ডিজায়ার_আনলিশড
✍️সাবিলা সাবি
পর্ব-৩৫ (প্রথমাংশ)
.
.
অফিসের সেই সুসজ্জিত কনফারেন্স রুমের এসির হিমশীতল হাওয়াও জাভিয়ানের ভেতরে জ্বলতে থাকা আগুনকে শান্ত করতে পারছিল না। রেস্টরুমের আয়নায় নিজের ঘর্মাক্ত প্রতিচ্ছবি আর ফোনের স্ক্রিনে তান্বীর আধো ঘুমন্ত মুখ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে জাভিয়ানের ভেতরের অস্থিরতা প্রশমিত হওয়ার বদলে আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে পুনরায় মিটিং রুমে ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু ডিল কিংবা ক্লায়েন্টদের গম্ভীর আলোচনা—সবই তার কাছে আজ অর্থহীন মনে হচ্ছিল।
বিশাল ওক কাঠের টেবিলের ওপাশে বসে থাকা মেক্সিকান ক্লায়েন্ট যখন প্রজেক্টের ফিন্যান্সিয়াল গ্রাফ বুঝিয়ে বলছিল, জাভিয়ানের কানে তখন বারবার বাজছিল সেই রেকর্ডেড অডিও; তান্বীর সেই অবাধ্য আর সুখের আবেশের কণ্ঠস্বর। তার চোখের সামনে ফাইলের অক্ষরের বদলে ভেসে উঠছিল তান্বীর সেই বিপর্যস্ত রূপ। সে এক হাতে কলমটা সজোরে চেপে ধরল, ওর চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে উঁচিয়ে উঠল।
বিলাসবহুল এই কর্পোরেট জগতটা হুট করেই ওর কাছে খুব সংকীর্ণ আর দমবন্ধ লাগতে শুরু করল। জাভিয়ান আর এক সেকেন্ডও সেখানে বসে থাকতে পারল না। সে হুট করে নিজের লেদার চেয়ারটা পেছনের দিকে ঠেলে সশব্দে উঠে দাঁড়াল। পুরো রুমে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল, ক্লায়েন্টরা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালে জাভিয়ান কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না।
করিডোরে আসতেই রায়হান ফাইল হাতে প্রায় দৌড়ে এগিয়ে এল, “স্যার, আর ইউ ওকে? ক্লায়েন্টরা একটু কনফিউজড, ডিলটা অলমোস্ট ডান…”
জাভিয়ান ওর দিকে এমন এক বিধ্বংসী চাহনি দিল যে রায়হান মাঝপথেই থমকে গেল। জাভিয়ান খুব নিচু কিন্তু কমান্ডিং ভয়েসে বলল, “মিটিং ক্যানসেল করো রায়হান। হ্যান্ডেল দ্য রেস্ট ইওরসেলফ। আই হ্যাভ সামথিং মাচ মোর ইমপর্ট্যান্ট টু ডু। আই অ্যাম লিভিং নাউ!”
করিডোর পেরিয়ে নিজের নতুন কেনা ব্ল্যাক ল্যাম্বরগিনিতে উঠে বসতেই ইঞ্জিনের গর্জন যেন জাভিয়ানের ভেতরের বন্যতার সাথে পাল্লা দিল। মেক্সিকো সিটির ট্রাফিক উপেক্ষা করে সে এক কালো ঝড়ের মতো গাড়ি ছোটাতে শুরু করল। তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে তখন কেবল তান্বীর সেই শাড়ির এলোমেলো ভাঁজ আর চোখের সামান্যতম জল খেলা করছে। ভিলা এস্পেরেন্জার প্রধান ফটকে গাড়িটি যখন বিকট শব্দে ব্রেক কষল, গার্ডরাও তটস্থ হয়ে পড়ল।
জাভিয়ান গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে তার ছিল এক মদমত্ত রাজকীয় সিংহের দম্ভ আর শিকার ধরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
বেডরুমের দরজার সামনে এসে সে কোনো সৌজন্যের ধার ধারল না; এক প্রচণ্ড আঘাতেই সে কবাট খুলে ফেলল। ঘরের ভেতর বিকেলের আলো তখন ম্লান হয়ে আসছে। দরজার শব্দে তান্বী আঁতকে উঠে দাঁড়াল। জাভিয়ান কোনো কথা না বলেই দীর্ঘ কদমে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় তান্বীর অতি নিকটে পৌঁছে গেলএবং তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
তান্বী কিছু বলার আগেই জাভিয়ান করিডোর পেরিয়ে তাকে নিয়ে সেই গোপন ‘ফ্যান্টাসি রুম’-এর ভেতর ঢুকে দরজা লক করে দিল। সেই লালচে আলো আর ওয়াটার ম্যাট্রেসের দুলুনি তান্বীর মনে এক অজানিত শিহরণ জাগিয়ে তুলল।
জাভিয়ান তাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলল না, বরং খুব সন্তর্পণে তাকে ওয়াটার ম্যাট্রেসের ওপর শুইয়ে দিল। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর।
জাভিয়ান তার শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে বলল, “ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া জিন্নীয়া… তুমি জানো না তোমার ওই ঘুমন্ত ভয়েস আমাকে কতটা পাগল করে দিয়েছে। অফিসে বসে আমি শুধু ভাবছিলাম কখন তোমাকে নিজের হাতের কাছে পাব।”
জাভিয়ান কোনো কৃত্রিমতার তোয়াক্কা না করে সরাসরি তান্বীর ওপর নিজের সর্বগ্রাসী অধিকার বিস্তার করল। ওয়াটার ম্যাট্রেসের ভেতরের জলরাশি তখন জাভিয়ানের উন্মাদনার সাথে পাল্লা দিয়ে এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের মতো দুলতে শুরু করেছে। জাভিয়ানের প্রতিটি পেষণে তান্বীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ নতুন করে জেগে উঠছিল। জাভিয়ান আজ কোনো যান্ত্রিক নিয়ম মানল না; সে তার সর্বশক্তি দিয়ে তান্বীকে বিদ্ধ করতে লাগল। প্রতিটি তীব্র আঘাতের সাথে সে তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলছিল, “বলো… তুমি আমার! ইউ আর মাইন, জিন্নীয়া!”
তান্বী যন্ত্রণায় আর এক অনির্বচনীয় সুখের আবেশে জাভিয়ানকে জাপটে ধরল। এক সময় জাভিয়ান তার সমস্ত উত্তেজনা আর অস্থিরতাকে এক তীব্র গর্জনে তান্বীর গভীরে বিলীন করে দিল।
ঘরজুড়ে তখন কেবল ভারী নিশ্বাসের শব্দ। জাভিয়ান নিথর হয়ে তান্বীর বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ওর ঘাম আর তান্বীর চোখের জল মিলেমিশে এক পরম তৃপ্তির আবহ তৈরি করল। কিছুক্ষণ পর জাভিয়ান মাথা তুলে তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল পরম মমতায় চুমু একে দিলো।
জাভিয়ান বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে তার কোটের পকেট থেকে একটি ঝকঝকে পাসপোর্ট বের করল। সে তান্বীর একদম কাছে এসে বসল এবং অত্যন্ত ধীরলয়ে পাসপোর্টটি তান্বীর বুকের ওপর রাখল। পাসপোর্টের ভেতর থেকে স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে বাংলাদেশের সেই কাঙ্ক্ষিত ভিসা।
জাভিয়ান তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশালু গলায় ফিসফিস করে বলল—”দিস ইজ ইওর ভিসা, জিন্নীয়া। ডে আফটার টুমরো আমরা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। তৈরি থেকো আর আমরা যেখানেই যাইনা কেনো ট্রাস্ট মি, তোমার এই জাভিয়ান থেকে কোনো এসকেপ নেই।”
জাভিয়ানের কণ্ঠের সেই অধিকারবোধ তান্বীর কানে পৌঁছালেও, তার সমস্ত শরীর তখন এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে পাসপোর্টটি তুলে নিল। পাসপোর্টের পাতায় সাঁটানো সেই লাল-সবুজ ভিসার সিলের ওপর আঙুল বুলাতেই তান্বীর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল।
আজ কত কত দিন পর! কত মাস, সে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছে। বিদেশের এই মায়াবী কিন্তু নিঠুর খাঁচায় বন্দি থাকতে থাকতে সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল তার শিকড়ের কথা। ভিসার ওপর হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার হাস্যোজ্জ্বল মুখ আর মায়ের হাতের সেই চেনা গন্ধ। সে আজ ফিরছে! নিজের দেশে, নিজের মা-বাবার কোলে।
আবেগে আপ্লুত তান্বী এতটাই বিমোহিত হয়ে পড়ল যে, সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে পাসপোর্টটি নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। জাভিয়ান পাশ থেকে তান্বীর এই কান্না দেখছিল। তার ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
জাভিয়ান তান্বীর অশ্রুসিক্ত গালটি আলতো করে মুছে দিয়ে বলল, “কান্নাকাটি বন্ধ করো জিন্নীয়া। ফাইনালি তুমি যাচ্ছো তোমার বাবা মায়ের কাছে।”
তান্বী কোনো উত্তর দিল না, শুধু অশ্রুভরা চোখে ভিসার দিকে তাকিয়ে রইল। ধোঁয়াটে চোখের দৃষ্টিতে লাল-সবুজের সেই সিলটা আবছা হয়ে আসছে। জাভিয়ানের দেওয়া এই ‘উপহার’ তার কাছে যতটা আনন্দের, তার চেয়েও অনেক বেশি বিষাদময়।
পাসপোর্টের পাতায় নিজের আঙুল বোলাতে বোলাতে তান্বীর বুকটা এক অসহ্য হাহাকারে ফেটে যেতে চাইল। সে ফিরছে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজের জন্মভূমিতে ফিরছে ঠিকই—কিন্তু কার কাছে? তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তার বড়বোন এলিনার মুখটা। সেই নিষ্পাপ হাসি, সেই খুনসুটি—যা চিরতরে হারিয়ে গেছে। সে মা-বাবার কাছে ফিরবে, তাদের চোখের জল মুছিয়ে দেবে, কিন্তু এলিনাকে তো আর কোনোদিন দেখতে পারবে না। সেই শূন্যতা কি কোনোদিন পূর্ণ হবে?
আর তার ভাই? যে ভাইটি থাকার কথা ছিল তার সবচেয়ে বড় ঢাল, সে তো থেকেও নেই। তার সেই সাজানো বাগানটা আজ কেমন তছনছ হয়ে গেছে। যে বাড়িতে এক সময় হাসির রোল উঠত, সেখানে আজ এলিনার নিথর নীরবতা আর তার ভাইয়ের অস্তিত্বহীনতা এক হাড়হিম করা অন্ধকার তৈরি করে রেখেছে।
জাভিয়ান তান্বীর এই নীরবতাকে হয়তো আনন্দ বলে ভুল করছিল, কিন্তু তান্বী তখন নিজের ভেতর এক প্রলয়ঙ্কারী যন্ত্রণার সাথে যুদ্ধ করছিল। সে জানে, বাংলাদেশে পা রাখার পর তাকে নিজের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া পরিবারের সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হবে।
তান্বী পাসপোর্টটা জাপটে ধরে বালিশে মুখ গুজল। তার চাপা কান্নায় ঘরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। সে মনে মনে শুধু তার বোন এলিনার নামটা জপতে লাগল। আজ যদি এলিনা থাকত, তবে হয়তো এই ফেরাটা পূর্ণতা পেত।
.
.
রাতের ডিনার টেবিল। ভিলা এস্পেরেন্জার বিশাল ডাইনিং হলে ঝাড়বাতির আলোয় এক থমথমে আভিজাত্য বিরাজ করছে। টেবিলের একদিকে বসে আছেন জাভিয়ানের বাবা সায়েম চৌধুরী, পাশে মা কার্গো চৌধুরী। অপর প্রান্তে চাচা সাইফ চৌধুরী এবং তার ছেলে মার্কো। লুসিয়া আর তান্বীও সেখানে উপস্থিত, তবে তান্বীর দৃষ্টি আজ মাটির দিকে নিবদ্ধ জাভিয়ানের বিকেলের সেই উন্মাদনার রেশ ওর শরীর থেকে এখনো মুছে যায়নি।
জাভিয়ান খুব আয়েশ করে ম্যাঙ্গো জুসে চুমুক দিয়ে সবার দিকে একবার দৃষ্টি বোলাল। তারপর খুব শান্ত গলায় ঘোষণা করল, “পরশু সকালে আমি আর তান্বী বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছি। এভরিথিং ইজ রেডি।”
পুরো টেবিলে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। সায়েম চৌধুরী তার হাতের কাঁটাচামচটা প্লেটে রেখে চশমার ওপর দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। তার চোখে বিস্ময় আর কিছুটা সন্দেহের আভাস।
“পরশু মানে? তুমি কি রসিকতা করছো জাভি?” সায়েম চৌধুরী গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন। “এই তো সেদিন তুমি মেক্সিকোতে একটা পারফিউম কোম্পানি শুরু করলে এতো বেশি টাকাও ইনকাম করছ ফেলোনি, অথচ দুই দিনের মাথায় তুমি ভিসা আর পাসপোর্টের সব ফর্মালিটিজ শেষ করে ফেললে? হাউ ইজ দ্যাট পসিবল? আমি বছরের পর বছর ধরে এত বড় বিজনেস টাইকুন হয়েও যেটা করতে কয়েক সপ্তাহ সময় নিতাম, তুমি সেটা ৪৮ ঘণ্টায় করে ফেললে!”
বাবার কথায় চাচা সাইফ আর মার্কোও জাভিয়ানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। সবাই যেন জাভিয়ানের উত্তরের অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে বসে আছে।
জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরস্থিরভাবে গ্লাসের বাকি জুসটুকু শেষ করল, তারপর টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে একটা ক্রুর হাসি দিল। সে সরাসরি তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল “তাহলে বুঝুন মিস্টার চৌধুরী… আপনার ছেলে হয়েও এই সব ব্যাপারে আমি আপনারও বাপ। পলিটিক্স আর পাওয়ার প্লে-তে চৌধুরী সাম্রাজ্যের পুরনো নিয়মগুলো এখন অকেজো হয়ে গেছে। আমি যেটা চাই, সেটা মুহূর্তের মধ্যে ছিনিয়ে নিতে জানি। সেটা পাসপোর্ট হোক, কিংবা কোনো মানুষের জীবন।”
জাভিয়ানের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ উত্তরে সায়েম চৌধুরীর মুখটা অপমানে আর রাগে কালো হয়ে গেল। পুরো ডাইনিং হলের পরিবেশ মুহূর্তেই বরফ শীতল হয়ে এল। জাভিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আর তান্বীর দিকে তাকিয়ে আদেশসূচক স্বরে বলল, “কাম অন তান্বী, আমাদের প্যাকিং শেষ করতে হবে।”
তান্বী ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ান এখন কেবল একজন ব্যবসায়ী নয়, সে এক ভয়ংকর ক্ষমতাবান সত্তা যার নাগাল পাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
.
.
.
ডিনার শেষে লুসিয়া যখন নিজের ঘরে ফিরে এল, তার ভেতরটা এক অস্থির বিষাদে ছটফট করছিল। গত কয়েকদিন তার ওপর দিয়ে এক কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। মার্তার বাসায় গিয়ে সে কতটা অঝোরে কেঁদেছে, তা কেবল মার্তাই জানে। ফারহানকে সে কোথাও পাচ্ছে না—না ফোনে, না কোনো মেসেজে। ফারহান যেন রাতারাতি বাতাসের সাথে মিশে গেছে।
কিন্তু লুসিয়াতো জানে ফারহান কোথায়। ফারহান এখন বাংলাদেশে, তার নিজের বাড়িতে। তান্বীর ভাই হওয়ার সুবাদে ফারহানকে এখন পাওয়াটা অনেক সহজ। আর এটাই লুসিয়ার জন্য শেষ সুযোগ। জাভিয়ান আর তান্বী যদি পরশু বাংলাদেশ চলে যায়, তবে মেক্সিকোর এই বিশাল ভিলা তার কাছে এক জীবন্ত কবর হয়ে দাঁড়াবে।
লুসিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের জল মুছল। তার মনে মনে একটাই জেদ কাজ করছিল—যেভাবেই হোক, জাভিয়ানকে রাজি করাতে হবে যাতে সেও ওদের সাথে যেতে পারে। আর একবার যদি সে তান্বীর বাড়িতে পৌঁছাতে পারে, তবে ফারহানার কাছে সে জানতে চাইবে আসল ঘটনা। ফারহানের প্রতি তার এই তীব্র টান এখন আর কেবল ভালোবাসা নয়, এক ধরণের অবসেসনে পরিণত হয়েছে।
লুসিয়া ভাবল, “জাভি ব্রো আর তান্বী এখন মেক্সিকো ছাড়ছে। আমি যদি ওদের বুঝিয়ে তান্বীর মেন্টাল সাপোর্টের দোহাই দিয়ে ওদের সাথে যেতে পারি, তবেই ফারহানের দেখা পাওয়া সম্ভব। ফারহানকে পাওয়ার জন্য আমাকে তান্বীর বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছাতেই হবে।”
সে দ্রুত নিজের ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। জাভিয়ানের মেজাজ সে চেনে; সরাসরি বললে হয়তো সে মানবে না। তাই তান্বীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার এক চতুর পরিকল্পনা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। বাংলাদেশে যাওয়ার এই যাত্রায় লুসিয়া কেবল একজন সফরসঙ্গী নয়, বরং নিজের হারানো প্রেমকে খুঁজে পাওয়ার এক মরিয়া অভিযাত্রী হতে চাইছে।
.
.
সকাল হতেই ভিলা এস্পেরেন্জার করিডোরে এক চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। লুসিয়া সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। তার চোখের নিচে কালচে ছায়া, কিন্তু সেই ক্লান্তিতেও এক ধরণের মরিয়া জেদ চকচক করছে। সে জানে, জাভিয়ান একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব, তবে জাভিয়ানের একমাত্র দুর্বলতা এখন তান্বী।
লুসিয়া সরাসরি জাভিয়ানের স্টাডি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে জাভিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল— “কাম ইন!”
ভেতরে ঢুকতেই দেখল জাভিয়ান জানলার ধারে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে তার চোখেমুখে এক ধরণের প্রশান্তি—যা কাল রাতের সেই উম্মত্ত মিলনের পর আসা স্বাভাবিক। লুসিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, “জাভি ব্রো, আই নিড টু টক টু ইউ।”
জাভিয়ান না ফিরেই নিচু গলায় বলল, “আমি জানি তুই কী বলবি লুসিয়া। তুই বাংলাদেশে যেতে চাস, তাই তো?”
লুসিয়া চমকে গেল। জাভিয়ানের কাছ থেকে কোনো কিছু গোপন করা সত্যিই দায়। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে জাভিয়ানের কাছে এগিয়ে গেল। “ব্রো, তান্বী এই মুহূর্তে মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিধ্বস্ত। সে তার বোনকে হারিয়েছে, তার পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে গিয়ে যখন সে ওই ফাঁকা বাড়িতে ঢুকবে, ও একা হ্যান্ডেল করতে পারবে না। শি নিডস এ ফ্রেন্ড, শি নিডস মি। প্লিজ ব্রো, আমাকে সাথে নাও।”
জাভিয়ান এবার ধীরে ধীরে লুসিয়ার দিকে ঘুরল। তার ধারালো দৃষ্টি লুসিয়ার চোখের গভীরে যেন ফারহানের নামটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে জাভিয়ান এক বাঁকা হাসি দিল। “তান্বীর মেন্টাল সাপোর্ট, নাকি ওই ফারহানের সান্নিধ্য—তোর আসল উদ্দেশ্য কী লুসিয়া?” জাভিয়ানের এই সরাসরি প্রশ্নে লুসিয়ার হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল। সে তো ভেবেছিল ফারহান পার তার কথা কেউ জানে না। সে তো খুব গোপনে ফারহানের সাথে দেখা করতো , তাহলে জাভিয়ান কি তবে প্রতিটা মুহূর্তে ওর ওপর নজর রাখছিল?
লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি… তুমি ফারহানের কথা কীভাবে জানলে? তুমি কি আমার ওপর স্পাই (Spy) লাগিয়েছিলে?”
জাভিয়ান কফির কাপটা সজোরে টেবিলের ওপর রাখল। তার চোখে এক বিদ্রুপের হাসি। “ভিলা এস্পেরেন্জায় আমি না চাইলেও দেয়াল কথা বলে লুসিয়া। তুই একটা মরীচিকার পেছনে ছুটছিস। যে ছেলে তোর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তার জন্য এত পাগলামি করার মানে হয় না। জাস্ট মুভ অন (Move on)!”
লুসিয়া এবার যেন এক অদৃশ্য অপমানে জ্বলে উঠল। সে এক পা এগিয়ে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জের সুরে বলল, “মুভ অন? বলাটা খুব সহজ তাই না জাভি ব্রো? আচ্ছা, তুমি পারবে? যদি কখনো তান্বী তোমাকে কোনো কিছু না বলে হুট করে ছেড়ে চলে যায়, তুমি পারবে ওর পেছনে না ছুটে থাকতে? পারবে ওকে ভুলে মুভ অন করতে?”
লুসিয়ার এই সরাসরি প্রশ্নে জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল, চোখের মণি দুটো যেন মুহূর্তেই জমাট বরফ হয়ে গেল। সে খুব নিচু আর ভারী গলায় বলল—”ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটা ছেলে যদি আমার মতো উম্মাদ হয়, তবে সেই ভালোবাসা কখনো হারায় না। আমি জিন্নীয়াকে পৃথিবী খুঁড়ে হলেও বের করে আনব। কিন্তু একটা মেয়ে… তুই ফারহানকে তোর প্রতি পাগল করতে পারিসনি লুসিয়া। আর যে পাগল নয়, তাকে ধরে রাখা যায় না। সো, স্টপ দিস ড্রামা!”
জাভিয়ানের এই রুক্ষ কথাগুলো তীরের মতো লুসিয়ার বুকে বিঁধল। তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কিছুদিন আগে মেইলস্ট্রোমও ঠিক এই একই কথা বলেছিল তাকে। আজ জাভিয়ানও তাকে সেই একই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
লুসিয়া এবার তার সবটুকু অভিমান বিসর্জন দিয়ে মিনতি করল, “ব্রো, আমি জানি আমি ওকে পাগল করতে পারিনি, কিন্তু আমি একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই। প্লিজ, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো।”
জাভিয়ান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে তার রিস্টওয়াচটা দেখল। “এত শর্ট নোটিশে তুই ভিসা কীভাবে পাবি? পরশু ভোরে আমাদের ফ্লাইট।”
লুসিয়া এবার জাভিয়ানের হাতটা চেপে ধরল। তার গলায় এক অদ্ভুত ভরসা, “আমি জানি তুমি পারবে ব্রো। চৌধুরী সাম্রাজ্যের রাজপুত্রের কাছে দুই দিনে ভিসা ম্যানেজ করা কোনো ব্যাপারই না। তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বলো।”
জাভিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে লুসিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। বোনের চোখের সেই অবাধ্য আকুতি হয়তো তার পাথুরে হৃদয়ে কোথাও একটু দোলা দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা তুলে নিল “ফাইন। আমি দেখছি কী করা যায়। কিন্তু মনে রাখিস লুসিয়া, বাংলাদেশে পা রাখার পর তুই যদি নিজের লিমিট ক্রস করিস, তবে তার ফল খুব ভয়াবহ হবে।”
লুসিয়া মনে মনে এক পৈশাচিক আনন্দ পেল। জাভিয়ান রাজি হওয়া মানেই তার বাংলাদেশের রাস্তা পরিষ্কার। সে মনে মনে হাসল—ফারহানকে সে পাগল করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু ফারহানের দেশেই এখন সে হানা দিতে যাচ্ছে।
.
.
.
দুদিন পরের সকালেই ভিলা এস্পেরেন্জার করিডোরে এক চাপা উত্তেজনার আমেজ। জাভিয়ানের ক্ষমতার দাপট এমনই যে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লুসিয়ার পাসপোর্ট হাতে এসে পৌঁছেছে—যেখানে বাংলাদেশের সিলটা এখনো যেন টাটকা কালির ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।
জাভিয়ান তার ব্যক্তিগত জেটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। রায়হান আর অন্যান্য গার্ডরা ব্যস্ত মালামাল আর সিকিউরিটি চেক নিয়ে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝে তান্বী যেন এক জীবন্ত পুতুল। জাভিয়ান তাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না।
মেক্সিকোর ব্যক্তিগত রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশাল প্রাইভেট জেট। ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। জাভিয়ান তার পরনে ডার্ক নেভি ব্লু স্যুট, চোখে সানগ্লাস আর হাতের সেই ঘড়ির সাথে ডায়মন্ডের ব্রেসলেটা চিকচিক করতে লাগলো সে একদম রাজকীয় ভঙ্গিতে বিমানে উঠতে শুরু করল। তার এক হাত তান্বীর কোমরে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেন সে কোনো অমূল্য সম্পদ আগলে রাখছে।
পেছনে লুসিয়া আসছে, তার চোখে এক রহস্যময় জয়ী ভাব। জাভিয়ান সিটে বসেই লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল—”তোর পাসপোর্ট আর ভিসা রেডি লুসিয়া। কিন্তু মনে রাখিস, বাংলাদেশ মেক্সিকো নয়।
.
.
লুসিয়া ম্লান হাসল।সে মনে মনে এক অদ্ভুত শান্তি পেল—অবশেষে সে ফারহানের দেশে যাচ্ছে।
বিমানটি যখন রানওয়ে ধরে টেক-অফ করার জন্য গতি বাড়াল, তখন তান্বীর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। জানলার কাঁচের ওপাশে মেক্সিকোর মাটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। সে অনুভব করল জাভিয়ানের হাতটা ওর হাত শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে।
জাভিয়ান তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—”একটু পরেই আমরা মেঘের ওপরে থাকব জিন্নীয়া। আর কয়েক ঘণ্টা পর তুমি তোমার সেই চেনা মাটিতে পা রাখবে।”
তান্বী চোখ বন্ধ করে নিজের পাসপোর্টটা বুকের কাছে শক্ত করে ধরল। সে মনে মনে শুধু এলিনার কথা আর তার অসহায় মা-বাবার কথা ভাবছিল। এই দীর্ঘ বিমান যাত্রা তার জীবনের এক অধ্যায়ের সূচনা।
এদিকে লুসিয়া চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে লাগল—বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে যখন সে নামবে, ফারহান হয়তো জানবেও না। সে সরাসরি ফারহানের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। এতদিন যে যন্ত্রণা সে মেক্সিকোতে একা একা সয়েছে, ফারহানকে দেখা মাত্রই সে সব ভুলে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে। ফারহান হয়তো বাধা দেবে, হয়তো রাগ করবে, কিন্তু লুসিয়া এবার তাকে কোনোমতেই ছেড়ে দেবে না। সে মনে মনে হাসল, “ফারহান, আমি আসছি। এবার কোনো দূরত্ব আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
এদিকে কেবিনের ভেতর জাভিয়ান তান্বীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সে দেখল তান্বী জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে, ওর চোখে তখনো জলকণা চিকচিক করছে।
জাভিয়ান ধীরগতীতে ওর ঘাড়ের কাছে নিজের মুখ নিয়ে এল। জাভিয়ান খুব নিচু আর ভরাট গলায় বলল, “ইউ নো জিন্নীয়া, আমি চাইলেই তোমাকে সারাজীবন এই মেক্সিকোতে বন্দি করে রাখতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, তোমার ওই ভেজা চোখগুলো আমাকে শান্তি দেবে না। আই ওয়ান্ট ইউ টু বি হ্যাপি, বাট অনলি উইথ মি।”
জাভিয়ান তান্বীর চিবুকটা আলতো করে ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিল। ওর আঙুলের স্পর্শে আজ কোনো রুক্ষতা নেই, বরং আছে এক গভীর মায়া। সে তান্বীর কপালে একটি দীর্ঘ চুমু দিলো।
বিমানটি যখন আকাশের বুকে মেঘের আস্তরনে চলতে লাগলো, তখন তিনজনের মনে তিন ধরণের অনুভূতি। জাভিয়ান তার আধিপত্য নিয়ে নিশ্চিন্ত, তান্বী তার মা-বাবার কাছে ফেরার ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন, আর লুসিয়া ফারহানকে এক পলক দেখার নেশায় উম্মাদ।
চলবে……..
(আজকের পর্বটা একটু ছোট হয়ে গেছে। রাত ১টায় লেখা শুরু করছিলাম। পরের অংশ বড় করে দিবো তবে আপনাদের রেসপন্স কমে গেছে এমন হলে আর গল্প দেয়ার ইচ্ছা নাই যদিও। ৩ হাজার+ রিয়েক্ট থেকে ১.৫ এ চলে এসেছে অনেক রিয়েক্ট থেকে হুট করে রিয়েক্ট কমলে আর লেখার আগ্রহ থাকেনা পরের পর্ব তাড়াতাড়ি পেতে হলে ২ হাজার রিয়েক্ট কমপ্লিট করবেন।নাহলে এটা আর বোধহয় লেখা হবেনা)
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২০
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৮