিছে পাগলামি আর ওর মায়ার জালে ফেঁসে গিয়েছি। ওর ওই একরোখা জেদটাই আমাকে ওর কাছে বারবার টেনে নিয়ে যায়। আমি তোকে বোঝাতে পারব না ফারিহা, ও আমার জীবনের এক গভীর অসুখের মতো, যার কোনো ওষুধ এই পৃথিবীতে তৈরি হয়নি।”

ফারিহা বুঝতে পারল ফারহান কতটা গভীরে ডুবে আছে। কিন্তু সে জানত না, এই মুহূর্তে মেক্সিকোর সেই বিলাসবহুল রুমে বসে লুসিয়া ঠিক কী ভাবছে। লুসিয়া যদি জানত, তার প্রিয়তম ফারহান বাংলাদেশের এক অন্ধকার ছাদে দাঁড়িয়ে তার সৌন্দর্যের চেয়েও তার মায়ার জয়গান গাইছে, তবে হয়তো তার হৃদয়ের সমস্ত প্রতিহিংসা মুহূর্তেই ধুয়ে জল হয়ে যেত।

ফারিহা অবশেষে নিজের রুমে ফিরে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল।এতক্ষণের আগলে রাখা সব ধৈর্য আর আভিজাত্য যেন এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। সে বিছানায় আছড়ে পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। যে ফারহানকে সে স্কুলজীবন থেকে সযত্নে নিজের মনের মণিকোঠায় শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে রেখেছিল, সেই ফারহান আজ এক নিমেষেই তাকে ‘বন্ধুত্বে’র ফ্রেমে বন্দি করে অন্য এক বিদেশি নারীর মায়ার আখ্যান শুনিয়ে দিল। ফারিহার বুক ফাটা কান্না যেন থামছেই না—সে কেবলই ভাবছে, কেন সে আরও আগে ফারহানকে নিজের মনের কথা জানাল না? কেন এতটা দেরি করে ফেলল সে?

অন্যদিকে, সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারে মেক্সিকোর সেই বিলাসবহুল ভিলাতে লুসিয়া তখন নিজের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার হেঁচকি তোলা কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে ঘরের বাতাস। ফারিহার প্রোফাইলে ফারহানের ওই চেনা হাসিমুখের ছবিটা দেখার পর থেকে ওর কলিজাটা যেন কেউ বিষাক্ত নখ দিয়ে খামচে ধরে আছে। লুসিয়া কাঁদছে আর বিড়বিড় করে বলছে—”কেন ফারহান? আমাকে মেক্সিকোতে একা ফেলে রেখে তুমি ওই ফারিহার সাথে হাসাহাসি করছ? আমাকে ‘সস্তা আর নষ্টা’ বলে দূরে ঠেলে দিলে, আর এখন ওই মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলছো? আমি তোমাকে ঘৃণা করি ফারহান, আমি তোমাকে তছনছ করে দেব!” লুসিয়ার এই উন্মাদনার পেছনে যেমন আছে তীব্র অধিকারবোধ, তেমনি আছে এক গোপন হারানোর ভয়। সে জানে না যে, তার ভালোবাসার মানুষটি কিছুক্ষণ আগেই বাংলাদেশের এক অন্ধকার ছাদে দাঁড়িয়ে তাকে নিজের ‘অসুখ’ এবং ‘মুক্তি’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে।

আর এদিকে ফারহান তখনো সেই ছাদের রেলিং ধরে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে। সিগারেটের নীলচে ধোঁয়াগুলো রাতের মেঘের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তার অপলক দৃষ্টি আকাশের রূপালি চাঁদের দিকে স্থির। চাঁদের ওই শীতল আলোয় সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে লুসিয়ার সেই জেদি, অভিমানী আর মায়াবী মুখটা।

ফারহান মনে মনে বলছে— “চাঁদ তো সবার জন্যই এক লুসিয়া। তুমি ওখানে বসে কাঁদছ নাকি আমাকে অভিশাপ দিচ্ছ, আমি জানি না। কিন্তু আমি যে তোমার ওই বিষাক্ত মায়ার জালে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে গেছি, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ আমার জানা নেই। ফারিহা পবিত্র, ও স্নিগ্ধ মেয়ে। কিন্তু আমি যে অন্ধকারের যাত্রী হয়ে তোমার ওই একরোখা ভালোবাসার মধ্যেই নিজের পরম মুক্তি খুঁজে পেয়েছি।”

তিনটি জীবন, তিনটি ভিন্ন আবেগ। কেউ কাঁদছে পাওয়ার আশায়, কেউ পুড়ছে হারানোর যন্ত্রণায়, আর কেউ তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত ধূসর ভবিষ্যতের দিকে।
.
.
.

