Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৪


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব: ৩৪
.
.

মেক্সিকোর আকাশে আজ রোদের তেজ নেই, কেমন একটা ঘোলাটে ভাব রয়েছে। ভালোবাসা দিবসের এই দুপুরে মেক্সিকো সিটির ‘পুয়েন্তে দে ওজুয়েলা’ ব্রিজের ওপর একাকী দাঁড়িয়ে আছে লুসিয়া। ব্রিজের রেলিংয়ের ওপাশে শান্ত নদীটা বয়ে যাচ্ছে নিজের মতোই, যার শব্দ এখন ওর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর আওয়াজ বলে মনে হচ্ছে।

লুসিয়া আজ খুব জেদ করে একটা লাল-সাদা শাড়ি পরেছে। ফারহান সবসময় বলে শাড়িতে মেয়েদের অদ্ভুত সুন্দর লাগে। সেই শাড়ি সামলাতে গিয়ে লুসিয়ার এখন নাভিশ্বাস উঠছে।

মেক্সিকান মেয়ে হিসেবে শাড়ির এই প্যাঁচ আর কুঁচির সাথে ওর বিন্দুমাত্র পরিচয় নেই। বারবার আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে পড়ছে, কুঁচিগুলো পায়ের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। তবুও লুসিয়া আজ হার মানতে নারাজ। এই পোশাকটা ওর কাছে এখন আর কেবল কাপড় নয়, ফারহানের একটা স্মৃতির টুকরো।

ব্রিজের ওপর রাখা ওর গাড়িটা ফুলের পাপড়িতে ঢাকা। একপাশে বড় করে লেখা— “আই লাভ ইউ ফারহান”। লুসিয়া ভেবেছিল ফারহান বাংলাদেশে যাওয়ার পর হয়তো ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাই যোগাযোগ করতে পারছে না। কিন্তু আজ ভ্যালেন্টাইন ডে! আজ কি একটা বারও ওর কথা মনে পড়বে না?

লুসিয়া বারবার ফোনটা চেক করছে। হোয়াটসঅ্যাপে ফারহানের চ্যাট বক্সে মেসেজগুলো এখনো সেই ‘সিঙ্গেল টিক’ হয়েই পড়ে আছে। না আছে কোনো রিপ্লাই, না কোনো কল। ফারহান যাওয়ার পর থেকে যেন মাটির নিচে ঢুকে গেছে। লুসিয়ার কাছে ওর বাংলাদেশের নম্বরটাও নেই। এক অজানা আশঙ্কায় ওর বুকের ভেতরটা বারবার মোচড় দিয়ে উঠছে।

ব্রিজের রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে ধপ করে বসে পড়ল লুসিয়া। বাতাসের ঝাপটায় ওর চুলগুলো অবাধ্য হয়ে চোখের ওপর এসে পড়ছে। ও মনে মনে ভেবেছিল আজ ভিডিও কলে ফারহানকে ওর এই সাজটা দেখাবে। হাসি মুখে বলবে, “দেখো ফারহান, তোমার প্রিয় শাড়ি পরে আমি বসে আছি, তোমার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছি, তোমার পছন্দ হয়েছে?” কিন্তু ওপারের নিস্তব্ধতা ওর সব কল্পনাকে চুরমার করে দিচ্ছে।

লুসিয়ার দুচোখের কোনে জল জমতে শুরু কররো।বারবার নাক টানতে টানতে সে মনে মনে বলল— “ফারহান, তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেলে? নাকি নিজের দেশে ফিরে এই মেক্সিকান মেয়েটার কথা মনে রাখার কোনো প্রয়োজনই বোধ করলে না?”

নদীর জল বয়ে যাচ্ছে তার আপন খেয়ালে,আর ব্রিজের ওপর এক পরিত্যক্ত প্রেমিকা তার না ফেরা মানুষের জন্য এক অর্থহীন সাজ নিয়ে বসে রইল।
.
.
.
পুয়েন্তে দে ওজুয়েলা ব্রিজের ওপর সময় যেন স্থবির হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও ফারহানের ফোনটা একবারও বাজল না। ভ্যালেন্টাইন ডের এই দিনটা লুসিয়ার কাছে এখন কোনো উৎসব নয়, বরং এক বিষাক্ত একাকীত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।শরীরের ক্লান্তি আর মনের ওপর চেপে বসা অবসাদ ওকে ভেঙে দিচ্ছে। ব্রিজের কনকনে হাওয়া পাতলা শাড়ি ভেদ করে শরীরে বিঁধছে ঠিকই, কিন্তু ফারহানের এই হাড়কাঁপানো নীরবতা ওর ভেতরটা আরও বেশি দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে।

লুসিয়া ক্লান্ত শরীরে গাড়ির বনেটের ওপর গা এলিয়ে দিল। মাথার ওপরে সাদা মেঘের মিলনমেলা, অথচ ওর সমস্ত ভাবনা জুড়ে কেবল ফারহান। কেন এই লোকটা ওর গোছানো জীবনে এসে সবকিছু এমন তছনছ করে দিল?

স্মৃতিগুলো হাতড়াতে হাতড়াতে লুসিয়া থমকে দাঁড়াল সেই বিশেষ রাতটিতে।মেক্সিকো ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন আগের কথা। শহরের নিয়ন আলো আর অন্ধকারের লুকোচুরির মাঝে ক্লাবের বাইরে এক অদ্ভুত পরিবেশ ছিল সেদিন। ক্লাবের শোরগোল থেকে একটু দূরে নির্জন এক কোণায় ফারহান হঠাৎ সেদিন ওকে গাড়ির সাথে চেপে ধরেছিলো লুসিয়া সেদিন ড্রাগসের কারনে নেশায় বুদ হয়েছিলো। লুসিয়া সেদিন কোনোকিছু ভাবার আগেই ফারহান যা করল তা ছিল ওর কল্পনার অতীত।

কোনো ভূমিকা ছাড়াই ফারহান ওকে গাড়ির সাথে চেপে ধরে,লুসিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারহানের ঠোঁটজোড়া ওর ঠোঁটে নিজের অধিকার স্থাপন করে দিয়ছিলো। সেই চুম্বনে কোনো বিলাসিতা ছিল না; ছিল এক বুক হাহাকার, এক অসমাপ্ত তৃষ্ণা আর ভিষন জেলাসি থেকে লুসিয়াকে নিজের আত্মার সাথে বেঁধে রাখার এক চরম হাহাকার। ফারহানের গায়ের সেই পুরুষালি ঘ্রাণ, হাতের শক্ত মুঠো আর ঠোঁটের সেই উত্তাপ লুসিয়া এখনও চোখ বুজলে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।

লুসিয়া অবশ আঙুলে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেখল। ওই একটা মুহূর্তেই তো ফারহান ওকে পুরোপুরি নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে। সেদিন সেই স্পন্দনের ভেতর একটা অলিখিত অঙ্গীকার ছিল। তবে আজ কেন ফারহান এত অচেনা? লুসিয়া ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে বলল, “ফারহান, ওই চুম্বন কি তবে কেবল এক মুহূর্তের ভালো লাগা ছিল? নাকি ওটা ছিল তোমার চলে যাওয়ার শেষ বিদায়? আমি তো আজও সেই রাতের ঘোরেই আটকে আছি, অথচ তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে?”

ব্রিজের নিচে নদীর জল আজ একদম স্তব্ধ। লুসিয়া চোখ বুজল। ওর মনের আয়নায় কেবল সেই রাতের ফারহানের মুখটা বারবার ভেসে উঠছে, যা এখন এক যন্ত্রণার নাম।

ব্রিজের ওপর সেই শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা লুসিয়া আর বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না। ফারহানের এই নীরবতা যেন সশরীরে ওর বুকের ওপর চেপে বসেছে। শাড়ির অবাধ্য আঁচলটা কোনোমতে হাতে পেঁচিয়ে সে টলমলে পায়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। শূন্য মনে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে সে সোজা গিয়ে থামল ওর বেস্ট ফ্রেন্ড মার্তার বাড়ির সামনে।

নিঝুম দুপুরে উস্কোখুস্কো চুল আর পরনে আলুথালু শাড়ি দেখে মার্তা আঁতকে উঠল। লুসিয়া ঘরে ঢুকেই মার্তাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কান্নার তোড়ে ওর গলার স্বর বুজে আসছিল। কিছুক্ষণ পর নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে ফারহানের চলে যাওয়া, সেই বিদায়ী বেলা আর আজকের এই দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিটি যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্ত খুলে বলল।

মার্তা সব শুনে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। সে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে ফারহানের সেই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে নিজেই একটা মেসেজ পাঠাল। মার্তা ভেবেছিল হয়তো লুসিয়ার ওপর কোনো কারণে রাগ করে সে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু মেসেজটা পাঠানোর পর দুজনেই যখন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল—সেখানেও কেবল সেই একলা ‘সিঙ্গেল টিক’ বিষণ্ণভাবে ঝুলে রইল।

মার্তা এবার গম্ভীর হয়ে লুসিয়ার দিকে তাকাল। ওর গলায় উদ্বেগের সুর, “লুসিয়া, ব্যাপারটা যতটা সহজ ভাবছিস, সম্ভবত ততটা নয়। আমার মেসেজটাতেও ডাবল টিক উঠছে না। এর একটাই মানে হতে পারে—ফারহান এই হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টটা হয় ডিলিট করে দিয়েছে, নয়তো এই নম্বরটা সে চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।”

লুসিয়ার মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ফারহান কি তবে মেক্সিকোর প্রতিটি চিহ্ন নিজের জীবন থেকে এভাবে উপড়ে ফেলতে চায়? এমনকি যে হোয়াটসঅ্যাপে তাদের অজস্র স্মৃতি আর জমানো কথা ছিল, সেটাকেও সে এতটা তুচ্ছ করে দিল?

লুসিয়া ফিসফিস করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “তাহলে কি আমি আর কোনোদিন ওর খোঁজ পাব না মার্তা? ও কি সত্যিই আমাকে মাঝপথে ফেলে এভাবে হারিয়ে গেল?”

মার্তা লুসিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। “ফারহান যদি বাংলাদেশে গিয়ে থাকে, তবে আমাদের অন্য কোনো পথ খুঁজতে হবে। কেউ শখ করে নিজের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় না লুসিয়া। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ও হয়তো কোনো বড় বিপদে পড়েছে।”

‘বিপদ’ শব্দটা শুনতেই লুসিয়ার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। যে ফারহান তাকে ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছিল, সে কি তবে বাংলাদেশে গিয়ে কোনো জালে ফেঁসে গেছে?

মার্তার ড্রয়িংরুমে লুসিয়া তখন এক খাঁচায় বন্দি আহত বাঘিনীর মতো ছটফট করছে। ফারহানের এই রহস্যময় নীরবতা বিষের মতো ওর রক্তে মিশে গিয়ে ওকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে খাক করে দিচ্ছে। এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সোজা গিয়ে মার্তার ফ্রিজটা খুলল। একটা দামী ওয়াইনের বোতল বের করে কাঁপা হাতে গ্লাসে ঢালল; লাল তরলটা উপচে পড়ল গ্লাসের কিনারা বেয়ে। এরপর পাশের টেবিল থেকে মার্তার সিগার প্যাকেটটা টেনে নিয়ে একটা স্টিক বের করল সে।

লুসিয়ার আঙুলগুলো তখনো থরথর করে কাঁপছে। লাইটার জ্বেলে যখন সিগারটা ঠোঁটে ছোঁয়াবে, ঠিক তখনই ওর মস্তিষ্কের কোনো এক গহিন থেকে ফারহানের সেই ভারী আর শাসনমাখা কণ্ঠস্বরটা তীরের মতো বিঁধল।

মেক্সিকো ছাড়ার আগের সেই শেষ মুহূর্তগুলোতে ফারহান ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে খুব কড়া গলায় সতর্ক করেছিল— “লুসিয়া, আমাকে মিস করতে করতে যদি তোমার দমও বেরিয়ে যায়, তবুও তুমি এক ফোঁটা ওয়াইন ছোঁবে না। মনে রেখো, যেদিন তুমি নেশায় ডুব দেবে, সেদিন ফারহান তোমার জীবন থেকে পাকাপাকিভাবে হারিয়ে যাবে। আমি আর কোনোদিন মেক্সিকোতে ফিরব না।”

স্মৃতিটা মনে পড়তেই লুসিয়া পাথরের মতো নিথর হয়ে গেল। ওর কেন যেন মনে হলো, ফারহান এই ঘরেরই কোনো এক অন্ধকার কোণ থেকে ওর প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে। ফারহানের সেই কঠোর শাসনের আড়ালে যে গভীর অধিকারবোধ লুকিয়ে ছিল, তা মুহূর্তেই নেশার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে ছাপিয়ে গেল।

লুসিয়া এক ঝটকায় সিগারটা অ্যাশট্রেতে পিষে নিভিয়ে ফেলল। হাতের ওয়াইন গ্লাসটা পরম ঘৃণাভরে দূরে সরিয়ে রাখল সে। ওর দুচোখ বেয়ে এবার বাঁধভাঙা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে ফুঁপিয়ে উঠে আর্তনাদ করে বলল—
“না… আমি পারব না! ও বলেছিল ও আমাকে নজরে রাখবে। যদি ও সত্যিই কোনোভাবে জানতে পারে যে আমি ওর কথা রাখিনি? যদি ও সত্যি এই অভিমানে আর কোনোদিন ফিরে না আসে?”

লুসিয়া মার্তার কোলে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যে মেয়েটা কয়েক মুহূর্ত আগে নেশার অন্ধকারে নিজেকে বিলীন করে দিতে চেয়েছিল, সে আজ কেবল ফারহানের দেওয়া এক টুকরো ‘অঙ্গীকার’ আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিল। ফারহান সশরীরে পাশে নেই ঠিকই, কিন্তু ওর সেই অদৃশ্য শাসন এখনো লুসিয়ার প্রতিটি রক্তকণিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে।

মার্তা পাশে বসে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখল—একটা মানুষের প্রতি কতটা হাহাকার মেশানো প্রেম থাকলে কেউ ধ্বংসের কিনারা থেকেও এভাবে নিজেকে টেনে আনতে পারে। লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করতে লাগল, “আমি ঠিক থাকব ফারহান। আমি মদ খাব না, আমি সিগারেট ছোঁব না। শুধু তুমি ফিরে এসো… অন্তত একবার জানাও যে তুমি আমাকে মনে রেখেছো।”
.
.
.

জাভিয়ান আর তান্বী সেই কটেজ থেকে সরাসরি মেক্সিকোর ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’-তে ফিরে এসেছে। লম্বা জার্নির ক্লান্তি তান্বীর চোখেমুখে স্পষ্ট থাকলেও ওর মনের ভেতর একটাই তাড়না—যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশে বাবা-মায়ের কাছে যেতে হবে। তান্বীর এই জেদ আর অস্থিরতা দেখেই জাভিয়ান অনেকটা তড়িঘড়ি করেই মেক্সিকোতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের ভিসার জটিলতা আর কিছু পারমিট রেডি করতে হলে তাদের উপস্থিতি মেক্সিকোতে জরুরি ছিল।

ভিলার বিশাল ফটক দিয়ে গাড়িটা যখন ভেতরে ঢুকল, তান্বী দেখল পরিবেশটা বেশ থমথমে। লিভিং রুমে পা রাখতেই দেখা হলো জাভিয়ানের বাবা-মা আর ওর চাচা আর মার্কোর সাথে। জাভিয়ান যে এভাবে হুট করে তান্বীকে নিয়ে আবার ভিলা এস্পেরেন্জায় ফিরে আসবে, তা সম্ভবত পরিবারের কেউ আশা করেনি।

জাভিয়ানের মা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তান্বীর দিকে তাকালেন। তারপর জাভিয়ানের দিকে ফিরে বিরক্ত গলায় বললেন, “বিনা নোটিশে হুট করে এই মেয়েকে নিয়ে আবার মেক্সিকোতে কেন ফিরলে জাভি? তোমরা তো এখন বাংলাদেশে থাকার কথা ছিল।”

জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের ওভারকোটটা খুলে সার্ভেন্টের হাতে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। ওর বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, “শুনলাম তুমি নাকি আবারও বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য ভিসার তদ্বির শুরু করেছ? এই মেয়ের পাগলামির জন্য তুমি নিজের এত বড় বিজনেস ডিল ফেলে বারবার দৌড়াদৌড়ি করছ কেন?”

চাচা সাইফ চৌধুরী এক কোণায় দাঁড়িয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসছিলেন। তিনি টিপ্পনী কেটে বললেন, “চৌধুরী সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি এখন এক বাঙালি মেয়ের ইশারায় নাচছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগছে। জাভিয়ান, তুমি কি নিজের ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি হারিয়ে ফেললে?”

জাভিয়ান এবার সাইফ চৌধুরীর দিকে একপলক তাকাল। ওর সেই বরফশীতল চাহনি দেখে সাইফ চৌধুরীর মুখের হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। জাভিয়ান অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কোথায় যাব আর আমার ওয়াইফকে নিয়ে কী করব, সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ বাড়িতে আমি এসেছি কারণ আমার কিছু পেপারস দরকার। আপনাদের সাথে আড্ডা দেওয়ার কোনো ইচ্ছে বা সময় আমার নেই।”

জাভিয়ানের বাবা গর্জে উঠলেন, “জাভিয়ান! বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার আদব কি তুমি ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলেছ একেবারেই?”

জাভিয়ান একটুও বিচলিত হলো না। সে তান্বীর হাতটা শক্ত করে ধরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। যাওয়ার আগে পেছন ফিরে না তাকিয়েই ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, “আদব তাদের জন্য যারা সন্তানের আবেগ বুঝতে পারে। আপনারা আমাকে দাবার ঘুঁটি বানাতে চেয়েছিলেন, মানুষ নয়। তাই আমার কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার চেষ্টা করবেন না।”

জাভিয়ান তান্বীকে নিয়ে দ্রুত দোতলায় নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। পরিবারের বাকিরা নিচে দাঁড়িয়ে রাগে আর বিস্ময়ে ফুঁসতে লাগল। ঘরে ঢুকেই জাভিয়ান সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল।

তান্বী একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “ওনারা বড়, আপনি চাইলে একটু নরম হয়েও কথা বলতে পারতেন। আমার জন্য ওনাদের সাথে আপনার দূরত্ব বাড়ছে।”

জাভিয়ান তান্বীকে নিজের খুব কাছে টেনে নিল। ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “ওদের জন্য ভেবো না জিন্নীয়া। আমি শুধু জানি তোমাকে তোমার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা দিয়েছি আমি। আর জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী তার কথা রাখতে জানে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তোমার ভিসা রেডি হবে। তুমি কি আমার ওপর ভরসা রাখছ?”

তান্বী জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। এই অসীম ক্ষমতার অধিকারী লোকটা তার পরিবারের কাছে কতটা নিস্পৃহ, অথচ তান্বীর সামান্য একটা ইচ্ছার জন্য সে পুরো পৃথিবীর সাথে লড়তে রাজি।
.
.
.
ভিলা এস্পেরেন্জার থমথমে পরিবেশের মাঝে হঠাৎ ঝড়ের বেগে বাড়িতে ঢুকল রায়হান। ওর চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রায়হানকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে জাভিয়ান বুঝল, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে। জাভিয়ান তখন নিজের স্টাডি রুমে বসে ভিসার ফাইলগুলো দেখছিল, পাশে তান্বী চুপচাপ বসে ছিল।
রায়হান ঘরে ঢুকেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “স্যার, সর্বনাশ হয়ে গেছে! জেল থেকে খবর এসেছে… মেইলস্ট্রোম পালিয়ে গেছে!”

