ডিজায়ার_আনলিশড
✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৩৯
ভিলা এস্পেরেন্জার নিস্তব্ধতা ভেঙে জাভিয়ানের কালো ল্যান্ড রোভারটি যখন শহরের উপকণ্ঠে এক গোপন বাঙ্কারের সামনে থামল, তখনো কেউ জানত না যে আজকের রাতটি বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে চলেছে।
জাভিয়ান গাড়ি থেকে নেমে রায়হানকে বাইরে পাহারায় রেখে ভেতরে ঢুকল।
মেক্সিকো সিটির আকাশ আজ এক বিশাল অন্ধকার চাদরের মতো ধূসর মেঘে ঢাকা। শহরের শান্ত উপরিভাগের নিচে, ডিজিটাল জগতে তখন চলছে এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধ।
‘Cicada 3301’—এটি স্রেফ কোনো কোড নয়, এটি ইন্টারনেটের ইতিহাসের সবথেকে ভয়ংকর এক গোলকধাঁধা। ডার্ক ওয়েবের এই পাজেলটি গত ১০ বছর ধরে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসি’র এনএসএ (NSA) হেডকোয়ার্টার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স (MI6)—বিশ্বের সেরা কোড-ব্রেকাররা কপালে ঘাম মুছে কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছেন। গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে তাদের সুপার কম্পিউটারগুলো এই পাজেলের প্রথম লেয়ারটি পর্যন্ত ভাঙতে পারেনি। কম্পিউটার স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠছে একটি বিদ্রুপাত্মক মেসেজ: “Access Denied. You are not worthy.”
ঠিক সেই মুহূর্তে, মেক্সিকো সিটির দুটি ভিন্ন প্রান্তে দুটি রহস্যময় বাঙ্কার সক্রিয় হয়ে উঠল।
জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী তার ব্যক্তিগত ডেস্কে বসে আছে। ঘরের আলো নীলচে, আর তার সামনে সারিবদ্ধ বিশাল মনিটর। জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারের ধোঁয়া তার চোখের মণিগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর তলোয়ারের মতো চলছে।
মার্কো রেয়েস চৌধুরী তার প্রাইভেট কার থেকে নেমে সরাসরি এক গোপন সার্ভার রুমে ঢুকেছে। তার পাশে দুজন লোক দাঁড়িয়ে।মার্কো তার ল্যাপটপটা অন করে এক অদ্ভুত কোড ইনপুট দিচ্ছে। তার চোখেও সেই একই জেদ, একই পৈশাচিক হাসি।
গোয়েন্দা প্রধানরা বুঝতে পারলেন, এই পাজেল সলভ করার মানে হলো বিশ্বের প্রতিটি দেশের স্যাটেলাইট কন্ট্রোল, ব্যাঙ্কিং সার্ভার আর নিউক্লিয়ার পাসওয়ার্ড নিজের পকেটে রাখা। কিন্তু তাদের কাছে সেই ‘মাস্টার কি’ নেই। সরকার যখন হাল ছেড়ে দিয়ে একে ‘অসম্ভব’ বলে ঘোষণা করল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে এক রহস্যময় নীরবতা নেমে এল।
মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে এক গোপন বাঙ্কারের ভেতরে নাইট রেভেন তার বিশাল মনিটরগুলোর সামনে বসে ছিল। তার ঠোঁটের কোণে জ্বলছে একটি দামী সিগার। ধোঁয়ার আস্তরণ তার চোখের মণিগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। ঘরের নীলচে আলোয় কেবল কিবোর্ডের অবিরাম ট্যাপ ট্যাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সে বিড়বিড় করে বলল, “CIA ভাবছে এটা গণিতের খেলা… কিন্তু তারা জানে না, এটা আসলে মানুষের সাইকোলজির খেলা।”
সে তার বিশেষ তৈরি ‘ব্লু-চিপ’ কার্ডটি ইনসার্ট করল। রাত যান প্রায় ঠিক ৩টা ১৫ মিনিট।স্ক্রিনে হুট করে লাল রঙ পাল্টে গাঢ় সবুজ হয়ে গেল। স্ক্রিনে বড় বড় অক্ষরে লেখা উঠল: “Welcome, Night Raven. The world is yours.”
সে সফল হয়েছে! বিশ্বের সেরা হ্যাকার গ্রুপ ‘অ্যানোনিমাস’ যেখানে হার মেনেছিল, সেখানে এই ছায়াশরীর এখন ‘গ্লোবাল মাস্টার কি’ এর মালিক। মেক্সিকো সিটির এক-চতুর্থাংশ এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ এক সেকেন্ডের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে আবার ফিরে এল। এটি ছিল তার বিজয় এক সংকেত যা বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া যে, এখন ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন রুলস সে লিখবে।
কিন্তু সবার মনে এখন এক বিশাল দ্বন্দ্ব। এই নাইট রেভেন আসলে কে?
একদিকে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী—যাকে কিছুক্ষণ আগেই মেক্সিকোর সিংহাসনে এক দুর্ধর্ষ সম্রাট হিসেবে দেখা গেছে। সে কি তার ক্ষমতার দাপট বজায় রাখতে এই অদৃশ্য ডিজিটাল তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছে? জাভিয়ানের বাঙ্কারেও তো একই রকম নীল আলো আর একই রকম দামী সিগারের গন্ধ পাওয়া যায়!
অন্যদিকে আছে জাভিয়ানের চাচাতো ভাই মার্কো রেয়েস চৌধুরী। যে সবসময় চৌধুরী ভিলার বিশাল লাইব্রেরিতে বই-পুস্তক আর এনক্রিপশন নিয়ে পড়ে থাকে। যাকে সবাই শান্ত আর নম্র বলে অবহেলা করে, সেই কি তবে পর্দার আড়ালে বসে থাকা এই গডফাদার? মার্কোর হাতের আঙুলগুলো তো দীর্ঘকাল ধরে এই জটিল গাণিতিক বিন্যাস সলভ করার জন্যই তৈরি হয়েছে!