ভিলা এস্পেরেন্জার চারপাশ তখন গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। বাইরে মেক্সিকোর চাদর বিছানো অন্ধকার, আর ভেতরে ল্যাভেন্ডারের মৃদু সুবাসের সঙ্গে মিশে আছে এক মাদকতা। তান্বী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করছিল। আয়নার প্রতিফলনে নিজের ক্লান্ত অথচ সতেজ মুখটা দেখে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গত কয়েকদিনের ধকল, ফারিহা আর ফারহানের সেই ছবি, আর জাভিয়ানের বলা সেই ধোঁয়াশাভরা পারিবারিক সত্য—সব মিলিয়ে ওর মনের ভেতর এক অস্থির ঘোর কাজ করছে।

হঠাৎ আয়নার প্রতিফলনেই সে দেখল, জাভিয়ান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর গায়ের ব্ল্যাক শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, চোখে সেই চিরচেনা শিকারি দৃষ্টি—যা তান্বীকে মুহূর্তেই কুঁকড়ে দেয়। জাভিয়ান ধীরপায়ে এগিয়ে এল। তান্বী পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে ও এক ঝটকায় তান্বীর কোমর জড়িয়ে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। তান্বীর পিঠ এখন জাভিয়ানের শক্ত বুকের সাথে ঠেকানো।
“কোথায় যাচ্ছ জিন্নীয়া? রাত তো এখনো অনেক বাকি,”

জাভিয়ানের গম্ভীর আর নিচু স্বরের কণ্ঠটা তান্বীর কানের কাছে প্রতিধ্বনি তুলল। ওর তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর ঘাড়ে এসে লাগতেই ও শিউরে উঠল।

জাভিয়ান আলতো করে তান্বীর নাইট সুটের শার্টের কলারটা সরিয়ে দিয়ে ওর কাঁধের ওপর নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। সেই তপ্ত স্পর্শে তান্বীর সারা শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে ধকধক করতে থাকা বুক নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “ছাড়ুন না! আপনি তো সবসময় সুযোগ খোঁজেন। সারা দিন তো কাজ নিয়ে থাকলেন, এখন আবার কী হলো?”

জাভিয়ান হালকা হাসল। সে তান্বীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর দুহাতের তালু নিজের মুঠোয় বন্দি করল। জাভিয়ানের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট জোড়া তান্বীর নমনীয় ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ল। এক দীর্ঘ, গভীর আর তীব্র চুম্বনে তান্বীর নিশ্বাস যেন ফুরিয়ে আসছিল। জাভিয়ান থামল না; ওর ঠোঁট নেমে এল তান্বীর ফর্সা গলার খাঁজে। সেখানে তপ্ত চুম্বনের পর জাভিয়ান নিজের দাঁত দিয়ে মৃদু অথচ ধারালো এক কামড় বসিয়ে দিল। তান্বী অস্ফুট এক শব্দ করে জাভিয়ানের শার্টের কলার খামচে ধরল।

জাভিয়ান ফিসফিস করে বলল, “বিকেলে তোমায় একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে? আমাদের ছোট একটা জগত… আমাদের একটা বেবি।”

তান্বীর গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম হয়ে উঠল। জাভিয়ানের নিপুণ হাতের আঙুলগুলো তখন তান্বীর শার্টের বোতামগুলো একে একে আলগা করে দিচ্ছিল। অবাধ্য কাপড়ের আবরণগুলো অবলীলায় শরীর থেকে খসে পড়তেই উন্মুক্ত হয়ে পড়ল তান্বীর শ্বেতপাথরের মতো শুভ্র আর মসৃণ দেহ। জাভিয়ান ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানার নরম চাদরের ওপর শুইয়ে দিল।

জাভিয়ান তান্বীর সেই দীর্ঘ চুলের গোছায় হাত বুলিয়ে রহস্যময় হাসি হাসলো। সে নিচু স্বরে বলল, “জিন্নীয়া, তোমার এই লম্বা চুলগুলো আসলে অনেক কাজের… এগুলো থাকলে হর্স রাইড করা অনেক সহজ হয়ে যায়।”

তান্বী নিজের পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা এক ঢাল কালো লম্বা চুলগুলো দুহাতে আঁকড়ে ধরে অস্ফুট স্বরে বলল, “কী বললেন? চুল ধরে হর্স রাইড করবেন? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? এটা কি কোনো সিনেমার স্টান্ট নাকি?”

জাভিয়ান ধীরপায়ে বিছানায় উঠে এসে তান্বীর ওপর ঝুঁকে পড়ল। সে তান্বীর একগুচ্ছ সিল্কি চুল নিজের বলিষ্ঠ আঙুলে পেঁচিয়ে নিয়ে সজোরে এক টান দিল। জাভিয়ান খুব নিচু স্বরে তান্বীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, “পাগলামি তো কেবল শুরু জিন্নীয়া। এই লম্বা চুলগুলো তো শুধু সাজিয়ে রাখার জন্য নয় তাইনা। আজ রাতে তুমি হবে আমার সেই অবাধ্য ঘোড়া, যাকে আমি নিজের বশে আনব। আর এই চুলগুলো হবে আমার লাগাম।”

জাভিয়ানের দুই চোখের সেই শিকারি দৃষ্টি তান্বীর শরীরের প্রতিটি কোষে এক অজানা কম্পন তৈরি করছিল। জাভিয়ান হঠাৎ আরও এক ঝটকায় তান্বীর সেই দীর্ঘ চুলের গোছা নিজের মুঠোর ভেতর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।

“আহ্! জাভিয়ান…” তান্বী আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু সেই কণ্ঠে ব্যথার চেয়েও ছিল এক আদিম শিহরণ।

জাভিয়ান চুলের মুঠিতে এক অনমনীয় টান দিয়ে তান্বীর মাথাটা পেছনের দিকে টেনে আনল। তান্বীর ফর্সা গলাটা এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত, ধনুকের মতো বেঁকে গেছে ওর শরীর। জাভিয়ান ওর উন্মুক্ত গলার হাড়ের কাছে আবারও নিজের ঠোঁট আর দাঁত ডুবিয়ে দিয়ে ধরা গলায় বলল, “আজ কোনো নিয়ম নেই জিন্নীয়া। আজ শুধুই তোমার আত্মসমর্পণ হবে।”

চুলের মুঠিতে জাভিয়ানের প্রতিটি টান তান্বীর ভেতরকার আগুনকে আরও উসকে দিচ্ছিল। জাভিয়ান ওকে নিজের পেশিবহুল শরীরের সাথে পিষে ধরে চুলের মুঠিটা আরও শক্ত করে পেঁচাল। তান্বী আবেশে চোখ বন্ধ করে বিছানার চাদরটা খামচে ধরল। জাভিয়ানের সেই পৌরুষদীপ্ত শক্তির কাছে তান্বীর কোমলতা বারবার হার মানছিল।

জাভিয়ান চুল ধরে ওকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে চরম মুহূর্তে পৌঁছে গেল। প্রতিটি টানে আর প্রতিটি ছোঁয়ায় এক উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে। তান্বীর সেই লম্বা চুলগুলো জাভিয়ানের আঙুলের ফাঁকে বন্দি হয়ে থাকল এক অখণ্ড নীরবতার সাক্ষী হিসেবে। মেক্সিকোর সেই গভীর রাতে ভিলা এস্পেরেন্জার চারদেয়ালের ভেতর জাভিয়ানের অধিকারবোধ আর তান্বীর নিবিড় আত্মসমর্পণ একাকার হয়ে গেল।
.
.
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জার চারদেয়ালের ভেতরের সেই আদিম রোমান্টিক আবহাওয়া ছাপিয়ে পরদিন সকালে এক নতুন উত্তেজনার জোয়ার এল। জাভিয়ান তখন ড্রয়িংরুমে বসে ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা চেক করছিল, ঠিক তখনই মেক্সিকান ভিলা এস্পেরেন্জায় এক বিশেষ ঘোষণা নিয়ে এলেন সায়েম চৌধুরী।

