ডিজায়ার_আনলিশড
✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৩৮
কার্টেসি ছাড়া কপি করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ 🚫
চৌধুরী নিকেতনের সেই রাজকীয় ফটকের সামনে তখন যুদ্ধংদেহী এক পরিবেশ। মেক্সিকো থেকে আসা ওই রহস্যময় ফোনকলের পর জাভিয়ানের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। সেখানে বড় কোনো গ্যাং-ওয়ার বা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে ধস নেমেছে যার পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে যে জাভিয়ানের সেখানে থাকাটা এখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। কিন্তু ঠিক এয়ারপোর্টে রওনা হওয়ার আগমুহূর্তে ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিপত্তি।
জাভিয়ানের অন্য এক সেক্রেটারি হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে জানাল, “স্যার, একটা টেকনিক্যাল প্রবলেম হয়েছে। তান্বী ম্যামের ভিসার পেপারে একটা লিগ্যাল এরর ধরা পড়েছে। নরমাল কমার্শিয়াল ফ্লাইটে এই মুহূর্তে ওনার যাওয়া ইমপসিবল। ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স পেতে অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লেগে যাবে।”
জাভিয়ান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে টেবিলের ওপর সজোরে এক ঘুসি মারল। একদিকে তার হাতে একদম সময় নেই, অন্যদিকে তান্বীকে এই অবস্থায় বাংলাদেশে ফেলে যাওয়া মানে তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। মেইলস্ট্রোম কোথায় আছে সে জানেনা তবে যেকোনো সময় ছোবল মারার জন্য ওত পেতে আছে। এক মুহূর্তকাল ভাবল জাভিয়ান, তারপর বরফশীতল গলায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাল।
“ক্যানসেল অল কমার্শিয়াল টিকেটস! আমার পার্সোনাল প্রাইভেট জেট রেডি করতে বলো।রাইট নাও!”
মিনিট দশেকের মধ্যেই খবর এল রানওয়েতে ছোট জেটটি উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সমস্যাটা হলো অন্য জায়গায়। এই লাক্সারি জেটটি আকারে বেশ ছোট। পাইলট আর কো-পাইলট বাদে সেখানে মাত্র দুজনের বসার জায়গা আছে। অর্থাৎ জাভিয়ান আর তান্বী ছাড়া তৃতীয় আর কারো সেখানে তিলধারণের সুযোগ নেই।
রানওয়েতে জেটের ইঞ্জিনের বিকট গর্জন তখন চারপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। জাভিয়ান লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “লুসিয়া, তোকে আজ এখানেই থাকতে হবে। জেটে একদমই জায়গা নেই। আমি আগে তান্বীকে নিয়ে মেক্সিকোতে সেটল হই, কালকের মধ্যে বড় বিমান পাঠিয়ে দেয়া হবে তোর জন্য। ততক্ষণ তুই চৌধুরী নিকেতনেই থাক। গ্ৰান্ডমা আর আমার পার্সোনাল গার্ডরা সারাক্ষণ তোর আশেপাশেই থাকবে।”
লুসিয়া প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এমন একটা আকস্মিক বিচ্ছেদ ঘটবে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনের ভেতরে এক পৈশাচিক আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। জাভিয়ান নেই মানেই সে আজ পুরোপুরি মুক্ত! কড়া নজরদারি থাকলেও জাভিয়ানের ওই খু/নি দৃষ্টির শাসন এখন হাজার মাইল দূরে থাকবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—বাংলাদেশে সে আরও অন্তত একটা রাত সময় পাচ্ছে ফারহানের সাথে সেই অপূর্ণ কাজটা শেষ করার জন্য।
লুসিয়া ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে মেকি বিষাদ নিয়ে বলল, “ঠিক আছে জাভি ব্রো। আমি ম্যানেজ করে নেব। তুমি তান্বীকে নিয়ে সাবধানে পৌঁছাও।”
তান্বী তখনো কাঁদতে কাঁদতে বললো ” বাবা মায়ের সাথে আরেকটা বার দেখা করে যেতে পারবোনা? জাভিয়ান, প্লিজ একটা ব্যবস্থা করুন!”
জাভিয়ান কোনো কথা না বাড়িয়ে তান্বীর কোমর জড়িয়ে ধরল। প্রায় পাজাকোলা করে তাকে জেটের সিঁড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “সময় নেই জিন্নীয়া। আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে, আমাদের এখনই টেক-অফ করতে হবে। চলো!”
জেটের ভারী দরজা যখন সজোরে বন্ধ হয়ে গেল, লুসিয়া রানওয়েতে দাঁড়িয়ে দেখল সেই রুপালি ডানাওয়ালা আকাশযানটি ধোঁয়া উড়িয়ে নীল আকাশে মিশে যাচ্ছে। তার চোখে তখন জয়ের নেশা। বিড়বিড় করে সে বলল—
“যাও জাভি ব্রো! এবার মাঠ একদম ফাঁকা। ফারহান রেহেমান, কাল রাতে তো দাদিমার ভয়ে ইঁদুরের মতো পালিয়েছিলে, আজ তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে?”