নাইট রেভেন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। সে এখন চাইলে যেকোনো ভিভিআইপি-র গোপন নথিপত্র এক ক্লিকে ডার্ক ওয়েবে লিক করে দিতে পারে। সরকার এখন তাকে গ্রেফতার করার বদলে তাকে যমের মতো ভয় পাচ্ছে। কিন্তু এই অসীম ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক না কেন, এটি যার হাতে থাকে তাকে যেমন অপরাজেয় করে তোলে, তেমনি তাকে বানিয়ে দেয় পুরো বিশ্বের সবথেকে বড় লক্ষ্যবস্তু।
মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, “অতিরিক্ত ক্ষমতা মানুষকে উন্মাদ করে দেয়।” নাইট রেভেনের জন্য এই কোডটি এখন একটি মরণফাঁদ। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এই ‘গ্লোবাল মাস্টার কি’ যদি ভুল কোনো হাতে পড়ে, তবে পুরো পৃথিবী এক নিমিষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। আর সেই অপরাধে সে হয়ে উঠবে পৃথিবীর সবথেকে বড় ক্রিমিনাল।
ঠিক তখনই বাঙ্কারের গোপন স্পিকারে একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কণ্ঠস্বরটি শান্ত কিন্তু তাতে এক ভয়ংকর হুমকি লুকিয়ে আছে:
“অভিনন্দন, নাইট রেভেন! বিশ্ববরেণ্য হ্যাকার আর গোয়েন্দাদের হারিয়ে আপনি ‘Cicada 3301’-এর রহস্য ভেদ করেছেন। এই ‘গ্লোবাল মাস্টার কি’ এখন আপনার মুঠোয়। আপনি চাইলে এখন এক ক্লিকে যেকোনো দেশের সিকিউরিটি ল্যাক করতে পারেন, যেকোনো ভিভিআইপি-র গোপন নথিপত্র ডার্ক ওয়েবে লিক করে দিতে পারেন। সরকার এখন আপনাকে গ্রেফতার করার বদলে আপনাকে যমের মতো ভয় পাচ্ছে।”
কণ্ঠস্বরটি মুহূর্তের জন্য থামল, তারপর আবার বলতে শুরু করল:
“কিন্তু মনে রাখবেন নাইট রেভেন, আপনার জন্য এই কোডটি এখন একটি মরণফাঁদ। আপনি এখন অপরাজেয় ঠিকই, কিন্তু আপনি হয়ে গেছেন পুরো বিশ্বের সবথেকে বড় লক্ষ্যবস্তু।আপনার এই সাফল্য যতটা গৌরবের, তার চেয়েও বেশি বিপদের। এই কোড স্রেফ কিছু গাণিতিক সংখ্যার বিন্যাস নয়; এটি হলো আধুনিক পৃথিবীর ‘ডিজিটাল গড’ হওয়ার চাবিকাঠি।”
বাঙ্কারের ভেতরে পিনপতন নীরবতা। কেবল ওই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে “এই ‘গ্লোবাল মাস্টার কি’ যদি ভুল কোনো হাতে পড়ে, বিশেষ করে কোনো বিকারগ্রস্ত বা স্বার্থান্বেষী মানুষের হাতে পড়ে—তবে পুরো পৃথিবী এক নিমিষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। আর সেই অপরাধে আপনি হয়ে উঠবেন পৃথিবীর সবথেকে বড় অপরাধী। আপনার ধ্বংস তখন কেউ আটকাতে পারবে না। আপনি এখন অপরাজেয়, কিন্তু আপনি হয়ে গেছেন পুরো বিশ্বের সবথেকে বড় আন্তর্জাতিক টেররিস্ট।”
নাইট রেভেন কোনো কথা বলল না। সে জানে, এই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরটি যা বলছে, তা এক চরম সত্য। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার মেক্সিকো শহরের দিকে তাকাল। তার মনের ভেতর এখন শুধু একটিই চিন্তা—এই সাফল্য তার গৌরবের, নাকি তার ধ্বংসের কারণ হবে?
সে রাতেই পুরো বিশ্বে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে গেল। ‘Cicada 3301’-এর রহস্য ভেদ করার খবরটি আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্বের বড় বড় সব নিউজ পেপার আর নিউজ চ্যানেলে কেবল ‘Night Raven’-এর কথাই আলোচনা হতে লাগল।
“ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন সম্রাট: কে এই নাইট রেভেন?” — ওয়াশিংটন পোস্টের হেডলাইন।
“বিশ্বের সব গোপন চাবিকাঠি এখন এক মানুষের হাতে!” — দ্য গার্ডিয়ানের খবর।
“‘Cicada 3301’ সলভড: পুরো বিশ্ব এখন নাইট রেভেনের দয়ায়!” — আল জাজিরার রিপোর্ট।
পুরো বিশ্ব এখন এক অজানা আতঙ্কে কাঁপছে। গোয়েন্দা প্রধানরা বুঝতে পারলেন, তাদের সব গোপন নথিপত্র এখন এই এক মানুষের হাতে।
ভোরের আলো ফুটতেই যখন মেক্সিকো সিটির আকাশ চিরে রক্তিম সূর্য উঁকি দিল, তখন পুরো বিশ্ব এক অদ্ভুত ডিজিটাল পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। ইন্টারনেটের আনাচে-কানাচে কেবল একটিই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—Night Raven। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো তাদের প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখেছে: “The World is Under One Key.”
পর্দার আড়ালে থাকা সেই রহস্যময় ‘নাইট রেভেন’ তখন তার বাঙ্কারের আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার হাতের সেই গ্লোবাল মাস্টার কি বা ‘Cicada 3301’ কোডটি এখন স্রেফ একটি অ্যালগরিদম নয়; এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতার ভাগ্যবিধাতা।
নাইট রেভেন এখন যা যা করতে সক্ষম, তা ভাবলে যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের কপালে ঘাম জমতে বাধ্য:
নাইট রেভেন চাইলে এখন বিশ্বের যেকোনো দেশের নিউক্লিয়ার লঞ্চিং প্যাড হ্যাক করতে পারে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া থেকে আমেরিকার পেন্টাগন—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখন তার কিবোর্ডের একটা ক্লিকের দূরত্বে। সে চাইলে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই বিশ্বের মানচিত্র থেকে একটি দেশ মুছে দিতে পারে।
সুইস ব্যাংক থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিট—বিশ্বের সব বড় ব্যাংকিং সার্ভারের পাসওয়ার্ড এখন তার পকেটে। সে যদি চায়, তবে এক নিমিষেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট শূন্য করে দিতে পারে, অথবা পুরো বিশ্বের স্টক মার্কেট ক্রাশ করিয়ে গ্লোবাল ইকোনমিকে পাথর যুগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারে।
নাইট রেভেন এখন মহাকাশে থাকা জিপিএস এবং যোগাযোগ স্যাটেলাইটগুলোর গতিপথ বদলে দিতে পারে। পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট কানেকশন কেটে দিয়ে সে এক মুহূর্তেই পৃথিবীকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে। রাডার সিস্টেম অকেজো করে দিয়ে সে মাঝ-আকাশে উড়ন্ত বিমানগুলোর দিকভ্রম ঘটাতে সক্ষম।
বিশ্বের প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থার (CIA, Mossad, RAW) টপ-সিক্রেট ফাইলগুলো এখন তার সামনে খোলা বইয়ের মতো। কোন নেতা কার সাথে গোপন চুক্তি করেছে, কোন সেলিব্রিটির ডার্ক ফ্যান্টাসি কী—সবই এখন নাইট রেভেনের হাতের মুঠোয়। সে চাইলে যেকোনো ভিভিআইপি-র জীবন এক মিনিটে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
সে এখন আর কোনো ব্যক্তি নয়, সে একটি আদর্শ বা ভয়ংকর এক আতঙ্ক। সরকারগুলো এখন তাকে গ্রেফতার করার সাহস পাবে না, কারণ তারা জানে—নাইট রেভেনের মৃত্যু বা গ্রেফতার মানেই ‘ডেড ম্যানস সুইচ’ (Dead Man’s Switch) অ্যাক্টিভেট হয়ে যাওয়া, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বের সব গোপন তথ্য ইন্টারনেটে লিক করে দেবে।
বাঙ্কারের ভেতরে বাতিগুলো নিভিয়ে নাইট রেভেন জানালার বাইরে তাকাল। সে অনুভব করতে পারছে, এই অসীম ক্ষমতা তাকে যতটা অপরাজেয় করেছে, তার চেয়েও বেশি একা করে দিয়েছে। সে এখন আর সাধারণ মানুষ নয়; সে হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবথেকে বড় ‘ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্ট’—যার মাথার দাম এখন কোটি কোটি ডলার।
নাইট রেভেনের ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, “ক্ষমতা যখন আকাশের সমান হয়, তখন পতনের শব্দটাও হয় মহাপ্রলয়ের মতো। আমি কি প্রস্তুত সেই শব্দের জন্য?”
.
.
.
মেক্সিকোর ভিলা এস্পেরেন্জায় তখন সকালের কড়া আলো ফুটেছে। সারা রাত দুশ্চিন্তায় তান্বীর চোখের পাতা এক হয়নি। সে ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফায় কুশন বুকে চেপে বসে আছে। এক হাতে ধোঁয়া ওঠা রামেন নুডুলসের বাটি, আর অন্য হাতে এক গ্লাস জুস—সেগুলো তার শেষ করার রুচি নেই, শুধু জাভিয়ানের অপেক্ষায় সময় কাটানো।
সামনে বিশালাকার টেলিভিশন স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ চলছে। সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো এখন উত্তাল। ঠিক সেই মুহূর্তে মূল দরজার ভারি শব্দ হলো। জাভিয়ান ভেতরে ঢুকল। তার চোখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোয়ালে সেই চিরচেনা আভিজাত্য। গায়ের ব্ল্যাক ওভারকোটটা খুলে সে ধীরপায়ে এসে তান্বীর পাশের সোফায় গা এলিয়ে দিল।
তান্বী নুডুলসের বাটিটা পাশে রেখে উৎসুক হয়ে বলল, “আপনি অবশেষে এলেন? সারা রাত কোথায় ছিলেন আপনি? আমি কত ভয় পাচ্ছিলাম জানেন?”
জাভিয়ান চোখ বুজে মাথাটা সোফার পেছনে ঠেকিয়ে হালকা হাসল। খুব নিচু স্বরে বলল, “একটা জরুরি ডিল ছিল। মেক্সিকোর রাতগুলো তো জানোই, কাজ শেষ না করে ফেরা কঠিন।”
“আরে রাখুন আপনার ডিল! খবরে কী দেখাচ্ছে দেখুন তো একবার,” তান্বী টিভির দিকে ইশারা করে বলল। “পুরো দুনিয়া তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। কী যেন একটা নাম… ওই যে, নাইট…রামেন! ওই নাইট রামেন কী সব করেছে, পুরো দুনিয়ার চাবিকাঠি নাকি এখন ওর হাতে!”
জাভিয়ান এবার চোখ মেলল। সে আলতো করে তান্বীর হাত থেকে নুডুলসের বাটি আর চপস্টিকটা নিজের হাতে নিয়ে নিল। একটু নুডুলস তুলে সে পরম মমতায় তান্বীর ঠোঁটের কাছে ধরল। “আগে এটা শেষ করো। রাতভর না ঘুমিয়ে শরীর নষ্ট করেছ, এখন আবার এসব আজেবাজে খবর দেখছ?”
“আজেবাজে মানে? এটা অনেক ইম্পর্ট্যান্ট খবর!” তান্বী নুডুলসটা চিবুতে চিবুতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। “সারা দুনিয়ার মানুষ ভয়ে কাঁপছে। ওই নাইট রামেন নাকি চাইলে যেকোনো দেশের মিসাইল ছুঁড়তে পারে, সবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে দিতে পারে। আপনি ডিল নিয়ে পড়ে আছেন আর ওদিকে দুনিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে!”
জাভিয়ান এবার নিজের হাতে থাকা জুসের গ্লাসটা তান্বীর ঠোঁটে ধরল। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “তোমার এই ডার্ক আর ভায়োলেন্ট খবর দেখতে হবে না। তোমার জন্য টম অ্যান্ড জেরি বা কার্টুনই ঠিক আছে। দুনিয়া রসাতলে যাক বা না যাক, তোমার এই পুতুলের মতো চোখ দুটোয় ঘুমের খুব দরকার।”
ভিলা এস্পেরেন্জার ড্রয়িংরুমের সেই সকালটা ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে টিভির পর্দায় বিশ্বজুড়ে হাহাকার, আর অন্যদিকে সোফায় পা তুলে বসে থাকা এক চঞ্চলা তরুণী। জাভিয়ান যখন পরম মমতায় তান্বীকে নুডুলস খাইয়ে দিচ্ছিল, তান্বী তখন চোখ বড় বড় করে আবার বলতে শুরু করলো।
“আপনি কি বুঝতে পারছেন না আমি কী বলছি? ওই লোকটার নাইট রামেন।”
জাভিয়ান নুডুলসের চপস্টিকটা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকাল এবার। “নাইট রামেন কি? তান্বী, ওখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘Night Raven’ (নাইট রেভেন)। ওটা একটা দুর্ধর্ষ হ্যাকার, কোনো জাপানিজ ডিশ নয়।”
“আরে ওই তো হলো!” তান্বী এক গাল হাসি দিয়ে বলল। “ওর নাম রামেন—শুনতে তো একই রকম লাগছে। আর দেখুন না, ও যেভাবে সবার ডাটা চুরি করে নিজের বাটি ভরছে, ওটা তো রামেন খাওয়ার মতোই কাজ। সারারাত জেগে নিশ্চয়ই ও রামেন খায় আর ল্যাপটপে টাইপ করে। তাই ওর নাম হওয়া উচিত ‘নাইট রামেন’।”
জাভিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপাল চাপড়াল। পৃথিবীর সবথেকে বড় ‘ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্ট’ আজ এক বাটি নুডুলসের সাথে তুলনা পাচ্ছে! সে মনে মনে ভাবল— সিআইএ যদি আজ জানতে পারে যে তাদের মোস্ট ওয়ান্টেড হ্যাকারকে মেক্সিকোর এক কোণে বসে কেউ ‘নাইট রামেন’ বলছে, তবে তারা হয়তো চাকরি ছেড়ে হিমালয়ে চলে যাবে।
“আচ্ছা,” তান্বী এবার একটু সিরিয়াস হওয়ার ভান করল। “এই নাইট রামেন কি চাইলে আমাদের ইন্টারনেটের স্পিড বাড়িয়ে দিতে পারে? আমার ফোনে বড় বড় ফাইল ডাউনলোড হতে অনেক সময় লাগে। ও যদি এতই পাওয়ারফুল হয়, তবে ওকে একটা মেইল করে দিন না! ও যদি আমাদের নেটটা ঠিক করে দেয়, তবে আমি ওকে এক বাটি আসল রামেন গিফট করব।”
জাভিয়ান এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে তান্বীর গালে আলতো করে একটা চিমটি কেটে বলল, “তোমার ওই ‘নাইট রামেন’ এখন পুরো দুনিয়ার পাসওয়ার্ড চুরি করতে ব্যস্ত, সে তোমার ফাইল ডাউনলোড স্পিড বাড়াবে না। আর খবরদার! ওকে কোনো মেইল করার কথা ভাববেও না।”
“আপনি ভয় পাচ্ছেন?” তান্বী টিপ্পনি কেটে বলল। “আপনি তো আবার ওই ‘ঝড় তুফান আর ‘কদবেল’ ম্যামদের মতো মানুষদের চেনেন। আপনি ওই নাইট রামেনকেও চেনেন না তো? ও কি আপনার কোনো ফ্রেন্ড?”
হঠাৎ ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা জাভিয়ানের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। রায়হানের টেক্সট।”
জাভিয়ান ফোনটা উল্টে রেখে তান্বীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি তোমার নুডুলস শেষ করো। আমি আসছি।”
.
.
.
মেক্সিকোর অন্ধকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তখন এক নতুন আতঙ্কের রাজত্ব শুরু হয়েছে। মেইলস্ট্রোম তার গোপন ডেরায় বসে বিশালাকার টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে ‘Night Raven’ নামটি লাল রঙে ফ্লাশ করছে।
মেইলস্ট্রোমের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইসাবেলা মোরেলাস। ইসাবেলার চোখেমুখে এক অস্থির ছাপ, তার মেক্সিকান মাফিয়া কুইন ইগো আজ এই অদৃশ্য ‘নাইট রেভেন’-এর কাছে যেন হার মানছে।
মেইলস্ট্রোম হাতের মদের গ্লাসটা সজোরে টেবিলে আছড়ে মেরে গর্জে উঠল “কে এই নাইট রেভেন? কোথা থেকে এল এই আপদ? আমার চোখের সামনে মেক্সিকোর ডিজিটাল সার্ভারগুলো হ্যাক হয়ে গেল আর আমি কিছুই করতে পারলাম না?”
ইসাবেলা হাতের আইপ্যাডে সিআইএ-র লিক হওয়া নথিপত্রগুলো স্ক্রল করতে করতে ঠান্ডা গলায় বলল—
“পুরো বিশ্ব এখন ওর দয়ায় চলছে মেইলস্ট্রোম। ওয়াশিংটন থেকে মস্কো—সবাই এখন ভিখারির মতো ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওই ‘Cicada 3301’ (কিকাডো) কোডটা সলভ করা কোনো মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল, কিন্তু ও সেটা করে দেখিয়েছে।”
“অসম্ভব বলে কিছু নেই!” মেইলস্ট্রোম দাঁতে দাঁত চেপে বলল। “এই দুনিয়ায় সবকিছুই বিক্রয়যোগ্য। আমাকে ওকে খুঁজে বের করতে হবে। যেভাবেই হোক ওই নাইট রেভেনকে আমার পায়ের নিচে আনতে হবে। ওই কিকাডোর মাস্টার কোডটা আমার চাই। ওটা হাতে থাকলে জাভিয়ান তো দূরের কথা, পুরো মেক্সিকো আমার হাতের তালুতে নাচবে।”
ইসাবেলা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে মেইলস্ট্রোমের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল—”ইট’স নট দ্যাট ইজি মেইলস্ট্রোম! তুমি যা ভাবছ এটা মোটেও ততটা সহজ নয়। নাইট রেভেন কোনো সাধারণ হ্যাকার নয়, সে এখন একটা ‘ডিজিটাল গড’। তুমি তাকে খুঁজে বের করার আগে সে হয়তো তোমার ব্যাংকের সব টাকা গায়েব করে দিয়েছে কিংবা তোমার মাথার দাম ডার্ক ওয়েবে এক ডলার করে দিয়েছে।”
মেইলস্ট্রোম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, “তুমি কি বলতে চাইছ আমি খুঁজে বের করতে পারবোনা?”