সায়েম চৌধুরী অর্থাৎ জাভিয়ানের বাবা আজ বেশ খোশমেজাজে আছেন। তিনি গম্ভীর কিন্তু তৃপ্ত গলায় ঘোষণা করলেন, “আগামীকাল আমাদের এই বাড়িতে এক বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। মার্কো রেয়েস চৌধুরী—যাকে সবাই কেবল এক কোণায় পড়ে থাকা ‘বইপোকা’ মনে করত, সে তার নতুন একটি পাণ্ডুলিপির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ‘গ্লোবাল লিটারারি অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছে। মার্কো আমাদের বংশের নাম উজ্জ্বল করেছে।”

ঘোষণাটা শোনামাত্রই বাড়ির নিস্তব্ধতা যেন এক লহমায় আনন্দ আর শোরগোলে রূপ নিল। মার্কোর এই অভাবনীয় সাফল্যে বাড়ির সবার প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো।

মার্কো সে বরাবরের মতোই নির্বিকার। চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে নিয়ে সে ভাবলেশহীনভাবে বলল, “পুরস্কার তো কাঁচের তৈরি একটা ট্রফি মাত্র। ওটা দিয়ে কী হবে? তার চেয়ে বরং লাইব্রেরিতে এক সেট নতুন এনসাইক্লোপিডিয়া আসলে ভালো হতো।” তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র বাড়তি উত্তেজনা নেই, যেন এই পুরস্কার জেতাটা খুব সাধারণ একটা বিষয়।

তান্বী খুশিতে একদম আত্মহারা হয়ে গেল। দুই হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “ওয়াও! মার্কো ভাইয়া তো দেখি আস্ত একটা সেলিব্রিটি হয়ে গেছেন! আমি কালকের জন্য সবথেকে সুন্দর শাড়িটা এখনই গুছিয়ে রাখব।” তান্বীর চোখেমুখে এক অন্যরকম দ্যুতি, সে যেন মেক্সিকোর মাটিতে বাংলাদেশি উৎসবের আমেজ খুঁজে পেয়েছে।

আর লুসিয়া মেক্সিকোর সেই উগ্র আর জেদি মেয়েটার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে খুশিতে মার্কোকে এক প্রকার জড়িয়ে ধরে বলল, “ভাইয়া! কালকের পার্টিটা হবে মেক্সিকোর সবথেকে বড় গ্র্যান্ড ইভেন্ট। আমরা এমন ধামাকা করব যে পুরো শহর তাকিয়ে দেখবে।” লুসিয়া মুহূর্তের জন্য তার সব বিষাদ ভুলে এক অন্যরকম উত্তেজনায় মেতে উঠল।

জাভিয়ান শুধু একবার মার্কোর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। তার তীক্ষ্ণ নজর যেন মার্কোর এই ‘পুরস্কার’ আর ‘বই’-এর আড়ালে অন্য কোনো রহস্য খুঁজছে। তবে সে মুখে কিছু বলল না, শুধু হালকা হেসে তান্বীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল—যার অর্থ সেও এই খুশিতে শামিল।

পুরো বাড়িতে এখন সাজ সাজ রব। ভিলা এস্পেরেন্জার প্রতিটি কোণ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মেক্সিকোর নামী-দামী লেখক, প্রকাশক আর অভিজাত মহলের অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য সব আয়োজন শুরু হয়ে গেল। কিন্তু এই আনন্দ আর উৎসবের আড়ালে কী কোনো নতুন নাটকের সূচনা হতে যাচ্ছে?
.
.
.
বিকেলের পড়ন্ত রোদে লুসিয়া যখন ভিলা এস্পেরেন্জা থেকে বেরিয়ে এল, মেক্সিকোর আকাশটা তখন রক্তিম আভা ধারণ করেছে। পরনে ওর সেই চিরচেনা স্টাইলিশ ব্ল্যাক স্লিট ড্রেস, যা ওর ব্যক্তিত্বের সাথে দারুণ মানানসই। তবে চোখেমুখে এখনো ফারহানের বিরহের এক বিষাদময় ছাপ স্পষ্ট। সে সোজা চলে গেল শহরের সবচেয়ে অভিজাত মেক্সিকান ক্লাবে, যেখানে তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মার্তা আগে থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।

ক্লাবের নিয়ন আলো আর কানের তালা লাগানো চড়া মিউজিকে চারপাশ তখন উন্মাতাল। লুসিয়া এক কোণায় বসে মার্তার সাথে ড্রিঙ্কস নিচ্ছিল, নিজেকে কিছুটা হালকা করার চেষ্টায়। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক কর্কশ আর পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল— “লুসিয়া! কতদিন পর দেখলাম তোমাকে ডার্লিং!তোমার রূপ তো দেখি দিন দিন আরও উগ্র হচ্ছে বেইবি!”

লুসিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তার এক্স-বয়ফ্রেন্ড আলেকজান্দ্রো দাঁড়িয়ে আছে। মেক্সিকোর কুখ্যাত এক ড্রাগ লর্ডের ছেলে সে—উশৃঙ্খল, অহংকারী আর দুশ্চরিত্র হিসেবে যার বেশ নামডাক। আলেকজান্দ্রো এক গাল কুৎসিত হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে লুসিয়ার গালের কাছে হাত বাড়াতেই লুসিয়া এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিল।

“ডোন্ট টাচ মি, আলেকজান্দ্রো! নিজের লিমিটের মধ্যে থাকো, নইলে পরিণতি ভালো হবে না,” লুসিয়া দাঁতে দাঁত চেপে সতর্ক করল।

আলেকজান্দ্রো একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে গ্লাসে চুমুক দিল তারপর বললো “ইশ এখন আমার টাচ সহ্য হচ্ছেনা অথচ মিউজিক রেকর্ডের জন্য তো আমার হাত ধরতে।তা শুনলাম লুসিয়া চৌধুরী নাকি বাংলাদেশের কোনো এক আনকালচার্ড ছেলের পেছনে পাগল হয়েছে? মেক্সিকোতে কি আভিজাত্যবান ছেলের আকাল পড়েছে বেইবি? তোমার মতো একটা হাই-প্রোফাইল মেয়ে কিনা ওই বাংলাদেশের বাঙাল ছেলের পেছনে ছুটছে!”

লুসিয়ার চোখ দুটো মুহূর্তেই আগুনের গোলার মতো জ্বলে উঠল। সে কড়া গলায় বলল, “মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ, আলেক! ওর ব্যাপারে একটাও বাজে কথা বললে তোমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব।”

আলেকজান্দ্রো এবার আরও নিচে নামল। সে লুসিয়ার একদম কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে নোংরা সুরে বলল, “কী নাম যেন তার? ফারহান? সে কি বিছানায় তোমাকে খুব বেশি খুশি করেছে? মেক্সিকোর ছেলেদের চেয়ে কি ওর পাওয়ার বেশি? নাকি সে তোমাকে ভোগ করে জঞ্জালের মতো ফেলে চলে গেছে?”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই লুসিয়া বিদ্যুৎগতিতে আলেকজান্দ্রোর নাক বরাবর এক শক্ত ঘুষি বসিয়ে দিল। এক ঘুষিতে আলেকজান্দ্রো কয়েক হাত পিছিয়ে গেল, আর ওর নাক ফেটে দরদর করে রক্ত ঝরতে শুরু করল।

লুসিয়া বাঘিনীর মতো গর্জে উঠে ওর কলার টেনে চিৎকার করে বলল, “আমার ফারহান কি তোর মতো লুইচ্চা, লম্পট আর বদমাইশ নাকি? তুই ওর পায়ের ধুলোর যোগ্যও না! ও একটা হীরা পবিত্র একটা মানুষ, আর তুই হচ্ছিস নর্দমার কীট বাস্টার্ড!”

আলেকজান্দ্রো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েও রাগে অন্ধ হয়ে লুসিয়ার ওপর চড়াও হতে চাইল। কিন্তু লুসিয়া তাকে সেই সুযোগটুকুও দিল না। সে চোখের পলকে আলেকজান্দ্রোর গোপন অঙ্গে নিজের হাঁটু দিয়ে এক প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল।

আলেকজান্দ্রো এবার এক বিকট চিৎকার দিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। সারা ক্লাবের মানুষ তখন বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে লুসিয়ার এই রণচণ্ডী রূপের দিকে। লুসিয়া শান্তভাবে তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে মার্তাকে ইশারা করল।
“চল মার্তা, এখানে বাতাসের গন্ধ খুব নোংরা হয়ে গেছে। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে,” বলতে বলতে লুসিয়া দম্ভের সাথে ক্লাব থেকে বেরিয়ে এল। ওর মনে তখন শুধু ফারহানের সেই মায়াবী মুখটা ভাসছে, যার সম্মানের জন্য সে আজ মেক্সিকোর ডন-পুত্রকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি।

মার্তাকে নিয়ে আলেকজান্দ্রোর সেই ক্লাব থেকে বেরিয়ে লুসিয়া সোজা চলে গেল শহরের অন্য আরেক প্রান্তে। অন্য এক অন্ধকার অথচ আভিজাত্যপূর্ণ ক্লাবের কাউন্টারে গিয়ে বসল সে। আলেকজান্দ্রোর ওপর যে প্রচণ্ড রাগটা ঝাড়ল, তা এখন থিতিয়ে গিয়ে জমাটবদ্ধ বিষাদে পরিণত হয়েছে। সে বারটেন্ডারকে একের পর এক কড়া ড্রিঙ্কস দেওয়ার ইশারা করল। মার্তা পাশে দাঁড়িয়ে বারবার বারণ করছিল, কিন্তু লুসিয়া আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার একটাই লক্ষ্য—স্মৃতিগুলোকে নেশার ঘোরে ডুবিয়ে দেওয়া।

গ্লাসগুলো যখন একে একে খালি হতে শুরু করল, তখন ক্লাবের চড়া মিউজিকও ওর কানে ঝাপসা হয়ে এল। চারপাশটা দুলছে। হঠাৎ ধোঁয়াটে আলোর গোলকধাঁধায় সে দেখল সামনের সোফাটায় কে যেন বসে আছে। সেই চেনা মুখচ্ছবি, সেই গম্ভীর অথচ মায়াবী শান্ত চাউনি।

“ফারহান?” লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল। ওর কণ্ঠস্বর কান্নার ভারে বুজে আসছে।

নেশাতুর কল্পনায় সে দেখল ফারহান সোফা ছেড়ে উঠে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ফারহানের সেই কাল্পনিক অবয়বটা ওর একদম সামনে এসে দাঁড়াল এবং খুব শাসন মেশানো গলায় বলল— “লুসিয়া! তোমাকে কতবার বারণ করেছি না ড্রিঙ্কস করতে না? নিজের শরীরের ওপর কি তোমার একটুও মায়া নেই? কেন করছ এসব পাগলামি?”

লুসিয়া টলমল পায়ে কাউন্টার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর দুচোখ বেয়ে তখন অবাধ্য নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে ফারহানের সেই কল্পিত মূর্তির সামনে গিয়ে ওর পেটের কাছাকাছি মাথা ঠেকিয়ে জাপটে ধরল। ফারহানের গায়ের সেই বিশেষ সুবাসটা যেন ও নেশার ঘোরেও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।
“তোমার জন্য তো ফারহান…” লুসিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল। “সব তো তোমার জন্য! তুমি কি জানো না আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি? তুমি কেন আমাকে এইভাবে অবহেলা করলে? কেন আমাকে এত কষ্ট দিলে? তুমি আমাকে ওইভাবে ফিরিয়ে না দিলে কি আর আমি আজ এই বিষাক্ত জায়গায় আসতাম? বলো?”

লুসিয়া ফারহানের কাল্পনিক শরীরটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় বলতে লাগল— “আমি উগ্র হতে পারি, আমি বদমেজাজি হতে পারি, কিন্তু আমি তো শুধু তোমারই হতে চেয়েছিলাম। তুমি বাংলাদেশে গিয়ে ওই ফারিহার সাথে হাসাহাসি করবে আর আমি এখানে নিজেকে শেষ করে দেব, এটাই কি তুমি চেয়েছিলে?”

ফারহানের সেই কাল্পনিক রূপটা কোনো উত্তর দিল না, শুধু লুসিয়ার মাথায় যেন একটা অদৃশ্য শীতল হাত বুলিয়ে দিল। মার্তা দূর থেকে অবিশ্বাসের চোখে দেখল লুসিয়া শূন্যতায় হাত বাড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে আর কার সাথে যেন বিরামহীন কথা বলছে। নেশার ঘোর আর ভালোবাসার দহন লুসিয়াকে বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

হঠাৎ মার্তার ফোনের ওপাশে খবরটা আসতেই ও আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। ওর মা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করেছেন, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। লুসিয়া তখন নেশায় পুরো বুঁদ হয়ে ক্লাবের সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে অসংলগ্নভাবে ফারহানের নাম বিড়বিড় করছে। মার্তা নিরুপায় হয়ে ক্লাবের এক পরিচিত ওয়েটারকে ইশারা করে বলল, “প্লিজ, আমার বান্ধবীকে একটু খেয়াল রাখবেন, আর গাড়ি আছে বাইরে তবে। আমি আসবো কিছুক্ষণের মধ্যে আর না আসলেও ওকে একটা উবারে তুলে দিবেন। আমি আপনাকে ওর ভাইয়ের নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি!”

কিন্তু মার্তা বের হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লুসিয়া টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল। ওয়েটার খেয়াল করেনি। ওর নেশাতুর মস্তিস্কে তখন এক অদ্ভুত জেদ চেপেছে—সে এই মুহূর্তে ফারহানের কাছে যাবে, সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দেবে, নয়তো নিজেকে শেষ করে দেবে। সে ভিড় ঠেলে টলতে টলতে ক্লাবের বাইরে বেরিয়ে এল।

বাইরে পার্কিংয়ে ওর নিজস্ব বিলাসবহুল গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে।লুসিয়া কিছু না ভেবেই ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ল এবং স্টার্ট দিয়ে দিল। ড্রাইভ করার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা ওর এক শতাংশও নেই; চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে লহমায় দুলে উঠছে।

“ফারহান… আমি আসছি… তুমি দেখতে পাবে আমি কতটা পাগল…” লুসিয়া বিড়বিড় করে এক্সিলারেটরে সজোরে পা দিল। গাড়িটা এক বিকট শব্দে টায়ার ঘষে ক্লাবের সীমানা ছাড়িয়ে মেইন রোডে উঠে পড়ল।

মাঝরাস্তায় মেক্সিকোর অন্ধকার হাইওয়ে। লুসিয়া দেখছে সামনের রাস্তাটা যেন সাপের মতো এঁকেবেঁকে দুলছে। ও তখন স্টিয়ারিংটা ঠিকমতো ধরে রাখতে পারছে না। হঠাৎ উল্টো দিক থেকে এক বিশাল বড় কন্টেইনারবাহী লরি হর্ন বাজাতে বাজাতে ধেয়ে এল। লরির হেডলাইটের তীব্র সাদা আলো লুসিয়ার চোখে পড়তেই ও দিশেহারা হয়ে গেল। ঘাবড়ে গিয়ে স্টিয়ারিংটা এক ঝটকায় ডান দিকে ঘুরিয়ে দিল সে।

সাথে সাথে এক ভয়ানক ধাতব ঘর্ষণের শব্দ! হলো। লুসিয়ার গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ধারের এক বিশাল পুরনো ওক গাছের সাথে সজোরে ধাক্কা খেল। মুহূর্তের মধ্যে এক প্রচণ্ড ঝটকায় গাড়িটা থমকে গেল, আর লুসিয়ার মাথাটা স্টিয়ারিংয়ে আছড়ে পড়ল।

এয়ারব্যাগ খুলেছে ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে স্টিয়ারিংয়ের শক্ত আঘাতে লুসিয়ার কপাল ফেটে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। গাড়ির সামনের কাঁচ চুরমার হয়ে ওর শরীরে বিঁধে গেছে। নেশার ঘোর আর প্রচণ্ড যন্ত্রণার মাঝেও লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করছে— “ফারহান… দেখলে তো…নিয়তিও চায়না আমি তোমার কাছে যাই…”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের ধানমন্ডিতে ফারহান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ ওর হাতের চায়ের কাপটা কোনো কারণ ছাড়াই হাত থেকে পড়ে মেঝের ওপর চুরমার হয়ে গেল। ফারহানের বুকটা হঠাৎ এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। এক তীব্র শীতল অনুভূতি ওর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। ও কি অনুভব করতে পারছে যে হাজার মাইল ওপারে ওর সেই ‘জেদি’ আর ‘পাগল’ ভালোবাসার মানুষটা এখন আহত হয়ে পড়ে আছে রাস্তার ধারে?

চলবে………….

নোট: আপনাদের রেসপন্স খুব কম আশা করি বেশি রেসপন্স করবেন তবেই তাড়াতাড়ি পর্ব পাবেন।জাভিয়ান আর তান্বীর রোমান্টিক দৃশ্যটা কি অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছে? ওটাকি এডিট করে দিবো নাকি ঠিক আছে। কিন্তু এরচেয়ে বেশি কেউ দিতে বলোনা প্লিজ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply