ডিজায়ার_আনলিশড
✍️ #সাবিলা_সাবি
পর্ব: ৩২
WARNING: This chapter contains explicit content, intense romantic scenes, and adult themes (18+). Reader discretion is strongly advised.
মেক্সিকো সিটির আকাশটা আজ তামাটে রঙের। অফিসের কাঁচঘেরা কেবিনে বসে জাভিয়ান শেষ মুহূর্তের নথিপত্রগুলো যাচাই করে নিচ্ছিল। পারফিউম সাম্রাজ্যের প্রতিটি খুঁটিনাটি আজ সে রায়হানের জিম্মায় ছেড়ে দিচ্ছে। রায়হান যখন কেবিনে ঢুকল, জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত আর দৃষ্টিতে এক অনড় সংকল্প।
“রায়হান, লজিস্টিকস থেকে অপারেশন—সব এখন তোমার হাতে। আমি আগামী কয়েকদিন একদম ‘অফ গ্রিড’ থাকছি। কোনো ফোন কল, কোনো ইমার্জেন্সি যেন আমার আর জিন্নীয়ার মাঝখানে না আসে,” জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর ধারালো তরবারির মতোই শোনালো।
রায়হান ডেস্কে সই করা ফাইলগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে একটু বাঁকা হেসে বলল, “সবই তো বুঝলাম স্যার, কিন্তু আমার একটা কথা ছিল। এবার অন্তত বাসরটা করেই ফিরুন। অনেক তো হলো!”
জাভিয়ান ফাইল থেকে চোখ তুলে রায়হানের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে সরু হাসির রেখা টেনে বলল, “আমার বাসর দেখার জন্য দেখছি আমার চেয়েও বেশি তুমি এক্সাইটেড, না?”
রায়হান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রসিকতার সুরে বলল, “কী আর করব স্যার? আমার কপালে তো আর এই জনমে বউ জুটবে বলে মনে হচ্ছে না আপনি বেঁচে থাকতে। তাই অন্যজনের বাসর নিয়েই যত চিন্তা।”
জাভিয়ানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে এল। জানালার ওপাশে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তান্বী এখন মেন্টালি সিক, রায়হান। ওর ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, তাতে এখন এসব ভাবা একদম ঠিক হবে না।”
রায়হান এবার অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেলল, “স্যার! আপনি কিভাবে থাকেন বলেন তো? এতগুলো মাস হয়ে গেল, অথচ আপনি নিজেকে এভাবে কন্ট্রোল করে আছেন?”
জাভিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতাই বুঝিয়ে দিল, তান্বীর প্রতি তার ভালোবাসা কেবল শরীরী তৃষ্ণায় সীমাবদ্ধ নয়। দায়িত্বের বোঝা অন্যের কাঁধে ঝেড়ে ফেলে জাভিয়ান যখন ভিলা এস্পেরেন্জার দোরগোড়ায় পৌঁছাল, তখন সন্ধার আলোয় ভিলাটা এক রহস্যময় প্রাসাদের মতো ঝকঝক করছে।
রুমে ঢুকে জাভিয়ান দেখল তান্বী অর্থাৎ তার জিন্নীয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। জাভিয়ানকে দেখামাত্রই তান্বী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সব ভয় আর ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে সে দ্রুত এসে জাভিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে তান্বী যেন দীর্ঘদিনের হারানো কোনো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল। জাভিয়ানও পরম মমতায় ওকে বাহুবন্দী করল।
জাভিয়ান আলতো করে তান্বীর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “তান্বী… শান্ত হও। আমরা এখনই বের হচ্ছি। আমি আমার প্রয়োজনীয় কয়েকটা শার্ট প্যান্ট গুছিয়ে নিয়েছি, কিন্তু তোমার কোনো ব্যাগ নিতে হবে না। সব পুরনো মায়া আজ আমরা এই ভিলাতেই ফেলে যাব। চলো, তোমাকে নিয়ে এক নতুন জীবনের পথে রওনা হই।”
তান্বী কোনো প্রশ্ন করল না। জাভিয়ানের এই অধিকারবোধ এখন ওর কাছে পরম আশ্রয়ের মতো। গাড়ি যখন মেক্সিকোর সবচেয়ে দামী এবং নান্দনিক শপিং মল ‘লা গ্রান প্লাজা’-র সামনে এসে থামল, জাভিয়ান তান্বীর হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল।
মলের ভেতরে ঢোকার পর জাভিয়ান এক জহুরির মতোই হয়ে উঠলো, যে তার শ্রেষ্ঠ রত্নটিকে সাজানোর জন্য অস্থির। সেলস গার্লরা এগিয়ে আসতে চাইলেও জাভিয়ান হাত তুলে বারণ করে দিল। সে নিজেই নিজের পছন্দে তান্বীর জন্য পোশাক বেছে নিতে শুরু করল।
শপিং মলের উজ্জ্বল আলোর নিচে জাভিয়ান একের পর এক দামী পোশাক দেখছিল। তার চোখ আটকে গেল একটি চমৎকার এমব্রয়ডারি করা গাউনে। সে তান্বীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “জিন্নীয়া, এই ড্রেসটা একবার ট্রায়াল দিয়ে দেখো তো।”
তান্বী নিঃশব্দে ড্রেসটা নিয়ে ট্রায়াল রুমের দিকে এগিয়ে গেল। জাভিয়ান ট্রায়াল রুমের বাইরে পকেটে হাত দিয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তান্বীকে হেল্প করার জন্য ভেতরে একজন সেলস গার্ল আগে থেকেই ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে অন্য একজন কর্মী উচ্চস্বরে ডেকে উঠল, “এলিনা! এদিকে শোনো!”
‘এলিনা’ নামটা কানে পৌঁছানো মাত্রই তান্বীর হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল। এক নিমেষে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বোন এলিনা আর ভ্যালেরিয়ার মুখ। সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি, যা সে মন থেকে মুছে ফেলতে চাইছিল, তা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। বুক চিরে এক তীব্র হাহাকার বেরিয়ে এল ওর। তান্বী ট্রায়াল রুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
বাইরে থাকা অন্য এক সেলস গার্ল ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনে ঘাবড়ে গেল। সে দ্রুত জাভিয়ানের কাছে গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “স্যার, ম্যাম হঠাৎ খুব জোরে কাঁদছেন!”
কথাটা শোনা মাত্রই জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ওর শান্ত চোখ দুটো মুহূর্তেই রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ট্রায়াল রুমের দরজার দিকে এগোল। সেলস গার্লটি ভয়ে সামনে এসে হাত বাড়িয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, “স্যার, প্লিজ! ভেতরে যাবেন না, ওটা মেয়েদের ট্রায়াল রুম—”
“গেট আউট!” জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার দিয়ে উঠল। এক ধাক্কায় মেয়েটিকে সরিয়ে দিয়ে সে দরজায় লাথি মেরে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে ঢুকেই সে দেখল তান্বী মেঝেতে বসে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কাঁদছে। জাভিয়ানের বুকটা যেন কেউ চিরে ফেলল। সে দ্রুত তান্বীকে টেনে নিজের শক্ত বুকের মাঝে নিয়ে এল। “জিন্নীয়া! কী হয়েছে তোমার? শান্ত হও, আমি আছি তো!” জাভিয়ান ওর চুলে হাত বুলিয়ে ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তান্বীর কান্না থামছিল না।
জাভিয়ানের মাথা তখন রাগে কাজ করছিল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ‘এলিনা’ নামের সেলস গার্লটি ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। জাভিয়ান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পকেট থেকে নিজের রিভলভার বের করল। চোখের পলকে সে এলিনার কপালে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে গর্জে উঠল, “কী করেছিস তুই আমার জিন্নীয়ার সাথে? কী বলেছিস ওকে যে ও এভাবে কাঁদছে? সত্যি কথা বল, নাহলে তোর লা/শ এখানেই পড়বে!”
এলিনা ভয়ে কথা বলতে পারছিল না, তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল। পুরো শপিং মলে তখন এক আতঙ্কিত নিস্তব্ধতা নেমে এল।
.
.
.
জাভিয়ানের হাতের বন্দুকটা এলিনার কপালে সজোরে চেপে বসে আছে। ওর আঙুল ট্রিগারে স্থির, আর চোখেমুখে খু/নির আবেশ। পুরো শপিং মলের কর্মীরা ভয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে এই দৃশ্য। ঠিক তখনই তান্বী জাভিয়ানের হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। ওর গলার স্বর কান্নায় ভারী হয়ে আসলেও সে জাভিয়ানকে থামানোর জন্য চিৎকার করে উঠল।
“জাভিয়ান! থামুন! প্লিজ বন্দুকটা নামান!” তান্বী ওর হাতের ওপর নিজের হাত রেখে টেনে নামানোর চেষ্টা করল।
জাভিয়ান তখনো রাগে ফুঁসছে। সে তান্বীর দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, “কেন থামব জিন্নীয়া? এই মেয়েটা নিশ্চয়ই তোমাকে কিছু বলেছে! কেউ আমার জিন্নীয়ার চোখে পানি আনলে আমি তাকে জ্যান্ত রাখব না!”
তান্বী এবার জাভিয়ানের সামনে এসে ওর বুকে হাত রাখল। ধরা গলায় বলল, “না জাভিয়ান, ও কিছু করেনি। আমি শুধু এই মেয়েটির নাম শুনে কেঁদেছি। ওর নাম এলিনা, আর সেই নামটা শোনার পর আমার বোনের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ও একদম নির্দোষ।”
তান্বীর মুখে ‘এলিনা’ নামটা শুনে জাভিয়ানের রাগ কম তো হলোই না, বরং আরও বেড়ে গেল। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানেজারের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গর্জে উঠল, “আমার জিন্নীয়ার সামনে কেন এলিনা নাম উচ্চারণ করা হলো? জানো না এই নামটা ওর জন্য কতটা যন্ত্রণার? তোমাদের সাহস কী করে হয় ওর সামনে এই নাম ডাকার?”
শপিং মলের ম্যানেজার কাঁপতে কাঁপতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এলিনা নামের মেয়েটি তখন ভয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। জাভিয়ান যখন আবারও বন্দুকটা উঁচিয়ে ওদের দিকে এগোতে চাইল, তখন তান্বী তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“জাভিয়ান, প্লিজ শান্ত হন! ওনাদের কী দোষ? ওনারা তো আর জানতেন না যে এই নামটা আমার অতীতকে মনে করিয়ে দেবে। ওনারা তো শুধু নিজেদের কাজ করছিলেন। আমার জন্য কোনো নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করবেননা, দোহাই আপনার!”
তান্বীর আকুতি আর ওর শরীরের কম্পন জাভিয়ান অনুভব করতে পারল। তান্বীর এই মিনতি জাভিয়ানের ভেতরের আগুনটাকে কিছুটা হলেও স্তিমিত করল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্দুকটা নামিয়ে নিলো এবং পকেটে পুরল। তবে ওর চোখ থেকে হিংস্রতা তখনো পুরোপুরি যায়নি। সে এলিনার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলল, “আজ শুধু আমার জিন্নীয়ার জন্য তোকে ছেড়ে দিলাম। সামনে থেকে সরে যা!”
মেয়েটি এক মুহূর্ত দেরি না করে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। জাভিয়ান এবার তান্বীর মুখটা দুহাতে তুলে ধরল। ওর ভেজা চোখ দুটো মুছে দিয়ে নরম স্বরে বলল, “দুঃখিত জিন্নীয়া, তোমাকে শান্ত করতে গিয়ে আমি নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। চলো, এখান থেকে বের হই। এ শহর আমাদের জন্য নয়।”
জাভিয়ান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। বাছাবাছি করার মেজাজ তখন ওর পুরোপুরি উধাও। সে শোরুমের ম্যানেজারকে আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করে বলল, “সবগুলো ড্রেস প্যাক করো। একটাও যেন বাদ না পড়ে।”
ম্যানেজার জান হাতে নিয়ে দ্রুত সব ড্রেস প্যাকেট করতে শুরু করল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দামী দামী ব্র্যান্ডের ডজনখানেক শপিং ব্যাগ জাভিয়ানের সামনে হাজির করা হলো। জাভিয়ান কারো দিকে না তাকিয়ে এক হাতে তান্বীকে আগলে ধরে অন্য হাতে ব্যাগগুলো নিয়ে গটগট করে মল থেকে বেরিয়ে এল।
পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙের ল্যান্ড রোভারের পেছনের সিটে ব্যাগগুলো ছুঁড়ে দিয়ে সে তান্বীকে সযত্নে সিটে বসিয়ে দিল। নিজে বসার আগে একবার তান্বীর দিকে তাকাল। তান্বী তখনো জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, ওর চোখের কোণে লেগে থাকা জল তখনো শুকায়নি।
জাভিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে বসলো। ড্রাইভার তখন গাড়ি টান দিল। শপিং মলের সেই কোলাহল আর ‘এলিনা’ নামের সেই যন্ত্রণাময় স্মৃতিকে পেছনে ফেলে গাড়িটা হাইওয়েতে উঠে পড়ল। মেক্সিকো সিটির ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে গাড়ি যখন খোলা রাস্তার দিকে ধাবিত হলো, জাভিয়ান তান্বীর এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল।
শান্ত কিন্তু গভীর স্বরে জাভিয়ান বলল, “জিন্নীয়া, ওটা কেবল একটা নাম ছিল। ওটা তোমার বোন ছিল না। আমি কথা দিচ্ছি, যেখানে আমরা যাচ্ছি সেখানে আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। সেখানে কোনো নাম তোমাকে কাঁদাতে পারবে না।”
তান্বী কোনো উত্তর দিল না, শুধু জাভিয়ানের হাতের ওপর নিজের আঙুলগুলো আলতো করে চেপে ধরল। ওর নীরবতাই বলে দিচ্ছিল, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে জাভিয়ানই এখন ওর একমাত্র ধ্রুবতারা।
গাড়িটা হু হু শব্দে বাতাসের বুক চিরে এগিয়ে চলল। দুপাশের রুক্ষ জমি আর ক্যাকটাসের সারি পেরিয়ে সামনে বড় বড় পাহাড়ের আবছা ছায়া দেখা যাচ্ছে। মেঘে ঢাকা সেই পাহাড়ের চূড়াতেই অপেক্ষা করছে ওদের এক টুকরো একান্ত পৃথিবী।
মেক্সিকো সিটির কোলাহল আর বিষাক্ত স্মৃতিগুলো কয়েকশ মাইল পেছনে ফেলে জাভিয়ানের ল্যান্ড রোভার এখন এক নির্জন পাহাড়ী উপত্যকায়। একদিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের চূড়া আর অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি। পাহাড় আর সমুদ্র যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল লাক্সারি রিসোর্ট— ‘দ্য ওশান রিট্রিট’।
পুরো রিসোর্টটি জাভিয়ান আগামী এক সপ্তাহের জন্য বুক করে নিয়েছে। এখানে আজ তারা দুজন ছাড়া আর কোনো পর্যটক নেই। এমনকি রিসোর্টের কর্মীদেরও জাভিয়ান কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছে, প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন তাদের আশেপাশে না আসে।
গাড়িটা রিসোর্টের মূল প্রবেশপথে থামতেই ইউনিফর্ম পরা কর্মীরা মাথা নিচু করে দাঁড়াল। জাভিয়ান নিজেই নেমে তান্বীর পাশের দরজা খুলে দিল। সমুদ্রের নোনা বাতাস আর পাহাড়ের শীতল হাওয়া তান্বীর অবিন্যস্ত চুলে এসে লাগছে। জাভিয়ান ওর হাত ধরে রিসোর্টের সবচেয়ে রাজকীয় ‘প্রেসিডেন্সিয়াল সুইট’-এর দিকে নিয়ে গেল।
সুইটটি পাহাড়ের একেবারে কিনারায় অবস্থিত। এর বিশাল বারান্দা থেকে তাকালে মনে হয়, পা বাড়ালেই গভীর সমুদ্রে আছড়ে পড়া যাবে। ঘরের ভেতরে দামী ফার্নিচার, সুগন্ধি মোম আর নরম আলোর এক মায়াবী পরিবেশ।
জাভিয়ান শপিং ব্যাগগুলো ঘরের এক কোণে রেখে তান্বীকে বারান্দায় নিয়ে এল। নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে সাদা ফেনা তৈরি করছে। জাভিয়ান পেছন থেকে তান্বীকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে চিবুক রাখল।
“জিন্নীয়া, তাকাও ওদিকে। ওই যে দিগন্ত যেখানে সমুদ্র আর আকাশ মিশে গেছে আজ থেকে ওই আকাশটার মতোই আমি তোমার পাশে থাকব। কোনো এলিনা, কোনো ভয় আজ এই সীমানা পার হতে পারবে না। পুরো রিসোর্টটা এখন শুধু তোমার আর আমার।”
তান্বী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাভিয়ানের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। এই পাহাড়ী নির্জনতা আর সমুদ্রের গর্জন ওর মনের সব হাহাকার যেন শুষে নিচ্ছে। সে আলতো স্বরে বলল, “সবকিছু এত সুন্দর যে আমার ভয় লাগছে জাভিয়ান। মনে হচ্ছে এটা কোনো স্বপ্ন, যা চোখ খুললেই ভেঙে যাবে।”
জাভিয়ান ওর ঘাড়ের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, “এটা স্বপ্ন নয় জিন্নীয়া, এটাই তোমার বর্তমান। আজ থেকে তোমার সব ভয় আমার, আর আমার সবটুকু শান্তি তোমার।”
জাভিয়ান আলতো করে ওকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করল। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত নেশা। সে প্যাকেটগুলোর দিকে ইশারা করে বলল, “যাও, ফ্রেস হয়ে নাও। আমি চাই আজ রাতে ডিনারে তুমি আমার নিজের হাতে কেনা ওই মেরুন শাড়িটা পড়ো। আমি তোমার জন্য বারান্দায় ডিনারের ব্যবস্থা করছি।”
তান্বী ম্লান হেসে ড্রেসটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। জাভিয়ান তাকিয়ে রইল ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে। ওর মনে তখন এক অস্থির ইচ্ছা—আজ রাতেই সে তান্বীর মনের সব অন্ধকার মুছে দিয়ে সেখানে নিজের নাম চিরস্থায়ী করে লিখে দেবে।
পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই রিসোর্টটিতে রাত নেমেছে এক আদিম নির্জনতা মেখে। বাইরে সমুদ্রের উত্তাল গর্জন আর পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়া বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ মিলে এক অদ্ভূত আবহ তৈরি করেছে। বারান্দায় জাভিয়ান একাই দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশের বুক চিরে রূপালি চাঁদটা সমুদ্রের জলে নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজছে। জাভিয়ানের পরনে গাঢ় কালো শার্ট, উপরের দুটো বোতাম খোলা, হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। পকেট থেকে একটি চুরুট বের করেও সে আবার রেখে দিল; মনে পড়ল ওর জিন্নীয়া ধোঁয়ার গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না।
ঠিক তখনই পেছনে স্লাইডিং ডোরের মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হলো। জাভিয়ান ফিরে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল সে।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তান্বী। জাভিয়ানের নিজের হাতে বেছে নেওয়া সেই রক্তিম মেরুন রঙের শাড়িটা জড়িয়েছে সে। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে ওর উন্মুক্ত ফর্সা হাত দুটো চাঁদের আলোয় মোমের মতো চিকচিক করছে। পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা অবিন্যস্ত ভেজা চুল আর কপালে বসানো একটি ছোট্ট কালো টিপ—এই সাধারণ সাজেই তান্বীকে কোনো এক মেঘবতী অপ্সরার মতো লাগছে।
জাভিয়ান মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর দিকে এগিয়ে এল। তান্বী কিছুটা লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে নিজের আঙুল দিয়ে শাড়ির পাড় নিয়ে খেলা করছে। জাভিয়ান ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তান্বীর গায়ের সেই চিরচেনা সতেজ ঘ্রাণ জাভিয়ানের মস্তিষ্কে মৃদু নেশার জাল বুনছে।
জাভিয়ান নিচু স্বরে বলল, “আমি জানতাম এই রঙটা তোমাকে মানাবে, কিন্তু তুমি যে আমার হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নেবে—সেটা ভাবিনি জিন্নীয়া।”
তান্বী মুখ তুলে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাতেই দেখল সেখানে এক গভীর অধিকারবোধ আর অবদমিত তৃষ্ণা। জাভিয়ান আলতো করে তান্বীর চিবুক স্পর্শ করে মুখটা একটু উপরে তুলল। তারপর ওর কানের লতির খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজকের এই রাত, এই নির্জন পাহাড় আর ওই অতল সমুদ্র—সবাই সাক্ষী থাকছে যে তুমি কেবলই আমার। পৃথিবীর কোনো শক্তি আজ তোমাকে আমার কাছ থেকে আড়াল করার ধৃষ্টতা দেখাবে না।”
জাভিয়ান তান্বীর হাত ধরে বারান্দার সেই বিশেষ ডিনার টেবিলের দিকে নিয়ে গেল। টেবিলটি সাদা গোলাপ আর সুগন্ধি মোমবাতি দিয়ে সাজানো। জাভিয়ান নিজে চেয়ার টেনে তান্বীকে বসিয়ে দিল। এরপর সে পাশের সোফা থেকে তার প্রিয় গিটারটি তুলে নিল। গিটারের তারে আঙুল বুলিয়ে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ অথচ সুন্দর সুর তুলল সে।
জাভিয়ান তান্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “সারাদিন তো নন-স্টপ রেডিওর মতো বকবক শোনাও। আজ না হয় এই নিস্তব্ধতায় একটা গান শোনাও আমাকে?”
তান্বী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আমি গান গাইতে পারি না জাভিয়ান। কোনোদিন গাইনি।”
জাভিয়ান গিটারের তারে আরেকটা টুং করে শব্দ তুলে গভীর চোখে ওর দিকে তাকাল। ওর কণ্ঠে তখন নেশাতুর এক মাদকতা। সে বলল, “সুর মিলুক বা না মিলুক—সেটা বড় কথা নয় তান্বী। যেভাবে খুশি গাও। আমি সুর শুনতে চাই না, আমি শুধু তোমার ওই গোলাপী ঠোঁটের নড়াচড়া দেখতে চাই। এই পাহাড়ের নির্জনতায় ওটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।”
মোমবাতির শিখাগুলো পাহাড়ি হাওয়ায় সামান্য কাঁপছে। তান্বী চোখ বুজে খুব নিচু আর নরম গলায় প্রথম লাইনটা ধরল—”জীবন ছিল নদীর মতো গতিহারা…”
লাইনটা শোনা মাত্রই জাভিয়ানের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে তান্বীর সুরের সাথে একদম নিখুঁতভাবে তাল মিলিয়ে গিটারের তারে আঙুল চালাল। টুংটাং শব্দে গিটারের সুর যেন পাহাড়ের বুক চিরে সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল।
তান্বী এবার আত্মবিশ্বাসের সাথে পরবর্তী লাইনগুলো গাইতে শুরু করল: “তোমার আকাশ দুটি চোখে, আমি হয়ে গেছি তারা। এই জীবন ছিল নদীর মতো গতিহারা, দিশাহারা…
ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে আমি হয়ে গেছি তারা।”
জাভিয়ান গিটার বাজাতে বাজাতে অপলক দৃষ্টিতে তান্বীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মোমের আলোয় তান্বীর মেরুন শাড়ি আর ওর মুখের স্নিগ্ধতা যেন জাভিয়ানকে কোনো এক স্বপ্নের ঘোরে নিয়ে যাচ্ছে।
তান্বী সুরের মায়ায় ডুবে পরবর্তী অন্তরা ধরল:”আগে ছিল শুধু পরিচয়, পরে হলো মন বিনিময়…শুভ লগ্নে হয়ে গেল শুভ পরিণয়। আজ যখনই ডাকি জানি তুমি দেবে সাড়া।
জীবন ছিল নদীর মতো গতিহারা, দিশাহারা…”
জাভিয়ান গিটারের রিদমটা একটু পাল্টালো, সুরটা এবার আরও গভীর আর মায়াবী হয়ে উঠল। তান্বী যেন গাইতে গাইতে অনুভব করছিল, জাভিয়ান সত্যিই ওর জীবনের সেই দিশাহারা নদীর মোহনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ও গাইলো:
“গানে নতুন করে এলো সুর, এ যেন আগের চেয়ে সুমধুর।
নিয়ে এলে আমায় তুমি আজ বহুদূর…”
শেষের লাইনটা গাইতে গাইতে তান্বীর কণ্ঠস্বর একদম মিলিয়ে এল। বারান্দার নিস্তব্ধতা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। জাভিয়ান আলতো করে গিটারটা পাশের সোফায় রেখে দিল, কিন্তু ওর চোখ জোড়া তখনো তান্বীর মুখে স্থির হয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে এক অন্যরকম ঘোর, যেন সহস্র বছরের তৃষ্ণা নিয়ে সে তাকিয়ে আছে।
জাভিয়ানের এমন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা দেখে তান্বী কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল। সে মাথা নিচু করে ম্লান হেসে বলল, “জানি, তেমন একটা ভালো গাইতে পারিনি। বললাম না আমি গান পারি না!”
জাভিয়ান ওর চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে কিছুটা ঝুঁকে এল। নেশাতুর চোখে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “তাতে কী? আমিতো তোমার লিপসের মুভমেন্ট দেখছিলাম।”
কথাটা শোনা মাত্রই তান্বী বড় বড় চোখ করে তাকাল। ওর গাল দুটো মেরুন শাড়ির রঙের মতোই লাল হয়ে উঠল। সে অভিমানী সুরে বলল, “তার মানে আপনি আমার গান শোনেনইনি? অথচ গানটা আমি আপনাকে ডেডিকেট করে গাইলাম!”
জাভিয়ান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। ওর এই অকৃত্রিম হাসি খুব কম মানুষই দেখেছে। হাসির রেশটুকু ঠোঁটে রেখেই সে তান্বীর আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর ওর চিবুকটা আলতো করে স্পর্শ করে গভীর স্বরে বলল:”ভুল বুঝলে জিন্নীয়া। গান তো শোনে কান দিয়ে, আর আমি সেটা শুনেছি। আর তোমার ওই ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেছি চোখ দিয়ে। মনের সবটুকু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কান আর চোখ—দুটোকেই তো কাজে লাগাতে হয়, তাই না?”
জাভিয়ানের এই উত্তরে তান্বী আর কথা খুঁজে পেল না। জাভিয়ানের কথার মাদকতা আর সমুদ্রের নোনা বাতাস মিলেমিশে ওকে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় ঘিরে ফেলল। জাভিয়ান ওর কানের পাশে ঝুলে থাকা একটা অবাধ্য চুলের গোছা সযত্নে কানের পেছনে গুঁজে দিল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর গালে আছড়ে পড়ছে।
জাভিয়ান ফিসফিস করে বলল, “জিন্নীয়া, তোমার ওই গানটার লাইনগুলোর মতো আমাদের পরিণয়টাও যেন এই পাহাড়ের মতোই অটল হয়। আজ রাতে তোমাকে অন্য কিছুর চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে।”
তান্বী দেখল জাভিয়ানের চোখের মণি দুটো মোমের আলোয় ঝকঝক করছে। সে অনুভব করল, এই মানুষটার কঠোর আবরণের নিচে এক বিশাল সমুদ্রের মতো ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, যা আজ শুধু ওর জন্যই উত্তাল হয়ে উঠেছে।
জাভিয়ানের মাদকতাময় কথার ধরনে তান্বী লজ্জায় একেবারে আড়ষ্ট হয়ে রইল। আগুনের উত্তাপ ছাড়াই ওর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। জাভিয়ান হুট করেই চেয়ার ছেড়ে দরাজ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল এবং তান্বীর দিকে নিজের শক্তপোক্ত হাতটি বাড়িয়ে দিল।
ওর চোখের কোণে এক বিচিত্র দীপ্তি ফুটিয়ে জাভিয়ান বলল, “চলো জিন্নীয়া, তোমাকে এমন এক জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব যেটা তুমি স্বপ্নেও কল্পনা করোনি। আজ এই পাহাড়ের আকাশও আমাদের একান্ত সময়ের জন্য যথেষ্ট নয়।”
তান্বী কিছুটা দ্বিধা আর রাশি রাশি বিস্ময় নিয়ে ওর হাত ধরল। জাভিয়ান তাকে নিয়ে রিসোর্টের লিভিং রুমের একটি গোপন লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। লিফটে চড়ে ওরা যখন নিচের দিকে নামতে শুরু করল, তান্বী স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল সমুদ্রের গর্জন ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। লিফটের ধাতব দরজাটি খুলতেই তান্বী এক নিমেষে স্থবির হয়ে গেল। পাহাড়ের পাথুরে পেটের ভেতর দিয়ে এক দীর্ঘ কাঁচঘেরা টানেল চলে গেছে সোজা সমুদ্রের ডকিং স্টেশনে। সেখানে রুপালি রঙের এক দানবীয় জলযানের মতো শান্ত হয়ে ভেসে আছে অত্যাধুনিক লাক্সারি সাবমেরিন।
তান্বী বড় বড় চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি সত্যিই পানির নিচে যাচ্ছি?” ওর কণ্ঠে যতটা উত্তেজনা, ঠিক ততটাই ভয়ের রেশ।
জাভিয়ান ওর ভীরু হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে সে সাবমেরিনের ভেতরে পা রেখে বলল, “ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই জিন্নীয়া। পৃথিবীর কেউ জানবে না আমরা এখন কোথায়। এই অতল নীল জলের নিচে আজ শুধু তুমি আর আমি—বাকি সব তুচ্ছ।”
সাবমেরিনের ভেতরে ঢুকতেই তান্বীর মনে হলো সে কোনো রাজকীয় স্যুটে ঢুকে পড়েছে। এর এক পাশের দেয়ালগুলো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বিশেষ ধরনের কাঁচের তৈরি। জাভিয়ান কন্ট্রোল প্যানেলের একটি বোতাম চাপতেই সাবমেরিনের ভারি হ্যাচটি যান্ত্রিক শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। এরপর ধীরে ধীরে সেটি সমুদ্রের অতল গহ্বরে ডুব দিতে শুরু করল।
ওরা যত গভীরে যাচ্ছে, বাইরের দৃশ্য তত বেশি রহস্যময় হয়ে উঠছে। সমুদ্রের নীল রঙ ক্রমশ গাঢ় থেকে ঘন নীল হয়ে ধরা দিচ্ছে। কাঁচের ওপাশে হাজারো রঙিন সামুদ্রিক মাছ আর বিচিত্র প্রবালের সারি যেন নৃত্যরত। তান্বী মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে কাঁচের দেয়ালে হাত রাখল। সাবমেরিনের ভেতরের মৃদু নীল আলোয় ওর মেরুন শাড়িটা এখন এক বিষণ্ণ অথচ মায়াবী রূপ নিয়েছে।
ঠিক তখনই তান্বীর মুখটা ম্লান হয়ে এল। সে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে খুব মিনতিভরা গলায় বলল, “জাভিয়ান, আমার বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। মনটা কেমন যেন আনচান করছে… একটু ফোনে কথা বলিয়ে দেবেন প্লিজ?”
জাভিয়ান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়াল। ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য কাঠিন্য ফুটে উঠলেও পরক্ষণেই তা কোমল হয়ে গেল। সে তান্বীর খুব কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল, “তান্বী,আমরা এখানে এসেছি শুধু নিজেদের জন্য। আমি চাইছি এই কয়েকটা দিন তুমি তোমার পুরনো সব আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা থেকে একদম দূরে থাকো। আমি আমার ফোন থেকে সিম খুলে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এসেছি, যাতে কোনোকিছুই আমাদের এই শান্তিতে ব্যাঘাত না ঘটাতে পারে।”
তান্বী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। জাভিয়ান ওর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে পূর্ণ অধিকার নিয়ে বলল, “ভয় পেও না। এখান থেকে ফিরে গিয়ে আমি নিজে তোমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাব। তুমি তোমার বাবা-মায়ের কাছে যাবে। কিন্তু এখন… শুধু এখনকার জন্য বাইরের পৃথিবীটা ভুলে যাও জিন্নীয়া।”
কথাটা শেষ করেই জাভিয়ান এক হাত দিয়ে তান্বীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। সমুদ্রের তলার এই গহীন নিস্তব্ধতায় জাভিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর কানে আছড়ে পড়ছে। নীলচে আলোয় জাভিয়ানের চোখদুটোকে এক আদিম শিকারির মতো লাগছে, যে তার সবচেয়ে দামী রত্নটিকে আজ চিরতরে নিজের করে নিতে চায়।
সাবমেরিনটি এখন সমুদ্রের কয়েকশ ফুট গভীরে। চারদিকের স্বচ্ছ কাঁচের ওপাশে গাঢ় নীল জলরাশি এক অন্য জগতের জন্ম দিয়েছে। সাবমেরিনের ভেতরের আলো আরও নিস্তেজ হয়ে এল, এখন সেখানে শুধু মৃদু নীল আর সোনালি আলোর খেলা।
জাভিয়ানের বলিষ্ঠ বাহু তান্বীর কোমরে সর্পিল বন্ধনের মতো জড়িয়ে আছে। জাভিয়ানের শরীরের উষ্ণতা তান্বীর পাতলা মেরুন শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে ওর ত্বকে এসে লাগছে। তান্বী অনুভব করল, ওর হৃদপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় আজ বড্ড অবাধ্য হয়ে উঠেছে।
জাভিয়ান ওর কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে খুব গভীর এক টান দিল। তান্বীর গায়ের তাজা গোলাপের আর ভেজা চুলের ঘ্রাণে জাভিয়ানের দীর্ঘদিনের সংযম আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে চাইছে। সে ফিসফিস করে বলল, “জিন্নীয়া, তুমি কি জানো এই গভীর সমুদ্রের একটা অদ্ভুত শক্তি আছে? সে সব শব্দ শুষে নেয়, সব অস্থিরতা শান্ত করে দেয়। কিন্তু আমার ভেতরের এই ঝড়টা কেন শান্ত হচ্ছে না বলতে পারো?”
তান্বী কাঁপাকাঁপা হাতে জাভিয়ানের শার্টের হাতা খামচে ধরল। ওর মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না, শুধু এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। জাভিয়ান আলতো করে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। মোমের আলোর মতো নীল আলোয় তান্বীর মুখটা এখন এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ঝলমল করছে। ওর টকটকে লাল ঠোঁট দুটো ভয়ে আর লজ্জায় সামান্য কাঁপছে।
জাভিয়ান ওর এক হাত তান্বীর গালে রাখল। ওর বুড়ো আঙুল দিয়ে তান্বীর নিচের ঠোঁটটা আলতো করে স্পর্শ করে সে মাতাল গলায় বলল, “আমি নিজেকে অনেক আটকে রেখেছিলাম জিন্নীয়া। ভেবেছিলাম তুমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাকে স্পর্শ করব না। কিন্তু আজ… আজ এই নির্জনতায় তোমার এই মেরুন শাড়ি আর চোখের ওই মায়া আমাকে বিদ্রোহী করে তুলছে।”
তান্বী জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো হিংস্রতা নেই, আছে শুধু এক সর্বগ্রাসী ভালোবাসা। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “জাভিয়ান… আমি…”
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না তান্বী। জাভিয়ান ঝড়ের গতিতে ওর মাথাটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এল এবং ওর ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চুমু, যাতে মিশে আছে মাসের পর মাস ধরে জমানো তৃষ্ণা, অধিকার আর ভালোবাসা। তান্বীর সারা শরীর এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল।
সাবমেরিনের সেই সুনিভৃত কেবিনে এখন ফুটে উঠলো আদিম কামনার এক গাঢ় আরক্তিম আভা। বাইরে অতল সমুদ্রের কৃষ্ণ গহ্বর, আর ভেতরে জাভিয়ানের দুই চোখে জ্বলছে এক হাই লিবিডোর তৃষ্ণার অনল।তান্বীর মেরুন শাড়ির প্রতিটি ভাঁজ আজ ওর কম্পিত শরীরের রেখাগুলোকে যেন আরও স্পষ্ট করে তুলছে; দৃশ্যটা অনেকটা আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মাঝে এক শুভ্র পদ্ম দগ্ধ হওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে।
জাভিয়ান ওর খুব কাছে এসে ওর কানের লতিতে দাঁত দিয়ে মৃদু কামড় বসালো। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর ঘাড়ের রক্তনালীগুলোতে লাভার মতো উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। জাভিয়ান এক গভীর ও নেশাতুর স্বরে ফিসফিস করে বলল, “আর কত মাস তুমি তোমার এই পবিত্র অক্ষত ভার্জিনিটি নিয়ে আমার সামনে ঘুরে বেড়াবে জিন্নীয়া? দিনের পর দিন তুমি তোমার এই মায়াবী রূপ দিয়ে আমায় অঘোষিতভাবে সিডিউস করেছো, অথচ তোমাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ছুঁতে না পারার যন্ত্রণায় আমি প্রতি রাতে দগ্ধ হয়েছি। আজ এখানে আমাদের মাঝে কোনো পর্দা নেই, কোনো বাধা দেওয়ার মতো তৃতীয় সত্তা নেই।”
জাভিয়ানের কর্কশ আঙুলগুলো যখন তান্বীর কোমরের কাছে মেরুন শাড়ির কুঁচিতে স্পর্শ করল, তান্বী এক তীব্র শিহরণে চোখ বুজল। ওর ভেতরটা এক অজানা আচ্ছন্নতায় ভেঙে পড়ছে। জাভিয়ান কোনো নমনীয়তা না দেখিয়ে এক অবাধ্য হেঁচকা টানে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিল। শাড়িটা এক পরাজিত সাপের মতো ওর শরীর বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ল; উন্মুক্ত হয়ে পড়ল তান্বীর শ্বেতশুভ্র নাভি আর কোমরের মোহময়ী ভাঁজ। জাভিয়ান ওর শক্ত হাতটা তান্বীর মসৃণ উদরের ওপর স্থাপন করে সজোরে চেপে ধরল, যেন ওই কোমল অবয়বটি আজ ওর পেশীবহুল হাতের চাপে চুরমার হয়ে যাবে।
ব্লাউজের সূক্ষ্ম ফিতে গুলো জাভিয়ানের আঙুলের চাপে খুলে গেলো। ওর বলিষ্ঠ হাতের বুনো খেলায় তান্বী ব্যথায় আর এক অদম্য সুখে ডুকরে উঠল। জাভিয়ান তান্বীর ঘাড়ের সেই স্পর্শকাতর ভাঁজে নিজের তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠাধর ডুবিয়ে দিয়ে এক প্রকার নিষ্ঠুর আস্বাদনে মত্ত হলো। জাভিয়ানের স্ট্যামিনা আর দেহের সেই বুনো সুবাসে তান্বী তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য।
জাভিয়ান ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানার নরম গদিতে এক প্রকার আছড়ে ফেলল। তান্বী হাপাচ্ছিল, ওর চোখদুটো ভয়ে এবং আবেশে ঝাপসা হয়ে আসছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “জাভিয়ান… আমার খুব ভয় করছে। আমি নিতে পারছি না…”
জাভিয়ান ওর ওপরে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর সুঠাম দেহের ভারে তান্বীকে পিষে ফেলে সে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে গুমরে ওঠা স্বরে বলল, “তোমার ওই অতিরিক্ত উত্তেজনায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অসুখটা আজ আমিই সারিয়ে তুলব জিন্নীয়া। তোমার এই ভয়টা আজ আমি আমার পুরুষত্ব দিয়ে জয় করবই।
জাভিয়ানের পৌরুষদীপ্ত হাত দুটো যখন তান্বীর দেহের প্রতিটি সংগোপন বাঁককে চুরমার করে দেওয়ার নেশায় চূড়ান্ত উন্মাদনায় মেতে উঠল, ঠিক তখনই—
ক্র্যাক করে একটি বিকট ধাতব শব্দে পুরো সাবমেরিনটি এক ভয়াবহ ঝাকুনিতে কেঁপে উঠল। কেবিনের সেই কামনাময় নীল আলো নিভে গিয়ে মুহূর্তেই রক্তবর্ণের এমার্জেন্সি সাইরেন বেজে উঠল। জাভিয়ান থেমে গেল। ওর ঘাড়ের রক্তনালীগুলো তখনো উত্তেজনায় ফুলে আছে, চোখে তখনো সেই অবদমিত কামনা—কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা ওকে স্থির করে দিল।
সাবমেরিনের ভেতরে তখন এক বিভীষিকাময় লাল আলোর নাচানাচি। এমার্জেন্সি সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ কানের পর্দা ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। ভালোবাসার রাতের সেই উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি এক লহমায় হিমশীতল আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। জাভিয়ানের শরীরের পেশিগুলো তখনো উত্তেজনায় কাঁপছে, কিন্তু ওর মস্তিষ্ক এখন দাবার চালের মতো ক্ষিপ্র।
বিছানার ওপর প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকা তান্বী ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে ডাকল, “জাভিয়ান! কী হচ্ছে এসব?”
জাভিয়ান এক মুহূর্ত নষ্ট না করে মেঝে থেকে ওর মেরুন শাড়ি তুলে তান্বীর দিকে ছুঁড়ে দিল। ওর কণ্ঠে তখন এক কঠোর কমান্ডারের সুর, “দ্রুত নিজেকে ঢেকে নাও জিন্নীয়া! ইঞ্জিন রুমের প্রেসার ভালভ ফেটে গেছে। আমাদের হাতে সময় খুব কম!”
জাভিয়ান কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে ছুটে গেল। ওর আঙুলগুলো বিদ্যুতের গতিতে সুইচ টিপছে, কিন্তু সাবমেরিনের মেইন কম্পিউটার বারবার রি-বুট নিচ্ছে। সাবমেরিনটি এখন ধীরে ধীরে উল্টো দিকে কাত হচ্ছে। বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে গেছে, যার মানে হলো কোথাও লিক হয়েছে এবং ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।
তান্বী শাড়িটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে জাভিয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল। ও দেখল জাভিয়ানের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। যে মানুষটা একটু আগেও কামনার আগুনে জ্বলছিল, সে এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।
জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে ম্যানুয়াল লিভারটা টানার চেষ্টা করতে করতে গর্জে উঠল, “Damn it! হাইড্রো-সিস্টেম জ্যাম হয়ে গেছে। জিন্নীয়া, সিটের নিচে থাকা লাইফ জ্যাকেটটা বের করো, জলদি!”
হঠাৎ এক বিকট শব্দে সাবমেরিনের পেছনের দিকের একটা পাইপ ফেটে গিয়ে বরফশীতল নোনা পানি ভেতরে ঢুকতে শুরু করল। পানির তোড়ে তান্বী ছিটকে যেতে নিলে জাভিয়ান এক হাতে ওকে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।
জাভিয়ান তান্বীর চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত কিন্তু ভারী গলায় বলল, “ভয় পেও না। আমি থাকতে সমুদ্রের এই নোনা জল তোমাকে ছুঁতে পারবে না। আমরা ম্যানুয়াল হ্যাচ দিয়ে বের হব। বুক ভরে শ্বাস নাও জিন্নীয়া, কারণ আমাদের এখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য ডুব দিতে হবে।”
তান্বী দেখল জাভিয়ানের চোখে সেই আদিম শিকারির তেজ এখনো ম্লান হয়নি। সে জাভিয়ানের শার্টটা শক্ত করে খামচে ধরল। সাবমেরিনের ভেতর তখন কোমর সমান পানি। জাভিয়ান যান্ত্রিক হ্যাচটা খোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করল। লোহার সেই ভারি চাকাটা যখন ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল, জাভিয়ান তান্বীর কপালে এক শেষ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “রেডি হও। আমাদের বাসর আজ সমুদ্রের গভীরেই হবে, তবে সেটা জীবনের জন্য লড়াই করে!”
এক ধাক্কায় হ্যাচটা খুলে গেল আর হুড়মুড় করে সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ভেতরে ঢুকে পড়ল। এক নিমিষেই সব অন্ধকার হয়ে গেল।সমুদ্রের সেই অতল অন্ধকার আর বরফশীতল নোনা জলের সাথে যমে-মানুষে লড়াই করে অবশেষে ভেসে উঠল জাভিয়ান। এক হাতে নিথরপ্রায় তান্বীকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে অন্য হাতে সে দক্ষ সাঁতারুর মতো ঢেউ কেটে এগিয়ে চলল তীরের দিকে। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের নোনা জল জাভিয়ানের পেশীবহুল পিঠে চিকচিক করছে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর যখন সে তান্বীকে নিয়ে বালুকাময় তটে এসে পৌঁছাল, তখন দুজনেই হাঁপাচ্ছে।
রিসোর্টের কর্মীরা ততক্ষণে খবর পেয়ে টর্চ আর কম্বল নিয়ে ছুটে এসেছে। কিন্তু জাভিয়ান কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দিল না। এক ঝটকায় নিজেই তান্বীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
তান্বীর ভেজা মেরুন শাড়িটা এখন তার শরীরের সাথে দ্বিতীয় চামড়ার মতো লেপ্টে আছে। শাড়ির পাতলা আবরণ যেন তান্বীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে আরও প্রলুব্ধকর করে তুলেছে। ভেজা চুল থেকে চুইয়ে পড়া পানি ওর উন্মুক্ত বুকের খাঁজে গিয়ে মিশছে। জাভিয়ান যখন তান্বীকে নিয়ে রিসোর্টের করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটছিল, ওর ভেতরে তখন অন্য এক ঝড় শুরু হয়েছে। সমুদ্রের সেই মৃত্যুর শীতলতা মুহূর্তেই কামনার তীব্র দাবানলে রূপ নিল।
রুমের ভেতরে ঢুকে লাথি মেরে দরজা বন্ধ করে দিল জাভিয়ান। বিছানায় তান্বীকে শুইয়ে দিতেই দেখল, মেয়েটা ক্লান্তিতে আর ঠান্ডায় কাঁপছে। ওর আধবোজা চোখের মায়া আর এই ভেজা শরীরের দৃশ্য জাভিয়ানের সেই স্ট্যামিনাকে আবার জাগিয়ে তুলল। জাভিয়ানের ইচ্ছে করছিল এখনই ওই ভেজা শাড়িটা সরিয়ে দিয়ে নিজের তপ্ত শরীরের ছোঁয়ায় তান্বীর শরীরের প্রতিটি বিন্দুকে দগ্ধ করে দিতে।
কিন্তু জাভিয়ান থমকে গেল। তান্বীর ফ্যাকাশে মুখ আর ওর অসহায় অবস্থা দেখে নিজের ভেতরকার পশুকে সে অতি কষ্টে শিকল পরাল। এখন যদি সে নিজের লিবিডোর বশবর্তী হয়, তবে সেটা ভালোবাসা নয়, পাশবিকতা হবে।
জাভিয়ান এক ঝটকায় ফিরে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে বারান্দায় চলে এল। ওর বুকটা তখন ধপধপ করছে। ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করল। হাত কাঁপছে ওর। একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা এক টান দিল সে। কিন্তু এক স্ট্রোকে ওর অস্থিরতা কমল না। একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে ছাই করতে লাগল জাভিয়ান।
বারান্দার রেলিংটা শক্ত করে ধরে সে সমুদ্রের দিকে তাকাল। নিকোটিনের ধোঁয়া ফুসফুসে ঢুকলেও জাভিয়ানের মস্তিষ্কে তখনো ঘুরপাক খাচ্ছে তান্বীর ওই ভেজা মেরুন শরীরের মানচিত্র। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “F/uck! নিজেকে কন্ট্রোল করা এত কঠিন কেন ? তোমাকে এভাবে দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না।”
বারান্দায় যখন সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হচ্ছে, তখন রুমের ভেতরে তান্বী ধীরে ধীরে চোখ মেলল। সে দেখল বারান্দায় জাভিয়ানের সেই চওড়া পিঠ আর তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেট। এই বিপদের মুখে জাভিয়ান যেভাবে তাকে আগলে রেখেছে, সেটা ভেবে তান্বীর মনে ভয়ের চেয়ে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করতে লাগল।
বারান্দায় নিকোটিনের ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে জাভিয়ান তখনো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। ওর প্রতিটি নিঃশ্বাসে অস্থিরতা। তান্বী ঘরের ভেতর থেকে পা টিপে টিপে বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়াল। ভেজা মেরুন শাড়িটা বদলায়নি এখনও, ওর ভেজা চুলগুলো তখনো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে।
তান্বীর পায়ের শব্দ পেতেই জাভিয়ান সিগারেটটা ঠোঁটে চেপেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ওর চোখ দুটো তখনো লালচে হয়ে আছে—সেই পৈশাচিক কামনার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তান্বীকে দেখেই জাভিয়ান কর্কশ স্বরে বলে উঠল, “জামাকাপড় পাল্টে শুয়ে পড়ো। আর শোনো, আজকের রাতটা আমার থেকে যতটা পারো দূরত্ব বজায় রাখো। আজকে আমার কাছে এসো না।”
জাভিয়ানের কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত কাঠিন্য আর নিজেকে দমিয়ে রাখার লড়াই। সে আবার সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “কাল ভোরে আমরা পাহাড়ে ঘুরতে যাব। এখন গিয়ে ঘুমাও।”
তান্বী থমকে দাঁড়িয়ে গেল। জাভিয়ানের এই অস্বাভাবিক আচরণ আর নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা দেখে ওর হঠাৎ করেই ভ্যালেরিয়ার কথা মনে পড়ে গেল। ভ্যালেরিয়া ওকে বলেছিল যে, জাভিয়ান নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে মেডিসিন নেয়। বিশেষ করে যখন তান্বী আশেপাশে থাকে, তখন নিজের ভেতরের পশুকে আটকে রাখতে জাভিয়ানকে কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তান্বী বুঝতে পারল, আজ সাবমেরিনের সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত আর তারপর সমুদ্রের নোনা জলে ভেজা শরীরে ওকে দেখে জাভিয়ানের সেই অবদমিত আকাঙ্ক্ষাগুলো এখন বিস্ফোরণের মুখে। জাভিয়ান যে ওকে ঘরে যেতে বলছে, সেটা রাগে নয়—বরং তান্বীকে নিজের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।
তান্বী এক পা বাড়িয়ে জাভিয়ানের একদম পাশে এসে দাঁড়াল। জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে রেলিংটা শক্ত করে ধরল। ওর হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। জাভিয়ান গরগর করে বলল, “শুনতে পাওনি আমি কী বলেছি? ভেতরে যাও!”
তান্বী ডরহীন চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। সে নরম গলায় বলল, “আপনি আবারও ওই মেডিসিন নিয়েছেন তাই না? নিজেকে কেন এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন?”
জাভিয়ান এবার ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে সিগারেটটা আরেকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে তান্বীর দিকে এক কদম এগিয়ে এল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর কপালে লাগছে। জাভিয়ান নিচু কিন্তু ভয়ানক স্বরে বলল, “তুমি কি জানো তুমি কিসের সাথে খেলছো? আমার এই ধৈর্য সুতোর মতো পাতলা হয়ে গেছে জিন্নীয়া। মেডিসিন আজ কাজ করবে না। তোমার এই মায়াভরা মুখ আর আমার এই তৃষ্ণা… তোমাকে চুরমার করে দেওয়ার জন্য আমার এই হাত দুটো কাঁপছে। এখনো বলছি, চলে যাও!”
জাভিয়ানের সেই তপ্ত নিশ্বাস আর নিজেকে দমন করার আপ্রাণ লড়াই তান্বীকে আজ এক অদ্ভুত সাহসী করে তুলল। সে জানত, এই মানুষটা তাকে আগলে রাখার জন্য নিজের ভেতরের আদিম সত্তার সাথে যুদ্ধ করছে। তান্বী আর এক মুহূর্ত সময় নিল না; সে জাভিয়ানের কথার মাঝেই পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচিয়ে উঠে জাভিয়ানের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
জাভিয়ান প্রথমে বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা অজান্তেই আঙুলের ফাঁক দিয়ে নিচে পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের সেই অসাড়তা কাটার পরই জাভিয়ানের ভেতরের সেই লিবিডো যেন শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না।
জাভিয়ান বাঘের মতো গর্জে উঠে এক ঝটকায় তান্বীকে বারান্দার রেলিংয়ের সাথে ঠেসে ধরল। ওর বলিষ্ঠ দুই হাত তান্বীর কোমর আর ঘাড় এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যেন সে তাকে নিজের শরীরের ভেতরে মিশিয়ে নিতে চায়।
জাভিয়ানের চুম্বন আর কোমল রইল না, তা হয়ে উঠল এক বিধ্বংসী আক্রমণের মতো। তান্বীর নরম ওষ্ঠাধর সে নিজের দন্তের নিচে পিষ্ট করতে লাগল।
রেলিংয়ের ওপর তান্বীর পিঠটা চেপে বসায় ও ব্যথায় সামান্য কুঁকড়ে উঠল, কিন্তু জাভিয়ানের সেই উন্মাদনা ওকে এক অন্য জগতের মাদকতায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল। জাভিয়ান ওর ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে তান্বীর ঘাড়ের কাছে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল। এক দীর্ঘ গোঙানির মতো শব্দ বেরোল ওর গলা দিয়ে—
জাভিয়ানের সেই চুম্বনের তীব্রতায় তান্বীর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ওর মনে হচ্ছিল জাভিয়ান যেন আজ ওকে নিঃশেষ করে ফেলবে। রেলিংয়ের সাথে পিষ্ট হওয়া তান্বীর শরীরটা জাভিয়ানের অমানুষিক শক্তির চাপে নীল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু ঠিক যখন উত্তেজনার পারদ চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে, যখন জাভিয়ানের হাত দুটো শাড়ির গভীরে আরও নিষ্ঠুর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল—ঠিক তখনই জাভিয়ান নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল।
ওর বুকের ধকধকানি আর দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দে নিস্তব্ধ বারান্দাটা যেন কাঁপছে। জাভিয়ান রেলিংয়ে দুই হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। ওর কপালের রগগুলো এখনো ফুলে আছে, ঘাড়ের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার এই যে অমানুষিক যুদ্ধ, সেটা জাভিয়ানের মুখাবয়বকে ভয়ানক এক রূপ দিয়েছে।
তান্বী অগোছালো অবস্থায় দাঁড়িয়ে ধুঁকছিল। ওর ঠোঁট দুটো জাভিয়ানের দংশনে সামান্য ফুলে লাল হয়ে আছে। সে অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল।
জাভিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়াল, কিন্তু তান্বীর দিকে এক মুহূর্তের জন্যও তাকাল না। সে জানে, এই মুহূর্তে তান্বীর ওই বিধ্বস্ত রূপ দেখলে সে আর কোনো নীতি বা মেডিসিনের তোয়াক্কা করবে না। সে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, “যথেষ্ট হয়েছে জিন্নীয়া। ভেতরে যাও। এক্ষুনি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
তান্বী কিছু বলতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল। ওর স্বরে এখন বরফশীতল গাম্ভীর্য। “একদম কোনো কথা নয়। আমি নিজেকে কতটুকু আটকে রেখেছি তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা আর নিও না। যাও, গিয়ে ঘুমাও। কাল ভোরে আমাদের পাহাড়ে উঠতে হবে।”
তান্বী বুঝতে পারল, জাভিয়ান আজ ইচ্ছে করেই থেমে গেছে। সে চায় না এই উত্তেজনার মাথায় তান্বীর সাথে এমন কিছু করতে যা তান্বী সহ্য করতে পারবে না। জাভিয়ানের এই সংযম যেন ওর ভালোবাসার চেয়েও বেশি গভীর মনে হলো তান্বীর কাছে।
তান্বী ধীর পায়ে রুমের ভেতরে চলে গেল। জামাকাপড় পাল্টে বিছানায় শুয়েও সে বারান্দার দিকে তাকিয়ে রইল। দেখল জাভিয়ান আবার একটা সিগারেট ধরিয়েছে। আগুনের লাল বিন্দুটা অন্ধকারে ধিকধিক করে জ্বলছে। জাভিয়ান সারা রাত আর রুমে ঢুকল না। সে বারান্দার ওই ঠান্ডা বাতাসে নিজের ভেতরের উত্তপ্ত লাভাকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেল।
ভোরের আলো যখন সমুদ্রের বুকে উঁকি দিতে শুরু করল, তখন জাভিয়ান রুমে ঢুকল। ও দেখল তান্বী অঘোরে ঘুমাচ্ছে। জাভিয়ান ওর কপালে খুব আলতো করে একটা স্পর্শ দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “জিন্নীয়া, তোমার প্রতি আমার এই ডিজায়ার কোনোদিনও শেষ হবে না। কিন্তু আমি তোমাকে জয় করতে চাই তোমার ভয় ছাড়া।”
চলবে……
(আজকের পর্বে সবই রিয়েক্ট দিবেন অবশ্যই ২.৮কে রিয়েক্ট চাই কারন পরের পর্বে সেই ঝুলন্ত গাছের পর্ব আসবে তাই অবশ্যই রিয়েক্ট দিবেন আর তাড়াতাড়ি পর্ব পাবেন😩)
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৫
-
আযদাহা সব পর্বের লিংক
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৭