ডিজায়ার_আনলিশড
✍️ #সাবিলা_সাবি
পর্ব-২৭
.
.
.
মেক্সিকোর এই ইসাবেলার গোপন দুর্ভেদ্য প্রাসাদের বিশাল জানালা গলে আসা এক চিলতে সোনালী রোদ সরাসরি তান্বীর বন্ধ চোখের পাতায় আছড়ে পড়ল। ঘুমের রেশটা তখনো পুরোপুরি কাটেনি, কিন্তু এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর উষ্ণতা তার অবশ শরীরকে ঘিরে আছে। তান্বী ধীরে ধীরে চোখ মেলল। দৃষ্টির সামনে ভেসে উঠল এক বিশাল রাজকীয় ঘর, যার আভিজাত্য চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়।
কিন্তু শরীরের ওপর কোনো এক ভারী আবরণের অস্তিত্ব অনুভব করে সে পাশে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল! জাভিয়ান তার একদম পাশে, একই বিছানায় শুয়ে আছে। জাভিয়ানের এক বলিষ্ঠ হাত তান্বীর কোমরের ওপর এক অলঙ্ঘনীয় অধিকারবোধে রাখা। ঘুমের ঘোরে জাভিয়ানকে ঠিক সেই আগের মতো শান্ত আর নিষ্পাপ লাগছে। তান্বীর মগজে কাল রাতের প্রতিটি স্মৃতি মনে হলো সিনেমাটিক ড্রামার মতো ফিরে এল—সেই নিষিদ্ধ টিভি চ্যানেল, জাভিয়ানের সাথে রিমোট নিয়ে সেই ধস্তাধস্তি, আর সবশেষে জাভিয়ানের ওই সর্বগ্রাসী উম্মত্ত স্পর্শ। লজ্জার এক তীব্র ঢেউ তার অস্তিত্বকে তছনছ করে দিল; সে তৎক্ষণাৎ নিজের মুখখানা গায়ের ভারী কম্বলের ভেতর লুকিয়ে ফেলল।
সে সুযোগ বুঝে অত্যন্ত সন্তর্পণে জাভিয়ানের হাতটা সরিয়ে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু আঙুল দিয়ে জাভিয়ানের তপ্ত কবজি স্পর্শ করতেই জাভিয়ান চোখ না মেলেই নিজের হাতের বাঁধন আরও ইস্পাত-কঠিন করে ফেলল।
জাভিয়ান ঘুম জড়ানো কিন্তু ভারী ও গম্ভীর গলায় বললো “পালাচ্ছ কেন জিন্নীয়া? কাল রাতে তো বেশ বীরত্ব দেখিয়ে মাঝপথেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে। আমি তো ভেবেছিলাম তুমি যুদ্ধের শেষ ময়দান পর্যন্ত টিকে থাকবে!”
তান্বী পাথরের মতো জমে গেল। সে বুঝতে পারল জাভিয়ান আদতে জেগেই ছিল। সে গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল “ছাড়ুন আমাকে! কাল রাতে আপনি যা করেছেন… ওটা মোটেও সভ্য মানুষের কাজ ছিল না। আপনি… আপনি একটা আস্ত অসভ্য!”
জাভিয়ান এবার এক ঝটকায় চোখ মেলে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি। সে কুইন সাইজ বিছানায় একটু গড়িয়ে তান্বীর একদম ওপরে এসে নিজের দুই হাত দুপাশে লক করে দিল। জাভিয়ানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তান্বীর মুখমণ্ডলে নিবদ্ধ “অসভ্য? তান্বী ওটা তো কেবল ট্রেলার ছিল, তাতেই তুমি সেন্স হারিয়ে বসলে। আচ্ছা, তোমার শরীরে আসলে কোন ভিটামিনের অভাব বলতো, যে সামান্য ছোঁয়াতেই বারবার এমন দুর্বল হয়ে অজ্ঞান হয়ে যাও?”
তান্বী অপমানে আর লজ্জায় লাল হয়ে সরাসরি জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সে নিজের রাগ চেপে রেখে ত্যাড়ামি করে উত্তর দিল “আমার শরীরে যেই ভিটামিনেরই অভাব থাকুক না কেন, আপনি দয়া করে আগে ‘লজ্জার ভ্যাকসিন’ নিন! আপনার অসভ্যতা দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে!”
জাভিয়ান হো হো করে হেসে উঠল। সেই অট্টহাসিতে ঘরটা যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেল। সে তান্বীর নাকের ডগায় নিজের নাক আলতো করে ঘষে দিয়ে এক মাদকতাময় স্বরে বলল—”জিন্নীয়া, তুমি কি জানো না,লজ্জা হলো মেয়েদের শ্রেষ্ঠ ভূষণ, আর সেই লজ্জা কেড়ে নেওয়াই হলো আমার মতো অসভ্য প্রেমিকের প্রধান কাজ? আমি যদি ভ্যাকসিন নিয়ে খুব ভদ্র হয়ে যাই, তবে এই যে তোমার গাল দুটো এখন রক্তিম টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে, এই বিরল দৃশ্য আমি কোথায় দেখতে পাবো?”
তান্বী তখন বললো “আপনার এই মুখ খারাপের জন্যই আমি অজ্ঞান হই। আপনার আসলে উচিত দিনে অন্তত দশবার করে তিতা নিমপাতা খাওয়া, যাতে মুখটা একটু পরিষ্কার হয়।”
জাভিয়ান চোখ টিপে বললো “নিমপাতা দিয়ে কী হবে? আমার তিতা মুখ তো তোমার এই মিষ্টি ঠোঁটেই পরিষ্কার হয়। কাল রাতে তো মাত্র শুরু করেছিলাম, তুমিই তো মাঝপথে সেন্সর বোর্ড বসিয়ে দিলে!”
তান্বী এবার আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে বিছানার ওপর রাখা একটা পাশবালিশ টেনে নিয়ে জাভিয়ানের মুখে সজোরে মারল। কিন্তু জাভিয়ান বালিশটা এক হাত দিয়ে আটকে দিয়ে তান্বীর কবজি দুটো ধরে বিছানায় চেপে ধরল। তার দৃষ্টি এবার একটু গম্ভীর কিন্তু ভীষণ মায়াবী হয়ে উঠল।
“শরীরের ভিটামিন যা-ই কম থাক জিন্নীয়া, তোমার মনে কিন্তু আমার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। তুমি যতই লজ্জা দেখাও বা ভ্যাকসিন নিতে বলো, আমি জানি—জাভিয়ান চৌধুরী ছাড়া তোমার এক মুহূর্তও চলে না। ঠিক কি না?”
তান্বী নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জাভিয়ানের ওই অতলান্ত চোখের দিকে তাকালে তার সমস্ত যুক্তি যেন হারিয়ে যায়। সে অভিমানী গলায় বলল “আপনি খুব অহংকারী। আপনি জানেন আমার মন সম্পর্কে, তাই আপনি এমন সুযোগ পান।”
জাভিয়ান তখন বললো “হুমম, আমি সুযোগ পাই না, আমি সুযোগ ছিনিয়ে নিই।” এটা বলেই জাভিয়ান মুচকি হেসে তান্বীর কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেল। তার স্পর্শে তান্বীর সারা শরীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল।
জাভিয়ান যখন তান্বীর কপালে চুমু খেয়ে তাকে ছেড়ে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই তান্বী তাকে থামিয়ে দিল। তার চোখেমুখে এখন গভীর এক সংশয় “জাভিয়ান, একটা কথা আপনাকে বলতে একদম ভুলে গিয়েছিলাম। খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
জাভিয়ান ভ্রু কুঁচকে আবার বিছানায় বসল। তান্বীর চোখে এমন সিরিয়াসনেস সে সচরাচর দেখে না।
জাভিয়ান তখন বললো “বলো, কী বলবে।”
তান্বী তখন বলতে শুরু করলো “আপনি কি আমার এলিনা আপাকে দেখেছিলেন? ওই দিন যখন রিকার্দো আমাদের আটকে রেখেছিল?”
জাভিয়ান একটু সময় নিয়ে মনে করার চেষ্টা করল। সেদিনের সেই রণক্ষেত্রের মতো পরিবেশে সবকিছুই ছিল ধোঁয়াটে।
জাভিয়ান তখন বললো “হ্যাঁ, দেখেছিলাম। তবে খুব ভালো করে না। তোমাদের যখন ওই ঘরের এক কোণে আটকে রাখা হয়েছিল, তখন তোমার বোনের চেহারায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ, ধুলোবালি আর চুলে মুখ ঢাকা ছিল। আলোও খুব কম ছিল সেখানে।”
তান্বী তখন বললো “তার মানে কি আপনি এলিনা আপার চেহারাটা একদমই মনে রাখতে পারেননি?”
জাভিয়ান এবার তান্বীর চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠে সেই চিরচেনা মোহময়তা ফিরে এল “জিন্নীয়া, ওই নরকের মাঝে তোমাকে দেখার পর আমার চোখ আর কারো দিকেই ফোকাস করেনি। আমার সমস্ত ফোকাস ছিল শুধু তোমার ওপর। তাই পাশে কে ছিল, তার চেহারা কেমন ছিল—সেটা মনে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি।”
তান্বী মুহূর্তের জন্য লজ্জা পেলেও সেটা ঝট করে ঝেড়ে ফেলল। সে জাভিয়ানের বাহুতে হাত দিয়ে বলল— “জানেন, ওই যে ম্যালেরিয়া আপা…”
জাভিয়ান একদম আকাশ থেকে পড়ার মতো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো “ম্যালেরিয়া? ম্যালেরিয়া আবার কে?”
তান্বী তখন বললো “আরে ওই যে আপনার জুয়ার পার্টনার! যার সাথে কাল রাতে লুডু খেললাম।”
জাভিয়ান এবার কপালে হাত দিয়ে অট্টহাসি হাসল।
“ওহ্! তুমি ভ্যালেরিয়ার কথা বলছো? ভ্যালেরিয়াকে তুমি ম্যালেরিয়া বানিয়ে দিলে?”
তান্বী তখন বললো “যেটাই হোক! ওই আপা দেখতে হুবহু আমার বড় বোন এলিনা আপার মতো। মানে জাস্ট কার্বন কপি! আপনি দেখলে বিশ্বাসই করবেন না।”
জাভিয়ানের হাসিমাখা মুখটা এবার গম্ভীর হয়ে গেল। সে বেশ অবাক হলো। “কীভাবে সম্ভব? ভ্যালেরিয়া তো মেক্সিকান, ওর পূর্বপুরুষরা এদিকেই ছিল। তোমার বোনের সাথে ওর মিল থাকবে কেন?”
তান্বী বললো “আমি জানি না। কিন্তু আমি ওনাকে এলিনা আপার ছবি দেখিয়েছি, উনিও দেখে পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। আমি যখন প্রথম ওনাকে সেই ‘ঝড়তুফানের’ বাড়িতে দেখলাম, আমি তো ওনাকে আপা ভেবে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিলাম…”
জাভিয়ান থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো “এক সেকেন্ড! এক সেকেন্ড! এই ‘ঝড়তুফান’ আবার কে? মেক্সিকোতে কোনো নতুন মাফিয়া ডন এল নাকি?”
তান্বী বিরক্ত হয়ে বললো “আরে ওই যে লোকটা আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল… যার হাত থেকে ভ্যালেরিয়া আপু আমাকে বাঁচালো।”
জাভিয়ান বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বললো “ওহ্ শিট! তুমি মেইলস্ট্রোমকে ‘ঝড়তুফান’ বলছো? মানুষের নামের পিন্ডি চটকানো কেউ তোমার থেকে শিখবে! ভাগ্যিস আমার নামটার পিন্ডি চটকাওনি!”
তান্বী এবার সত্যিই রেগে গেল। সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়ামি করে বলল—”একটু সিরিয়াস হন তো জাভিয়ান! আমি এখানে একটা রহস্যের কথা বলছি আর আপনি নামের রসিকতা করছেন।
ভ্যালেরিয়া আপু আর এলিনা আপার এই মিল কোনো সাধারণ কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। আপনি কি কোনোদিন ওনার অতীত নিয়ে কিছু শুনেছেন?”
জাভিয়ানের চোখ এবার সংকুচিত হয়ে এল। সে বুঝতে পারল তান্বী অযথা কিছু বলছেনা।
জাভিয়ান বিছানায় হেলান দিয়ে কিছুটা কৌতুক মেশানো কণ্ঠে বলল, “ওরা আবার যমজ বোন নয়তো? সিনেমার মতো ছোটবেলায় হয়তো কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল!”
তান্বী মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। তার চোখে তখন ভাবনার গভীরতা। “না জাভিয়ান, তেমনটা হলে বাবা-মা আমাদের অবশ্যই জানাতেন। আর তাছাড়া এলিনা আপার অনেক ছোটবেলার ছবি আছে আমার কাছে, আমরা একসাথেই বড় হয়েছি। আর ওই যে ‘ঝড়তুফান’ লোকটা সে আমাকে তাদের পারিবারিক অ্যালবামও দেখিয়েছে। ভ্যালেরিয়া আপু আর এলিনা আপুর ছোটবেলার কোনো সংযোগই নেই।”
জাভিয়ান এবার একটু গম্ভীর হয়ে বিছানা থেকে নামল।বিছানার পাশ থেকে তার ঘড়িটা নিতে নিতে বলল, “তাহলে এটা নিছকই কাকতালীয়। পৃথিবীতে একই চেহারার মানুষ সাতজন থাকে এটা বৈজ্ঞানিকভাবেও অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণিত। হয়তো এটা তেমনই কোনো অদ্ভুত মিল।”
তান্বী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বিছানা থেকে নেমে জাভিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এখন এক পৃথিবী সমান কৌতূহল। “আচ্ছা জাভিয়ান, আমার পেটের মধ্যে আরেকটা প্রশ্ন অনেকক্ষণ ধরে…”
জাভিয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বাঁকা হেসে বললো “অ্যাকুরিয়ামের জেলিফিশের মতো লাফাচ্ছে, তাই তো?”
তান্বী খিলখিল করে হেসে ফেলল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে একদম সিরিয়াস হয়ে গেল। সে জাভিয়ানের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “ আমাকে সত্যি করে বলুন তো আপনি আসলে কে? যেখানে সাধারণ মানুষের একটা ভিসা পেতে মাসের পর মাস সময় লাগে, সেখানে আপনি মাত্র একদিনে আমার বাংলাদেশ যাওয়ার ভিসা করিয়ে দিয়েছিলেন! তারপর যেভাবে জাহাজ আর হেলিকপ্টার নিয়ে হামলা করলেন—তা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ হতে পারে না। এমনকি ওই ‘ঝড়তুফান’-এর মা বলছে, সে নিজের ছেলেকে আপনার হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের সাহায্য করছে! তার মানে আপনি কি ওই ঝড়তুফানের চেয়েও ভয়ংকর কিছু? আপনি আসলে কে, বলুন তো?”
জাভিয়ানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তার চারপাশের আবহাওয়া যেন হঠাৎ বদলে গেল। সে এক পা তান্বীর দিকে এগিয়ে এল। তান্বী একটু পিছিয়ে যেতে চাইলেও জাভিয়ান তার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের খুব কাছে টেনে আনল। জাভিয়ানের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত রহস্যময় গাম্ভীর্য।”আমি কে, আমার অতীত কী, বা আমার শক্তির সীমা কতটুকু—এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এখনো আসেনি জিন্নীয়া।”
সে তান্বীর কপালের অবাধ্য চুলগুলো কানের পিছে গুজে দিয়ে নিচু স্বরে বলল—”এই মুহূর্তে পৃথিবীতে আমার একটাই পরিচয়, যা তোমার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—আমি তোমার হাজবেন্ড। আর তোমার এই হাজবেন্ড তোমাকে আগলে রাখার জন্য পুরো পৃথিবীকে জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর চেয়ে বেশি কিছু তোমার জানার প্রয়োজন নেই।” কথাটা বলে জাভিয়ান এক অদ্ভুত হাসল, যে হাসির মানে তান্বী বুঝতে পারলো না। জাভিয়ানের এই রহস্য তাকে যতটা ভয় দেখায়, তার চেয়েও বেশি মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে।
.
.
.
.
সমুদ্রের বিশাল জলরাশির দিকে তাকিয়ে মেইলস্ট্রোমের দুচোখে আজ কেবলই শূন্যতা। গত ৪৮ ঘণ্টা সে এই ডেক থেকে এক চুলও নড়েনি। তার মনে বারবার ফিরে আসছিল তান্বীর সেই শেষ মুহূর্তটি—যখন মেয়েটি ভ্যালেরিয়ার হাত ধরে অতল সাগরে ঝাঁপ দিয়েছিল। মেইলস্ট্রোম ভেবেছিল, তান্বী হয়তো মরে গিয়েছে।
এই শোক আর পরাজয়ের গ্লানি মেইলস্ট্রোমকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। সে এক মুহূর্তের জন্যও মেনে নিতে পারছিল না যে, যাকে সে নিজের করে পেতে চেয়েছিল, সে আজ সাগরের নোনা জলের নিচে কোনো এক নিথর পাথর হয়ে পড়ে আছে।তার অনুচর মার্কাস একরাশ আতঙ্ক নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল। “বস… একটা গোপন খবর এসেছে। আমাদের রাডার সোর্স বলছে…”
“মরে গেছে ওরা! আর কী খবর দিবি তুই?” মেইলস্ট্রোম আর্তনাদ করে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে এক অসীম হাহাকার। “তান্বী আমাকে ঘৃণা করতে করতে মরে গেল। এই সমুদ্র ওকে গিলে খেয়েছে মার্কাস! আমি হেরে গেছি…”
মার্কাস তখন বললো “না বস, আপনি হারেননি। কারণ ওরা মরেনি! আমাদের স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং বলছে, ঠিক ওই জায়গাটায় সমুদ্রের তলদেশে একটা সাইলেন্ট সাবমেরিন পজিশন নিয়ে ছিল। কোনো লাশ ভাসেনি, কোনো চিহ্ন মেলেনি কারণ ভ্যালেরিয়া ওদের মাঝপথেই সাবমেরিনে করে পালিয়েছে।”
মেইলস্ট্রোম যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। তার শোকের ছায়া মুহূর্তেই এক প্রলয়ংকরী রাগে রূপ নিল। তার চোখের মনিতে তখন শোকের বদলে খুনের নেশা খেলা করছে। “সাবমেরিন? তার মানে… ওই কালনাগিনী ভ্যালেরিয়া আগে থেকেই সব সাজিয়ে রেখেছিল? সে জানত আমি তান্বীর জন্য পাগল হয়ে উঠব, তাই সে আমার আবেগের সুযোগ নিয়ে আমার চোখের সামনে থেকে ওদের চুরি করে নিয়ে গেল?”
মেইলস্ট্রোম সজোরে ডেক-এর রেলিংয়ে নিজের হাতটা পিষে ধরল। তার প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মতো তপ্ত। সে ভাবতেও পারেনি ভ্যালেরিয়া যে তার বোন—যাকে সে নিজের ডান হাত মনে করতসে তাকে এভাবে ধোঁকা দেবে।
মেইলস্ট্রোম তখন দাঁতে দাঁত চেপে বললো “ভ্যালেরিয়া… তুই জানতিস তান্বী আমার কত বড় দুর্বলতা। তুই জানতিস ওকে হারানোর যন্ত্রণায় আমি শেষ হয়ে যাবো। আর তুই সেই সুযোগে আমাকে মৃত মানুষের শোক উপহার দিয়ে ওকে নিয়ে পালিয়ে গেলি? তুই আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেলেছিস ভ্যালেরিয়া!”
মেইলস্ট্রোম এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। তার সেই হাসিতে সারা জাহাজ কেঁপে উঠল। সে মার্কাসের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিল—”পুরো মেক্সিকোর পাতাল চিরে ফেলো! মাটি খুঁড়ে হলেও ওদের খুঁজে বের করো। ভ্যালেরিয়াকে আমি এমন তিলে তিলে মারব যা দেখে যমরাজও ভয়ে পালিয়ে যাবে। যে সাবমেরিনে করে ও আমার তান্বীকে নিয়ে পালিয়েছে, সেই সাবমেরিনটাই হবে ওর শেষ সমাধি! আমি ওকে জ্যান্ত কবর দেব, এটাই মেইলস্ট্রোমের শেষ কথা!”
মেইলস্ট্রোমের দুচোখে এখন আর শোক নেই, আছে কেবল রক্তের তৃষ্ণা। সে বুঝে গেছে, এই যুদ্ধের দাবানল এখন আর সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নেই; ভ্যালেরিয়ার বিশ্বাসহীনতা এই যুদ্ধকে এক চরম ব্যক্তিগত আক্রোশে পরিণত করেছে।মেইলস্ট্রোম এখন আর কোনো মাফিয়া ডন নয়, সে এখন এক জখম হওয়া বাঘ, যে কেবল রক্তের তৃষ্ণায় হন্যে হয়ে উঠেছে।
মেইলস্ট্রোম তার জাহাজের অন্ধকার কেবিনে ম্যাপের ওপর ঝুঁকে পড়ে আছে। তার এক হাতে জ্বলন্ত চুরুট, অন্য হাতে ভ্যালেরিয়ার একটি পুরোনো ছবি। সেই ছবিতে ভ্যালেরিয়া তার পেছনে এক বিশ্বস্ত ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। মেইলস্ট্রোম এক ঝটকায় ছবিটা ছিঁড়ে ফেলল। সে বুঝতে পারছে, ভ্যালেরিয়া যদি তান্বীকে লুকিয়ে রাখে, তবে সে এমন কোথাও রেখেছে যেখানে মেইলস্ট্রোমের রাডার পৌঁছাতে পারবে না।
সে সজোরে বেল টিপে মার্কাসকে ভেতরে ডাকল। মার্কাস ঘরে ঢুকতেই মেইলস্ট্রোমের শীতল কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। “মার্কাস, আমার এই বিশাল সাম্রাজ্যে এমন কেউ নেই যে ভ্যালেরিয়ার গতিবিধি সম্পর্কে জানে না। ওই মেয়েটা মাটির নিচে লুকালেও কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে গেছে। মেক্সিকোর যত পুরোনো সোর্স আছে, আন্ডারগ্রাউন্ডের যত ইনফর্মার আছে—সবাইকে জানিয়ে দাও, ভ্যালেরিয়ার খবরের বিনিময়ে আমি এক কোটি ডলার দেব।”
মার্কাস তখন বললো “বস, আমরা কি সরাসরি আপনার মায়ের প্রাসাদে তল্লাশি চালাব?”
মেইলস্ট্রোম তখন বললো “না! আমার মা ধূর্ত। সে জানে আমি সেখানে নজর রাখব। কিন্তু ভ্যালেরিয়া একা নয়, তার সাথে জাভিয়ান আর তান্বী আছে। তিনজনের এই কাফেলা বেশিদিন আড়ালে থাকতে পারবে না। মার্কাস, মেক্সিকোর প্রতিটি হাইওয়ে সিসিটিভি চেক করো। সাবমেরিনটা কোন ডকইয়ার্ডে ভিড়েছিল সেটা বের করো। আর শোনো…”
মেইলস্ট্রোম মার্কাসের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে এক নিষ্ঠুর হাসি হাসল। “ভ্যালেরিয়ার কোনো দুর্বলতার মাধ্যমে আমি তাকে আঘাত করবো এমনভাবে আঘাত করব যাতে সে নিজে থেকেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়।”
মেইলস্ট্রোম জানে, ভ্যালেরিয়াকে খুঁজে পাওয়া মানেই তান্বীকে ফিরে পাওয়া। আর তান্বীকে ফিরে পাওয়ার জন্য সে পুরো মেক্সিকোকে নরক বানিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করবে না। সে জানালার কাঁচের ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল—”পালাবি কোথায় ভ্যালেরিয়া? এই সমুদ্র, এই আকাশ, এমনকি পাতালও তো আমারই ইশারায় চলে। আমি তোকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার জন্য মাটি খুঁড়তে শুরু করেছি। খুব শীঘ্রই দেখা হচ্ছে!”
.
.
.
মেক্সিকোর তপ্ত রোদ আজ লুসিয়ার মনে কোনো দোলা দিচ্ছে না। তার কানে বারবার একটি খবরই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ফারহান বাংলাদেশ চলে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে ধরে রাখার জন্য লুসিয়া এতদিন একটা বিরাট সত্য গোপন করে রেখেছিল, সে আজ সত্যিই তার হাতের মুঠো থেকে পিছলে যাচ্ছে।
লুসিয়া জানত, জাভিয়ান যখন গোপনে তান্বীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল (পরবর্তীতে তান্বী বিপদে পড়েছিল, যা লুসিয়া জানে না), সেই খবরটা ফারহানকে দিলেই সে মেক্সিকো ছেড়ে চলে যেত। ফারহানকে নিজের চোখের সামনে রাখার মোহে লুসিয়া তখন স্বার্থপরের মতো চুপ ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ফারহান নিজেই পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় নিচ্ছে।
লুসিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিবর্ণ মুখটা দেখল। সে মনে মনে ভাবল— “ফারহানকে আটকানোর শেষ অস্ত্র এটাই। তাকে জানাতে হবে তান্বী বাংলাদেশে আছে। এই ছুতোয় অন্তত তার সাথে শেষ একবার দেখা তো করা যাবে!”
লুসিয়া জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার আঙ্গুলগুলো কাঁপছে। সে জানে, এই মেসেজটি তাদের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ভাবার পর সে টাইপ করল: “তুমি কি সত্যিই বাংলাদেশ চলে যাচ্ছো ফারহান?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে খুব বেশি সময় লাগল না। ফারহানের সংক্ষিপ্ত কিন্তু কাঠখোট্টা উত্তর এল: “হ্যাঁ। তিনদিন পর ফ্লাইট। কেন?”
লুসিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। তিনদিন! হাতে সময় খুব কম। সে দ্রুত টাইপ করল: “আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। আজ কি সম্ভব?”
ফারহান তখন টাইপ করলো “সরি লুসিয়া। প্যাকিং আর কিছু জরুরি কাজ আছে। এখন দেখা করা সম্ভব নয়। ভালো থেকো।”
ফারহানের এই প্রত্যাখ্যান লুসিয়াকে আরও বেপরোয়া করে তুলল। সে তার তুরুপের তাসটি এবার ব্যবহার করল “ফারহান, তোমার বোনের বিষয়ে খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা খবর দেয়ার আছে।”
মেসেজটি পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফারহানের কল এল না ঠিকই, কিন্তু টাইপিং স্ট্যাটাসটা দেখা গেল। ফারহানের মনে তখন কৌতূহলের তীব্র ঝড়। “তান্বীর খবর? কী খবর? ও কোথায় আছে? মেসেজেই বলো!”
লুসিয়া তখন টাইপ করে বললো “সব কিছু ফোনে বা মেসেজে বলা যায় না ফারহান। আমি চাই তুমি সামনাসামনি কথাটা শোনো। প্লিজ।”
ওপাশে ফারহান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। একদিকে তান্বীর জন্য দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে লুসিয়ার এই রহস্যময় আচরণ। শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো, কিন্তু নিজের শর্তে। “ঠিক আছে। কিন্তু এখন নয়, আমি একটা কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত। সন্ধ্যায় আমার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসো। সেখানেই কথা হবে।”
লুসিয়া ফোনের স্ক্রিনটা বুকের সাথে চেপে ধরল। সে সফল হয়েছে। আর এদিকে মেক্সিকোর অন্ধকার জগতে যে প্রলয় শুরু হয়েছে, তার আঁচ এই দুজন মানুষের গায়ে কখন এসে লাগে, তা কেবল সময়ই জানে।
.
.
.
বিশাল ডাইনিং টেবিলের ওপর রাজকীয় সব খাবার সাজানো, কিন্তু কারো মনেই খাবারের প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। ইসাবেলা টেবিলের প্রধান আসনে বসে আছেন, তার দুই পাশে জাভিয়ান এবং ভ্যালেরিয়া। আর জাভিয়ানের ঠিক পাশেই চুপচাপ বসে আছে তান্বী। ঘরের গাম্ভীর্য ভেদ করে ইসাবেলার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
“এমিলিও, এবার বলো—তোমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী? এখান থেকে এক কদম বাইরে পা রাখলেই কিন্তু তোমরা মেইলস্ট্রোমের রাডারে ধরা পড়ে যাবে। সে এখন পুরো মেক্সিকোকে নরক বানিয়ে রেখেছে তোমাদের খোঁজে।”
জাভিয়ান তার হাতের কাঁটাচামচটা প্লেটে মৃদু শব্দ করে রেখে ইসাবেলার দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো সেই অবাধ্য জেদ। “রাডারে ধরা পড়লে পড়ুক। কিন্তু আমাদের তো এখান থেকে বেরোতেই হবে, তাই না? আমি তান্বীকে নিয়ে চিরকাল এই মাটির নিচের দুর্গে লুকিয়ে থাকতে আসিনি।”
ইসাবেলা শান্ত গলায় বললেন “এমিলিও, আমি চাই না তোমার আর মেইলস্ট্রোমের মধ্যে কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাঁধুক। সে আমার রক্ত হতে পারে, কিন্তু তুমিও আমার স্নেহের। আমি কোনো ধ্বংস দেখতে চাই না।”
জাভিয়ান তখন বললো “তাহলে কি আমরা সারা জীবন এখানেই বন্দি থাকব? পালিয়ে বেড়ানো আমার ডিকশনারিতে নেই।”
ইসাবেলা তখন বললেন “পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হতে দাও। সবটুকু আমার ওপর ছেড়ে দাও, আমি নিজেই তোমাদের নিরাপদে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করব।”
জাভিয়ান এবার চেয়ারটা একটু পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের দম্ভ। “আমি মেইলস্ট্রোমকে ভয় পাই না। ওর ক্ষমতা আছে তা আমার জানা আছে, আমারটাও আমার জানা আছে।”
ইসাবেলা এবার বললেন “আমি জানি তুমি ভয় পাও না এমিলিও। কিন্তু নিজের জন্য না হোক, অন্তত তান্বীর কথা তো ভাবো! সবসময় মাথা গরম করে ক্ষমতা আর শক্তি দিয়ে লড়াই জেতা যায় না। যুদ্ধ জিততে হলে বুদ্ধি আর কৌশলেরও দরকার হয়।”
ইসাবেলা এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর সরাসরি জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—”তার প্রমাণ তো তুমি অলরেডি পেয়েছ। তুমি বাঘের মতো গর্জে উঠে মেইলস্ট্রোমের ডেরায় হামলা করেছিলে, প্রচুর রক্ত ঝরিয়েছিলে—কিন্তু দিনশেষে তান্বীকে উদ্ধার করে আনতে পারোনি। অথচ ভ্যালেরিয়া নিজের মাথা খাটিয়ে সামান্য কৌশলে ঠিকই তান্বীকে নিয়ে এসেছে। এটা তোমাকে বুঝতে হবে এমিলিও, সব জায়গায় পেশীশক্তি কাজ করে না।”
ইসাবেলার এই অকাট্য যুক্তিতে জাভিয়ান মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। সে পাশে বসে থাকা তান্বীর দিকে তাকাল, যে কিনা এখনো আতঙ্কিত। টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে থাকা ভ্যালেরিয়া নিঃশব্দে কফি খাচ্ছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল মেঝের দিকে—যেন সে কোনো গভীর হিসাব মেলাচ্ছে।
ইসাবেলার অকাট্য যুক্তির পরও জাভিয়ান সেটা পুরোপুরি মানতে নারাজ। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল তর্কের জন্য—ঠিক তখনই পাশ থেকে তান্বী মুখ খুলল। “জাভিয়ান… আমার মনে হয় ‘কদবেল ম্যাম’ একদম ঠিকই বলেছেন। আপনার এখন ওনার কথা শোনা উচিত।”
মুহূর্তের জন্য পুরো ডাইনিং টেবিল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ইসাবেলার হাতে থাকা কফির কাপটা মাঝপথেই থেমে গেল। ভ্যালেরিয়া বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল, আর জাভিয়ান বড় বড় চোখ করে তান্বীর দিকে তাকাল।
জাভিয়ান হতভম্ব হয়ে বললো “কী? কী বললে? কাকে কী বললে তুমি?”
ইসাবেলা ভ্রু কুঁচকে বললেন “কদবেল? ইজ দ্যাট মাই নিউ নেম, এমিলিও?”
তান্বী বুঝতে পারল সে আবারও নামের পিন্ডি চটকে ফেলেছে। সে লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে জিভ কাটল এবং দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল—”আই এম রিয়েলি সরি ম্যাম! আসলে আপনার নামটা ‘বেল’ নাকি যেনো তো… ওটা উচ্চারণ করতে গিয়ে আমার কেন জানি ‘কদবেল’ বেরিয়ে গেছে। আপনার নামটা খুব কঠিন, আর আমি আসলে বেশি কঠিন শব্দ সহজে উচ্চারণ করতে পারি না। প্লিজ রাগ করবেন না!”
জাভিয়ান এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে কপালে হাত দিয়ে নিচু স্বরে হাসতে হাসতে বলল— “জিন্নীয়া, তুমি পারোও বটে! দুনিয়ায় আর কোনো শব্দ খুঁজে পেলে না? মাফিয়া কুইনের আভিজাত্যের বারোটা বাজিয়ে তুমি ওনাকে কদবেল বানিয়ে দিলে?”
তান্বীর মুখে ‘কদবেল ম্যাম’ শুনে ইসাবেলা স্তম্ভিত হলেও তার চোখমুখে এক অদ্ভুত মায়া ফুটে উঠল। তিনি জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। এই মেয়েটার সারল্য যেন এই পাথরের প্রাসাদেও প্রাণের স্পন্দন নিয়ে এসেছে। ইসাবেলা বুঝতে পারলেন, কেন জাভিয়ানের মতো মানুষ এই মেয়েটার জন্য পুরো মেক্সিকোর সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত।ইসাবেলা প্রথমে গম্ভীর থাকলেও তান্বীর নিষ্পাপ মুখ আর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভঙ্গি দেখে তার ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন “দেখেছ এমিলিও? এই মেয়েটার ভেতরে কোনো প্যাঁচ নেই। ও যা বলছে মন থেকেই বলছে। ওর এই সরলতাটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও তোমাকে এখন মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।” তান্বীর এই ছোট্ট ভুলের কারণে ঘরের গুমোট ভাবটা অনেকটা কেটে গেল।
এদিকে জাভিয়ান তখনও স্তব্ধ হয়ে তান্বীর দিকে তাকিয়ে আছে। পৃথিবীর কেউ কোনোদিন জাভিয়ান চৌধুরীকে কোনো নির্দেশ দেওয়ার সাহস পায়নি। নিজের জেদ আর ক্ষমতার দম্ভই ছিল তার জীবনের শেষ কথা। মানুষের কথা শোনা বা কারো সামনে মাথা নত করা জাভিয়ানের ইগোতে প্রচণ্ড আঘাত করে। এমনকি ইসাবেলা যখন শক্তির চেয়ে কৌশলের কথা বলছিলেন, জাভিয়ানের রক্ত টগবগ করে ফুটছিল তা অস্বীকার করার জন্য।
কিন্তু তান্বী যখন একই কথা বলল, জাভিয়ানের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর রাগী মানুষটা যেন এক মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। সে অনুভব করল, তান্বীর এই আকুতি তার ওপর কোনো আধিপত্য নয়, বরং তার প্রতি এক গভীর উদ্বেগ।
জাভিয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অত্যন্ত নিচু স্বরে বললো “ঠিক আছে। শুধু তোমার জন্য তান্তী… শুধুমাত্র তোমার কথা ভেবে আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলালাম।”
সে ইসাবেলার দিকে ফিরে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল—”আপনার কথা আমি শুনব। তবে এটা মনে করবেন না যে আমি মেইলস্ট্রোমকে ভয় পেয়েছি। আমি শুধু চাই না আমার কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে তান্বীর কোনো ক্ষতি হোক। আপনি আপনার কৌশল সাজান, আমি আমার জেদকে আপাতত বন্দি করে রাখলাম।”
ইসাবেলা অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “কেউ কোনদিন জাভিয়ান এমিলিওকে চৌধুরীকে জয় করতে পারেনি, কিন্তু এই সাধারণ মেয়েটা ঠিকই সিংহকে পোষ মানিয়ে ফেলেছে।”
ভ্যালেরিয়া একদৃষ্টিতে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দেখল, যে মানুষটা কোনোদিন কারো কাছে হার মানেনি, জাভিয়ানের মতো একজন অহংকারী এবং একরোখা মানুষের জন্য কারো কথা মেনে নেওয়া মানে নিজের অস্তিত্বকে ছোট করা। কিন্তু তান্বীর প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই গভীর যে, প্রথমবারের মতো সে তার ‘ইগো’ বা আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিল। সে আজ তান্বীর এক কথায় নিজের দীর্ঘদিনের আভিজাত্য বিসর্জন দিল। ভ্যালেরিয়ার মনের কোনো এক কোণে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব হলো—এই জয় কেবল ভালোবাসার, যা সে কোনোদিন জাভিয়ানের কাছ থেকে পায়নি।
তান্বী:তখন খুশি হয়ে জাভিয়ানের হাতটা চেপে ধরে বললো “আমি জানতাম আপনি আমার কথা শুনবেন! আপনি একদম ঠিক কাজ করেছেন।”
জাভিয়ান তান্বীর হাতের স্পর্শে একটু ম্লান হাসল, তবে তার ভেতরে তখনো একটা অস্থিরতা কাজ করছে। কারণ সে জানে, এই শান্ত থাকাটা কেবল ঝড়ের আগের স্তব্ধতা মাত্র।
.
.
মেক্সিকোর আকাশজুড়ে সন্ধ্যার ধূসর আভা ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তার সোডিয়াম আলোগুলো জ্বলে উঠতেই এক ধরনের বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে চারপাশকে। ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গত আধঘণ্টা ধরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে লুসিয়া। গায়ে তার নীল রঙের শাড়ি—যেটা ফারহানের খুব পছন্দের রঙ। ভিনদেশি এই পোশাক সামলাতে আজ তার বেশ কষ্ট হচ্ছে, ঠিক যেমন সে সামলাতে পারছে না নিজের ভেতরের আবেগকে।
কিছুক্ষণ পরেই বাইকের হেডলাইটের তীব্র আলো লুসিয়ার চোখে এসে পড়ল। একটা ঝরঝরে ইঞ্জিনের গর্জন তুলে ফারহান তার বাইকটা ঠিক লুসিয়ার সামনে এসে থামাল। হেলমেটটা খুলতেই দেখা গেল ফারহানের ক্লান্ত অথচ কঠোর মুখাবয়ব। লুসিয়ার শাড়ি পরা রূপটা তার চোখে পড়লেও সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করল না সে। তার সমস্ত মনোযোগ তখন কেবল বোনের খবরের দিকে।
বাইক থেকে নেমে ফারহান সরাসরি লুসিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। কোনো কুশল বিনিময় নেই, কোনো ভূমিকা নেই—সরাসরি তার তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো “বলো লুসিয়া, কী এমন ইম্পর্ট্যান্ট কথা যা ফোনে বলা গেল না? তান্বী কোথায়? ও কেমন আছে?”
লুসিয়া ফারহানের এই পাথুরে শীতলতায় একটু থতমত খেয়ে গেল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে রেখে সে বলল “ফারহান, জাভি ব্রো তান্বীকে অনেক আগেই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে কয়দিনের জন্য বেড়াতে।”
খবরটা শোনামাত্র ফারহানের শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল শিথিল হয়ে এল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে প্রশান্তির ঝিলিক দেখা দিল। তান্বী বাংলাদেশে আছে, এর চেয়ে স্বস্তির খবর তার জন্য আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই ফারহানের মনে পড়ল লুসিয়ার লুকোচুরির কথা। তার চোখের মনিতে এখন খুশির বদলে তীব্র ক্রোধের আগুন। “কী বললে? তান্বী অনেক আগে দেশে চলে গেছে? আর তুমি এই খবরটা আজ আমাকে জানাচ্ছ?”
লুসিয়া একটু কাঁপাকাঁপা গলায় বললো “ফারহান, আমি আসলে… আমি চাইনি তুমি এখনই চলে যাও। এটা শুনলেই তুমিও বাংলাদেশে চলে যাবে তাই,আমি তোমাকে হারানোর ভয় পাচ্ছিলাম…”
ফারহান তিরস্কারের সুরে বললো “হারানোর ভয়? নাকি চরম স্বার্থপরতা? আমি ভাবতেও পারিনি তুমি এত বড় একটা সত্যি আমার কাছে গোপন করবে। তোমার এই অযোগ্য নীরবতার কোনো অজুহাত হয় না লুসিয়া।”
ফারহান আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে হনহন করে অ্যাপার্টমেন্টের গেটের দিকে এগিয়ে গেল। লুসিয়া অপরাধীর মতো পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। ফারহান সিঁড়িতে পা রেখে একবার পেছনে ফিরে চাইল।”ধন্যবাদ সত্যটা শেষ পর্যন্ত জানানোর জন্য। তিনদিন পর ফ্লাইট ছিল, এখন আমি চেষ্টা করব কালকের টিকিটই ম্যানেজ করতে। ভালো থেকো লুসিয়া।”
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে দেখল, ফারহান ভেতরে চলে যাচ্ছে। সে ফারহানকে কাছে পাওয়ার জন্য একটা মিথ্যে আড়াল তৈরি করেছিল, কিন্তু সেই আড়ালটাই আজ তাদের মাঝখানে এক বিশাল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। এক ঘণ্টা কেটে গেছে। ফারহান নিজের রুমে ব্যাগ গুছিয়ে, অস্থিরতা কমাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁওয়া ছাড়তেই তার নজর গেল নিচে। অন্ধকারের মধ্যে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটি নীল রঙের অবয়ব এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লুসিয়া এখনো যায়নি। সে একদৃষ্টিতে ফারহানের বিল্ডিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। ফারহান ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত হয়ে আসছে। একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে সে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পিষে নিচে নেমে এল।
অ্যাপার্টমেন্টের গেট খুলে বাইরে আসতেই লুসিয়া এক পা এগিয়ে এল। তার চোখমুখ ক্লান্তিতে বসে গেছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এখনো সেই আকুতি। ফারহান তার সামনে এসে দাঁড়াল, কণ্ঠে কোনো মায়া নেই, বরং এক ধরনের তাচ্ছিল্য।”এখনো কেন দাঁড়িয়ে আছো? রাত হয়ে যাচ্ছে, বাড়ি ফিরে যাও।”
লুসিয়া কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ফারহান তাকে সুযোগ না দিয়ে রুক্ষ স্বরে বলতে থাকল “আই নো তোমার কালচার এটাই। রাত-বিরাতে ক্লাবে বন্ধুদের সাথে হ্যাংআউটে পড়ে থাকা তোমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু শোনো লুসিয়া, এটা কোনো ক্লাবের বারান্দা নয়, এটা ভদ্রলোকদের অ্যাপার্টমেন্ট। এখানে এভাবে মাঝরাতে একটা মেয়ের দাঁড়িয়ে থাকাটা দৃষ্টিকটু লাগছে। এখান থেকে যাও।”
ফারহানের মুখে ‘ভদ্রলোক’ আর ‘কালচার’ নিয়ে এই খোঁচাটা লুসিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে ভাবতেও পারেনি ফারহান তাকে এতটা সস্তা মনে করবে। লুসিয়ার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ফারহান সেটা দেখেও না দেখার ভান করল।
লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বললো “তুমি আমাকে এতটাই খারাপ ভাবো ফারহান? শুধু চেয়েছিলাম তুমি একবার অন্তত শান্ত হয়ে আমার কথাটা শোনো…”
ফারহান তখন বললো “শোনার মতো কিছু বাকি নেই। তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছ, এটাই শেষ কথা। এখন যদি নিজের আত্মসম্মানবোধ বিন্দুমাত্র থাকে, তবে চলে যাও। কাল সকালে আমার অনেক কাজ আছে।”
লুসিয়ার ভেতরের মেক্সিকান রক্ত এবার যেন টগবগ করে ফুটে উঠল। ফারহানের ক্রমাগত অবজ্ঞা আর ‘কালচার’ নিয়ে খোঁচা তার সহ্যক্ষমতার বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। সে এক ঝটকায় ফারহানের শার্টের কলারটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। ফারহান এই আকস্মিক আক্রমণে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
লুসিয়া দাঁতে দাঁত চেপে ,চোখে আগুনের ফুলকি নিয়ে বললো “যাব না! কোথাও যাব না আমি! কী ভাবো তুমি নিজেকে? শুনে রাখো ফারহান, আমি তোমাকে ভালোবাসি মানে ভালোবাসি-ই! আর এই জীবনে তুমিই প্রথম এবং শেষ পুরুষ যাকে আমি একমাত্র মন দিয়েছি।”
লুসিয়া ফারহানের কলারটা আরও কাছে টেনে আনল, তাদের দুজনের নিশ্বাস এখন একে অপরের খুব কাছাকাছি।”তুমি যদি সেদিন আমাকে কিডন্যাপ না করতে, তবে হয়তো আমি তোমার প্রেমে পড়তাম না। কিন্তু তোমার ওই রুক্ষ পার্সোনালিটি আমাকে বাধ্য করেছে তোমার প্রেমে পড়তে। এখন আমার আর কোনো পালানোর পথ নেই। আর মনে রেখো, ‘লুসিয়া চৌধুরী’ যেটার ওপর একবার নজর দেয়, সেটা তার চাই-ই চাই। যেকোনো মূল্যে!”
ফারহান মুহূর্তের জন্য লুসিয়ার চোখের ওই তীব্র জেদ দেখে অবাক হয়ে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল ঠিকই, কিন্তু সে সেটা প্রকাশ হতে দিল না। সে লুসিয়ার হাত দুটো কলার থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠে তখনো সেই উপহাস মেশানো তাচ্ছিল্য “ছাড়ো আমাকে! আর ড্রামা বন্ধ করে বাসায় ফিরে যাও। তোমার এসব ‘ক্রাশ ফ্রাশ’ দুদিনের নেশা ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমার মতো মেয়েরা পারফিউম যেভাবে চেঞ্জ করে, ক্রাশও ঠিক সেভাবেই বদলায়। আজ আমি, কাল অন্য কেউ। তোমার এই ক্ষণস্থায়ী আবেগ দিয়ে আমাকে অন্তত ইমপ্রেস করার চেষ্টা কোরো না।”
লুসিয়া স্থির চোখে ফারহানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এখন আর জল পড়ছে না, বরং সেখানে এক অদ্ভুত সংকল্পের ছাপ। ফারহান তাকে অবজ্ঞা করছে, তাকে সস্তা ভাবছে—এটাই লুসিয়ার জেদকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
ফারহান আবারও বললো “যাও এখন। মেক্সিকোর রাত অনেক ভয়ঙ্কর, তোমার মতো বাড়ির আদুরে মেয়েদের জন্য এটা নিরাপদ নয়।”
লুসিয়ার গলার স্বর এবার আর কঠিন রইল না, বরং তা অভিমানে আর কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে নিজের শাড়ির আঁচলটা মুষ্টিবদ্ধ করে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—”ক্রাশের জন্য কেউ এসব করে ফারহান? দেখো আমি আজ কী পরেছি! যা কোনোদিন পরিনি, যেটার নাম পর্যন্ত জানতাম না—আজ সেই শাড়িটা পেঁচিয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি না নীল রঙ পছন্দ করো? তুমিই তো বলেছিলে মেয়েদের শাড়িতে সুন্দর লাগে। হ্যাঁ ফারহান, আমি তোমার জন্য নীল শাড়ি পরেছি! আমাকে একবার অন্তত একসেপ্ট করে নাও না? আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমার জন্য প্রতিদিন শাড়ি পরব। দরকার পড়লে রাতেও শাড়ি পরেই ঘুমাব, তাও একবার আমাকে কাছে টেনে দেখো। আমি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলব ফারহান। তোমার যা যা পছন্দ, আমি ঠিক তাই তাই হব।”
লুসিয়ার এই আকুতি ফারহানের ভেতরের শক্ত বরফটাকে কিছুটা হলেও গলাতে শুরু করল। তার চোখের সেই জেদ একটু নরম হয়ে এল। সে লুসিয়াকে আপাদমস্তক একবার দেখল। মেয়েটা সত্যিই তার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছে।
ফারহান খানিকটা গম্ভীর গলায় বললো “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি কি রাঁধতে জানো?”
লুসিয়া যেন খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো উৎসাহ পেল। সে দ্রুত বলতে শুরু করল—”হ্যাঁ! আমি খুব ভালো রান্না পারি। টাকোস, এনচিলাডাস, কোয়েসাডিলা আর মেক্সিকান স্টেক।তুমি যা বলবে আমি তাই বানিয়ে দেব!”
ফারহান এবার একটা বাঁকা হাসি হাসল। সে মাথা নেড়ে বলল— “উঁহু! আমি ওসব মেক্সিকান খাবার একদম পছন্দ করি না। আমার প্রিয় খাবার হচ্ছে গরম ভাত, আলু ভর্তা, শাক-ভাজি, মচমচে ইলিশ মাছ ভাজা আর ঝাল ঝাল গরুর মাংস। এগুলো পারবে?”
লুসিয়া মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নামগুলো তার কাছে ভিনগ্রহের ভাষার মতো মনে হলেও সে দমে গেল না। সে দৃঢ় গলায় বলল— “আমি শিখে নেব ফারহান! তুমি শুধু একবার সুযোগ দিয়ে দেখো।”
ফারহান তখন বললো “পারবে না। বাঙালি রান্না অনেক কঠিন।”
লুসিয়া বললো “তুমি শুধু সুযোগ দাও। আমি অসম্ভবকেও ,সম্ভব করতে পারি তোমার জন্য।”
ফারহান এবার ঘড়ির দিকে তাকাল। তার পেটে তখন খিদে চনচন করছে। সে পকেট থেকে চাবিটা বের করে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—”ঠিক আছে। কথা যখন দিয়েছ, তখন প্রমাণ হয়ে যাক। চলো আমার ফ্ল্যাটে। আজ রাতে আমার ডিনারটা তুমিই রান্না করবে। যদি তোমার রান্না খেয়ে আমি কাল সকালে এয়ারপোর্টে যাওয়ার শক্তি পাই, তবেই বুঝব তুমি সিরিয়াস।”
.
.
.
.
ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের কিচেনটা এখন একটা রণক্ষেত্রের মতো হয়ে আছে। লুসিয়া এক হাতে ফোন ধরে ইউটিউবে ‘Bengali Fish Fry and Rice’ সার্চ করে দেখছে, আর অন্য হাতে খুন্তি নিয়ে লড়াই করছে। তার সেই দামী নীল শাড়ির আঁচলটা কোমরে গোঁজা, কপালে ঘাম আর চোখে ধোঁয়া।
সবচেয়ে বড় বিপত্তিটা ঘটল যখন সে ফ্রাইপ্যানে মাছটা ছাড়ল। ফুটন্ত তেলের ছিটকা এসে সরাসরি লুসিয়ার বাঁ হাতের কবজিতে লাগল। যন্ত্রণায় তার মুখটা কুঁচকে গেল, কিন্তু সে শব্দ করল না। ফারহানকে সে প্রমাণ করতে চায় যে সে পারবে। পোড়া জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে উঠছে, কিন্তু সেদিকে নজর না দিয়ে সে কোনোমতে রান্না শেষ করল।
টেবিলে খাবার সাজানো হলো। চালটা ঠিকমতো সেদ্ধ হয়নি, অর্ধেক চাল শক্ত হয়ে আছে। আর মাছ ভাজাটা বাইরে থেকে পুড়ে কয়লা হয়ে গেলেও ভেতরটা কাঁচা রয়ে গেছে।
ফারহান গম্ভীর মুখে এক লোকমা মুখে দিল। পরক্ষণেই বিরক্তিতে মুখটা বিকৃত করে খাবারটা প্লেটে ফেলে দিল সে।”এটা কী বানিয়েছ? এটাকে খাবার বলে? চালগুলো পাথরের মতো শক্ত, আর মাছটা মুখে দেওয়ার অযোগ্য। লুসিয়া, আমি আগেই বলেছিলাম তুমি পারবে না। তুমি স্রেফ আমার সময় নষ্ট করলে।”
লুসিয়া ছলছল চোখে ফারহানের দিকে তাকাল। সে তার পোড়া হাতটা আড়াল করার চেষ্টা করছিল। সে চেয়েছিল ফারহান অন্তত তার চেষ্টার প্রশংসা করবে।
“ফারহান, আমি প্রথমবার করেছি তো… আমি পরের বার ঠিকই শিখে নেব। প্লিজ আরেকটা পদ খেয়ে দেখো…”
ফারহান চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললো “পরের বার আর আসবে না লুসিয়া। ইউ ফেইলড। তোমার এই জেদ আর শৌখিনতা দিয়ে বাঙালি হওয়া যায় না। আমার কাল সকালে অনেক কাজ আছে, এখন আমার একটু শান্তিতে ঘুম দরকার। তুমি এখন আসতে পারো।”
ফারহান একবারও লুসিয়ার হাতের দিকে তাকাল না, কিংবা তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটোর দিকেও না। সে সরাসরি দরজার দিকে ইশারা করল। “যাও লুসিয়া। রাত অনেক হয়েছে, গেটটা টেনে দিয়ে যেও।”
লুসিয়া আর একটা কথাও বলল না। অপমানে আর শারীরিক যন্ত্রণায় তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে তার পোড়া হাতটা শাড়ির আঁচলে ঢেকে ফারহানের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল। লিফটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের বিধ্বস্ত রূপটা দেখল। ফারহানের এই চরম অবজ্ঞা তার ভালোবাসাকে এবার এক ভয়াবহ জেদে রূপান্তর করল।সে বিড়বিড় করে বলল— “তুমি কাল সকালে এয়ারপোর্টে যাবে তো ফারহান? আমি দেখব মেক্সিকোর মাটি তোমাকে কীভাবে বিদায় দেয়। তুমি আমাকে আজ এই অবস্থায় বের করে দিলে, এর মাশুল তোমাকে দিতেই হবে।”
.
.
.
মেক্সিকোর সেই হাড়কাঁপানো শীত আর আচমকা নামা বৃষ্টির তোড়ে পুরো শহর যেন এক নিথর কবরে পরিণত হয়েছে। রাস্তার সোডিয়াম আলোগুলো বৃষ্টির ঝাপটায় অস্পষ্ট হয়ে আসছে, আর জনমানবহীন রাস্তায় গাড়ির কোনো চিহ্ন নেই।
লুসিয়া তার ফ্ল্যাটের নিচে গেটের পাশে একটি ছোট্ট ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। তার পাতলা নীল শাড়িটা বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। সে বারবার তার ড্রাইভারকে ফোন করার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই দুর্যোগে নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। পোড়া হাতের যন্ত্রণা আর শীতের কামড়ে তার শরীর যেন অসাড় হয়ে আসছে।
প্রায় দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেল। কোনো সাহায্য নেই, কোনো ফেরার পথ নেই। ঠিক তখন অ্যাপার্টমেন্টের নাইট গার্ড তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। সে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দেখছিল মেয়েটি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।
গার্ড তখন জিজ্ঞেস করলো “ম্যাম, আপনি কি এখানেই থাকেন? এতো রাতে এই বৃষ্টিতে কোথায় যাবেন? বাইরে তো একটা ট্যাক্সিও নেই, পুরো এলাকা ব্লক হয়ে আছে।”
লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না। তার নীল হয়ে আসা ঠোঁট দুটো শুধু কাঁপছে। সে অপমানে এতটাই ভেঙে পড়েছে যে কারো সাহায্য চাইতেও তার ঘৃণা হচ্ছে।
গার্ড যখন দেখল মেয়েটি কোনো কথা বলছে না এবং শীতে নীল হয়ে যাচ্ছে, তখন সে চিন্তায় পড়ে গেল। সে মনে করতে পারল, এই মেয়েটি কিছুক্ষণ আগে ফারহানের সাথে ওপরে গিয়েছিল। কোনো ঝামেলা হয়েছে কি না সে জানে না, কিন্তু মানবিক খাতিরে সে রিসেপশনের ফোন থেকে ফারহানের ফ্ল্যাটে ইন্টারকমে কল দিল ফারহানের ফ্লাটে।
ফারহান তখন সবেমাত্র ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ ইন্টারকমের কর্কশ আওয়াজে সে ভ্রু কুঁচকে রিসিভারটা তুলল। “হ্যালো?”
গার্ড তখন ওপাশ থেকে বললো “স্যার, আমি নিচ থেকে গার্ড বলছি। আপনার সাথে যে মেয়েটি এসেছিল, সে এখনো গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর তুষারপাতের মতো ঠান্ডা। মেয়েটা পুরো ভিজে গেছে এবং শীতে কাঁপছে। এখানে কোনো গাড়িও নেই যে ও চলে যাবে। আমার মনে হয় আপনি যদি একবার নিচে আসতেন…”
ফারহান রিসিভারটা ধরে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। তার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করতে লাগল। সে ভেবেছিল লুসিয়া হয়তো নিজের গাড়িতে করে চলে গেছে। কিন্তু এই হাড়কাঁপানো বৃষ্টিতে একটা মেয়ে দুই ঘণ্টা ধরে নিচে দাঁড়িয়ে আছে শুনে তার রাগটা এবার মায়ায় না হোক, অন্তত বিবেকের দংশনে রূপ নিল।
সে একটা ভারী জ্যাকেট হাতে নিয়ে লিফটের দিকে দৌড় দিল।
ফারহান যখন নিচে পৌঁছাল, তখন দেখল লুসিয়া দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়েছে। তার চোখগুলো প্রায় বুজে আসছে। ফারহান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালো।”লুসিয়া! তুমি এখনো এখানে? কেন যাওনি?”
লুসিয়া ধীরগতিতে চোখ মেলল। ফারহানকে দেখেও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তার অবশ হয়ে আসা হাতটা শুধু একটু নড়ল। ফারহান দেখল লুসিয়ার পোড়া হাতটা বৃষ্টির জলে সাদা হয়ে ফুলে উঠেছে।
ফারহান তখন আতঙ্কে বললো “মাই গড! তোমার হাত… আর তুমি এই শীতে বৃষ্টিতে ভিজে শেষ হয়ে গেছ! চলো ভেতরে চলো।”
লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বলল— “আমি… আমি ঠিক আছি। তুমি তো আমাকে বের করে দিয়েছিলে… আমি তোমার ‘ভদ্রলোক’ এপার্টমেন্টে আর যাব না।”
ফারহান আর কোনো কথা না বলে নিজের হাতের জ্যাকেটটা লুসিয়ার গায়ে জড়িয়ে দিল। তাকে এক প্রকার পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নড়বড়ে পা ফেলে লিফটের দিকে এগোতে লাগল।
ফারহানের অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরটা এখন বাইরের ঝোড়ো আবহাওয়ার ঠিক বিপরীত—শান্ত এবং উষ্ণ। ফারহান লুসিয়াকে সোফায় বসিয়ে দ্রুত বাথরুম থেকে শুকনো তোয়ালে নিয়ে এল। লুসিয়া তখনো শীতে কাঁপছে, তার গায়ের নীল শাড়িটা থেকে টপটপ করে জল পড়ছে কার্পেটে।
ফারহান তার আলমারি ঘেঁটে নিজের একটা বড় সাইজের সাদা শার্ট আর একটা ট্রাউজার বের করে আনল।”এই শাড়ি পরে থাকলে তোমার নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। এগুলো নিয়ে বাথরুমে যাও, চেঞ্জ করে নাও। ট্রাউজারটা তোমার জন্য অনেক বড় হবে, পায়ের দিকে একটু গুটিয়ে নিলেই হবে।”
লুসিয়া নিঃশব্দে পোশাকগুলো নিয়ে বাথরুমে গেল। কিছুক্ষণ পর সে যখন বেরিয়ে এল, ফারহান নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ফারহানের শার্টটা তার হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে, আর ট্রাউজারের নিচের অংশটা কয়েক ভাঁজ করে গোড়ালি পর্যন্ত তোলা। এই পোশাকে লুসিয়াকে এক অদ্ভুত মায়াবী আর অসহায় লাগছে।
ফারহান তাকে সোফায় বসিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে পাশে বসল। সে লুসিয়ার পোড়া হাতটা খুব সাবধানে নিজের হাতের ওপর রাখল। আগুনের আঁচ আর বৃষ্টির ঠান্ডা জল লেগে পোড়া জায়গাটা বেশ বাজেভাবে লাল হয়ে ফুলে আছে।
ফারহান তখন বললো “উহ! হাতটার অবস্থা তো খুব খারাপ করেছ। রান্না করতে না পারলে এতো জেদ দেখানোর কী দরকার ছিল?”
ফারহান খুব আলতো করে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা মলমটা লুসিয়ার ক্ষতের ওপর লাগিয়ে দিতে লাগল। ফারহানের আঙুলের ছোঁয়া আর মলমের শীতলতায় লুসিয়া এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলল। যন্ত্রণার চেয়েও ফারহানের এই যত্নটুকু তার কাছে অনেক বেশি দামী মনে হচ্ছিল।
লুসিয়া খুব নিচু স্বরে বললো “জেদ না দেখালে কি তুমি আজ আমাকে এভাবে তোমার পাশে বসতে দিতে? আমি তো শুধু চেয়েছিলাম তুমি একবার অন্তত আমাকে বোঝো…”
ফারহান কোনো উত্তর দিল না। সে খুব মনোযোগ দিয়ে ব্যান্ডেজটা বেঁধে দিচ্ছে। ফারহানের এই নীরবতা আজ লুসিয়াকে কষ্ট দিচ্ছে না, কারণ সে ফারহানের চোখের কোণে অপরাধবোধের ছায়া দেখতে পাচ্ছে।
মলম লাগানো শেষ করে ফারহান উঠে দাঁড়িয়ে বলল— “এখানে শুয়ে পড়ো। আর শোনো, কাল সকালে আমি এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে তোমাকে তোমার বাসায় ড্রপ করে দিয়ে যাব। এখন একদম কথা না বলে ঘুমানোর চেষ্টা করো।”
লুসিয়া সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ফারহানের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার পোড়া হাতটা এখনো টনটন করছে, কিন্তু মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি। ফারহানের দেওয়া বড় শার্টটার হাতা দিয়ে সে নিজের মুখটা একটু ঢেকে নিল—শার্টটাতে ফারহানের পারফিউমের ঘ্রাণ মিশে আছে।
ফারহান ড্রেসিং টেবিলের ওপর তার ফোনটা রেখেই বাথরুমে ঢুকেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিস্তব্ধ ঘর কাঁপিয়ে ফোনটা বেজে উঠল। ভাইব্রেশনের শব্দে সোফায় শুয়ে থাকা লুসিয়ার তন্দ্রা ছুটে গেল। সে দেখল ফারহান ফোনটা নিতে ভুলে গেছে।
লুসিয়া কৌতূহলবশত স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ফোন স্ক্রিনে ইনকামিং কলের সাথে একটি ছবি ভেসে উঠছে। এটি সেই ছবি যা সে কয়েকদিন আগে ফারহানকে পাঠিয়েছিল।
ছবিতে লুসিয়ার পুরো চেহারা নেই তবে ঠোঁটের অংশ থেকে শাড়ির পাড় বরাবর কোমর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। খয়েরি রঙের শাড়িতে সেই মোহনীয় ভঙ্গি আর কোমরে জড়ানো আঁচলের ভাঁজ।
লুসিয়া স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। ফারহান তাকে বারবার বলেছে সে লুসিয়াকে অপছন্দ করে, তার ‘কালচার’ নিয়ে বিদ্রূপ করেছে, এমনকি তার রান্না করা খাবারকেও তাচ্ছিল্য করেছে। কিন্তু ফারহান যে গোপনে তার পাঠানো সেই ছবিটি ফোনের হোমস্ক্রিনে সেভ করে রেখেছে, সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
লুসিয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, ফারহানের বাইরের এই কঠোর অবয়বটা আসলে একটা দেয়াল মাত্র—যার ভেতরে সে অলরেডি জায়গা করে নিয়েছে।
কলটা কেটে গেল, কিন্তু স্ক্রিনের সেই ছবিটা লুসিয়ার মনে আশার এক নতুন প্রদীপ জ্বেলে দিল। সে বিড়বিড় করে বলল, “তুমি আমায় ঘৃণা করো ফারহান? নাকি নিজের ভালো লাগাটাকে স্বীকার করতে ভয় পাও?”
বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হতেই লুসিয়া দ্রুত চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ভান করল। ফারহান ঘর থেকে বেরিয়ে ফোনের দিকে এগিয়ে গেল। সে জানে না, তার গোপন দুর্বলতা আজ লুসিয়ার কাছে ধরা পড়ে গেছে।
ফারহান বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত চেহারাটা একবার দেখল। তারপর ধীরপায়ে সোফার দিকে এগিয়ে এল। সেখানে তার বিশাল শার্ট আর গুটিয়ে রাখা ট্রাউজার পরে লুসিয়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ফারহান আলতো করে সোফার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ঘুমন্ত লুসিয়াকে এখন আর সেই জেদি, উদ্ধত মেক্সিকান মেয়েটির মতো লাগছে না; বরং অদ্ভুত এক মায়াবী আর নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। তার চোখের পাতায় তখনো কান্নার শুকনো দাগ লেগে আছে, আর ব্যান্ডেজ করা হাতটা বুকের কাছে আগলে রেখেছে সে।
ফারহান অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, যে দেয়ালটা সে নিজের চারদিকে তুলে রেখেছিল, তা এই মেয়েটা তিলে তিলে ভেঙে ফেলছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ফোনের দিকে তাকাল—যেখানে ওই খয়েরি শাড়ি পরা ছবিটা এখনো তার দুর্বলতার সাক্ষী হয়ে আছে।
ফারহান পাশের আলমারি থেকে একটা পাতলা কম্বল বের করে খুব সাবধানে লুসিয়ার গায়ে জড়িয়ে দিল। খেয়াল রাখল যেন তার পোড়া হাতে কোনো চাপ না লাগে। তারপর নিজে এক কোণে পাশের ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল।
জানালার বাইরে মেক্সিকোর সেই বৃষ্টি আর ঠান্ডা বাতাস তখনো থামেনি, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এখন এক অবর্ণনীয় স্তব্ধতায় ঘেরা। ফারহানের চোখে ঘুম নেই; সে শুধু ভাবছে কাল সকালে যখন সে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হবে, তখন এই মায়াটুকু সে কোথায় ফেলে যাবে।
কিছুক্ষণ পর ফারহানের চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। লুসিয়ার নিশ্বাসের মৃদু শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে সে-ও একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
.
.
.
প্রাসাদের ইনডোরের সেই বিশাল সুইমিংপুলের নীল পানি আজ স্থির, ঠিক যেন কোনো বিষণ্ণ আয়না। ওপরের ঝাড়বাতির আলো পানিতে পড়ে কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে। জাভিয়ান আর ভ্যালেরিয়া বিপরীতে বসে আছে, কিন্তু দুজনের মনের ভেতরে চলছে ঝোড়ো হাওয়া। ভ্যালেরিয়া একটা ছোট নুড়ি পাথর পানির বুকে ছুঁড়ে মারল; ছোট একটা ‘টুপ’ শব্দ তুলে পানিতে বলয় তৈরি হলো, যা তাদের বর্তমান পরিস্থিতির মতোই অনিশ্চিত।
ভ্যালেরিয়া ট্যাবের ডিজিটাল ম্যাপটা জাভিয়ানের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললো “জাভিয়ান,পরিস্থিতি ভালো না। মেইলস্ট্রোম এই পাহাড়ের প্রতিটি এক্সিট পয়েন্টে তার ‘মেইলস্ট্রোম সেন্টিিনেল’ আর থার্মাল ড্রোন মোতায়েন করেছে। আকাশপথে পালানোর চিন্তা এখন স্রেফ আত্মঘাতী হবে। প্রতিটা ইঞ্চি ও ওর নজরে রেখেছে।”
জাভিয়ান পানির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এখন এক ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসে বললো “মেইলস্ট্রোম খুব প্রেডিক্টেবল, ভ্যালেরিয়া। ও ভাবছে আমি হয়তো কোনো ব্যাকআপ টিম ডাকব বা সরাসরি পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আমরা পালানোর চেষ্টা করব। কিন্তু ও জানে না, ওর এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝেই একটা বড় ফাঁক আছে।”
ভ্যালেরিয়া তখন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো “কীসের ফাঁক? পুরো পাহাড়ও তো ওর কব্জায়।”
জাভিয়ান টেবিল থেকে একটা কলম নিয়ে ম্যাপের ওপর একটা পয়েন্টে দাগ কেটে বললো “এই প্রাসাদের ঠিক ৫০০ মিটার নিচে একটা পরিত্যক্ত খনি আছে, যা সরাসরি দক্ষিণ দিকের উপত্যকায় গিয়ে মিশেছে। সত্তরের দশকে এটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মেইলস্ট্রোম ড্রোন উড়িয়েছে আকাশ পাহারা দিতে, কিন্তু ও মাটির নিচের এই সুড়ঙ্গের কথা ভুলে গেছে। পাহাড়ের ঢালে যেখানে ওর সেন্টিিনেলরা দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক নিচ দিয়ে আমরা বেরিয়ে যাব।”
ভ্যালেরিয়া বললো “কিন্তু ওই খনি তো এখন ধ্বংসাবশেষ! ওখানে অক্সিজেন কম হতে পারে, তাছাড়া রাস্তা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।”
জাভিয়ান তখন বললো “সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। ইউ নো হু আই অ্যাম?? আমি অলরেডি একটা ‘সিগন্যাল জ্যামার’ সেট করবো যা ঠিক ১০ মিনিটের জন্য ওই এলাকার সেন্সরগুলোকে অকেজো করে দেবে। আমাদের হাতে সময় খুব কম থাকবে। তান্বীকে নিয়ে আমি ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হয়ে যাবো, আর তুমি মূল গেট দিয়ে একটা ডামি গাড়ি পাঠিয়ে ওদের ডাইভার্ট করে দিবে।”
জাভিয়ানের পরিকল্পনায় এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে জানে মেইলস্ট্রোমের মতো সাইকোপ্যাথকে হারাতে হলে তার চিন্তা করার গণ্ডির বাইরে গিয়ে চাল চালতে হবে।
ভ্যালেরিয়া জাভিয়ানের আত্মবিশ্বাস দেখে আশ্বস্ত হলো। সে বুঝতে পারল, এই লড়াই কেবল পালানোর নয়, বরং জাভিয়ানের রাজত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ।
.
.
.
জাভিয়ান যখন তার পরবর্তী ভয়ংকর ছক কষছে, ঠিক তখনই প্রাসাদের ওপরতলার একটি সজ্জিত কক্ষে ইসাবেলা আর তান্বী মুখোমুখি বসে। ইসাবেলা খুব আগ্রহ নিয়ে তান্বীর কথা শুনছিলেন। তান্বীর চোখেমুখে এক ধরনের আতঙ্ক আর বিস্ময় মেশানো।
তান্বী বলা শুরু করলো “জানেন ম্যাম, সত্যি বলছি আপনাকে—আপনার ছেলে ওই ‘ঝড়তুফান’ লোকটা আছে না? ও একদম আপনার বিপরীত! আপনি কত সুন্দর মাফিয়া কুইন হলেও,কতটা স্নিগ্ধ। কিন্তু সে? ওরে বাবা! সে একটা আস্ত জ্যান্ত ভয়ঙ্কর মানুষ!”
ইসাবেলা কৌতুকভরা হাসিতে জিজ্ঞেস করলেন, “হুয়াই লিটল গার্ল? মেইলস্ট্রোম তোমার সাথে কী এমন করেছে?”
তান্বী এবার হাত-পা নেড়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল “দেখুন ম্যাম, সে দেখতে মাশাআল্লাহ কত সুন্দর, কত সুদর্শন! দেখলে মনে হয় কোনো সিনেমার হিরো। কিন্তু তার কাজ-কর্ম? ইয়াক! ছি ছি! আপনি জানেন সে কী করেছে? সে আস্ত একটা বিচ্ছু ধরে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে! আমার চোখের সামনেই। কোনো রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষে কি এটা সম্ভব ম্যাম? আমার তো মনে ওর মধ্যে জীন-ভুত কিছু একটা আছে। নরমাল মানুষ কি আর বিচ্ছু চিবিয়ে খায়?”
তান্বীর এই “বিচ্ছু চিবিয়ে খাওয়া”র বর্ণনা শুনে ইসাবেলা হোহো করে হেসে উঠলেন। তিনি জানতেন মেইলস্ট্রোম তার শত্রুদের মনে ত্রাস সৃষ্টির জন্য কতটা নৃশংস হতে পারে, কিন্তু তান্বী সেটাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করছে, তা যেমন অদ্ভুত তেমনি হাস্যকর।
তান্বী যখন মেইলস্ট্রোমের বিচ্ছু খাওয়ার কথা বলে শিউরে উঠছিল, তখন ইসাবেলা তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথাগুলো গুছিয়ে বলতে শুরু করলেন।
“তান্বী, যে মানুষটা জ্যান্ত বিষাক্ত বিচ্ছু চিবিয়ে খেয়ে ফেলে, তার মাথায় সাধারণ মানুষের মতো আবেগ কাজ করে না। ক্লিনিক্যাল রিপোর্টে মেইলস্ট্রোমের এই অবস্থাকে বলা হয়েছে ‘অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ (ASPD) এর সাথে ‘পিকা’ (Pica) ডিসঅর্ডারের এক সংমিশ্রণ।”
তান্বী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ইসাবেলা ব্যাখ্যা করলেন—”পিকা ডিসঅর্ডার হলে মানুষ এমন সব জিনিস খায় যা খাদ্য নয় যেমন মাটি, পাথর বা পোকামাকড়। কিন্তু মেইলস্ট্রোমের ক্ষেত্রে এটা কেবল একটা রোগ নয়, এটা তার ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম’-এর অংশ। ও যখন তোমার সামনে ওই বিষাক্ত বিচ্ছুটা চিবিয়ে খাচ্ছিল, তখন ও আসলে নিজেকে মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো ‘দানব’ বা ‘ঈশ্বর’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছিল।”
ইসাবেলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “ডাক্তারি ভাষায় একে বলা হয় ‘সিলফ-ডেস্ট্রাক্টিভ ইমপালসিভিটি’। ও জানে বিচ্ছুর বিষ ওর ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু ও নিজের ভয়কে জয় করার এক পৈশাচিক আনন্দ পায়। ও ওই বিষের যন্ত্রণার চেয়েও বেশি উপভোগ করে আশেপাশের মানুষের চোখের আতঙ্ক। যখন ও দেখে ওর এই অদ্ভুত আর নোংরা কাজ দেখে মানুষ ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে, তখন ওর মস্তিষ্কে এক ধরনের ডোপামিন নিঃসরণ হয় যা ওকে নেশার মতো আনন্দ দেয়। ও আসলে একজন ‘হাই-ফাংশনিং সাইকোপ্যাথ’, যার কাছে কোনো নৈতিকতা বা ঘেন্না নেই।”
তান্বী স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। সে ভাবল, যে মানুষটা নিজের শরীরের ওপর এতোটা নিষ্ঠুর হতে পারে কেবল অন্যদের ভয় দেখানোর জন্য, সে অন্যদের সাথে কী করতে পারে!
তান্বী থমকে গেল। ইসাবেলা আরও গভীরে গিয়ে বললেন—”এই ধরণের সাইকোপ্যাথরা খুব ধুরন্ধর হয়। এরা দেখতে তোমার বলা ওই হিরোদের মতোই সুদর্শন আর মার্জিত হয়, যাতে মানুষ খুব সহজে এদের ফাঁদে পড়ে। কিন্তু এদের হৃদপিণ্ডটা স্রেফ একটা মাংসপিণ্ড, সেখানে কোনো আবেগ পৌঁছাতে পারে না। এরা কোনো অন্যায় করলে অপরাধবোধে ভোগে না, বরং সেই অন্যায়টাকে একটা শিল্প হিসেবে দেখে। ওর কাছে রক্তপাত কিংবা নৃশংসতা স্রেফ একটা খেলা।”
ইসাবেলার গলার স্বর কিছুটা বুজে এল। তিনি জানালা দিয়ে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন—”ও যখন ছোট ছিল, তখনই আমি ওর চোখে এই শূন্যতা দেখেছিলাম। ও পুতুল নিয়ে খেলত না, ও পতঙ্গদের ডানা ছিঁড়ে তাদের ছটফটানি দেখে হাসত। আমি চেষ্টা করেছিলাম ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে, কিন্তু এই অন্ধকার ওর রক্তে। ও এখন একটা শিকলছেঁড়া বাঘ, যার কাছে ক্ষমতা আর ত্রাস সৃষ্টি করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।”
তান্বী স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। সে বুঝতে পারল, ঝড়তুফান লোকটা যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়েও বেশি বিচিত্র। যে মানুষের মনে কোনো অনুশোচনা নেই, তাকে হারানো কতটা কঠিন হতে পারে, সে জাভিয়ান আর তাকে কি করতে পারে ।সেই চিন্তা তান্বীকে নতুন করে আতঙ্কিত করে তুলল।
.
.
.
সুইমিংপুলের নীল জলরাশির ওপর ঝাড়বাতির আলো কম্পন হচ্ছে। জাভিয়ান ম্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার দৃষ্টি যেন বহুদূরে কোথাও আটকে আছে। ভ্যালেরিয়া দীর্ঘক্ষণ লক্ষ্য করছিল জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে এক গভীর অবসাদ।
ভ্যালেরিয়া ম্যাপ থেকে চোখ সরিয়ে বললো “জাভিয়ান, তুমি কি কোনো কারণে আপসেট বা ডিপ্রেসড? আজ তোমাকে কেন যেন খুব অস্থির দেখাচ্ছে।”
জাভিয়ান কিছুটা চমকে উঠল। সে তার আবেগ আড়াল করতে প্রচুর দক্ষ, কিন্তু আজ যেন সব দেয়াল ভেঙে পড়ছে।
জাভিয়ান বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো “তুমি কীভাবে বুঝলে?”
ভ্যালেরিয়া একটা ম্লান হাসি দিয়ে বললো “তোমার চোখের প্রত্যেকটা পলক পড়ার ভাষাও আমি চিনি জাভিয়ান। কোনটা তোমার রাগ, আর কোনটা তোমার দীর্ঘশ্বাস—সেটা আমার চেয়ে ভালো বোধহয় আর কেউ জানে না।”
জাভিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল ভ্যালেরিয়া আসলে তার প্রতি কতটা অবসেসড; তার অস্তিত্বের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তনও মেয়েটির নজর এড়ায় না। জাভিয়ান এবার আর লুকাল না, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরাসরি বলল—”ভ্যালেরিয়া… শি ডোন্ট লেট মি টাচ হার।”
ভ্যালেরিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কি? তান্বী কি তোমাকে ওকে স্পর্শ করতে দেয় না?”
জাভিয়ান ব্যাখা করলো “বিষয়টা আসলে এমন না যে ও আমাকে বাধা দেয়। কিন্তু আমি ওর কাছে গেলে বা ওকে ছুঁলে ও সেন্সলেস হয়ে যায়। একটু গভীর চুমুতেই ও জ্ঞান হারিয়ে আমার কোলে ঢলে পড়ে।”
ভ্যালেরিয়া বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। “এটা তো আসলেই ভাবনার বিষয়! এমনটা কেন হচ্ছে?”
জাভিয়ান বললো “আমি জানি সমস্যাটা কোথায়। ও আসলে মেন্টালি মোটেও প্রিপেয়ার না। ওর ওই ছোট্ট শরীর আর কোমল মন কোনোভাবেই আমার মতো একজন উন্মাদ মানুষের ছোঁয়া সহ্য করার জন্য প্রস্তুত নয়। আমাদের বিয়ের অনেক মাস পার হয়েছে ভ্যালেরিয়া। আমি যখন ওর সামনে যাই, তখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা আমার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমার ভেতরের পুরুষত্ব ওকে পাওয়ার জন্য হাহাকার করে, কিন্তু সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওর জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
জাভিয়ান পকেট থেকে একটা ছোট রূপালি পাত বের করল। সেখানে কয়েকটা নীল রঙের ট্যাবলেট। সে এক স্থির দৃষ্টিতে ওগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল “তুমি জানো আমি এখন কী করি? নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে আর আমার এই তীব্র ফিজিক্যাল ডিজায়ার কমানোর জন্য আমি নিয়মিত ‘মেডরক্সিপ্রোজেস্টেরন’ (Libido Suppressant) নিচ্ছি।লোকে এটা খায় হরমোনাল সমস্যার জন্য, আর আমি এটা খাচ্ছি আমার ভেতরকার জানোয়ারটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য। এটা খেলে আমার আকাঙ্ক্ষা দমিত থাকে, আমি স্থির থাকতে পারি। আমি চাই না আমার কোনো আচরণে ও আঘাত পাক বা ভয় পাক। ওর নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে আমি নিজের এই শারীরিক কষ্টটুকু সানন্দে মেনে নিয়েছি।”
ভ্যালেরিয়া অবিশ্বাসে পাথর হয়ে গেল। জাভিয়ানের মতো একজন ডমিনেটিং আর ক্ষমতাধর পুরুষ নিজের স্ত্রীর জন্য নিজের পৌরুষকে ওষুধের মাধ্যমে এভাবে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে—এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ান তান্বীকে কেবল ভালোবাসে না, সে তান্বীর পবিত্রতাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি আগলে রাখছে।
ভ্যালেরিয়া তখন বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল বললো “জাভিয়ান! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এই ড্রাগটা তোমার শরীরের ন্যাচারাল ব্যালেন্স বিষিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন এটা নিলে তুমি ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে চলে যাবে, তোমার পেশীর শক্তি আর রিফ্লেক্স কমে যাবে। তুমি মেইলস্ট্রোমের বিরুদ্ধে এই বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে লড়বে কীভাবে?”
জাভিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা ম্লান কিন্তু পাহাড়ের মতো অটল হাসি “মেইলস্ট্রোমের সাথে লড়ার জন্য আমার এই মগজ আর এই হাত দুটোই যথেষ্ট ভ্যালেরিয়া। কিন্তু তান্বীর সাথে থাকার জন্য যে অসীম ধৈর্য আর মানসিক স্থিরতা দরকার, সেটা এই ওষুধ ছাড়া আমার নেই। ওই ছোট্ট মেয়েটা যখন আমার সামান্য ছোঁয়াতে অজ্ঞান হয়ে যায়, ওর সেই অবশ শরীরটা যখন আমার বাহুতে ঢলে পড়ে, তখন আমার মনে হয় আমি ওকে ভালোবাসছি না—বরং আমি ওকে তিলে তিলে মেরে ফেলছি।”
.
.
.
ভ্যালেরিয়া জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বলল, “জাভিয়ান, আমি আর তোমাকে এভাবে নিজের শরীরের ওপর অত্যাচার করতে দেব না। এই বিষাক্ত মেডিসিন আমি তোমাকে আর নিতে দেব না। আমি আজই তান্বীর সাথে কথা বলব।”
জাভিয়ান শশব্যস্ত হয়ে বাধা দিয়ে বলল, “না না ভ্যালেরিয়া, ওকে কী বলবে তুমি? আমি জোর করে ওর কাছ থেকে কিছুই চাই না। ওর অনিচ্ছায় বা ওকে ভয় পাইয়ে আমি কোনো অধিকার ফলাতে চাই না।”
ভ্যালেরিয়া মৃদু হেসে জাভিয়ানের কাঁধে হাত রাখল, “আরে আমি জোর করতে যাব কেন? আমি শুধু ওর মনের ভেতর জমে থাকা ভয়টুকু দূর করে দেব। ওকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করব যাতে ও তোমার ছোঁয়া সহ্য করতে পারে, যাতে ও বুঝতে পারে তুমি ওর জন্য কতটা ব্যাকুল। ওর ওই মানসিক জড়তা কাটানোর দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দাও।”
জাভিয়ান কিছুটা সংশয় নিয়ে তাকাল, “কীভাবে করবে? আবার উল্টোপাল্টা কিছু বুঝিয়ে বসবে না তো?”
ভ্যালেরিয়া আশ্বস্ত করে বলল, “আরে না, আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। তুমি এখন নিশ্চিন্তে নিজের রুমে যাও। ইসাবেলা খালামনির ওখান থেকে একটু পরেই ও আমার রুমে আসবে। তখনই আমি ওর সাথে কথা বলব।”
জাভিয়ান চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও একবার থামল। তারপর একটু লাজুক কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু আমার ওই অপদার্থ বউটাকে বেশিক্ষণ আটকে রেখো না। ওকে না জড়িয়ে ধরলে আমার আবার ঘুম আসবে না। অনেকদিন পর ওকে কাছে পেয়েছি, এই সুযোগটুকু হারাতে চাইনা।”
কথাটা বলেই জাভিয়ান দীর্ঘ পদক্ষেপ নিয়ে করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।ভ্যালেরিয়া পাথরের মূর্তির মতো সেদিকে তাকিয়ে রইল। জাভিয়ানের শেষ কথাগুলো তার বুকে তীরের মতো বিঁধল। যখন জাভিয়ান দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, ভ্যালেরিয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে নিজেকে বলল—”ভ্যালেরিয়া, তুই বোধহয় পৃথিবীর প্রথম প্রেমিকা যে নিজের একতরফা ভালোবাসার মানুষকে অন্য এক নারীর ছোঁয়ার জন্য প্রস্তুত করতে যাচ্ছিস! কী অদ্ভুত ভাগ্য নিয়ে জন্মেছিস তুই! যাকে হৃদয়ে লালন করলি, তাকেই আজ অন্যের বাসর সাজিয়ে দিতে হচ্ছে।”
বাইরে মেক্সিকোর ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টির শব্দ যেন ভ্যালেরিয়ার মনের হাহাকারের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল।
আপনাদের কি মনে হয় পরের পর্বে জাভিয়ান কি সাকসেস হতে পারবে তার রোমান্সে ????
চলবে….
নোট: ৯ হাজার শব্দ হয়ে গিয়েছে এরচেয়ে বেশি দিলে ফেসবুক লাইট দিয়ে আপনারা পড়তে পারবেন না।
আরো অর্ধেক নোটপ্যাডে রয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি এই পর্বে ৩ হাজার রিয়েক্ট করে ফেলুন আমি পরের পর্ব দিয়ে দিবো আরো অর্ধেক লিখে। দুদিন তো লাগবেই ৩ হাজার হতে তাই একটু রিল্যাক্স করবো। রিচেক করিনি ভুলত্রুটি হলে মন্তব্য করে জানিয়ে দিবেন।
(কভারটা এক পাঠিকা বানিয়েছে ভালো লাগলো তাই ব্যবহার করলাম)
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৩
-
ডিজায়ার আনলিশড গল্পের লিংক
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১১
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২০