“আমি বলতে চাইছি, তুমি যার পিছনে ছুটছ সে হয়তো তোমার খুব কাছেই আছে, অথচ তুমি তাকে চিনতে পারছ না,” ইসাবেলা জানালার বাইরে মেক্সিকো সিটির অন্ধকার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল। “নাইট রেভেন মানেই হলো অন্ধকার। আর অন্ধকারে থাকা মানুষকে আলোর নিচে টেনে আনা যায় না।”
মেইলস্ট্রোম তার মায়ের কোনো কথা কর্নপাত না করে এবার নিজের ল্যাপটপটা টেনে নিল।
.
.
.
বিকেলের নরম রোদ তখন ভিলা এস্পেরেন্জার জানালার কাঁচ চিরে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। তান্বী মনোযোগ দিয়ে আলমারিতে জাভিয়ানের দামী ব্লেজার আর শার্টগুলো গুছিয়ে রাখছিল। ঘরজুড়ে ল্যাভেন্ডার আর জাভিয়ানের সিগনেচার পারফিউমের একটা হালকা সুবাস মিশে আছে।
হঠাৎ করেই তান্বীর কোমরে দুটো শক্ত হাতের বেষ্টনী অনুভব করল। জাভিয়ান পেছন থেকে খুব নিবিড়ভাবে ওকে জড়িয়ে ধরেছে। জাভিয়ানের চিবুক এখন তান্বীর কাঁধের ওপর স্থির। ওর উষ্ণ নিশ্বাস তান্বীর ঘাড়ের কাছে এক অদ্ভুত শিরশিরানি ধরিয়ে দিল।
তান্বী হুট করে থমকে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আরে কী করছেন? ছাড়ুন! কাজ করছি তো।”
জাভিয়ান ছাড়ল না, বরং আরও একটু নিবিড়ভাবে ওকে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরল। ওর গভীর আর মাদকতাময় গলায় ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করল—
“জিন্নীয়া, অনেক তো হলো। এই বিশাল বাড়িতে আমরা শুধু দুজন। চলো না, আমরা এবার একটা বেবি নিয়ে নেই। আমাদের ছোট একটা জগত হবে।”
জাভিয়ানের মুখে এমন সরাসরি কথা শুনে তান্বী একদম পাথরের মতো জমে গেল। ওর গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল, হাতের শার্টটা তখন আলমারির তাকে অর্ধেক ঝুলে আছে।
“কী যা তা বলছেন!” তান্বী মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল। “আমি… আমি তো এখনো নিজেই বাচ্চা। আমি সামলাতে পারব না।”
জাভিয়ান এবার হালকা শব্দ করে হাসল। ও তান্বীর ঘাড়ের কাছে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর ওর এক হাত দিয়ে তান্বীর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, যাতে তান্বী আয়নায় জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়।
“আমি জানি তুমি এখনো পুরোপুরি ম্যাচিউর হওনি জিন্নীয়া,” জাভিয়ান খুব নরম স্বরে বলল। ওর চোখে তখন এক অপার্থিব মায়া। “কিন্তু তাতে চিন্তা করার কী আছে? আমি তো আছি। আমি আর তুমি মিলে ওকে পালব। তুমি ভয় পেলে আমি আছি সামলে নেওয়ার জন্য। আমি চাই আমাদের এই বড় ভিলাটা একটা ছোট বাচ্চার হাসিতে ভরে উঠুক।”
তান্বী আয়নায় জাভিয়ানের চোখের সেই গভীরতা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। জাভিয়ানের মতো একরোখা আর দুর্ধর্ষ মানুষটা যখন বাচ্চার কথা বলে এত নরম হয়ে যায়, তখন তান্বীর ভেতরের সব জড়তা যেন গলে জল হয়ে যায়।
সে মুখ ঘুরিয়ে জাভিয়ানের বুকের ভেতরে মুখ লুকাল। লজ্জায় ওর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না, শুধু বিড়বিড় করে বলল— “আপনি খুব বদমাইশ! সবসময় আমাকে বিপদে ফেলে দেন।”
.
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জার বিশাল ডাইনিং হলে তখন এক থমথমে পরিবেশ। রাজকীয় ঝাড়বাতির আলোয় মেক্সিকান চৌধুরী বংশের রাঘববোয়ালরা আজ এক টেবিলে বসেছে। জাভিয়ানের বাবা আর চাচাদের মুখে শুধু একটাই শব্দ—’নাইট রেভেন’।
জাভিয়ানের বাবা সায়েম চৌধুরী হাতের চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে গদগদ গলায় বললেন, “পুরো বিশ্ব এখন এই একটা মানুষের হাতের মুঠোয়। মেক্সিকোর ডিজিটাল সার্ভারগুলো পর্যন্ত নাকি সে শাটডাউন করে দিতে পারে। আমি ভাবছি, এই নাইট রেভেন যদি আমাদের শপিং মলে বা ব্যাঙ্কে হাত দেয়, তবে আমাদের পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না।”
জাভিয়ানের চাচা আন্তোনিও মাথা নেড়ে সায় দিলেন, “আমিও তাই ভাবছি। সিআইএ পর্যন্ত একে খুঁজে পাচ্ছে না। যে এই ‘কিকাডো’ কোড ভেঙেছে, সে কোনো সাধারণ মানুষ নয় সে এক অপার্থিব শয়তান। আমাদের উচিত একে আমাদের দলে টেনে নেওয়া, নাহলে ধ্বংস অনিবার্য।”
টেবিলের এক কোণায় তখন নিঃশব্দে বসে আছে মার্কো রেয়েস চৌধুরী। তার সামনে এক বাটি স্যুপ আর পাশে একটা পুরনো লাইব্রেরির বই। বড়দের এই উত্তপ্ত আলোচনা যেন তার কানেই পৌঁছাচ্ছে না। সে খুব ধীরস্থিরভাবে স্যুপের চামচ নাড়ছে, যেন দুনিয়া রসাতলে গেলেও তার কিছু যায় আসে না।
সায়েম চৌধুরী হঠাৎ মার্কোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। “মার্কো! তুমি তো দিনরাত ওই কম্পিউটার আর বই নিয়ে পড়ে থাকো। এই নাইট রেভেনকে নিয়ে তোমার কী মত? তোমার কি মনে হয় না এটা আমাদের জন্য এক বিশাল হুমকি?”
মার্কো খুব নির্লিপ্তভাবে বইয়ের একটা পাতা উল্টাল। তার চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো ভয় নেই। সে চশমাটা নাকের ডগায় একটু ঠিক করে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল—”বড় আব্বু, নাইট রেভেন কোনো হুমকি নয়। সে শুধু একটা সত্য। আপনারা যেটাকে আতঙ্ক ভাবছেন, সেটা আসলে মেধার একটা উচ্চস্তর। দুনিয়া যেখানে শেষ হয়েছে, সে সেখান থেকে শুরু করেছে। আর তাছাড়া, সে যা করেছে তা নিয়ে এত মাতামাতি করার কিছু নেই। সে তো আর আপনাদের ব্যাংক থেকে টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়নি। সে শুধু দেখিয়েছে যে আপনাদের সব দেওয়াল আসলে কাঁচের তৈরি।”
মার্কোর এমন নির্লিপ্ত জবাব শুনে তার বাবা সাইফ চৌধুরী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। “তুমি কি পাগল হয়েছ মার্কো? সারা দুনিয়া কাঁপছে, আর তুমি বলছ এটা মাতামাতি করার কিছু নেই? তোমার মতো বইপোকা এসব ডিজিটাল যুদ্ধের কী বুঝবে?”
মার্কো এবার একটা রহস্যময় হাসি হাসল। সে স্যুপের বাটিটা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। তার শান্ত আর বিষণ্ণ চোখের আড়ালে তখন এক ভয়ংকর বুদ্ধির ঝিলিক। সে বিনীতভাবে বলল—”আপনারা ঠিকই বলেছেন। আমি বইপোকা মানুষ, দুনিয়ার খবর আমি কমই রাখি। আমার কাছে ‘নাইট রেভেন’ মানে শুধুই একটা কাল্পনিক চরিত্র। আমি বরং লাইব্রেরিতে ফিরে যাই, ওখানে অন্তত শান্তির একটা জগত আছে।”
মার্কো যখন ধীরপায়ে ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখন দোতলার বারান্দা থেকে জাভিয়ান নিচে তাকাল। তার হাতে দামী সিগার, আর চোখে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। জাভিয়ান আর মার্কোর চোখাচোখি হলো এক সেকেন্ডের জন্য।
.
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জার সদর দরজায় তখন এক রণচণ্ডী মূর্তি। লুসিয়া ভিলায় পা রাখা মাত্রই সোজা জাভিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো অপমানে আর ক্লান্তিতে লাল হয়ে আছে। জাভিয়ান তখন ড্রয়িংরুমে একটা ফাইল চেক করছিল, লুসিয়াকে দেখে ও একটুও অবাক হলো না। বরং ওর চোখে একটা উপহাসের ঝিলিক খেলে গেল।
জাভিয়ান ফাইলটা বন্ধ করে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল— “বাংলাদেশ থেকে মেইলস্ট্রোম তোকে মেক্সিকোতে এনেছে, তাই না?”
লুসিয়া থমকে গেল। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে অবিশ্বাসের সুরে পালটা প্রশ্ন করল— “তুমি… তুমি কীভাবে জানলে?!”
জাভিয়ান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সোফায় হেলান দিল। “বাদ দে ওসব। তোর আপন ভাই মেইলস্ট্রোম, তার সাথেই তো তুই আসবি-যাবি। এতে অবাক হওয়ার কী আছে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল তান্বী। জাভিয়ানের শেষ কথাটা ওর কানে বিষম খাওয়ার মতো লাগল। হাতের খাবারের বাটিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল ওর। সে টলমল পায়ে সামনে এগিয়ে এসে চিৎকার করে উঠল—
“কী বললেন? ওই ঝড়তুফান…লুচি আপুর ভাই? এটা কীভাবে সম্ভব? ও তো আমাদের শত্রু, আর লুচি আপু তো আপনার বোন!”
জাভিয়ান আর লুসিয়া দুজনেই চুপ হয়ে গেল। জাভিয়ান বুঝতে পারল, হিতে বিপরীত হয়ে গেছে। তান্বীর সামনে এই সত্যটা এত তাড়াতাড়ি আনার কোনো পরিকল্পনা ওর ছিল না। তান্বী অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে, ওর ছোট মস্তিস্ক এই বিশাল তথ্যটা হজম করতে পারছে না।
জাভিয়ান দ্রুত উঠে এসে তান্বীর হাত ধরল। “জিন্নীয়া, শান্ত হও। ঘরে চলো, আমি সব বুঝিয়ে বলছি।”
তান্বীকে প্রায় জোর করেই বেডরুমে নিয়ে এল জাভিয়ান। দরজা বন্ধ করে ও তান্বীর দুই কাঁধ ধরে বিছানায় বসাল। তান্বী তখনো ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করছে— “ঝড়তুফান আর লুচি আপা ভাই-বোন? তার মানে কদবেল ম্যামও ওদের আত্মীয়?”
জাভিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল— “শোনো জিন্নীয়া, এটাই সত্যি। মেইলস্ট্রোম আসলে লুসিয়ার আপন ভাই। আর তুমি যাকে কদবেল ডাকো, সেই ইসাবেলা মোরেলাস হলো আমার সাইফ চাচুর ওয়াইফ—অর্থাৎ আমাদেরই পরিবারের মানুষ।”
তান্বী এবার আকাশ থেকে পড়ল। “কী বলছেন আপনি? কদবেল ম্যাম আপনার চাচি? তাহলে তারা আমাদের সাথে থাকে না কেন? কেন তারা অন্য বাড়িতে থাকে? কেন তারা আলাদা?”
জাভিয়ান তান্বীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু চাপ দিল। ওর চোখে তখন এক অন্ধকার অতীতের ছায়া। সে গম্ভীর গলায় বলল— “এটার পেছনে অনেক বড় আর নোংরা একটা কাহিনী আছে জিন্নীয়া। ক্ষমতার লড়াই, রক্তের ইগো আর পুরনো কিছু পাপ—সব মিলিয়ে এটা অনেক জটিল। আজ না, অন্য একদিন সব বলব তোমাকে। এখন শুধু এটুকুই জেনে রাখো, আমাদের এই বংশের শত্রু বাইরে কেউ নয়, ঘরের মানুষরাই সবথেকে বড় বিপদ।”
তান্বী স্তব্ধ হয়ে রইল। মেক্সিকোর এই রাজপ্রাসাদটা ওর কাছে এখন এক মস্ত বড় ধাঁধা মনে হচ্ছে। একদিকে ‘নাইট রামেন’-এর আতঙ্ক, আর অন্যদিকে ঘরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা আপন শত্রুদের ভিড়।
.
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জার ডাইনিং টেবিলে তখন রাতের নিস্তব্ধতা। জাভিয়ান ওপরের ঘরে কোনো এক জরুরি মেইলে ব্যস্ত, আর তান্বী একা বসে ফোনের ব্রাইটনেস কমিয়ে স্ক্রলিং করছিল। হঠাৎ ফেসবুকের নিউজফিডে একটা ছবির ওপর ওর আঙুলটা থমকে গেল।
ওর বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল। ফারিহা আপু একটা নতুন ছবি পোস্ট করেছে। তান্বী স্ক্রিনটা জুম করে দেখতে লাগল। ছবিতে ফারিহা আপুর সাথে ওর ভাই ফারহান! কতদিন হলো সে তার ভাইকে দেখেনি, কতদিন হলো তার গলার স্বর শোনেনি। ফারহানকে ছবিতে বেশ গম্ভীর আর কিছুটা বিমর্ষ দেখাচ্ছে। তান্বী পরম মমতায় স্ক্রিনে হাত বুলাল, যেন ফোনের কাঁচ চিরে সে তার ভাইয়ের গালে হাত ছোঁয়াতে পারবে।
“ভাইয়াটা কত শুকিয়ে গেছে… ঠিকমতো খায় না নিশ্চয়ই,” তান্বী বিড়বিড় করে উঠল। ওর চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। সে ভুলেই গিয়েছিল যে চুলায় সে জাভিয়ানের জন্য দুধ গরম করতে বসিয়েছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে লুসিয়া ডাইনিং হলের দিকে আসছিল। তান্বী এতটাই মগ্ন ছিল যে ও টেরই পায়নি লুসিয়া ওর একদম পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। লুসিয়া আড়চোখে একবার তান্বীর ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ফারিহা আর ফারহানের ছবি। ফারিহাকে দেখাচ্ছে অসম্ভব মায়াবী, আর তার পাশে ফারহান—যাকে দেখে লুসিয়ার বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই হিংসায় জ্বলে উঠল। বাংলাদেশের সেই পার্কের অপমান, ফারহানের ওই বিষাক্ত কথাগুলো ওর কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধতে শুরু করল। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, ফারহানের পাশে ফারিহার ওই হাসিমুখ আর আভিজাত্য দেখে লুসিয়ার ভেতর এক চরম ‘জেলেসি’ বা হিংসা কাজ করতে শুরু করল।
হঠাৎ রান্নাঘর থেকে দুধ উথলে পড়ার শব্দ আসতেই তান্বী চমকে উঠল। “ওরে আল্লাহ! দুধ তো সব পড়ে গেল!” বলতে বলতেই সে ফোনটা টেবিলের ওপর উপুড় করে রেখেই রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিল।
লুসিয়া এই সুযোগটা পেয়েই।সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে তান্বীর ফোনটা হাতে নিল। ফারিহার প্রোফাইলটা তখনো খোলা। লুসিয়া নিজের ফোন বের করে দ্রুত ফারিহার ফেসবুক আইডির নাম মোবাইলে ছবি তুলে নিল।
.
.
লুসিয়া নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বুকটা ধকধক করছে অপমানে আর হিংসায়। সে তড়িঘড়ি করে নিজের ফোন বের করে ফেসবুক সার্চ বারে গিয়ে ‘ফারিহা’ আইডি নামটা টাইপ করল। আইডিটা সামনে আসতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।
“এই সেই ফারিহা!” লুসিয়া বিড়বিড় করে উঠল। সে জানত, এই মেয়েটা ফারহানকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করত। ফারহানের ভার্সিটির পুরোনো ফ্রেন্ড। লুসিয়া স্ক্রল করতে করতে নিচে নামল। হঠাৎ একটা রিলস ভিডিওর ওপর ওর নজর পড়ল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ফারহান আর ফারিহা একসাথে, সাথে আরও কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব। তারা সবাই হাসাহাসি করছে, আনন্দ করছে। ফারিহা ফারহানের খুব কাছে দাঁড়িয়ে রিলস বানাচ্ছে। ফারহানের মুখে হাসি।
ভিডিও ব্লগ দেখে লুসিয়ার মনে হলো কেউ ওর কলিজাটা খামচে ধরেছে। দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। “আমাকে সস্তা বলে অপমান করে এখন এই মেয়ের সাথে প্রেম করছ ফারহান? আমাকে মেক্সিকোতে ফেলে রেখে তুমি ওর কাছে চলে গেলে?” লুসিয়ার কান্না এবার তপ্ত রাগে পরিণত হলো।
সে আর সহ্য করতে পারল না। হিংসায় অন্ধ হয়ে সে বিছানা থেকে উঠে নিজের হাই-কনফিগারেশন কম্পিউটারের সামনে গিয়ে বসল। কিবোর্ডের ওপর ওর আঙুলগুলো তলোয়ারের মতো চলতে লাগল। সে একের পর এক ভুয়া রিপোর্ট আর স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে শুরু করল।
“তুমি এই আইডি দিয়ে ফারহানের সাথে ছবি দেবে? আর আমি সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব? অতটা সহজ নয় ফারিহা!” লুসিয়া দাঁতে দাঁত চেপে কম্পিউটারে এমন কিছু কমান্ড দিল যা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সে ফারিহার আইডিতে গণ-রিপোর্ট (Mass Report) মারতে শুরু করল এবং কয়েকটা স্প্যামিং বট সেট করে দিল।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল— “Account Suspended.”
লুসিয়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। ফারিহার আইডিটা এখন ফেসবুকের দুনিয়া থেকে ভ্যানিশ।
লুসিয়া মনে মনে বলল, “ফারহানকে আমি না পেলে অন্য কেউ পাবে না। বিশেষ করে তোমার মতো ওই ফারিহা তো কখনোই নয়!”
.
.
.
এদিকে বাংলাদেশের ধানমন্ডির সেই আভিজাত্যে ঘেরা ফারিহার ড্রয়িংরুম তখন আড্ডায় মুখর। অনেকদিন পর ভার্সিটির পুরনো সব বন্ধুরা এক হয়েছে। ফারহান এক কোণায় সোফায় বসে আছে, ওর চোখেমুখে সেই আগের চঞ্চলতা নেই, বরং এক গভীর গাম্ভীর্য আর রুক্ষতা ওর ব্যক্তিত্বকে যেন আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
বন্ধুদের মধ্যে একজন, সিয়াম, ফারহানের কাঁধে হাত দিয়ে হেসে বলল, “ফারিহা ম্যাডাম, এতদিন পর এই ফারহান শালাকে তুই কোথায় পেলি বল তো? ও তো একদম কর্পূরের মতো ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিল! ফোন দিলে পাওয়া যায় না, মেসেজ দিলে সিন হয় না।”
ফারিহা সোফার ওপর পা তুলে বসে হাসল। “আর বলিস না! আজকে রাস্তার এক মোড়ে ফারহান একটা বিপদে পড়েছিল। আমার সাথে ওর লেখ হয়ে যায় আর আমি ওকে বাঁচিয়েছি। তবে ফারহানকে দেখে আমি নিজেও অবাক! আমাদের সেই শান্ত-শিষ্ট ফারহান আর নেই রে। ও তো এখন পুরো গ্যাংস্টার হয়ে গিয়েছে! ওর চলন-বলন দেখলেই ভয় লাগে।”
ফারহান এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। ফারিহার কথা শুনে ও একটু নড়েচড়ে বসল। ওর শক্ত চোয়ালটা আরও শক্ত হয়ে উঠল। ও নিচু কিন্তু ধমকের সুরে বলল, “ফারিহা, একদম চুপ কর! কি থেকে কী বলছিস… এখন এসব আজেবাজে কথা বলার সময় না। সব জায়গায় এসব বলা যায় না।”
বাকি বন্ধুরা হো হো করে হেসে উঠল। “আরে থাক না ফারহান! তুই যে কবে থেকে আমাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিলি, আজকে তোকে পেয়ে জাস্ট ফাটাফাটি লাগছে। অনেকদিন পর সবাই মিলে আড্ডা হচ্ছে, এটাই বড় কথা।”
ফারিহা এবার ফারহানের দিকে তাকিয়ে আবদারের সুরে বলল, “এই ফারহান! তোর মনে আছে কত ভালো চা বানাস তুই? আমাদের ভার্সিটির দিনগুলোতে তোর হাতের চায়ের জন্য আমরা পাগল ছিলাম। কতদিন খাইনি তোর হাতের চা! যা না, আমাদের সবাইকে এক কাপ স্পেশাল চা বানিয়ে খাওয়া।”
বন্ধুদের জোরাজুরিতে ফারহান শেষমেশ উঠে দাঁড়াল। “আচ্ছা ঠিক আছে, বানাচ্ছি। তোদের পাল্লায় পড়লে নিস্তার নেই।” ও রান্নাঘরের দিকে এগোতে থাকল।
ফারহান ভেতরে যেতেই ফারিহা নিজের মোবাইলটা হাতে নিল। “দ্যাখ, আমি ফারহানের সাথে একটা সেলফি তুলে পোস্ট করেছিলাম, এখনই কত লাইক-কমেন্ট পড়ছে দেখিস!”
কিন্তু মোবাইলটা আনলক করে ফেসবুক অ্যাপে ক্লিক করতেই ফারিহার হাসিটা মিলিয়ে গেল। স্ক্রিনে লাল রঙে একটা লেখা ভেসে উঠছে— “Your account has been suspended.”
ফারিহা অবিশ্বাসের চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আরে! আমার আইডি কই গেল? এই তো একটু আগে ব্লগ আপলোড করলাম, ছবি দিলাম… এখন দেখাচ্ছে আইডি সাসপেন্ডেড! এটা কীভাবে সম্ভব?”
বন্ধুরা সবাই ওর ফোনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। “কী বলিস? রিপোর্ট খেয়েছে নাকি? নাকি কেউ হ্যাক করল?”
ফারিহা দিশেহারা হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারছে না যে সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপাড়ে মেক্সিকোর এক বিলাসবহুল রুমে বসে কেউ একজন হিংসার আগুনে জ্বলে তার এই ডিজিটাল অস্তিত্ব নিমিষেই মিটিয়ে দিয়েছে।
.
.
চলবে………..
পেইজের রিচ কমে গেছে তাই সবাই রিয়েক্ট দিবেন। ২ হাজার রিয়েক্ট হলেই পরের পর্ব আসবে।
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল পর্ব)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৪
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩০
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)