Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৭


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি

পর্ব – ৩৭

সকাল থেকেই ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এ এক উৎসবমুখর পরিবেশ হয়ে উঠেছে। তান্বীর ভার্সিটির বান্ধবীদের পুরো গ্যাং আজ তার বাড়িতে হানা দিয়েছে। স্নেহা, মিম, আরিশা সহ প্রায় পাঁচ-ছয়জন মিলে ড্রয়িংরুমটা প্রায় দখল করে নিয়েছে। দুপুরের এলাহি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলল, কিন্তু তাদের আড্ডা আর হাসাহাসি থামার কোনো নাম নেই।

জাভিয়ান নিজের ঘরে বসে মোবাইলে কাজ করছিল, কিন্তু তার মেজাজ এখন সপ্তম আকাশে। সকাল থেকে সে তান্বীর সাথে একটু সময় কাটানোর সুযোগ পায়নি। তান্বী তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে বান্ধবীদের সাথে পুরনো দিনের গল্পে মেতে আছে। জাভিয়ান একবার ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় ডাকতে চাইল, কিন্তু তান্বীর খুশিময় মুখ দেখে নিজেকে আটকে নিল। তবে তার ভেতরের রাগটা বারুদের মতো জমছে।

এদিকে ড্রয়িংরুমে হাসাহাসির মাঝখানে স্নেহা ফিসফিস করে বলল, “কিরে তান্বী, তোর কি সেই শিমুলের কথা মনে আছে? ছেলেটা তোকে পাওয়ার জন্য কত পাগল ছিল! তুই তো ওকে পাত্তা ই দিলি না।”

তান্বী হাহা করে হেসে উঠে বলল, “আরে রাখ তো! ওই সব ফাটিচার মার্কা ছেলেদের কে পাত্তা দেয়? ওসব আজেবাজে ছেলেকে পাত্তা দিলে আমি কি আজকে জাভিয়ানের মতো এমন হাজবেন্ড পেতাম?”

বান্ধবীদের হাসির রোলে ড্রয়িংরুম ফেটে পড়ল। জাভিয়ান দরজার আড়াল থেকে তান্বীর মুখে নিজের প্রশংসা শুনে একটু শান্ত হলেও তার অস্বস্তি কাটল না।
ঠিক তখনই স্নেহা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “আচ্ছা তান্বী, তোর বড় ভাই ফারহান ভাইয়া কি আজকাল বাসায় আসে না? ওনাকে দেখার আমার খুব ইচ্ছা। তুই তো জানিস, ফারিয়া আপু কিন্তু তোর ভাইকে কত পছন্দ করত! যদিও আমি কোনোদিন সামনাসামনি দেখিনি, কিন্তু ফারিয়া আপুর মুখে ওনার বর্ণনা শুনে মনে হতো তোর ভাই নির্ঘাত কোনো গ্রীক গড হবে! তোর ভাইয়ের উচিত ছিল ফারিয়া আপুকে বিয়ে করে নেওয়া। দারুণ মানাত দুজনকে।”

ফারহানের রুমের দরজাটা তখন সামান্য খোলা ছিল। ভেতরে লুসিয়া আধশোয়া হয়ে ফারহানের সেই চেক শার্টটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিল। স্নেহার কথাগুলো তীরের মতো লুসিয়ার কানে গিয়ে বিঁধল। ‘ফারিয়া আপু’, ‘পছন্দ করত’, ‘বিয়ে করলেই পারত’—এই শব্দগুলো শোনার পর লুসিয়ার মাথার রক্ত একদম মাথায় উঠে গেল।

লুসিয়া বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মেক্সিকান রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। সে মনে মনে গর্জে উঠল, “ফারহান আমার! ওকে অন্য কেউ পছন্দ করবে—এত বড় সাহস কার? আর তান্বীর বান্ধবীরা আমার ফারহানকে নিয়ে বিয়ের গল্প ফেঁদেছে?”

লুসিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দরজার হাতলটা শক্ত করে ধরল। তার ইচ্ছে করছিল এখনই ড্রয়িংরুমে গিয়ে ওই মেয়েদের মুখের ওপর বলে দিতে— “ফারহান রেহমান ইজ মাইন!”

বিকেলের শান্ত আলোয় এক ভয়াবহ ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে জাভিয়ানের নিজের বউয়ের ওপর রাগ, আর অন্যদিকে লুসিয়ার ভেতরের ঈর্ষার আগুন।

সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নামার পর যখন তান্বীর বান্ধবীরা বিদায় নিল, পুরো বাড়িটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তান্বী বেশ হাসিখুশি মনেই নিজের রুমে ঢুকল, কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই দেখল জাভিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর শক্ত চোয়াল বলে দিচ্ছিল তার ভেতরে যে আগ্নেয়গিরি ফুটছে।

তান্বী কাছে আসতেই জাভিয়ান ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখের দৃষ্টি এতটাই প্রখর ছিলো যে তান্বী একটু থমকে গেল। জাভিয়ান চাপা গর্জনে বলল, “সাড়ে আট ঘণ্টা, জিন্নীয়া! সাড়ে আট ঘণ্টা ধরে তুমি ওই আজেবাজে আড্ডায় মেতে ছিলে?”

তান্বী একটু অবাক হয়ে বলল, “ওরা আমার ভার্সিটির ফ্রেন্ড জাভিয়ান! মেক্সিকো চলে গেলে ওদের সাথে তো আর এভাবে দেখা হবে না। আপনার সাথে তো আমি সারাদিন থাকি, আর ইনশাআল্লাহ সারাজীবন থাকবো। কিন্তু ওদের তো আর পাব না, তাই না?”

জাভিয়ান এক কদম এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এখন বরফের মতো শীতল। “তাই বলে তুমি তোমার হাজব্যান্ডকে ইগনোর করবে সারাটা সময়? আমি এই বাড়িতে একটা আসবাবপত্রের মতো পড়ে থাকব আর তুমি ওদের নিয়ে হাসাহাসি করবে?”

“আমিতো এমন কিছুই করিনি জাভিয়ান! ওরা তো আমার ফ্রেন্ড,” তান্বী একটু আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করল।

জাভিয়ান এবার তান্বীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার শরীরের উত্তাপ তান্বী অনুভব করতে পারছে। সে বলল, “তান্বী, আমি তোমার ওই আড্ডাকে ঘৃণা করছি। ওই প্রতিটা মুহূর্তকে ঘৃণা করছি যা তুমি আমার থেকে দূরে কাটিয়েছ।”

তান্বী এবার কিছুটা হেসেই ফেলল। “এই সামান্য বিষয়! তাও আবার ওরা আমার মেয়ে ফ্রেন্ড। আপনি এত জেলাসি কেন হচ্ছেন?”

“জেলাসি?” জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত অন্ধকার হাসি ফুটে উঠল। সে তান্বীর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরল। “জেলাসি কাকে বলে তুমি জানো জিন্নীয়া? তুমি তো কেবল বান্ধবীদের কথা বলছ—”

জাভিয়ান তার মুখটা তান্বীর কানের খুব কাছে নিয়ে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর চামড়ায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। সে ফিসফিস করে বলল—”আমি ঘৃণা করি তোমার ঘুমকে। কারণ ঘুমন্ত অবস্থায় তোমার মস্তিষ্ক থেকে আমি বিচ্ছিন্ন থাকি। তুমি যখন ঘুমাও, তখন তোমার স্বপ্নে আমি আছি কি না, সেটা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আর সেই বিচ্ছিন্নতা আমাকে পাগল করে দেয়।”

তান্বী স্তব্ধ হয়ে গেল। জাভিয়ানের এই পাগলামি, এই অধিকারবোধ তাকে মাঝে মাঝে শিউরে দেয়। সে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে বলল, “তাহলে কি আপনি চান আমি না ঘুমিয়ে থাকব? মানুষ কি না ঘুমিয়ে থাকতে পারে?”