জাভিয়ানের হাতের কলমটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে মাথা তুলে রায়হানের দিকে তাকাল। রায়হান আরও যোগ করল, “পালিয়েছে বললে ভুল হবে স্যার, ও যেন স্রেফ বাতাস হয়ে গেছে। জেলের সিসিটিভি ফুটেজ, গার্ডদের পাহারা—কোনো কিছুতেই কোনো চিহ্ন নেই। কেউ টেরও পায়নি ও কখন আর কীভাবে ভ্যানিশ হয়ে গেল।”

খবরটা শুনে জাভিয়ান সামান্যতমও ঘাবড়ালোনা। মেইলস্ট্রোম যে এত দ্রুত আর এত নিখুঁতভাবে গায়েব হতে পারবে, সেটা ওর ধারনা ছিল। তবে নিজের ভেতরের কিছুটা অস্থিরতা সে প্রকাশ পেতে দিল না। জাভিয়ান চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে মেক্সিকোর বিস্তীর্ণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—”পালিয়ে আর যাবে কোথায়? মেইলস্ট্রোমের যত আক্রোশ আর যত পাগলামি, সবকিছুর শেষ গন্তব্য তো এই তান্বী। ও পালিয়ে যেখানেই লুকাক না কেন, একদিন না একদিন ওকে বেরোতেই হবে। আর ওকে তান্বী পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে আগে আমার মুখোমুখি হতে হবে। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী বেঁচে থাকতে মেইলস্ট্রোমের কোনো ছায়া জিন্নীয়াকে ছুঁতে পারবে না।”

রায়হান কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল, “স্যার, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এবার ও বড় কোনো খেলা খেলছে। জেলের ভেতর থেকে কোনো চিহ্ন না রেখে বেরিয়ে যাওয়াটা সাধারণ কোনো পালানো নয়। এর পেছনে বড় কোনো শক্তি কাজ করছে। ও হয়তো এমন কোথাও ওত পেতে আছে যেখানে আমাদের নজর পৌঁছাচ্ছে না।”

জাভিয়ান ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখে এখন হিংস্র শিকারির দৃষ্টি। সে মোবাইলের দিকে একপলক তাকিয়ে রায়হানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ও খেলুক ওর খেলা। কিন্তু ও ভুলে যাচ্ছে, বাঘ যখন শিকার করতে বের হয়, তখন সে সব পথ চিনে বের করে। মেইলস্ট্রোম যদি ছোবল দিতে চায়, তবে আমি ওকে কবর দিতেও জানি। এখনই পুরো ভিলার সিকিউরিটি দশগুণ বাড়িয়ে দাও। আর বাংলাদেশ যাওয়ার প্রসেস আরও ফাস্ট করো। আমাদের এখান থেকে দ্রুত বের হতে হবে।”

তান্বী এতক্ষণ সব শুনছিল। হে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো মেইলস্ট্রোমের নাম শুনলেই ওর শরীর ভয়ে শিউরে ওঠে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় জাভিয়ানার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ও কি আবার আমাদের ক্ষতি করবে? আমরা কি তবে কোনোদিন শান্তিতে থাকতে পারব না?”

জাভিয়ান তান্বীর কাছে গিয়ে ওর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরল। ওর চোখের গভীরে তাকিয়ে অভয় দিয়ে বলল, “শান্তি আসবে জিন্নীয়া। মেইলস্ট্রোমের চ্যাপ্টার আমি চিরতরে ক্লোজ করব। এবার ও বের হলে আর জেলে যাবে না, সোজা নরকে যাবে।”

কিন্তু রায়হানের কপালের ভাঁজ কমল না। সে জানে, মেইলস্ট্রোমের এই নীরবতা বড় কোনো সুনামির পূর্বাভাস।
.
.
.
⚠️ CONTENT ALERT
READERS’ DISCRETION IS ADVISED:
THIS CHAPTER CONTAINS EXPLICIT CONTENT, INTENSE PHYSICAL AND PSYCHOLOGICAL DOMINANCE (BDSM THEMES), AND DARK ROMANCE ELEMENTS. THE SCENES DESCRIBED ARE GRAPHIC AND DEPICT EXTREME EMOTIONAL AND PHYSICAL INTENSITY. IT IS INTENDED FOR MATURE AUDIENCES ONLY. PLEASE PROCEED WITH CAUTION IF YOU ARE SENSITIVE TO THEMES OF POWER DYNAMICS AND AGGRESSIVE INTIMACY.

রাত নামতেই ভিলা এস্পেরেন্জার করিডোরগুলো এক রহস্যময় স্তব্ধতায় ডুবে গেল। জাভিয়ান যখন একটি মসৃণ কালো সিল্কের কাপড় দিয়ে তান্বীর চোখ দুটো বেঁধে দিল, তখন তান্বীর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। জাভিয়ানের আঙুলের স্পর্শ আজ অনেক বেশি তপ্ত হয়ে আছে। সে তান্বীর হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে যাচ্ছিল বাড়ির সেই নিষিদ্ধ প্রান্তের দিকে, যেখানে জাভিয়ানের ব্যক্তিগত অফিস রুম অবস্থিত ছিলো আগে।

পথ চলতে চলতে তান্বী বারবার প্রশ্ন করছিল, “জাভিয়ান, চোখ বাঁধছেন কেন? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”

জাভিয়ান কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। কেবল তান্বীর কানের খুব কাছে এসে তপ্ত নিশ্বাসে বলল, “সারপ্রাইজ, জিন্নীয়া। একটু ধৈর্য ধরো।”

‘সারপ্রাইজ’—শব্দটা এখন তান্বীর কাছে কোনো আনন্দের বার্তা নয়, বরং এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই একটি শব্দের আড়ালে জাভিয়ান তাকে দুই দুবার যন্ত্রণার অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দিয়েছে। তবে আজ ভালোবাসা দিবসের রেশ কাটেনি বলে তান্বীর মনে এক চিলতে আশা ছিল—হয়তো ভ্যালেন্টাইন ডেতে দেয়া চমকের মতোই আজ কোনো আলো ঝলমলে রোমান্টিক ডিনার কিংবা স্নিগ্ধ ফুলের সাজানো বাগান ওর জন্য অপেক্ষা করছে।

অফিস রুমের বিশাল দরজাটা খোলার শব্দ হলো। জাভিয়ান ওকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে চোখের বাঁধনটা খুলে দিল।

চোখ মেলার পর তান্বী যা দেখল, তাতে ওর সারা শরীর পাথর হয়ে গেল। এটা কোনো রঙিন উৎসব নয়, বরং এক বিভীষিকাময় রূপকথা যেন ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরজুড়ে বিষণ্ণ লাল নিওন আলো, যা অন্ধকারকে দূর না করে বরং আরও ঘনীভূত করেছে। চারিদিকের ছায়ারা দেয়ালের গায়ে বীভৎস সব আকার নিয়েছে। ঘরটা দেখতে অনেকটা কোনো ভুতুড়ে ডার্ক রুমের মতো লাগছে।

রুমের ঠিক মাঝখানে রাখা একটি বিশাল বেড। আর সেই বেডের ওপর বিছানো আকাশী রঙের একটি ওয়াটার ম্যাট্রেস, যা লাল আলোয় এক অদ্ভুত অপার্থিব রূপ নিয়েছে। তান্বীর নজর যখন পাশের সেলফগুলোর দিকে গেল, সে লজ্জায় আর আতঙ্কে দুপা পিছিয়ে এল। সেখানে সাজানো রয়েছে মানুষের আদিম কামনার বিচিত্র সব অনুষঙ্গ—নানা ধরনের ফিজিক্যাল টর্চার টয়। আর সবচেয়ে পিলে চমকানো দৃশ্যটি ছিল বিছানার ওপর। ছাদ থেকে ঝুলে আছে ভারি সব ধাতব হ্যান্ডকাফ যা বাতাসের ঝাপটায় একে অপরের গায়ে লেগে টুংটাং শব্দ করছে। সেই শব্দ নিস্তব্ধ ঘরটাতে এক ভয়ানক আর্তনাদের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

জাভিয়ান পেছন থেকে তান্বীর উন্মুক্ত পিঠে নিজের ঠান্ডা হাত রাখল। ওর ঠোঁটের সেই বাঁকা হাসিটা লাল আলোয় আজ অনেক বেশি আদিম আর হিংস্র দেখাচ্ছে। সে তান্বীর কাঁধে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—”এটা তোমার জন্য আমার ভ্যালেন্টাইনের শেষ উপহার, জিন্নীয়া।

তান্বী দেখল জাভিয়ান রিমোট দিয়ে দরজার ইলেকট্রনিক লকটা আটকে দিল। লাল মায়াবী কিন্তু আতঙ্কিত সেই ঘরে তান্বী বুঝতে পারল, জাভিয়ানের সেই অবদমিত বন্য রূপটা আজ সব সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

তান্বীর সারা শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। লাল নিওন আলোর সেই অস্পষ্টতায় রুমটাকে ওর কাছে কোনো নরকের প্রবেশদ্বার বলে মনে হচ্ছে। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা ওই ঠান্ডা ধাতব হাতকড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে ও নিজের গলার স্বর খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ পর ধীর পায়ে অনেকটা পিছিয়ে গিয়ে ও জাভিয়ানের দিকে তাকাল।

তান্বী অস্ফুট স্বরে বলল, “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন জাভিয়ান? এমন ভুতুড়ে রুম কেউ কাউকে সারপ্রাইজ কিভাবে দেয়?।”

জাভিয়ান এক পা এগিয়ে এল। ওর পরনের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। লাল আলোয় ওর গায়ের তিলগুলো আজ আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জাভিয়ান ওর সেই চিরচেনা গম্ভীর আর নেশাতুর গলায় জবাব দিল—”এটা ভুতুড়ে রুম নয় জিন্নীয়া। এটাকে বলে ‘ফ্যান্টাসি সেক্সুয়াল রুম’। আমার কাছে এটাই পরম সুখের জায়গা। এখানে সমাজ নেই, নিয়ম নেই, আছে শুধু আমার শাসন আর তোমার সমর্পণ।”

তান্বী বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। জাভিয়ান থামল না, ও এগিয়ে এসে তান্বীর কোমরে হাত দিয়ে ওকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ধরল।

“এই আকাশী রঙের ওয়াটার ম্যাট্রেসটা দেখছো? এখানে যখন আমি তোমাকে নিয়ে শোবো, তখন প্রতিটা ঢেউ তোমাকে মনে করিয়ে দেবে তুমি কার অধীনে আছো। আর এই সেলফের খেলনাগুলো… এগুলো তো কেবল শুরু। আজ রাতে আমি তোমাকে এমন এক পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেব, যা তুমি আগে কোনো নিষিদ্ধ কোনো উপন্যাসে পড়েছো কিনা ঠিক নেই।”

তান্বী জাভিয়ানের বুক ঠেলে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল, “আপনি আমার ওপর আপনার এই নোংরা ফ্যান্টাসি চাপিয়ে দিতে পারেন না! আমি ভয় পাচ্ছি জাভিয়ান, দয়া করে দরজাটা খুলুন।”

জাভিয়ান ওর কানে খুব মৃদু একটা কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভয়ই তো আসল আনন্দ জিন্নীয়া। যত বেশি তুমি ভয় পাবে আমার আদরকে, আমার যত বেশি তৃপ্তি হবে। ভালোবাসা দিবসের পরের এই রাতটা আমি সাধারণ কোনো ডিনারে নষ্ট করতে চাইনি। আমি চেয়েছি তোমার প্রতিটি ইঞ্চিতে আমার মালিকানা লিখে দিতে—হয় ভালোবাসায়, নয়তো এই শিকলের বন্দিত্বে।”

জাভিয়ান এবার এক ঝটকায় তান্বীকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। তান্বী চিৎকার করে ওঠার আগেই ও তাকে সেই নরম ওয়াটার ম্যাট্রেসের ওপর ছুঁড়ে দিল। বিছানার আকাশী জলস্তরটা তান্বীর শরীরের ভারে দুলে উঠল, আর ওপর থেকে সেই হ্যান্ডকাফগুলো ওর মুখের একদম কাছাকাছি এসে দুলতে লাগল।

ওয়াটার ম্যাট্রেসের অস্থির দুলুনিতে তান্বীর ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। চারদিকের সেই লাল আলোর আভা আর অদ্ভুত সব খেলনা ওর মস্তিষ্ককে অবশ করে দিচ্ছে। বিছানায় শোয়া অবস্থাতেই সে একরাশ আতঙ্ক মেশানো চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল।

তান্বী গলা উঁচিয়ে কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করল, “আপনি কি কেমন মানুষ? এই বীভৎস ঘর সাজিয়ে আপনি কী করবেন জাভিয়ান? এই হ্যান্ডকাফ আর খেলনা দিয়ে কী বোঝাতে চাইছেন আপনি?”

জাভিয়ান ধীরেসুস্থে ওর শার্টের হাতা দুটো ভাঁজ করতে করতে তান্বীর একদম মাথার কাছে এসে দাঁড়াল। ওপর থেকে দুলতে থাকা একটা হ্যান্ডকাফ ও আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল, যার ধাতব টুংটাং শব্দে তান্বী শিউরে উঠল। জাভিয়ান ওর সেই শীতল আর নেশালু চোখে তান্বীর সারা শরীর মেপে নিয়ে বলল—”এই রুমে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে এক ‘স্পেশাল ট্রিটমেন্ট’ জিন্নীয়া। এতদিন তুমি আমার যে রূপ দেখেছ, তা ছিল কেবল টিজার। আজ এই চার দেয়ালের ভেতরে তোমার প্রতিটি আর্তনাদ আর প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস কেবল আমার অধিকারে থাকবে।”

তান্বী কিছু বলতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান ওর ঠোঁটে একটা আঙুল রেখে ওকে থামিয়ে দিল। ওর কণ্ঠস্বর এবার আরও গভীর আর রহস্যময় হয়ে উঠল।
“আর শোনো, আজ শুধু ট্রিটমেন্টেই শেষ হবে না। আজকের রাতটা আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ, আজ আমাদের এই প্রতিটি মুহূর্তের ইনটিমেসি, তোমার গলার প্রতিটি চিৎকার সবকিছু হাই-ডেফিনিশন সাউন্ডে রেকর্ডিং করা হবে।”

কথাটা শুনে তান্বীর রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল, “সাউন্ড রেকর্ডিং? আপনি কতটা উন্মাদ হতে পারেন জাভিয়ান! আপনি আমাদের একান্ত মুহূর্তগুলোকে এভাবে বন্দী করবেন?”

জাভিয়ান পকেট থেকে ফোন বের করে রেকর্ডিং অনি করে তান্বীর চোখের সামনে ধরল। ওর মুখে সেই কুটিল তৃপ্তির হাসি। “উন্মাদনা নয় জিন্নীয়া, এটাকে বলে অবসেশন। যখন তুমি আমার সামনে থাকবে না, কিংবা যখন তুমি অবাধ্য হবে তখন এই রেকর্ডিং আমাকে মনে করিয়ে দেবে তুমি কতটা অসহায়ভাবে আমার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলে। তোমার সেই আর্তনাদগুলো আমার কানের কাছে মিউজিকের মতো বাজবে।”

জাভিয়ান এবার বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসল। ওপর থেকে ঝুলে থাকা হ্যান্ডকাফ দুটো হাতে নিয়ে ও তান্বীর কবজির দিকে এগিয়ে এল। তান্বী চিৎকার করে পিছু হটার চেষ্টা করল, কিন্তু ওয়াটার ম্যাট্রেসের ঢেউয়ে সে আরও বেশি জাভিয়ানের নাগালের ভেতরে চলে এল।
জাভিয়ান ফিসফিস করে বলল, “রেকর্ডিং শুরু হয়ে গেছে জিন্নীয়া।
.
.
কক্ষের লাল নিয়ন আলোটা আরও গাঢ় হয়ে এল। জাভিয়ান কোনো তাড়া দেখাল না, বরং অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তার শিকারকে কাবু করার নেশায় মেতে উঠল। তান্বী নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু জাভিয়ানের লৌহকঠিন হাতের সামনে ওর প্রতিরোধ ছিল বালির বাঁধের মতো দুর্বল।

জাভিয়ান ওপর থেকে ঝুলে থাকা সেই ভারী হ্যান্ডকাফ দুটো টেনে নামিয়ে আনল। কোনো কথা না বলে সে তান্বীর নরম হাতজোড়া এক জায়গায় জড়ো করে সেই ঠান্ডা ধাতব বেষ্টনীতে আটকে দিল। ‘ক্লিক’ শব্দে তালাটা লেগে যেতেই তান্বী বুঝতে পারল আজকের রাতটা কেবল জাভিয়ানের ইচ্ছাধীন। ও এখন পুরোপুরি বন্দী।

তান্বীর চোখের কোণে দুফোঁটা জল টলমল করছিল, কিন্তু জাভিয়ানের চোখে তখন আদিম তৃষ্ণা। সে বিছানায় ঝুঁকে এল। তবে তার শুরুটা ছিল একদম বিপরীত। সে তান্বীর ললাটে, চোখের পাতায় আর গালের প্রতিটি ইঞ্চিতে অত্যন্ত নরম, পালকের মতো সূক্ষ্ম কিছু চুমু এঁকে দিল। এই আকস্মিক কোমলতায় তান্বী এক মুহূর্তের জন্য বিমূঢ় হয়ে গেল। জাভিয়ানের এই দ্বৈত রূপ ওকে সবসময় বিভ্রান্ত করে কখনও সে কঠোর শাসক, আবার কখনও সে নিঃশব্দ প্রেমিক।
কিন্তু সেই কোমলতা স্থায়ী হলো না। জাভিয়ান এবার সরাসরি তান্বীর ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিল। সেখানে কোনো আপস ছিল না, ছিল একচ্ছত্র অধিকার। সেই গভীর চুম্বনে তান্বীর নিশ্বাস আটকে আসছিল। এরপর জাভিয়ান তার ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে এল তান্বীর গলার খাঁজে।

সেখানে সে তার উষ্ণ ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। তান্বীর শাড়ির আঁচলটা জাভিয়ানের এক টানে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। কাঁধের ওপর দিয়ে যখন জাভিয়ানের হাতটা আলতো করে পিঠের দিকে নেমে গেল, তান্বী যন্ত্রণায় আর উত্তেজনায় চোখ বুজল। জাভিয়ান এবার ওর ঘাড়ের নরম অংশে মুখ ডুবিয়ে দিল। সেখানে কখনও সে তীব্র চুমু খাচ্ছে, আবার কখনও দাঁত দিয়ে মৃদু কামড় বসিয়ে দিচ্ছে—যেন সে তান্বীর শরীরের প্রতিটা কোণকে নিজের সিলমোহর দিয়ে চিহ্নিত করে দিতে চায়।
হ্যান্ডকাফের শিকলটা জাভিয়ানের প্রতিটি মুভমেন্টের সাথে সাথে ঝনঝন করে বেজে উঠছিল, যা রেকর্ডারের সাউন্ডে এক বিচিত্র আবহ তৈরি করছিল।
জাভিয়ান নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “জিন্নীয়া, তোমার শরীরের এই প্রতিটি কম্পন আজ আমার এই মোবাইলে বন্দি হচ্ছে। এই রাতটা তোমার আমৃত্যু মনে থাকবে।”

তান্বী কেবল এক অস্ফুট আর্তনাদ করল। সে জানে, এই অন্ধকার ঘরে আজ জাভিয়ান চৌধুরী তার সমস্ত ফ্যান্টাসিকে বাস্তবে রূপ দিয়ে তবেই শান্ত হবে।

লাল নিয়ন আলোর মায়াবী কিন্তু বিষাক্ত আভা পুরো ঘরটাকে এক নিষিদ্ধ ঘোরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জাভিয়ান কোনো তাড়াহুড়ো করল না। সে যেন তার শিকারকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে উপভোগ করার এক আদিম খেলায় মেতেছে। সে এবার অত্যন্ত মন্থর গতিতে নিজের পরনের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে ফেলল। পেশিবহুল বুক আর কাঁধ লাল আলোয় আজ আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। এরপর সে নিজের চামড়ার বেল্টটা খুলে সশব্দে মেঝের ওপর রাখল—সেই ধাতব শব্দের প্রতিধ্বনি তান্বীর হৃদস্পন্দনকে এক অজানা শঙ্কায় বাড়িয়ে দিল কয়েক গুণ।

জাভিয়ান পুনরায় হাঁটু গেড়ে বিছানায় উঠে এল। ওর শরীরের ভারে ওয়াটার ম্যাট্রেসটা মৃদু দুলছে, উত্তাল সমুদ্রের ঢেউর মতোই। জাভিয়ান তান্বীর পরনের শাড়ির শেষ আবরণটুকুও অত্যন্ত নিপুণভাবে সরিয়ে দিল। হ্যান্ডকাফে বন্দি হাতজোড়া মাথার ওপরে তুলে রাখা ছাড়া তান্বীর আর কোনো উপায় ছিল না। সে আজ পুরোপুরি জাভিয়ানের সেই অবদমিত ফ্যান্টাসির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

জাভিয়ান এবার পাশের কাঠের সেলফ থেকে একটি বিশেষ মখমলের বাক্স টেনে নিল। সেখানে সাজানো রয়েছে মানুষের আদিম কামনার বিচিত্র সব অনুষঙ্গ। সে সেখান থেকে একটি ‘সিলিকন ভাইব্রেটর’ বের করে সুইচ অন করল। একটি যান্ত্রিক গুঞ্জন পুরো ঘরের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল, যা রেকর্ডারের সেনসিটিভ মাইক্রোফোনে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করছিল।
সে যন্ত্রটি তান্বীর উন্মুক্ত উদরের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনল। তান্বী শিউরে উঠে চিৎকার করে বলল, “না জাভিয়ান… দয়া করে আর না!”

জাভিয়ান ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে তপ্ত নিশ্বাসে বলল, “আজ রাতে ‘না’ শব্দটা নিষিদ্ধ তোমার জন্য। আমি দেখতে চাই, যন্ত্রণার শেষ সীমায় গিয়ে আনন্দটা তুমি কীভাবে খুঁজে নাও।”

সে যন্ত্রটির কম্পন তান্বীর স্পর্শকাতর অঙ্গে স্থির করতেই তান্বী যন্ত্রণায় আর এক অদ্ভুত ঘোরে ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। ওর হাতের সেই শিকলগুলো সজোরে ঝনঝন করে বেজে উঠল। জাভিয়ান এবার একটি ‘লেদার ফ্লগার’ হাতে নিল। তার চামড়ার চিকন ফিতাগুলো দিয়ে সে তান্বীর মসৃণ উরুতে মৃদু ছন্দময় আঘাত করতে লাগল। প্রতিটি আঘাত যেন তান্বীর স্নায়ুতে বিদ্যুতের ঝিলিক বয়ে দিচ্ছিল।
জাভিয়ান নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল তান্বীর নাভির নিচে। সেখানে দাঁত দিয়ে মৃদু কামড় বসিয়ে সে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে এল। ওর গালের খসখসে ত্বক তান্বীর নরম ত্বকে এক অদ্ভুত ঘর্ষণ আর জ্বালা তৈরি করছিল। রেকর্ডারে তখন হ্যান্ডকাফের আর্তনাদ, ওয়াটার ম্যাট্রেসের ঢেউ আর তান্বীর রুদ্ধশ্বাস গোঙানি মিলেমিশে এক নিষিদ্ধ সিম্ফনি তৈরি করছিল।

জাভিয়ান ওর ঘাড়ের নরম অংশে নিজের মালিকানার চিহ্ন একে দিচ্ছিল কামড় আর চুম্বনের মাধ্যমে। সে আজ নিজেকে কোনো সীমানায় আটকে রাখেনি; সে আজ কেবল এক অদম্য কামাতুর সম্রাট, যার সাম্রাজ্য কেবল এই আতঙ্কিত নারী।

লাল নিয়ন আলোর তীব্রতা প্রতিটি ক্ষণে বাড়ছে, আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জাভিয়ানের তৃষ্ণা। কক্ষের তাপমাত্রা এখন অসহ্য রকমের উত্তপ্ত। জাভিয়ান এবার একটি ‘গ্লাস ডিলডো’ হাতে তুলে নিল, যার মসৃণ কাঁচের গায়ে লাল আলোর প্রতিফলন এক অদ্ভুত বিভ্রম তৈরি করছে। সে সেটি তান্বীর উন্মুক্ত উরুর ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে স্লাইড করে ওপরে নিয়ে এল। কাঁচের সেই শীতল স্পর্শ আর জাভিয়ানের শরীরের তপ্ত উত্তাপ এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে তান্বী বারবার শিউরে উঠছিল।

জাভিয়ান এবার তান্বীর ওপর পুরোপুরি ঝুঁকে এল। ওর সুঠাম বুকের ঘাম তান্বীর তপ্ত শরীরে আছড়ে পড়ছে। সে অত্যন্ত ক্ষিপ্র হাতে একটি ‘সিল্কি ব্লাইন্ডফোল্ড’ বের করে তান্বীর চোখ দুটো আবার ঢেকে দিল। অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যেতেই তান্বীর বাকি সব ইন্দ্রিয় আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। জাভিয়ান ওর কানের লতিতে দাঁত বসিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চোখ দিয়ে নয় জিন্নীয়া, আজ শুধু অনুভূতি দিয়ে আমাকে অনুভব করো। আমি চাই তোমার শরীরের প্রতিটি কোষ আমার নাম জপ করে।”

জাভিয়ান এবার ওর বেল্টটা হাতে নিয়ে বিছানায় দুম করে আছাড় দিল। সেই শব্দের সাথে সাথে সে তান্বীর শরীরে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার ঠোঁট এখন আর নরম নয়, বরং এক অবাধ্য ঝড়ের মতো তান্বীর সারা শরীরে বিচরণ করছে। ঘাড় থেকে শুরু করে বুকের খাঁজ, নাভি ছাড়িয়ে আরও গভীরে জাভিয়ানের মুখ ডুবিয়ে দেওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত রেকর্ডারে ধরা পড়ছে এক আদিম শব্দতরঙ্গ হিসেবে।

তান্বীর হাতদুটো তখনো হ্যান্ডকাফে বন্দি, ওপরে ঝুলছে। ও ছটফট করছিল, কিন্তু ওয়াটার ম্যাট্রেসের দুলুনি ওকে আরও গভীরে তলিয়ে দিচ্ছিল। জাভিয়ান এবার সেই অন্তিম মুহূর্তের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করল।

“তাকাও আমার দিকে জিন্নীয়া,” জাভিয়ান ওর চোখের বাঁধন এক ঝটকায় খুলে দিল। তান্বীর চোখে তখন যন্ত্রণার জল আর এক অদ্ভুত আকুলতা। জাভিয়ান কোনো সুযোগ না দিয়েই নিজেকে সজোরে তান্বীর গভীরে প্রবিষ্ট করাল।

এক তীব্র আর্তনাদ ঘর চিরে বেরিয়ে এল, যা রেকর্ডারের কাঁটাটাকে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে দিল। হ্যান্ডকাফের শিকলগুলো পাগলের মতো ঝনঝন করে উঠল। জাভিয়ানের প্রতিটি মুভমেন্টে ওয়াটার ম্যাট্রেসের ভেতরকার জলরাশি কোনো প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের মতো দুলছিলো।জাভিয়ান থামল না; ওর প্রতিটি চলন ছিল ছন্দময় অথচ প্রচণ্ড বিধ্বংসী। সে যেন আজ তান্বীর আত্মার ভেতরে নিজের নাম খোদাই করে দিচ্ছে।

তান্বী ওর পিঠে নখ বসিয়ে দিল, ওর ঠোঁট কামড়ে ধরল যন্ত্রণায়। জাভিয়ানের ঘাম আর তান্বীর চোখের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। জাভিয়ান ওর ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে চূড়ান্ত উন্মত্ত গর্জনে ওর ভেতরে নিজেকে বিলীন করে দিল। সেই মুহূর্তে পুরো পৃথিবী থমকে দাঁড়িয়েছিল ওই লাল আলোর অন্ধকার ঘরে।

লাল নিয়ন আলোর সেই মায়াবী কক্ষটি এখন এক রণক্ষেত্রের মতো নিস্তব্ধ। ওয়াটার ম্যাট্রেসের ওপর তান্বীর শরীরটা নিথর হয়ে পড়ে আছে। জাভিয়ানের চূড়ান্ত বন্যতা আর সেই যান্ত্রিক ‘ট্রিটমেন্ট’ সহ্য করার ক্ষমতা ওর ছিল না। যন্ত্রণার এক চরম মুহূর্তে ওর মস্তিষ্ক যেন সব সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছে। হ্যান্ডকাফে বন্দি হাত দুটো ঝুলে আছে অবশ হয়ে, আর ওর মাথাটা একদিকে হেলে পড়েছে।

জাভিয়ান যখন তার অতিরিক্ত তৃষ্ণা মিটিয়ে স্বাভাবিক পৃথিবীতে ফিরে এল, তখন সে খেয়াল করল তান্বীর কোনো সাড়া নেই। ওর ভারী নিশ্বাসগুলো রেকর্ডারে ধরা পড়লেও তান্বীর দিক থেকে কোনো আর্তনাদ বা গোঙানি আর আসছে না।

জাভিয়ান এক ঝটকায় তান্বীর চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। ওর চোখ দুটো আধবোজা, মণি দুটো স্থির।

“জিন্নীয়া?” জাভিয়ানের কণ্ঠে এক মুহূর্তের জন্য উদ্বেগের ছোঁয়া লাগল। সে ওর গালের ওপর হালকা চাপড় দিল, কিন্তু তান্বী তখন চেতনার ওপাড়ে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর শারীরিক যন্ত্রণার তীব্রতায় ও অজ্ঞান হয়ে গেছে।

জাভিয়ান দ্রুত ড্রয়ার থেকে চাবি বের করে হ্যান্ডকাফগুলো খুলে দিল। কবজিতে লাল হয়ে বসে যাওয়া দাগগুলো দেখে জাভিয়ানের ভেতরে এক বিচিত্র অপরাধবোধ জাগলেও পরক্ষণেই তা চাপা পড়ে গেল ওর দম্ভের কাছে। সে তান্বীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ওয়াটার ম্যাট্রেস থেকে ওকে সরিয়ে পাশের একটি আরামদায়ক ডিভানে শুইয়ে দিল।
রেকর্ডারটা এখনো চলছে—সেখানে শুধু জাভিয়ানের দ্রুত হৃদস্পন্দন আর তান্বীর অচেতন শরীরের নিস্তব্ধতা রেকর্ড হচ্ছে। জাভিয়ান রেকর্ডারটা বন্ধ করে ফোনটা হাতে নিল। আজকের এই দীর্ঘ রাতের প্রতিটি শব্দ এখন ওর হাতের মুঠোয় বন্দি। সে তান্বীর ললাটে জমে থাকা ঘামগুলো নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল।
“এতটা দুর্বল হলে চলবে না জিন্নীয়া।তোমাকে আরও উন্মাদনার মোকাবিলা করতে হবে,” সে বিড়বিড় করে বলল।

জাভিয়ান যখন তান্বীর গায়ে একটি পাতলা চাদর জড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই ওর ফোনের ব্লু-টুথ হেডসেটে একটা সিগন্যাল বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রায়হানের নাম। এই মাঝরাতে রায়হানের কল দেওয়ার মানে একটাই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

জাভিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মেক্সিকোর রাতের শীতল বাতাস ওর ঘর্মাক্ত শরীরে আছড়ে পড়ল।

“বলো রায়হান,” জাভিয়ানের গলা এখন বরফশীতল।
ওপাশ থেকে রায়হানের হন্তদন্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “স্যার, মেইলস্ট্রোমকে আমরা ট্র্যাক করতে পেরেছি। কিন্তু ও মেক্সিকোতে নেই। ও অলরেডি বর্ডার ক্রস করে ফেলেছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর খবর হলো—বাংলাদেশের বিমানবন্দরে আমাদের যে সোর্স আছে, সে খবর দিয়েছে যে মেইলস্ট্রোমের সাথে একজন ‘ইনসাইডার’ হাত মিলিয়েছে। স্যার, ও আপনার ভিলা এস্পেরেন্জার প্রতিটি গোপন ম্যাপ জানে!”

জাভিয়ানের হাতটা ফোনের ওপর শক্ত হয়ে বসল। মেইলস্ট্রোম পালিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে আসলে পালায়নি; সে জালের বিস্তার করছে।
.
.
.
ভোরের আলো তখন ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’র ভারী পর্দা ভেদ করে ঘরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। লাল নিয়ন আলোগুলো নিভে গেছে, ঘরটা এখন ভোরের ধূসর আলোয় এক বিষণ্ণ শান্তিতে ডুবে আছে। তান্বী যখন চোখ মেলল, ওর মস্তিষ্ক তখনও ভারী হয়ে ছিল। সারা শরীরে একটা তীব্র অস্বস্তি আর অবশ ভাব।

সে অনুভব করল তার মাথাটা কারও শক্ত আর প্রশস্ত বুকের ওপর রাখা। ওপরের দিকে তাকাতেই দেখল জাভিয়ান। মানুষটা ঘুমাচ্ছে, কিন্তু ঘুমের মধ্যেও ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, যেন স্বপ্নেও সে কোনো যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে। জাভিয়ানের এক হাত তান্বীর কোমরে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে কোনো মূল্যবান সম্পদ সে আগলে রেখেছে।

জ্ঞান ফেরার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গত রাতের সেই বীভৎস স্মৃতিগুলো সিনেমার রিলের মতো তান্বীর চোখের সামনে ভেসে উঠল। সেই লাল আলো, ওপরে ঝুলতে থাকা ঠান্ডা ধাতব হ্যান্ডকাফ, সেই বিচিত্র সব যন্ত্রপাতির যান্ত্রিক গুঞ্জন আর জাভিয়ানের কণ্ঠস্বরের সেই নেশাতুর শাসন—সবকিছু মনে পড়তেই তান্বীর সারা শরীর ভয়ে শিউরে উঠল।

সে জাভিয়ানের বুকের ওপর থেকে সরে আসার চেষ্টা করতেই সারা শরীরের প্রতিটি পেশি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। গত রাতে জাভিয়ান যে নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে, তা তান্বীর কল্পনারও অতীত ছিল। সে জানত জাভিয়ান কঠোর, সে জানত জাভিয়া মেক্সিকোর জগতের সম্রাট কিন্তু তার ব্যক্তিগত প্রেমের ধরণ যে এতটা পাশবিক হতে পারে, তা তান্বী এই প্রথম হাড়ে হাড়ে টের পেল।

তান্বী স্থির হয়ে শুয়ে রইল। জাভিয়ানের রোমান্টিকতা বড্ড অদ্ভুত। সে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসার পরতে পরতে থাকে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের নেশা। সে আদর করে, কিন্তু সেই আদরের মাঝেও যন্ত্রণার চিহ্ন এঁকে দেয়। তান্বীর মনে হলো, জাভিয়ানের কাছে প্রেম মানে কোনো পারস্পরিক বিনিময় নয়, বরং এক আদিম শিকার আর শিকারির খেলা।
.
.
.
সকাল হতেই জাভিয়ান আবার তার সেই চিরচেনা রুপে ফিরে এলো। রাতের সেই বন্য প্রেমিক আর এখনকার সুট-টাই পরা গম্ভীর জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে অফিসের শেষ ধাপের কাজগুলো গুছিয়ে নিতে সে খুব সকালেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় তান্বীর কপালে একটা নিস্পৃহ কিন্তু মালিকানাসূচক চুমু দিয়ে গেল।

জাভিয়ান বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তান্বী বিধ্বস্ত শরীরে নিজের ঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই নিচের লনে একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল লুসিয়া। সারা রাত মার্তার বাড়িতে কান্নাকাটি আর ফারহানের খোঁজ না পাওয়ার হাহাকার নিয়ে সে নিজের বাড়িতে ফিরেছে।

লুসিয়া যখন ওপরের দিকে তাকাল, ওর চোখ আটকে গেল তান্বীর ওপর। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় তান্বীকে দেখে লুসিয়ার বুকটা হু হু করে উঠল। তান্বীর অবয়ব, ওর চোখের চাহনি আর গায়ের রঙ—সবকিছুর মধ্যে লুসিয়া আজ তীব্রভাবে ফারহানকে খুঁজে পাচ্ছে। ওরা ভাই-বোন, তাই চেহারার আদলে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। ফারহানকে হারানোর যে শূন্যতা লুসিয়াকে কুরে কুরে খাচ্ছে, তান্বীকে দেখা মাত্রই সেই ক্ষতটা আবার টাটকা হয়ে উঠল।

লুসিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর খুব ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে তান্বীকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠতে। ওর মনে হচ্ছিল, তান্বীকে জড়িয়ে ধরা মানেই যেন ফারহানের স্পর্শ ফিরে পাওয়া। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সংযত করল। তান্বীর সাথে ওর সম্পর্কটা কেবল জাভিয়ানের স্ত্রী হিসেবেই, তার ওপর ওদের মধ্যে তেমন কোনো ঘনিষ্ঠতাও নেই। হুট করে এভাবে জড়িয়ে ধরাটা বড্ড ‘অকোয়ার্ড’ বা বেমানান দেখাবে।
লুসিয়া নিজের চোখের জল আড়াল করে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কিন্তু তান্বী ওপর থেকে লুসিয়ার সেই তৃষ্ণার্ত চাউনিটা ঠিকই খেয়াল করল। সে বুঝতে পারল, এই মেক্সিকান মেয়েটির ভেতরে কোনো একটা দহন চলছে।

তান্বী ভাবছিল, লুসিয়া কেন এভাবে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল?
.
.
.
লুসিয়া ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় বসেছিল, কিন্তু ওর অস্থির চোখদুটো বারবার সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল। তান্বী নিচে নেমে আসতেই লুসিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে একটু স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় করল। তবে ওর মলিন মুখ আর ফোলা চোখ ফারহানের প্রতি ওর ব্যাকুলতা আড়াল করতে পারছিল না।

তান্বী কাছে আসতেই লুসিয়া আমতা-আমতা করে ইনবিনিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তান্বী, তোমার ভাইয়া… মানে ফারহান কোথায় তুমি জানো? ও কি মেক্সিকোতেই আছে নাকি চলে গেছে?”

তান্বী একটু অবাক হয়ে তাকাল। সে জানে লুসিয়া কেমন মেয়ে হঠাৎ ফারহানের কথা জিজ্ঞেস করছে ভেবে সে অবাক হলো, কিন্তু ফারহান এখন কোথায় সেটা তান্বীর নিজের কাছেই এক বিরাট রহস্য। সে মাথা নিচু করে ম্লান স্বরে বলল, “না লুচি আপা, ভাইয়ার কোনো খবর আমি জানি না। আমার সাথে আর কোনো যোগাযোগ করেনি।”

লুসিয়ার বুকটা ধক করে উঠল, কিন্তু সে সরাসরি নিজের মনের কথা প্রকাশ করল না। সে কথা ঘুরিয়ে নিয়ে একটু কৌশলে বলল, “আসলে হয়েছে কী… আমার এক ফ্রেন্ড ফারহানকে খুব পছন্দ করেছিল। ও ওর ফোন নম্বরটা চাইছে। কিন্তু তোমার ভাইয়ার নম্বর তো আমার কাছে নেই। ও হয়তো এখন বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। তুমি যদি ওর নম্বরটা আমাকে দিতে, তবে খুব ভালো হতো।”

কথাটা শুনে তান্বীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়ল। ফারহানের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর নীতিবান একজন মানুষের জন্য বিদেশি কোনো মেয়ের এই আগ্রহ তান্বীর কাছে একটু বেমানান ঠেকল। সে সরাসরি কিন্তু মার্জিত গলায় জবাব দিল—”আরে কী বলছেন লুচি আপা! আমার ভাইয়া এসব প্রেম-ভালোবাসায় জড়াবে না। ও অনেক গম্ভীর আর আদর্শবাদী মানুষ। তাছাড়া এই বিদেশি কালচার, এখানকার লাইফস্টাইল—এসবে অভ্যস্ত কোনো মেয়ের সাথে ভাইয়া কথা পর্যন্ত বলবে না। সত্যি বলতে, সে এই কালচারের মেয়েদের একদমই পছন্দ করে না।”

লুসিয়ার কানে তান্বীর শেষ কথাগুলো তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। ‘সে এই কালচারের মেয়েদের পছন্দ করবে না’—এই বাক্যটি লুসিয়াকে মনে করিয়ে দিল যে, ফারহান আর ওর মাঝখানে শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। লুসিয়া যে ছোট পোশাক পরে, যে স্বাধীন জীবন কাটায়, ফারহান হয়তো ঘৃণাভরে সেগুলোকেই প্রত্যাখ্যান করেছে।

লুসিয়া ম্লান হেসে বলল, “ওহ, আচ্ছা। আমি জানতাম না ও এতটা কনজারভেটিভ। ঠিক আছে তান্বী, নম্বর না থাকলেও সমস্যা নেই।”

লুসিয়া মনে তখন হাহাকার—তবে কি ফারহান ওকে কোনোদিন আপন করে নেবে না? কেবল ‘মেক্সিকান মেয়ে’ বলেই কি সে ওকে এভাবে মাঝপথে ফেলে হারিয়ে গেল?

লুসিয়া চলে যেতে চেয়েও থেমে গেল তান্বীর ডাকে। তান্বীর চোখেমুখে এক চরম দ্বিধা আর অস্বস্তি। সে আমতা-আমতা করে বলল, “লুচি আপা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব? যদিও বিষয়টা খুবই ব্যক্তিগত, কিন্তু বলাটা বোধহয় জরুরি। এই বাড়িতে আপনি ছাড়া আমি আর কাউকে এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।”

লুসিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে তান্বীর হাত ধরল। ওর কম্পিত হাতের স্পর্শ দেখে লুসিয়া বুঝতে পারল মেয়েটা কোনো বড় ধাক্কা খেয়েছে। লুসিয়া নরম গলায় বলল, “বলো তান্বী, কী হয়েছে? তুমি কি খুব ভয় পাচ্ছো?”

তান্বী বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ম্লান স্বরে বলল, “আপনার ভাই কাল রাতে আমাকে একটা সারপ্রাইজ দিয়েছেন। কিন্তু ওটা সারপ্রাইজ ছিল না, ছিল এক বিভীষিকা। তিনি আমাকে একটা অদ্ভুত রুমে নিয়ে গিয়েছিলেন। রুমের মাঝখানে আকাশী রঙের একটা ওয়াটার ম্যাট্রেস ছিল, আর আশেপাশে এমন সব জিনিস সাজানো ছিল যা আমি জীবনে কোনোদিন দেখিনি। শুধু হ্যান্ডকাফ আমি চিনতে পেরেছি। তিনি… তিনি আমার সাথে খুব অদ্ভুত আচরণ করেছেন।”

তান্বীর কথাগুলো শুনে লুসিয়ার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সে যেন বজ্রাহত হলো। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “হোয়াট? জাভি ব্রো তোমাকে ওসব রুমে নিয়ে গেছে? তার মানে কি তিনি তোমার ওপর ওগুলো এক্সপেরিমেন্ট করেছেন?”

তান্বী মাথা নিচু করে শুধু বলল, “হ্যাঁ।”

লুসিয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তার চোখে বিস্ময় আর আতঙ্ক। সে বিড়বিড় করে বলল, “ওহ গড! তার মানে কি জাভি ব্রো সত্যিই BDSM-এ আসক্ত? সে কি ফ্যান্টাসি আর রিয়ালিটির পার্থক্য ভুলে গেছে?”

“BDSM?” তান্বী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। এই শব্দটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। “এটা আবার কী লুচি আপা?”

লুসিয়া বুঝতে পারল তান্বী কতটা সরল। এই আধুনিক আর অন্ধকার জগত সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই নেই। লুসিয়া কথা না বাড়িয়ে নিজের ফোনটা বের করল। গুগলে গিয়ে সে সংক্ষেপে সার্চ দিয়ে কিছু আর্টিকেলের ছবি আর ডেসক্রিপশন তান্বীর সামনে ধরল।

সে তান্বীকে বুঝিয়ে বলল, “শোনো তান্বী, BDSM মানে হলো—Bondage and Discipline (শিকল ও শাসন), Dominance and Submission (আধিপত্য ও সমর্পণ), আর Sadism and Masochism (পরকে কষ্ট দিয়ে বা নিজে কষ্ট পেয়ে আনন্দ পাওয়া)। সহজ কথায়, এটা শারীরিক সম্পর্কের এমন এক ধরণ যেখানে সঙ্গী অন্যকে বেঁধে বা শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে তৃপ্তি পায়। জাভি ব্রো হয়তো মানসিকভাবে এই বন্য ফ্যান্টাসিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।”

ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সেই বীভৎস বর্ণনা আর ছবিগুলো দেখে তান্বীর শরীর রি রি করে উঠল। গত রাতের প্রতিটি মুহূর্ত ওর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিল জাভিয়ানের সেই শীতল চাহনি, সেই রেকর্ডিং, আর হ্যান্ডকাফের টুংটাং শব্দ।

তান্বীর চোখেমুখে তখন রাজ্যের অন্ধকার। লুসিয়ার ব্যাখ্যা করা শব্দগুলো ওর কানে বারুদের মতো বিঁধছিল। ও কোনোভাবেই মেলাতে পারছিল না যে, যে লোকটা ওর জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে লড়তে পারে, সে লোকটা চার দেয়ালের ভেতরে ওকে এভাবে যন্ত্রণায় নীল করতে পারে কী করে!

লুসিয়া তান্বীর দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল। ওর গলায় এবার সহমর্মিতার সুর। লুসিয়া নিচু স্বরে বলতে শুরু করল “শোনো তান্বী, ভেঙে পড়ো না। জাভি ব্রো তোমাকে অনেক ভালোবাসে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই বিডিএসএম (BDSM) বা এই বন্যতার সাথে ভালোবাসার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এটাকে ভালোবাসা বা ঘৃণার দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায় না।”

তান্বী ভিজে গলায় প্রশ্ন করল, “তাহলে এটা কী লুচি আপা? কেন তিনি এমন করেন?”

লুসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এটা একটা সাইকোলজিক্যাল সমস্যা বা মানসিক জটিলতা বলতে পারো। জাভি ব্রো ছোটবেলা থেকেই এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। বড় হওয়ার পর চারপাশের শত্রু, আর ক্ষমতার লড়াই ওকে হয়তো ভেতরে ভেতরে খুব একা আর কঠোর করে দিয়েছে। অনেক সময় মানুষ যখন বাইরের পৃথিবীতে সব নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখে, তখন ব্যক্তিগত জীবনেও সে চরম আধিপত্য বা ‘ডমিন্যান্স’ চায়। ও হয়তো অবচেতন মনে যন্ত্রণা আর শাসনের মধ্যেই পরম তৃপ্তি খুঁজে পায়।”

তান্বী স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। লুসিয়া আরও যোগ করল—
“ও তোমাকে আঘাত করেনা তান্বী, বরং ও তোমাকে এতটাই নিজের করে পেতে চায় যে ওটা একটা অবসেশনে পরিণত হয়েছে। তবে হ্যাঁ, ওর এই নেশাটা সুস্থ স্বাভাবিক কোনো আচরণ নয়। এটা এক ধরণের মানসিক আসক্তি, যেখানে ও তোমাকে শাসন করে শান্তি পায়।”

তান্বী ওর কবজির সেই লাল দাগগুলোর দিকে তাকাল। কাল রাতের সেই রেকর্ডিংয়ের কথা মনে পড়তেই ওর শরীর আবার রি রি করে উঠল। ও বুঝতে পারল, জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী আসলে এক দ্বৈত চরিত্রের মানুষ। দিনের আলোয় সে রক্ষক, আর রাতের অন্ধকারে সে এক ভয়ংকর শিকারি।

লুসিয়া তান্বীর হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। “ভয় পেয়ো না। জাভি ব্রো তোমাকে আগলে রাখবে ঠিকই, কিন্তু ওর এই ডার্ক সাইডটা তোমাকে সহ্য করতে হবে নয়তো ওকে পাল্টানোর চেষ্টা করতে হবে। যদিও জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীকে পাল্টানো প্রায় অসম্ভব।”

তান্বী জানালার বাইরে মেক্সিকোর রোদেলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
.
.
.
মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত চৌধুরী এম্পায়ারের বিশাল কনফারেন্স রুম। চারদিকে কাঁচের দেয়াল, বাইরে বিকেলের রোদে মেক্সিকোর ব্যস্ত শহরটাকে মরীচিকার মতো লাগছে। ভেতরে তখন মেক্সিকান আর ইউরোপীয় ক্লায়েন্টদের সাথে জাভিয়ানের এক ম্যারাথন মিটিং চলছে। রায়হান পাশে বসে ল্যাপটপে সব ডেটা চেক করছে, আর বড় বড় ডিল নিয়ে ক্লায়েন্টরা একঘেয়ে আলোচনা করে যাচ্ছে।
জাভিয়ানের মেজাজ আজ ভীষণ খিটখিটে। এই বিজনেস প্রপোজাল, গ্রাফ আর লাভ-ক্ষতির হিসেবগুলো ওর কাছে আজ অসহ্য রকমের বোরিং লাগছে। ওর মস্তিষ্কের একটা বড় অংশ তখনো পড়ে আছে ভিলা এস্পেরেন্জার সেই লাল আলোয় ঘেরা ঘরে, যেখানে কাল রাতে সে এক অজেয় বিজয়ীর মতো রাজত্ব করেছিল।

হঠাৎ করেই জাভিয়ান সবার কথা অগ্রাহ্য করে নিজের ড্রয়ার থেকে দামি নয়েজ-ক্যানসেলেশন হেডফোনটা বের করল। ক্লায়েন্টরা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালেও কারও সাহস হলো না প্রশ্ন করার। রায়হানও কিছুটা থতমত খেয়ে গেল।

জাভিয়ান হেডফোনটা কানে লাগিয়ে ফোনের সিকিউর ফোল্ডার থেকে সেই ফাইলটা প্লে করল—’ডিজায়ার রেকর্ডিং’।

পরমুহূর্তেই ক্লায়েন্টদের কর্কশ গলার আওয়াজ ছাপিয়ে জাভিয়ানের কানে এক অন্য জগতের সুর বেজে উঠল। প্রথমে সেই পরিচিত হ্যান্ডকাফের টুংটাং শব্দ, আর তারপরই তান্বীর সেই করুণ কিন্তু মায়াবী আর্তনাদ—”না জাভিয়ান… দয়া করে আর না!”

জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে পৈশাচিক কিন্তু তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজল। রেকর্ডিংয়ের সময় যত গড়াচ্ছে, শব্দের তীব্রতা তত বাড়ছে। ওয়াটার ম্যাট্রেসের দুলুনির সাথে তান্বীর সেই যন্ত্রণামাখা কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত আবেশে বদলে যেতে শুরু করল। যন্ত্রণার সেই প্রথম ধাক্কাটা যখন কেটে গেল, তখন তান্বীর গলার স্বরে এক অবাধ্য সুখের আবেশ ফুটে উঠল। সেই নিবিড় গোঙানি, সেই অস্ফুট শীৎকার যা জাভিয়ানের রক্তের তেজকে মুহূর্তে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।

ক্লায়েন্টরা তখনো সিরিয়াসলি কোনো একটা প্রজেক্ট বোঝাচ্ছে, কিন্তু জাভিয়ান এখন পুরোই অন্য গ্রহে। ওর কানে তখন তান্বীর সেই এলোমেলো নিশ্বাসের শব্দগুলো আছড়ে পড়ছে। সে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে হ্যান্ডকাফে বন্দি তান্বীর সেই ঘর্মাক্ত শরীর, ওর বাঁক নেওয়া দেহভঙ্গি।

রায়হান পাশ থেকে নিচু স্বরে ডাকল, “স্যার? ওরা আপনার সিগনেচার চাইছে…”

জাভিয়ান হেডফোনটা কান থেকে না খুলেই কেবল হাত দিয়ে ইশারা করল থামার জন্য। সে এখন এই শব্দের নেশা থেকে বের হতে পারছে না। ওর কাছে মনে হচ্ছে, এই কোটি টাকার ডিলের চেয়েও ওই রেকর্ডিংয়ে তান্বীর পরাজয়ের সুরটা অনেক বেশি দামী।

জাভিয়ান বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল, “জিন্নীয়া… তুমি জানোই না তোমার এই শব্দগুলো আমাকে কতটা উন্মাদ করে দেয়। এই নেশা থেকে মুক্তি আমার নেই, আর তোমারও নেই।”

কনফারেন্স রুমের ভারী এসির বাতাসও জাভিয়ানের ভেতরের উত্তাপ কমাতে পারছিল না। ক্লায়েন্টদের কণ্ঠস্বরগুলো ওর কানে এখন অর্থহীন কোলাহলের মতো বাজছে। হেডফোনে তান্বীর সেই রেকর্ডেড গোঙানি ওর মস্তিষ্কের প্রতিটি শিরায় এক অদ্ভুত উন্মাদনা তৈরি করেছে। জাভিয়ান আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর এই আকস্মিক প্রস্থানে পুরো কামরায় এক নিস্তব্ধতা নেমে এল, কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার মতো মানসিক অবস্থায় সে নেই। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে সে করিডোরের শেষ প্রান্তে থাকা ব্যক্তিগত রেস্টরুমে গিয়ে ঢুকল।

ভারী দরজাটা আটকে দিয়ে জাভিয়ান আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর দৃষ্টি তখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত। সে অনুভব করল, তার শরীরের রক্তপ্রবাহ এক অবাধ্য ছন্দে ধাবিত হচ্ছে। পকেট থেকে ফোন বের করে সে সরাসরি তান্বীকে কল করল।

ওপাশে তখন মেক্সিকোর সোনালী বিকেলে তান্বী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ফোনের তীক্ষ্ণ আওয়াজে যখন তার ঘুম ভাঙল, তখন ঘরের আবহাওয়া এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় ঘেরা। সে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ফোনটা রিসিভ করে খুব নিচু, ভাঙা আর নেশালু গলায় বলল—
“হ্যালো…”

তান্বীর সেই ঘুমজড়ানো কন্ঠস্বরের প্রতিটি কম্পন জাভিয়ানের কানে কোনো নিষিদ্ধ সুরের মতো আছড়ে পড়ল। এই একটা শব্দই জাভিয়ানের ধৈর্যের শেষ বাঁধটা ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। জাভিয়ান নিজের শার্টের কলারটা টেনে আলগা করে দিল। ওর এক হাত অবচেতনেই নিজের শরীরের সেই তীব্র অস্থিরতা দমনে ব্যস্ত হয়ে উঠল। পোশাকের আবরণের নিচেই সে নিজের কামনার চরম বহিঃপ্রকাশের পথে হাঁটতে শুরু করল, যেখানে শরীরের প্রতিটি পেশি এক অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক তৃপ্তিতে ধনুকের মতো টানটান হয়ে উঠছে।

“জিন্নীয়া…” জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর তখন গভীর আর ফ্যাসফ্যাসে। “ভিডিও মোডে আসো। এখনই।”

তান্বী ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। ওর অবিন্যস্ত চুল আর গালের ওপর পড়ে থাকা বিকেলের রোদে ওকে কোনো প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়িকার মতো সুন্দর দেখাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “আপনি এখন অফিসে না? কেন হুট করে…”

“আমার কথার অবাধ্য হয়েওনা প্লিজ” জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর এখন নিয়ন্ত্রিত ঝড়ের মতো। “আমি তোমাকে এই মুহূর্তেই দেখতে চাই। তোমার ওই বিভ্রান্ত চোখ আর এলোমেলো বেশের প্রতিটি ইঞ্চিতে আজ আমার দৃষ্টি বিচরণ করবে।”

তান্বী কাঁপতে কাঁপতে ভিডিও কলটি অন করল। স্ক্রিনে জাভিয়ানের সেই তপ্ত, ঘর্মাক্ত মুখ আর শিকারি চাউনি দেখে ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। ওপাশে জাভিয়ান তখন নিজের আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত সোপানে দাঁড়িয়ে। সে স্ক্রিনে তান্বীর উন্মুক্ত কাঁধ আর গলার সেই লালচে দাগগুলোর ওপর দৃষ্টি স্থির করে রাখল।

জাভিয়ান নিজের হাতের সঞ্চালন বাড়াতে বাড়াতে এক অদ্ভুত ঘোরে বিড়বিড় করে বলল, “শাড়িটা একটু সরাও জিন্নীয়া। আমি দেখতে চাই আমার অধিকার তোমার শরীরে কতটা গভীরে ছাপ রেখে গেছে। আজ দূর থেকেও আমি তোমাকে নিজের করে নেব।”

চলবে………..
(এই পর্বটা ইচ্ছা ছিলো রোজার আগের দিন দেয়ার কিন্তু রিচেক করতে সময় লেগে গিয়েছিল পরবর্তি পর্ব আসবে ২ হাজার+ রিয়েক্ট হলে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply