ডাকপ্রিয়র চিঠি
লেখিকা:_রিক্তা ইসলাম মায়া
০৭
অবশেষে ঠিক হলো, মারিদদের সঙ্গে রিফাত যাবে। কিন্তু কাল থেকে একই পোশাকে থাকায় রিফাতের অস্বস্তি লাগছে। বাসায় গিয়ে গোসল না করলেই নয়। আজ শুক্রবারের নামাজটাও তার পড়া হলো না। সিলেটে যাবে বলে হাসপাতাল ও কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছে দু’দিনের। বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে পুনরায় সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেবে সে। রিফাত সোজা এয়ারপোর্টে মারিদদের জন্য অপেক্ষা করবে। এরপর বিকেল চারটার ফ্লাইটে সিলেট। সিলেট থেকে ওরা কোথায় যাবে, কী কী করবে, সে সম্পর্কে আপাতত রিফাতের কোনো ধারণা নেই। এই সম্পর্কে হাসিব জানে। রিফাত তো মারিদকে একা ছাড়তে চাইছে না বলেই তার সঙ্গে যাচ্ছে।
মারিদের ব্যবসায়িক কারণে অনেক পরিচিত-অপরিচিত শত্রু রয়েছে। মারিদের অবাধ চলাফেরার জন্য প্রায়ই দেখা যায় ওর ওপর আক্রান্ত হয়। আর এ জন্য মারিদের বাবা মাহবুব আলম ছেলের চিন্তায় তার জন্য কয়েকজন বডিগার্ড ও রেখেছেন। কিন্তু বেপরোয়া মারিদ কখনোই বডিগার্ড নিয়ে চলাফেরা করে না আর না কারও কথা শোনে সে। বরং মারিদের যা মন চায়, তাই করে বেড়ায়। আর এতে মারিদের মা-বাবার চিন্তার শেষ নেই। একটি মাত্র ছেলে, ওনাদের চিন্তা করা কি স্বাভাবিক নয়? রিফাত বাড়ি থেকে বের হতেই ডাইনিং টেবিল থেকে ডাকল সালমা সৈয়দ। বলল,
‘রিফাত, কোথায় যাচ্ছিস? এদিকে আয়। খাবি।
সালমা সৈয়দের হাতে হাতে কাজ করছে দুই জা। পাশেই দাঁড়িয়ে দু’জন সার্ভেন্ট খাবারের বাটি এগিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যে ফাতেমা সৈয়দকে দেখা গেল টেবিলে সবার জন্য প্লেট সাজাতে। ছোট জা রুবাব গ্লাসে পানি ঢালছিল। রিফাত দরজার কাছাকাছি গিয়ে পেছন ঘুরে তাকাল বড় মামির ডাকে। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,
‘খাওয়ার সময় নেই মামি। আজ ব্যস্ত আছি। পরে আবার আসব।
কথাটা বলেই রিফাত বেরিয়ে যেতে লাগল। পেছন থেকে সালমা সৈয়দ রিফাতকে ধমকের সুরে শুধাল,
‘খাওয়া নিয়ে আবার কিসের ব্যস্ততা তোর? এদিকে আয়। কোথাও যাবি না রিফাত।
রিফাত শুনল না সালমা সৈয়দের কথা। সে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
‘আমার খাবার মারিদের ড্রাইভারের কাছে দিয়ে দিয়ো মামি। আমি পরে খেয়ে নেব। এখন প্যারায় আছি। যেতে হবে।
রিফাত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই তার চোখে পড়ল পাখিকে। বাগানের গাছ থেকে লাঠি দিয়ে আম পাড়ছে সে। সঙ্গে রাতুল আর রাদ সেগুলো দৌড়াদৌড়ি করে কুড়াচ্ছে। রিফাত পাখিকে দেখে হাঁক ছেড়ে ডাকল। রাদিলের ফোন মারিদকে দেয়নি, সে কথা কানে এসেছে তার। সেই নিয়ে পাখিকে একটু শাসন করবে ভেবেই রিফাত ডেকে বলল,
‘এই পালক্কা সুখ! এদিকে আয়।
নিজের নাম কানে যেতে খুব স্বাভাবিকভাবে পেছন ঘুরে তাকাল পাখি। রিফাতকে দেখল কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে। পাখির নামই সুখ। মূলত পাখি নামটা ওর দাদাভাই দিয়েছে ওর চঞ্চলতার জন্য। সৈয়দ বাড়ির অর্ধেক মানুষ ‘পাখি’ ডাকে, বাকি অর্ধেক ‘সুখ’। যার যখন যেটা মনে চায়, পাখিকে সেই নামেই ডাকে তারা। আর এতে জবাব দেয় সে। ছোট থেকে সে দুই, তিন নামে অভ্যস্ত, তাই নাম নিয়ে তার সমস্যা হয় না কখনো। মূলত সে ‘পাখি’ নয়। ওর আসল নাম রিদিতা সৈয়দ সুখ। ‘পাখি’ ওর ডাকনাম। সবাই মুখে মুখে ডাকে। তবে কাগজ-কলমে বাবার দেওয়া রিদিতা সৈয়দ সুখ নামটাই পরিচিত। পাখি হাতের লাঠিটা নিয়েই উত্তর দিয়ে বলল,
‘কী ভাই?
‘এদিকে আয়!
রিফাতের ডাকে পাখি হাতের লাঠি মাটিতে রেখে রাতুল, রাদের উদ্দেশে বলল,
‘তোরা এখানেই দাঁড়া। আমি আসছি কেমন?
‘আচ্ছা আপু।
দুই ভাইয়ের একত্রে সম্মতি পেয়ে পাখি রিফাতের কাছে গিয়ে অবুঝ গলায় শুধাল,
‘পালক্কা কী রিফাত ভাই? তুমি আমাকে পালক্কা ডাকলে কেন?
পাখির চোখেমুখে কৌতূহল দেখে রিফাত বানিয়ে বানিয়ে বলল,
‘পালক্কা মানে হচ্ছে তুই এই বাড়ির পালিত মেয়ে। আমরা তোকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, বুঝলি?
রিফাতের কথায় সুখকে কষ্ট পেতে দেখা গেল না। বরং তৎক্ষণাৎ রিফাতকে শুধিয়ে সুখ বলল,
‘ নিশ্চয়ই আমি কোনো রাজা-বাদশার মেয়ে ছিলাম রিফাত ভাই, তাই না? কোনো এক মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে আমি আজ প্রাসাদ ছাড়া। শিট! আমার আব্বা হুজুর কে, রিফাত ভাই বলো। আমি প্রাসাদে ফিরতে চাই।
সুখের ভণ্ডামিতে মুখ কুঁচকাল রিফাত। ব্যঙ্গ করে বলল,
‘হ! তুই রাজরানীর মেয়ে না, চাকরানীর মাইয়া ছিলি। তোকে আমরা ‘ অষ্টাশির বন্যার সময় ড্রেনের পাশে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, বুঝলি? তোর গায়ে ছেঁড়া কাপড় আর কী দুর্গন্ধ ছিল, সুখ! ছিঃ! বড় মামির মনটা ভালো, তাই তোকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে। আমি হলে তো কখনোই আনতাম না।
রিফাতের নাক মুখ কুঁচকে বলা কথায় সুখ কপাল কুঁচকে সন্দেহভরা গলায় বলল,
‘আমার বয়স তো সবে পনেরো, তাহলে তোমরা আমাকে ‘ অষ্টাশির বন্যার সময় কীভাবে পেলে, রিফাত ভাই? এতদিন আমি কোথায় ছিলাম? আমার বয়স বাড়ল না কেন? আমিতো তোমাদের বড় হওয়ার কথা।
‘ আরে তুই বড় হবি কেমনে? তোকে তো আমরা ফ্রিজে সংগ্রহ করে রেখেছিলাম, সেজন্য তোর বয়স বাড়েনি, বুঝলি গাধী?
রিফাতের কথায় সুখ কিছু বলবে, তার আগেই সেখানে উপস্থিত হলো সুখের ছোট চাচী রুবাব। তিনি রিফাতের কথা শুনে রিফাতকে শুধিয়ে পেছন থেকে বলল,
‘রিফাত, তুমি আমাদের সুখকে ভুলভাল বোঝাচ্ছ কেন? আমার সুখ মোটেও পালিত মেয়ে নয়। বরং মারিদের পরে সুখকে জন্ম দিতে বড় ভাবি কতকিছুই না করল। এই মাজার থেকে ঐ মাজারে কত কান্নাকাটি করে অবশেষে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে মারিদের পনেরো বছরের ছোট সুখকে জন্ম দিল বড় ভাবি। আর তুমি বলছ আমরা সুখকে বন্যায় কুড়িয়ে পেয়েছি?
ছোট চাচীর কথায় সুখকে খুশি হতে দেখে রিফাত ফের সুখকে মিথ্যা বানিয়ে বলল…
‘সুখ, শোন! ছোট মামি তোকে পাম দিচ্ছে। তুই যাতে কষ্ট না পাস, সেজন্য। তুই কিন্তু মামির কথায় বিশ্বাস করিস না কেমন। আমি যা বলছি, তাই সত্য। তোকে আমরা বন্যায় কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, বুঝলি?
সুখ নাক-মুখ কুঁচকে রিফাতের দিকে তাকাল। রিফাত যে মিথ্যা বলছে সেটাই সত্য। রিফাত সুখকে রাগাতে পেরে সুখের কপালে টোকা দিয়ে হাসতে হাসতে চলে যেতে লাগল। রুবাব বেগম সুখকে খাওয়ার কথা বলে এগোল রাদ-রাতুলকে আনতে। সুখ রিফাতকে চলে যেতে দেখে পেছন থেকে ডেকে বলল,
‘রিফাত ভাই, কই যাও?
‘বাড়িতে।
সুখ রিফাতের কথা শুনেও না শোনার ভান করে রিফাতকে পুনরায় পেছন থেকে বিরক্ত করতে ডাকল। একই ভাবে বলল,
‘ও রিফাত ভাই, কই যাও?
রিফাত আগের চেয়ে আরও খানিকটা জোরে চেঁচিয়ে বলল,
‘বাড়িতে যাই, গাধী।
সুখ আবার চেঁচাল। একই প্রশ্ন করে বলল,
‘রিফাত ভাই, কই যাও?
সুখের পরপর ডাকাডাকিতে রিফাত খানিকটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিয়ে বলল,
‘জাহান্নামে যাই। যাবি?
‘ না তুমিই যাও। আমার সময় নেই। আসার সময় আমার জন্য কলা নিয়ে এসো তাহলেই হবে।
রিফাত বেশ বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সুখের দিকে নাক-মুখ কুঁচকে তাকাতেই সুখ মুখ ব্যঙ্গ করে দৌড়ে বাড়ির ভিতরে পালিয়ে যেতে রিফাত সেদিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ে যে কী পরিমাণ ভণ্ড হয়েছে, আল্লাহ জানে। আচ্ছা, সুখের সাহস দিন দিন বাড়ছে না? বড় ভাইদের সে আজকাল ‘তুমি’ করে বলছে। আবার রাদিলের ফোনটাও নাকি মারিদকে দেয়নি। রিফাত এবার সিলেট থেকে ফিরেই সুখের একটা ক্লাস নিবে। এই মেয়ের ভণ্ডামির লেভেল পরীক্ষা করে দেখবে।
~~
সূর্য তখন মাথার ওপর থেকে হেলে পড়েছে। শেষ বিকেলের নরম আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। মারিদ, রিফাত আর মারিদের সহকারী হাসিব— তিনজন মিলে বেরিয়ে পড়েছে সিলেটের পান্তুমাই গ্রামের উদ্দেশে। সঙ্গে আছেন তাদের নিরাপত্তার জন্য এক স্থানীয় গার্ড, যিনি এই এলাকার প্রতিটি পথঘাট চেনেন। তবে আপাতত আদিবাসী তাতিয়ানের বাড়িতে পৌঁছানোই তাদের লক্ষ্য। যদিও তারা কাল রাতে সিলেট পৌঁছেছিল, তবে নিরাপত্তার জন্য সিলেটের একটি রিসোর্টে রাত্রি যাপন করে আজ সকাল সকাল বেরিয়েছিল পান্তুমাই গ্রামের উদ্দেশে। স্থানীয় সিকিউরিটি গার্ড নিয়ে বেরুতে বেরুতে তাদের দুপুর গড়াল।
তবে ওরা শহর ছাড়িয়ে কিছুটা এগোতেই রাস্তার দু’পাশে দেখা গেল সারি সারি সবুজ গাছের সমারোহ। চারপাশের ইট-পাথরের দেয়াল যেন মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুরু হলো পাহাড়ি পথের যাত্রা। রাস্তা কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। কখনও আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে গাড়িটা উঠছে ওপরে, কখনও নামছে নিচে। পথের এই ওঠানামায় আনন্দ রিফাত আর হাসিবের মাঝে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও মারিদ নিশ্চুপ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে পাহাড়ের শেষ চড়াইয়ের দিকে। গাড়ির সামনে বসেই নিরাপত্তার গার্ডটি জায়গায় জায়গায় বিবরণ দিচ্ছে রিফাত আর হাসিবকে। সে কথা মারিদের কান অবধি পৌঁছাচ্ছে কিনা, কে জানে? অথচ গাড়ি চলছে দূর দিগন্তে মেঠোপথে। সেই সাথে গাড়ির জানালা ভেদ করে হিমেল বাতাস বইছে শো শো শব্দে। বাতাস শুধু শীতলই নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছে বন-জঙ্গলের এক মিষ্টি গন্ধ। চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ। নানা প্রজাতির গাছপালা, লতাপাতা আর বুনো ফুলের সমারোহ। রাস্তার দু’পাশে ঘন গাছগুলো দেখে মনে হয় যেন, তারা কোনো সবুজের সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মেঘে ঢাকা উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের ওপর মেঘের খেলার দৃশ্য দেখে রিফাত, হাসিব দু’জনই মুগ্ধ। রিফাত তার হাতের ফোনের ক্যামেরায় কয়েকটি ছবি তুলল। ঢাকায় ফিরে এসব সুখকে দেখাবে।
রাস্তার পাশে ছোট ছোট পাহাড়ি ঝর্ণাও দেখা গেল। ঝর্ণা থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জল পাথরের ওপর দিয়ে আপন মনে বয়ে যাচ্ছে। ঝর্ণার কলকল ধ্বনি যেন এক সুরের মূর্ছনা তৈরি করছে ক্ষণে ক্ষণে।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়িটা এগিয়ে চলল। দুপুরে তপ্ত রোদের আলো নিভে তখন বিকালের নরম আলোয় পৃথিবীজুড়ে। অবেলায় পাহাড়ি পথে যাত্রা নিয়ে রিফাত ও হাসিব খানিকটা চিন্তা প্রকাশ করলে গার্ডটি তাদের অভয় দিয়ে বলল,
‘চিন্তা করবেন না সাহেব, আমরা ইতিমধ্যে চলে এসেছি। আপনাদের দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী আমরা গাড়ি থেকে নেমে আরও দশ-পনেরো মিনিট পায়ে হেঁটে পাহাড়ের চড়াইয়ে যাবো। সেখানেই আদিবাসী তাতীয়ানের বাড়ির।
রিফাত গাড়ির জানালা গলিয়ে মাথা বের করল। বাইরে তাকাতেই দেখল রাস্তার পাশ ঘেঁষে একটি সরু মাটির পথ চলে গেছে পাহাড়ের চড়াইয়ের দিকে। এই রাস্তা দিয়েই যেতে হবে তাদের। হলোও তাই। রিফাতের ভাবনা অনুযায়ী গার্ডের নির্দেশে চালক গাড়ি থামালেন। একে একে সকলে গাড়ি থেকে বের হতেই অনুভব করল, চারপাশের শীতল বাতাস যেন আরও স্নিগ্ধ। পাহাড়ি গাছগাছালি থেকে ভেসে আসছে নানা ধরনের পাখির ডাক আর ঝিঁঝি পোকার শব্দ। মারিদ গাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বের হতেই পাহাড়ের চড়াইয়ের দিকে তাকাল। গন্তব্য তার সেখানেই। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পরিচয় গোপন করে মারিদ গায়ে কালো হুডি জড়াল কালো প্যান্টের সাথে। পায়ে কালো সুজ। পাহাড়ি রাস্তায় জোঁকের উপদ্রব বেশ। সেজন্য সবার পায়েই সুজ পড়া। মারিদ হুডির মাথা কপাল পর্যন্ত টেনে মুখে কালো মাস্ক পরল। হাত দুটো হুডির পকেটে গুঁজে সামনে হাঁটল। মারিদকে সামনে এগোতে দেখে রিফাত তাড়াহুড়ো করে সেদিকে এগোল। পেছন পেছন হাসিব গার্ডকে নিয়ে সামনে এগোল। হাসিবের হাতে এক টুকরো কাগজে তাতিয়ানের বাড়ির লোকেশন আঁকা। পাহাড়ি এলাকায় নেটওয়ার্ক পাবে না বলেই আপাতত কেউ ফোন বের করল না। সবাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গার্ডকে অনুসরণ করেই এগোচ্ছে। তাতিয়ান বাড়িতে যাওয়ার পথটি ছিল বেশ ঢালু, কোথাও কোথাও কাদাও ছিল। দক্ষ গার্ডটি পিঠে ব্যাগ চড়িয়ে এক হাতে লাঠি নিয়ে তাতে ভর করে ওপরে উঠছে। যদিও সবাইকে একটা করে লাঠি দেওয়া হয়েছে পাহাড়ের চড়াইয়ে উঠতে, তবে মারিদ বাদে সকলেই সেই লাঠির সাহায্যে একে অপরের পেছনে হাঁটতে লাগল।
প্রায় মিনিট দশেকের পরই তারা একটি ছোট টিলার ওপর পৌঁছাল। সেখান থেকে দেখা গেল, নিচে কয়েকটি বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা ঘর। ঘরের বারান্দায় আলো জ্বলছে। গার্ডটি আঙুল তাক করে সেই ঘরটি দেখিয়ে বলল,
‘ওই যে সাহেব, তাতিয়ানের বাড়ি এটা।
তারা সবাই নিচে নামতে লাগল। তাতিয়ানের বাড়িটি বেশ পরিচ্ছন্ন আর সুন্দর। ঘরের সামনে উঠানে একটি বড় মাচার ওপর কয়েকটি কুকুর শুয়ে ছিল। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে একজন বয়স্ক আদিবাসী মহিলা বেরিয়ে এলেন। অপরিচিত মানুষদের নিজের বাড়িতে দেখে তিনি নিজের ভাষায় বললেন,
‘কে আপনারা? কাকে চান?
আদিবাসী মহিলার কথা কেউ বুঝতে না পারায় মারিদের সঙ্গে থাকা গার্ডটি এগিয়ে আদিবাসীদের ভাষায় উত্তর দিয়ে বললেন,
‘ওনারা ঢাকা থেকে এসেছেন। তাতিয়ানের সঙ্গে দেখা করতে। তাতিয়ান বাড়িতে আছে মাওমা?
বয়স্ক মহিলাটি তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়লেন। যার অর্থ তাতিয়ান বাড়িতে আছে। মহিলাটি মারিদের দিকে এক পলক তাকিয়ে ভিতরে চলে যেতেই মারিদ আশেপাশে তাকাল। মনে তার অসংখ্য প্রশ্ন। অপরিচিতার দেখা পাওয়ার ব্যাকুলতা। অস্থির চোখ দুটো ক্রমশ এদিক-ওদিক ছুটে চলেছে মারিদের এই ভেবে, হয়তো তার অপরিচিতা পাহাড়িয়ান কেউ। তাতিয়ান লোকটা কি অপরিচিতার বাবা? আর এই মাওমা মহিলাটি কি অপরিচিতার মা? আচ্ছা, অপরিচিতা কি আশপাশে কোথাও থেকে মারিদকে দেখছে?
মারিদের ভাবনার মাঝে বাঁশের ছোট ঘর থেকে মাথা নুইয়ে বের হলো ঈষৎ কালো, বেটে একটা লোক। গায়ের গঠন হালকা-পাতলা। পরনে আদিবাসী লুঙ্গি। উদোম শরীরে গলায় ঝুলছে আদিবাসী গামছা। লোকটি বের হতে হতে এক পলক সকলকে দেখে নিল। এর মাঝে শোনা গেল গার্ডটির প্রশ্ন,বলল…
‘আপনি তাতিয়ান?
তাতিয়ান লোকটি একত্রে এতগুলো অপরিচিত মানুষ দেখে কেমন বোকার মতো মাথা নাড়লেন। লোকগুলো কে হতে পারে, সেই কৌতূহল তাতিয়ানের চোখেমুখে স্পষ্ট। এর মাঝে ফের গার্ড লোকটি মারিদকে দেখিয়ে তাতিয়ানকে বলল,
‘ওনারা ঢাকা থেকে এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে। খুব সম্ভবত ওনারা আপনার কাছে কোনো কিছুর সন্ধানে এসেছেন। আপনি সঠিক তথ্য দিলে উপকার হতো তাতিয়ান।
ঢাকা থেকে মানুষ এসেছে আদিবাসী তাতিয়ানের বাড়িতে, কথাটি শুনে কেমন বিস্ময়কর লাগল তাতিয়ানের। অবিশ্বাস্য গলায় বাংলা ভাষায় বলল,
‘আমার কাছে কিসের সন্ধানে এসেছেন ওনারা? আমি কিসের সঠিক তথ্য দিব গার্ড?
তাতিয়ান লোকটাকে বাংলা ভাষায় কথা বলতে দেখে সবার কাছে সহজ হলো কথা বলতে। বয়স্ক তাতিয়ান একজন মাঝি। সে নৌকা চালিয়ে পর্যটকদের নেওয়া-আসা করে, তাই সে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে। মূলত সে বাঙালি পর্যটকদের কাছ থেকে এই বাংলা ভাষা শিখেছেন। এর মাঝে রিফাত হাসিবের হাতের কাগজটা নিয়ে তাতিয়ান লোকটাকে দেখিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে বলল,
‘কাগজে থাকা নম্বরটা কি আপনার তাতিয়ান?
বয়স্ক তাতিয়ান নম্বরটির দিকে তাকাল। প্রথমে চিনতে না পারলেও বেশ কয়েকবার নম্বর দেখে হঠাৎ চেনার মতো করে বলল,
‘জি স্যার, নম্বরটি তো আমারই। কিন্তু আপনারা এই নম্বরটা পেলেন কই থেকে? এই নম্বরটা তো আমি আরও এক বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছিলাম স্যার। আপনারা হঠাৎ এতদিন পর এই নম্বরের সন্ধান কেন করছেন?
তাতিয়ানের কথায় রিফাত চট করে মারিদের দিকে তাকাল। মাস্কের আড়ালে ঢেকে থাকা মারিদের ভাবভঙ্গি বোঝার উপায় হলো না রিফাতের। তাতিয়ান লোকটা যদি এক বছর আগে এই নম্বর হারিয়ে থাকে, তাহলে মারিদ এতদিন কার সাথে কথা বলল? রিফাত মারিদকে এক পলক দেখে পুনরায় একই ভাবে প্রশ্ন করল তাতিয়ানকে। বলল,
‘আপনি শিওর, এক বছর আগে আপনি এই নম্বরটি হারিয়ে ফেলেছেন? নাকি আপনার কোনো মেয়েকে দিয়েছেন এই নম্বর ব্যবহার করতে?
‘কী বলেন স্যার? আমার তো মেয়েই নেই? আমার একটা মাত্র ছেলে আছে। ওরে বিয়ে দিয়ে নাতি-নাতনী নিয়ে থাকি এই বাড়িতে। চাইলে আপনারা দেখে যেতে পারেন। আমার কোনো মেয়ে নেই। আর না এই নম্বরটা আমরা কেউ ব্যবহার করি।
রিফাত খানিকটা সন্দিহার গলায় প্রশ্ন করে বলল…
‘তাহলে এই সিমটা হারালেন কীভাবে?
তাতিয়ান ফের সহজ সরল মনে উত্তর দিয়ে বলল…
‘শুধু সিমটা হারাইনি স্যার। আমার ফোন, টাকার ব্যাগ সবগুলো চুরি হয়ে যায় আরও এক বছর আগে। তখন আমি সিলেটের বাইরে বরিশাল যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বাসের মধ্যে কারা যেন আমার ফোন আর টাকার ব্যাগটা চুরি করে নিয়ে যায়। এরপর অনেক খোজাখুজি করেও তার সন্ধান আর পেলাম না। আমি গরিব মানুষ, তাই দ্বিতীয়বার আর টাকা খরচ করে সিমটা ওঠাইনি। এখন আপনারা সেই সিমের সন্ধান হঠাৎ করে আমার কাছে করলে আমি তার খোঁজ কীভাবে দেব স্যার?
তাতিয়ান লোকটার কথা অবিশ্বাস্য মনে হলো না কারও। তারপর রিফাত নিজের প্রশ্ন চালিয়ে বলল…
‘আপনার সিমটা ছয় মাস যাবত কেউ ব্যবহার করছে, আর সেটা আপনি বলতে পারেন না বলছেন?
‘না স্যার বলতে পারি না। আমার ফোন হারানোর পর আমি আর সিমের খোঁজ করিনি। আমার ছেলে আমাকে ওর একটা নতুন সিম দিয়েছে, ওটাই এখন চালাই। পুরাতন সিমের কথা তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনাদের বলাতে এখন মনে হইলো।
‘আপনি সত্যি বলছেন?
‘জি স্যার।
রিফাত তাতিয়ানকে ভয় দেখিয়ে বলল…
‘ যদি আপনি আমাদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকেন, তাহলে এরজন্য কিন্তু আপনার জেল হতে পারে, আপনি সেটা জানেন?
রিফাতের কথায় তাতিয়ানের মধ্যে ভয় দেখা গেল। তিনি অন্তত গরীব মানুষ। খেটেখুটে খাওয়া মানুষ। এখন ওনার জেল হলে তাতিয়ানের পরিবার না খেয়ে থাকবে। তাতিয়ান ভয় নিয়ে রিফাতের কথার উত্তরের বলল…
‘স্যার, যেটা আমি জানি না, সেটার তথ্য আপনাদের আমি কীভাবে দেব? আমাকে বিশ্বাস করুন স্যার, আমি সত্যি জানি না আমার এই ফোনটা চুরি হওয়ার পর সিমটা কে ব্যবহার করেছে।
তাতিয়ানের কথা শেষ হতেই মারিদ আর দাঁড়াল না। কেমন শক্ত রোবটের মতো এগোল যে পথে এসেছিল, সে পথে। মারিদের মনে হয়েছে, বয়স্ক তাতিয়ান সত্যি বলছে। অপরিচিতার সঙ্গে আদিবাসী তাতিয়ানের কোনো সম্পর্ক না থাকলে তাহলে অপরিচিতা কে ছিল? কে বা মারিদের সঙ্গে ঘণ্টা পর ঘণ্টা কথা বলত? দিন দিন মারিদ ফোনের ওপাশের মানুষটাকে যত খোঁজতে যাচ্ছে ততই যেন মানুষটা ঘোলাটে আর অদৃশ্য মানবে পরিণত হচ্ছে।
চলবে…
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২