জেটের ভেতরে পরিবেশটা একদম অন্যরকম। রাজকীয় ইন্টেরিয়র, মৃদু নীল আলো আর জানালার ওপারে শুধুই পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা। জাভিয়ান তান্বীকে নিজের কোলের ওপর টেনে বসাল। তান্বী তখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে বাবা জন্য ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
জাভিয়ান তান্বীর চিবুকটা আঙুল দিয়ে আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখে তখন এক আদিম তৃষ্ণা আর একাধিপত্য। সে খুব শান্ত কিন্তু ভয়ানক গম্ভীর স্বরে বলল—
“কাঁদছ কেন জিন্নীয়া? বাবা মা নেইতো কি হয়েছে? আমিতো আছি তোমার কাছে, এটা কি যথেষ্ট নয়?।”
তান্বী জাভিয়ানের বুকের সেই পরিচিত উত্তাপ অনুভব করতে পারছে। মেঘের ওপরের এই নির্জনতায় জাভিয়ানের ভালোবাসা যেন আরও বেশি উন্মত্ত আর বেপরোয়া হয়ে উঠল। সে তান্বীর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজল, আর তান্বী এক অজানা শিহরণে শিউরে উঠে জাভিয়ানের শার্ট শক্ত করে খামচে ধরল।
.
.
.
এদিকে চৌধুরী নিকেতনে ফিরে লুসিয়া নিজের রুমে গিয়ে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তার কানে এখনো জেটের ইঞ্জিনের সেই একটানা আওয়াজ বাজছে। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বারবার গতরাতের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলোর কথা ভাবছে।
ঠিক যখন সে ফারহানকে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বিছানার সাথে আটকে ফেলেছিল, যখন ফারহানের সেই পুরুষালি ঘ্রাণ আর তপ্ত নিঃশ্বাস তার নাকে আসছিল—তখনই ঘটেছিল ওই চরম বিভ্রাট। দাদি’র সেই কড়া কণ্ঠস্বর আর দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে ফারহান যেন মুহূর্তে পাথর হয়ে গিয়েছিল। দাদি যখন ওপাশ থেকে বলে উঠলেন, “এক ঘণ্টা তো হয়ে গেল দিদু! ছেলেটাকে বিদায় কর, বাড়ির মান-সম্মানের কথা ভাবিস,” তখন লুসিয়ার মনে হয়েছিল সব মাটি হয়ে গেল।
ফারহান আতঙ্কে আর অপমানে এতটাই কুঁকড়ে গিয়েছিল যে সে লুসিয়াকে ইশারায় হ্যান্ডকাফ খুলে দিতে বলছিল। লুসিয়াও নিরুপায় হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে চাবি ঘুরিয়েছিল। ফারহান মুক্তি পাওয়া মাত্রই এক মুহূর্ত দেরি করেনি। জানালার ওপার দিয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সে পাঁচিল টপকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। লুসিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তার মিলিয়ে যাওয়া ছায়াটার দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল।
সেই অপূর্ণ চুম্বনের তৃষ্ণা আর ফারহানের শরীরের উত্তাপ এখনো লুসিয়ার মনে বিষের মতো বিঁধছে। লুসিয়া বিছানায় পড়ে থাকা বালিশটা গায়ের জোরে জাপটে ধরল। সে মনে মনে হাসল, “ওপরওয়ালা যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন! একদিনের জন্য ভিসা পাওয়া গেল না বলেই তো আজ জাভি ব্রো আমাকে এখানে ফেলে গেল। আজ আমাদের মাঝে দোদুল্যমান কোনো দেয়াল নেই। গ্ৰান্ডমা নিশ্চয়ই রোজ রোজ রাত জেগে পাহারা দেবেন না।”
লুসিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে নিল। তার চোখে তখন একরোখা জেদ। সে তার ফোনটা তুলে নিয়ে দ্রুত ফারহানকে মেসেজ টাইপ করতে শুরু করল।
.
.
.
সূর্য তখন ডুবুডুবু, মেঘের পাহাড়ের গায়ে লেগেছে সিঁদুরে আভা। প্রাইভেট জেটের জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হয় কোনো শিল্পী মনের মাধুরী মিশিয়ে দিগন্তজুড়ে সোনালি আর বেগুনি রঙের খেলা খেলছে। নিচে তাকালে দেখা যায় সাদা মেঘের ভেলা পেঁজা তুলোর সমুদ্রের মতোই, যার ওপর দিয়ে জেটটা নিঃশব্দে ভেসে চলেছে।
তান্বী অপলক দৃষ্টিতে বাইরের এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখছিল। তার সব বিষণ্ণতা আর উৎকণ্ঠা এই মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। সে মুগ্ধ হয়ে বিড়বিড় করে বলল, “সুবহানাল্লাহ! এখান থেকে আকাশটা দেখতে যদি এতই সুন্দর হয়, তবে হ্যাভেন দেখতে কেমন হবে?”
তান্বীর কথা শেষ হওয়ার আগেই জাভিয়ান তার কোমর জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। জেটের কাস্টমাইজড কনভার্টিবল বেডটি তখন পুরোপুরি প্রস্তুত। জাভিয়ান অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় তান্বীকে সেই নরম বিছানায় চেপে ধরল। তান্বী অপ্রস্তুত হয়ে জাভিয়ানের প্রশস্ত কাঁধ খামচে ধরল, তার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল।
জাভিয়ান তান্বীর খুব কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার চোখে তখন এক নেশা আর তীব্র দখলদারিত্ব স্পষ্ট। সে তার সেই সিগনেচার হাস্কি টোনে, অর্থাৎ ফিসফিসে অথচ গম্ভীর গলায় বলল—”Now, behold your heaven, Jinnia.” (এখন তোমার স্বর্গকে দেখে নাও, জিন্নীয়া।)
জাভিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। তান্বী বুঝতে পারল, জাভিয়ান তাকে বোঝাতে চাইছে যে—এই মুহূর্তে জাভিয়ানের বাহুবন্দি হওয়াই তার জন্য স্বর্গ।
জাভিয়ানের চোখের সেই প্রখর চাউনি তান্বীর শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে এক অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলল। বাইরে মেঘের রাজ্যে গোধূলির আলো ম্লান হয়ে আসছে, আর জেটের ভেতরে জাভিয়ানের ভালোবাসা যেন এক উত্তাল সমুদ্রের মতো তান্বীকে গ্রাস করতে শুরু করল।
জেটের কাস্টমাইজড কনভার্টিবল বেডের নরম গদিতে জাভিয়ানের ভারী শরীরের নিচে তান্বী তখন পুরোপুরি বন্দি। জাভিয়ানের চোখের ওই তীব্র চাউনি আর হাস্কি টোন তান্বীর সারা শরীরে এক অজানা কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে পাইলটদের কথা মনে পড়তেই তান্বী ছটফট করে উঠল।
সে জাভিয়ানের প্রশস্ত বুক দুহাতে ঠেলে দূরে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল, “আরে! কী করছেন কী? ছাড়ুন! সামনে পাইলট আছে, ওনারা দেখে ফেললে কী ভাববে?”
জাভিয়ান তান্বীর ভয়টাকে উপভোগ করতে লাগলো। সে তার ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা আর আত্মবিশ্বাসী হাসিটা ঝুলিয়ে রাখল। তান্বীর কানের লতি আলতো করে ছুঁয়ে সে নিচু স্বরে বলল, “থাকুক ওরা। আমার এই প্রাইভেট জেটে আমার পারমিশন ছাড়া কারো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর সাহস নেই। জিন্নীয়া, এই কয়েক হাজার ফিট ওপরে এখন শুধু আমার আইন চলবে।”
তান্বী এবার রেগে গিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। জাভিয়ানের এই বেপরোয়া স্বভাব তাকে একদিকে যেমন টানে, অন্যদিকে তেমনি ভড়কে দেয়। সে জাভিয়ানের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে রাগী অথচ আদুরে গলায় বলে উঠল— “What do you actually want? বদমাইশ লোক!”
জাভিয়ান থামল না। সে তান্বীর দুই হাত মাথার ওপরে তুলে ধরে বিছানার সাথে চেপে ধরল। তার মুখটা তান্বীর মুখমণ্ডলের এত কাছে নিয়ে এল যে দুজনের নাকের ডগা প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। জাভিয়ান তার গম্ভীর আর নেশাক্ত গলায় কবিতার মতো করে বিড়বিড় করল—
“I wanna be your shadow, I wanna be your light!
I wanna keep you breathless, every single night.”
(আমি হতে চাই তোমার ছায়া, আমি হতে চাই তোমার আলো! তোমাকে শ্বাসরুদ্ধকর ভালোবাসায় ডুবিয়ে রাখতে চাই, প্রতিটি রাতে।)
তান্বী স্তব্ধ হয়ে গেল। জাভিয়ানের এই কাব্যিক অথচ তীব্র দখলদারিত্ব তাকে পুরোপুরি নিশ্চুপ করে দিল। জেটের বাইরে তখন গোধূলির শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে গাঢ় অন্ধকার নামছে, আর ভেতরে জাভিয়ানের ভালোবাসা যেন এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার অপেক্ষায়। তান্বী বুঝতে পারল, এই ‘বদমাইশ’ লোকটার হাত থেকে পালানোর কোনো পথ আজ এই মেঘের রাজ্যে নেই।
.
.
.
জেটের ভেতর জাভিয়ান আর তান্বীর সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো যখন এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, তখন হাজার মাইল নিচে চৌধুরী নিকেতনের নিস্তব্ধ ঘরে লুসিয়ার ফোনটা আচমকা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ‘ফারহান’ নামটা দেখে লুসিয়ার হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে গলায় চলে এল।
সে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফারহানের গম্ভীর আর কিছুটা ভারি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আজ ফারহানের গলার স্বরটা প্রতিদিনের মতো শান্ত নয়, বরং তাতে এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর তীব্রতা মিশে আছে।
“লুসিয়া, তুমি এখন কোথায় ? আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই,” ফারহান সরাসরি কাজের কথায় এল।
লুসিয়া খুশিতে প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ফারহান! আমি তো তোমার মেসেজের অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি শোনো, জাভি ব্রো আর তান্বী মেক্সিকোর পথে রওনা দিয়েছে। বাড়িতে এখন কেউ নেই, শুধু গ্ৰ্যান্ডমা ঘুমাচ্ছেন। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।”
ওপাশ থেকে ফারহান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কণ্ঠে একরাশ বিস্ময় আর অভিমান ঝরে পড়ল, “কী বললে? তান্বী চলে গেছে? আমাকে আগে বলোনি কেন? আমার বোনটা দেশ ছেড়ে চলে গেল আর আমি জানলামও না!”
লুসিয়া একটু আমতা আমতা করে বলল, “আসলে সব এত হুট করে হয়েছে যে আমি বলার সুযোগই পাইনি ফারহান। জাভি ব্রো কাউকে কিছু বলার সময় দেয়নি। এখন ওসব বাদ দাও, তুমি চৌধুরী নিকেতনে আসো। আমরা অনেক কথা বলব।”
“না!” ফারহান দৃঢ় গলায় বলল। “আমি বাইরে দেখা করতে চাই, তুমি গুলশানের পার্কে চলে আসো আমি অপেক্ষা করছি।”
লুসিয়া অবাক হলো। ফারহানের গলার সুর আজ বড্ড অন্যরকম লাগছে। তবে এসব ভাবনা মাথা থেকে সরিয়ে লুসিয়া আয়নায় নিজের পিচ রঙের পাতলা স্কার্ট ড্রেসটার দিকে তাকাল। তার ওপর একটা লম্বা চাদর জড়িয়ে নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, “ঠিক আছে ফারহান, আমি আসছি। কিন্তু মনে রেখো, আজ যদি তুমি আমাকে ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করো, তবে আমি তোমাকে শাস্তি দেব!”
ফারহান কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল। লুসিয়া দ্রুত পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। ষ
.
.
.
গুলশানের সেই নিরিবিলি পার্কটি তখন রাতের নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ল্যাম্পপোস্টের হালকা হলুদ আলোয় পার্কের বেঞ্চ আর গাছগুলো এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। লুসিয়া অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই চৌধুরী নিকেতন থেকে বেরিয়ে এসেছে। দূর থেকে ফারহানের লম্বা অবয়বটা দেখতেই তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
লুসিয়া পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে শক্ত করে ফারহানকে জড়িয়ে ধরল। ফারহানের পিঠে মুখ গুঁজে সে আবেশে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল—
“আমি তোমাকে কতটা মিস করেছি জানো ফারহান? থ্যাঙ্ক গড, একদিনের জন্য ভিসা পাওয়া গেল না বলেই তো আমি মেক্সিকোতে এখন যাইনি। আমি আরও দু দিন তোমার কাছে থাকতে পারব।”
লুসিয়া আশা করেছিল ফারহান হয়তো ঘুরে তাকে কাছে টেনে নেবে, কিন্তু ঘটল উল্টোটা। ফারহান অত্যন্ত রুক্ষভাবে লুসিয়ার হাত দুটো নিজের শরীর থেকে সরিয়ে দিল। সে ঘুরে দাঁড়াল, তার চোখের দৃষ্টিতে তখন আগ্নেয়গিরির মতো রাগ। ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, আর নিশ্বাস পড়ছে দ্রুত।
লুসিয়া থতমত খেয়ে গেল। ফারহানের এই রুদ্রমূর্তি সে আগে কখনো দেখেনি। সে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে ঘাবড়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল—
“ফারহান? তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো? সরি… আমি জানি তোমার রাগ হওয়ার কথা। তান্বী যে এভাবে হুট করে মেক্সিকোর পথে রওনা দেবে, সেটা আমি আসলেই আগে থেকে জানতাম না। তাই তোমাকে বলার সুযোগই পাইনি।”
ফারহান এবার এক কদম এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এখন বরফের মতো শীতল অথচ তীক্ষ্ণ। “সুযোগ পাওনি লুসিয়া? নাকি সুযোগ নিতে চেয়েছ? আমার একমাত্র বোনটা দেশ ছেড়ে চলে গেল, আমি দূর থেকে অন্তত ওকে একবার দেখতে পারতাম—আর তুমি সেটা আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি?”
লুসিয়া প্রতিবাদ করতে চাইল, “আরে জাভি ব্রো তো কাউকে সময় দেয়নি—”
ফারহানের চোখ দুটো এখন লাল হয়ে উঠেছে। সে লুসিয়ার কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল—
“তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো লুসিয়া? নাকি এটা তোমার কোনো জেদ? তান্বীর চলে যাওয়াটা তোমার কাছে জাস্ট একটা ‘সুযোগ’, কারন জাভিয়ান ও থাকবেনা আর যাতে তুমি আমার কাছে আসতে পারো। তোমার এই স্বার্থপরতা দেখে আমার ঘৃণা হচ্ছে।”
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে ফারহানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে জল টলমল করছে। সে ভাবতেও পারেনি ফারহান তাকে এভাবে ভুল বুঝবে।
গুলশানের সেই নিঝুম পার্কের স্তব্ধতা ভেঙে ফারহানের কণ্ঠস্বর এবার আরো বজ্রপাতের মতো ফেটে পড়ল। লুসিয়া তার কাঁধে ফারহানের হাতের শক্ত বাঁধন অনুভব করতে পারছে, যা যন্ত্রণার চেয়েও বেশি অপমানের। ফারহানের চোখের সেই চেনা মায়া আজ উধাও, সেখানে কেবল জ্বলছে ধিকিধিকি ঘৃণা আর বিশ্বাসঘাতকতার আগুন।
ফারহান লুসিয়াকে সজোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠল—”তুমি আর কত কী লুকিয়েছ আমার কাছে লুসিয়া? মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে এই ভালোবাসার নাটক আর কতদিন চালাবে? মেক্সিকোতে থাকতে তুমি আমায় বুক বলেছিলে যে আমার বোন নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। অথচ সত্যিটা কী ছিল? তান্বী তখন মেইলস্ট্রোমের নরকে বন্দি ছিল!”
লুসিয়া পাথরের মতো জমে গেল। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। ফারহান থামল না, তার গলার স্বর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল—”ওই মাফিয়া… যে সেদিন তোমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়েছিল, সে তোমার নিজের ভাই! তোমার আপন ভাই আমার বোনের সাথে এমন জানোয়ারের মতো আচরণ করল কীভাবে লুসিয়া? তাকে বন্দি করে রাখা, তাকে আতঙ্কিত করা—এসবের পেছনে তোমারও কি সায় ছিল না? তুমি জানত সবটা, কিন্তু একবারও আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি। কেন জানো? কারণ মেইলস্ট্রোম তোমার ভাই ছিল! ভাইয়ের অপরাধ ঢাকতে তুমি আমার বোনের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছ।”
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো। তার দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আর্তনাদ করে বলতে চাইল, “ফারহান, শোনো! আমি তখন নিরুপায় ছিলাম। ভাইয়ার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস মেক্সিকোতে কারো ছিল না—”
“মিথ্যে কথা!” ফারহান এক ধাক্কায় লুসিয়াকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। “তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসতে, তবে আমার বোনের বিপদে তুমি চুপ করে থাকতে পারতে না। ভালোবাসা মানে শুধু শারীরিক আকর্ষণ আর অধিকারবোধ নয় লুসিয়া, ভালোবাসা মানে সততা। তুমি আমাকে ভালোবেসেছ তোমার স্বার্থে, তোমার একঘেয়েমি কাটাতে। আর আমি? আমি বোকার মতো বিশ্বাস করে গেছি যে তুমি আমার পাশে আছ।”
ফারহান লম্বা একটা শ্বাস নিল, তার বুকটা অপমানে ফুলে উঠছে। সে পার্কের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“আজ তান্বী মেক্সিকো চলে গেছে। যে যমপুরী থেকে ও একবার ফিরে এসেছে, সেখানেই ওকে নিয়ে যাওয়া হলো। আর তুমি? তুমি এখন আমার সাথে এই পার্কে রোমান্স করতে এসেছ? ধিক্কার জানাই তোমার এই ভালোবাসাকে!”
.
.
.
ফারহানের চোখের মণি রাগে জ্বলছে। সে লুসিয়ার থেকে কয়েক হাত দূরে সরে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠল—
“তোমার দুই ভাই মিলে আমার বোনের জীবনটাকে পিষ্ট করে দিচ্ছে লুসিয়া! জাভিয়ান আর ওই মেইলস্ট্রোম—ওরা যমদূতের মতো তান্বীর সাথে জড়িয়ে আছে। তুমি কি ভেবেছ আমি সারাজীবন এভাবে পাথরের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব? আমার রক্ত কি এতটাই হিম হয়ে গেছে?”
লুসিয়া ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের জামার কোনাটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে পালটা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করল। তার গলার স্বরে তখন এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব।
“ফারহান, তুমি ভুল বুঝছো! জাভি ব্রো তান্বীকে জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ভাইয়ার হাত থেকে জাভি ব্রো তান্বীকে উদ্ধার করে এনেছে। জাভি ব্রো না থাকলে আজ হয়তো তান্বীকে আর খুঁজে পাওয়া যেত না!” লুসিয়া আর্তি নিয়ে বলল।
“উদ্ধার করে এনেছে?” ফারহান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “নাহয় মানলাম জাভিয়ান ওকে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু ওই মেইলস্ট্রোম? সে তো এখনো আমার বোনের পিছে শিকারি নেকড়ের মতো পড়ে আছে। জাভিয়ান কি পেরেছে তাকে থামাতে? পারেনি। আমি আর কোনো ঝুঁকি নেব না লুসিয়া। আমি আমার বোনকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনবই।”
ফারহানের জেদ দেখে লুসিয়া আঁতকে উঠল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে ফারহানের হাত চেপে ধরল। “এই ভুল কোরো না ফারহান! তান্বী জাভি ব্রো’র কাছেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। মেক্সিকোর ওই দুর্ভেদ্য প্রাসাদে ওকে স্পর্শ করার সাহস মেইলস্ট্রোমেরও নেই।”
“কেমন নিরাপদ তা তো আমি হাড়েমাসেই দেখতে পাচ্ছি!” ফারহান এক ঝটকায় লুসিয়ার হাত সরিয়ে দিল। “ওই মেইলস্ট্রোম এখন বাংলাদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেন? কারণ সে আমার বোনের ক্ষতি করতে চায়, তাকে ছিনিয়ে নিতে চায়। জাভিয়ান যদি তাকে আটকাতেই পারত, তবে সে বাংলাদেশে আসার সাহস পেত না। আমি কোন ভরসায় মেক্সিকোতে আমার বোনকে ওই আগুনের কুণ্ডলীতে রেখে আসব?”
লুসিয়া এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের জমে থাকা সত্যিগুলো আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে এল। সে ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক নিষ্ঠুর সত্য উচ্চারণ করল—”তুমি নিরাপত্তা দিতে চাও ফারহান? তোমার কাছেও তোমার বোন নিরাপদ নয়, আর সেটার প্রমাণ আগেই পেয়েছ! তান্বীর জীবনের প্রতিটা বিপদ, প্রতিটা চোখের জল—সবকিছুর শুরু হয়েছে তোমার জন্য। তোমার ওই অন্ধকার জগতের শত্রুতার কারণেই প্রথম বিপদটা ওর জীবনে এসেছিল। আজ বড় বড় কথা বলছো, কিন্তু ওকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার কারিগর তো তুমি নিজেই!”
লুসিয়ার এই মোক্ষম আঘাতে ফারহান যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, আর হৃদপিণ্ডটা অপমানে ছিঁড়ে যেতে চাইল। লুসিয়া যা বলছে তা মিথ্যে নয়। ফারহানের নিজের ছায়ারাই তান্বীর জীবন বিষিয়ে দিয়েছে।
গুলশানের সেই নীরব পার্কের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ফারহানের মুখটা এখন এক নিষ্ঠুর খুনির মতো দেখাচ্ছে। লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে সে ঘৃণার স্বরে বলল—
“শোনো লুসিয়া, আমার ভুল ছিল সেটা আমি মানলাম। কিন্তু তোমার ওই জানোয়ার ভাই মেইলস্ট্রোমকে বলে দিও, আমার বোনের দিকে যেন আর দ্বিতীয়বার নজর না দেয়। ওর সাহস হয় কী করে একজনের বিবাহিত স্ত্রীর দিকে হাত বাড়ানোর?”
লুসিয়া এবার তেড়ে এল। তার মেক্সিকান রক্ত অপমানে টগবগ করে ফুটছে। সে তর্জনী উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল—
“বাহ! আমি বললেই আমার ভাই শুনে ফেলবে? আমার ভাইয়াও তো তোমাকেও বলেছিল আমার ধারেকাছে না ঘেষতে, তুমি কি শুনেছ? শোনোনি তো! তবে মেইলস্ট্রোম কেন শুনবে?”
“আমার বিষয় আলাদা!” ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল। “কিন্তু আমার বোন এখন বিবাহিত। জাভিয়ানের সাথে ওর ঘর সংসার। সেখানে মেইলস্ট্রোম কেন ভাগ বসাতে চায়? সে কেন আরেকজনের ঘর ভাঙতে চায়?”
“দেখো ফারহান, এর মধ্যে আমাকে কেন টানছ? আমার দোষটা কোথায়?” লুসিয়া প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“তোমার দোষ!” ফারহানের কণ্ঠে এবার তীব্র বিষ ঝরে পড়ল। “তোমার দোষ এটাই যে, আমার বোনের চরম শত্রুর রক্ত তোমার শরীরে বইছে। ওই জানোয়ার মেইলস্ট্রোম তোমার ভাই, আর ওর সম্বন্ধে আমি সব জানি। ও কতটা জঘন্য হতে পারে সেটা দেখার পর আমি এখন বুঝতে পারছি ওর বোন আসলে কেমন হতে পারে!”
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের জল শুকিয়ে সেখানে আগুনের ফুলকি দেখা দিল। “কী বোঝাতে চাইছ তুমি?”
“বোঝাতে চাইছি যে আমি একটা ভুল মানুষকে ভালোবেসেছি!” ফারহান এক পা এগিয়ে এল, তার ছায়াটা লুসিয়ার ওপর দানবের মতো জেঁকে বসল। “তবে ফারহান রেহমান নিজের ভুল শুধরে নিতে জানে। আমার বোন যখন যমে-মানুষে লড়াই করছিল, যখন ও এত বড় বিপদে ছিল—তুমি তখন দিব্যি আমার পিছু পিছু ঘুরে বেরিয়েছ! আমার সাথে প্রেম করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলে। তুমি জানতে ও মেইলস্ট্রোমের নরকে পচছে, অথচ তুমি আমার সাথে রোমান্স করতে ব্যস্ত ছিলে! এতেই তো বোঝা যায় মেইলস্ট্রোমের রক্ত কতটা জঘন্য আর স্বার্থপর হতে পারে।”
লুসিয়া এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সজোরে ফারহানের বুকে এক ধাক্কা দিল। তার আর্তনাদ পার্কের নিস্তব্ধতা চিরে দিল—
“জাস্ট স্টপ ফারহান! তুমি আমাকে এভাবে অপমান করছ? আরে, তোমার বোন কি খুব সাধু নাকি? ওর জন্যই আজ আমার দুই ভাইয়ের জীবনটা ছারখার হয়ে যাচ্ছে। ওই একটা মেয়ের জন্য আমার দুই ভাই আজ একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে উঠেছে! আমার দুই ভাইয়ের মধ্যে যে চরম শত্রুতা, তার মূল কারণই হলো তোমার ওই বোন তান্বী। আমার পরিবারের সুখ-শান্তি নষ্ট করার জন্য ও-ই দায়ী!”
ফারহান স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। লুসিয়া আজ তার পরিবারের ওপর আক্রমণ করেছে। পার্কের সেই রাত আর রোমান্টিক রইল না; তা হয়ে উঠল এক রণক্ষেত্র। একদিকে ভাইয়ের প্রতি টান, অন্যদিকে বোনের প্রতি অসীম ভালোবাসা—মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হয়ে গেল তাদের কয়েক দিনের সেই ঠুনকো প্রেমের সম্পর্ক।
গুলশানের সেই অন্ধকার পার্কটি আজ এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। লুসিয়ার মেক্সিকান রক্ত তখন অপমানে ফুটছে। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—
“শোনো ফারহান! এই জন্যই প্রথম থেকে আমি ওই তান্বীকে আমার ভাইয়ের বউ হিসেবে মেনে নিতে পারিনি। ও মোটেও অতটা ভালো নয় যতটা দেখায়। ওর কারণেই আজ আমার দুই ভাইয়ের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী শত্রুতা! চোখের সামনে নিজের পরিবার শেষ হয়ে যেতে দেখছি আমি স্রেফ ওই একটা মেয়ের জন্য!”
লুসিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারহান বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে লুসিয়ার দুই বাহু খামচে ধরল। তার আঙুলের চাপে লুসিয়া যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল—”খবরদার লুসিয়া! আমার বোনের নামে আর একটাও বাজে কথা বললে আমি তোমাকে এখানেই মেরে ফেলব! তুমি আমার বোন সম্বন্ধে কী জানো? ও হচ্ছে একটা পবিত্র ফুল। তোমাদের ওই জানোয়ার আর জালেম বংশের মতো ও নয়। ওই অপবিত্র মুখে আমার বোনের নাম আর কোনোদিন নেবে না, তুমি নিজে একটা আস্ত নষ্টা মেয়ে!”
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কানে যেন তপ্ত সিসা ঢেলে দেওয়া হয়েছে। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ফারহানের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “কী বলতে চাইছ তুমি? তুমি আমাকে এভাবে অপমান করতে পারলে ফারহান? আমার সম্বন্ধে তুমি কী জানো?”
“জানতে হবে কেন? সব তো চোখের সামনেই দেখতে পেয়েছি!” ফারহান এক ঝটকায় লুসিয়াকে দূরে ঠেলে দিল। “তুমি মেক্সিকোর কোন ক্লাবে কোন ছেলের সাথে ঘেঁষেছ, তোমার শরীরে কত পুরুষের ছোঁয়া লেগে আছে—সবটা না জেনেও আমি তোমাকে ভালোবেসে মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আলাদা।”
“একদম বাজে কথা বলবে না ফারহান!” লুসিয়া চিৎকার করে প্রতিবাদ করল। “আমি হয়তো ফ্রি-মিক্সিং করতাম, আমার অনেক ছেলে বন্ধু ছিল—তার মানে এই নয় যে আমি নিজের দেহকে সস্তা বানিয়ে ফেলেছি কিংবা হাজারটা ছেলের সাথে শুয়েছি। তুমি আমাকে এত নিচ ভাবলে?”
ফারহান এবার একটা পৈশাচিক হাসি হাসল। তার চোখে তখন চরম ঘৃণা। সে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল— “সেটা তো কাল রাতেই বুঝেছি লুসিয়া! যে মেয়ে বিয়ের আগে নিজের সবটুকু আমাকে দিয়ে দিতে চায়, যার মধ্যে এত উত্তেজনা—সে কোনো ছেলেকে নিজের দেহ দেয়নি, এটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে? তোমার মতো সস্তা মেয়েকে চেনা আমার বাকি নেই।”
নিস্তব্ধ পার্কে সজোরে একটা শব্দ হলো। লুসিয়া সর্বশক্তি দিয়ে ফারহানের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। তার হাত কাঁপছে, চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। সে চিৎকার করে বলল— “মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ ফারহান রেহমান! তুমি আজ তোমার সব লিমিট ক্রস করেছ। আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”
ফারহান গালটা হাত দিয়ে চেপে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন পাথরের মতো কাঠিন্য। সে বরফশীতল গলায় বলল— “আর কোনোদিন যেন আমার সাথে তোমার দেখা না হয়। আজ থেকে ফারহান রেহমান তোমার জন্য মরে গেছে। আর কোনোদিন আমাকে ফোন করার ধৃষ্টতা দেখাবে না।”
লুসিয়া তখন অপমানে আর যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে। সে চোখের জল মুছে শেষবারের মতো ফারহানের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন এক চরম প্রতিজ্ঞা— “মরে গেলেও আর কোনোদিন তোমার সামনে আসব না ফারহান। আজ আমাদের সব শেষ। আর কোনোদিন আমাদের দেখা হবে না!”
কথাটা বলেই লুসিয়া পেছন ফিরে দৌড় দিল। তার সেই পিচ রঙের ড্রেসের ওপর জড়ানো চাদরটা বাতাসে উড়ছে। পার্কের গেট পেরিয়ে সে যখন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, ফারহান তখনো একা দাঁড়িয়ে রইল।
লুসিয়া হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গুলশানের জনশূন্য রাস্তায় পাগলীর মতো হাঁটছে। গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুছবার কোনো তাগিদ নেই তার। ফারহানের প্রতিটি বিষাক্ত শব্দ— “নষ্টা মেয়ে”, “সস্তা শরীর”—তপ্ত শলার মতো তার মস্তিস্ককে বিদ্ধ করছে। সে জানত না, এক রাতেই ভালোবাসা এভাবে বীভৎস এক ঘৃণায় রূপ নিতে পারে।
রাস্তায় গাড়ির আনাগোনা নেই বললেই চলে। হঠাৎ পেছনের দিক থেকে একটা দানবীয় ট্রাক প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে এল। ড্রাইভারের উচ্চস্বরে হর্ন কিংবা ব্রেকের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ লুসিয়ার কানে পৌঁছালো না। সে তখন ফারহানের ওই শেষ থাপ্পড় আর অপমানের স্মৃতিতে বিভোর। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড—ট্রাকটা লুসিয়াকে পিষে দিয়ে চলে যেত।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা শক্তিশালী হাত লুসিয়ার কলার চেপে ধরে তাকে সজোরে রাস্তার পাশে টেনে নিল। লুসিয়া ছিটকে ফুটপাতে আছড়ে পড়ল। ট্রাকটা একটা কালান্তক বাতাস রেখে শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে গেল।
লুসিয়া ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চোখ তুলে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে সেই ক্রুর হাসি আর তীক্ষ্ণ চোখ। মেইলস্ট্রোম!
মেইলস্ট্রোম খুব শান্ত ভঙ্গিতে নিজের জ্যাকেটের ধুলো ঝেড়ে বলল, “প্রাইভেট জেট রেডি আছে লুসিয়া। চলো, তোমাকে মেক্সিকোতে পৌঁছে দেই। এই আবর্জনার শহরে তোমার আর এক মুহূর্ত থাকার প্রয়োজন নেই।”
লুসিয়া কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কিন্তু… আমার লাগেজ? ওগুলো তো সব চৌধুরী নিকেতনে। আমাকে ওগুলো নিতে হবে—”
“নেয়ার কোনো দরকার নেই,” মেইলস্ট্রোম লুসিয়ার কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল। তার কণ্ঠে তখন বরফশীতল কাঠিন্য। সে এক কদম এগিয়ে এসে লুসিয়ার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল। “তোমার কি জামাকাপড়ের অভাব? ওইগুলো নেয়ার কোনো দরকার নেই তোমাকে আমি মেক্সিকোর সবচেয়ে দামি শোরুমে পুরোটা কিনে দেবৌ।”
লুসিয়ার চোখে তখনো জল টলমল করছে। মেইলস্ট্রোম তার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর আর গম্ভীর স্বরে বলল—
“আমি শুধু একটা কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই লুসিয়া—তুমি কার বোন, সেটা মাথায় রাখবে। তুমি মেইলস্ট্রোমের রক্ত! তোমার পরিচয় এতটাই উঁচুতে যে এই সাধারণ পথের ছেলেরা তোমার পায়ের নিচে এসে আছড়ে পড়বে, তুমি তাদের জন্য চোখের জল ফেলবে না। আজ থেকে তোমার চোখের এক ফোঁটা জলের দাম হবে একেকটা মানুষের প্রাণ।”
লুসিয়া মেইলস্ট্রোমের চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারল, ফারহানের দেওয়া অপমানের ক্ষত হয়তো কোনোদিন শুকাবে না, কিন্তু মেইলস্ট্রোম তাকে যে পথে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ফেরার কোনো রাস্তা নেই।
মেইলস্ট্রোম লুসিয়াকে ইশারায় তার কালো এসইউভি গাড়িতে উঠতে বলল। গাড়িটা যখন স্টার্ট দিল, লুসিয়া জানালার কাঁচ দিয়ে শেষবারের মতো ঢাকার রাতের আকাশটা দেখল। ফারহান রেহমানের জন্য রাখা শেষ মায়াটা সে সেখানেই বিসর্জন দিল।
.
.
.
মেক্সিকোর উত্তপ্ত বাতাস আর ল্যাভেন্ডারের সুবাসে ঘেরা ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’-র বিশাল গেটটা যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল, তান্বীর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। দীর্ঘ যাত্রা আর জেটের ভেতরে জাভিয়ানের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ভালোবাসার রেশ এখনো তার শরীরে লেগে আছে। কিন্তু ভিলার পাথুরে দেয়াল আর সশস্ত্র পাহারাদারদের দেখে তার মনে হলো, সে আবার সেই সোনার খাঁচায় বন্দি হতে চলেছে।
জাভিয়ান গাড়ি থেকে নেমে তান্বীর কপালে একটা আলতো চুমু দিয়ে তার হাতটা শক্ত করে ধরল। তার চোখের সেই রোমান্টিক ভাবটা মুহূর্তেই উধাও হয়ে সেখানে এক পৈশাচিক কাঠিন্য ফিরে এসেছে। সে নিচু স্বরে বলল, “জিন্নীয়া, ভেতরে যাও। বাড়ির সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ রাতটা সাবধানে থেকো, আমি কাজ শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব ফিরব।”
তান্বী কিছু বলতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ানের চোখের ওই বরফশীতল চাহনি দেখে সে চুপ হয়ে গেল। সে দেখল ভিলার বাইরে একটা কালো ল্যান্ড রোভার দাঁড়িয়ে আছে, যার সামনে সিটে বসে আছে জাভিয়ানের বিশ্বস্ত ডান হাত—রায়হান।
জাভিয়ান দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠল। রায়হান আয়নায় জাভিয়ানের মুখটা দেখে নিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে যখন বেরিয়ে গেল, তান্বী শুধু গেটের আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই মিলিয়ে যাওয়া ধোঁয়া দেখল।
চলবে……..
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২০