জাভিয়ান তান্বীর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখে তখন এক নেশা আর তীব্র দখলদারিত্ব। সে খুব শান্ত ভয়ানক গলায় বলল—”যদি এটা করা যেত জিন্নীয়া, তাহলে আমি তোমাকে এমন মেডিসিন খাইয়ে রাখতাম যে তুমি সারারাত, সারাদিন জেগে থাকতে। তোমার চোখের পাতা এক হতো না, আর তুমি শুধু আমার কথা ভাবতে। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। আমি চাই না তোমার অবচেতন মনটাও এক সেকেন্ডের জন্য আমার থেকে দূরে থাকুক।”

তান্বীর গলার কাছে একটা ঢোক গিলল। জাভিয়ানের ভালোবাসা যেন এক বিশাল সমুদ্র, যাতে ডুবে যাওয়া যায় কিন্তু তীরের দেখা পাওয়া অসম্ভব।

জাভিয়ানের সেই তীব্র অধিকারবোধের চাদরে ঢাকা ঘর থেকে কয়েক দেয়াল দূরে, ফারহানের ঘরে লুসিয়া তখন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। স্নেহার বলা সেই “ফারিয়া আপু” নামটা তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে হাতুড়ি পেটা করছে। ‘বিয়ে করলে দারুণ মানাত’—এই একটা বাক্য লুসিয়ার মেক্সিকান রক্তকে টগবগ করে ফুটিয়ে তুলেছে।

সে আর অপেক্ষা করতে পারল না। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা। লুসিয়া সজোরে ফারহানের নাম্বারে ডায়াল করল। এক রিং হতেই ওপাশ থেকে ফারহান ফোনটা ধরল। সে কিছু বলার আগেই লুসিয়া তীরের মতো গর্জে উঠল— “ফারহান রেহেমান! তোমার সাহস তো কম না! তুমি বাংলাদেশে বসে ফারিয়া নামের কোনো মেয়ের সাথে প্রেম করেছো আর এদিকে আমার সাথে ভালোবাসার নাটক দেখাচ্ছ?”

ওপাশ থেকে ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে সম্ভবত লুসিয়ার এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “কী বলছ এসব লুসিয়া? ফারিয়া কোথ থেকে আসলো এখানে?”

“ন্যাকামি করো না ফারহান!” লুসিয়া প্রায় চিৎকার করে উঠল, তবে জাভিয়ানের ভয়ে গলার স্বর কিছুটা দমিয়ে রাখল। “আজ তান্বীর বান্ধবীরা এসেছিল। স্নেহা বলছিল ফারিয়া আপু নাকি তোমাকে অনেক পছন্দ করে, তুমি নাকি গ্রীক গড! আর তোমরা নাকি একে অপরকে বিয়ে করলে দারুণ মানাত! সত্যি করে বলো, ওই ফারিয়ার সাথে তোমার কী সম্পর্ক?”

ফারহান এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল ড্রয়িংরুমের আড্ডা লুসিয়ার কানে পৌঁছেছে। সে একটু হেসেই ফেলল, যা লুসিয়ার রাগকে আরও বাড়িয়ে দিল।

“হাসছ তুমি? মজা পাচ্ছ?” লুসিয়া এবার ফুঁসতে শুরু করল। “শোনো ফারহান, যদি আমি জানতে পারি যে তুমি আমার অগোচরে ওই ফারিয়া বা অন্য কোনো মেয়ের দিকে একবারও তাকিয়েছ, তবে আমি কী করতে পারি তুমি জানো না!আমি ওই মেয়ের বাড়ি জ্বালিয়ে দেব!”

ফারহান এবার সিরিয়াস হলো। সে খুব নিচু আর গভীর স্বরে বলল, “লুসিয়া, শান্ত হও। ফারিয়া আমার ভার্সিটির ফ্রেন্ড ছিলো ও তান্বীর থেকে কয়েক বছরের বড়। সে আমাদের এলাকায় থাকত।সে আমাকে পছন্দ করত কি না সেটা তার ব্যাপার, কিন্তু আমার জীবনে তোমার বাইরে কেউ নেই। ওই আড্ডার কথা শুনে তুমি কেন পাগল হচ্ছ?”

“পাগল হবো না তো কী করবো?” লুসিয়া কান্নাভেজা গলায় বলল। “আমি তোমার জন্য দেশ ছাড়লাম, আর এখন শুনছি তোমার জন্য লাইনে মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে! শোনো ফারহান, তুমি শুধু আমার। তোমার নখের কোণটাও অন্য কেউ ছুঁতে পারবে না। যদি দেখি ওই ফারিয়া তোমার আশেপাশে ঘুরছে, তবে আমি নিজের হাতে ওকে ঠিক করে দেব!”

ফারহান ওপাশ থেকে মৃদু হাসল। লুসিয়ার এই তীব্র অধিকারবোধ তাকে একাধারে ভয় দিচ্ছে আবার এক অদ্ভুত তৃপ্তিও দিচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল, “আচ্ছা বাবা, আমি শুধু তোমার। এখন শান্ত হও তো।”

লুসিয়া রাগে ফোনটা বিছানায় আছাড় মারল। সে জামার হাতাটা খামচে ধরে বিড়বিড় করল, “ফারিয়া! দেখাচ্ছি তোমাকে মজা। ফারহানকে পছন্দ করার শখ আমি মিটিয়ে দেব।”

লুসিয়ার এই ঈর্ষার আগুন আজ রাতে সহজে নিভবে বলে মনে হচ্ছে না। ওদিকে জাভিয়ানও তান্বীকে নিয়ে নিজের এক উন্মাদ জগত তৈরি করে রেখেছে।
.
.
.
মেক্সিকোর ফ্লাইটের আর মাত্র তিন দিন বাকি। জাভিয়ানের ইচ্ছা, দেশ ছাড়ার আগে শেষ দুটো দিন সে তার বাবার পৈতৃক ভিটে, সেই বিশাল ঐতিহ্যবাহী ‘চৌধুরী নিকেতন’-এ কাটাবে। তার দাদার আমলের সেই বাড়িটি জাভিয়ানের শিকড়, আর যাওয়ার আগে সে তান্বীকে নিজের সেই আদি ঐতিহ্যের সাথে আরেকবার পরিচয় করিয়ে দিতে চায়।

সকাল সকাল পুরো বাড়িতে এক বিষণ্ণতার ছায়া নেমে এল। লবিতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে জাভিয়ান আর তান্বীর লাগেজ। তান্বীর বাবা-মা ড্রয়িংরুমের এক কোণায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। তাদের বুক খালি করে তান্বী আবার অনেক দূরের দেশে চলে যাবে,এই সত্যিটা তাদের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে।

তান্বীর মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তান্বীকে জড়িয়ে ধরে তিনি ডুকরে উঠলেন, “মা রে, যাওয়ার তো এখনো দেরি ছিল। আজই কেন যাবি? এই শেষ কটা দিন তো অন্তত আমার চোখের সামনে থাকতে পারতিস।”

তান্বী মায়ের কাঁধে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছে। তার মনটা আজ বড্ড ভার। একদিকে জাভিয়ানের প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে এই মা-বাবা আর নিজের প্রিয় ঘরটা ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা। জাভিয়ান দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। তার শক্ত হৃদয়েও একটু মোচড় দিল, কিন্তু সে জানে তাকে যেতেই হবে। সে তান্বীর বাবার সামনে গিয়ে নিচু হয়ে কদমবুচি করল “বাবা, আমরা তো দেশেই আছি। মাত্র দুদিন পরেই তো চলে যাব। আপনাদের দোয়া সাথে থাকলে আমরা আবার ফিরে আসব,” জাভিয়ান খুব শান্ত গলায় সান্ত্বনা দিল।

কিন্তু এই বিদায়ের আয়োজনে সবচেয়ে বেশি মন খারাপ লুসিয়ার। সে ফারহানের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিল। এই ঘরটা, এই জানালা, যেখান থেকে সেই রাতে ফারহানের দেখা পেয়েছে—সবকিছু ছেড়ে যেতে তার একদম ইচ্ছে করছে না। এই ঘরে থাকলে সে ফারহানের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে। এখানে ফারহানের গায়ের ঘ্রান লেগে আছে।

লুসিয়া বিড়বিড় করে বলল, “ফারহানের ঘরে থাকতে কত ভালো লাগছিল! এখন চৌধুরী নিকেতনে গেলে ফারহানের সাথে আমার দেখা হবে কীভাবে? ও কি ওখানে আসবে?”

লুসিয়ার চোখে আবার জল চলে এল। সে বুঝতে পারছে জাভিয়ান একবার ও বাড়িতে গেলে সেখান থেকে তার বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সে বারবার ফারহানের নাম্বারে ডায়াল করতে চেয়েও নিজেকে সামলে নিল, যদি জাভিয়ান দেখে ফেলে।

জাভিয়ান ড্রয়িংরুমে এসে কড়া গলায় ডাক দিল, “লুসিয়া! রেডি হয়ে নে। গাড়ি চলে এসেছে।”

লুসিয়া একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ব্যাগটা তুলে নিল। ফারহানের বালিশটা সে শেষবারের মতো একবার ছুঁয়ে দেখল। তার মনে হলো সে তার হৃদয়ের একটা বড় অংশ এই ঘরেই ফেলে যাচ্ছে।

বাড়ির মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তান্বী তার বাবার হাতটা কিছুতেই ছাড়ছিল না। বাবা-মা দুজনেই তখন ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। জাভিয়ান তান্বীর কাঁধে হাত রাখল। “জিন্নীয়া, চলো। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

গাড়ি যখন স্টার্ট দিল, তান্বী জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখল তার মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। আর লুসিয়া দেখল সেই প্রাচীন বটগাছটা, যার নিচে সেই রাতে ফারহান তাকে গভীর চুম্বনে সিক্ত করেছিল। গাড়িটা চৌধুরী নিকেতনের দিকে চলতে শুরু করল, কিন্তু ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর সেই স্মৃতিগুলো যেন আঠার মতো তাদের পিছু লেগে রইল।
.
.

.গাড়ির পেছনের সিটে বসে লুসিয়ার অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। জাভিয়ানের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে সে দ্রুত ফোনে টাইপ করল— “ফারহান, আমরা চৌধুরী নিকেতনে চলে যাচ্ছি। ওখানের পরিবেশ কেমন আমি জানি না, কিন্তু তোমার এই ঘরটা আমি খুব মিস করব। সুযোগ পেলে দেখা কোরো।” মেসেজটা পাঠিয়ে সে বুক ঢিপঢিপ অবস্থায় ফোনের স্ক্রিন অফ করে দিল। তার কেবলই মনে হচ্ছে, চৌধুরী নিকেতনের সেই বিশাল দেয়াল পেরিয়ে সে কি আর ফারহানের দেখা পাবে?

এদিকে গাড়ির ভেতরে গুমোট ভাব কাটাতে জাভিয়ান মরিয়া হয়ে উঠেছে।তান্বীর ম্লান মুখটা তার সহ্য হচ্ছে না। সে তান্বীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু চাপ দিল। বিয়ের পর একবারই তান্বী সেই চৌধুরী নিকেতনে ছিলো। সেখানে জাভিয়ানের দাদি, সুফিয়া খান, তান্বীকে প্রথম দেখাতেই খুব পছন্দ করে ফেলেছিলেন। তান্বীর স্নিগ্ধ স্বভাব আর মায়াবী ব্যবহার বয়স্ক মানুষটার মন জয় করে নিয়েছিল।

জাভিয়ান নিচু গলায় তান্বীকে বলল, “তান্বী, মন খারাপ করো না। গ্ৰ্যান্ডমা কিন্তু কাল রাত থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। উনি আমাকে ফোন করে তিনবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যেন তোমার একদম মন খারাপ না থাকে।গ্ৰ্যান্ডমা এর কাছে গেলে তোমার এই মন খারাপ আর থাকবে না, দেখবে।”

তান্বী একটু ম্লান হাসল। চৌধুরী নিকেতনের সেই পুরনো আভিজাত্য আর সুফিয়া খানের অকৃত্রিম ভালোবাসা তার প্রথমদিনি প্রিয় ছিলো। তবুও নিজের মা-বাবাকে ছেড়ে যাওয়ার শূন্যতা তার চোখে ধরা পড়ছে।

জাভিয়ান আবার বলল, “জানো, গ্ৰ্যান্ডমা কাল বলছিলেন যে এবার তোমাকে তিনি তাদের পারিবারিক কোনো একটা গয়না দেবেন। তুমি যাওয়ার সময় ওটা গ্ৰ্যান্ডমার বড় আদরের স্মৃতি হয়ে থাকবে।”

গাড়িটা যখন চৌধুরী নিকেতনের সেই বিশাল ফটকের সামনে এসে থামল, লুসিয়া দেখল রাজকীয় সেই দালানটা। তার মনে কেবলই ফারহানের চিন্তা—এই দুর্ভেদ্য প্রাসাদে কি ফারহান আসতে পারবে? নাকি তাদের প্রেমের গল্পটা ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর মাঠেই দাফন হয়ে যাবে?
.
.
.
গাড়িটা যখন চৌধুরী নিকেতনের সেই বিশাল লোহার ফটক পেরিয়ে নুড়িপাথর বিছানো পথে ঢুকল, গাড়ির চাকার সেই চিরচেনা শব্দ শুনেই সুফিয়া খান বুঝে গেলেন—তাঁর প্রাণের দাদুভাই জাভিয়ান চলে এসেছে। সাদা সুতির শাড়ি পরা, বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়া সুফিয়া খান লাঠিতে ভর দিয়ে সদর দরজার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখেমুখে তখন আনন্দের ঝিলিক।

জাভিয়ান আর তান্বী গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গায়ে তাকে সালাম দিলেন। সুফিয়া খান জাভিয়ানের মাথায় হাত রেখে দোয়া করে তান্বীকে দুই হাতে আগলে নিলেন।

“এই তো আমার জাভি দাদুভাই আর নাতবউ চলে এসেছে! কতক্ষণ ধরে পথ চেয়ে বসে আছি জানিস?”

সুফিয়া খান তান্বীর চিবুক নেড়ে দিয়ে বললেন, “আমার নাতবউটা তো আরও সুন্দর হয়ে গেছে রে জাভি!”

ঠিক তখনই গাড়ির অন্য পাশ থেকে লুসিয়া নামল। তার পরনে একটা নিখুঁত ঢিলেঢালা কুর্তি, আর চোখে সানগ্লাস। তাকে দেখেই সুফিয়া খান একটু অবাক হয়ে চশমাটা ঠিক করে নিলেন।

“ওমা! এ কী! আমার বিদেশি মেমটাও দেখি এসেছে!” সুফিয়া খান বিস্ময় আর আনন্দ নিয়ে বলে উঠলেন।

লুসিয়া সানগ্লাসটা মাথার ওপর তুলে একটু আদুরে ভঙ্গিতে দাদির দিকে এগিয়ে এল। “উফ গ্র্যান্ডমা! এখনো আমাকে ওই নামে ডাকবে? কত বড় হয়ে গেছি দেখো!”

সুফিয়া খান লুসিয়াকে কাছে টেনে নিলেন, তবে তাঁর গলায় একরাশ পুরোনো স্মৃতি খেলা করে গেল। তিনি বললেন, “ডাকবো না তো কী? তুই তো সেই ছোটবেলা থেকেই এখানে আসতে চাইতিস না। মেক্সিকোর ওই জাঁকজমক ছেড়ে এই দেশের পরিবেশ, এই বাংলাদেশ তোর একদমই পছন্দ ছিল না। বড় হওয়ার পর তো এই প্রথম তুই তোর বাবার আদি বাড়ি এই চৌধুরী নিকেতনে পা রাখলি। তা হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন রে দিদু?”

দাদির এই সহজ প্রশ্নে লুসিয়া একটু থতমত খেয়ে গেল। সে তো জানে কেন সে আজ এখানে—ফারহানের টানে, ফারহানের সন্ধানে। সে আড়চোখে একবার জাভিয়ানের দিকে তাকাল, যে তখন তান্বীর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত।

লুসিয়া কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল, “গ্র্যান্ডমা, মানুষের পছন্দ তো বদলায়। এখন আমার এই দেশটা আর এই বাড়িটা বড্ড ভালো লাগছে।”

সুফিয়া খান হাসলেন। “ভালো, খুব ভালো। তা ভেতরে আয় সবাই। তান্বী ,তোর জন্য তোর প্রিয় সব খাবারের আয়োজন করেছি। আর জাভিয়ান, তোর দাদার সেই খোদাই করা ঘরটা তোর জন্যই সাজিয়ে রাখা হয়েছে।”
.
.
.

চৌধুরী নিকেতনের বিশাল সেগুন কাঠের ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় খাবারের আয়োজন। কাঁচি বিরিয়ানি, ঝাল রোস্ট আর দাদির হাতের বিশেষ চিংড়ি মালাইকারির সুগন্ধে পুরো ঘর ম ম করছে। সুফিয়া খান নিজে তদারকি করে সবাইকে বেড়ে দিচ্ছেন। তান্বী দাদির পাশে বসে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু দাদি তাকে জোর করে বসিয়ে দিয়েছেন।

সবাই যখন খাওয়া-দাওয়ায় মগ্ন,ঠিক তখনই সুফিয়া খান গ্লাসটা নামিয়ে রেখে হঠাৎ জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসলেন। তারপর বেশ গম্ভীর গলায় বলে বসলেন—”সব তো হলো দাদু ভাই, কিন্তু একটা কথা তো কেউ ভাবছিস না। তোদের বিয়ের তো বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল, তা এখনো কেন বাবা হচ্ছিস না? আমার তো সময় ঘনিয়ে এলো, যাওয়ার আগে একটা পুতুল দেখে যাই। নাতীর ঘরে একটা পুতিন দেখে যেতে পারব না?”

দাদির এই সোজাসাপ্টা আর রসিক প্রশ্নে খাবারের টেবিলে মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এল। তান্বীর গলায় বিরিয়ানির গ্রাস আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে লজ্জায় আর অস্বস্তিতে একদম লাল হয়ে মাথা নিচু করে নিল। তার মনে হচ্ছিল যদি ডাইনিং টেবিলের নিচ দিয়ে অদৃশ্য হওয়ার কোনো পথ থাকত!

জাভিয়ান অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে খুব শান্তভাবে পানির গ্লাসটা হাতে নিল, তারপর ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা স্টাইলের হাসিটা ফুটিয়ে দাদির দিকে তাকিয়ে বলল— “প্রসেসিং চলছে গ্র্যান্ডমা, কেবল তো শুরু করেছি। একটু সময় তো দিতে হবে, তাই না? তাড়াহুড়ো করলে কি আর সেরা জিনিস পাওয়া যায়?”

জাভিয়ানের এই অকপট আর রসালো উত্তর শুনে তান্বী এবার লজ্জায় শেষ! সে টেবিলের নিচে জাভিয়ানের পায়ে আলতো করে একটা লাথি মারল যাতে সে চুপ করে। কিন্তু জাভিয়ান ভ্রু নাচিয়ে তান্বীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপল, যা তান্বীর গালকে আরও টকটকে লাল করে দিল।

সুফিয়া খান জাভিয়ানের কথায় হা হা করে হেসে উঠলেন। “তোর মুখের ওপর কথা বলার সাধ্য কারোর নেই রে জাভি! তবে মনে রাখিস, আমার কিন্তু তর সইছে না। নাতবউ তো দেখি লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতেই পারছে না।”

লুসিয়া একপাশে বসে জাভিয়ানের এই রসিকতা উপভোগ করলেও তার মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। সে আড়চোখে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে—ফারহান কি কোনো মেসেজ দিল? দাদির এই পারিবারিক গল্পের ভিড়ে সে নিজেকে একটু বিচ্ছিন্ন বোধ করছে। তার কেবলই মনে হচ্ছে, এই আভিজাত্য আর হাসিখুশি পরিবেশের আড়ালে ফারহান কি আজ রাতে কোনোভাবে তার সাথে যোগাযোগ করবে?

তান্বী তখনো মাথা নিচু করে প্লেটের ভাত নাড়াচাড়া করছে। জাভিয়ান ঝুঁকে পড়ে তান্বীর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—”এত লজ্জা পেলে হবে জিন্নীয়া? গ্ৰ্যান্ডমা তো ঠিকই বলেছেন, প্রসেসিংয়ে আমাদের আরেকটু গতি বাড়াতে হবে, কী বলো?”

তান্বী এবার রাগী চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল, কিন্তু সেই রাগের পেছনেও একরাশ ভালোবাসা আর লাজুকতা লুকিয়ে ছিল।
.
.
.
বিকেলের মিঠে রোদ চৌধুরী নিকেতনের বিশাল বারান্দা পেরিয়ে জাভিয়ানের ঘরে এসে পড়েছে। পুরো বাড়ি তখন দুপুরের খাওয়ার পর কিছুটা ঝিমিয়ে আছে। জাভিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের পুরোনো আমগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তান্বী মাত্র ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল ঠিক করছিল, তখনই জাভিয়ান নিঃশব্দে পেছন থেকে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।

জাভিয়ানের শক্ত হাতের বাঁধনে তান্বী একটু শিউরে উঠল। জাভিয়ান ওর কাঁধে চিবুক রেখে খুব নিচু আর গভীর স্বরে বলল, “জিন্নীয়া, গ্র্যান্ডমা কিন্তু একদম ঠিক কথা বলেছে। ওনার বয়স হয়েছে, ওনার আবদারটা কি খুব একটা অযৌক্তিক?”

তান্বী আয়নায় জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিল। লজ্জায় ওর কান লাল হয়ে উঠেছে। ও ফিসফিস করে বলল, “আপনার কি লজ্জা বলতে একদমই কিছু নেই? সবার সামনে খাবারের টেবিলে আপনি কী সব বলছিলেন! আমার তো মনে হচ্ছিল ওখানেই মাটির নিচে ঢুকে যাই।”

জাভিয়ান একটু হাসল, সেই হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব। সে তান্বীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর চোখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। “আই অ্যাম স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, জিন্নীয়া। লজ্জা কেন পাব? যা সত্য, যা স্বাভাবিক আর বাস্তবিক, সেটা নিয়ে লুকোছাপার তো কিছু নেই। আর তাছাড়া গ্র্যান্ডমাকে তো একটা জবাব দিতেই হতো।”

তান্বী জাভিয়ানের বুকের বোতাম নিয়ে আনমনে খেলতে খেলতে বলল, “তাই বলে এভাবে বলতে হয়?”

জাভিয়ান এবার তান্বীর কোমরে হাত রেখে ওকে আরও কাছে টেনে নিল। ওর চোখের দৃষ্টি এখন অনেক বেশি গাঢ়। “চলো, গ্ৰ্যান্ডমা তো যখন বলেই দিয়েছেন, তাহলে দেরি করে লাভ কী? চলো আজ থেকেই প্রসেসিং শুরু করি।”

তান্বী ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। “কিসের প্রসেসিং?”

জাভিয়ান তান্বীর কপালে একটা আলতো চুমু দিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে বলল—”ডিএনএ ট্রান্সফারের। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর রক্ত আর তান্বী রেহমানের মায়ার মিশেলে একটা নতুন জীবন তৈরির প্রসেসিং।”

তান্বী এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল জাভিয়ানের এমন বৈজ্ঞানিক অথচ রোমান্টিক টার্ম শুনে। ও কিছু বলতে যাওয়ার আগেই জাভিয়ান ওকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। তান্বী ভয়ে আর লজ্জায় জাভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল।

“জাভিয়ান! ছাড়ুন! কেউ দেখে ফেলবে!” তান্বী আতঙ্কে বলে উঠল।

“চৌধুরী নিকেতনে জাভিয়ানের ঘরে অনুমতি ছাড়া ঢোকার সাহস কারো নেই, জিন্নীয়া। এখন শুধু আমি আর তুমি,” জাভিয়ান ওকে নিয়ে বিছানার দিকে পা বাড়াল।

বিকেলের সোনা রোদ জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে তান্বীর মুখে পড়ছে। জাভিয়ান তাকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে তার দুপাশে হাত রেখে ঝুঁকে এল। তান্বীর বুকের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জাভিয়ান তার তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর গালে ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জিন্নীয়া, তুমি কি জানো তুমি যখন লজ্জা পাও তখন তোমাকে কতটা অসহ্য রকমের সুন্দর লাগে? আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোমাকে কোনো একটা কাঁচের জারে বন্দি করে রাখি, যাতে কেউ তোমার এই রূপ দেখতে না পায়।”

তান্বী কাঁপাকাঁপা হাতে জাভিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। “আপনি বড্ড বেশি পাগল জাভিয়ান…”

“হ্যাঁ, জানি তো।” জাভিয়ান আলতো করে তান্বীর কপালে, তারপর দুই চোখে চুমু দিল। তার ঠোঁট যখন তান্বীর ঠোঁটের খুব কাছে পৌঁছাল, ঠিক সেই মুহূর্তে জাভিয়ানের প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনটা সজোরে কেঁপে উঠল।

একবার, দুবার, তিনবার। জাভিয়ান বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। সে কলটা ইগনোর করতে চাইল, কিন্তু ফোনের রিংটোনটা ছিল একটা বিশেষ টোনের—যা কেবল মেক্সিকোর অত্যন্ত জরুরি কন্ট্যাক্টগুলোর জন্য সেট করা।

তান্বী নিচু স্বরে বলল, “জাভিয়ান, ফোনটা ধরুন। হয়তো খুব জরুরি কিছু।”

জাভিয়ান অনিচ্ছা সত্ত্বেও সোজা হয়ে বসল এবং ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে একটা কোডেড নাম্বার ভেসে উঠছে। জাভিয়ানের চেহারার সেই রোমান্টিক ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক কঠোর কাঠিন্য ফিরে এল। সে তান্বীর দিকে একবার তাকিয়ে বারান্দায় গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল।

ওপাশ থেকে অত্যন্ত দ্রুতলয়ে স্প্যানিশ ভাষায় কেউ কিছু বলছিল। জাভিয়ান কোনো কথা বলছিল না, শুধু তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল আর হাতের মুঠো শক্ত হচ্ছিল। প্রায় দুই মিনিট শোনার পর সে শুধু একটা বাক্য বলল, “আই উইল বি দেয়ার।”

ফোনটা কেটে জাভিয়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে ঘরে ফিরে এল। তান্বী তখন বিছানায় উঠে বসেছে, তার চোখেমুখে উদ্বেগ। সে জাভিয়ানের মুখ দেখেই বুঝেছে কিছু একটা ওলটপালট হয়ে গেছে।

“কী হয়েছে জাভিয়ান? সব ঠিক আছে তো?” তান্বী ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

জাভিয়ান তান্বীর সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ভয়ংকর ছায়া। সে তান্বীর দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল—”জিন্নীয়া, আমাদের হাতে আর সময় নেই। দাদির সাথে কাটানোর সেই দুদিন হয়তো আর পাওয়া হবে না। এখনই সব গোছগাছ শুরু করো। কাল সকালেই আমাদের মেক্সিকো ফিরতে হবে।”

তান্বী চমকে উঠল। “কালকেই? কিন্তু ফ্লাইটের তো এখনো তিন দিন বাকি ছিল!”

“পরিস্থিতি বদলে গেছে জিন্নীয়া। এমন কিছু ঘটেছে যা সামাল দিতে আমার সেখানে থাকাটা এখনই অনিবার্য। আমাদের হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আছে।”

জাভিয়ান দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগুলো লুসিয়াকে খবরটা দেওয়ার জন্য।ওদিকে পাশের ঘরে লুসিয়া ফারহানের মেসেজের অপেক্ষায় ফোন হাতে বসে ছিল। জাভিয়ানের ‘কালকেই ফেরা’র খবরটা শুনলে তার পায়ের তলার মাটি কীভাবে সরবে, তা সে কল্পনাও করতে পারছে না।
.
.
.
চৌধুরী নিকেতনের বিশাল প্রাসাদে তখন নিঝুম অন্ধকার। মেক্সিকো থেকে আসা সেই রহস্যময় ফোনের পর জাভিয়ান নিজের ঘরে ল্যাপটপ আর ফাইল নিয়ে ব্যস্ত, তান্বী প্যাকিং করছে বিষণ্ণ মনে। বাড়ির পরিচারক আর দাদি সুফিয়া খান অনেক আগেই ঘুমে আচ্ছন্ন।

লুসিয়া বিছানায় ছটফট করছিল। ঠিক তখনই তার ফোনটা জ্বলে উঠল। ফারহানের কল! লুসিয়া দ্রুত ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে ফারহানের ফিসফিসানি শোনা গেল—”লুসিয়া, আমি চৌধুরী নিকেতনের মেইন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। একবার বারান্দায় আসবে? তোমাকে শেষবারের মতো একটু দেখতে চাই।”

লুসিয়া আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে কেবল বারান্দায় গিয়ে ক্ষান্ত হতে পারল না। পায়ের স্যান্ডেলটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। গার্ডরা পেছনের দিকে তদারকিতে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগে লুসিয়া মেইন গেটের পকেট গেট দিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়।

চাঁদের আবছা আলোয় ফারহানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লুসিয়া দৌড়ে গিয়ে তার হাতটা শক্ত করে ধরল। ফারহান কিছু বলার আগেই লুসিয়া ফিসফিস করে বলল, “ভেতরে চলো ফারহান। আমার রুমে যাবে।”

ফারহান আঁতকে উঠল। সে লুসিয়ার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল, “পাগল হয়েছ লুসিয়া? তুমি কি বলছো এসব? এটা চৌধুরী নিকেতন। কেউ দেখে ফেললে আজই আমাদের শেষ দিন হবে!”

লুসিয়া ফারহানের কোনো কথাই কানে তুলল না। তার চোখে তখন এক জেদ আর হারানোর ভয়। সে বলল, “আরে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি নিজে চেক করেছি। জাভিয়ান ভাইয়া তার ঘরে কাজে ডুবে আছে, আর বাড়ির সব লাইট অফ। চলো আমার সাথে চুপচাপ, কোনো কথা বলবে না।”

লুসিয়া একপ্রকার জোর করেই ফারহানের হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে চলল। ফারহান দ্বিধা আর ভয়ের দোলাচলে পড়েও লুসিয়ার হাতের টানে অবশ হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি লুসিয়া এত বড় ঝুঁকি নেবে।
লুসিয়া ফারহানকে নিয়ে সাবধানে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। অন্ধকার ড্রয়িংরুমের ভেতর দিয়ে তারা যেন দুটো ছায়ার মতো ভেসে চলল। ফারহানের প্রতিটি পদক্ষেপে তার মনে হচ্ছে কেউ বুঝি এখনই টর্চের আলো ফেলবে তাদের মুখে।

ড্রয়িংরুমের সেই ভারী সোফা আর পুরোনো সব পোর্ট্রেটের পাশ দিয়ে যখন তারা এগোচ্ছে, হঠাৎ ওপর তলার সিঁড়িতে একটা খসখস শব্দ হলো। ফারহান থমকে দাঁড়াল, লুসিয়াও স্থির হয়ে গেল।

ড্রয়িংরুমের বিশাল ঝাড়বাতিটা হুট করে জ্বলে উঠতেই লুসিয়া আর ফারহান পাথরের মতো জমে গেল। তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে আসতেই সামনে দেখা গেল সুফিয়া খানকে। তিনি হাতে একটা ছোট টর্চ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন।

লুসিয়া বিদ্যুতবেগে ফারহানের হাত ছেড়ে দিয়ে কয়েক পা দূরে সরে দাঁড়াল। ফারহান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সে বুঝতে পারছে আজ রক্ষা নেই।

সুফিয়া খান গম্ভীর গলায় বললেন, “বিদেশি মেম! এত রাতে তুমি এখানে কী করছ? আর অন্ধকার দিয়ে কাকে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছ? এই ছেলেটা কে?”

লুসিয়া আমতা আমতা করে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আরে গ্র্যান্ডমা! তুমি এখনো জেগে? ও… ও হচ্ছে ফারহান। তান্বীর ভাই। আসার সময় তান্বীর সাথে ওর দেখা হয়নি তো, তাই আমাকে বলেছিল একবার দেখা করতে আসবে। গেট খোলা ছিল না তাই আমিই বাইরে গিয়ে ওকে নিয়ে আসলাম।”

সুফিয়া খান চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে ফারহানের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকালেন। “দেখা করবে তো এত রাতে কেন? আর তাছাড়া চোরের মতো লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছ কেন? আচ্ছা দাঁড়াও, আমি নাতবউকে ডেকে দিচ্ছি। তার ভাই এসেছে শুনলে তো সে এখনই ছুটে আসবে।”

দাদি যেই না সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে চাইলেন, লুসিয়া হার্টফেল করার মতো অবস্থায় পড়ল। জাভিয়ান যদি জানতে পারে ফারহান এই বাড়ির ভেতরে, তবে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। লুসিয়া দ্রুত দৌড়ে গিয়ে দাদির হাত চেপে ধরল।

লুসিয়া দাদিকে ফারহানের থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে মিনতিভরা গলায় ফিসফিস করে বলল— “গ্র্যান্ডমা, শোনো না! প্লিজ কাউকে ডেকো না। সত্যি কথা বলি… আমি ফারহানকে ভালোবাসি, আর ও-ও আমাকে ভালোবাসে। জাভি ব্রো একটা কারণে ওর ওপর অনেক রেগে আছে, তাই ও দিনের বেলা আসার সাহস পায়নি। আমরা কাল সকালেই মেক্সিকো চলে যাচ্ছি, তাই শেষবারের মতো ও আমাকে দেখতে এসেছে। আমাদের আর দেখা হবে কি না তাও জানি না।”

লুসিয়ার চোখে তখন জল টলমল করছে। সে দাদির হাতটা ধরে ডুকরে উঠল, “প্লিজ গ্র্যান্ডমা, আমাকে একটু সাহায্য করো। আমাদের জাস্ট একটু কথা বলতে দাও। ওকে আমার রুমে যেতে দাও প্লিজ… আমি প্রমিস করছি কেউ টের পাবে না।”

সুফিয়া খান স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর নাতনির চোখে এমন আকুতি তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি একবার ফারহানের দিকে তাকালেন, যার শান্ত আর বিমর্ষ মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে সত্যিই খুব বিপদে আছে। চৌধুরী বাড়ির আভিজাত্য আর নিয়মের বাইরে গিয়ে সুফিয়া খানের ভেতরের দাদি মনটা গলে গেল।
তিনি নিচু গলায় বললেন, “তোর ভাই জানলে কিন্তু অনর্থ হবে লুসিয়া। এই ছেলেটা কি সত্যিই তোকে ভালোবাসে?”

“প্রাণের চেয়েও বেশি গ্র্যান্ডমা!” লুসিয়া প্রায় শ্বাসরুদ্ধকর কণ্ঠে বলল।

লুসিয়ার আকুতি শুনে সুফিয়া খানের মনটা একটু নরম হলেও, তিনি চৌধুরী বাড়ির কর্ত্রী। মেক্সিকোর কালচার আর এই বাংলার মাটির সংস্কৃতির তফাতটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। তিনি লুসিয়ার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন—”থাম দিদু!আবেগ দিয়ে সবকিছু হয় না। এটা বাংলাদেশ, এখানের কালচার আলাদা। এটা তোর মেক্সিকো নয় যে যখন যাকে খুশি নিজের ঘরে নিয়ে যাবে। বিয়ের আগে তুই একটা পর পুরুষকে এভাবে মাঝরাতে রুমে নিয়ে যেতে পারিস না। এই খবর যদি জানাজানি হয়, তবে আমাদের ‘চৌধুরী নিকেতন’-এর মান-সম্মান বলে আর কিচ্ছু থাকবে না।”

লুসিয়া এবার দাদির একদম কাছে সরে এল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত নেশা আর দৃঢ়তা। সে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল—”ও পর পুরুষ নয় গ্র্যান্ডমা, ও আমার একান্ত পুরুষ! ওকে যেতে দাও আমার সাথে প্লিজ। আমরা শুধু কথা বলবো, আমাদের হাতে আর সময় নেই। কালই আমাকে জাভি ব্রো নিয়ে যাবে, হয়তো আর কোনোদিন ওর সাথে দেখা হবে না। তুমি কি চাও তোমার নাতনিটা সারাজীবন এই কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকুক?”

সুফিয়া খান লুসিয়ার চোখের সেই পাগল করা জেদ আর ভালোবাসা দেখে ভেতরে ভেতরে কিছুটা কেঁপেই উঠলেন। তিনি জানতেন, এই বিদেশি মেমকে আটকানো সহজ নয়।এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদি দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত এখন একটা। তিনি কড়া গলায় বললেন—”ঠিক আছে, যা! তবে শুধুমাত্র এক ঘণ্টা। এর বেশি এক মিনিটও নয়। আমি নিচেই জেগে বসে আছি। ঠিক এক ঘণ্টা পর আমি নিজে তোর রুমে যাব ওকে বের করে দিতে। আর মনে রাখিস লুসিয়া, শুধুমাত্র কথা বলা! অন্য কোনো কিছু যেন না হয়, আমি বলে দিলাম।”

লুসিয়া খুশিতে দাদিকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু খেল। “থ্যাঙ্ক ইউ গ্র্যান্ডমা! তুমি বেস্ট! আমি প্রমিস করছি তুমি যেমনটা চাচ্ছ তেমনই হবে।”

লুসিয়া আর দেরি করল না। সে ফারহানের হাত ধরে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। ফারহান তখনো ঘোরের মধ্যে আছে। সে ভাবতেই পারেনি দাদি শেষ পর্যন্ত রাজি হবেন।

লুসিয়ার রুমে ঢুকে সে দরজাটা খুব সাবধানে ভেতর থেকে আটকে দিল। লুসিয়ার রুমে ঢুকেই ফারহান যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। সে ঘরের চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “লুসিয়া, তোমার দাদি নিচতলায় অমন করে কী বলছিলেন?”

লুসিয়া একটা বাঁকা হাসি দিয়ে ফারহানের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে বলল, “দাদি বলছিল এটা বাংলাদেশ, এখানকার কালচার আলাদা। এটা মেক্সিকো নয় যে আমি একটা ‘পর পুরুষ’কে মাঝরাতে এভাবে রুমে নিয়ে আসব। বিষয়টা নাকি অনেক খারাপ দেখায়, চৌধুরী নিকেতনের সম্মান নাকি ধুলোয় মিশে যাবে।”

ফারহান এবার সত্যিই অস্থির হয়ে পড়ল। সে দরজার দিকে এক পা বাড়িয়ে বলল, “লুসিয়া, উনি তো একদম ঠিক কথাই বলেছেন। এভাবে আমাদের ওনার সামনে দিয়ে রুমে আসা উচিত হয়নি। সত্যিই বিষয়টাও খুব খারাপ দেখায়। আমি বরং চলে যাই, কাল সকালে এমনিতেও তোমরা চলে যাবে—”

ফারহান বের হতে যাওয়ার আগেই লুসিয়া ওর হাতটা হ্যাঁচকা টানে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এল। ওর চোখে তখন একরাশ দুষ্টুমি। সে ঠোঁট উল্টে বলল, “তুমি এমন আনরোমান্টিক কীভাবে হতে পারো ফারহান? এই সিচুয়েশনে ছেলেরা কত কী করে, আর তুমি পালানোর পথ খুঁজছো?”

ফারহান একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। “কেন? তুমি কি আমাকে ইমরান হাশমি ভেবেছিলে যে ঢুকেই রোমান্স শুরু করে দেব?”

লুসিয়া এবার ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে হুট করেই বলে ফেলল, “না, আমি তো তোমাকে জনি সিন্স ভেবেছিলাম!”

ফারহান একদম আকাশ থেকে পড়ল। সে ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লুসিয়ার দিকে। “জনি সিন্স? এই লোকটা আবার কে? মেক্সিকান কোনো ডন নাকি?”

লুসিয়া এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সে হাসতে হাসতে ফারহানের বুকের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

ফারহান বিড়বিড় করে বলল, “হাসছ কেন? নামটা তো আগে শুনিনি।”

লুসিয়া হাসি থামিয়ে ফারহানের গালে একটা চিমটি কেটে বলল, “এই লিজেন্ডকে তুমি চেনো না? ও মাই গড! ফারহান, তুমি সত্যিই বড্ড ইনোসেন্ট! পৃথিবীতে জনি সিন্সকে চেনে না এমন ছেলে বোধহয় তুমি একাই আছ।”

ফারহান আরও বিভ্রান্ত হয়ে গেল। “লিজেন্ড মানে? বড় কোনো বিজ্ঞানী নাকি ডাক্তার?”

লুসিয়া তখন দুষ্টুমিতে ভরা চোখে তাকিয়ে বলল, “ডাক্তারও হয়, ইঞ্জিনিয়ারও হয়, আবার মাঝেমধ্যে মহাকাশেও যায়। মাল্টি-ট্যালেন্টেড পারসন! থাক, তোমার জেনে কাজ নেই। ইনোসেন্ট আছ, ইনোসেন্টই থাকো। তবে আমার এই ইনোসেন্ট লিজেন্ডকে এখন সারারাত আমি আমার কাছে আটকে রাখব।”

লুসিয়ার গলার স্বরে তখন এক অদ্ভুত বিষাদ আর নেশার মিশ্রণ। সে ফারহানের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, ফারহানের বুকের ওপর নিজের হাত দুটো রেখে ডাগর চোখে তার দিকে তাকাল। ল্যাম্পশেডের নীলচে আলোয় লুসিয়ার মুখটা মায়াবী অথচ বিধ্বংসী লাগছে।

“কাল চলে যাচ্ছি ফারহান। আবার কবে তোমাকে পাব, কবে তোমার এই ঘ্রাণ নিতে পারব—আমি কিচ্ছু জানি না। তুমি তো পলায়নবিদ্যায় ওস্তাদ! আবার কখন আমার কাছ থেকে লুকিয়ে পালিয়ে যাও, তারও তো ঠিক নেই। তাই আমি চাই আজকের এই রাতটা, এই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বেশি রোমান্টিক সময় হয়ে থাকে।”

ফারহান একটু অস্বস্তিতে পড়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। সে লুসিয়ার হাত দুটো সরিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, “লুসিয়া, তোমার দাদি কী বলে দিয়েছেন মনে নেই? মাত্র এক ঘণ্টা সময়! উনি কিন্তু নিচতলায় জেগে বসে আছেন। এই অবস্থায় রোমান্স করার সাহস আমি অন্তত পাচ্ছি না।”

লুসিয়া এবার একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। সে ফারহানের ঠোঁটের ওপর নিজের আঙুল চেপে ধরল। “আরে দূর! ওনার কথা বাদ দাও তো। উনি সেকেলে মানুষ, আধুনিক যুগের ভালোবাসা উনি কী বুঝবেন? ওসব শাসনের কথা বললেই হলো। দেখবে উনি এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তুমি ওসব বাদ দিয়ে শুধু আমার দিকে ফোকাস দাও ফারহান। আজকে শুধু আমি আর তুমি।”

ফারহান এবার একটা লম্বা শ্বাস নিল। সে লুসিয়ার চোখের সেই গভীর আর অবাধ্য চাহনি দেখে নিজেকে কিছুটা স্থির করার চেষ্টা করল। সে খুব নিচু স্বরে প্রশ্ন করল—”আসলে তুমি কী চাইছো লুসিয়া? তোমার মনে ঠিক কী চলছে?”

লুসিয়া এবার ফারহানের কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস ফারহানের রক্তে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। সে খুব ধীরলয়ে, স্পষ্ট গলায় বলল—”আমি তোমার ভার্জিনিটি চাইছি ফারহান।”

কথাটা শোনার সাথে সাথে ফারহান হতভম্ব হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে ভাবতেই পারেনি এই শান্ত আর গম্ভীর চৌধুরী নিকেতনে বসে লুসিয়া তাকে এমন একটা সরাসরি প্রস্তাব দেবে। ফারহান বড় বড় চোখ করে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর হুট করেই সশব্দে হেসে ফেলল।

“হাসছ কেন ফারহান? আমি কিন্তু সিরিয়াস!” লুসিয়া একটু ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলল।

ফারহান হাসি থামিয়ে লুসিয়ার দুই গাল আলতো করে টিপে দিল। “তুমি সত্যিই পাগল লুসিয়া! একদিকে তোমার ভাই জাভিয়ান আর মেইলস্ট্রোম বন্দুক নিয়ে ঘুরছে, নিচে তোমার দাদি লাঠি হাতে পাহারা দিচ্ছে—আর তুমি এই মৃত্যুপুরীর মাঝে বসে আমার ভার্জিনিটি নিয়ে পরিকল্পনা করছো?”

ফারহানের হাসি দেখে লুসিয়ার জেদ আরও বেড়ে গেল। সে ফারহানের শার্টের একটা বোতাম খুলতে খুলতে বলল, “তুমি হেসো না ফারহান। এই রাতটা আমি অমর করে রাখতে চাই। তুমি কি সত্যিই আমাকে এই শেষ চাওয়াতা থেকে বঞ্চিত করবে?”

ফারহানের হাসিটা এবার একটু মিলিয়ে গেল। সে লুসিয়ার চোখের সেই আকুতি আর গভীর ভালোবাসাটা অনুভব করতে পারল।

লুসিয়া আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে ফারহানকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল আর নিজেই তার কোলে চড়ে বসল। ফারহানের গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে তার নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে আদুরে গলায় বলল—”তুমি এমন বোরিং পার্সন কেন ফারহান, বলতো? একটু তো অ্যাডভেঞ্চারাস হতে পারো! জানো, জাভি ব্রো কী করেছে? সে তো রোমান্সের জন্য আলাদা একটা ‘ফ্যান্টাসি রুম’ তৈরি করেছে। ভাবো একবার, কতটা রোমান্টিক সে! সেখানে আবার ওয়াটার ম্যাট্রেস আছে, আরও কত রকমের টয়েস আছে…”

লুসিয়ার মুখ থেকে এসব কথা বের হতে না হতেই ফারহান শিউরে উঠল। সে দ্রুত লুসিয়ার মুখটা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরল। ফারহানের চোখ দুটো তখন কপালে উঠে গেছে।

“স্টপ! জাস্ট স্টপ লুসিয়া! ছি ছি, জাভিয়ান তোমার ভাই হয়। নিজের ভাইকে নিয়ে এসব কী বলছ তুমি? লজ্জা করছে না তোমার?” ফারহান যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।

লুসিয়া ফারহানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, “আরে কী হয়েছে? এটা তেমন কী? জাভি ব্রো তো তান্বীর সাথেই এসব করে। ওটা ওদের পার্সোনাল ব্যাপার।”

“অনেক কিছু হয়েছে লুসিয়া!” ফারহান এবার বেশ কড়া গলায় বলল। “এখানে আমার বোন তান্বী জড়িয়ে আছে। এসব কথা শুনতে আমার কেমন লাগছে তুমি বুঝতে পারছো? তুমি যা বলছো এটা কোনো স্বাভাবিক ফ্যান্টাসি হতে পারে না, এটা পুরোপুরি বিকৃত ফ্যান্টাসি!”

লুসিয়া এবার ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিল। সে তার আঙুল দিয়ে ফারহানের ঠোঁট স্পর্শ করে বলল, “আরে এটা বিকৃত কিছু না ফারহান। জাভি ব্রো আসলে ‘বিডিএসএম’ (BDSM)-এ আসক্ত, তাই সে নিজেকে ওভাবেই আনন্দ দেয়। এটা খুব আনকমন যদিও।”

ফারহান এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করল। সে যেন বড় কোনো ধাক্কা খেয়েছে। সে বিড়বিড় করে বলল, “বিডিএসএম! বুঝতে পেরেছি। তুমিও বোধহয় এসবে আসক্ত হওয়ার পথেই আছো। একই রক্ত তো শরীরে বইছে!”

লুসিয়া এবার ফারহানের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখে তখন এক পৃথিবী মায়া। সে
ফারহানের খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“আরে না ফারহান! আমি ওইসব ডমিনেশন বা টয়েস-এ আসক্ত নই। আমার রক্ত হয়তো জাভি ব্রোর মতো তপ্ত, কিন্তু আমার নেশাটা আলাদা। আমি শুধু তোমাতে আসক্ত ফারহান। তোমার এই ইনোসেন্স, তোমার এই শাসন আর তোমার এই ভালোবাসা—এটাই আমার একমাত্র বিডিএসএম।”

লুসিয়া আর কথা না বাড়িয়ে ফারহানের গলার খাঁজে মুখ লুকাল। ফারহান স্থির হয়ে বসে রইল। সে বুঝতে পারছে লুসিয়া তাকে নিয়ে এক গভীর সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই।

ফারহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে চলেছে। সে লুসিয়াকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বেশ কড়া গলায় বলল—”অনেক হয়েছে লুসিয়া! এবার আমায় যেতে হবে। এক ঘণ্টা প্রায় শেষ হতে চলল। দাদি উপরে আসার আগেই আমার এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। আর দেরি করো না, প্লিজ।”

ফারহান বিছানা থেকে উঠতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ধাতব শব্দ হল!ফারহান তার ডান হাতে একটা টান অনুভব করল। সে অবাক হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার কবজিতে একটা চকচকে স্টিলের হ্যান্ডকাফ লাগানো, যার অন্য প্রান্তটা বেডের শক্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে আটকানো! ফারহান আকাশ থেকে পড়ল। সে হতভম্ব হয়ে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—”লুসিয়া! এটা কী? এটা কখনো করলে তুমি? আমি তো টেরই পেলাম না!”

লুসিয়া তখন পা ঝুলিয়ে বসে এক রহস্যময় হাসি হাসছে। সে তার হাতের ছোট্ট চাবিটা ফারহানের চোখের সামনে দুলিয়ে বলল—”আরে বাবা, কথা বলতে বলতেই লাগিয়ে দিয়েছি। তুমি তো আমার কথায় এতোই মগ্ন ছিলে যে টেরই পাওনি কখন আমি তোমাকে বন্দি করে ফেলেছি। এবার পারলে যাও দেখি ফারহান রেহেমান!”

ফারহান এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। সে হ্যান্ডকাফটা ধরে টানাটানি করতে করতে বলল, “লুসিয়া, কী বাচ্চামি করছো এসব? তোমার দাদি যে কোনো মুহূর্তে ঘরে চলে আসবে। উনি যদি আমাকে এই অবস্থায় দেখে, তবে কী হবে ভেবে দেখেছো? প্লিজ চাবিটা দাও!”

লুসিয়া নির্বিকার। সে ফারহানের খুব কাছে গিয়ে তার কপালে একটা হালকা টোকা দিয়ে বলল—
“দাদি আসলে আসুক। আমি বলে দেব তুমি আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাচ্ছিলে তাই তোমাকে বেঁধে রেখেছি। আপাতত এভাবেই বসে থাকো। জানো ফারহান, আজকে যদি আমি আগে থেকে জানতাম যে তুমি আসবে, তবে আমি একটা শাড়ি পরে থাকতাম। তাহলে আর তুমি ওইভাবে আমাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্যও যেতে পারতে না। তবে তুমি যেন না যাও, আমি সেই ব্যবস্থাই করছি। এখন শুধু বসে থাকো, আমি একটু নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছি।”
.
.
.
ফারহান যখন হ্যান্ডকাফ খোলার জন্য লুসিয়াকে মিনতি করছিল, লুসিয়া তখন সেদিকে পাত্তাই দিল না। সে ফারহানের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে আলমারি থেকে একটা কাপড় বের করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ফারহান বিছানায় বন্দি হয়ে বসে ঘামছে আর ভাবছে, দাদি যদি এখনই ঢুকে পড়ে তবে কী হবে!

মিনিট দশেক পর ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। ফারহান দরজার দিকে তাকাতেই তার চোখের পলক যেন স্থির হয়ে গেল। লুসিয়া গোসল সেরে বেরিয়ে এসেছে। তার লম্বা চুলগুলো ভেজা, যা থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে। গায়ের চামড়া আধা ভেজা হয়ে আছে, আর তার পরনে একটা পিচ রঙের নাইট ড্রেস। ড্রেসটা একদমই পাতলা, যার চিকন সুতোর মতো ফিতা কাঁধের ওপর দিয়ে গেছে আর ঝুলটা হাঁটুর বেশ ওপরে—ফ্রক স্টাইল।

ফারহান এক সেকেন্ড তাকিয়েই বিদ্যুতবেগে নিজের চোখ সরিয়ে নিল। তার বুকের ধুকপুকানি তখন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “লুসিয়া! ছি ছি! তুমি… তুমি এসব কী পরেছ? যাও, এখনই চেঞ্জ করো এটা!”

লুসিয়া কোনো কথা না বলে ড্রেসিং টেবিলের টুলের ওপর বসল। সে ফারহানের শৃঙ্খলিত হাতটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর হেয়ার ড্রায়ারটা চালু করে খুব আয়েশ করে ভেজা চুল শুকাতে লাগল। ড্রায়ারের বাতাসে তার শরীরের সেই ভেজা গন্ধ ফারহানের নাকে এসে বিঁধছে।

লুসিয়া আয়নায় ফারহানের মুখটা দেখছিল। ফারহান শক্ত হয়ে বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন তাকালেই কোনো পাপ হয়ে যাবে। লুসিয়া ড্রায়ার বন্ধ করে খুব ধীর স্বরে বলল, “কেন ফারহান? তাকাতে ভয় লাগছে? আমি তো বলেছি, আজকে রাতে আমি তোমাকে পালানোর কোনো সুযোগ দেব না।”

ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “লুসিয়া, প্লিজ! দাদি যেকোনো সময় ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন। তার ওপর তোমার এই পোশাক! তুমি কি আমাকে আজই মেরেই ফেলবে? চেঞ্জ করো এটা, বলছি!”

লুসিয়া এবার টুল থেকে উঠে ধীরে ধীরে ফারহানের দিকে এগিয়ে এল।সে ফারহানের খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে বসল। ফারহান এখনো মুখ ফিরিয়ে আছে।

লুসিয়া ফারহানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমার গ্ৰ্যান্ডমা আমাকে এই ড্রেসে দেখলে ভাববেন আমি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু উনি যদি তোমাকে এই হ্যান্ডকাফ লাগানো অবস্থায় দেখে, তবে কী হবে ভেবেছ? সো… চুপচাপ আমাকে দেখ ফারহান। এই রূপটা শুধু তোমার জন্য।”

ফারহান চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে বুঝতে পারছে লুসিয়া আজ কোনোভাবেই তাকে ছেড়ে দেবে না।

ফারহান পাথরের মতো শক্ত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। তার সারা শরীর দিয়ে এক বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সে জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতি দেখেছে। অন্ধকার জগতে তার অবাধ যাতায়াত। ঠান্ডা মাথায় কাউকে খু/ন করা কিংবা কয়েক কোটি টাকার ড্রাগস চালান পার করে দেওয়া তার কাছে বাঁ হাতের কাজ। সেসব পরিস্থিতিতে সে সবসময় শান্ত, অবিচল। কিন্তু আজ, লুসিয়ার এই অতি সাধারণ অথচ তীব্র বোল্ড রূপের সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের সব বীরত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

লুসিয়া যখন দেখল ফারহান কিছুতেই তার দিকে তাকাচ্ছে না,লুসিয়া নিজের নরম হাত দিয়ে ফারহানের চিবুক ধরে সজোরে তার দিকে মুখটা ঘুরিয়ে দিল।
ফারহান বাধ্য হয়ে চোখ মেলল। সামনেই লুসিয়া—আধা ভেজা শরীর, চিকন ফিতার সেই নাইট ড্রেস আর চোখের পাতায় লেগে থাকা জলের কণা। ফারহানের গলার কাছটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। তার ভেতরে এমন এক অনুভূতির জন্ম নিল যা তার কাছে একদমই অপরিচিত, একদমই নতুন। এই ফিলিংসটাকে সমাজ যা-ই বলুক, ফারহান বুঝতে পারছে সে এই মুহূর্তে পুরোপুরি ‘হর্নি’ হয়ে পড়েছে। নিজের ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

ফারহান তোতলানো গলায় বলল, “লুসিয়া… প্লিজ… আমাকে যেতে দাও। আমি… আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না।”

লুসিয়া ফারহানের চোখের সেই অস্থিরতা আর কামনা দেখতে পাচ্ছিল। সে আরও একটু ঝুঁকে ফারহানের একদম ঠোঁটের কাছে নিজের মুখ নিয়ে এল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ফারহানের ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে ফিসফিস করে বলল—”কেন সামলাতে হবে ফারহান? আজ তো কোনো বাধা নেই। শুধু আমি আর তুমি।”

ফারহান চোখ বুজে ফেলল। তার হৃদপিণ্ড তখন পাঁজরের হার ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে কোনোমতে বলল, “তুমি জানো না তুমি কী করছ লুসিয়া। এই অনুভূতিটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। আমি হয়তো কোনো ভুল করে ফেলব।”

লুসিয়া ফারহানের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল, “ভুল করো ফারহান। আমি চাই তুমি আজ ভুল করো। কাল তো আমি থাকব না। এই স্মৃতিটুকুই আমাকে ওদেশে বাঁচিয়ে রাখবে।”

চলবে…..

(আগেরবার চৌধুরী নিকেতনের কাহিনী যা লিখেছিলাম ভুলে গিয়েছি জাভিয়ান তান্বীর বিয়ের পরেরদিন কি কি লিখেছিলাম তাই কোথাও ভুল থাকলে ধরিয়ে দিবেন।আর প্রতিদিন পর্ব দিচ্ছি আপনাদের কথা ভেবে তবে আপনারা রেসপন্স কমিয়ে দিয়েছেন ২ হাজার রিয়েক্ট হলেই পরের পর্ব দিবো)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply